হোম গদ্য গল্প উপেন বাবুর হাঁস

উপেন বাবুর হাঁস

উপেন বাবুর হাঁস
261
0

খুবই ব্যক্তিগত কারণে দ্রুত বিয়ে করল দুজন। ইতোমধ্যে দুজনেই এমএ পাসও করে ফেলেছে। রেজাল্ট বেরোনর উনিশ দিনের মাথায় রাজগঞ্জে একটা প্রাইভেট কলেজে অধ্যাপনার চাকরিও পেয়ে গেছে অতনু। কিন্তু  বিয়ের পরও  আইএএস-এর শেষ ল্যাপের প্রস্তুতির জন্যে বিবাহোত্তর সমস্ত ‘সখ-আহ্লাদ’ থেকে ওকে  মাস তিনেক বঞ্চিত  রাখল। তার পর হঠাৎ একদিন হিস্ট্রিক্যাল অ্যাটলাসে মগ্নতা থেকে ভাবুক নাকি বিভ্রান্ত চোখদুটো তুলে, ওদের সমস্ত যৌথ স্বপ্নের বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে দিয়ে প্রতারক অতনু বলল, ‘চল বী, চলো একটা সিনেমা দেখে আসি’। বী তো আকাশ থেকে  পড়ল। ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘সিনেমা? মানে? আর উনিশ দিন পর পরীক্ষা! পাগল হলে নাকি?’ অতনু বলল, ‘চল তো! মনে নেই, এম. এ. পরীক্ষার সাত দিন আগে হার্ডির ‘টেস’ পড়েছিলাম?’

‘কিন্তু তখন তো বলতে, আমি মাস্টারি করতে জন্মাই নি; আমি আইএএস করব। ফলে এমএ পরীক্ষায় চারটে বাড়তি পারসেন্ট নিয়ে মাথা ঘামাই না। আর এখন তো তোমার সেই সাধের আইএএস-ই সামনে।’

‘কিন্তু এখন তো বিয়ের খাতিরে সেই মাস্টারিই করছি। আর তখন তো আর কাগজে এই খবর পড়ি নি।’

সতের বছর থেকে শুরু হওয়া সাত বছরের প্রাক্-বিবাহিত প্রেমের সূত্রে বী অতনুর মনের গতি-প্রকৃতির সাত সতের সবই জানে। জানে খবরটা সকাল থেকেই অতনুকে জ্বালাচ্ছে। খবরটা আর কিছু নয়। চুয়াত্তরের টালমাটাল দিনে এক জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিরস্ত্র জনতার উপর গুলি চালাবার অর্ডার দিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আর স্বভাবে আক্রমক কিন্তু প্রগাঢ় শান্তিবাদী অতনু, যে কিনা হাতে ডামি বন্দুক-সঙ্গিনও ধরবে না বলে কলেজে এনসিসি-তে পর্যন্ত নাম না দিয়ে বিপদে পড়েছিল; আর সব সময়ে বলে লিবার্টির প্রতিবন্ধক দূর করা ছাড়া সমাজবিজ্ঞানের কোনো লক্ষ্য নেই, সে সকাল থেকেই মন মরা। ফলে হতাশ বী বলে, ‘তাহলে চলো’। আর একটা হিন্দি সিনেমার কোডোপাইরিন গিলে ফেরার সময়ে অতনু ঘোষণা করে, ‘চলো গিয়ে লাগি গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার কাজে’।

 ‘মানে!’

‘আবার “মানে”? মানে আইএএস ইমতেহান আর দেবো না, বুঝলে সখী! চলো যাই,  রাজগঞ্জে কিংসলি আ্যামিস-এরলাকি জিম-এর নায়ক বনে যাই।’


ভালো আর খারাপ লাগার কারণগুলো এমন পাশাপাশি, জড়িয়ে মিশিয়ে থাকে যে একটু বিভ্রান্তও লাগে মাঝে মাঝে।


সাত বছরের প্রাক্-বিবাহ প্রেমের সূত্রেই বী খুব ভালো করে জেনে গেছে যে অতনু ওর কথায় কথায় ইংরেজি সাহিত্যের রেফারেন্স আর আ্যলিউশন দেওয়া কোনোদিন ছাড়তে পারবে না। বুদ্ধদেব বসুর ‘বৌদ্ধ’ ভক্তদের এটাই প্রবলেম। এর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে আশৈশব এর জন্যে তৈরি হয়েও ওর ইংরেজি না পড়তে পারার গভীর বেদনা। বী কন্সট্যান্ট সঙ্গগুণে এই আ্যলিউশনগুলোর খোসা ছাড়াতেও শিখে গেছে। স্তম্ভিত হয়ে বোঝে আইএএসও এবার গেল। এখন প্রতারক তাকে নিয়ে যাবে রাজগঞ্জের ওই মফস্বলের কলেজে। ওই লেখাপড়া আর ক্ষমতা নিয়ে গ্রামের কলেজে প্রথম প্রজন্মের ছাত্রদের পলিটিক্যাল সায়েন্স পড়িয়ে নিজের মানবজন্ম  সার্থক করবে, আর তার জীবনেরও বারটা বাজাবে। অথচ ওরই জন্যে একসময় এমবিবিএস ডাক্তার, চার্টার্ড আক্যাউন্ট্যান্ট আদি শহুরে আ্যডমায়ারদের প্রেমনিবেদন উপেক্ষা করেছে বী। ওদের একজনকেও বাছলে আর কিছু না হোক কলকাতায় তো থাকা যেত। পাওয়া যেত স্বচ্ছল, মসৃণ শহুরে জীবন, কফি হাউসের আড্ডা, বে কাফেতে বসে গঙ্গা দেখা, কবিবন্ধুদের সঙ্গে বিয়ার পান। তার জায়গায় এখন ধ্যাদ্ধেড়ে এক গ্রামে যেতে হবে। সহায় সম্বলহীন, গরিব বাবার আর্থিক উত্তরাধিকারবিহীন আদুরে নবম সন্তানের ঘরে, যে নাকি এমন বেয়াক্কেলে যে এর জন্যে বিন্দুমাত্র কৃতজ্ঞতাও নেই। থাকবে কী করে! ক্লাস টেন পর্যন্ত গ্রামে থাকা গরিব ঘরের ছেলে শহরের সচ্ছল পরিবারের মেয়ের গ্রামে থাকার দুঃখ কেমন করে বুঝবে? বয়সে পর্যন্ত এক বছরের ছোট। ওর এক দিদি এ নিয়ে অনেক জল ঘোলা করলে  অতনু চোখ মটকে বলেছে, ‘দিদি, বাড়ির বড় ছেলে বাবার জন্যে অনেক করার পর অতিষ্ঠ  হয়ে বাবাকে কী বলে জানিস? বলে, আমি কি সারা জীবন শুধু “করেই” যাব? দিদি প্লিজ বোঝ কথাটা! আমারও ওটাই কথা। আমিও কি সারা জীবন খালি “করেই” যাব?’ আর বী একই কথা তুললে বলে, ‘শোনো, টিশিয়ানের পক্বযুবতী, একটু বোঝ? বয়সে একটু  বড় না হলে ওটা ঠিকঠাক হয়? ‘বাবুঘাটের কুমারী পোনা’’ খারাপ নয় ঠিকই, কিন্তু একটু মধ্যবয়সী রুই কি আর একটু সুস্বাদু  হয় না? নইলে আর ঠাকুর পরিবারে বৌদিদের এত রমরমা ছিল কেন? রবীর কাদম্বরী, জ্যোতির জ্ঞানদানন্দিনী!’ আর তার পর ওই দিদিরই বরের ‘লাইন’ আওড়ায়, ‘চুলে তোমার যতই ধরুক পাক,/ আমি তোমার বশংবদ হয়ে,/ কাটিয়ে দেবো তোমারই আশ্রয়ে।/ সারাজীবন, আঁধার সাক্ষী থাক’।  কিছুই করবার নেই। মুখটা অসম্ভব গম্ভীর করতেই হয়, কারণ  ঠকটা নইলে বুঝে যাবে যে তাকে ছাড়া বী-র উপায়ই নেই। বাঁচবেই না।  কোনোভাবেই ওকে সেটা  জানানো চলবে না। ভাও বেড়ে যাবে।

