হোম গদ্য গল্প একটি পৌরাণিক রাতের খসড়া

একটি পৌরাণিক রাতের খসড়া

একটি পৌরাণিক রাতের খসড়া
283
0

কী ঠান্ডা কী গরম যে দশাই দেশে চলুক আসগর আলি বিছানা থেকে কম্বল সরায় না। এই কম্বল নিয়া বউয়ের সঙ্গে লাগাবাজা কম হয় নাই। তাও সে কম্বল ছাড়ে না। বিশেষ করে রাতের বেলা আসগর আলি আর তার বউয়ের মাঝখানে সেই কম্বল এমনভাবে থাকে যেন আরেকটা মানুষ। রাত-বিরাতে আসগরের বউয়ের শরীর কী মন চাইলেও সে আসগরকে জড়াজড়ি করে থাকতে পারে না কম্বলটার জন্য। তখন তার মন চায়, কম্বলটাতে আগুন লাগায়া হালুয়া বানায়া আসগর আলিকে খাইতে দিবে আর কম্বলের ছাই দিয়া কৈ মাছ কাটবে। কম্বল নিয়া বউয়ের এই সতীনপনা আসগর কেমনে যেন টের পায়। হতে পারে কম্বল বিষয়ে আসগরের মনে একটা আলগা ফিলিংস তৈরি হয়েছে যা তার বউ মায়মুনাকে একটা প্রতিদ্বন্দ্বী হিশাবে খাড়া করায়। আবার নাও হতে পারে। কেবল অনুমানের খাতিরে সে এটা বলতে পারে। তারপর রাতে শুয়ে শুয়ে আসগর যখন বলে, কম্বলে আগুন লাগলে সংসারে আগুন জ্বলবে তখন আসগরের বউ মায়মুনা আর সাহস পায় নাই আগুন লাগানোর কথা চিন্তা করার। সে ভাবে, যে-মানুষ কম্বল আঁকড়াইয়া বছরের পর বছর ধরে জিন্দেগি পার করতে পারে তার কম্বলে আগুন দেয়ার একটা শক্ত উসিলা দরকার। ওই রাতের পর তার মাথায় শয়তানি উসিলা এসে ভর করে। কিংবা সে হার মানতে নারাজ থাকে। মানে ব্যাপারটা এমন হয় যে, কম্বলটা তার কাছে সতীনের খাসলত নিয়ে বিরাজ করে। তখন তার মনে শয়তান পিচকারি মারে। পিচকারিতে পানি বের হলে সে ভাবে, আগুন দিতে না পারলেও পানি তো মারা যাবে! শয়তান আবার পিচকারি মারে। তার মনে হয়, খালি খালি পানি দিয়া লাভ কী? এইবার শয়তান আবার পিচকারি মারলে তার নাকে পেচ্ছাবের গন্ধ লাগে। তখন তার মাথায় কূটনীতি খেলে। তারপর ওইরাতে সে কম্বলটা জড়ায়ে ধরে মনোযোগ দিয়া পেচ্ছাব করে।


আসগর আলি বলে, বুড়ি মাগি, মুতি বিছানা ভাসাইয়া কও কী হইছে?


শীতের রাতে পেচ্ছাবে ভেজা কম্বল আসগর আলির ঘুম হারাম করলে সে দিশাহারা মানুষের মতন ব্যাপারটা আন্দাজ করার চেষ্টা করে। তারপর লুঙ্গিতে হাত দিয়ে দেখে তার লুঙ্গি হালকা ভেজা। তখন সে বুঝে, এই পানির রহস্যতে তার হাত নাই। সে আরও দেখে কম্বলটা ভেজা আর এই পেচ্ছাবে ভেজা কম্বল দিয়ে তার লুঙ্গি ভিজেছে। আর তখনই সে মায়মুনার দিকে নজর দেয়। মায়মুনা তখন চোখ আটো করে ব্যাপারটার একটা দৃশ্যকল্প মনের ভেতর সাজাতে থাকে। আর শয়তান তাকে সমানে কাতুকুতু দিতে থাকে। ঠিক তখনই আসগর আলির একটা হাত তার গায়ে নামে। মায়মুনা তখনও নির্বিকার থেকে আসগর আলির চাল ধরার চেষ্টা করে। আসগর আলি এইবার মায়মুনাকে ধরে একটা ঝাঁকুনি দিলে সে পাকা অভিনেত্রীর মতন ভেক ধরে বলে, কী হইছে? আসগর আলি বলে, বুড়ি মাগি, মুতি বিছানা ভাসাইয়া কও কী হইছে? মায়মুনা তার ভেক ধরা চেহারা নিয়া বিছানার শুকনা জমিনে হাত দিয়া কয়, কই ভিজা? আন্দাজি কী কও? খোয়াব দেখছ নাকি! এইবার আসগর আলি ভালো মতন চেতে কয়, হারামজাদি কম্বলে হাত দিয়া দ্যাখ! এইবার শয়তান মায়মুনার কানে কানে বলে, সপ্তায় তিনবার কইরা বিছানায় মুতবি। মায়মুনার নীরবতায় আসগর আলি ওর হাতটা জোর করে ধরে পেচ্ছাবে ভেজা কম্বলে নিতে চাইলে মায়মুনা বলে, নিজে মুইতা আমারে দিয়া মুত নাড়াইবার চাও। বুইড়া খাটাশ।

