হোম গদ্য গল্প আনন্দকুসুম

আনন্দকুসুম

আনন্দকুসুম
299
0

            আমি এলেম, ভাঙল তোমার ঘুম,
শূন্যে শূন্যে ফুটল আলোর আনন্দ-কুসুম।
                              আমায় তুমি ফুলে ফুলে
ফুটিয়ে তুলে
      দুলিয়ে দিলে নানা রূপের দোলে।
আমায় তুমি তারায় তারায় ছড়িয়ে দিয়ে কুড়িয়ে নিলে কোলে।
(বলাকা ২৯)

বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি।

স্বাতী ঢাউস একটা উপন্যাসে মন দেবার চেষ্টা করছিল। মন বসছে না। পৃষ্ঠা দেড়েক পড়ে একটা লাইন পেল, “ও পাশের ঘর থেকে মাউথ অর্গানের সুর ভেসে আসছে। টানা এবং কান্নার সুর …।” স্বাতীর চোখ আটকে থাকে লাইন দুটোর ওপর। বৃষ্টির শব্দ আর লাইন দুটো মিলে ছোট্ট ঘরটার ভেতর একটা অপার্থিব বিষণ্নতায় ভরে দেয়।


নীলের মনে আশঙ্কাটা বেশি থাকলেও ছোট্ট একটা আশা ছিল যে নীরা খেলা দেখতে আসবে, প্রথম সারির কোণের দিকের একটা চেয়ারে রজনীগন্ধা হয়ে বসে থাকবে।


পাঁচ মিনিট। স্বাতী দেখল, ও দ্বিতীয় পাতাও শেষ করতে পারে নি। সবচেয়ে হতাশার ব্যাপার হচ্ছে, ওকে আবার প্রথম থেকে পড়তে হবে; মাউথ অর্গানের ব্যাপারটা কোথা থেকে এল, ওর মাথায় খেলছে না। বইয়ের শুরুটা কী ছিল, তাও মনে নাই। খুব মন খারাপ করে বইটা রেখে দিল বালিশের পাশে। জানালার পর্দা সরিয়ে বৃষ্টি দেখতে লাগল। এ রকম বৃষ্টি হলে ওর মন খারাপ হয়ে যায়। কিছু ভালো লাগে না। কেন জানে না, খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে। কান্নাকাটির জন্য সামান্যতম একটা কারণ তো লাগবে; তাও না থাকাতে গলা-তক এসে থেমে থাকা কান্নাটার জন্য কাঁদে। মনে মনে কাঁদে। চোখে  জল নেই, গলায় একটা ব্যথা; মুখের মাংশপেশিতে ব্যথা—আয়নায় চোখ পড়ে—একটা বিরহ বিরহ ভাব ফুটেছে কি? অথচ কারও বিরহে সে কাঁদছে না। নিজের ওপর খুব রাগ হয় স্বাতীর। নিজেই নিজেকে বুঝতে পারছে না, এতটা জটিল করে ওকে গড়লেন কেন ঈশ্বর? একটা বিশাল, উদ্দেশ্যবিহীন অভিমান নিয়ে স্বাতী কম্বলে আপাদমস্তক ঢেকে পাশ ফিরে শোয়।

দুপুরে বৃষ্টি হতে দেখে নীলের মেজাজটা বিগড়ে যায়। আজ বিকেল চারটায় লন টেনিস টুর্নামেন্টের ফাইনাল। পুরুষ এককে ও সম্ভাব্য বিজয়ী। ছোট এই কারখানা-শহরটিতে ও একজন হিরো; ফুটবলে, ব্যাডমিন্টনে, ক্রিকেটে সেরা কৃতিত্ব দেখানোর পর আজ লন টেনিস। ধুস শালা বৃষ্টি!!

নীল এখানে এসেছে নয় মাস। প্রথমে ভালো লাগত না কিছুই। ও খেলা-পাগল। এখানে সব সবরকম খেলাধুলার চর্চা আছে দেখে ভেবেছিল, শেষতক মানিয়ে নিতে পারবে। পরে অবশ্য এমন হলো, কোনো রকম খেলাধুলা ছাড়াও ওর দিব্যি চলে যেতে পারত। ওর চোখে পরেছে নীরাকে!

