হোম গদ্য গল্প একটি শোক সংবাদ

একটি শোক সংবাদ

একটি শোক সংবাদ
648
0

একটি শোক সংবাদ। একটি শোক সংবাদ। তালবাড়িয়া গ্রামের উত্তর পাড়ার কেরামত আলী মণ্ডল আজ সকাল নয় ঘটিকায় ইন্তেকাল করিয়াছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মরহুমের নামাজে জানাজা আজ বাদ আসর মরহুমের নিজ বাসভবনে অনুষ্ঠিত হইবে। উক্ত জানাযায় আপনারা সকলে আমন্ত্রিত।

মরহুম কেরামত মণ্ডল নিজ বাসভবনের দক্ষিণ-দুয়ারী ঘরের শানের বারান্দায় উত্তর দিকে মাথা দিয়ে চিত হয়ে শুয়ে আছেন। তার শরীর রেললাইনের পাতের মতো টান টান এবং সমান্তরাল। মসজিদের মাইকে শোক সংবাদের ঘোষণা তিনি শুনতে পেয়েছেন। এমনকি চিনতে পেরেছেন ঘোষণাকারীর কণ্ঠও। না চেনার কোন কারণ নেই—জামে মসজিদ তার বাড়ির কাছেই। মাইকের আজান অথাবা হারানো বিজ্ঞপ্তি কিংবা শোক সংবাদের এলান স্পষ্টভাবে শোনা যায় তার ঘরের ভেতর থেকে। আর এখন তো তিনি বারান্দায় শোয়া।

ঘোষণা দিয়েছে মুয়াজ্জিন শরিফুল্লাহ। মরহুম কেরামত মণ্ডল ঘোষণাটা কানের ভেতর নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। ঘোষণাটা যখন দিল শরিফুল্লাহ, তখন তার গলা কি গোপন আনন্দে দুলে উঠেছিল! যাক, আপদ বিদায় হইছে—এমন কোন আনন্দ! মরহুম কেরামত মণ্ডলের মনে হলো, তার মৃত্যু সংবাদে শরিফুল্লাহর গলা আনন্দে নেচে ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। জীবিতকালে তিনি মুয়াজ্জিন শরিফুল্লাহর উপর একবার অবিচার করেছিলেন। কেরামত মণ্ডল তখন নতুন নামাজ ধরেছেন। সবখানে মাতব্বরি করা মণ্ডলের মসজিদেও মাতব্বরি ফলাতে ইচ্ছে করে। একবার ইশার নামাজে ওযু করতে গিয়ে দেখেন ওযুখানায় ভূতের অন্ধকার। লাইট নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। তিনি চড়া গলায় মুয়াজ্জিনকে ডাকলেন। মুয়াজ্জিন, এই মুয়াজ্জিন! ওযুখানা আন্দার ক্যা! ইডা মসজিদ না ভূতির বাড়ি!

মুয়াজ্জিন পড়িমড়ি ছুটে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে জানাল—লাইট কাটে গেছে। ফান্ডে এক টাকাও নি। শুক্কুরবারের কালেকশনের পর লাইট কিনে লাগা দেবনে।

কেরামত মণ্ডল সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে বিশটাকার নোট বের করে বললেন, যাও, একুনি যাও দুকানে। লাইট কিনে আনো। মুরব্বিরা নামাজ পড়তি আসে। আন্দারে কখুন কিডা উশটা খায়ে পড়ে তার ঠিক আছে!

মুয়াজ্জিন শরিফুল্লাহ পাঞ্জাবির পকেট থেকে সাদাকালো নকিয়া ফোন বের করে টাইম দেখে নিয়ে বলল, চাচা, নামাজের আর সাত মিনিট বাকি আছ। আমি দুকানে গেলি ইকামত দিবি কিডা! তাছাড়া আমারও তো নামাজ পড়া লাগবি। কেরামত মণ্ডল অন্ধকারে ওযু’র আসনে বসে পাঞ্জাবির হাতা গুটাতে গুটাতে বললেন, তালি নামাজ পড়ে যাও।


চড়টা মেরে একটু যেন অস্বস্তিতেই পড়ে যান মণ্ডল। মন থেকে চান নি, হঠাৎ যেন ট্রিগারে চাপ লেগে বেরিয়ে গেছে গুলি।