গিয়ে কিন্তু অতটা খারাপ লাগে না বী-র। রাজগঞ্জ জায়গাটা মফস্বল শহর নামেই। আসলে একটা আধা গ্রাম, আধা শহর গঞ্জ। কিন্তু তিনটি জেলার মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় ধনী বাণিজ্যকেন্দ্র। এক বিখ্যাত দামাল নদ আর ততোধিক বিখ্যাত নদীর মাঝখানে তার স্থিতি। একদিন বী জিজ্ঞেস করে  ফেলেছিল, ‘নদ আর নদীর তফাৎ কী। একটাকে নদ আর একটাকে নদী বলে কেন? নদ কি বেশি দুরন্ত, আর নদী কি বেশি নাব্য?’ নাই-বা জিজ্ঞেস করবে কেন?  অতনুকে সে কবে থেকেই সব কিছু যাচাই করে নেওয়ার ঠাঁই বলে ঠাউরে রেখেছে। নইলে আর এমবিবিএস আর সিএ-দের ছেড়ে এই পাগলের  হাতে ধরা দেবে কেন? কিন্তু অতনুকে হাড়ে হাড়ে চেনে বলেই বোঝে যে কোথাও প্রশ্নটার মধ্যেই একটা গণ্ডগোল রয়ে গেছে। নইলে অতনু এরকম একটা উচ্চাঙ্গের হাসি দেবে কেন! অতনু বলে, ‘গুরু, গুরু! এই না হলে বী! একেবারে তিনে দুই মেরে দিয়েছ। নদ তো দুরন্ত, দামাল বটেই। আর নদীও তো বেশি শান্ত নাব্যই। তবে আর স্ত্রীলিঙ্গে পুংলিঙ্গে অসুবিধে কী? নাব্য আমার বী, কে চায় পরস্ত্রী!’ ‘তাহলে উত্তরে দুই কেন দেবে, তিন নয় কেন? মাস্টারি পেয়েছ?’, বী রাগ দেখায়। ‘কারণ অবজেক্টিভ প্রশ্নের শেষ তিন নম্বর উত্তরটাই বাদ দিয়েছ।’ ‘কী সেটা?’ অতনু এক চোখ টিপে বলে, ‘কী আর! যতই দামাল হোক না কেন, নদ শেষে নদীর মধ্যে ঢোকে যে!’ বী বলে ফেলেছিল ‘নদ নদীর মধ্যে ঢোকে? কিভাবে?’ রহস্যময় হাসি হেসে অতনু বলে, ‘এর জন্যে তো ম্যাপ লাগবে! ম্যাপ কোথায় পাই? রাত্রে নিয়ে আসব?  যাকগে, দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে কাছে এসো একটু, আপাতত ম্যাপ ছাড়াই নয় খানিকটা বুঝিয়ে দিই!’ এতক্ষণে বী নিজের বোকামি বোঝে, আর মুহূর্তে সরে যায়। অত্যন্ত অসভ্য অতনুটা!

সে যাই হোক, অতনু তার স্বাভাবিক নিয়মেই বাড়ি ঠিক করেছে ‘টিচারপাড়া’ নামের এক পল্লিতে, সব ধারের সব চেয়ে খারাপ বাড়িটাতে। এই পাড়ায় নতুন নতুন একতলা ‘কোঠাবাড়িতে’ মাস্টারমশাইরা ছাত্রদের সকালে-বিকালে ‘প্রাইভেট’ পড়ান। ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস টেনের বাংলা-ইতিহাস-ভূগোলের আওয়াজে মুখরিত, গুঞ্জরিত হয়ে থাকে শিক্ষকপল্লি। অতনু বলে হরাইজন্ট্যাল নালন্দা। মাস্টারদের আঞ্চলিক ডায়াস্পোরায় মর্যাদাবৃদ্ধির আগে অবশ্য জায়গাটার নাম ছিল ‘শুওরডাঙা ’। এখনো পাড়ার সামনের দিকটায় একান্তে মেথররা থাকে তাদের ঝুপড়ি, ন্যাংটো ছেলেমেয়ে আর শুয়োরের পাল নিয়ে। অ্যাম্বিয়েন্স হিশেবে খুব ভালো নয়। কিন্তু অতনু আর তার বী নাম্নী মধুকরীর এখানেই আস্তানা, মাস্টারপাড়ারও প্রত্যন্তে, তেপান্তর সদৃশ মাঠের একেবারে ধারে, উপেনবাবুর বাড়িতে। বী-র এখানে যতটা ভালো লাগে, ততটাই খারাপ লাগে। আর ভালো আর খারাপ লাগার কারণগুলো এমন পাশাপাশি, জড়িয়ে মিশিয়ে থাকে যে একটু বিভ্রান্তও লাগে মাঝে মাঝে। বিচ্ছিরি লেগেছিল প্রথমেই বাড়িটা দেখে। বলা ভালো বাড়িটা দেখে বী দারুণ ধাক্কা খেয়েছিল। উত্তর কলকাতায় টালা পার্কের এধারে চিৎপুর ইয়ার্ডের রেল লাইনের পাশে বিশাল অর্ধগোলাকার একটি তিন তলার সমান উঁচু, ইটালিয়ান মার্বেলে মোড়া বাড়িতে থেকে অভ্যস্ত বী উপেনবাবুর বাড়ি দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। ছিরিছাঁদহীন দুটি ঘর, এক ফালি বারান্দা, তারই এক পাশে টালির চালের রান্নাঘরের এক্সটেনশন। দুতলায় ঠিক একই কাঠামো। তফাতের মধ্যে দুতলায় টালির চালের রান্নাঘরের এক্সটেনশন নেই, থাকলে ঝুলন্ত উদ্যানের মতোই ঝুলন্ত কিচেন হয়ে যেত। সিঁড়ির ল্যান্ডিং এর এক পাশেই মেসোমশাই মাসিমাদের রান্নাঘর।

