হোম গদ্য গল্প এক্সভিডিওজ.কম

এক্সভিডিওজ.কম

এক্সভিডিওজ.কম
863
0

দিন-চারেক পর আজ এক্সভিডিওজ.কম সাইটটি ওপেন করেছে শফিক। স্বামী-স্ত্রীর মানানসই যৌনজীবন। তবুও পর্নোসাইটে ক্লিক না করলে দিন যায় না তার। এটা একসময় যৌন-উদ্দীপনা বাড়ালেও এখন ওর অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে।

শফিকের বেড়ে উঠার কালে ইন্টারনেট আসে নি মফস্বল শহরগুলোতে। তবে ঘটনাচক্রে প্রথম এক্স মুভি দেখা কৈশোরেই। ও তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। বন্ধুর বাড়ি থেকে ভিসিআর সেট এনেছিল বাড়ির ফিলিপস সাদা-কালো ১৪ ইঞ্চি টিভির সঙ্গে ফিট করে সিনেমা দেখবে বলে। বন্ধু ফয়সালের বাপ-চাচারা সৌদিতে থাকে। ওদের বাড়ি ঘরে ঘরে ভিসিআর। অনেক দিন ফয়সালের পেছনে লেগে থেকে নিজের প্রিয় লাটিমটা দিয়ে তবে দুদিনের জন্য সেটটা বাড়িতে আনার সুযোগ হয়। হিন্দি-বাংলা মিলে ৫টা সিনেমার ক্যাসেট। এর মধ্যে ‘শোলে’ লেখা ক্যাসেটটা প্লে হলো না কিছুতেই—ফিতা ও ভিসিআরের হেড স্যাভলন দিয়ে অনেক পরিষ্কার করার পরও। সন্ধ্যায় শফিক ‘রাজ্জাক’ লেখা ক্যাসেটটা প্লে করেই দিনের আলোয় ভুত দেখার মতো চমকে ওঠে। শুরু হয় মাঝবয়সী এক নারীর টাইট সালোয়ার-কামিজে স্টেজ ড্যান্স দিয়ে। ইউটিউবের যুগে এসে জেনেছে ওটা ছিল পাকিস্তানি মুজরা ড্যান্স। সাইমা খানের উথলে ওঠা শরীরের কথা আজও ভুলতে পারে নি। গানের কিছুক্ষণ পরেই কাটপিস হিসেবে ঢুকে পড়েছে বিদেশি ফার্মে এক শ্বেতাঙ্গ নারীর ঘোড়ার উত্থিত-প্রায় লিঙ্গ সাক করার দৃশ্য। এরপর গানের মাঝে মধ্যে চলে এসেছে—নগ্ন নারী হামাগুড়ি দিয়ে বসে, কুকুরটি পেছন দিক থেকে তার শরীরের উপর উঠে আসার চেষ্টা করছে; পরের দৃশ্যে ফার্মের বড় মুরগি ধরেছে এক লোক। সেই প্রথম নিগ্রো দেখা। এরপর মাথা চক্কর দিয়ে উঠলে রিমোটের স্টপ বাটন খুঁজে না পেয়ে সরাসরি পাওয়ার অফ করে দিয়েছে।


মেয়েগুলো প্রফেশনাল নয়। যে কারণে শফিক এই আড়িপাতা গোপনদৃশ্যের প্রতি অন্যরকম ফ্যান্টাসি অনুভব করে।


ফয়সাল অনেক গল্প ওদের সামনে করে। কিন্তু এই ধরনের জিনিস ভিসিআরে দেখা যায়, সৌদি থেকে ওর বাপ-চাচারা নিয়ে এসেছে, এসবের কিছুই বলে নি। এরপর থেকে দেখা দৃশ্যগুলো ভুলে যেতে চেয়েছে শফিক। যতই ভুলতে চেয়েছে ততই যেন পিষ্ট হয়েছে। একটা টানা দুঃস্বপ্নের মতো কেটেছে দিনগুলি। দ্বিতীয়বার যখন এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়, ততদিনে সে শরীর-মনে কিছুটা পোক্ত। ক্লাস এইটে পড়ে শহরের স্কুলে। মেসের বড়ভাইরা রাতের শেষ শোতে এক টিকিটের দুটি সিনেমা দেখতে যাবে। শফিক একা একা ভয় পেতে পারে ভেবে ওকেও সঙ্গী করে তারা। দুটি সিনেমা হল ছিল শহরে, কোনো না কোনো হলে এক টিকিটে দুটি সিনেমা দেখানো হতো। একটা কোরিয়া বা চাইনিজ অ্যাকশন-কমেডি; দ্বিতীয়টা নীলছবি। টুএক্স। এই গ্রেডিংটা অবশ্য শফিক আরও পরে বুঝেছে।

