হোম গদ্য গল্প একজন পা আর শূন্য জীবনের শরীর

একজন পা আর শূন্য জীবনের শরীর

একজন পা আর শূন্য জীবনের শরীর
246
0

জীবন আচমকা এসে থমকে দাঁড়াল অয়নের পায়ে! এখন বোধশূন্য হয়ে পড়ে আছে আগামীর পথ রুদ্ধ করে। স্থির এ জীবনপ্রবাহ—যেন জীবন্মৃত কোনো মানুষ অন্ধকারের কাছে বন্দি—জ্যোতিহীন, আবছায়া শরীর নিয়ে।

ফুটনোন্মুখ যৌবনের দুরন্ত পা আটকে দিয়েছে অন্ধকার। অন্ধকার! অন্ধকার ব্যবহার করেছে কে? কারা? যারা পেছন থেকে অয়নের মাথায় আঘাত করেছিল? মাথায় আঘাত অথচ দুপায়ের অলৌকিক শক্তিও অয়নকে রক্ষা করতে পারে নি। পড়ে গিয়েছিল ভূমিতে—মাটির বুকে। মাটি আপনই করে নেয়—মমতার বিছানা পেতে। এখানেই প্রকৃতি আর মানুষের মধ্যে পার্থক্য। শরীরে অনুভব করেছিল উপর্যুপরি আঘাতের পর আঘাত। বা-টাকে নিয়ে খেলছিল বাধাহীন উগ্রোল্লাস। কাটা রগের চিৎকার ছিল আকাশ কাঁপিয়ে। অতঃপর প্রকৃতির অন্ধকারের মতো আলোহীন হয়ে গিয়েছিল ওর চোখ। দীর্ঘদিন যাপন করেছে অবচেতন বিছানায়, ঘোরহীন দেহ নিয়ে। জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখে গোড়ালি থেকে বা-পা নেই। মাথায় আঘাতের পর স্মৃতিভ্রষ্ট হলে অয়ন বেঁচে যেত। এখন বিকল পা অয়নকে আর বাঁচতে দিবে কি?

ফুটবলার ছিল অয়ন। ফুটবল খেলেছে নাকি ফুটবলকে নিয়ে খেলেছে? কী ক্যারিশমেটিক পারফরমেন্স! অপার্থিব পায়ের জাদুর অপেক্ষায় থাকত পুরো গ্রাম। এখন অয়নের অকেজো পা দেখার অপেক্ষায় পুরো গ্রামীণ চোখ। অয়ন মুগ্ধ করে দিয়েছিল পায়ের জাদু দিয়ে—পায়ে পায়ে এগিয়েও যাচ্ছিল ভবিষ্যতে, প্রাপ্তিময় আলোর পথে। আজ জাদুকরের দুচোখের কোণে অন্ধকারের কালো। পায়ে চেয়ে আর স্বপ্ন বোনা যায় না—শুধু স্মৃতি রোমন্থনে জাগে অতীত মুগ্ধতা।

এ বিশ্বচরাচরে মানুষের বন্ধু কে? আর শত্রুই-বা কে? মানুষই? বন্ধু আর শত্রুর তো পৃথক পরিচয়। যদিও অয়ন খুব ভালো বুঝে না এসব বিষয়। ও যাপিত জীবনে পা’কে যতটুকু মূল্যায়ন করেছে, মস্তিষ্ককে মূল্যায়ন করে নি তার তিলপরিমাণও। ওর ভাবনায় জীবনটা ছিল খেলার মতো, জীবনবোধের উপস্থিতি ছিল কম। আর এখন, শুধু থমকে যাওয়া জীবন নয়, দুঃস্বপ্ন আর দুর্ভাগ্যের শূন্য জীবন নিয়ে মাঝমাঠে বিকল হয়ে পড়ে আছে।


শিশুরা প্রকৃতির মতো—অথচ বড় হলে ওরা মানুষ হয়ে যায়। 


অয়ন দিনের বেশির ভাগ সময়ই বটতলায় বসে থাকে। একে ধ্যানমগ্ন বলা যাবে না। হয়তো কিছুটা আত্মমগ্ন। কিছুদিন আগেও এ আত্মমগ্নতা ওর স্বাভাবিক জীবনের সাথে যেত না। সময় মানুষকে পরিবর্তন করে। অসময়ের সময় তো মানুষের সহজাত সৌন্দর্যকে নষ্ট করে দেয়। অয়ন কিছুটা আক্ষেপ নিয়ে বসে পড়ে—হয়তো এ বসে পড়াটাই ওর জীবন-নিয়তির সর্বশেষ সংযোজন।