একতলায় ঘরের মধ্যে চার দিকের অসমান দেওয়ালে চুনকাম, আগের বারের চুনকামের দাগ ঢাকতে পারে নি। এমনকি রং করার ফেঁসোর পোঁচগুলোও রয়ে গেছে। আলকাতরা মাখানো আমকাঠের জানলার সঙ্গে ম্যাচ করা কালো কালো আড়াআড়ি কাটা দুটি কড়ি বরগা সিলিংটাকে চার টুকরোয় ভাগ করে দিয়েছে। বাইরের দেওয়ালে প্লাস্টারের থেকে ঝুরঝুর করে বালি ঝরে পড়লেও কিচ্ছু এসে যায় না উপেনবাবুর। বী-র খুব ভালো লাগে তাকে। পুব বাংলা থেকে উন্মূল হয়ে আসা রিটায়ার্ড প্রাইমারি স্কুলের টিচার। লম্বা, কালো, দোহারা চেহারা। হ্যান্ডলুমের পাঞ্জাবি আর মিলের ধুতি, একদিনের না কামানো খোঁচা দাড়ি আর সদাতুষ্ট, হাস্যময় মুখ নিয়ে মিষ্টি বুড়ো। বড় ছেলেটি বিয়ের পর সব গুছিয়ে নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে। মেজটি রিষড়ায় এক জুট মিলে আ্যপ্রেন্টিস। একটিই মেয়ে, কালো আর মুখ-ভর্তি আব বা টিউমার। সেজ ছেলেটি অতনুর কলেজেই বিকম পড়ে। আর একদম  ছোট্টটি স্কুলের ছাত্র। কিন্তু এই ভারগ্রস্ত বৃদ্ধের অমলিন হাসি তাতে একটুও কমে নি। অতনুকে সম্বোধন করেন, ‘মাস্টারমশাই’, আর বী-কে ‘বউ মা’। যখন অস্তসূর্যের আলোয় মেটে উঠোনে দাঁড়িয়ে অতনুকে আর তাকে বোঝাতে বসেন যে সব চেয়ে ভালো আর মজবুত গাঁথনি হয় ‘ওয়ান-ইজ-টু-এইট’ অর্থাৎ এক বস্তা সিমেন্ট আর আট বস্তা বালিতে, যদি ঠিক মতো ‘কিওরিং’ হয়, তখন কয়েকটি ঝুরঝুরে বালি যেন নেমে এসে তাকে সোৎসাহে সমর্থন জানায়। বী-র মনে পড়ে যায় নিজের চাকরি জীবনে সাহেবি পোশাক পরা আর এখনকার ফিনলের ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি আর একশ কুড়ি সুতোর ধুতি পরা, হাঁকডাক করা বাবার কথা। কিম্বা নিঃস্ব আর সেরিব্রাল শ্বশুরের কথা। কত তফাৎ তিন বৃদ্ধের। কিন্তু তিনজনেই বাবা। ভদ্রলোককে শ্বশুর ভাবতে একটুও অসুবিধে হয় না তার। অসভ্য অতনুটা যদিও সায় দিতে দিতে ওর চোখের আড়ালে বুড়ো আঙুল দিয়ে দেওয়াল ঘষে বেশ খানিকটা বালি তুলে ফেলেছে। তবুও মেসোমশাই যখন উপদেশ দেন, ‘বউ মা, মাস্টারমশাইকে কয়ে দিও টাকা নষ্ট করার জিনিশ নয়, একশ টাকা উপায় করলে অন্তত দশ টাকা সঞ্চয় করতে হবেই’, তখন বী মাথা নাড়ে, যদিও জানে খেয়ালি অতনু এই গেঁয়ো মাস্টারের চাকরি বেশি দিন করবেও না, আর সঞ্চয়ের এই বিধান ওদের মানার প্রশ্নই নেই। কিন্তু তবু যেমনি ভালো লাগে মেসোমশাইকে, তেমনই ভালো লাগে মাসিমাকে। পতিগতপ্রাণা, অভিযোগহীনা বৃদ্ধা। ভালো লাগে ওদের মেয়েটিকেও। অসুন্দর, কিন্তু  বী-র জানা যে কোনো সুন্দরী শহরিণীর চেয়ে মহৎআর উদার। ছেলেদুটি যেমন সিধে তেমন সরল। ভালো লাগে ওদের সদাসন্ত্রস্ত ভাব। কী করে এই শহুরে, সুন্দরী বউদিটির মনস্তুষ্টি করবে তাই নিয়ে সদাই ভাবিত।


ইচ্ছে করেই জল খেয়ে শাড়িব্লাউজ ছেড়ে, বিয়েয় কেনা দামি, স্বচ্ছ অন্তর্বাস পরে পাশে শোওয়ার সময় বী একবার আড় চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কী, প্রোফেসর সাহাব! অমৃতে অরুচি কেন আজ?’


