হোম গদ্য গল্প করমচা গাছের পাশে একজন বৃষ্টিতে ভিজছে

করমচা গাছের পাশে একজন বৃষ্টিতে ভিজছে

করমচা গাছের পাশে একজন বৃষ্টিতে ভিজছে
466
0

তুলির অভাব ছিল। তাই আঙুলে রং লাগিয়ে কাঠের ফ্রেমের ওপর বসানো কালো টিনের পাতে কেউ বুঝি লিখে দিয়েছে সাইনবোর্ডটা : নাবাতি দাওয়াখানা। হাকিম : জয়নুদ্দিন। ত্যাড়া-বাঁকা মাত্রার ওপর অক্ষরগুলো ছোট-বড়। দেখলেই বুঝা যায় আনাড়ি হাতের ছাপ। ছোট্ট একটা টেবিল সামনে নিয়ে যে-চেয়ারটায় হাকিম জয়নুদ্দিন নিজে বসেন, তার পেছন পর্যন্ত কাঠের তাক ভর্তি সারি সারি ফলের টনিক, নানা রঙের তরল ওষুধভরা ছোট-বড় বোতলের গাদাগাদি আর সঞ্জীবনী সালসা। আরও আছে প্রমাণ সাইজের মলমের কৌটা, বিভিন্ন রোগের হালুয়া প্যাকেট, জোলাপ ও হজমির প্রাচুর্য। আর আয়ুর্বেদ ওষুধের প্যাকেটের গায়ে কত বিচিত্র নাম যে লেখা আছে তার ইয়ত্তা নেই। যেমন সুতিকাসংহারক বটিকা, শুলগজেন্দ্র তৈল, অষ্টাঙ্গ লবণ, স্বপ্ন বিলাস ইত্যাদি। জেলা সদর থেকে আসা পুবের যে-রাস্তাটা পশ্চিমে হেলে গেছে মুখরিত টাউনের দিকে, বাসে যেতে যেতে কেউ যদি সেই রাস্তার ডানে জানালায় গলা বাড়িয়ে দেন, তিনি জানবেন, নয়া বাজারের এই নাবাতি দাওয়াখানা আসলে একটা ভেষজ গন্ধের আড়ত। নানা গুণ-সমৃদ্ধ সেইসব ভেষজগুলো নমুনা হিশেবে বিভিন্ন কাচের বয়ামে রাখা আছে। বহেড়া, আমলকি, মাজুফল, মৌরিবীজ, গোর কাঁটা ইত্যাকার নামের রহস্যে আরোগ্য লাভের এক মদির কামনা এমনিতেই লেগে থাকে। রোগীরা সেই ভেষজের গন্ধ নেয়। একটা গ্রামীণ তাড়না আছে সেই গন্ধে। আর নগর বিলুপ্ত এক প্রাচীন ঐশ্বর্যভরা জয়নুদ্দিনের মুখ। সারাদিন তাম্বুল রাঙা কত কথার ফোড়ন ছড়িয়ে বেড়ায়। সে-কথায় মোহ আছে। সেই মোহে যারা ধরা পড়ে, তাদের সিংহভাগ যুবক শ্রেণির। স্বপ্নদোষের বাড়াবাড়ি আর স্নায়ুবিক দুর্বলতা হয়তো তাদের যৌবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাই জয়নুদ্দিনের শুক্র জীবন হালুয়া একমাত্র প্রতিকার। কিছু উঠতি কিশোরও এখানে ভিড়ে। মৈথুনের অভিজ্ঞতা না থাকলেও প্রারম্ভিক যৌবন নিয়ে কত আতঙ্ক তাদের। আগাম সতর্ক হতেই তারা চায় পূর্ণচন্দ্র রস। আর মহিলাদের জন্য সুতিকার প্রথম দাওয়াই মৃতসঞ্জীবনী সুধা। বৃদ্ধ যারা আসেন, তাদের ঝোঁকের জিনিস বাতের তৈল। যথাস্থানে মর্দনের অব্যর্থ পরামর্শ নিয়ে সহসা বিদেয় হন। তাজুল মিয়ার ব্যাপার অবশ্য ভিন্ন। সহসা বিদায় নেবার লোক সে নয়। এখানে এলেই তার বসে যেতে ইচ্ছে করে। ভিন্ন এক উপসর্গও এর সঙ্গে যোগ হয়েছে। সে মাঝ বয়সী। তবু এ বয়সেই তার রক্ত যেন নিস্তেজ হতে চলেছে। হাকিম জয়নুদ্দিন বলেছিল : চল্লিশের পর যৌবন একবার চাগাড় দিয়া ওঠে। তুমি এমন বাঁকা হয়া গেছ যে? রগরগে যৌবনের সময়টাতে যে-ভাবে বউয়ের স্পর্শ পেলেই উত্তেজনায় পাগলা ষাঁড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করত, এখন অতটা হয় না। হলেও শিখরস্পর্শী আনন্দ যে-মাত্রায় পৌঁছলে নিজের পৌরুষ নিয়ে তৃপ্তি মেলে, গর্ব হয়, সেইটুকু সে হাতড়ে বেড়ায়, পায় না। তাই নয়ার হাটের এই দাওয়াখানায় হাকিম জয়নুদ্দিনের কাছে এর একটা বিহিত হবে বলেই তার বিশ্বাস। বিয়ের চার বছর পর অর্থাৎ বছর দশেক আগে সর্পসঙ্গমের কৌশল আয়ত্ত করে কিভাবে বউকে বিছানায় পরাজিত করতে হয়, তা শিখিয়েছিল জয়নুদ্দিন। আর দেড় শ টাকার জোঁকের তেল হাতে ধরিয়ে বলেছিল : সকাল বিকাল অঙ্গের গোড়ায় মাখবা। লোহার মতো টনটন করব।


