হোম গদ্য গল্প আট বছর আগের দুই দিন

আট বছর আগের দুই দিন

আট বছর আগের দুই দিন
1.33K
0

পিলখানায় যেদিন বিডিআর বিদ্রোহ শুরু হয়, সেদিন আমার সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ‘শামুক’-এর শেষ সংখ্যাটা প্রকাশিত হয়েছিল। রাতটা তাই প্রেসেই, ছাপা প্রক্রিয়ার দেখভাল করে কাটে। সকালে বাইন্ডিং বাদে বাকিসব কাজ শেষ হলে প্রেস থেকে বেরিয়ে আসি। আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে বেরিয়ে, উপরে উঠে আসতেই তীব্র রোদে মাথা চক্কর দেওয়ার উপক্রম হয়, কিন্তু তখনই মমতার ফোন পেয়ে ব্যাপারটাকে আমি সামলে নিতে পারলাম।

‘হ্যালো সর্বনাশ! শুনছ কী হইছে?’

‘কী হইছে?’ পেন্ডিং থাকা চক্করটা সুযোগ পেয়ে আবার উশখুশ করতে থাকে।

‘বিডিআর বিদ্রোহ, পিলখানায়। ওরা বলতেছে বিডিআর-প্রধানকে নাকি গুলি করে মেরে ফেলা হইছে। ভাবতে পারো!’

‘বলো কী!’ যথাসম্ভব গুরুত্বের সঙ্গে, তবু ছেড়ে দেওয়া হাইটাকে শেষ পর্যন্ত ফিরিয়ে নিতে না পেরে, আমি বলি।

‘আশ্চর্য তোমার হাই উঠল এটা শুনে!’ তেল-গ্যাস ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা কমিটির সমর্থক মমতা ব্যাপারটাকে ঠিক মেনে নিতে না পেরে বলে।

‘না না, তুমি তো জানোই সারারাত আমি প্রেসে ছিলাম।’

‘ও আচ্ছা, হ্যাঁ তাই তো। বের হইছে তোমাদের লিটল ম্যাগাজিন?’

‘বাইন্ডিং বাকি আছে’, আমি বলি।

‘তো, তুমি কি জানতা প্রতিদিন আমি পিলখানার ভিতর দিয়েই কলেজে যাই?’

পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে এরচেয়ে ভালো তথ্য আর কী হতে পারত? ‘মানে কী! কী হইছে বলো তো?’ ঝেড়েকেশে জানতে চাই আমি।

‘বাসায় যাও, টিভিতে দ্যাখো, আমি গেলাম’, বলে ফোন ছাড়তে চায় মমতা।

‘না তা কেন?’ আমি জিগ্যেস করি।

‘আরে খবর দেখি গিয়ে’, কর্কশ স্বরে এ-কথা বলেই লাইন কেটে দেয় মমতা।

আমি বাসায় না গিয়ে রাস্তা পার হয়ে ফেনী প্রেসক্লাবে ঢুকে পড়ি। টিভিস্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা উপস্থিত কান খাড়া করে রাখা সাংবাদিকদের পাশে গিয়ে দাঁড়াই।

বিডিআর সদর দফতর থেকে জনপদে গুলি ছোড়াসহ, আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের ছোটাছুটির দৃশ্য ও আরো সকালে দরবার হলে ঘটে যাওয়া সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনা, র‌্যাব ও পুলিশ-সদস্যদের ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যে আমি গিয়ে টিভিসেটের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম।

ঢাকা থেকে ফোন পেয়ে একটা জাতীয় দৈনিকের জেলা প্রতিনিধি আমাদের আগেভাগেই নিশ্চিত করে দেয়, ‘সম্ভবত বিডিআরের মহাপরিচালককে গুলি করা হয়েছে। অন্য অনেক অফিসাররাও নাকি গুলিবিদ্ধ, বেঁচে আছে কিনা নিশ্চিত না।’

‘বাঁচিয়ে রাখার কোনো কারণ আছে কি? সেনাবিদ্রোহগুলোতে আমরা কী দেখি..’ একজন প্রবীণ সাংবাদিক সমবেত বাকিদের উদ্দেশ্যে তার যৎসামান্য সামরিক জ্ঞান ফলাতে শুরু করলে, সন্তর্পণে বেরিয়ে আসি আমি।


পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে ফিরে গিয়ে বিদ্রোহী জোয়ানরা অস্ত্র-জমা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় নতুন নাটক।


রিকশায় উঠে মমতাকে ফোন দিই, ‘কী সর্বনাশ, ভাগ্যিস তুমি আজকে কলেজে যাও নাই!’

‘কী অদ্ভুত দ্যাখো, আমিও হয়তো জিম্মি থাকতাম এতক্ষণে!’ এবার আমার কণ্ঠে সত্যিকারের উৎকণ্ঠা টের পেয়ে খুশি হয়ে মততা বলে। নিজেকে নিয়ে টেনশন করে এবং আমাকে জিগ্যেস করে, ‘টিভি দেখছ? ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পারছ এবার?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, দ্যাখো আমার গায়ের লোম দাঁড়াইয়া গেছে।’

‘কিভাবে দেখব, ভিডিও করে ইমেইল করে দাও’, উপায় বাতলে দেয় মমতা।

‘কিন্তু ক্যামেরা সেট তো বাসায়’, আমি বলি।

‘ওমা তুমি এখনো বাসায় যাও নাই?’

‘আরে না, তুমি বিপদে পড়তে যাচ্ছিলা, আমি কি বাসায় যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব নাকি?’

খুশি হয়ে মমতা বলে, ‘তো তুমি কী করলা?’

আমি বললাম যে, ‘আমি সোজা প্রেসক্লাবে চলে গেলাম। কিভাবে যে রাস্তা পার হলাম, চিন্তাও করতে পারবা না, একটু হলেই ট্রাকের নিচে পড়তাম।’

‘সে কী! দিনের বেলা না ফেনীতে ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দিছে বললা সেদিন?’

জিভ কামড়াতে কামড়াতে কুল পেলাম না, বিগ মিসটেক।

তবু তাৎক্ষণিক এই যুক্তি দাঁড় করাতে পারলাম যে, ‘এটা সেদিন মাত্র পৌরসভা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, এখনো বাস্তবায়িত হয় নাই।’

‘কবে বাস্তবায়িত হবে?’

বলি, ‘শিগগিরই হয়ে যাবে, কথাবার্তা চলতেছে।’

‘কী যে কও তুমি বুঝি না’, ঘটনার পক্ষে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পেয়ে বিমর্ষ হয়ে পড়ে মমতা।

‘বাদ দাও তো’, আমি বলি, ‘এখন বাসায় যাচ্ছি। বাসায় গিয়ে আরো অনেক খবর দেখতে হবে।’

‘ঘুমাবা না? সারারাত তো ঘুমাও নাই, কালকে আবার জার্নি করে ঢাকায় আসবা।’ নিজের নামের প্রতি সুবিচার সম্পন্ন করে মমতা বলে।

‘তা একটু ঘুমানো তো দরকার..’ আমি বলার চেষ্টা করি।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ ঘুমাও, বিপদ কেটে গেছে। আমি তো সুস্থ আছি।’ সে বলে।

‘এবং আমারই আছো’, যুক্ত করে আহ্লাদ করতে চাইলে, মমতা বললো, ‘তা আছি।’

বলেই লাইন কেটে দিল নাকি আমার ফোনের ব্যালান্স শেষ হয়ে গেছিল, কে জানে!

তবে সে আর কলব্যাক করে নাই। (হয়তো তারও ব্যালান্স ছিল না)।

বাসায় গিয়ে দেখি অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে তার বদলে শক্ত হয়ে টিভির সামনে বসে আছে আব্বু।

আমাকে দেখে, ‘ঘটনা শুনছিস’ বলে দর্শকসারিতে একাকী নিজের সঙ্গে আমাকেও প্রত্যাশা করল যেন-বা। আমি না শোনার ভান করে সোজা বাথরুমে ঢুকে পড়ি।

গোসল করে বের হতেই, কয়টা বেনসন এনে দিতে বললে অবাক হয়ে আমি বললাম, ‘আপনি না সিগারেট ছেড়ে দিছেন?’

হাত নেড়ে আব্বু বলল, ‘আরে এত বড় একটা ঘটনা.. বুঝোসই তো, সিগারেট ছাড়া সামাল দিব কিভাবে?’

‘হ্যাঁ আপনি একটা উসিলা পাইছেন আর কি’, ভর্ৎসনা করে আমি সিগারেট আনতে বেরিয়ে গেলে, ভুলবশত ফোনটা রুমেই রেখে যাই। আমার অনুপস্থিতিতে মমতা আবারও ফোন দিলে (হয়তো ততক্ষণে কোনোভাবে ব্যালান্স ভরে) আব্বু সেটা রিসিভ করে।

ফিরে এসে দেখি আব্বু উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে জোরে কথাবার্তা বলছে, হাতে তার আমার ফোন। ‘না না, এটা আল্লাহর রহমত ছাড়া আর কিছুই না। নিয়মিতই তুমি পিলখানার ভিতর দিয়া যাও, আজকেও যাইতে পারতা।’

আমি সিগারেট দিয়ে ফোন ফেরত চাইলে, হাতের ইশারায় আব্বু আমাকে থামতে বলল। এবং আমার ব্যাপারে বলে চলল, ‘না না ওর এসব কোনো সেন্স নাই, দেশে কী হচ্ছে না-হচ্ছে কোনো খবরই রাখে না।’

শেষে সিগারেট ফেলে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ফোনটা ফেরত নিলে, মমতা আমাকে বলল, ‘ও! তুমি নাকি খবর না দেখেই ঘুমাতে যাচ্ছিলা?’

কী সর্বনাশ, আব্বু এটাও বলেছে! ‘কই না তো আমি তো শুধু গোসলটা করলাম। এরপর গেলাম তার সিগারেট কিনে আনতে।’ আমি ব্যাখ্যা করি।

‘কিন্তু তোমার আব্বু না সিগারেট ছেড়ে দিছে বললা সেদিন?’

‘চিন্তা করো অবস্থা’, ক্ষেপে গিয়ে আমি, আব্বুকেও শুনিয়ে শুনিয়ে বলি, ‘এত কিছু বলতে পারছে, ফোনটা কেন তাকে ধরতে হইছে, সেটা বলে নাই!’

হেসে ফেলে মমতা, ‘থাক থাক, তোমার আব্বুকে আমার পছন্দ হইছে। আমি পিলখানার ভিতর দিয়ে কলেজে যাই শুনে টেনশন করতেছিলেন।’

‘তুমিও একটা’, মুখ ফস্কে বলে ফেলি আমি, ‘পিলখানার ভিতর দিয়ে কলেজে যাও এটা সবাইকে বলতে হচ্ছে!’

‘ওমা! সমস্যা কী?’ অবাক হয় মমতা, এবং মুহূর্তেই আমার ভুল ধরে ফেলে, ‘ও আচ্ছা তোমার কাছে এটা বড় কোনো ব্যাপার না? তোমার মনে হচ্ছে ব্যাপারটা নিয়ে আমি আদিখ্যেতা করতেছি? তুমি ভাবতে পারতেছ, প্রতিদিন, তুমি জানো জিগাতলা থেকে আমি পিলখানার ভিতর দিয়ে যাওয়া আসা করি..’

পরিস্থিতি আউট অফ কন্ট্রোল দেখে আমি দৌড়ে গিয়ে আব্বুর প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট এনে ধরাই।

‘দ্যাখো..’ বলে অনেকক্ষণ আর কী বলা যায়, খুঁজে পাই না।

‘কী দেখব?’ প্রশ্ন তোলে মমতা।

‘না মানে, আমি এভাবে বলতে চাই নাই। আমি আসলে স্যরি।’

‘ঠিক আছে’, মেনে নেয় মমতা, আর ঠিকই সেই ঘুমানোর ব্যাপারেই তাগিদ দেয়।

‘তুমি এত ভালো..’ আমি বলার চেষ্টা করি।

সত্যিকার অর্থেই, কেঁদেও ফেলি একটু, আর প্রথমবারের মতো ফিলও করি, ঠিকই তো মমতা তো আমার মারাও যেতে পারত!

‘তোমার কোথাও লাগে নাই তো বাবু?’ জিগ্যেস করে শব্দ করেই কেঁদে ফেলি আমি।

‘ধুর বোকা’, মমতাও ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে। ‘কিচ্ছু হয় নাই আমার, এই তো আমি সুস্থ আছি।’

‘এবং আমার আছো’ বলে সিগারেটটা জাস্ট টোকা দিয়ে বাইরে ফেলে একপাশে ফিরে আমি ঘুমিয়ে পড়ি।

আমি যখন ঘুমিয়ে পড়ছি, সেনা, র‌্যাব ও পুলিশ-সদস্যরা তখন পিলখানার তিন নাম্বার গেট দিয়ে প্রথমবারের মতো বিডিআর সদর দফতরের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিল।

কিন্তু তারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। বিদ্রোহী বিডিআররা তাদের উদ্দেশ্যে মর্টাল শেল নিক্ষেপ করলে পিছু হটে যায় তিন বাহিনীর সদস্যরা। পরবর্তী কিছুসময় যৌথবাহিনীর হস্তক্ষেপ ঠেকাতে পিলখানার সবকয়টা গেট থেকে রাইফেল ও মেশিনগানের গুলি ছুড়তে থাকে বিদ্রোহীরা।

আশেপাশের কয়েকটি এলাকা পর্যন্ত নির্বিরাম গুলি বর্ষণের শব্দ শোনা যেতে থাকে। জিগাতলায় থাকা মমতা তখন ভয় পেয়ে একের পর এক ফোন করে গেলেও রাতে না ঘুমানো আমি সেসবের কিছুই টের পাই না।

দুপুর দুইটার দিকে সরকারের পক্ষ থেকে সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে এলজিএডি প্রতিমন্ত্রী ও হুইপ শাদা পতাকা হাতে পিলখানার সামনে গেলে সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যরা মাইকিং করে বিডিআর সদস্যদের প্রতি আলোচনার প্রস্তাব দেয়। জবাবে সেই গুলিই ছুঁড়তে থাকে বিদ্রোহী বিডিআররা। পরে এসব খবর আমি মমতার কাছ থেকে পাই।

‘তখন আমার অবস্থা যদি দেখতা, আমি তোমাকে একের পর এক ফোন করে যাচ্ছিলাম’, অভিমানী কণ্ঠে মমতা বলেছিল। ‘সারা এলাকায় তখন মাইকিং হচ্ছে, সবাইকে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ রাখতে বলা হচ্ছে। ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করা হচ্ছে। ভাবতে পারতেছ অবস্থাটা?’