সব চেয়ে ভালো লাগে অবশ্যই অতনুকে। যদিও সব চেয়ে খারাপও লাগে সব ব্যাপারে ওর উচ্চাঙ্গের হাসি। গা জ্বলে যায়। বলে, ‘কি সখী, খারাপ লাগছে না তো? যতই স্বীকার না করো। লাগবে কী করে? এমনি এমনি কি মাইকেল সীতাকে দিয়ে সরমাকে বলালেন, ‘ “সখী, ছিনু মোরা সুখে,/ নাম পঞ্চবটী, মর্তে সুরবন সম।” রাজান্তপুরে প্রোটোকলে বন্দিনী যুবরানি বনে এসে প্রথম চার শাশুড়ির শাসনের বাইরে অবাধ স্বামীসাহচর্যের স্বাদ পেলেন। সঙ্গে ফাউ হিশেবে সুদর্শন দেবর লক্ষ্মণের মনোযোগ। ফলফুলুরি, কন্দমূল, মৃগয়ার পশুমাংসে এমনিতেই সকলে আতপ্ত। ফলে প্রভু শ্রীরাম কামে চটকপক্ষীর ন্যায় কাতর। সীতাকে নিরন্তর রমণের বাসনা। সীতার তো পোয়া বারো। ঘরে তৃষার্ত স্বামীর আদর। বাইরে ভয়ার লক্ষ্মণ দেবর। পঞ্চবটীকে সুরবন লাগবে না সীতার? তোমারও লাগবে গুরু। একটু সবুর কর।’ বী বিরক্তির ভাব দেখায়। তবু নিজের কাছেই অস্বীকার করতে পারে না যে সুরবনসম না মনে হোক, জায়গাটাকে খারাপ লাগছে না। তার কারণ অনেক। একটা অবশ্যই অতনু। বিয়ের আগে আট বছরের প্রেমে রোজ বিদায়ের সমাপ্তি আর নেই। একটু শারীরিক সঙ্গ পেতে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে ভর সন্ধ্যের গড়ের মাঠ দিয়ে পার্ক স্ট্রিটের গান্ধীমূর্তি পর্যন্ত বিপজ্জনক পদযাত্রা করতে হয় না, কেবল এই জন্য যে বী-র গয়া পাউডার মাখা বুকে ডান হাতটা ঢুকিয়ে অতনু আপন মনে বাংলা ছন্দের গোত্র বিচার করতে করতে এই দীর্ঘ অন্ধকার পথ পাড়ি দেবে। এখন  অতনু সারাদিন ওর। আর ছাড়াছাড়ি নেই। নেই প্রতিদিনের অসহ বিরহ। তাছাড়া অতনু মুহূর্ত তৈরি করতে জানে। ভরা মাঘে রাজগঞ্জে শীত কর্কটক্রান্তি রেখার কারণে আরো দুঃসহ। কিন্তু তার ফলেই রাতের খাওয়ার পর মাঠের একেবারে ধারে উপেনবাবুর ছোট্ট পুকুরটির এক পাড়ে দেবরদের ডাকে গিয়ে খেজুর গাছের জিরেন কাঠের রস খেয়ে ওরা যখন শুতে আসে তখন চোখেই পড়ে না যে উপেনবাবুর কালো কালো আড়াআড়ি কাটা দুটি কড়ি বরগা সিলিং-এর মাঝখানে ফাঁকা দোদুল্যমান ‘এস’-টায় কোনো ফ্যান ঝুলছে না। কেননা অতনু এখনও একটা ফ্যান কিনতে পারে নি। তাতে অবশ্য কিছুই আসে যায় না এই ঘোর শীতে। একটাই ভারী লেপের নিচে শুয়ে গালে অতনুর দাড়ির ঘষা আর বুকে, পেটে  অতনুর অস্থির হাতের অনুভূতি খেতে খেতে যখন দুজনের শরীরের ওমে মাঘের শীত বাঘের মুখে পড়ে, আর অতনু কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, ‘চলবে আরেকটু জিরেন গাছের রস? তখন ঘুম জড়ানো চোখে বী বলে— ‘ন্‌না, প্লিজ, আজ আর নয়’। ঘুমোতে চায় বী। কারণ কয়েক ঘণ্টা বাদেই অতনুর গা থেকে সরে যাওয়া লেপ ঘণ্টায় ঘণ্টায় গায়ে তুলে দিতে হবে। আর ঘুমের চোদ্দটা বাজবে। তার পর আছে ঘুমের মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে অতনুর গায়ে পড়া। আর ও ঘুমোলেও ওর হাত দুটো তো ক্রনিক ইনসমনিয়াক!

সুরবনে বী-র প্রেমে সহায়ক শুধু প্রকৃতি নয়, মানুষ, এমনকি প্রাণী। কতকিছু যে আছে যা ‘টার্ন অন’ করে দেয়।  অতনু তো অতনুই। সারাদিন কবিতা আওড়ায়, ইয়েটস থেকে জয়দেব। সন্ধে হলেই স্টিফেন স্পেন্ডারের সম্পাদিত এরটিক ভার্স বা ভারতচন্দ্রের কবিতা থেকে মণিমুক্তো। আর তার গা গরম করিয়ে দেওয়া ব্যাখ্যা। কলেজটাও মজার। সকালে ভাগের পার্টটাইম ক্লাস একটা বা দুটো। সেরে বাড়িতে আসে জলখাবার খেতে। আবার ভাত খেয়ে কলেজে যাবে। বিকেলে  বউকে নিয়ে কলেজপাড়ায় আড্ডার পর আবার ক্লাস। সন্ধের মুখে আবার ভাগের পার্টটাইম, তার পর অজয়ের নৌকা ফেরিতে একবার উঠার পর আর না নেমেই অবিরত  পারাপার, কিম্বা রিকশায় কোনো সহকর্মীর বাড়িতে উদ্দাম আড্ডা। এর মধ্যে খিদে পেয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘নিশ্চয়! আগুন জ্বলছে! প্রিয়ে চারুশীলে, মুঞ্চ ময়ি  মানমনিদানম্।/ দহতি ময়ি দারুণো মদনকদনাললো।’ এমন রাগ হয় না! তার পর নিঝুম রাত নটায় দুজনে টর্চ হাতে বাড়ি ফিরে রান্নায় হাত দেওয়া। অতনু এসেই সেদ্ধ গোবিন্দভোগের ভাত চড়িয়ে দেয়। বী ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলে, ‘দাঁড়াও, শাড়িটা ছেড়েই আসছি’। অতনু আরো চেঁচিয়ে মাসিমা-মেসোমশাইদের ঘুম প্রায় চটকে দিয়ে বলে, ‘ছাড়ো, কিন্তু আর পরতে হবে না’। তার পর খাওয়া, শুয়ে পড়া। দেশলাই বাক্সের সৃজনশীল ব্যবহার। এমন কামুক যে রাত্রে গায়ে একটু পা লাগলে বলে, ‘আহা! আর একটু বোলাও না!’ জামাইবাবুর কবিতা আউড়িয়ে শোনায়, ‘আহা, পায়ের পাতায় এত স্নেহ!’ বলে, ‘আমাকেই হতে হবে নতুন বীচরণচারণচক্রবর্তী।’