কামরূপ কামাখ্যার এক ন্যাংটা কবিরাজ তাকে জানিয়েছে : নারী পরাজিত হতে ভালোবাসে কিন্তু বাহানা করে জয়ের।


হয়তো সেরকমই হয়েছিল। কিন্তু গত তের-চৌদ্দ বছরে যতবার সে বউকে জিজ্ঞেস করেছে : তোর কি মজা হয় নাই? বউ শুধু মৌন থেকেছে। জোরের এক পর্যায়ে হেরে গেলে রাজহংসীর মতো চিকন গলা অন্যদিকে ঘুরিয়ে শুধু বলেছে : সরেন তো। আপনের শরম নাই? কিন্তু তাজুল মিয়া ভেবে পায় নাই কিসের শরম। রাতের গভীরে তাদের নগ্ন এবং যৌথ কর্মে কত তুলকালাম কাণ্ডই তো ঘটে থাকে। কত নিবিড় নির্জনতা শরীরের পরতে পরতে আগুনের মতো জ্বলে উঠেছে। সেই দাউ দাউ আদিম সরগোলে শরমের লেশ মাত্র ছিল না কোথাও। কিন্তু পূর্বতন প্রশ্নের রেশ ধরে যতবার প্রশ্ন হতো : তোর কি মজা হয় নাই? প্রতিবার একই উত্তর : আপনের শরম নাই? তাই রহস্যের খেই ধরতে তার স্মৃতি সমৃদ্ধ মন এক পা দুই পা করে পেছনে যায়। প্রারম্ভিক যৌবনের কথা ভেবে হেসে ওঠে। আবার ফিরে আসে। পৌরুষ বিলুপ্ত প্রায় এক নিস্তেজ বর্তমান তাকে আজ হতাশ করে। আবার সে পেছনমুখো হয়। তখন যৌবনের রক্ত পল্লবিত ডালে ডালে পাতায় লুকনো একটা চড়ুই পাখির মতো মনে পড়ে কাজলের মুখ। কাজল আর চড়ুই পাখি—সঙ্গমের প্রসঙ্গে দুজন একই রকম মতাদর্শী। অথবা কাজলের সঙ্গে মোরগের সাদৃশ্য আরো জোরাল। বহু পত্নী মাত করে হয়তো মোরগ গেরস্থের প্রাতঃরাশ হয় সকাল বেলায়। নির্বিকার মৃত্যুর মধ্য দিয়েও পারঙ্গম যৌবনের মৌ মৌ গন্ধ সে ছড়িয়ে দেয়। রান্না করা মাংসে গেরস্থ হয়তো টের পায় সেই গন্ধ। কিন্তু বলে না। কাজলের কথা সবাই বলে। সে হচ্ছে যৌন সম্রাট। ওর বাবা ধনী ছিল। একমাত্র ছেলে বলে সম্পত্তির প্রায় সবটাই সে-ই পেয়েছে এবং সিংহভাগ খুইয়েছে ছেনাল মেয়েদের পিছে। শেষটায় একটা ট্রাক কিনেছে। নিজেই চালায়। আয়ের পুরোটাই এখনো প্রায় বিভিন্ন নারীর জন্য বরাদ্দ। বহুবার সে পুলিশের কাছে ধরা খেয়েছে। মোরগের মতো প্রাতঃরাশ হয় নাই। তবে মার খেয়েছে। সারা রাত তিন জন নারীর সঙ্গে কর্ম করেও চতুর্থ নারীর কাছে সে হারে নাই। এই প্রবাদ প্রচলিত বলে তাজুল মিয়ার কোথায় যেন ঈর্ষা হয়। আর ভাবে প্রতিবার সে নিজেই কি বউয়ের কাছে হেরে যায়? বউ কি সেই শরমের কথাই বলে? কিন্তু তৃপ্তি বা বিরক্তির কোনো রেশ বউটির মুখে কোনোদিন দেখে নাই সে। বরং পেয়েছে দেহের নন্দন। রাজহংসীর মতো গলা বাড়িয়ে আবার নামিয়ে আনার অবিরাম শুশ্রূষা, উত্থান, পতন। তার মানে বউ তাকে তৃপ্তি দিয়েছে। ধারণ করেছে তার শরীরের সমস্ত শৈলী—নির্ভার রাত্রির কোলে যা চেপে বসে নারীর ওপর, সেইটুকু, অগাধ। তাতেও তাজুল মিয়ার সাধ মেটে না। নারীর আগুন তো পুরুষকেই নেভাতে হয়। সে কি পেরেছে? তখন বহু পেছনের এক স্মৃতি তার বুকে উত্তাপ দেয় এবং নিশিঘন এক রাত্রির যৌন আড্ডার কথা মনে পড়ে। কাজল ছিল সেই আড্ডার মুখ্য অবতার। আর ভেষজগন্ধী দাওয়াখানায় কাঠের তাকে রাখা সারি সারি বোতল পেছনে রেখে, মলমের কৌটা, জোলাপ আর হজমির প্রাচুর্যের মধ্যে আদিম কথকের মতো কথার প্রস্রবণ বইয়ে দিয়েছিল হাকিম জয়নুদ্দিন। তাজুল ভেসেছে কিন্তু মৌনব্রত ভাঙে নাই। জয়নুদ্দিনের চিবানো কথার অশিষ্ট প্ররোচনাও তখন মহাসত্য বলে মনে হয়েছে। কী বলেছিল জয়নুদ্দিন? বলেছিল কামরূপ কামাখ্যার এক ন্যাংটা কবিরাজ তাকে জানিয়েছে : নারী পরাজিত হতে ভালোবাসে কিন্তু বাহানা করে জয়ের। সেই বাহানা ভাঙতে ভাঙতে আর জয়ী হতে হতে নারী মহলে পূজিত কাজল? আর বন্ধু মহলে গর্বিত? কথা সত্য বটে কিন্তু রহস্য আরও এক জায়গায় ঘনীভূত ছিল। সেটি মৃগনাভি। কাজল পাঁচ হাজার টাকায় একটা মৃগনাভি কিনে নিয়েছে। জোগান দিয়েছে হাকিম জয়নুদ্দিন। সুদূর আসাম থেকে আনা সেই মৃগনাভি খেলে মর্দামি শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। হস্তিনী মেয়েরাও কাবু হয়, হাতে পায়ে ধরে। একে বলে পঞ্চ হাতির মর্দামি শক্তি।