‘আমি স্যরি বাবু, আমার এত ঘুম পাইছিল, তুমি তো জানোই, রাতভর আমি প্রেসে ছিলাম..’

‘না ঠিক আছে, তোমার ঘুম দরকার ছিল’, বলেছিল মমতা।

তবে, পরে পুলিশ সদস্যদের বদলে প্রতিমন্ত্রী নিজে যখন মাইকিং করে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সমঝোতার প্রস্তাব দেয়, তখন, বিকেল পৌনে তিনটার দিকে এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে বিডিআর সদস্যরা সরকারের এই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনায় বসে।

আমার ঘুম ভাঙে তারও প্রায় আড়াই ঘণ্টা পরে। ততক্ষণে বিডিআরের ১৪ সদস্যের একটা প্রতিনিধি দলকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে তার বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একঘণ্টারও বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের বৈঠক চলছে।

‘কী মনে হয়, শান্তিপূর্ণ কোনো সমাধানে পৌঁছতে পারবে আদৌ?’ জিগ্যেস করে মমতা।

‘নিশ্চয়ই, সেরকম ইচ্ছা না থাকলে তারা বৈঠক করতো না।’ আমি বলি।

আমার ঘুম ভেঙেছিল বাইন্ডিং হাউস থেকে দীপকদার ফোন পেয়ে। পঞ্চাশ কপির মতো বাইন্ডিং করে দিচ্ছেন আপাতত। এগুলো নিয়ে পরেরদিন ঢাকায়, একুশের বইমেলায়, বহেরা তলার লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে থাকার কথা আমার।

‘কিন্তু এই গণ্ডগোলের মধ্যে ঢাকায় এসে আবার বিপদে পড়বা না তো?’ এবার আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয় মমতা।

‘কিসের বিপদ’, আমি বলি, ‘আমি মনে করো কারওরান বাজারের ওদিকে কোনো একটা হোটেলে উঠব। সেখান থেকে শাহবাগে বইমেলায় যাওয়া-আসা, এই তো।’

‘কিন্তু আমাদের তো দেখা হবে না এবার, আব্বু বের হতে দিবে না আমাকে।’ মমতা বলে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি ‘সেটা আমিও ধারণা করছি, তাছাড়া বের হওয়াটা রিস্কিও হবে তোমার জন্য’, বলি।

‘খুব খারাপ লাগবে, তুমি ঢাকায় আসছ তবু দেখা হবে না’, বলে কেঁদে ফেলে মমতা।

আমি আশার প্রদীপ জ্বেলে রেখে বলি, ‘বৈঠকে হয়তো শান্তিপূর্ণ কোনো সমাধান বেরিয়ে আসবে।’

‘কিন্তু তাতেও কোনো লাভ নাই’, মমতা বলে, ‘আব্বু আসলে আগামী কয়েকদিন আমাকে ঘর থেকে বের হতে দিবে না।’

‘ও আচ্ছা, তাহলে আর কী, দ্রুত বিদ্রোহ থামানোর কোনো তাড়া রইল না আর।’ আমি বলি।

‘তুমি রাগ করতেছ বাবু? প্লিজ রাগ করো না..’

আমি ঠিক রাগ করছিলাম না যদিও, তবে মন তো একটু হচ্ছিলই খারাপ। সেটা ঠেকানোও যাচ্ছিল না কোনোভাবে। বাইন্ডিং করা পঞ্চাশ কপি শামুক নিয়ে রিকশায় উঠতেই, আবারও মমতার ফোন, ‘খবর শুনছো! সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হইছে। বিদ্রোহীরা অস্ত্র-সমর্পণে রাজি হইছে।’

‘ওয়াও, আর তো ভয় নাই কোনো, তুমি কি বের হতে পারবা তাহলে?’ আমি বহাল থাকি আমার নিজের ধান্দায়।

‘সেটা তো তোমাকে বললামই.. তবু আব্বুকে আবার বলে দেখব’, কথা দেয় মমতা।

‘দেইখো, কতদিন তোমাকে দেখি না, বুঝোই তো..’ আমি চাপা অনুরোধ জারি রাখি।

‘কতদিন বলো তো?’ জানতে চায় মমতা, অর্থাৎ আমাকে ঝামেলায় ফেলে দেয়।

‘ইয়ে মানে, কবে যেন লাস্ট দেখা হইছিল? অক্টোবরেই তো? নাকি নভেম্বরে?’ আমার দ্বিধা কাটে না।

‘বলব না, এবং এটাই উচিত হচ্ছে যে আমাদের দেখা হচ্ছে না’, এভাবে বলে, ধারণা করি যে, মমতা হয়তো দেখা না হওয়ার পেছনে আমারও কিছু দোষ সংযুক্ত করে।

ভাবি, ওর নিজের দিকের একাকী দোষের হয়তো আমার দিকের এটুকু দোষের সঙ্গ প্রয়োজন, তাই চুপ মেরে থাকি।

কিন্তু পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে ফিরে গিয়ে বিদ্রোহী জোয়ানরা অস্ত্র-জমা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় নতুন নাটক। কে বা কারা ছড়িয়ে দিয়েছে, অস্ত্র-সমর্পণের পর প্রত্যেক বিদ্রোহীকে ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে গুলি করে মারা হবে।

তাই তারা অস্ত্র-সমর্পণের অঙ্গীকার করে এলেও, উদ্ভূত নিরাপত্তাহীনতার সাপেক্ষে, অস্ত্র জমা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। নিরাপত্তা ইস্যুতে তারা আরো বিশ্বাসযোগ্য কোনো নিশ্চয়তা দাবি করে বসে সরকারের কাছ থেকে। থেমে থেমে দুয়েকটি ফাঁকা গুলির আওয়াজ শুনতে পায় মমতা।

‘পরিস্থিতি তো আবারও জটিল হয়ে গেল,’ ফোনে মমতা আমাকে বলে।

‘হ্যাঁ তাই তো দেখতেছি’, আমার শাদামাটা উত্তর।

কিছুক্ষণ বাক্যহীন থাকার পর এবার আমিই জোর দিয়ে বলে উঠি, ‘না না, তোমার বের হবার প্রশ্নই আসে না। বিদ্রোহীদের প্রত্যেককে গ্রেফতার করার আগে বের হবা না।’

‘এবং তুমিও আইসো না এই সময়ে।,’ সর্বোচ্চ বাস্তববাদী হয়ে সে বলে।

আমি জবাবে কিছু একটা বলতে শুরু করার মুখেই মমতা বাকি অংশটুকু বলতে শুরু করে, ‘এক বছর লিটল ম্যাগাজিন প্রাঙ্গণে না আসলে কিছু হবে না। তাছাড়া মেলা তো আরো কয়েকদিন চলবে। এর মধ্যে যদি পরিস্থিতি শান্ত হয়, তখন আসো।’

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, ধরো সেটা ২৮ তারিখেই। পরিস্থিতি শান্ত হবার পর আমি আসলাম। তখন কি তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে?’