উচ্চ মাধ্যমিকে উঠে শহর বদলের সাথে সাথে হাতে উঠেছে নীলছবি ছাপা রঙিন বই, নিউজপ্রিন্টে চটি। একবার কিনে সেটা আবার কমিশনে বদলে নতুন আরেকটা নেওয়া যেত। শফিক নিয়মিত যেত স্টেশনে, ট্রেনের আসা-যাওয়া নিয়ে ওর কোনো মাথাব্যথা ছিল না। একটি বা দুটি বই কিনে বা কমিশনে বদলে ব্যাগের ভেতর নিয়ে সটকে পড়ত।  এই করতে করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝামাঝি এসে পেয়ে যায় কম্পিউটার, শেষদিকে তার সঙ্গে যুক্ত হয় ইন্টারনেট। তখন আর শফিক টুএক্স-এর ভোক্তা থাকে না। ব্যাঙব্রস, ব্রাজার্স, অ্যাজপ্যারেড, নটি আমেরিকা, ডিজিটাল প্লেগ্রাউন্ড, রিয়েলিটি কিংস—এসব ওর প্রিয় পর্নোসাইট। জিয়ানা মাইকেল ও কার্মেলা বিং ওর প্রথম জীবনের প্রিয় পর্নতারকা। এরপর অড্রে বিটোনি, এভা এডামস, আবে ব্রুকস, প্রিয়া রায় হয়ে হালের মিয়া খলিফা ও কার্লি গ্রে পর্যন্ত। কিন্তু বছর দশেকেই শফিক শ্বেতচামড়ায় আগ্রহ হারিয়ে বসে। রাবারের মতো ইম্প্লান্টেড বুক-পাছা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বছর দুয়েক থেকে সে পড়ে আছে এক্সভিডিওজ.কম সাইটে। বাংলাদেশি এবং ভারতীয় এমএমএস ভিডিও ক্লিপগুলো দেখে। বিশেষ করে অডিও-যুক্ত ভিডিওগুলো। বেশিরভাগই গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত। মানে মেয়েগুলো প্রফেশনাল নয়। যে কারণে শফিক এই আড়িপাতা গোপনদৃশ্যের প্রতি অন্যরকম ফ্যান্টাসি অনুভব করে। এখন সে বাস্তব রক্তমাংসের নারী দেহের চেয়ে ভার্চুয়াল নারীদেহের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। স্ত্রীর সঙ্গে যৌনমিলনে সুখ পায়, কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু এটাও সত্য সপ্তায় দুয়েকদিন পর্নভিডিও ছেড়ে মাস্টারবেট না করলে তৃপ্তিবোধ করে না সে।