তাজুল মিয়া গরীব কৃষক। হাই স্কুলের গণ্ডি টপকাতে পারে নি বলে একটা নিস্তেজ দুঃখ নিয়ে নিরন্ন সংসারে কোনোরকম টিকে আছে। বিরল কস্তুরি কিনে খেতে পারবে না জেনেও নিজের বুকের মধ্যে এই আড্ডার স্মৃতিসত্য জমিয়ে রাখে সে। একদিন আরও বড় হয়, বিয়ে করে এবং ভুলে যায় সেই ঘন রাত আর জমজমাট কথার প্রলোভন। শুধু হাটবারে হাকিম জয়নুদ্দিনের নাবাতি দাওয়াখানায় একটু বসে যাওয়ার রেওয়াজ ছিল তার। কথার ফাঁকে ফাঁকে বহুবার তার জানতে ইচ্ছে করেছে—নারী-পুরুষের গোপন সম্পর্কে এমন কোনো তুলাদণ্ড আছে কি-না যা জয় বা পরাজয়ের নিশ্চায়ক? এটি জানবার প্রয়োজন খুব বেশি নাই। তবে অপ্রয়োজনের দায় মনে খুব চাপ দিলে মানুষ বুঝি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে? আজ মনে হচ্ছে জয়নুদ্দিনের ভেষজ হালুয়া খেলে লবঙ্গের ঝাঁঝ দেওয়া আর দারুচিনির গন্ধ মাখানো যে-ঝাঁঝাল অনুভূতি গলা চিড়ে বুকে নামে তাতেই রোগমুক্তির সম্ভাবনা তার। আর যদি বলে-কয়ে মৃগনাভির কয়েকটি দানা কমদামে হস্তগত হয়, তবে বয়সের এই নিস্তেজ ভাবটি কেটে যাবে। কামরূপ কামাখ্যার ন্যাংটা পাগল যে-তত্ত্ব শুনিয়েছে তাও সত্য হবে নিজের বউয়ের ওপর। সে হবে যৌনবীর। এই দুর্মূল্য আকাঙ্ক্ষার দাস তাজুল মিয়া তখন ভুলে যায় তার দশ বছরের মেয়েটির কথা। মনের অন্তরালে হারায় পাঁচ বছরের ছেলেটিও। কিন্তু হাঁপানি রোগে-ভোগা তার রাজহংসী বউটির চিকন গলার নিচে যে-তিল কালো চাঁদ হয়ে মাধুর্য বিলায় তাকে মনে পড়ে। মনে পড়ে বাড়ির উঠোনের একটি করমচা গাছ। এই গাছের পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যস্নাত আষাঢ় মাসের একটি দীর্ঘতম দিন অভিমানে পার করে দিয়েছিল তার বউ। কী নিয়ে অভিমান ছিল এখন আর মনে পড়ে না। সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টি নামলে তাকে ডেকে বলেছিল : আপনে কি মাইয়া মানুষ? ঘর ছাড়েন না ক্যান? তাজুল বারান্দায় এসে দেখে তার বউয়ের শরীরে অনন্য বর্ষার ঢল। তাকে বলে : বাইর হন। বৃষ্টিতে ভিজমু। আমৃত্যু সাধনা করেও ওরকম একটি বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার সুখ আর কোনোদিন পায় নাই তাজুল মিয়া। কিন্তু সেই সুখ সয় নি। আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে। রাতে শ্বাসকষ্ট বেড়ে গিয়েছিল বউটির। বউ তাকে ভালোবাসে। সে-ও আপ্রাণ দিয়েছে হৃদয়। তবু বউয়ের হাঁপানিটাই দুঃখ হয়ে আছে। জয়নুদ্দিনের চ্যবনপ্রাশ কতবার খাইয়েছে। বাদুরের মাংস নিজে গোপনে রান্না করে খেতে দিয়েছে। বউ বুঝতে পেরে বমি করে ভাসিয়েছে সব। ফল হয় নি। নিমগ্ন অভিমানে বউ আজও খোঁটা দেয় : আপনে আমারে হারাম খাওয়াইছেন।


তেলের কামগন্ধী নিপীড়নে তাজুল কেবলি রাতের অপেক্ষা করে। বহুদিন আগে জয়নুদ্দিনের দাওয়াখানা থেকে এই তেল এনে দিয়েছিল সে।