বটবৃক্ষের পূর্বদিকটা শিকড়ের সাথে সাথে ঢালু হয়ে অনেকটা নিচে নেমে গেছে। ঝোপঝাড়ে মিশে প্রকৃতির জংলিরূপ। প্রাচীন সভ্যতার কোনো ছবি এখানে আয়োজন নিয়ে বসে আছে যেন। অয়ন মাটির দিকে চেয়ে থাকে। খাদের দিকে চেয়ে থাকে। খাদের শেষ প্রান্তে প্রবাহমান পানিতে ওর চোখ ভেসে যায়। এখন মাঠের দিকে তাকাতে ওর ভালো লাগে না। অসীম আকাশের দিকে চেয়ে থাকাটা সীমাহীন কষ্টের!

ক্রাচে ভর দিয়ে জমিনে ঠক ঠক শব্দ তুলে অয়ন প্রতিদিন চলে আসে বটের ছায়াতে, শেকড়ে। পথের আওয়াজটাকে ওর পতনধ্বনি মনে হয়। দু-কানের চারদিকে প্রতিধ্বনিত হয়ে যন্ত্রণা দেয়। মানুষের সঙ্গ ভালো লাগে না বলেই যন্ত্রণায় ভর দিয়ে বাড়ি থেকে এ নির্জনে চলে আসা। তবু প্রতিদিনই কেউ না কেউ ওকে সঙ্গ দেয়। এ সঙ্গটাই বিরক্তিকর। বিষয়বস্তু ছাড়া নিছক কৌতূহলে মানুষ বার বার পায়ের কাছে চলে যায়—বাক্যে বিদ্ধ করে। মমতার আতিশয্যে করুণা উগরে দেয়। তবু শিশুদের সঙ্গ কিছুটা স্বস্তিদায়ক। অয়নের মন এখনও বিশ্বাস করে, শিশুরা প্রকৃতির মতো—অথচ বড় হলে ওরা মানুষ হয়ে যায়। মানুষের ভয় অয়নকে এখনও ঘুমাতে দেয় না। স্বপ্নেও এ ভয় সমান কাজ করে! হাঁটতে পারে না ক্রাচ ছাড়া।

‘অয়নদাদা, তোমার পা কবে ঠিক হবে?’

পাভেল। শিশুবয়সের খেলোয়াড়। অয়নের খেলাকে ভালোবাসত—পা-ও। ‘পা কবে ভালো হবে?’ এরকম প্রশ্নে অয়নের চোখে খেলা করে পানি। কখনো গড়িয়ে পড়ে, কখনো মিলিয়ে যায় গভীরে। অয়ন পাভেলের উদ্দেশ্যে বলে, ‘পড়াশোনা ভালোভাবে চালিয়ে যাবি, ভাই। শিক্ষাকে কেউ ভাঙতে পারে না, কেটে ফেলতে পারে না।’

পা কাটা গেছে তাও তো বছর গড়িয়ে নতুন বছর চলে এল বলে। কিছুদিন পরেই গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। আশপাশের আট-দশ গ্রাম থেকে দল এসে জড়ো হবে ‘বিশ্ব গ্রাম ফুটবল টুর্নামেন্ট’-এ। পরপর তিনবারের চ্যাম্পিয়ন আলীপুর গ্রাম—অয়ন ও তার দল। এ বৎসর অয়নের বদলে কামাল দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করবে। অয়ন এখন আর ফুটবল খেলা নিয়ে ভাবতে চায় না। জীবনটাই তো খেলছে ওকে নিয়ে। একটা পা কিভাবে শূন্য করে দেয় জীবনীশক্তি—অকেজো পা-টা কতবড় এক বোঝা! কেটে ছোট করা হয়েছে, অথচ পাহাড় সমান ভার নিয়ে শরীরে যুক্ত। দাঁড়াতে পারে না, দায় হয়ে আছে। জাদুকরি এ পা দিয়ে অয়ন দেখেছিল মানুষের চোখে উচ্ছ্বাস। এখন জাদু বন্ধ, মানুষের চোখে উচ্ছ্বাস নেই—আছে অবহেলা, করুণা আর উপদেশের রমরমা বাক্যবাণ।