পরদিন ফজরের নামাজে এসে দেখা গেল আগের চিত্রই। ওযুখানা অন্ধকার। লাইট লাগায় নি। কেরামত মণ্ডলের চান্দি ধাই করে গরম হয়ে গেল। মুয়াজ্জিন শরিফুল্লাহর কি কপাল, এই চান্দি গরম সময়ে সে সরাসরি পড়ে গেল মণ্ডলের সামনে। পেশাবখানা থেকে বেরিয়ে সে মিসাক করতে করতে ওযুখানার দিকে আসছিল। কেরামত মণ্ডল তখন অগ্নিমূর্তি ধারণ করে ওযুখানায় দাঁড়ানো। তিনি কথা শুরু করলেন দক্ষিণ হস্ত দ্বারা। মুয়াজ্জিন শরিফুল্লাহর গালে প্রকাণ্ড এক চড় মারার মাধ্যমে। অপমানে শরিফুল্লাহ মূর্তির মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে যতই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসুক, তবু এখানে, এই তালবাড়িয়া জামে মসজিদে সে এক সম্মানজনক পেশায় কর্মরত। বয়সে তরুণ হলেও বিভিন্ন প্রয়োজনে অধিকাংশ মানুষ তাকে মুয়াজ্জিন সাহেব সম্বোধনে ডাকাডাকি করে। যেমন: মুয়াজ্জিন সাহেব, দক্ষিণ পাশের ফ্যানডা ছাড়েন তো! অথবা, মুয়াজ্জিন সাহেব, মায়িকি ডিসটাব নাকি, আজান আইজ আস্তে শুনা গেল! কিংবা, মুয়াজ্জিন সাহেব, আমার মিয়াডার তিনদিন ধরে পাতলা পায়খানা। তেল পড়ে দেন তো। মোটকথা, তাদের সকল কথার ভেতরে ‘সাহেব’ থাকবেই। সেই সাহেব মানুষটা যখন একজন নবমুসল্লীর হাতে চড় খায়, মনটা বড় বিমর্ষ হয়ে ওঠে। যদিও সে চড়টা খেয়েছে নির্জনে—আল্লাহ, সে আর মণ্ডল ছাড়া চতুর্থ কোন সাক্ষী নেই, চতুর্থ কোন লজ্জাও নেই, তবু তার মনে হয়, পেছন থেকে গ্যালারী ভর্তি হাজারখানেক দর্শক যেন উপভোগ করছে এই মান-অপমানের খেলা। চড়টা মেরে একটু যেন অস্বস্তিতেই পড়ে যান মণ্ডল। মন থেকে চান নি, হঠাৎ যেন ট্রিগারে চাপ লেগে বেরিয়ে গেছে গুলি। তবু তিনি তো মণ্ডল, শুধু বংশীয় পদবীতে নয়, কাজে-কর্মে-আচরণে-বিশ্বাসে তিনি আপাদমস্তক মণ্ডল। আর তাই সামান্য এক চড়ের জন্য তাকে অনুতপ্ত হলে চলে না। তিনি কড়া গলায় বলেন, লাইট লাগাওনি ক্যা! কচকচা টাকা দিলাম, খায়ে ফেলেচ নাকি! হুজুর মানষির বিশ্বাস নি।

মুয়াজ্জিন শরিফুল্লাহ কতক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, কাল দুকানে গিছলাম নামাজ পড়ে। কিন্তু শা’র দুকান বোন্দ হয়ে গিছলো। সকালে দুকান খুললি কিনে আনবোনে।

শরিফুল্লাহর কথার প্রেক্ষিতে কেরামত মণ্ডল শুধু ‘ও’ শব্দটাই উচ্চারণ করতে পারে। শরিফুল্লাহ আর দাঁড়ায় না। সে বাবার উপর ক্ষুব্ধ অথবা অভিমান করা বালকের মতো হনহন করে হেঁটে চলে আসে কলতলায়।

এতদিন পর, কেরামত মণ্ডল যখন মরহুম, বারান্দায় শুয়ে আছেন মৃত সাপের মতো সোজা হয়ে, তার ডান হাতের তালুর ভেতর লাঙল চষার মতো একটা অদৃশ্য পোকা যেন চষে ফিরছে ক্রমাগত। এই হাত দিয়েই তো তিনি চড়টা মেরেছিলেন।

হেফজখানার তিনটে ছেলে কেরামত মণ্ডলের মাথার কাছে রেহেলে কোরআন রেখে তেলাওয়াত করছে সুর করে। তার রুহের উপর যাতে শান্তি বর্ষিত হয় সেজন্য এই ব্যবস্থা। কেরামত মণ্ডলের ছোট ভাই শরাফত মণ্ডল মাদ্রাসার হুজুরকে বলে এদের নিয়ে এসেছে। ছোটভাইটা এত ভালোবাসে তাকে, জীবিতকালে বুঝতে পারেন নি তিনি। অথচ এই ছোট ভাইটা যখন চিরশত্রু খাঁ বংশের মেয়েকে গোপনে বিয়ে করেছিল, কেরামত মণ্ডল মেনে নেন নি। ছয়মাস তাকে বাড়ি উঠতে দেন নি। কীভাবে তিনি মানবেন এই বিয়ে! কে না জানে তালবাড়িয়ার মণ্ডল বংশ আর খাঁ বংশের শত্রুতা আওআমীলীগ-বিএনপির শত্রুতার চাইতেও জটিলতর। আওআমীলীগ-বিএনপি তবু লোক দেখানোর জন্য মাঝে মাঝে এক টেবিলে চা খায়। ঈদে-পূজায় শুভেচ্ছা বিনিময় করে। খাঁ আর মণ্ডলের ভেতর সেই লোক দেখানো চলটুকুও নেই। বিয়ের পর লোকে বউ নিয়ে কত আমোদ-প্রমোদ করে। আর তার ছোট ভাইটা ছয় ছয়টা মাস বাড়ি ছাড়া হয়ে আত্মীয়-স্বজনের দরজায় দরজায় ঘুরেছে। অথচ সেই শরাফত মণ্ডল বড় ভাইয়ের রূহের একটু শান্তির জন্য কোরআন পড়ানোর ব্যবস্থা করেছে। কৃতজ্ঞতায় ছোট ভাইটার প্রতি কেরামত মণ্ডলের অন্তর নুয়ে আসে ফলবান ডালিম বৃক্ষের শাখার মতো।