আজ নিস্তেজ বয়সটাকে চাঙ্গা করতেই জয়নুদ্দিনের কাছে আসা। কিন্তু সদর রাস্তার ডানদিকে তাকিয়েই তার চোখ ছানাবড়া। আঙুলে রং লাগিয়ে নাবাতি দাওয়াখানার যে-সাইনবোর্ডটি লেখা হয়েছিল সেটি উধাও। নাম ফলকের মতো বাস্তবে জয়নুদ্দিন নিজেও উধাও হয়েছে বলে গুঞ্জন শোনা গেল। তার দাওয়াখানার ছোট্ট ঘরটিসহ আরও দশ বারটি দোকান এবং তাদের মালিকদের কাউকেই দেখা গেল না। যেন ওই নিরীহ দোকানগুলো আর তাদের মালিকেরা একই ভাগ্যের নির্মম শিকার। পরে জানা গেল এই উচ্ছেদ আসলে অন্তর্বর্তী সরকারের শুদ্ধি অভিযান। খাস আর অবৈধ জমি উদ্ধারের যে-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তার সূর্য সাক্ষী হয়ে দোকান মালিকগণ কিছুদিনের মধ্যেই দৃষ্টিগোচর হলেন। শুধু নাবাতি দাওয়াখানার মালিক হাকিম জয়নুদ্দিন আর ফিরে এলেন না। নিয়মিত যাত্রীরা বাসের জানালা দিয়ে কচ্ছপের মতো গলা বাড়িয়ে হয়তো হদিস করেন ভেষজের ঘ্রাণ। বয়ামবন্দি হরিতকী জষ্টিমধু আখরোট আর পোস্তদানায় আরোগ্য লাভের নশ্বর স্মৃতিটাও হয়তো জাগে না মনে। মলমের কৌটা আর হজমির অস্তিত্ব বিহীন ধূধূ শূন্যতার দিকে তাকিয়ে কখনো-বা ভুলে যান ফলের টনিকভরা সারি সারি বোতলের কথা। আর তাম্বুল রাঙা ঠোঁট নিয়ে কোনো মানুষ হেঁটে গেলে স্মৃতি রোমন্থনে সহসা চমকে ওঠেন: এই তো জয়নুদ্দিন! যার অসীম ক্ষমতা ছিল কথা বলবার। কামসূত্র, যৌনতা, রোগলক্ষণ আর নিরাময়ের প্ররোচনায় ভরা ওইসব কথার সঞ্চয় বুকে নিয়ে তাজুল মিয়া কেবল বিষণ্ন হলো আর খুঁজে ফিরল মৃগনাভি। কিছুদিন পর সহসা কাজল এল। তার আবির্ভাবে আশায় বুক বেঁধে চাঙ্গা হলো তাজুলের মন। সে ভাবল : উঠোনের করমচা গাছে রাজসিক ক্ষমতার একটি অনন্য চড়ুই এসে বসেছে। মৃগনাভির কয়েকটি দানা তার কাছে চাওয়া যায় এবং তা পাওয়াও গেল। কাজল জানাল : এবার ওমরা করতে গিয়ে অর্ধ লক্ষ টাকা দিয়ে একটা বড় মৃগনাভি সে কিনে এনেছে। কামরূপ কামাখ্যার তত্ত্ব মতে এটিই আসল। সঙ্গমের আগে কয়েকটি দানা পানের সঙ্গে চিবিয়ে খেয়ে নিলেই হলো। ফিরে আসবার আগে তাজুল মিয়ার পিঠে চাপড় দিয়ে সে বলেছে : খায়া দ্যাখো মিয়া। আরব শেখেরা খায়। জৈষ্ঠ্যের লম্বা একটা দিন এইভাবে কাজলের সঙ্গে কাটাল সে। ভাবল—নারী বেষ্টিত এক দৃঢ় সংকল্পকে মুখ্য ধরে কাজল জীবনকে ভোগ করছে মজাদার খাবারের মতো। সে-জীবন উপাদেয় কিন্তু অগভীর। প্রসন্ন