আজগর মিয়া। নেতা হওয়ার ঘোরস্বপ্ন নিয়ে বিচরণ করে মাটির পৃথিবীতে। সময়ে-অসময়ে উপদেশ দিয়ে মানুষের কল্যাণ করাই ওর নিত্যদিনের কাজ। ‘অয়ন, তুমি এ বটতলায় সারাদিন বসে থাকো কেন? তাও আবার খাদের কিনারে? পড়ে গেলে তো মিয়া আরেকটা পা ভেঙে ফেলবা। হা হা হা।’ অয়ন নিরুত্তর। আজগর মিয়ার দিকে শুধু চেয়ে ভাবে বিকল মানসিকতার কথা।

‘শোন, তোমার জন্য স্টিলের একটা পা লাগনোর ব্যবস্থা করতেছি। তুমি আবার ফুটবল খেলবা, মিয়া। প্রতিবন্ধী বিশ্বকাপে তোমাকে পাঠাব। তোমার যে স্কিল, নিশ্চিত সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিয়ে আসবা।’

‘আজগর ভাই, সারাদিন বটতলায় বসে থাকি কার্টুন ছবি দেখার জন্য। টিভিতে দেখা কার্টুন ছবিগুলো মেকি, রিয়েল না। মানুষ এখন চলমান কার্টুন। আর খাদের কথা বলছেন?  দেখে যাই শুধু পতনের গভীরতা…’

আজগর হাসতে হাসতে চলে যায়। অয়ন চেয়ে দেখে দু পা কিভাবে চলে যায় বিমুগ্ধ ভঙ্গিমায়। পা হারিয়ে অয়নের বোধ জেগে উঠল কি? উড়ন্ত পায়ের জীবন থমকে গিয়ে মাথায় প্রবেশ করেছে। জীবনে এমন পরিবর্তন হয়তো প্রয়োজন।

প্রতিটি রোগই প্রথমে কষ্ট নিয়ে দেখা দেয়। পরবর্তীতে অবহেলিত রূপে জেঁকে বসে জীবন-যন্ত্রণায়। পারিবারিক অবহেলা সবচেয়ে মর্মন্তুদ। অয়নের পায়ে ভর দিয়ে ভাই-বোনেরা অনেক লম্ফঝম্ফ করেছিল এক সময়। গোলের পর গোল দিয়েছিল মাঠের বাইরে। আজ অয়নের পা-ই কি ওদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আটকে দিচ্ছে? বড় ভাই তো সেদিন বলেই ফেলল, ‘বাংলাদেশে ফুটবল খেলে কেউ কিছু করতে পারছে এরকম নজির একটাও দেখাতে পারবি? পড়াশোনাটাও করলি না ঠিক মতো? তোর এই পা নিয়া আমরা এখন কী করব বল তো?’ অয়ন চলে যাচ্ছিল রুম থেকে। পেছন থেকে বড় বোনের কথা শুনতে পেল। ‘প্রতিবন্ধী কোটায় কোনো চাকরির ব্যবস্থা কি করা যায় না?’  মা বলল, ‘দেখ না ইউনিয়ন পরিষদে যেয়ে মেম্বারের সাথে কথা বলে। আমার এই পোলা তো ভিক্ষা ছাড়া আর কিছুই করতে পারব না।’ সম্বলিত দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কানে এল। পেছন ফিরে কথা শোনার আর কোনো মানে হয় না। পায়ে বিষাদ ভর করে চলে গেল খাদের কিনারে।

সেই বিকেলেই অদিতি আর কামালকে দেখল একসাথে। বিষয়টা খেলাবিহীন পরাজয়ের মতো লজ্জার। পা কেটে ফেলার পর অদিতি দুতিনবার এসেছিল। তখনও হয়তো প্রেম ছিল কিংবা প্রেমের আবেশ। তারপর তো বহুদিন দেখা নেই। বছরের হিসেবে প্রায় এক ছুঁয়ে গেল।। কোনো প্রেম কি এভাবে ভেঙে যায়? ভিন্নমত সামনে এসে বাক্যবাণ হয় নি, মান-অভিমান হয় নি—শুধু মাঠ থেকে একটি পা ঘরে চলে এসেছিল চিরদিনের জন্য। অথচ কী উত্তুঙ্গ বাসনা ছিল মনে! সঙ্গমের আবহ জেগে উঠেছিল দুজনের চোখে। সঙ্গম হলে অদিতি কি সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারত? একটা বা-পা জীবন নিয়ে কিভাবে খেলছে!