কেরামত মণ্ডল কোরআন তেলাওয়াত শ্রবণের ফাঁকে স্ত্রী জুবাইদাকে খোঁজেন। তিনি যখন মারা যান, অশ্রুসজল চোখে জুবাইদা পাশেই বসা ছিল। অবোধ বালকের বিস্ময় আর বোকামি নিয়ে গোটা গোটা চোখে তাকিয়ে ছিল নিশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া স্বামীর দিকে। যখন জানটা বেরিয়ে গেল, খুব জোরে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠেছিল জুবাইদা। তারপর হঠাৎ করেই সব সুনসান। প্রচণ্ড জোরে বাজ পড়ার পর যেন স্বাভাবিক পৃথিবী।

জান বেরিয়েছিল শোয়ার ঘরে। জুবাইদা ছাড়াও সেখানে উপস্থিত ছিল কেরামত মণ্ডলের ছোটভাই, প্রতিবেশী এক মুরব্বি চাচা, জনা কয়েক মহিলা, আরো কে কে যেন। কেরামত মণ্ডলের অতো খেয়াল নেই। জান বেরোনোর সাথে সাথে মুরব্বি চাচা মৃতের চোখ বন্ধ করে দিয়েছিল। তার পরপরই কয়েকজন ধরাধরি করে বারান্দায় বের করে দিয়েছে লাশ। কেরামত মণ্ডল প্রভাবশালী মানুষ। মৃতুর পরেও সেই প্রভাব সমানভাবে বিরাজমান। অন্তত তেলাপিয়া মাছের ঝাঁকের মতো দলে দলে আসতে থাকা  লাশ দর্শনার্থীর মিছিল দেখে তেমনটাই মনে হয়। আর সেজন্যই তাড়াহুড়ো করে লাশ বের করে দেওয়া হয়েছে বারান্দায়। লোকেরা উন্মুক্ত জায়গায় শেষ বারের মতো কেরামত মণ্ডলকে দেখে নিক মনপ্রাণ উজাড় করে।


বুক থেকে আঁচল সরে কোথায় চলে গেছে, ভারি বুকের উপরিভাগ উদ্ভাসিত হয়েছে ব্লাউজ ঠেলে, যেভাবে চাঁদ ওঠে মেহগনির ডালের ফাঁকে। কোন খেয়াল নেই মেয়েটার।