‘তুমি বারবার এটা বলে আমাকে কষ্ট দিচ্ছ,’ দাবি করে মমতা, ‘জানোই তো আব্বু কিছু বললে সেটা না শোনার উপায় থাকে না আমার।’


‘সব তোমাকে খুলে বলার উপায় ছিল না,’ আমি বলি, ‘আমরা বিদ্রোহ করব এটা আগেই জানতাম, তাই তো তোমাকে নিষেধ করছিলাম।’


সেক্ষেত্রে কালকেও যা ২৮ তারিখও তাই। অযথা দেরি করে আসব কেন? স্টলগুলোতে দুয়েকটা দিন শামুকের নতুন সংখ্যাটা থাকবে না? আমার ভাবনাপদ্ধতি অনেকটা এভাবেই কাজ করছিল তখন। তাই, ‘ওকে স্যরি, আমি তোমাকে আসতে বলতেছি না। দরকার নাই এবার দেখা করার। কিন্তু আমার লিটল ম্যাগাজিনটা নিয়ে আমাকে মেলায় আসতে দাও?’ আকুতি জানাচ্ছিলাম আমি।

‘সেটা তুমি চাইলে তোমাকে তো ঠেকাতে পারব না আমি,’ নিস্পৃহ কণ্ঠে সে বলে।

‘দ্যাখো, সারা বছরে একটাই সংখ্যা বের হয়। বইমেলাটাই থাকে প্রধান টার্গেট।’

‘ঠিক আছে তুমি আসো,’ অনুমতি দেয় মমতা, ‘কিন্তু ঢাকায় এসে আবার ফেনী ফেরার আগ পর্যন্ত আমার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করবা না।’

হঠাৎই ইগোতে লাগে কথাটা। বলি, ‘কী ভাবো তুমি নিজেকে? তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য মরে যাচ্ছি নাকি আমি?’ এবং ক্ষেপে গিয়ে এও বলি যে, ‘যাও, কখনোই আর তোমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করব না আমি।’ বাইন্ডিং হওয়া শামুকগুলো নিয়ে বাসায় ফিরে মোবাইল বন্ধ করে দিই।

তবে, যেহেতু মমতাকে সত্যিই ভালোবাসতাম, তাই, এবার নিজ থেকেই গিয়ে আব্বুর পাশে বসি।

‘কী অবস্থা এখন?’ জানতে চাইলে উচ্ছ্বসিত আব্বু নতুন একটা সিগারেট ধরিয়ে মুহূর্তেই আবার সচেতন নাগরিক হিশেবে প্রাপ্ত বেদনার ছাপকে স্পষ্ট করে তুলে বলে, ‘আর বলিস না, নতুন শর্ত দিছে এখন। আগে সেনাবাহিনী সরাইতে হবে। তারপর অস্ত্র-সমর্পণ।’

‘ভালোই তো নাটক,’ আমার দায়সারা উত্তর, যা ঘটনার আগে পরে কোনো গুরুত্বই যোগ করে না।

এবং সিগারেটের প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে ‘বাহ আবারও সিগারেট আনছেন। বাঁচার ইচ্ছা নাই নাকি?’ জিগ্যেস করলে আব্বু বলে, ‘আর বাঁচন। দেশব্যাপী সেনাবিদ্রোহ শুরু হয় কিনা সেই চিন্তা কর।’

কিছুক্ষণ নীরবতার পর প্রসঙ্গ-প্রাপ্তির উচ্ছ্বাসে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোর দুপুরের বন্ধুটা কী যেন নাম? ..মমতা, সে তো বড় বাঁচা বেঁচে গেছে আজকে।’

‘হুঁ,’ আমি সায় দিই।

‘ব্যাপার কী বলত,’ আমার দিকে ভালো করে লক্ষ করে আব্বু বলে, ‘মন-মিজাজ খারাপ নাকি?’

আমি জবাব না দিয়ে আমার রুমে চলে আসলাম।

রাতে আমার রুমে এসে বাইন্ডিং হওয়া শামুকের সংখ্যাগুলো দেখে, আব্বু এই মর্মে অবাক হলো যে, ‘এই অবস্থায় তুই ঢাকা যাবি!’

‘কী অবস্থা?’ আমি জানতে চাই।

‘বিডিআর বিদ্রোহের মধ্যে ঢাকা যাওয়া চলবে না,’ কড়াভাবে জানিয়ে দেয় আব্বু।

‘বুঝতেছেন না কেন, আমি যাব বইমেলায়, বিডিআর বিদ্রোহের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?’ বিরক্ত হয়ে জিগ্যেস করি।

‘দেখি সংখ্যা কেমন হইছে,’ বলে শামুকের শেষ সংখ্যাটা উল্টেপাল্টে দেখছিল আব্বু।

‘বছরে একটাই সংখ্যা করি, যত্ন নিয়ে করি।’ আমার আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ।

‘কিন্তু এই অবস্থায় ঢাকায় যাওয়া চলবে না।’ সিদ্ধান্ত একই থাকে তার, ‘তাছাড়া..’

‘তাছাড়া কী?’ চূড়ান্ত অশ্রদ্ধাসহ আমি জানতে চাই।

‘বানান ভুল আছে, “স্বাতন্ত্র্য” বানানে স-এর নিচে ব হবে না।’

‘বলেন কী!’ মাথাখারাপ দশা হয় আমার, ‘আপনি শিওর?’

‘অবশ্যই।’ নিস্পৃহ কণ্ঠে আব্বু বলে, ‘ডিকশনারি দ্যাখ।’

‘ডিকশনারি তো বাসায় নাই, প্রুফ দেখতে শিবুর বাসায় নিয়ে গেছিলাম।’

‘তাহলে পরে দেখে নিস।’ বলে নাটকীয়ভাবে চলে যেতে থাকা আব্বুকে, ‘তবু আমি ঢাকা যাব, সকাল আটটা পঞ্চাশে আমার ট্রেন।’ জানিয়ে দিই।

‘অবাধ্য সন্তানকে এরচেয়ে বেশি কিছু বলার নাই,’ এ-ধরনের উচ্চমার্গীয় ভর্ৎসনা করে মমতার মতো আব্বুও আমার মেজাজ তুঙ্গে তুলে দিয়ে চলে যায়।

‘কী অবস্থা এখন মমতার?’ ভাবি আমি, ‘এবং দেশের?’ সন্ধ্যা থেকে মোবাইল বন্ধ করে রাখা, খবর দেখতেও যাই নি আর। যাওয়া উচিত? এইসব ভাবছি যখন, আবারও ছুটে এসে আব্বু জানিয়ে যায়, বিদ্রোহীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র জমা দিতে শুরু করেছে।

ফলে, এইবার অন্তত আর আমার ঢাকায় যাওয়া নিয়ে আপত্তি তুলতে নিষেধ করি তাকে।

খেতে বসে আবারও মমতার প্রসঙ্গ তোলে আব্বু, ‘কালকে ঢাকায় গিয়ে কি ওই মেয়ের সঙ্গে দেখা করবি?’

‘না, সেও তোমার মতোই এক অবিবেচক আব্বু জাতীয় উদ্ভিদের শিকার।’ আমি বলি।

‘মানে বের হতে দিবে না?’

আমি উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকি।

‘তাহলে তোর ঢাকায় গিয়ে লাভ কী?’ অর্থপূর্ণ কণ্ঠে জিগ্যেস করে আমাকে।

‘আশ্চর্য তো!’ তাৎক্ষণিকভাবে খাওয়া ছেড়ে উঠে যাওয়ার ভঙ্গি করে আমি বলি, ‘আমি কি মেয়েদের সাথে দেখা করতে ঢাকায় যাই নাকি?’