প্রকৃতির অ্যাফ্রোদিসিয়্যাক খেলা আরো আছে। শীত বিদায় নিয়েছে। উপেনবাবুর বাড়িতে অ্যাটাচ্‌ড বাথের কনসেপ্ট-ই নেই। উঠোন পার হয়ে যেতে হয় পায়খানা, কলঘরে। দুটো পাশাপাশি ন্যাড়া ইঁটের খুপরি। দুটোরই সামনে আর একটা মাপসই ইঁটের দেওয়াল। সেটাই আব্রু ছিল। বী তো দেখে আগুন হয়ে গিয়েছিল। তবে পরে ওদের খাতিরে উপেনবাবু দুটোতেই আলকাতরা মাখানো টিনের দরজা করে দিয়েছেন। একদিন সেখানে বী দেখে দুটো সাপ গা জড়াজড়ি করে পাকিয়ে আছে। প্রাকৃতিক ক্রিয়াকর্ম মাথায় ওঠে। আঁতকে উঠে ছুটে এসে অতনুকে জড়িয়ে ধরে বী, ‘ইস! গিয়ে দেখ! কলঘরে দুটো সাপ জড়াজড়ি করে কী যেন করছে?’ অতনু দেখে আসে উদ্বিগ্ন মুখে। কিন্তু ফিরে ওর কোমর জড়িয়ে মুচকি হেসে বলে, ‘শঙ্খ বেঁধেছে, সখী, শঙ্খই বেঁধেছে। আর কিছুই নয়। কিছুই  করবে না। মা নিষাদ … যৎ সর্প মিথুনাদেকমবধি কামমোহিতম্। শীতঘুমে অনেক দিনের উপোসী না? আর  তুমি আমি কি শীতেই বাঁধি নি শঙ্খ? এখন কি সকালেই আবার বাঁধবা?’ এই বলে বী-কে তুলে  নিয়ে বিছানায় ফেলে’ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ায়। নিশ্বাস ক্রমশই ঘন হয়ে ওঠে দুজনের। আলগা হয়ে এলিয়ে পড়ে বী-র শাড়ির আঁচল। আর কিছুর খেয়াল থাকে না। সাপ দুটোর মতোই লকলক করে দুজনের জিভ। অতনুর শরীর যতই শক্ত হয়ে ওঠে, ততই শক্ত হয়ে ওঠে বী-র বুকের বোঁটা আর তার চার দিকের অ্যারিওলাগুলি। কোথায় আবার যেন তেমনই কোমল, নরম, পিছল হয়ে ওঠে কোনো প্রত্যঙ্গ। প্রাণপণে দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে’ কী খুঁজতে চায়? কিন্তু তারপর সম্বিত ফিরে পেয়ে বী যখন শাড়ি গুছিয়ে নিয়ে বলে, ‘ইস! দরজা খোলা! লজ্জাও নেই?’ তখন অতনু অসহায় ভাবে বলে, ‘কিন্তু ওদেরও তো খোলাই ছিল! হাতে কলমে শঙ্খ বাঁধা বুঝবে না? আর আমার জিরেন কাঠের রসের কী হবে! নেবে না?’ বী ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে, ‘তুমিই পাড়ো আর তুমিই খাও! মাসিমা-মেসোমশাই কী ভাববেন বলো তো!’ অতনু বিরক্ত হয়, ‘তোমার মাসিমা-মেসোমশাইয়ের পাঁচটিই কি ইম্যাকিউলেট কনসেপশন? নাকি ওখানেও ফুল কিওরিং-এ ওয়ান-ইজ-টু-এইট? এমন ভাব করো? দেখোগে, ওরা হয়তো জিরেন গাছের রস কোনোদিন খায়ই নি। দিন আনি দিন খাই পার্টি! যাক্‌গে পাওনা রইল কিন্তু!’ বী ওকে আর না ঘাঁটিয়ে রান্নাঘরে চলে যায়। জানে রেগে গেলে অতনুর মুখে কিছু আটকায় না। আর এও জানে যে একটু পরেই মুখে একটা চারমিনার গুঁজে ওর রান্নাঘরের কাজে হাত লাগাবে। কলেজে গণ্ডগোল চলছেই। বাহাত্তরের নির্বাচনে ছলে-বলে-কৌশলে কংগ্রেস ফিরেছে বিধানসভায়। সিপিএম. স্বভাব মতোই নির্বাচন, বিধানসভা সব বয়কট করে’ কী স্বর্গোদ্ধার করছে তারাই জানে।  অতনু এক সময়ে নকশালদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। কিন্তু এখন কিছু বয়োজ্যেষ্ঠ, উদারমনা সি.পি.আই. ও সিপিএম সহকর্মীর প্রভাবে  সেন্ট্রিস্ট বামপন্থার দিকে একটু ফিরছে। বলে, ‘আমি ভদ্রস্থ হচ্ছি।’। সিপিএমদের তবু এখনো দেখতে পারে না। ওদের নাম দিয়েছে, ‘উপেন বাবুর হাঁস’।  অতনুর আসলে অ্যালিউশনের অভ্যেস এখনও যায় নি। অ্যালিউশনের হাঁসের প্রসঙ্গে বলা দরকার উপেন বাবুর বাড়ি আসতেই পড়ে ওর উপরের  ভাই ভুপেন বাবুর বাড়ি। উপেন বাবু যেমন নিরীহ আর নির্বিরোধী, ভুপেন তেমনি উগ্র আর কূটকচালে। দুই ভাইয়ের বাড়ির সামনে দিয়ে একটাই মেটে পথ। উপেন বাবুর বাড়িটা একেবারে শেষে হওয়ায় ওই পথ ছাড়া বাড়িতে আসার উপায় নেই। ভুপেন বাবু তার বাড়ির সামনের বারান্দায় রোজই থলথলে মোটা কালো শরীরের আর ভুঁড়ির নিচে একটা  হেঁটো ধুতি জড়িয়ে, খালি গায়ে বসে তার বাস্তু সাম্রাজ্যের চতুর্দিক এমনভাবে পর্যবেক্ষণ করেন যে মনে হয় খেয়াল রাখছেন যেন কোনো অতর্কিত আক্রমণ বা বেআইনী অনুপ্রবেশ ঘটে। একদিন  অতনু অবাক হয়ে দেখেছে যে ওই রাস্তা দিয়ে একদিন যখন উপেন বাবুর এক ঠেলা ইঁট আসছিল তখন ভুপেন বাবু দাওয়া থেকে নেমে এসে দুই হাত ছড়িয়ে বিধান দিলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে ইঁট যাবে না।’ আশ্চর্যজনক ভাবে উপেন বাবু তা মেনেও নিলেন। যখন অতনু এসে বলল, ‘সে কি কথা! তাহলে আপনার বাড়ির কাজ কী করে হবে?’ উপেন বাবু অত্যন্ত শান্ত ভাবে বললেন, ‘ওই ও দিকে ইঁট ফেলবে, আর মিস্তিরিরা কয়েকটা করে নিয়ে আসবে!’ অতনু বলে, ‘কিন্তু এভাবে কাজ হয়। আর উনি আপনার রাস্তা আটকান কী বলে? আপনার তো ইজমেন্ট রাইট রয়েছে!’ উপেন বাবু মলিন হেসে বলেন, ‘বড় দাদা, তায় প্রতিবেশী। ঝগড়া করে থাকা যায়!’