‘কেমন আছো, অয়ন?’

অতিদি কখন সামনে চলে এসেছে অয়ন লক্ষই করে নি। কামালকেও দেখা যাচ্ছে—দূরে, অথচ দৃষ্টিসীমার ভেতরে। দূরে দাঁড়িয়েও কামাল নিখুঁত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা রাখে!

‘ভালো আছি। এখন জীবনকে নিয়ে খেলা করছি।’

‘এসএসসি’র পর তো আর পড়াশোনা করলে না। আবার কি ভর্তি হবা ঠিক করছ?’

‘তুমি এখন কিসে পড়ছ, অদিতি?’

‘আমি তো ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে ফেললাম। সামনে ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করব।’

‘লেখাপড়া চালিয়ে যেও। সুশিক্ষা মানুষকে মহৎ করে। কামাল নিশ্চয়ই তোমাকে সহযোগিতা করবে। ’

‘তুমি কি আমার প্রতি রেগে আছো?’

‘আমি কারো প্রতি রেগে নেই। জানো, এই খাদটাকে আমি প্রচণ্ড ভালোবাসি। আর বটবৃক্ষের পাহারাকে ঈর্ষা করি। আসলে খাদের মতো পতন আর বটবৃক্ষের মতো জাগরণ আমার মধ্যে হঠাৎ করে এসেছে। এখন তো আমি অনেক ভালো আছি। নিজেকে চিনতে পেরেছি এবং মানুষকেও চিনতে পারছি।’

অদিতির মুখে ছায়া পড়ল। গোধূলি আসন্ন। অয়ন আকাশ আর অদিতির মুখ মিলিয়ে দেখে। ঘোর ছায়ার সম্ভাবনা রহস্যময় দুই চেহারায়। অদিতি দৌড়ে চলে গেল। একটু পর কি কান্নার আয়োজন হবে? দূরে দেখা যাচ্ছে বিকেলের পলায়ন। অয়ন লক্ষ করল, ওর চোখ থেকে চুরি হয়ে গেছে দুপুরের রোদ আর বিকেলের নরম আবহ।


খাদের কিনারে অয়নের জীবন উপস্থিত! ক্রাচটা পানিতে পড়ে গেছে। দেখা যাচ্ছে নিমজ্জমান-রূপ।


সন্ধ্যার বিদায়মুহূর্ত। চারদিক কালো হয়ে ঘন রাতের আয়োজন চলছে। বটতলায় বসে জীবনের হিসেব কষছিল অয়ন। পুরো জীবন পথ কিভাবে পাড়ি দিবে। পায়ের উপর ভর দিয়ে তো আর টাকা রোজগার করা যাবে না। জীবনকে চালিয়ে নেবার মতো আর কী পুঁজি আছে ভেতরে! একটা সময়ের পর পৃথিবীতে তো কেউ কারো নয়। তখন কিভাবে হবে বেঁচে থাকার আয়োজন। অন্ন জোগাড়ের মাধ্যম? পেট তো মনকে স্বস্তি দিবে না। অস্থির হয়ে যাবে মনের গতি-প্রকৃতি। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলার নাম কি জীবন?

ঘন অন্ধকার নিয়ে কামাল আচমকাই সামনে এসে দাঁড়াল। এ চেহারা তো স্বাভাবিক নয়। মানুষের স্বাভাবিক রূপ কি এমন হয়? অথচ কামাল অয়নের বন্ধু। নেংটা সময়ের বন্ধু। কত স্মৃতি মিশে আছে দুজনের যুগল কাঁধে। হাতে হাত রেখে, পায়ে পায়ে কত হয়েছে বিজয় উদ্‌যাপন।

‘অয়ন, তুই অদিতি আর আমাকে নিয়ে কী বলেছিস? ও কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি গেল কেন?’

‘আমি আবার অদিতি আর তোকে নিয়ে কী বলব? আমি আমাদের কথা বলেছি।’

‘তোদের আবার কী কথা?’