আমরা যখন এসব হালকা কথাবার্তায় ব্যস্ত, অস্ত্র জমা নেওয়ার পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন সেনা অফিসারদের আটকে পড়া দুয়েকটি পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসে।

রাতেই, উদ্ধারকৃত এসব পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ভেতরে ঘটে যাওয়া বিদ্রোহীদের তাণ্ডবলীলা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে।

ততক্ষণে, সকাল-সকাল ট্রেন ধরার উদ্দেশ্যে, রুমভর্তি নতুন ছাপা শামুকের গন্ধ নিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। আর, ভোরের দিকে দেখা এক স্বপ্নে বিদ্রোহী বিডিআর রূপে আবিষ্কার করি নিজেকে।

দেখি একটা সাইকেল চলার মতো সরু পথ ধরে পিলখানার ভেতর দিয়ে মমতা হেঁটে যাচ্ছে। ওকে দেখে বিদ্রোহরত আমি যারপরনাই বিরক্ত হয়ে বলি, ‘তোমাকে না বললাম, আজকে কলেজে যেতে হবে না!’

‘তোমার কথা শুনব কেন?’ জিগ্যেস করে সে।

‘সব তোমাকে খুলে বলার উপায় ছিল না,’ আমি বলি, ‘আমরা বিদ্রোহ করব এটা আগেই জানতাম, তাই তো তোমাকে নিষেধ করছিলাম।’

‘এখন কি তোমরা সেনা অফিসারদের মেরে ফেলতেছ?’ স্বপ্নের মধ্যে বিষণ্ন ভঙ্গিতে মমতা জানতে চায়।

‘উপায় ছিল না,’ আমি বলি, ‘তবে আমি মারি নাই, আমি এখানে বিডিআরদের সাইকেল পাহারা দিচ্ছি।’

‘তাহলে তো তুমি নির্দোষ, পালাও, এখনো সময় আছে।’ মমতা আমাকে বলে।

‘আমার পালানোর সুযোগ নাই, তুমি পালাও, চলো তোমাকে পার করে দিয়ে আসি।’ বলে একটা সাইকেল নিয়ে ওকেসহ পিলখানার ভেতর দিয়ে ছুটে যেতে থাকি।

‘কোন দিক দিয়ে বের হব আমরা? সবদিকেই তো সেনাবাহিনী ঘিরে রেখেছে।’ মমতা আমাকে বলে।

‘আছে একটা দিক, তোমাকে নিরাপদে পার করে দিব।’ আশ্বস্ত করে আমি বলি।

‘ওই যে দ্যাখো মুন্নী সাহা,’ স্বপ্নের মধ্যে মমতা আমাকে দেখায়, ‘… বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথা বলতেছে।’

‘আরে তাই তো! মুন্নী সাহা কী করে এখানে,’ ভাবতে ভাবতে সাইকেল চালাতে চালাতে হঠাৎই আরেক বিদ্রোহী ভাইয়ের সামনে পড়ে যাই। ‘এই মেয়ে কোত্থেকে আসলো, এ কি কোনো সেনা অফিসারের মেয়ে? তাকে পালাতে সাহায্য করার অপরাধে তোমাকেও শাস্তি দেওয়া হলো…’

কী সেই শাস্তি জানার আগেই ঘুম ভেঙে আজানের শব্দ শুনতে পাই, ফোন ওপেন করে কল দিই মমতাকে। কিন্তু ‘নাম্বার বিজি’। কল করে ডিসপ্লেতে ‘ওয়েটিং’ লেখাটা দেখলে যেকোনো প্রেক্ষিতেই আমি কষ্ট পাই, তাই নিজেই বলে নাম্বার বিজি অপশন চালু করিয়েছিলাম। পরবর্তী প্রায় বিশ মিনিট পার হয়ে গেলেও, মমতার নাম্বার বিজিই দেখিয়ে গেল ফোন কোম্পানি।

যান্ত্রিক কোনো ক্রুটি? নয়তো এই ভোরে এতক্ষণ ধরে কার সঙ্গে কথা বলবে মমতা? আমি বুঝতে পারি না। কিন্তু কষ্ট পেতে শুরু করি। এবং এসএমএস দিই, ‘তোমাকে স্বপ্নে দেখে ঘুম ভাঙল, তুমি কার সঙ্গে কথা বলতেছ?’ সেটারও কোনো রিপ্লাই আসে না। যেহেতু এরপর ডিউরেশনটা প্রায় চল্লিশ মিনিটে গিয়ে দাঁড়ায়।

এটা ছিল এমন একটা ঘটনা, যে ধরনের ঘটনা আগে কখনো ঘটে নি। বা ঘটলেও আমি টের পাই নি। যেহেতু ভোরে সাধারণত আমি ঘুমিয়েই থাকি।

‘স্যরি স্যরি স্যরি, আমি ভাবছিলাম এটা ওয়েলকাম টিউনের মেসেজ। তাই আর খুলে দেখি নাই। নইলে তোমাকে কি আমি এতক্ষণ অপেক্ষা করাতাম, তুমিই বলো?’ জানতে চায় মমতা।

‘সে বিষয়ে আমি একমত, আমার মেসেজ টের পেলে তখনই আমাকে কল দিয়ে কিছুতেই তুমি এটা বুঝতে দিতা না যে, কারো সঙ্গে তুমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রেমের আলাপ জমিয়ে থাকো,’ আমি বলি।

‘দ্যাখো রাগ কিন্তু আমার দেখানো উচিত,’ সে বলে, ‘তুমি সন্ধ্যা থেকে মোবাইল বন্ধ করে রাখছ।’

‘হ্যাঁ সেজন্য অবশ্যই অন্য কারো সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার বৈধতা তৈরি হইছে তোমার।’ রাগে কাঁপতে কাঁপতে আমি বলতে পারলাম।

‘দ্যাখো, শোনো, মূল ঘটনা না জেনে এভাবে সন্দেহ করাটা কিন্তু ঠিক না।’ সে বলার চেষ্টা করে।

‘বলো, কী সেই মূল ঘটনা,’ আমি আগ্রহ দেখাই, ‘কার সঙ্গে কথা বলতেছিলা?’

‘এ হলো আমাদের বাড়ির পাশের এক ভাই, ছোটবেলায় একসাথে আমরা খেলতাম টেলতাম, আমার চেয়ে বয়সে বড় যদিও,’ সে তার ভূমিকাযুক্ত ব্যাখ্যা দিতে শুরু করে।

বাগড়া দিয়ে আমি বলি, ‘বয়সে একটু বড় হলেই তো সুবিধা।’

‘প্লিজ আমাকে বলতে দাও,’ মিহি আকুতি মমতার।

‘জি আচ্ছা, বলো।’

‘আমরা ঢাকায় চলে আসার পরে তেমন দেখা টেখা হয় নাই। বছর খানেক আগে আমার এক ফুপাতো বোনের বিয়েতে, তাও ঢাকায়, সেই সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা।’

‘ব্যক্তির নাম তাহলে সেলিম..’ আমি বাম হাত ঢুকাই।

‘ওফ্, থামো তো প্লিজ,’ মমতা বিরক্ত হয় এতে, ‘তো, কথাবার্তা হলো। কত ছোট দেখছিলেন আমাকে, তার বিপরীতে এখন কত বড় হয়ে গেছি এসব আলাপ। জানালেন, উনি এখন সেনাবাহিনীতে আছেন। তাও দেশে না, জাতিসংঘের শান্তিমিশনে। ছুটিতে দেশে আসছেন,’ ব্যাখ্যাটা একধরনের দেওয়া হয়ে গেছে মর্মে থেমে যায় মমতা।

কিন্তু আমি জানতে চাই, ‘সেটার সাথে একঘণ্টা কথা বলার কী সম্পর্ক?’