নীলের মনে হয়, নীরা খেলা-পাগল না হলেও আগ্রহ আছে হয়তো কিছুটা। মাঝে মধ্যে খেলা-টেলা দেখতে আসে। নীল ওর চোখে পড়ার মতো যথেষ্ট পারফরমেন্স দেখিয়েছে। দুএকটা কথাও হয়েছে; মেয়েটিকে ওর একটু খেয়ালি মনে হয়। নাগাল পাওয়া ভার। নীরার কথা মনে হতে ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই দেখে মেজাজ বিগড়ে যায়।

মন খারাপ এবং বিগড়ানো মেজাজ নিয়ে বাদামি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়, হাঁক দেয়, “মোসাব্বির, চা!”

আড়াই ঘণ্টা পর স্বাতী বিছানা ছেড়ে উঠল। চোখে-মুখে জল দিল। কাঁদে নি যে, জলের দাগ মোছার জন্য জল ছিটাবে। ওর ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছিল, ও এক দুপুর খুব কেঁদে-টেদে উঠল। মুখ মুছে বাইরে তাকিয়ে দেখল, রোদ। বিকেলের রোদ কী চমৎকার আভা ছড়াচ্ছে রাস্তায়, রিকশায়, দোকানে, মানুষদের ওপর। হঠাৎ আয়নায় তাকিয়ে শেষবার মুখটা বিষণ্ন করল, তারপর হেসে উঠল, “পাগলি মেয়ে, তোর এত দুক্ষু কেনে রে, কাঁদন কেনে? সন্ধ্যা হয়ে আসছে। একটু সাজুগুজু কর। হারমোনিয়ামটা নিয়ে বস।” নিজেকেই ধমক দিয়ে আয়নার সামনে এনে বসায়। পড়তে শুরু করা বইটার দিকে করুণায় তাকায়, “তোকে আজ রাত্রেই খতম করব!” আজ শ্যাম্পু করেছে, চুলগুলো একটু বেশি এলোমেলো, মনের  মতোই। মনটা এখন আর এলোমেলো রাখা যাবে না। ওর সময়ের অনেক দাম।

নীলের মনে আশঙ্কাটা বেশি থাকলেও ছোট্ট একটা আশা ছিল যে নীরা খেলা দেখতে আসবে, প্রথম সারির কোণের দিকের একটা চেয়ারে রজনীগন্ধা হয়ে বসে থাকবে। আসে নি; নিশ্চয়ই বৃষ্টির জন্য—যে রকম চুপচাপ মেয়ে, কবিতা-টবিতার ব্যাপার আছে নিশ্চয়ই—এই ভেবে নীল একটু উদার হয়। তারপরই বিস্মিত হয়, বৃষ্টি একটা মূর্তিমান বিড়ম্বনা; এটাকে আর যাই হোক কবিতা করে তোলা ঠিক না। কবিরপুরের সেরা ক্রীড়াবিদের মনোভূমি জুড়ে শেষ বিকেলে একটা অভিমানী, কমলা রঙের বাস্কেট বল এধার ওধার করতে থাকে। কালো মতো রোগা একটা ছেলে মাউথ অর্গান বাজাচ্ছিল। ওকে কাছে ডাকল, “কী নাম?”—“চরন দাস”। “ভালো”, গলার মেডেলটা অবহেলায় মুঠো করে স্পোর্টস ব্যাগে ঢুকিয়ে বলল, “বাজা”। ছেলে ভয়ে ভয়ে বলে, “আধুনিক, না হারানো দিনের?” আকাশের দিকে চেয়ে, চেয়ারে হেলান দিয়ে, দু চোখ মুদে নীল সমঝদারের মতো বলল, “হারানো দিনের।”

নীরা টানা লিখে যাচ্ছে। দুই-তিন-চার পৃষ্ঠা। ক পৃষ্ঠা হলো খবর নেই; ওকে আজ লেখায় পেয়েছে। মাঝে মাঝে এরকম পাগলের মতো লিখে যায়। কিংবা একটি ভুত ওর ঘাড়ে বসে মাঝে মাঝে সারাটা বিকেল সারাটা সন্ধ্যা ওকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়।

বসার ঘরে নীলদার সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। জ্বালালো। নীরা মোটেও পাত্তা দিচ্ছে না অথচ ভাইয়ার এ বন্ধুটি কারণে অকারণে খেজুরে আলাপ জমানোর চেষ্টা করে। উনি আজ এসেছেন দেখে ওর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। জানা কথা দাদা থাকবেন না আজ, উইক এন্ডে বন্ধুদের সাথে কোথায় কোথায় হুল্লোড় হবে; আর প্রেমিক প্রবরের মোক্ষম সুযোগ জুটে গেল! দড়াম শব্দে দরজা বন্ধ করল নীরা। নীল অতটা বিপজ্জনক নয় যে দরজা বন্ধ করতে হবে; তবু ও যে অনাহূত, এটা বুঝিয়ে দিতে এই শব্দটুকু জরুরি ছিল। ছোট এপিসোডের এই একাঙ্কিকায় শব্দ নির্দেশনাটা খুব নির্ভুল ছিল। নীল নেমে যাচ্ছে।