লাশ বারান্দায় আসলেও বাইরে আসে নি জুবাইদা। তার কান্নার শব্দও শুনতে পাচ্ছেন না কেরামত মণ্ডল। স্বামীর মৃত্যুর পর একলা ঘরে কী করছে জুবাইদা, কেরামত মণ্ডলের বড় জানতে ইচ্ছে করে। কেরামত মণ্ডল জীবনে বহু মৃত্যু দেখেছেন। মাতব্বর হওয়ার কারণে ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক খাঁ বংশ বাদে সকল মরাবাড়ি তাকে উপস্থিত থাকতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলতে পারেন, পুরুষ মানুষের মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি শোকাহত হয় তার বউ। অথচ আজ তিনি মরলেন, তার বউটা জীবিত, কান্নাকাটি করার মতো সুস্থও, তবু সে কেন কাঁদে না! বজ্রপাতের মতো শুধু একবার চিৎকার দিয়ে ওঠা—এ তো কান্না নয়। তার মৃত্যুতে জুবাইদা কি তবে খুশি! সে কি আজও তাকে ক্ষমা করতে পারে নি! মরা মানুষের উপরেও কি লোকে রাগ পুষে রাখতে পারে! এটা সত্যি, কেরামত মণ্ডল অসংখ্য মানুষের উপর অবিচার করেছেন। যেমন আবিচার করেছেন মুয়াজ্জিন শরিফুল্লাহর উপর। এই আবিচারের ছোবল থেকে রেহায় পায় নি স্ত্রী জুবাইদাও। বরং অবিচারের ধকলটা জুবাইদার উপরেই বেশি গেছে। এই মুহূর্তে ছয়ফালের ডবকা বউটার কথা তার মনে পড়ে। মনে পড়ে ছয়ফালের কথাও। কী ভয়ঙ্কর চোরাবালির ফাঁদেই না তিনি ফেলেছিলেন ছয়ফালকে! তালবাড়িয়ার সবচেয়ে অভাবী আর দুর্বল মানুষের একটা তালিকা যদি করা হয়, পাঁচজনের একজন হবে ছয়ফাল। বছর তিনেক আগে, কেরামত মণ্ডল তখন সুস্থ, লিভারে পচন ধরে নি, বুনো মোষের মতো চষে বেড়ান গ্রামের এ-মাথা ও-মাথা। এর ভেতর ছয়ফালের পোষা গরুটা কারা যেন চুরি করে নিয়ে গেল। ভোরে গরু বের করতে গোয়ালে ঢুকেছে ছয়ফালের বউ। দেখে, গোয়াল খালি। সবকিছুই ঠিকঠাক আছে। ঘষির বস্তা, ছাল দিয়ে মাখানো বিচালির গামলা, চুনা পরিষ্কার করার জন্য দইয়ের পাতিল, সন্ধ্যায় যেমন দেখেছিল তেমনই। নেই শুধু গরু। ছয়ফালের বউয়ের মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল আর জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল গোবর-চুনার ভেতর। সংবাদ শুনে সঙ্গে সঙ্গে হাজির হলেন কেরামত মণ্ডল। তার কাজই হলো বিপদে-আপদে মানুষের পাশে থাকা। পরামর্শ দিয়ে মাতব্বরির দায়িত্ব পালন করা। তিনি যখন ঢুকলেন ছয়ফালের বাড়ি, জ্ঞান ফিরে পেয়েছে ছয়ফালের বউ। উঠোনে হাত-পা ছুঁড়ে এমন কান্না কাঁদছে সে, বুক থেকে আঁচল সরে কোথায় চলে গেছে, ভারি বুকের উপরিভাগ উদ্ভাসিত হয়েছে ব্লাউজ ঠেলে, যেভাবে চাঁদ ওঠে মেহগনির ডালের ফাঁকে। কোন খেয়াল নেই মেয়েটার। কেরামত মণ্ডল চোরা চোখে কতক্ষণ পূর্ণ চাঁদের থালার দিকে তাকিয়ে থাকলেন নিজেও জানেন না। তার মনে হলো, গরু না হারিয়ে যদি ছয়ফাল হারাত কিংবা মরত, তবে এমন বেহুশ কান্না কাঁদত না বউ। কেরামত মণ্ডলের অনুমানের পেছনে যুক্তি আছে। নিঃস্ব এই পরিবারটার বেঁচে থাকার একমাত্র প্রাণশক্তি ছিল ওই গরুটার ভেতরে। নিজেরা খেয়ে না খেয়ে বড় করছিল গরুটাকে। সামনে কোরবানীর হাটে চড়া দামে বেচে কোমর সোজা করে দাঁড়াবার স্বপ্ন বুনেছিল। এর ভেতর ঘটল চুরির ঘটনা। চোরের যে আসলেই কোন ধর্ম নেই, মজলিশের মুরব্বিরা নতুন করে স্মরণ করল কথাটা। অনেক খোঁজাখুঁজি হলো, মাইকিং হলো, মাতব্বদের সাথে বসাবসি হলো, কিন্তু গরু পাওয়া গেল না। ছয়ফালের পরিবার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেল।

এক মিষ্টি সকালে ক্ষুধার্ত কুকুরের মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ছয়ফাল আসল কেরামত মণ্ডলের কাছে। ঘরে তার খাদ্য খাবার কিচ্ছু নেই। এই দুর্দিনে কেরামত মণ্ডল যদি হাজার পাঁচেক টাকা ধার না দেয়, তবে বউ ছেলে নিয়ে তাকে না খেয়ে মরতে হবে নয়তো পথে পথে ভিক্ষে করতে হবে। এতে তার খুব একটা ক্ষতি হবে না। ক্ষতি হবে তালবাড়িয়া গ্রামের।

কেরামত মণ্ডল রাজি হলেন না। এই মুহূর্তে ছয়ফালকে কিছু দেওয়া মানে একবারের জন্য দিয়ে দেওয়া। বাপের জনমে ধার শোধ করার সাধ্য তার হবে না। কেরামত মণ্ডল হাতেম তাঈ নন। কেউ এসে কাচুমাচু করে কিছু চাইল আর অমনি তিনি দিয়ে দিলেন। টাকা পয়সা ধন-দৌলত সব তার কষ্টের উপার্জন। তিনি যখন নিজের অভাব-অনটনের অজুহাত তুলে অপারগতা প্রকাশ করছিলেন, সেই সময় ছয়ফালের পক্ষ নিয়ে ওকালতি করতে এগিয়ে আসল জুবাইদা। আল্লাহ দিলে তাদের অনেক আছে। ছয়ফাল বেচারা বিপদে পড়েছে। তাকে পাঁচহাজার টাকা ধার দিলে মণ্ডলের চুলার আগুন নিভে যাবে না। আল্লাহ না করুক বড় কোন রোগ-ব্যাধী হলে অমন টাকা হাজারে হাজারে কোন দিক দিয়ে বেরিয়ে যাবে টেরও পাওয়া যাবে না। বউয়ের প্যানপ্যানানীতে কেরামত মণ্ডল রাজি হলেন শেষ পর্যন্ত। অবশ্যই কঠিন শর্ত সাপেক্ষে। পাঁচ মাসের ভেতরে শোধ করতে হবে ঋণ। না পারলে অতিরিক্ত প্রতি মাসে এক হাজার টাকা সুদ দিতে হবে। শর্ত যত কঠিনই হোক, ছয়ফালের রাজি না হয়ে উপায় নেই। খড়কুটো সামনে যা-ই আসুক আঁকড়ে ধরতে হবে। এই মুহূর্তে তার কোন ভবিষ্যৎ-চিন্তা নেই। তাকে বাঁচতে হবে বর্তমান নিয়ে।