‘ও হ্যাঁ,’ ভুলে যাওয়া প্রসঙ্গ মনে পড়ার ভঙ্গিতে সে বলে, ‘আজকে পিলখানার ঘটনার পর উনি হঠাৎ ফোন দিলেন। বাইরে আছেন তো, আমার মাধ্যমে সারাদিন দেশের খবরাখবর নিলেন। আফ্রিকার কোন জঙ্গলে, টিভি বা ইন্টারনেট নাই এমন একটা অবস্থার মধ্যে উনি আছেন। তাই আমার মাধ্যমে খবরগুলো নিচ্ছিলেন।’

আমি জিগ্যেস করলাম, ‘সারাদিনে বিনিময়কৃত খবরগুলো নিয়ে ভোররাতের স্পেশাল টকশো করলা এতক্ষণ?’

‘দ্যাখো বাজে ইঙ্গিত অনেক করছ, এবার থামো। নিঃসন্দেহে সে হতাশ হয়ে পড়ছে এসব শুনে…’

‘তাই তোমার কাছ থেকে সান্ত্বনা আদায়ের জন্য সে ফোন করছে। এবং তুমি তাকে তা দিছো।’

‘হ্যাঁ দিছি, কোনো সমস্যা? ফারদার আমাকে ফোন করবা না’, বলে লাইন কেটে দেয় মমতা।

আমি ফোন রেখে শামুকের একটা কপি উল্টেপাল্টে দেখতে শুরু করলাম কোথাও কোনো ভুল রয়ে গেল কিনা। স্বাতন্ত্র্য বানানটার দিকে চোখ পড়ল। আব্বুর মতে স্বাতন্ত্র্য বানানে স-এর নিচে ব হবে না, সাতন্ত্র্য—হবে এরকম, নিচের ব ছাড়া এবং সঙ্গে য-ফলা যুক্ত হবে। য-ফলা পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু স-এর নিচে কি আসলেই ব হবে না? এবং মমতাকে কি আসলেই বিশ্বাস করা যায়?

রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে জোয়ানরা অস্ত্র জমা দিতে শুরু করলেও দুয়েকটি সেনা পরিবারকে উদ্ধার করে তিনি ওই স্থান ত্যাগ করার পর সমর্পণ-প্রক্রিয়াটি থেমে যায়। সকাল থেকে আবারও সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে অস্ত্র-সমর্পণ বিষয়ক কথাবার্তা চলতে থাকে। একইসঙ্গে একজন দুইজন করে জিম্মি মুক্ত করতে থাকে বিদ্রোহী বিডিআররা।

বেরিয়ে এসে তারা ভেতরে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডসমূহের বর্ণনা দিতে শুরু করল। এতক্ষণ পর্যন্ত নানা সুযোগ-সুবিধা-বঞ্চিত ও বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত বিডিআরদের প্রতি তৈরি হওয়া পাবলিক সিমপ্যাথি ডাইভার্ট হয়ে নিহত সেনা অফিসারদের দিকে চলে যায়।

জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এক ভাষণেও বিডিআরদের প্রতি আগেকার নমনীয়-ভাব উবে গিয়ে সেখানে প্রতিস্থাপিত হয় “দ্রুত ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার আহবান”, এবং অন্যথায়, “কঠোর ব্যবস্থা-গ্রহণের” ঘোষণা।


বরাবরের মতোই সীমান্তবর্তী এলাকার স্টেশন হিশেবে দুয়েকজন বিডিআর সদস্যকেও বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেল প্লাটফর্মে।


এমন পরিস্থিতিতে ভীত অনেক বিডিআর সদস্য পিলখানা ছেড়ে পালাচ্ছে, অসমর্থিত সূত্রে এ-ধরনের খবর পাওয়া যেতে থাকে। এমনকি সারাদেশের বিডিআর ক্যাম্পগুলোতে এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, ট্রেনে বসে আমি এমন গুজবেরও মুখোমুখি হই। আর সেটা বেশ সত্য-আতঙ্ক হয়েই ধরা দেয় যখন ট্রেনের সব যাত্রীরা মিলে টের পাই, আমাদের কারো মোবাইলেই কোনো নেটওয়ার্ক নেই। বলাবলি হয়, ফোনে ফোনে যেন দেশব্যাপী বিদ্রোহ উস্কে দিতে না পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা। ফলে বিশ্বাস না করেও উপায় থাকে না।

দুর্ভাগ্যক্রমে ঢাকাগামী মহানগর প্রভাতী ট্রেনটা তখন কুমিল্লা থেকে আখাউড়ার মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ সীমান্ত-ঘেঁষা এলাকা অতিক্রম করছিল। তাই কে বা কারা সারা ট্রেনে দ্রুত এই গুজব ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয় যে, সীমান্তবর্তী ক্যাম্পগুলোতেও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছে। ট্রেনেও হামলা হতে পারে, এই ভয়ে উদ্বিগ্ন যাত্রীরা সরব হয়ে ট্রেনের সবকয়টা জানালার অ্যালুমিনিয়াম শাটার বন্ধ করে দেয়।

জানালার পাশে সিট না পাওয়া নিয়ে চাপা অসন্তোষ ছিল আমার মধ্যে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মনে হতে থাকে, ভালোই হয়েছে না পেয়ে। এক বৃদ্ধ তার জানালার অ্যালুমিনিয়াম শাটার বন্ধ করতে পারছিল না। ব্যক্তিত্বের কারণে উঠেও আসতে পারছিল না সিট থেকে। ফলে তার বসে থাকার মধ্যে একটা আত্মঘাতী মহত্ত্ব এসে ভর করে। যেন তার বুক বিদ্রোহীদের বুলেটে ঝাঁঝরা হবে বলে, সে তার শার্টের দুটো বোতামও খুলে দেয়। এ প্রস্তুতি ভীতি ধরিয়ে দেয় তার পাশে বসা যাত্রীটির মনে। উঠে এসে সে ‘খাবার গাড়ি কোন দিকে, খাবার গাড়ি কোন দিকে’ বলে আসলে যে সে ভয় পেয়েছে এই তথ্য গোপন করে অজ্ঞাত খাবার গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।

আমি তাকে পাওয়ারকার সামনে পড়লে বগির ভেতরকার লাইটগুলো জ্বালিয়ে দিতে বললাম। এতে সে ভুত দেখার মতো চমকে উঠে ‘অন্ধকারই ভালো’ মন্তব্য করে অন্য বগিতে চলে গেল। এমন অবস্থায় পিলখানা থেকে সামান্য দূরত্বে থাকা মমতার কথা ভেবে হঠাৎই আমি ব্যাকুল হয়ে উঠি। রাগ ভেঙে কল দিতে যাই ওকে, কিন্তু মনেই থাকে না, অনেকক্ষণ হলো কারো মোবাইলেই কোনো নেটওয়ার্ক নেই। দেশের পরিস্থিতি কি আসলেই এত খারাপ?