‘হাঁস দম্পতিরা কোনো দাম্পত্য নিয়ম মানছে না’।


অতনু বোম খেয়ে যায়। রাত্রে বী দেখে যে লোকের শত কাজের, বইয়ে মগ্নতার মধ্যেও ওর বুকের থেকে একটু শাড়ি খসলেও চোখ এড়ায় না, সে বোমভোলানাথ হয়ে, ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে। ইচ্ছে করেই জল খেয়ে শাড়ি ব্লাউজ ছেড়ে, বিয়েয় কেনা দামি, স্বচ্ছ অন্তর্বাস পরে পাশে শোওয়ার সময় বী একবার আড় চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কী, প্রোফেসর সাহাব! অমৃতে অরুচি কেন আজ?’ অতনু ইঙ্গিতটা যেন শুনেও শোনে না। বলে, ‘জানো, তোমার ওই মেসোমশাইটি একটি নিন্‌কম্‌পুপ।’ বী প্রতিবাদ করে, ‘তা কেন? ভদ্রলোক শান্ত স্বভাবের মানুষ, ঝামেলা এড়াতে চান।’ অতনু বলে, ‘হ্যাঁ, সকলেই আজকাল ঝামেলা এড়াতে চায়। উপেন বাবু, তার হাঁস, সিপিএম—সবাই। যেন ঝামেলা এড়াতে চাইলেই ঝামেলা এড়ানো যায়।’ তার পর বীকে একটুও আদর না করেই ঘুমিয়ে পড়ে। বী বোঝে আজ মুডি অতনুর মন ভালো নেই। মনে আশা আসে তবে কি এবার এখানকার পালা ও শেষ করবে? ঘুমিয়ে পড়ার আগে বীও এবার  বুঝতে পারে  অতনুর এত মন খারাপ কেন। আসলে ব্যাপারটা হাঁসাহাঁসি নিয়ে। উপেন বাবু আর ভুপেন বাবু দুজনের বাড়িতেই হাঁস পোষা হয়। উপেন বাবুর একটা হাঁসা আর খান চারেক হাঁসি আছে। ভুপেন বাবুরও তাই। এরা সারাদিন ওদের বিরক্তও করে। সুনির্মল বসুর সেই, ‘গা দোলানো ছন্দে চলে নন্দলালের হাঁসের দলে ভঙ্গিতে’ প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে রান্না ঘরের সামনে পায়খানা করে দেয়। সে করুক। কিন্তু উপেন বাবুর হাঁসাটা ওর মতোই একটু দুবলা আর নির্বিরোধী। ফলে ভুপেন বাবুর মস্তান হাঁসাটা এসে রোজই ওর সামনেই উপেন বাবুর সব চেয়ে পুরুষ্টু, সুন্দরী হাঁসিটার উপর চড়ে বসে আর কাজ মিটিয়ে আলেকজান্ডারের ভঙ্গিতে চলে যায়। না আপত্তি করে হাঁসিটা না ওই কাপুরুষ হাঁসা। এতেই অতনুর আপত্তি। আর এটা ঘটলেই বী লক্ষ করেছে অতনু সে রাত্রে ওর সম্পর্কেও কেমন উদাসীন হয়ে যায়। ওর উদার স্বভাবের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে চেষ্টা করে’ ওর আগের পুরুষ বন্ধুদের কথা তোলে। এমনকি ওদের চার বোনের কিশোরী জীবনের স্বপ্নের নায়ক অমিতদাকেও টেনে আনে। বলে, ‘রাখো তোমার অমিতদা। যে কেউ চাইলে কয়েকটি ছটফটে কিশোরীকে অ্যাট্র্যাক্ট করতে পারে আর তাদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে পারে। কেবল ইরেস্পন্সিবল হতে হবে যথেষ্ট পরিমাণে’। বী বোঝে আধুনিক অতনু বহুগামিতা কোনো আঙ্গিকেই সহ্য করতে পারে না। কিন্তু যেহেতু বী অমিতদা সম্পর্কে কোনো কথাই সহ্য করতে পারে না তার ফলে এর পর কথা বন্ধ হয়ই। একলা কান্নার মধ্যেও বী হাড়ে হাড়ে জানে আমুদে, প্রেমিক অতনু কত সহজে শাটার নামিয়ে দিতে পারে দিনের পর দিন। ওর সব রাগ এখন গিয়ে পড়বে উপেন বাবু, তার কাপুরুষ হাঁসা, সিপিএম, এমনকি কলেজের স্নেহময় প্রিন্সিপ্যালের উপর, যেহেতু এখনো ইউজিসি ফিক্সেশন না হওয়ায় অতনু ফ্যান কিনতে পারে নি। এখনও গরম আসে নি। কিন্তু স্বভাব কৃপণ যে প্রিন্সিপ্যাল সব অধ্যাপকের মধ্যে একমাত্র ওকেই ডেকে ডেকে খাওয়ান তিনি যখন জিজ্ঞেস করেন, ‘অতনু, ক্কেমন আছো?’, তখন অতনু উত্তর দেয়, ‘গরমে ঘরে ফ্যান না থাকলে কেমন করে ভালো থাকব?’ হতভম্ব প্রিন্সিপ্যাল যখন জিজ্ঞেস করেন, ‘ফ্যান কেনো নি কেন?’, তখন আরো ঝাঁঝিয়ে অতনু উত্তর দেয়, ‘ইউজিসি-র বকেয়াটা দিতে পেরেছেন এখনও?’ প্রিন্সিপ্যাল বাকরুদ্ধ হয়ে যান, ছেলের সমান বয়সী এই তরুণ অধ্যাপককে গ্রামের কলেজে ধরে রাখতে তিনি ওর মাইনের ইউজিসি কম্পোনেন্টটার অনেকখানিই কলেজ ফাণ্ড থেকে দিয়ে দিয়েছেন। তার এই প্রতিদান! বী অনেকবার বলেছে, ‘আচ্ছা! একটা হাঁস একটা অন্য হাঁসিকে করছে, তাতে তোমার এত রাগ কেন? অতনু উত্তর দেয় না। কিন্তু ও যে অ্যাফেক্টেড হয় সেটা বী দেখেছে, এমনকি ওর একটা অপূর্ব কবিতায় এই লাইনও দেখেছে, ‘হাঁস দম্পতিরা কোনো দাম্পত্য নিয়ম মানছে না’।