ছয়ফাল তিন হাজার টাকা দিয়ে বাচ্চার চেয়ে একটু বড় একটা ছাগল কিনে রাখল। প্রতিদিনের চাল-ডাল-তরিতরকারির ব্যবস্থাটাও করতে লাগল। কিন্তু শুধু চালডালের ভেতরেই তো মানুষের জীবন না। অসুখ-বিসুখে তাকে চিকিৎসা করাতে হয়। পরনের পোশাক জোগাড় করতে হয়। ছোট সন্তান থাকলে তার সাধ-আহ্লাদ পূরণ করতে হয়। তো এইসব করতে গিয়ে ছয়ফালের হাতে অতিরিক্ত টাকাই থাকে না। এরি মধ্যে ছাগলটার কী এক অসুখ হলে সাতশ টাকা লসে বিক্রি করে দিতে হয়। পাঁচমাস পর মণ্ডল যখন পাওনা টাকা দিতে বলে, ছয়ফালের মনে হয় কেউ যেন হাত-পা বেঁধে তাকে ফেলে দিয়েছে সাগরে। সে জলমগ্ন মানুষের মতো খাবি খেতে খেতে বলে, কোন পাপে এই বছরডায় আল্লা আমার এম্মা বিপদে ফেলল, মণ্ডল ভাই! নিজির ছাওয়ালের চায়েও বেশি যত্ন কত্তাম গরুখেনের। কোন বেজন্মার বাচ্চা যে গরুখেন চুরি কল্ল! ছাগল কিনলাম তিনহাজার দিয়ে। শুয়োরের বাচ্চা ছাগলডাও অসুখীর জন্নি বেচতি হলো সাতশ টাকা লস দিয়ে। আপনের টাকা আমি ক্যাম্মা শোদ করব, কন?

কেরামত মণ্ডল কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, আমি জানতাম, টাকা তুই শোধ করতি পারবি নে। শুধু তুষারের মা’র ভকভকানির তে বাঁচতি তোক টাকা দিছলাম। আর বিপদের কতা কচ্ছিস, তা বিপদ নি কার তাই ক তো! তোর কী ধারণা, আমি খুব সুখি আছি! না, সুখি নি। এই দুনিয়ায় অভাব ছাড়া কুনু মানুষ নি। যাই হোক, অত কতা না, বিপদে পড়ছিলি, টাকা চাইছিস, দিছি। ইবার তাড়াতাড়ি ফেরত দিয়ার ব্যবস্থা কর। আমি গেলাম।

ছয়ফাল টাকার ব্যবস্থা করতে পারল না। ছাগল বেচা পনেরশ টাকা তার হাতে ছিল। বউয়ের পরামর্শে তার উপর আর পাঁচশ বাড়িয়ে মণ্ডলকে আপাতত ঠাণ্ডা করতে চাইল সে। দুইহাজার টাকা দেখে হাতেই নিলেন না কেরামত মণ্ডল। ছয়ফাল বাজারে গিয়ে রাস্তা এবং বাবা হারিয়ে ফেলা বালকের মতো অসহায় গলায় বলল—আপাতত এই রাকেন মণ্ডল ভাই। আমি কতা দিচ্চি খুপ তাতাড়িই বাকি টাকা শোদ করে দেব। চিড়া তবু ভেজে না। মণ্ডল বলেন, সুদই তো আসছে দুইহাজার। পাঁচ মাসের পর আরো দুইমাস চলে গেছ তোর খিয়াল আছে?

ছয়ফাল একবার শুধু বলতে গেল, মণ্ডলভাই, ইসলামে সুদ হারাম, আপনে তাও সুদ খাবেন! আপনে না নামাজ পড়েন! কিন্তু বলতে পারল না। এমন কথা বলার সাহস ছয়ফালদের দেওয়া হয় না। কেরামত মণ্ডল একটু থেমে কী যেন ভেবে নিয়ে টেনে টেনে বললেন, অবশ্য একটা কাজ তুই করতি পারিস। তাহলি তোর কুনু টাকাই আর দিয়া লাগবিনেন।

ছয়ফালের কানে কথাটা যেন ঢোকে নি। অথবা ঢুকেছে কিন্তু বিশ্বাস করতে পারে নি। বলে কি মণ্ডল! এও কি সম্ভব! মণ্ডল তার ঋণ মাফ করে দেবে! শুধু একটা কাজের বিনিময়ে! মণ্ডল এত ভালো! সে দুই পা এগিয়ে এসে খপ করে হাত চেপে ধরল মণ্ডলের—আপনে ইয়ার্কি মারচেন না তো! সত্যি সত্যি আমার আর টাকা দিয়া লাগবি নে! তার চেহারায় একই সাথে বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের ছায়া।

মণ্ডল গম্ভীর গলায় বললেন, ইয়ার্কি মারব ক্যা! তোর সাথে কি আমার ইয়ার্কি মারার সম্পর্ক!