হলেও সে-জীবন কোথায় যেন নির্মম এক দায় নিয়ে থাকে। তাজুল মিয়ার দায় নাই। মৃগনাভির বেশ কিছু দানা অপূর্ব পুলক তাকে এনে দিয়েছে। শুধু একবার বউ যদি বলত তারও পুলক হয় রাতে। আগুনে আগুন নেভে তার, তবে সে জয়ী হয়। তখন দুপুরের ঝাঁঝাল রোদ বিকেল গড়িয়ে দানা বাঁধে করমচা গাছের অলস ছায়ায়। সেই ছায়া নির্জীব ঝালরের মতো উঠোনের সামান্য জায়গা জুড়ে ছোপ ছোপ হয়ে আছে। সেখানেই পাটি পেতে হাঁপানির প্রারম্ভিক বেদনায় হাঁস-ফাঁস করছিল তাজুলের বউ। তাজুল এসেই কাগজে মোড়ানো খুরমা তার হাতে দিয়ে বলে : এই নে, খুরমা। তোর জইন্যে। বউয়ের বুক-ভাঙা নিঃশ্বাসের অবস্থা দেখে মন খারাপ হলো তার। ঘরের নৈঃশব্দ্যে কাউকেই না দেখে জিজ্ঞেস করল : ওরা কই? বউ শুধু বলল : ওগো মামায় আইসা লয়া গেছে। বউ আজ মাথায় শান্তি কুসুম তেল মেখেছে। সেই তেলের কামগন্ধী নিপীড়নে তাজুল কেবলি রাতের অপেক্ষা করে। বহুদিন আগে জয়নুদ্দিনের দাওয়াখানা থেকে এই তেল এনে দিয়েছিল সে। লেবেল আঁটা কাগজে লেখা ছিল : সকল ঋতুতেই সমান ফলপ্রদ শান্তিদায়ক অদ্বিতীয় তৈল। নিঃশেষিত বোতল নিংড়িয়ে সেই তেলের কয়েক ফোঁটা চুলে মেখে প্রাঞ্জল পরিচর্যার কথা ভেবেছিল রাজহংসী বউ। প্রশান্তি আর অনটনের দ্বৈত ফলাফলে সেই গন্ধ আজ দুরারোগ্য অসুখে মিলায়। তবু তাজুল শান্তি কুসুম তেলের শিশিতে লেবেল আঁটা কাগজের চমকপ্রদ ভাষার মতোই নিজেকেও আজ অদ্বিতীয় ভাবে। মোরগের অণ্ডকোষে নিহিত শক্তির মতো গোপন সামর্থ্যের এক অমূল্য চড়ুই নিজের ভিতরে সে চঞ্চল হতে দেখেছে। শুধু রাত যখন গভীর হলো, জৈষ্ঠ্যের সামান্য বৃষ্টিতে ভিজে গেল করমচা গাছের নিরীহ পাতাও, তারও আগে পানের সঙ্গে মিশিয়ে মৃগনাভির বেশ কয়েকটা দানা সে চিবিয়ে খেয়েছে—এই সত্য জানল না বউ। তার বুকে কফ। নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিলে শোঁ শোঁ শব্দ করছে অবিরাম।। রাজহংসীর চিকন গলার পরিবর্তে তখন উঠা-নামা করছিল পেট। তবু বউয়ের গলায় চন্দ্রমদির কালো তিল দেখে দেখে সে ভাবল, আজ সে পুরুষ হবে। নবলব্ধ যৌবনের ভার নিয়ে সে যখন বউয়ের ওপর উপগত হলো তখন বাইরে বৃষ্টিভেজা ডোবার কোনায় দুইটি ঘাউয়া ব্যাঙ শুধু ডাকল :  ঘ্যাং ঘ্যাং ঘ্যাং। নিজের আপ্লুত আনন্দের মধ্যে আজ সে আবিষ্কার করল পৌরুষ অপরাজিত। স্বভাবদোষে যদিও সে জিজ্ঞেস করেছিল : বউ, তোর কি মজা হয় নাই?