আসগর আলি ঘটনায় থ খাইলে মায়মুনা ঘর থেকে বের হয়ে কলতলায় যায়। তারপর টিউবওয়েলে পানি তোলার আওয়াজ করে বদনা ভরে নিয়ে পেচ্ছাব করার ভান করে। মিনিট কয়েক পরে ঘরে ঢুকে বলে, বুড়া ভাম এক কলসি পানি খায়া শুইছিল, মুইতা শাড়িটাও ভিজায়া দিছে। আসগর আলি কিছু না বলে সকাল হওয়ার অপেক্ষা করে আর মনে মনে বিচরায় মায়মুনাকে হেনস্তা করার কৌশল। কিন্তু শয়তান মায়মুনার পক্ষ নেওয়ায় সে কূলকিনারা পায় না। সকাল হওয়ার পর পর মুতে ভেজা কম্বলটা রোদে দেওয়ার জন্য বের করতে করতে মায়মুনা চেঁচানো শুরু করে, এই বয়সেও বিছানাত মুতে। বুড়া মরদের মুতের গন্ধে বাঁচি থাকায় দায়। নাপাক ঘর-বিছানাত ফেরেশতা আইসে ক্যামন করি! মায়মুনার এইসব কথায় বাড়ির সবাই ব্যাপারটা টের পায়। আর তখন আসগর আলি অসমাপ্ত ঘুমে ইস্তফা দিয়ে বিছানা থেকে উঠে এলে তাকে দেখে সবাই হি হি করে হাসে। তখন সে বলতে চায় যে, সে বিছানায় পেচ্ছাব করে নাই। কিন্তু মায়মুনা ততক্ষণে ব্যাপারটা চাউর করে দেয় আর সবাই বিশ্বাস করে যে, আসগর আলি বিছানায় পেচ্ছাব করেছে। আসগর আলির সারাটা দিন পেচ্ছাবের টিটকারিতে কাটলে সে বিমর্ষ হয়ে পড়ে। সে আরও বিমর্ষ হয় যখন চায়ের স্টলে বিস্কিট কিনতে যাওয়া একটা ছোট চ্যাংড়া বলে, কে বাহে তোমারে নাম আসগর আলি, তোমরায় বিছানাত মুতেন। তখন চায়ের স্টলে একটা হো হো আওয়াজ পাক খায়। আর আসগরের মনে হয়, শালা না মুইতা দোষ হইল তো এইবার মুইতা দেওয়ার কাম। বিছানায় শুয়ে সে যখন এসব ভাবছিল তখন সারাদিন শীতের রোদ খাওয়া কম্বলটা থেকে মুতের হালকা হালকা গন্ধ ভাসছিল। কম্বলটা তখনও তাদের মাঝখানে। সে তখন পেচ্ছাব করার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকে। কিংবা বলা যায়, শয়তান তাকে মদদ না দেওয়ায় সে বিছানায় পেচ্ছাব করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। কম্বলটার দিকে তাকিয়ে থাকা আসগর আলির চোখে কম্বলটার একটা মায়া এসে হাজির হয়। সে তখন কম্বলটার গায়ে হাত দিয়ে পরশ নেওয়ার চেষ্টা করে।