লাম্পট্য না ছাড়লে বন্ধ হওয়া দরজা দিয়ে ঢোকার অনুমতি নেই মণ্ডলের। জুবাইদা কথা রেখেছে। বন্ধ দরজা সে খোলে নি পরস্ত্রীকাতর স্বামীর জন্য।


ছয়ফালের চোখমুখ এবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল নতুন টিনে সূর্যের আলো পড়ার মতো—কী কাম মণ্ডল সাহেব! শুদু কয়ে দেখেন, আপনে যা কবেন তাই আমি করব। যদি মানুষ খুন কত্তি হয়, তাও। শুদু এই বিপদেত তে আমার বাঁচান। চিন্তায় চিন্তায় আমি শ্যাষ হয়ে গ্যালাম।

মণ্ডল এবার চোখ সরিয়ে নেন ছয়ফালের চোখ থেকে। আমড়া গাছের নিচে হেঁটে হেঁটে দুটো ঘুঘু খুটে খুটে শস্যদানা অথবা অন্যকিছু খাচ্ছিল। সেদিকে তাকিয়ে থেকে কিছু যেন ভাবেন। তারপর বলেন—কাজ তেমন কিছু না। তোর কিছু করাও লাগবিনেন। এই ধর মাঝে মাঝে রাতির বেলা তোর বাড়ি গেলাম, তোর সুন্দরী বউর হাতে নুনভাত যা উপস্থিত থাকে খালাম। ইট্টু গল্পটল্প করলাম। পোতিদিন না। সপ্তায় একদিন। কথা শেষ করে কেরামত মণ্ডল এক পলকে ছয়ফালের চেহারাটা পড়ে নেন গোপনে। তারপর আবার ঘুঘু দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

কাজ নিয়ে কত উত্তেজনা ছয়ফালের, যে কাজ তার গলা থেকে সরিয়ে দেবে ঋণের শেকল। অথচ এখন মণ্ডলের মুখে কাজের ফিরিস্তি শুনে কেমন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছয়ফাল। একটু আগের সেই উচ্ছ্বাস, প্রয়োজনে মানুষ খুন করে ফেলার সেই উদ্যম এক ফুৎকারে মোমবাতির আগুনের মতো নিভে গেছে। তার চোখের দৃষ্টি বৃষ্টির পর নদীর পানির মতোই ঘোলা। ছয়ফালের নীরবতা মণ্ডলকে একটু অস্বস্তিতে ফেলে দেয় যেন। তিনি আর সময় দেন না ছয়ফালকে। হঠাৎ তুই থেকে তুমিতে উঠে গিয়ে বলেন—তুমি এখন বাড়িত যাও ছয়ফাল। আমার ইট্টু কাজ আছে। আর যা বললাম ভাবে দেখো। আমগাছের পাশে দ্বিতীয় আমগাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ছয়ফাল। লোহার ভারি গেট ঠেলে কেরামত মণ্ডল বাড়ির ভেতর চলে যান। তারপর থেকে সপ্তাহের একটা দিন ছয়ফাল ইশার আজানের আগেই খেয়েদেয়ে ছেলেটাকে ঘুম পাড়িয়ে বউকে ঘরে একলা রেখে কোথায় যেন চলে যায়। ফিরে আসে একবারে শেষরাতে, চাঁদওঠা রাতে চাঁদ যখন ঢলে পড়ে পশ্চিম আকাশে। বাকি রাতটুকু সে বউয়ের দিকে পিঠ ফিরিয়ে নির্ঘুম চোখে শুয়ে থাকে কাঠ কাঠ হয়ে। পাশের বাড়ির মোরগ গলা ফুলিয়ে কক্বককা কক্ব ডেকে উঠলে সে নিঃশব্দে উঠে পড়ে বিছানা ছেড়ে। কলতলায় ওযু করে মসজিদে যায়। আজকাল সে নামাজ ধরেছে।