‘আমাদের তো অনেক কথাই থাকতে পারে। সে-সব কথা কি আমি তোকে বলব?’

অন্ধকারেই বোঝা যাচ্ছে কামাল ফুসে উঠছে ধীরে ধীরে। এ ফুসে উঠার কারণ কি আজকের ঘটনা! নাকি দীর্ঘদিনের রাগ, ক্ষোভ ভেতেরে পুষে রাখার বহিঃপ্রকাশ।

‘তোদের তো কোনো গোপন কথা থাকতে পারে না। নিজেকে আয়নায় কি দেখিস না ইদানীং?  ঠিক মতো দাঁড়াতে পারিস তুই?’

ভেতরটা কেঁপে উঠল অয়নের। দুঃখ, রাগ, ক্ষোভ জমা হলো। শক্ত হাতে ক্রাচ ধরল। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ‘আমি ভালোভাবে দাঁড়াতে পারি না তাতে কী? তাই বলে অদিতিকে নিয়ে পথ চলতে পারব না?’

সজোরে এক চড় এসে পড়ল অয়নের গালে। ধপাস করে পড়ে গেল বটবৃক্ষের দলবদ্ধ পা’য়। সেদিনের সেই ভয়াবহ রাত যেন ফিরে এল! আজও অন্ধকার ঘাতককে আড়াল করে ফেলল আলো থেকে। দু’ক্রাচের একটা গিয়ে পড়ল খাদে—আরেকটা কামালের পায়ের কাছে। কামাল স্থির চেয়ে আছে—কিরকম বেকে পড়ে আছে বিকলাঙ্গ খেলোয়াড়। অথচ অয়ন অতীতে ফিরে যেতে চায়। সেই বা-পা কোথায়? উঠে দাঁড়িয়ে একটা উড়ন্ত ফ্রি কিকে কামালকে খাদে ফেলে দেয়ার আক্ষেপ। অক্ষম অয়ন ব্যথিত, অপমানিত এবং লজ্জিতও। কামালের পায়ের কাছ থেকে একটা ক্রাচ তুলে নিয়ে বসল শিকড়ে। মাথা তুলে তাকাতে পারছে না। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে কি ফোঁটায় ফোঁটায়! জীবনে এ কোন পরাজয় নিয়ে হাজির হলো বা-পা। একি পায়ের প্রতিশোধ! এককালের হাততালি, উচ্ছ্বাস, প্রাপ্তিকে এখন চড়, লাথি আর অপমান দিয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছে! পায়ের আওয়াজ কানে এল। কামাল চলে যাচ্ছে পায়ে পায়ে। দূরে, দূরে, বহুদূরে। যেখানে পৌঁছানোর ক্ষমতা অয়নের নেই।

খাদের কিনারে অয়নের জীবন উপস্থিত! ক্রাচটা পানিতে পড়ে গেছে। দেখা যাচ্ছে নিমজ্জমান-রূপ। ক্রাচের মতো অয়নও বিলীন হয়ে যাবে। শূন্য জীবনকে বাঁচিয়ে রেখে কী লাভ! আত্মহন্তারক হওয়াই জীবনের জন্য ভালো। বিকল পা নিয়ে মানুষের পায়ে পায়ে ঘুরে ফুটবল হয়ে বাঁচা যাবে না সারাজীবন। জীবনকে পেছনে ফেলে অয়ন এক পায়ে ভর দিয়ে এগিয়ে যায় খাদের কিনারে।

মানুষের জীবনটাই এমন। সুখকে গিলে খাবে দুঃখ। নয়তো সুখ-দুঃখ মিলেমিশে থাকবে। চিরসুখে মানুষ পুরোটা জীবন যাপন করেছে এরকম নজির দুষ্প্রাপ্য। অয়ন সেদিন চলে এসেছিল মৃত্যুর কিনার থেকে। মৃত্যুকে দেখা কিংবা মৃত্যু নিয়ে ভাবনা সহজ হলেও মৃত্যুতে মিশে যাওয়া খুব কঠিন। এক ক্রাচে ভর দিয়ে লাফাতে লাফাতে বাড়ি পৌঁছেছিল বিক্ষিপ্ত মনে। পরিবারের সবাই দেখেছিল করুণ এক চিত্ররূপ। সবার কৌতূহল নিবৃত্ত করে নিশ্চুপ ছিল। জীবনকে এখন ও সত্যিই উপভোগ করতে চাইছে। মানুষকে চিনছে ও—মানুষের হাঁটা দেখছে প্রতিনিয়ত। কত দ্রুত মানুষ পার হয়ে যাচ্ছে অয়নের কাছ থেকে। এমনকি ওর ভাবনার জগৎ থেকে।