শয়তান যে-চাল দিয়া মায়মুনাকে কম্বলে পেচ্ছাব করায় মায়মুনা সেইরকম একটা ব্যাপার আবার চায় কম্বলটা ফেরত পাবার আশায়।


ঠিক দুই রাত পর আসগর আলির কম্বল আবার ভিজে গেলে জানা যায়, মায়মুনা আরও নিখুঁতভাবে কম্বলে পেচ্ছাব করার কাজটা সেরেছে। আর সকাল হওয়ার পর আবার বিছানায় পেচ্ছাব করার ব্যাপারটা নিয়া আসগর আলির বিরুদ্ধে বয়ান জারি রাখে। এইবার ঘটনাটা বাতাসের আগে উড়ায় আর তখন আসগর আলি আর মায়মুনার চেয়ে কম্বলটার প্রতি সবার আগ্রহ বাড়ে। আর সবাই না হলেও কেউ না কেউ মনে মনে একটা শয়তানি উস্কানি পায়। আর উস্কানিতে রোদে শুকাতে দেওয়া কম্বলটা চুরি হয়ে যায়। কম্বল চুরির ব্যাপারটা নিয়ে আসগর আলির সন্দেহ মায়মুনার দিকে ডালাপালা মেললে মায়মুনার আর করার কিছুই থাকে না এক কিরা-কসম খাওয়া ছাড়া। তখন শয়তান যে-চাল দিয়া মায়মুনাকে কম্বলে পেচ্ছাব করায় মায়মুনা সেইরকম একটা ব্যাপার আবার চায় কম্বলটা ফেরত পাবার আশায়। কিন্তু মায়মুনা তখনও বুঝে নাই দুনিয়া তার চাওয়া মতো ঘুরে না।

কম্বল চুরি যাওয়ার পর এটাই প্রথম রাত যখন আসগর আলির পাশ খালি। মায়মুনার মনে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও সে আসগর আলির পাশে খালি জায়গাটা দখল করার আশায় থাকে। এবং রাত বাড়তে থাকলে একটা গড়ান দিয়ে সে আসগর আলির নিশ্বাসের কাছে আসে। তখন সে একধরনের বিজয়ের স্বাদ অনুভব করার চেষ্টা করে। কিন্তু ক্ষণিকের মধ্যে সে আসগর আলির নিশ্বাসে একধরনের নিঃসঙ্গতার ছোঁয়া পায়। কম্বল ছাড়া আসগর আলির নিঃসঙ্গতা মায়মুনাকেও আচ্ছন্ন করলে সে কম্বলের জায়গাটা থেকে একটু সরে আসে। তারপর আসগর আলির কম্বলের দায় নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আসগর তার মুখের দিকে না তাকালে মায়মুনা নিজের নিভে আসা যৌবনকে প্রথমে দায়ী করতে চায়। কিন্তু সে টের পায় আসগর আলির শরীরে জ্বরের উত্তাপ। আসগর আলির জ্বরের উত্তাপে মায়মুনা সেদ্ধ হতে থাকলে তার মনে আবার পুরান প্রশ্নটা বিচরায়— কম্বলটার কাহিনিটা কী? বিয়ের পর থেকে সে অনেকবার আসগর আলির কাছে এটা জানতে চেয়েছে কিন্তু কোনো উত্তর পায় নাই। আর আসগর আলি কী-বা উত্তর দিত! ওই তো শীতের রাত। তার কৈশোর শেষ করে যৌবনে পা দেওয়ার কাল। এমন এক মাঘের রাতে আসগর যায় যাত্রাপালা দেখতে। যাত্রা শুরুর আগে যাত্রার মেয়েদের এক পশলা ড্যান্স চলে। আসগর ড্যান্স দেখে। ওইসব ড্যান্স দেখে অনেকের গা গরম হয়। কিন্তু আসগরের হয় না। আসগরের শরীর শীতল হয়। মাঘের হিমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শীতল হয় আসগরের গা। সারারাত আসগর শীতল হতে হতে ফ্যাকাশে হয়। তারপর একসময় যাত্রা ভাঙার কালে আসগর তার হিমদেহটা নিয়ে ঢলে পড়ে। তার এই ঢলেপড়া হিমদেহটা কারো নজরে পড়ে নাই। দেখে খালি একজন। সেই মেয়ে কিংবা যুবতী কিংবা নারী, যে-যাত্রা শুরুর আগে ড্যান্স দিয়েছিল, সে আসগরের হিমদেহটাকে নিয়ে নিজের শোয়ার জায়গায় টানে। আসগরের হুশ নাই, জ্ঞান নাই, কেবল শ্বাস চলে। সেই মেয়ে কিংবা যুবতী কিংবা নারী, যার আসল নাম জানা যায় না কখনও, সে নিজের কম্বলটা দিয়ে আসগরের সারাটা শরীর ঢাকে। আসগরের হিমশীতল দেহটা তাতেও সাড়া দেয় না। আর তখন সেই মেয়ে কিংবা যুবতী কিংবা নারী দেখে আসগরের শরীরটা কাঁপতে কাঁপতে খিঁচুনি দেয়। কোনোকিছু ভেবে ওঠার আগে সে আসগরের খিঁচুনি দেয়া শরীরটা নিজের শরীরের ভেতরে নিয়ে নেয়। এভাবে রাতটা একসময় ফুরায়। আর যৌবন দশায় প্রথম যে-মেয়ে কিংবা যুবতী কিংবা নারী তাকে জড়ায়ে ধরে সেই স্মৃতি সে বেঘোরে হারায়। স্মৃতি হারালে কী হবে, আসগর জানে তাকে সেই মেয়ে কিংবা যুবতী কিংবা নারী কম্বলটা শরীরে জড়ায়ে দিয়ে বলেছিল, যদি কোনোদিন দেখা পাও তো কম্বলটা ফিরত দিও। আসগর আলির জ্বর সারতে সারতে মেলাটা শেষ হয়ে যায়। এরপর পার হয়ে গেছে কত পৌষালি রাত, কত মাঘের দিন, বসেছে কত মেলা, যাত্রায় নেচেছে কত মেয়ে—যুবতী-নারী, কিন্তু আসগর আর তার দেখা পায় নাই। সেই কম্বলটা পাশে নিয়ে শুয়ে শুয়ে পার হলো কত দীর্ঘশ্বাসের সাঁকো, সে খবর কারো জানা নাই। শুধু সে জানে এর নাম মায়া।