নীরা আবার লিখতে বসল—“অনেকে ভালোবাসায় ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও ভালোবেসে কিছুই পায় না, সময় আর শ্রমের অপচয় করে, ক্ষয়ে যায় ভেতরে-বাহিরে। কিন্তু ভালোবাসাটাই সব নয়, কত সব অন্য ব্যাপার থাকে। আমাকে এ যাবৎ গুনে গুনে সাত জন প্রেম নিবেদন করল। কেউ ‘না’ শুনেই কেটে পড়ে; কেউ আবার লেগে থাকে—এদের নিয়েই মুশকিল। ‘না’ বলতে আমার বাধে না মোটেও, কিন্তু একজন মানুষের ভালোবাসাকে অপমান করতে একটা কষ্টের বোধ চলে আসে, তাই এখন আমার আক্ষরিক অর্থেই সাত রকমের কষ্ট। এই যে একজন খেলোয়াড় এসেছেন এ তল্লাটে। সোনার মেডেল গলায় ঝুলিয়ে কবিরপুরকে ধন্য করছেন, তার চোখও বলছে, “নীরা, ভালোবাসি”। আমি নিশ্চিত, এই ভদ্রলোক একথা বলবেন খুব শীঘ্রই। আর এজন্যে ঐ ফিরিয়ে দেয়ার কষ্ট এখন থেকে প্রাণে বাজছে আমার। আশ্চর্য লাগে, অ্যাফেয়ারের চিন্তা ছাড়া আর কোনো চিন্তা কি ছেলেদের মাথায় থাকে না? সবচে বড় কথা, এই খেলোয়াড়টি আর সব খেলোয়াড়ের মতোই হবে, সূক্ষ্ম বোধহীন, মোটা রুচির, সস্তা রসিকতায় হো হো হাসবে—সে কোন সাহসে আমার সাথে ভাব জমাতে আসে?”


নীলের কাছে ও এক অফুরান প্রাণের উৎস, এমনকি ওর এমনটাও মনে হয় নীরাই কি সেই মেয়ে—ঈশ্বর যাকে খুঁজতে পাঠিয়েছেন ওকে; না-কি সে স্বাতী!


নীরাদের বসার ঘরে পর পর দুটো সিগারেট ধ্বংস করে অরণ্যের ফ্ল্যাটের দিকে গড়ানো শুরু করল নীল। হাঁটার গতি মন্দ; ঠিক করতে পারছে না ওখানে যাবে কিনা। আজ উইক এন্ডে ওখানে সারা রাত সোনালি তরল, রূপালি গজল। সারা রাত আকাশের তারা গোনা, সারা রাত আনন্দ-বেদনা। আগেও দু একবার এসব উৎসবে যোগ দিয়েছে।

রাস্তার একটা সঙ্কট কোণে দাঁড়িয়ে আছে নীল। এখনই স্থির করতে হবে। ডানে গেলে অরণ্যের বাসা আর বাঁয়ের রাস্তাটি ধরে কিছুটা হেঁটে, কিছুটা যানবাহনে করে গেলে অন্য লোকালয়, একটা মেটে রঙের বাড়ি: স্বাতী।

নীলের কাছে ও এক অফুরান প্রাণের উৎস, এমনকি ওর এমনটাও মনে হয় নীরাই কি সেই মেয়ে—ঈশ্বর যাকে খুঁজতে পাঠিয়েছেন ওকে; না-কি সে স্বাতী!