পরদিন সকালেই ইউনিয়ন পরিষদে যাওয়ার কথা ছিল। একদিন পরে গিয়েছে আরেকটি ক্রাচ ক্রয় করে। এক্ষেত্রেও ছিল মানসিক পীড়ন। ইউনিয়ন পরিষদে যেয়ে হাত জোর করার ভঙ্গিমায় বসে থাকতে হয়েছে। এক প্রতিবন্ধী ফুটবলার! কেন, কিভাবে প্রতিবন্ধী হলো সে ভাবনা এখন অবান্তর। কে করবে বিচার? এখন সরকারি তহবিল থেকে নিয়মিত কিছু ভাতা দিলেই কি সব দায়িত্ব শেষ? ফিরতি পথে বাড়ির পথে একাই আসতে হয়েছিল। পড়ে গিয়েছিল রাস্তায়—অস্থির পদক্ষেপে। সত্তরোর্ধ্ব এক দাদু অয়নকে টেনে তুলে। এরই নাম জীনব! অয়ন হাসে আত্মার গভীরে যেয়ে।

এখন ও মাঝে মাঝেই আকাশের দিকে তাকায়। সৃষ্টিকর্তা নাকি পৃথিবীতেই অন্যায়কারীর শাস্তি দেন। অথচ অয়নই শুধু শাস্তি পেয়ে যাচ্ছে। অয়ন এখনও বটতলায় গিয়ে বসে। প্রতিনিয়ত খাদের কিনারায় যায় পতনের গভীরতা দেখতে। এখন অন্যদিকেও কিছুটা সময় কাটাতে চায়। মাঝে মাঝে ক্যারাম খেলে। ক্যারাম কি শুধু হাতের খেলা? বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে খেলতে পারে না। স্ট্রাইক দিয়ে টান মেরে হিট করতে পারে না। শেষ সময়ে এসে খেলায় হেরে যায়, জীবনের মতো। অন্যান্য শারীরিক পরিশ্রমের খেলা তো স্বপ্নের অতীত হয়ে গেছে। এ বছরের ফুটবল টুর্নামেন্টের কোনো খেলাই অয়ন দেখতে যায় নি। বরাবরের মতো এবারও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। কামালের হাতে উঠেছে গোল্ড কাপ। পুরো গ্রাম উদ্‌যাপন করেছে। অথচ অয়ন খুশি হয়েছে কিনা ও নিয়েই বুঝতে পারে নি। তবে স্বস্তি পেয়েছিল। গ্রাম তো মায়ের মতো সুন্দর। এ সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে হয় অন্তর থেকে। তবু কামালের হাতে গোল্ড কাপ দেখে ও কিছুটা চমকে গিয়েছিল বৈকি! মিছিল নিয়ে কামালের অগ্রযাত্রা দেখে ও বা-পায়ের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে ছিল। তারপর হাসি দিয়ে চেয়ে ছিল অসীম আকাশের দিকে। সেদিনের আকাশ ছিল মেঘলা।

বেশ কিছুদিন যাবৎ অয়নের কানে আসছিল দু’গ্রামের দ্বন্দ্বের কথা। ফাইনালে পরাজিত দল নাকি আয়োজক কমিটির উপর অসন্তুষ্ট। খেলার পরও খেলার রেশ থেকে গেল। কিছুদিন যেতে না যেতেই চরম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ল দু’দলের কিছু খেলোয়াড়। প্রথমে তর্ক, তারপর ধক্কাধাক্কি, একদিন শোনা গেল কামাল প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়কে প্রচণ্ড মেরেছে। কামালরা এভাবেই চিরদিন জিততে চায়। মাঠে এবং মাঠের বাইরে।