মায়মুনা তার শরীরের সমস্ত উত্তাপ নিংড়ে আসগর আলির শরীরের শীতলতাকে ক্রমশ তার নিজের দিকে টানতে থাকে।



রাত বাড়ছে। আসগর আলির শরীরের উত্তাপ হঠাৎ করে নেমে যায়। মায়মুনা কিছুটা স্বস্তিবোধ করা শুরু করলে সে টের পায় আসগর আলির শরীর হিমশীতল। আসগর আলির এই হিমশীতল শরীর মায়মুনাকে পেরেশান করলে সে কেবল দেখে শ্বাস তখনও জারি আছে। মায়মুনা তখন আসগর আলির শরীরের পাশে যে-জায়গাটায় কম্বলটা থাকত সেই জায়গাটায় তার শরীরের সব কাপড় খুলে কম্বল বানাতে থাকে। আসগর আলির নিমীলিত চোখ তখন অনেক দূরের অন্ধকারে ঢাকা। আর তার শরীর ক্রমশ শীতল হতে থাকলে মায়মুনা স্বীয় বিবসনা দেহটাকে আসগরের খেদমতে নেয়। কত রাত সে এভাবে চেয়েছে আসগরকে ধরে থাকতে। হাজার বছরে এমন রাত আর আসে নি কিংবা আসবেও কি-না তা কে জানে? তবে জানা যায়, মায়মুনা তার শরীরের সমস্ত উত্তাপ নিংড়ে আসগর আলির শরীরের শীতলতাকে ক্রমশ তার নিজের দিকে টানতে থাকে। কী কঠিন সে টান! এমন টানে আসগর আলির শরীর ছিলা ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে ওঠে, কিন্তু নারীর সে-টান প্রত্যাখ্যানের সামর্থ্য কোনো পুরুষকে দেয়া হয় নাই।

Masud Parvaj

মাসুদ পারভেজ

জন্ম ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫; দিনাজপুর।

শিক্ষা : স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।

প্রকাশিত বই—

জীবনানন্দের ট্রাঙ্ক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]
বিচ্ছেদের মৌসুম [গল্প, দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
ঘটন অঘটনের গল্প [গল্প, বটতলা, ২০১১]

ই-মেইল : parvajm@gmail.com
Masud Parvaj