মণ্ডলের চেহারা বেশ রোশনাই হয়ে উঠেছে। উপর উপর তাকে খুব তৃপ্ত দেখায়। তবে ঘরে অশান্তি নামে ডানা ঝাপটে। যেভাবে আকাশ থেকে শকুন নামে মরা গরুর উপর। পুরুষ জাতি যতই চতুর ভাবুক নিজেকে, অন্যখানে তার চতুরতা চলতে পারে, কিন্তু সে যখন পরনারীর সাথে শোয়াশোয়ি করে, ঠিক ঠিক ধরে ফেলে ঘরের বউ। কেরামত মণ্ডলও ধরা খেয়ে যান জুবাইদার হাতে। স্বামীর গায়ে পরস্ত্রীর দেহের গন্ধ নাক দিয়ে ঢুকে কামানের মতো মস্তিষ্কে আঘাত হানে জুবাইদার। প্রতিবাদস্বরূপ নিজ শরীরের দরজা সে বন্ধ করে দেয় অনির্দিষ্ট কালের জন্য। লাম্পট্য না ছাড়লে বন্ধ হওয়া দরজা দিয়ে ঢোকার অনুমতি নেই মণ্ডলের। জুবাইদা কথা রেখেছে। বন্ধ দরজা সে খোলে নি পরস্ত্রীকাতর স্বামীর জন্য। লিভারের অসুখে মণ্ডলের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। আর সে-জন্যই বুঝি স্বামীর মৃত্যুশোকে কান্নাকাটি করে না জুবইদা। বজ্রপাতের মতো শুধু একটা চিৎকার ছাড়া। জুবাইদার ভাবনা ছেড়ে কেরামত মণ্ডল ছয়ফালের বউকে নিয়ে ভাবতে থাকেন। ছয়ফালের বউ কি তার মৃত্যু সংবাদ পেয়েছে! পেয়েছে তো বটেই। জামে মসজিদের মাইকে ঘোষিত হয়েছে শোক সংবাদ, কারো বাকি নেই জানতে। মুয়াজ্জিন শরিফুল্লাহর মতো সেও কি মনে মনে বলেছে—যাক, আপদ বিদায় হইছে! না, আপদ তো সে শরিফুল্লাহর কাছে। ছয়ফালের বউয়ের কাছে সে শুধু আপদ নয়। আপদের চেয়েও বড় কিছু।

মরাবাড়িতে মানুষের ঢল। মহিলার সংখ্যাই বেশি। ঘরে, বারান্দায়, সিঁড়ির মুখে, উঠোনের কোণায়, বাতাবিলেবুর তলে, সবখানে মহিলা। নাকে আঁচলচাপা দিয়ে উঁকিঝুকি মারছে। এই মহিলাদের ভেতর কি ছয়ফালের বউটা আছে? নাকে আঁচলচাপা এত মহিলার ভিড়ে কেরামত মণ্ডল কীভাবে খুঁজবে ছয়ফালের বউকে! তার তো হাঁটাচলার উপায় নেই।

আব্দালপুর থেকে কেরামত মণ্ডলের একমাত্র বোন এসেছে একটু আগে। উঠোনে পা রেখেইে সে হাত-পা ছুঁড়ে বিলাপ শুরু করেছে। তার আগমনে মরাবাড়িতে কান্নাকাটির নতুন মাত্রা যোগ হলো। এতক্ষণ সবাই প্রায় চুপচাপই ছিল। দেখা গেল ফেরদৌসির কান্নার সাথে আরো অনেকেই যোগ দিল। তারা যেন এই উপলক্ষটার জন্য অপেক্ষা করছিল। কেরামত মণ্ডল বুঝতে পারলেন, বোনেরা ভাইদের একটু বেশিই ভালোবাসে।

জোহরের আগেই গোসল দিয়ে কাফন পরানো হয়ে যায় কেরামত মণ্ডলের। গোসলের পর তাকে আর বারান্দায় তোলা হয় না। খাটিয়ায় শুইয়ে বাতাবিলেবু গাছের নিচে উত্তর দক্ষিণ করে রাখা হয়। ইমাম সাহেব তার কাফনের ভাঁজে কর্পুর গুঁজে দিয়েছে। গন্ধটা ভালো লাগে না কেরামত মণ্ডলের। যদি শক্তি থাকত, কাফনের ভাঁজে কর্পুর দেয়ার তাৎপর্য তিনি ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করতেন ।

বাদ আসর জানাজা। আসরের আগ দিয়েই আত্মীয়-স্বজন যে যেখানে ছিল, এসে গেল। কেরামত মণ্ডলের চাচাতো ভাই তার মাথার কাছে টুল পেতে বসে আছে। নূতন কেউ লাশ দেখতে চাইলে সে কাফন সরিয়ে মুখ দেখাচ্ছে। দেখা শেষ হলে ঢেকে দিচ্ছে। নিজেকে নূতন বউ বউ লাগছে কেরামত মণ্ডলের। মুখ দেখা—এই একটা ব্যাপারে বিয়ে আর মৃত্যুর ভেতরে তিনি মিল খুঁজে পেলেন।


কবরে প্রবেশের এই শেষ আয়োজনে দুর্বল মানুষটার জন্য একটু বেদনাবোধই যেন হয় কেরামত মণ্ডলের।


আসরের পর লাশ তোলা হলো কাঁধে। জানাজা হবে বাড়ির বাইরে মণ্ডলদের নিজস্ব খোলাটে। খাটিয়া যখন গেট দিয়ে বের হয় হয়, কেরামত মণ্ডল ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা এক চিৎকার শুনতে পেলেন। চিৎকারটা জুবাইদার। কেরামত মণ্ডল স্বস্তি পেলেন—সম্ভবত স্ত্রী তাকে ক্ষমা করেছে।