ভার্চুয়াল পর্নোগ্রাফির দুনিয়ায় থাকতে থাকতে ওর ভেতর গুরুতর এক সমস্যাও দেখা দিয়েছে। আশেপাশের চেনা-অচেনা নারী-পুরুষ সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এই যেমন মাঝে মাঝে সে এক্সভিডিওজডটকমে সার্চ অপশনে নিজের স্ত্রীর নাম লিখে ইন্টার বাটকে ক্লিক করে। শারমিন আজকাল অফিস থেকে রাত করে বাড়ি ফিরছে। ওর সহকর্মীরা ওকে নামিয়ে দিয়ে যায়। দু তিনজন কলিগ ঘুরেফিরে আসে। দুজনের বাড়ি এ পথেই। কিন্তু রফিকউল্লাহ সাহেবের বাড়ি মিরপুর দশে। তারপরও জিগাতলায় ড্রপ করে যান। তবে বাসায় ওঠেন না। ইলিয়াস আর আরমান সাহেব মাঝে মধ্যে কফি খেয়ে যান। শফিক ওদের চেনে, বাসায় থাকলে আড্ডাও জমে। তবুও সন্দেহটা তার হয়। মাঝে মাঝে শারমিন নামের ইংরেজি বানানটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনুসন্ধান করে; Sharmin, Sarmin, Sharmeen, Sarmen—এইভাবে বানান বদলে। প্রায় ছ’মাস ধরে দেখছে সে। তিনদিন আগে Sharmeen নামে একটা ভিডিও পেয়েছে। শফিকের স্ত্রীর নামের বানান হুবহু এটাই। জানা তবুও শারমিনের পাসপোর্ট থেকে আরেকবার মিলিয়ে নিয়েছে শফিক। আমাদের দেশে সাধারণত শারমিন নামের ইংরেজি বানানটা লেখা হয় Sharmin। কিন্তু শফিকের স্ত্রীর নামের ইংরেজি বানান আলাদা। সচরাচর এইভাবে কেউ লেখে না। তার মানে যে ভিডিওটা আপ করেছে সে শারমিনের নামের বানানটা জানে। হতে পারে অফিসের কেউ। ওই তিনজনের একজন। কিংবা চতুর্থ কেউ আছে, যার ড্রপ করে যাওয়ার খবর সে জানে না। শফিক ভাবে। সে আগে নিশ্চিত হতে চায় ভিডিও-দৃশ্যের নারীটি আসলেই শারমিন কিনা। ৪৭ সেকেন্ডের ক্লিপ। আধো-অন্ধকার কক্ষে ধারণ করা। শফিক এ কয়দিনে ক্লিপটা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা শুরু করেছে। বিছানার চাদর-রুম ডেকোরেশন দেখে মনে হচ্ছে গড়পড়তা মধ্যবিত্ত বাংলাদেশিদের ঘর যেরকম হয় সেরকমই। কানে হেডফোন দিয়ে অডিও শোনার চেষ্টা করেছে কয়েকবার। দুয়েকটি অস্পষ্ট শব্দ কানে আসে। লোকটির কণ্ঠ। হিন্দি না বাংলা বোঝা মুশকিল। সঙ্গম-মুহূর্তে নারীটি খুব বেশি রেসপন্স করে না। কিছুদিন থেকে শারমিনও এমন নিরুত্তাপ সেক্স করছে। সন্দেহ করার মতো এমন আরও খুচরা কারণ বের করে আনে শফিক। খুব কৌশলে লোকটি নিজেকে আড়াল করেছে। নারীটিকে টের পেতে দেওয়া হয় নি ক্যামেরার বিষয়টি। লোকটিও কৌশলে নিজেকে আড়াল করেছে। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে পুরুষরা দুটি কারণে ভিডিও করে রাখে—এক. তাকে ভিডিও ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ফের বিছানায় আনা। দুই. ভিডিও ক্লিপের কথা বলে ব্লাকমেইল করা, অর্থাৎ অর্থ আদায় করা। শারমিনের ক্ষেত্রে সে-সবের কোনো লক্ষণ আছে কিনা তাও পরীক্ষা করছে শফিক। যেমন তিন দিন আগে ও ব্যাংক থেকে কিছু টাকা উঠিয়েছে। শফিককে সাধারণত বলে। কিন্তু এবার আড়াল করেছে। শফিক গোয়েন্দার মতো পেছনে লেগে না থাকলে জানতে পারত না। শারমিন নিজে একটা বড় কোম্পানিতে চাকরি করে। ভালো মাইনে। ওর ব্যাংক ব্যাল্যান্সের খোঁজখবর শফিক জানেও না। জানার প্রয়োজন মনে করে নি এতদিন। কারণ টাকা জমিয়ে জমিয়ে এবং লোন নিয়ে শারমিন নিজেই জিগাতলার এই ফ্লাটটা কিনেছে। কিন্তু এবার টাকাটা উঠানো দেখে শফিকের সন্দেহ আরও পাকতে শুরু করেছে। শারমিনকে খাওয়ার টেবিলে পরোক্ষভাবে সেটা বুঝিয়েও দিল সে।

কোনো সমস্যা? কদিন থেকে তোমাকে বেশ অস্থির দেখাচ্ছে? শফিক জানতে চায়।

তলপেটের ব্যথাটা বেড়েছে। টিউমারটা এবার ফেলতে হবে। শারমিন জবাব দেয়।

আচ্ছা। শফিক চুপ করে যায়।

নাকি অন্যকিছু? ফের জিজ্ঞাসা করে।

আর কী হবে? অফিসে নতুন এমডি এসেছেন। একটু চাপ তো বেড়েছেই। শারমিন উত্তর দেয়।

ওহ। ভাবছিলাম আর কিছু হলো কিনা?