বিষয়টা আরো গুলিয়ে গেছে কারণ কয়েক দিন আগেই ভুপেন বাবুর বর্বর হাঁসা এসে উপেন বাবুর সুন্দরী হাঁসিকে আবার ‘করে’ গিয়েছে, তার বরের সামনেই। অতনু লাথি মেরে দাওয়া থেকে নামিয়ে দিয়েছে উপেনের হাঁসাকে। উপরন্তু কলেজে ‘নব’-‘যুব’-রা একটি ভদ্র ছেলেকে বেধড়ক ঠেঙিয়েছে। সে অতনুর বিষয়েই সাম্মানিক ছাত্র। তার অপরাধ সে একটি গ্রুপ থিয়েটার চালায়, অতএব ছুপা সিপিএম। অতনু যথারীতি গুম। আবার বী-র পুরনো পুরুষ বন্ধুদের, ম্যায় অমিতদাকেও টেনে এনেছে। কিন্তু এবার কয়েক দিন উভয়েরই ঠান্ডা লড়াই প্রায় কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস-এ উত্তীর্ণ হবার আগেই বী একদিন অতনুকে রাত্রে টেনে তুলেছে, ভয়ারিজম শেয়ার করতে। ঘটনাস্থল উপেন আর ভুপেনের বাড়ির মাঝখানে কুড়ি ফুট পিছনে স্থানীয় ইস্কুলের ভূগোল টিচার নির্মলবাবুর সদ্য-নির্মিত একতলা বাড়ি। এখনও বাইরের প্লাস্টার হয় নি। ওরা এই জেলারই লোক। জনশ্রুতি ভদ্রলোক পুরুষত্বহীন, কিন্তু অত্যন্ত খিটখিটে আর পজেসিভ। তার শ্যামলা, তন্বঙ্গী বউটির বাপ-মা নেই। প্রায়ই আসে বীদের রান্নাঘরের সোজাসুজি উপেনবাবুর টিউবওয়েল থেকে জল নিতে। আর বীর শরীর খারাপ হলে  অতনু যখন ওর চারমিনারের সম্ভার নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে খাবার পাকায় তখন অবাক বিস্ময়ে দেখে প্রোফেসরের রান্নাবাড়া। অতনু ঠাট্টা করে বলে, ‘বী, কৌতূহল থেকে সাবধান!’ কিন্তু আজ রাত্রে সেই বউটি আর তার খিটখিটে বর দাঁড়িয়ে আছে ওদের অন্য ঘরটির জানলার ঠিক উলটো জানলার পাশটিতে। গায়ে সুতোর কুটোটি নেই। তার ‘নগ্ন নির্জন হাত’, তার উত্তুঙ্গ তালফলের মতো বুক, তার উপর লুটিয়ে থাকা একটি সরু বিছে হার, সরু কোমর, তার নিচের খয়েরি রোম, পিঠের উপর লুটিয়ে থাকা বেণি—তার সব কিছুকেই হাতে বুঝছে স্বামীটি, ঠিক সেই আতুরতায় যা কোনো প্রবেশে অক্ষম পুরুষ পারে। আর মেয়েটির ডান হাতের নিচটা দেখা যাচ্ছে না; কিন্তু উপরাংশ দারুণ নড়ছে। অতনু টের পায় বী ভালোরকম অ্যাফেক্টেড। ওর মুখ লাল হয়ে গেছে, দ্রুত পড়ছে নিশ্বাস। একটা হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে ওর গলা। ওর নরম বুক ঠেলে ধরছে অতনুর পাঁজর। কিন্তু বী টের পায়  অতনু ‘টার্নড্ অন’ হয় নি। ‘চলো’ বলে বিছানায় শুয়ে পড়ে। বী রাগে, ক্ষোভে, অসহায়তায় বোঝে এই গুমোট আরো বেশ কিছুদিন চলবে। উপেনের ঢোঁড়া হাঁসের কাপুরুষতার ফল ভুগতে হবে খামোখা ওকে। মনে হয় ডাক্তার অসিতের শেষ কাতর আবেদন উপেক্ষা করার ফল এই দুর্ভোগ।