লাশ সামনে রেখে মুসল্লিরা কাতার ধরে দাঁড়িয়ে গেছে। খাটিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কেবল ইমাম সাহেব আর শহরে ডাক্তারী করা কেরামত মণ্ডলের একমাত্র ছেলে তুষার। তুষার কখন এসেছে কেরামত মণ্ডল টের পান নি। গোসলের পর কত মানুষ এসে তার মুখ দেখেছে। তিনিও তাদের সবাইকে খুঁটে খুঁটে দেখেছেন। কারো চেহারার ভেতর ‘আহা উঁহু, অকালে চলে গেল বেচারা’ আবার কারো চেহারায় ‘খুব তো বাহাদুরী করেছিস এখন কেমন লাগে’ টাইপের একটা ভাব ছিল। তুষার তখন কোথায় ছিল? নাকি সে এইমাত্রই এসেছে শহর থেকে!

তুষার পিতার প্রতিনিধি হিশেবে সমবেত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে ছোটখাটো বক্তৃতার মতো কিছু কথা রাখল। কেরামত মণ্ডল ছেলের গলায় পিতৃবিয়োগের বেদনা খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু ছেলের গলায় বেদনা নয়, বরং এত মানুষের সামনে কোন শব্দের ভুল উচ্চারণ যাতে না হয় সেই সতর্কতার প্রচেষ্টা খুঁজে পেলেন। তুষার বলল, আপনারা জানেন আমার শ্রদ্ধেয় পিতা একজন বিশিষ্ট সমাজসেবক ছিলেন। এই তালবাড়িয়া গ্রামের প্রতিটি মানুষ বিপদ-আপদে তাকে পাশে পেয়েছে। অর্থ দিয়ে, সময় দিয়ে, বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে তিনি সকল মানুষকে সাহায্য করেছেন। কালের অমোঘ চক্রে আজ তিনি মৃত্যুর হাতে বন্দী হয়ে গেছেন। আমি আপনাদের প্রতি উদাত্ত আহবান জানাই—তিনি যদি কারোর কোন ক্ষতি করে থাকেন অথবা কারোর মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন তাহলে আমি আব্বার পক্ষ থেকে আপনাদের কাছে মাফ চাচ্ছি, তিনি এখন অন্য জগতের বাসিন্দা, আপনারা তাকে মাফ করে দেবেন। আর কেউ যদি আমার আব্বার কাছে টাকা-পয়সা পেয়ে থাকেন, আমাকে জানাবেন, আমি অবশ্যই শোধ করে দেব।

কেরামত মণ্ডল ভাবলেন, তুষার তো বলল, ‘আমি অবশ্যই শোধ করে দেব’—এখন যদি ছয়ফাল সবার সামনে বলে, মণ্ডল আমার বউয়ের ইজ্জত লুটেপুটে খেয়েছে, আমি এর ক্ষতিপূরণ চাই, আমি আমার আগের সংসার ফিরে পেতে চাই, তুষার তবে কিসের বিনিমিয়ে ক্ষতিপূরণ দেবে! দুনিয়ার সব ক্ষতির কাফফারা কি পয়সা দিয়ে হয়! কিন্তু আশার কথা হল ছয়ফাল ক্ষতিপূরণ দাবি করে না। সে জীবিত মণ্ডলের সামনে যেমন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকত, এখন, এই মৃত মণ্ডলের সামনেও সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে সামনের কাতারে। ওদিকে তুষারের কথা শেষ হওয়া মাত্র ইমাম সাহেব হাত উঁচু করে চিৎকার দিয়ে বলে, আপনারা সবাই হাত তুলে বলেন, আমরা মরহুমের সব অপরাধ মাফ করে দিলাম।

কারেন্টের মতো কাজ হয়। ইমাম সাহেবের দেখাদেখি সবাই হাত তুলে সজোরে বলে, আমরা সবাই মাফ করে দিলাম।

কেরামত মণ্ডলের মনে হয়, সবাই মাফ করলেও ছয়ফাল তাকে মাফ করবে না। যে ক্ষতি তিনি করেছেন ছয়ফালের—এর কোন ক্ষমা হয় না। কিন্তু অবাক হয়ে তিনি খেয়াল করেন, সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে, সবার মতো হাত তুলে ছয়ফালও বলছে—আমরা তাকে মাফ করে দিলাম। তিনি জান্নাতবাসী হন।

কবরে প্রবেশের এই শেষ আয়োজনে দুর্বল মানুষটার জন্য একটু বেদনাবোধই যেন হয় কেরামত মণ্ডলের।

সাব্বির জাদিদ

জন্ম ১৭ আগস্ট, ১৯৯৪; কুষ্টিয়া। কথাসাহিত্যিক।

ইসলামিক স্টাডিজ, অনার্স, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

প্রকাশিত গ্রন্থ :
একটি শোক সংবাদ [গল্পগ্রন্থ, ঐতিহ্য, ২০১৭]

ই-মেইল : sabbirjadid52@gmail.com

Latest posts by সাব্বির জাদিদ (see all)