এই প্রশ্নের সামনে আজ আর আমরা দাঁড়াব না। আরও সপ্তাহ দুই পর আমরা যাব নয়ার হাটের কামার শালায়। সেখানে হাপরের ওঠা-নামা দেখে হাঁপানির কষ্টে ভোগা রাজহংসী বউয়ের যন্ত্রণার কথা মনে পড়ে যায় তাজুল মিয়ার। আর উড়তে থাকা একটা হলুদ পাতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে দেখতে পায় আড্ডারত কাজলকে। আড্ডায় তুড়ি মেরে দুনিয়া মাত করে দিচ্ছিল সে। যা বলছিল তার অর্থ হলো : মৃগনাভির যুগ আর নাই। এখন ইয়াবার যুগ। ভায়াগ্রা হলেও চলে। কাজল আরও যা বলল তাতে ঘৃণা ও ক্ষোভে তার মন তেড়ে উঠলেও নিশ্চেতন দাঁড়িয়ে গোপনে শ্রবণ করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না তার। কাজল বলল : মোহিনী জর্দার মধ্যে আতর মাইখা তাজুল মিয়ারে দিছিলাম। মিছামিছি কয়া দিছি মৃগনাভি। ও কিন্তু বুঝে নাই। তারপর চরম অট্টহাসির মধ্যে তাজুল মিয়াকে চুনুপুঁটি বানিয়ে পানের পিকের সঙ্গে ছুঁড়ে দিল সে। নাস্তানাবুদ তাজুল মিয়া সার্কাসের ভাঁড়ের মতো ভঙ্গুর ব্যক্তিত্ব নিয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকে নি। দুর্মর কষ্টের একটা গলাকাটা কবুতর নিজের ভিতরে তড়পাতে দেখল সে। তাই হাকিম জয়নুদ্দিনের দাওয়াখানা যেখানটায় আঙুলে রং লাগানো হাতের লেখায় সাইনবোর্ডসহ বহু বছর প্রতাপ নিয়ে টিকে ছিল, আজ কালের পৃষ্ঠায় বিলুপ্ত ছবির মতো স্মৃতি নিয়ে জাগরূক, সেখানটায় ইউনানী বোতলের তরল ওষুধের মতো নিজেকে বড় বেশি জলো মনে হলো। ঘর্মাক্ত দুই ঠোঁটের লবণ হজমির মতো চেটে নিল সে। আর ভেষজ মলমের মতো চোখের পাতায় প্রলেপ দিতে দিতে সে যখন ফিরল, তখন তুমুল বৃষ্টি। ঘরের ভিতরে যবুথবু দুইটি সন্তান। বউ নাই। সেইদিন অস্বস্তি ভয় আর আতঙ্কের ফল বয়ে এনেছিল তার যে পিশাচ পৌরুষ তার অন্তিম দায় নিয়ে সে চলে গেছে। আর সেই-যে গোয়ার্তুমি ভরা প্রশ্নটি : বউ তোর কি মজা হয় নাই? তার জবাব কোনোদিন দেয় নাই সে। আমরাও সেদিন সেই দুর্মর প্রশ্নের সামনে দাঁড়াই নি। আজ সুস্পষ্ট আকুতির এই দিনে অমূল্য সাধনায় পাওয়া তাজুল মিয়ার একটি সুখ শুধু স্মরণে রাখি। জয়নুদ্দিনের দাওয়াখানায় কাচের বয়ামে রাখা জাফরান আমলকি জায়ফল হরিতকী খরমুজের বীজ আর রক্ত চন্দনের মতো নিরাময়ের নিগূঢ় মায়া নিয়ে সেই সুখ এনেছিল তাজুলের বউ। বলেছিল : বাইর হন। বৃষ্টিতে ভিজমু। আজও বৃষ্টি। করমচা গাছের পাশে বজ্রপাত ও বিদ্যুতের সহসা চমক। তবু উঠোনের প্রমত্ত জলে যে-আগুন নিভল না তাজুলের, তাকে হাহাকার বলা যায়। যেন সাইনবোর্ড। তুলির অভাব ছিল। তাই হৃদয়ের পাতে রক্তনখরে কেউ লিখে দিয়েছে: আহা, আমার রাজহংসী বউ।

Kazi Nasir

কাজী নাসির মামুন

জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩; মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : অধ্যাপনা।

প্রকাশিত বই :
লখিন্দরের গান [কবিতা, লোক প্রকাশন, ২০০৬]
অশ্রুপার্বণ [কবিতা, আবিষ্কার প্রকাশনী, ২০১১]

ই-মেইল : kazinasirmamun@gmail.com
Kazi Nasir