মেয়েটা এক বছর হলো কানাডা থেকে আমেরিকায় গেল। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে যেভাবে উল্টোপাল্টা কথা বলছেন বলে শুনছি। টেনশন তো একটু হয়ই। শারমিন জবাব দেয়।

না; ধরো অন্যরকম কিছু? আজকাল মানুষকে তো ভরসা কম। শফিক প্রশ্নটা ঠিক জায়গা মতো করার চেষ্টা করে।


অস্বীকার করতে পারবে এক্সভিডিওজডটকমে তোমার সেক্স ভিডিও নেই?


আমি আর কত মানুষের সঙ্গে মিশি! অফিস আর বাড়ি। বাড়ি আর অফিস। তবে এটা তো ঠিক, মানুষ আর আগের মতো নেই। শারমিন খুব স্বাভাবিকস্বরে কথাটা বলে।

এই তো লাইনে আসছে। মনে মনে ভাবে শফিক। আরেকটু ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে সে।

যেভাবে মানুষ মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করছে আজকাল। টাকার জন্য কি-না করছে? শফিক বলে।

শারমিন আর কোনো কথা না বলে উঠে পড়ে টেবিল থেকে। এভাবে উঠে যাওয়াটা ভালো ঠেকে না শফিকের কাছে। শোওয়ার সময় স্ট্রেইট জিজ্ঞাসা করে বসে—তোমার কাছে কেউ কোনো টাকাপয়সা চাই নি তো?

আমার কাছে কেন চাইবে? শারমিন নিরুত্তাপ কণ্ঠে উত্তর দেয়। সাধারণত অপরাধ যারা করে তারা এমন শান্ত থাকার ভান করে বলে শফিকের ধারণা। সে আর কথা বাড়ায় না। একদিনে সব বের করতে গেলে বিষয়টা গুলিয়ে যেতে পারে। কিন্তু মাসখানেক চলে যায় আর কিছু বের করতে পারে না সে। শফিক অপেক্ষা করছিল আরো কিছু ভিডিও ক্লিপ আপ হয় কিনা দেখার জন্য। সাধারণত এসব ঘটনায় কিছুদিন পরপর অংশ অংশ করে ক্লিপ আপ করা হয়। হতে পারে শারমিন ম্যানেজ করে থামিয়ে দিয়েছে। কারণ যে ভিডিও আপ করেছে ৪৭ সেকেন্ড আপ করে সে থেমে থাকবে কেন? নিশ্চয় এর ভেতর কোনো ঘটনা আছে। শফিক ভাবে।

২.
শফিকের আচরণের অস্বাভাবিকতা টের পেয়ে যায় শারমিন। ও বুঝতে পারে শফিক ওকে সন্দেহ করছে। অথবা শফিকই ওকে বুঝিয়ে ছাড়ে। যেমন দুদিন আগে সঙ্গম-মুহূর্তে শারমিনের ডান স্তনে মুখ দিয়ে বলল, মনে হচ্ছে তুমি আর আজকাল আমার স্পর্শে আনন্দ পাও না। নির্জীব থাকো।

বয়স তো হচ্ছে—শারমিন বলে।

এমন বয়স তোমার হয় নি। শফিক যোগ করে।

শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। ইউট্রাসটা ফেলতে হবে।

অন্য কারণও হতে পারে।

যেমন?

এক শরীরে বেশিদিনে একঘেয়েমি চলে আসা।

শারমিন কোনো উত্তর করে না। ওর এই নিরুত্তর থাকাটা সহজভাবে নিতে পারে না শফিক। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে নিজের স্টকের শেষ অস্ত্রটা প্রয়োগ করে সে; বলে, অস্বীকার করতে পারবে এক্সভিডিওজডটকমে তোমার সেক্স ভিডিও নেই?

শারমিন চমকে ওঠে। একবার ভাবে ভুল শুনেছে। কিংবা শফিকই কী বলতে গিয়ে কী বলে ফেলেছে।

ওসব ছাইপাঁশ দেখতে দেখতে তোমার মাথাটাই গেছে? শারমিন বলে।

মাথা আমার খারাপ হয় নি। হয়েছে তোমার। মান-সম্মানের কোনো তোয়াক্কাই করো নি তুমি? ছি!