নীলকে পর পর দু সপ্তাহে আসতে দেখে কিছুটা অবাক হলো স্বাতী। এমনিতে ও কোনো কিছুতেই খুব অবাক হয় না অবশ্য। মুখে কিছু বলল না, আমন্ত্রক হাসিতে বুঝিয়ে দিল ও অনাহূত কেউ না। অথচ, নীল ভাবে, নীরা কখনও ওর দিকে তাকিয়ে হাসে নি পর্যন্ত। ও প্রাণপণে নীরাকে ভুলে যেতে চাইছে এখন। স্বাতীর এখানে এলে অবশ্য নীরার কথা মনেও হয় না আর; তবু মনে মনে স্বাতীর স্বভাবের বা কোনো শারীরী ভঙ্গির তুলনা করতে গিয়ে নীরাকে পাশাপাশি ভেবে ফেলে অনিবার্যভাবে।

নীল কখনও জানতে পারে নি স্বাতীর অতীত। স্বাতী বলে, ধরে নাও না কেন আমার কোনো অতীত নেই। স্বাতী অন্য অনেক বিষয়ের মতো নীলের অতীত নিয়েও নিরাসক্ত। তাই আরো প্রশ্ন করা অসঙ্গত হয়ে যাবে ভেবে নীল থেমে যায়।

নীল স্বাতীর কাছে আসে খুব কষ্ট পেলে। যখন ওর মনে হয় নীরার জন্য বুকটা আক্ষরিক অর্থেই ফেটে যাচ্ছে কিংবা আত্মহননের অদ্ভুত উটের গ্রীবা দেখতে পায় দিবাস্বপ্নে, তখন; কিন্তু স্বাতীকে সে সবের কিছুই বলা হয় না—কাছে এলে ওসব কথা খুব খেলো মনে হয়। ও যখন হারমোনিয়ামের সামনে বসে সারাটা ঘর স্বপ্নজীবী সান্দ্র সুরে ভরিয়ে দেয় অথবা দু কাপ কফি করে এনে মুখোমুখি বসে থাকে বনলতা সেনটি হয়ে, তখন ওর শুধু মনে হয়, যে স্বাতীর সময়ের দাম জীবন ধারণের সমানুপাতিক, এতটা প্রশ্রয় দিচ্ছে কেন সে নীলকে, এতটা অপচয়ই বা কেন করছে সময়ের। স্বাতী ভাবে, নীলের চাওয়া এত কম কেন; অন্তত একজন চেনা পুরুষকে আগ্রাসনবাদী নয় ভেবে ভালো লাগে স্বাতীর। কষ্টও হয়, কেন, জানে না।

পাদটীকা :  আমি উপন্যাস লিখলে ঘটনার ঘনঘটা দিয়ে এই ত্রিভুজ চরিত্রদেরকে আরো বিকশিত করতে পারতাম। কিন্তু সে সুযোগ এখানে নেই। অতএব শেষ টানছি। নীলের ফিরে যাবার সময় হয়েছে। ওর জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর সময় সমাগত। এক, সোজা কথা—স্বাতীকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না, কষ্ট  হয় তার। দুই, যাবার সময় ওর ছোট্ট একটা কাজ করতে হয়। একটা খাম তার হাতে ধরিয়ে দেয়; স্বাতী অবশ্য গুনে দেখে না নীল ওকে ঠকালো কীনা। নীল খামটা বের করে অস্বস্তিতে ধরে রাখে, যেনবা ওর সবচেয়ে গোপন তথ্যটি দিনের আলোয় চৌরাস্তার বড় বিলবোর্ডে দেখতে হচ্ছে নিজেকেই। স্বাতী খুব সহজভাবে অতি দ্রুত খামটা হাতে নিয়ে ওকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করে। এই একটা ব্যাপারেই নীল এখন পর্যন্ত অসহজ। ও ভাবে, স্বাতী কি মনে করে না, ও ঠকাতেও পারে! আসলে এক হিশেবে ও তো ঠকিয়েই চলেছে ওকে। আর সবাই স্বাতীকে যা দেয়, নীলও তা-ই দেয়; কিন্তু স্বাতী নামের আনন্দকুসুমটি আর সবাইকে যা দেয়, নীল তা নেয় না—তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ঐশ্বর্য নিয়ে সম্রাটের মতো ফিরে যায় প্রতিবার।

মোশতাক আহমদ

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮; টাঙ্গাইল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক, জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে একটি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
সড়ক নম্বর দুঃখ/ বাড়ি নম্বর কষ্ট [দিনরাত্রি, ১৯৮৯]
পঁচিশ বছর বয়স [সড়ক প্রকাশ, ১৯৯৪]
মেঘপুরাণ [পাঠসূত্র, ২০১০]
ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি [পাঠসূত্র, ২০১৫]
বুকপকেটে পাথরকুচি [চৈতন্য, ২০১৭]

প্রবন্ধ—
তিন ভুবনের যাত্রী [এ লিটল বিট, ২০১৬]

ই-মেইল : mostaque.aha@gmail.com