সেদিনের সন্ধ্যা বৃষ্টি দিয়েই শুরু। আকাশের শরীরে হরেক রঙের খেলার আয়োজন। কী উত্তাপ আকাশের পানিতে। প্রকৃতির প্রলয় নাচ শেষে কিছুটা স্বস্তির হাওয়া। অয়ন বাড়িতে বসে থাকবে কতক্ষণ! বটতলায় এসে বাতাসের ঘ্রাণ নিবে, পাতার ঝরা পানি শরীরে মেখে শীতল হবে—প্রকৃতির এ আনন্দটুকু স্বস্তির। এখন জীবনের ্প্রতি এই তো ওর চাওয়া। রাতের আয়োজন চলছে, অথচ পুরো গ্রাম নীরব হয়ে বসে আছে। মানুষজন বাড়ির আরাম ছেড়ে আজ হয়তো আর বেরও হবে না।


কামালের শূন্য শরীরের সামনে অয়নের ডান পা-টা আজ পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠছে।


একটা চিৎকার! আবারও! খাদের কিনারে এবার মরণ চিৎকার! মৃত্যুর পদধ্বনি? ক্রাচে দ্রুত ভর দিয়ে এগিয়ে গেল অয়ন। ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে শরীর। কিছুক্ষণ পূর্বে মাটি আর পানির যুদ্ধে কাদায় মিয়ে আছে পথের কলঙ্ক। খাদের কিনারে পৌঁছতে পৌঁছতে অয়নের শরীর একেবারে দুর্বল হয়ে গেল। কামালের চিৎকার। আবছায়াতেও দেখা যাচ্ছে পেটের নিচ থেকে রক্তে ভেসে যাচ্ছে শরীর। চাকু মেরে ফেলে রেখে গেছে নিশ্চিত। কামাল  শুধু বলেতে পারছে, ‘বাঁচা, বাঁচা, অয়ন।’ বার বার বলছে। সেই দ্বন্দ্ব, খেলা, জীবন নিয়ে খেলা। প্রকৃতির ব্যবহারও আশ্চর্যজনক। আবারও সেই অন্ধকার। অয়ন স্মৃতিতে জেগে ওঠে। মাথার সেই আঘাত! পায়ের রগ কাটা! আকাশ কাঁপানো চিৎকার এবং পা-হীন শূন্য জীবন।

অতঃপর আরেকটি অন্ধকার দিন। সজোর এক চড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়া। ক্রাচ খাদে গিয়ে তলিয়ে যাওয়া। এ সেই খাদ। আজ খাদের কিনারে শিকড় আকড়ে ঝুলে আছে কামালের নিথর দেহ। রক্তক্ষরণ চলছে আর কিছুটা সময় পরেই হয়তো লুটিয়ে পড়বে যাবতীয় মোহ নিয়ে। অয়ন কি ডান পায়ের সজোর লাথি মেরে ফেলে দিবে শূন্য জীবনের এ শরীরকে। কেমন পরগাছার মতো ঝুলে আছে। অয়ন আকাশের দিকে তাকায়, দেখে ঝিলিকের পর ঝিলিক। অদূরে দেখা যাচ্ছে দুজন লোক। লোকদুটো কে? আসার আগেই লাথি মারবে কি? কামাল বারবার বলে যাচ্ছে, ‘অয়ন, বাঁচা, বাঁচা। কামালের শূন্য শরীরের সামনে অয়নের ডান পা-টা আজ পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠছে। কী এক উদ্দাম উন্মাদনা! ভেতরে জাগছে অসীম ক্ষমতা। আচমকা বিদ্যুৎ চমকালো। চোখ আবারও আকাশে—পরিষ্কার—উজ্জ্বল হাসি দিয়ে তাকিয়ে আছে অয়নের দিকে।

লোকদুটো ভিন্ন পথ দিয়ে দূরে চলে যাচ্ছে। দৃষ্টির আড়ালে। এদিকে কামালের হাত আর শিকড় আকড়ে ধরে থাকতে পারছে না। অয়ন চিৎকার দিয়ে লোকদুটোকে ডাকল। ক্রাচদুটো রাখল নামিয়ে। অতঃপর বটবৃক্ষের একটা শিকড় দুহাতে নিবিড়ভাবে জাপটে ডান পা-টা নরম করে বাড়িয়ে দিল কামালের দিকে।

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৮৪, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ। কবি ও কথাসাহিত্যিক। ঢাকা সিটি কলেজ থেকে মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই —
অদৃশ্য আলোর চোখ [গল্পগ্রন্থ, অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি, ২০১৮]

সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘শীতলক্ষ্যা’।

ই-মেইল : joychironton@gmail.com