বাজে কথা বলো না। কী প্রমাণ আছে তোমার কাছে? শারমিন ব্রা’র হুক লাগাতে লাগাতে প্রশ্ন করে।

শফিক মাথার কাছে মোবাইলটার লক খুলে হিডেন ফোল্ডার থেকে ক্লিপটা প্লে করে দেখায় শারমিনকে।

মোটেও আমি না। শারমিন দৃঢ়কণ্ঠে বলে। কোথাকার কোন শারমিন, এ আমি হতে যাব কেন?

লেখা আছে ‘অর্গাজম অব শারমিন’। হুবহু তোমার নামের বানান। আমাকে বোকা ভেব না। প্রতিবাদ করে ওঠে শফিক।

ইউ আর সিক। উত্তেজিত হয় শারমিন।

শরীরটা দেখেছ, একঝলকেই বোঝা যাচ্ছে, সাইজে এতটুকু নড়চড় হবে না। শফিক বলে।

একদম বাজে কথা বলবে না। খুব কষ্ট করে কণ্ঠনামিয়ে উত্তর দেয় শারমিন।

দুজনই ঠান্ডা স্বভাবের মানুষ। বেশি উত্তেজিত হলে চুপ করে যাওয়া দুজনেরই অভ্যাস। শফিক উঠে আসে বিছানা থেকে।

৩.
ঝামেলা এড়াতে নয়াপল্টনে ছোটবোনের বাসায় উঠেছে শারমিন। সংসার টেকাতে ওর এই মুহূর্তে সংসার ছেড়ে বাইরে থাকার প্রয়োজন ছিল। দিন সাতেকের মাথায় ফোনটা এল শফিকের কাছে। মেয়ের ফোন আমেরিকা থেকে।

ছি বাবা! তুমি এমন কাজ করতে পারলে? আমার আর মায়ের কথা একদম ভাবলে না? ইউ আর নট মাই ফাদার ফ্রম টুডে। বলেই ফোনটা রেখে দিল জুলি। শফিককে বুঝে ওঠার এবং নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার কোনো সুযোগই দিল না। বিকালে ফোন করল ওর বড়ভাই—কী শুনছি? তোর কারণে তো আমাদের মানসম্মান আর থাকল না। ছেলেমেয়ের সামনে মুখ দেখাতে পারছি না। খানিকবাদেই ফোন এল শারমিনের অফিস থেকে। আরমান সাহেব। বললেন, আপনি মিয়া পারেনও। করেছেন করেছেন, তাই বলে আপ করে দিতে হবে? এবার শফিক বিষয়টি গুলিয়ে ফেলে। রাগ চেপে রাখতে পারে না। বলে, আমি কী করলাম; করেছেন তো আপনারা?

আমরা করেছি মানে? নিজের নাম এক্সভিডিওজডটকমে সার্চ করে দেখেন মিয়া? বলে ফোনটা রেখে দেয় আরমান।


জীবনে প্রথম এবং শেষবারের মতন স্ত্রী ছাড়া অন্যকোনো নারীর সাথে মিলিত হওয়া। তার মানে গোপন ক্যামেরা সেট করা ছিল।