কিন্তু হঠাৎ-ই একদিন গুমোট কাটে। রবিবারের দুপুরে মাংস ভাত খেয়ে ঘুমোচ্ছিল অতনু। বী অভ্যেস মতো কাগজে শব্দসন্ধান করছিল। কিন্তু হঠাৎ-ই অনেক হাঁসের সমবেত প্যাঁকপ্যাঁকে বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে হতভম্ব হয়ে যায়। রান্নাঘরের সামনের দাওয়ায় হাঁসের পাল। তাদের চিৎকারে কান পাতা দায়। চতুর্দিকে হাঁসের পুরীষ। আর তার মাঝখানে উপেন বাবুর হাঁসা ভুপেন বাবুর সব চেয়ে সোহাগি হাঁসিটির উপর চড়ে বসেছে। পাড়াবেড়ানি কেন এদিকে এসেছিল কে জানে! বী ঘুমন্ত অতনুকে হিড় হিড় করে টেনে আনে। বিস্ফারিত চোখে অতনু একটু তাকিয়েই ব্যাপারটা বুঝে যায়। ভুপেনের হাঁসা উপেনের হাঁসাটার গায়ে ঠোকরাচ্ছে, কামড়াচ্ছে। কিন্তু উপেনের হাঁসার ভ্রূক্ষেপ নেই। বারবার তার নিম্নাঙ্গ প্রক্ষেপ করে চলেছে। শাদা লেজটা উঠছে পড়ছে আছড়ে। আর হাঁসিটা অত্যন্ত প্রশান্ত চিত্তে গ্রহণ করছে তার এই দীর্ঘ অবহেলার প্রতিশোধ। কী জানি সেই জন্যেই হয়তো ‘ইজমেন্ট রাইটের’ তোয়াক্কা না করে চলে এসেছিল। কতদিন সহ্য করবে, ‘আমার বঁধুয়া আন বাড়ি যায় আমারি আঙ্গিনা দিয়া’? হাস্যোজ্জ্বল মুখে অতনুর দিকে তাকিয়ে বী ঘাবড়ে যায়। অতনুর মুখ পালটে গেছে। চোখ দুটো ঘোলাটে, মুখে শরীরের সব রক্ত যেন জমা হয়েছে, দুটো হাতই শক্ত মুঠি করা।  অতনু ইয়েট্‌স-এর ‘Leda and the Swan’ আওড়াচ্ছে : ‘A sudden blow : the great wings beating still/ Above the staggering girl, her thighs caressed/ By the dark webs, her nape caught in his bill,/ He holds her helpless breast upon his breast./ How can those terrified vague fingers push/ The feathered glory from her loosening thighs?/ And how can body, laid in that white rush,/But feel the strange heart beating where it lies?’


একবার পাশ ফিরে বী একটা গভীর, ব্যাপ্ত চুমো দেয় অতনুর গালে। গালে টোকা দিয়ে বলে, ‘উপেনের হাঁসা!’


অদ্ভুত দৃষ্টিতে বী-র দিকে তাকিয়ে অতনু বিকৃত মোটা গলায় বলে, ‘বী, ঘরে চলো প্লিজ।’ বলে, সম্মতির অপেক্ষা না করেই ওকে তুলে নিয়ে যায় ঘরে। বী সায় দেয়, ভুপেনের হাঁসিটার মতো নয়, কিম্বা মতোই। একটানে ওর শাড়ি জামা খুলে দিয়ে অতনু ওকে বসায় ওদের খাটের উপর। তারপর নিচে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে ওর দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে শরীরটাকে তুলে এনে, মুখটা নিয়ে আসে ওর পায়রার মতো বিকম্প্র বুক বরাবর। স্বপ্নাচ্ছন্ন গলায় বলে, ‘রানি লিডা, আমার পশ্চাদ্ধাবন করছে এক ঈগল, আমায় আশ্রয় দাও, সঙ্গম দাও।’ তারপরই অচেতন প্রবেশ করে ওর মধ্যে। বী’র মনে হয় সে যেন এর মধ্যেও অস্ফুটে বলতে পেরেছিল, ‘তাই হোক, ছদ্মবেশী, প্রভু জিউস’।  বী টের পায় বিপুল ওর মস্তিষ্ককে, শরীরকে অবশ করে দিচ্ছে। ডোপামাইন-অক্সিটোসিনের খেলা ছাড়িয়ে খুলে যাচ্ছে এক নতুন দিগন্ত। মনে হয় এক সাতমহলা বাড়ির মধ্যে কে যেন বয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওকে, সেও ওর মতোই নগ্ন। তার পায়ের ধাক্কায় একে একে খুলে যাচ্ছে একের পর এক দরজা। প্রত্যেকটা ঘরেই উষ্ণ প্রস্রবণ জলের সঙ্গে ধোঁয়া উগরে দিচ্ছে। অতনুর  আওড়ানো লাইন, ‘একি আলিঙ্গন নাকি ওতপ্রোত গ্রাসের গঠন’ ধাক্কা দিচ্ছে মনের কানে। অতনুরই দেখানো রুবেন্সের লিডা অ্যান্ড দ্য সোয়ান ছবিটা ঝলকিয়ে যাচ্ছে মাথায়। ঘেমে দুজনের শরীর পিছল, পিছল তো বী যেন আপাদমাথা, যদিও চৈত্রের বিকেলে ছাপ্পান্ন ইঞ্চির ঊষা ফ্যান ঘুরছে মাথার উপর, যেটি অবশেষে কিনতে পেরেছে অতনু। অবশেষে এক সময় এলিয়ে যায় দুটি শরীর, ধামসানো বিছানায় পড়ে থাকে পাশাপাশি। একবার পাশ ফিরে বী একটা গভীর, ব্যাপ্ত চুমো দেয় অতনুর গালে। গালে টোকা দিয়ে বলে, ‘উপেনের হাঁসা!’

অতনু এবার ওর দিকে ফেরে। তারপর বলে মন দিয়ে শোন: ‘আজ সারাদিন তুই কোথায় ছিলিরে সারাবেলা? … ‘বুকের ভিতর থেকে, ছেড়ে দেবো ফুলের ভিতরে,/ তারপর ধীরে ধীরে মুচড়ে দেবো অপরূপ গলা।/ পালক ছাড়িয়ে, তোকে পালক ছাড়িয়ে খুব কাছে,/ কাছের পাঁজর ভেঙে আরো কাছে টেনে নেব তুই/ অন্য কারো জলাশয়ে ভরদুপুর কুড়াতে পারবি না।/ ছেঁড়া পালকের স্তূপে ভরে যাবে সমস্ত পুকুর।/ তোকে নিয়ে সারাদিন রোদ্দুরের দুন্দুভি বাজাব।’ কার লাইন? বী বলে, ‘শক্তি না, আমার রাজহংস?’ অতনু বলে, ‘দূর! মনিভূষণের রাজহাঁস সিরিজ’। বলেই ঘুমিয়ে পড়ে। বী রান্নাঘরে চা করতে যায়। কেটলিতে জল চাপিয়ে ভাবে—আইএএস কি দেওয়ানো যাবে এই রাজহাঁসটাকে? নাকি তার চেয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে একটা ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে যাওয়াই ভালো? তখন ওদের রান্নাঘরের দাওয়ায় রয়ে গেছে অনেক ছেঁড়া পালক। ঘুরছে ফিরছে বিভ্রান্ত চৈত্রের হাওয়ায়।

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল : dibyaupadhyay@gmail.com

Latest posts by অমর্ত্য মুখোপাধ্যায় (see all)