কম্পিউটার চালু করাই ছিল। ব্রাউজার খুলে এক্সভিডিওজ.কমে নিজের নাম লিখে সার্চ দেয় শফিক। একটা ভিডিও পর্দায় ভেসে ওঠে ‘Shafiq Jigatola Dhaka’ নামে। শারমিনের ভিডিও ক্লিপের শিরোনামে এত নির্দিষ্ট করে কিছু ছিল না। কেবল লেখা ছিল ‘Orgasm of Sharmeen’। ভিডিওটা প্লে করে আরও চমকে ওঠে শফিক। পেছন থেকে হুবহু শফিকের মতো দেখতে। দু মিনিট দশ সেকেন্ডের ক্লিপ। কিন্তু একবারও সামনে থেকে দেখার উপায় নেই। সাউন্ড অফ। মাঝে মাঝে শো শো শব্দ আসে। আপ হয়েছে কিংস অব ঢাকা নামের একটি প্রোফাইল থেকে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো নিচে রেকমেন্ডেড ভিডিওতে একই ভিডিওক্লিপ আছে অন্য নামে— ‘South Indian Big Boobs’। এতক্ষণে নারী চরিত্রটির দিকে চোখ পড়ে শফিকের। সত্যিই স্তনজোড়া অস্বাভাবিক বড়। পর্নোতারকা জিয়ানার মতো। শফিক এ ধরনের স্তন পছন্দ করে। এই মুহূর্তে তার ভাবতে ইচ্ছা করে সামনের পুরুষটি সত্যিই সে। আর তখনই নিজের খোঁড়া খাদে তলিয়ে যেতে থাকে শফিক। কক্ষের পর্দা থেকে বিছানার চাদর সব কিছু চেনা চেনা মনে হতে থাকে। বছর দশেক আগে দিল্লির এক হোটেলে উঠেছিল অফিসের কাজে। তৃতীয় রাতে কক্ষে আসে স্বাস্থ্যবান নারীটি। দু ঘণ্টার জন্য আড়াই হাজার রুপি। ‘Escort Service in Hotel’ নামে একটি বই ছিল কক্ষে, সেখান থেকেই নির্বাচন করে শফিক। জীবনে প্রথম এবং শেষবারের মতন স্ত্রী ছাড়া অন্যকোনো নারীর সাথে মিলিত হওয়া। তার মানে গোপন ক্যামেরা সেট করা ছিল। ভাবে সে। বড়ভাই ও আরমান সাহেব এই ভিডিওটির কথায় বলতে চেয়েছেন। তবে কি তারা তাকে আগে থেকেই সন্দেহ করছিল, নাকি নিজেরা ব্রাউজ করতে গিয়ে রানডম চোখে পড়ে গেছে? নাকি এতদিন পরে ভাইরাল হলো? শফিক ভাবতে থাকে। এতক্ষণে মেয়ের কথাও মনে আসে তার। জুলিই-বা জানল কেমন করে? এবার মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে শফিকের।

৪.
বড়আপা, শফিকভাই এল বলে তোমার কাছে। শারমিনের ছোটবোনের স্বামী ইকবাল শারমিনকে বলে।

এত কনফিডেন্টলি কেমন করে বলছ? প্রশ্ন করে শারমিনের ছোটবোন নাফিসা।

শফিকভাইকে জব্দ করার মতো কাজ করা হয়ে গেছে। মুচকি হেসে জবাব দেয় ইকবাল।

কী সেটা? জানতে চায় নাফিসা। শারমিনও চোখেমুখে প্রশ্নবোধক চিহ্নসেঁটে তাকিয়ে থাকে ইকবালের দিকে।

খুঁজে খুঁজে একটা ভিডিও এডিট করে ফেইক আইডি খুলে শফিকভাইয়ের নামে আপ করে দিয়েছি। এতক্ষণে চোখে না পড়ার কথা না। নিউ আপলোডেড ভিডিও এমনিতেই হোমপেইজে আগে আসে। ইকবাল অতি উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে।

আগে আসে সেটা তুমি জানলে কেমন করে? তেড়ে ওঠে নাফিসা। শারমিন-শফিকের ঠিক বিপরীত চরিত্র ইকবাল-নাফিসা। একটুতেই ওরা কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি পর্যন্ত চলে যায়। কিন্তু আজ বেশিদূর এগোনোর আগেই ফোনটা বেজে উঠল। ইকবাল এগোয় ফোনের দিকে। একটা দুঃসংবাদ নিয়ে ফোন করেছে শারমিনের বিল্ডিংয়ের কেয়ারটেকার। মর্মান্তিক এক দুঃসংবাদ বটে।


ঈদসংখ্যা ২০১৮

মোজাফফর হোসেন

জন্ম ২১ নভেম্বর; ১৯৮৬।

শিক্ষা : ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।

পেশা : কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি।

দ্বিধা [গল্প; অন্বেষা ,২০১১]
আদিম বুদবুদ অথবা কাঁচামাটির বিগ্রহ [গল্প; রাত্রি, ২০১২] বিশ্বগল্পের বহুমাত্রিক পাঠ [অনুবাদ ও আলোচনা গ্রন্থ; অনুপ্রাণন, ২০১৩]
আলোচনা সমালোচনা [প্রবন্ধ; ২০১৪, অনুপ্রাণন প্রকাশনী]
অতীত একটা ভিনদেশ [গল্প; ২০১৬, বেহুলা বাংলা] বিশ্বসাহিত্যের নির্বাচিত প্রবন্ধ [সম্পাদিত গ্রন্থ; দেশ, ২০১৭]

ই-মেইল : mjafor@gmail.com