ট্রেন আখাউড়া স্টেশনে দাঁড়ালে, প্ল্যাটফর্মে হকারদের হাঁকডাক শুনে আশ্বস্ত হয়ে, তাও কিছুটা ভয়ে ভয়ে জানালা খোলে যাত্রীরা। বরাবরের মতোই সীমান্তবর্তী এলাকার স্টেশন হিশেবে দুয়েকজন বিডিআর সদস্যকেও বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেল প্লাটফর্মে। কিন্তু তাদেরকে ঠিক বিদ্রোহী বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভবত সবটাই গুজব।

এরপর ঢাকায় পৌঁছানোর আগে আগে মোবাইল নেটওয়ার্ক আবার ফিরিয়ে দেওয়া হলে, আব্বুর ফোন পেয়ে বগির মধ্যে আমিই প্রথম সেটা টের পাই। এবং আমার দেখাদেখি অন্যরাও তখন মোবাইল বের করে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের ফোন দিতে শুরু করলে মুখর হয়ে ওঠে পুরো বগি।

‘কী অবস্থা, সব ঠিকঠাক?’ আব্বু জানতে চায়।

‘হ্যাঁ, ফোনে নেটওয়ার্ক ছিল আপনার?’ আমি পাল্টা প্রশ্ন করি।

‘না, এইমাত্র আসলো,’ আব্বু বলে।

‘তারমানে সারা দেশেই নেটওয়ার্ক ছিল না,’ বিড়বিড় করে আমি বলি।

আমাকে কখন কোথায় কিভাবে থাকছি সেসবের আপডেট জানাতে বলে আব্বু ফোন ছাড়া মাত্রই মমতার কল এসে ঢোকে।

‘হেই কী অবস্থা? আসছ তুমি? কোথায় এখন?’ উদ্বেগ ও আন্তরিকতার এই বহর দেখে ভোররাতে ঘটা সবকিছু ভুলে মমতাকে আমি বুকে টেনে নিলাম।

‘আসছি বাবু, কী হইছে জানো না, সারা ট্রেনে সে কী আতঙ্ক, সীমান্ত-ঘেঁষা এলাকাগুলো যখন পার হচ্ছিল, ফোনে নেটওয়ার্ক নাই, সবাই বলতেছিল বিদ্রোহী বিডিআররা নাকি ট্রেনে গুলি ছুঁড়বে…’ গুছিয়ে উঠতে না পেরে অথচ কয়েক বাক্যেই সব বুঝিয়ে ফেলতে চাই আমি।

‘আমি খুব টেনশনে ছিলাম তোমাকে নিয়ে, ভোরের ঘটনার জন্য আমি স্যরি বাবু। আমার উচিত হয় নাই এতক্ষণ কথা বলা।’ ভুল স্বীকার করে মমতা বলে।

‘ইটস ওকে ইটস ওকে’ বলে আমি সর্বোচ্চ উদারতা প্রদর্শন করতে থাকি।

কমলাপুরই আমার গন্তব্য ছিল, কিন্তু অনির্ধারিতভাবে তেজগাঁও স্টেশনে থেমে পড়লে তড়িঘড়ি করে আরো অনেকের সঙ্গে আমিও ট্রেন থেকে নেমে পড়ি।

আমি যখন ঢাকায় নামছি, ততক্ষণে পিলখানার ভেতরে ঘটা নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ মিলতে শুরু করেছে। বুড়িগঙ্গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ছয়জন সেনা অফিসারের লাশ। পরিস্থিতি আর নিজেদের পক্ষে নয় বুঝতে পেরে ছদ্মবেশে অনেক বিদ্রোহীরা পালিয়ে যাচ্ছে, খবর পেয়ে আবারও আব্বু কল দেয় আমাকে, ‘ঢাকায় কোনো বন্ধু-বান্ধব নাই যার বাসায় ওঠা যায়?’ জিগ্যেস করে।

‘হ্যাঁ অনেকেই আছে,’ আমার সহজ সরল জবাব, ‘কিন্তু কারো বাসায় উঠে কাউকে আমি বিরক্ত করতে চাই না,’ সাফ জানিয়ে দিই।

‘শোন, পরিস্থিতি ভালো না,’ আব্বু আমাকে ঠান্ডা মাথায় বোঝানোর চেষ্টা করে, ‘বিদ্রোহীরা পালাইতে শুরু করছে। তারাও হয়তো তোর মতো কোনো হোটেলে উঠবে। পরে দেখা যাবে নতুন কোনো পরিস্থিতিতে তুইও জিম্মি হয়ে যাবি।’

আমি ‘দয়া করে এত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কোনো বিপদ কল্পনা করতে’ নিষেধ করলাম আব্বুকে।

কিন্তু আব্বু এটাকে কোনোভাবেই ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে করা কোনো কল্পনা হিশেবে মেনে নিতে রাজি হয় না। এবং বর্তমান অবস্থা জেনে নিতে প্রশ্ন করে, ‘তুই এখন কোথায়, কী করতেছিস?’

বলি, ‘তেজগাঁও স্টেশনে নামছি। স্টেশনের বাইরেই একটা হোটেলে ভাত খাচ্ছি। এদিকেই কোনো একটা হোটেলে উঠব।’

‘প্লিজ এটা করিস না, প্রয়োজনে সরাসরি বইমেলায় চলে যা’ আব্বু বলে।

‘মাথা খারাপ?’ আমি বলি, ‘এত লং জার্নির পর একটু গোসল টোসল করে ফ্রেশ না হয়েই বইমেলায় চলে যাই কিভাবে?’

অর্থাৎ আব্বুর প্রায় কোনো কথাই আমি নিই না, এবং খাবার বিল মিটিয়ে দ্রুতই একটা আবাসিক হোটেলের ম্যানেজারের সামনে গিয়ে দাঁড়াই।

‘কোত্থেকে আসছেন?’/ ‘কী উদ্দেশে?’ ফরমে পূরণ করার পাশাপাশি মৌখিকভাবেও এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। জানি না সেটা পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণেই কিনা। কিন্তু তখন-সময় হোটেল ম্যানেজারের যেকোনো সাধারণ কৌতূহলকেও পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ বলেই মনে হচ্ছিল। ভোরে দেখা সেই স্বপ্নের প্রভাবে নিজের মধ্যেও কেমন যেন একটা পালিয়ে আসা বিডিআর-ভাব জাগ্রত হচ্ছে, অনেক চেষ্টা করেও যেটাকে ঠিক থামানো যাচ্ছে না।

‘বয়স কত’ ফরমে ও মৌখিকভাবে এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে হোটেল ম্যানেজারের অবিশ্বাসী ভ্রু-কুঞ্চনের শিকার হই। ‘কী বলেন! এত কম? দেখে তো মনে হয় না,’ হয়তোবা সরল জায়গা থেকেই, এ ছিল তার মন্তব্য। কিন্তু আমি বলে বসলাম, ‘কেন, এই বয়স তো বিডিআরে থাকার জন্য যথেষ্ট।’ এতে সে ‘কী জিগাই আর কী কয়’-সুলভ একটা অভিব্যক্তি দিলে, প্রথমবারের মতো মনে হয়, সে আসলে সাধারণ কৌতূহলের জায়গা থেকেই এসব প্রশ্ন করেছে। স্বপ্নের প্রভাবে, এমনকি কিছুক্ষণ আগে পাওয়া আব্বুর ফোনকলের প্রভাবেও, সামান্য হোটেল রেজিস্ট্রি খাতার সামনে দাঁড়িয়ে আমি ঘামতে নিচ্ছিলাম।

আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে তাকে আমার রুমে একটা সাবান ও শ্যাম্পু পাঠিয়ে দিতে বলে করিডোর ধরে হাঁটা দিতেই পেছন থেকে ডেকে সে বলল, ‘চাবি নিয়ে যান।’

স্বপ্নের হিশেবে, যেন সত্যিই এবার আমি ধরা পড়ে গেলাম, পালিয়ে আসার এই উত্তেজনা গোপন রাখা গেল না হেতু, যেন আমার পিঠের দিকে অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়েছে হোটেল ম্যানেজার।

কিন্তু তা নয়, তার হাতে একটি নিরীহ চাবি মাত্র, এবং চাবিটি আমার হাতে তুলে দেওয়ার আগ মুহূর্তে সে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করল, ‘না, আপনারে একটা নিরিবিলি রুম দিই।

‘কেন কেন কেন? নিরিবিলি রুম কেন?’ তিনবার কেন-সহ নিরিবিলি রুম দেওয়ার কারণ জানতে চাই আমি।

ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়ে তার বিমর্ষ উত্তর, ‘লেখক মানুষ, ভাবলাম নিরিবিলি একটা রুম দিই।’

‘ও আচ্ছা,’ বেড়ে যাওয়া হার্টবিটে ব্রেক কষতে কষতে আমি বলি, ‘না না, থাকুক কোলাহলের মধ্যেই একটা রুম দেন।’

ম্যানেজার আমাকে আগের চাবিটিই দিয়ে, করিডোর দিয়ে নয়, বরং পাশের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে যেতে বলে।

এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে এই বলে যে, ‘আপনার মতো আরেকজন আছে হোটেলে, সে নিজে থেকেই নিরিবিলি রুম চাইছিল, তাই আপনাকে বলা।’

আমার মতো একজন বলতে কী বুঝাচ্ছে? তবে কি এই হোটেলে আগে থেকেই, পালিয়ে আসা বিদ্রোহীরা থাকতে শুরু করেছে? (অথচ সে যে আরেকজন লেখক বা লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক হতে পারে সেটা আমার মাথাতেই আসে না)।

‘আমার মতো বলতে?’ প্রশ্ন করি হোটেল ম্যানেজারকে, আর ঠিক তখনই মমতা হঠাৎ কল দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, আমাকে স্বপ্নে দেখে ঘুম ভাঙছিল তোমার, কী দেখছিলা স্বপ্নে, বললা না তো!’

আমি কী বলব ভেবে পেলাম না। বিশেষত এই আধা-সন্দেহজনক হোটেল ম্যানেজারের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে। কিন্তু মমতাকেইবা কী বলে এড়াব? ‘আমি এখন চেক-ইন করতেছি, রুমে গিয়া বলি?’

‘না, এক্ষুনি বলো,’ তার কড়া ভাষার জবাব।

ফলে আমি বলতে শুরু করি এবং বলতে থাকি, ‘দেখলাম পিলখানার ভিতরে একটা সাইকেল চলার উপযোগী রাস্তা ধরে তুমি হাঁটতেছ। আমি খুব ক্ষেপে গেলাম তোমাকে দেখে, বললাম, আজকে তোমাকে কলেজে যাইতে মানা করছিলাম, আগেই জানতাম আজকে বিদ্রোহ হবে। তুমি বললা আমরা সত্যিই ডিজিকে মেরে ফেলছি কিনা, আমি বললাম, উপায় ছিল না, তবে আমি সেখানে ছিলাম না, আমি এখানে বিডিআরদের সাইকেল পাহারা দিতেছি। তখন তুমি আমাকে পালাইয়া যাইতে বললা। যেহেতু আমি নির্দোষ। আমি তখন একটা সাইকেল নিয়া তোমাকেসহ পিলখানার ভেতর দিয়ে ছুটে যেতে থাকলাম। তুমি হঠাৎ দেখলা মুন্নী সাহা বিদ্রোহী বিডিআরদের সাক্ষাৎকার নিতেছে। আমাকেও বললা দেখতে।’

বাকিটুকু আর বললাম না, এতেই হোটেল ম্যানেজার তার চেয়ার থেকে যেন-বা বসে থাকলে দাঁড়িয়ে যেত, তার বদলে দাঁড়িয়েই থাকার কারণে বসে পড়ল।

আমি ‘সিগারেট নিয়ে আসি’ এ-রকম একটা মৃদু শব্দ উচ্চারণপূর্বক হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে আসি।

এবং যেন একটা সিগারেটের দোকানই খুঁজছি এমন ভঙ্গিতে একটু এগিয়ে গিয়ে একটা রিকশা নিয়ে সোনারগাঁও হোটেলের সামনে চলে যাই। সেখান থেকে বাসে উঠে যখন শাহবাগে পৌঁছাই, সন্ধ্যা নামে নামে। কিন্তু রাস্তাঘাটে মানুষজন অস্বাভাবিক রকমের কম। বিশ কপি শামুকসহ বইমেলার ভেতরে ঢুকে দেখতে পাই দোকানপাট বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাই। একধরনের, পরিস্থিতিটা ঠিক বুঝতে না পারা পায়ে আমি এগুতে থাকি। বহেরা তলায় লিটল ম্যাগাজিন প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখতে পাই এখানকার দোকানপাট আরো আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। একমাত্র আশিক আকবরই শেষ ব্যক্তি হিশেবে তার স্টলের মালপত্র গোটাচ্ছে।

‘কী ব্যাপার আশিক ভাই, মেলা আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কেন?’

কিন্তু একাগ্রচিত্তে তিনি তার মালপত্র গোটাতেই ব্যস্ত।

‘শামুকের নতুন সংখ্যা বের হইছিল, সেটা দিতে আসছিলাম, সবই তো বন্ধ, কাকে দিব?’ এ ব্যাপারেও তার হস্তক্ষেপ কামনা করি।

প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত থাকা ব্যক্তি হিশেবে এবার তিনি সাড়া দেন। তাও মৃদুচালে।

‘আমাকে দিয়ে যেতে পারেন কয়েক কপি, তবে সবগুলো নয়,’ কিছুটা নির্দয় স্বরে দয়া দেখাতে ভালোবাসেন বলে মনে হলো তাকে। তাও যথেষ্ট, আমি দশ কপি শামুক দিতে চাইলাম, কিন্তু ‘মেলা প্রায় শেষ, অবিক্রিত শামুকে পা কাটতে চাই না’ বলে তিনি মাত্র পাঁচ কপি শামুক দিতে বললেন।

‘২৮ তারিখ বিকালে এসে, (যদি বিক্রি হয়,) দাম নিয়ে যাবেন।’ বলে সে তার স্টলটি ফাইনালি বন্ধ করে এবার আমার শুরুর দিকে করা প্রশ্নটির প্রতিও সদয় হয়, ‘বিডিআর ইস্যু,’ তবে খুবই সংক্ষিপ্ত জবাব তার, যেন-বা এটুকুতেই রিলেট করতে পারি কিনা সেই পরীক্ষা নেওয়া। যথারীতি পাশ করে যাই, এবং তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিই।

আগেই বন্ধ হয়ে যাওয়া বইমেলা থেকে বেরিয়ে এসে মমতাকে ফোন দিলে, আশ্চর্য যে, তার নাম্বারটিও তখন বন্ধ পাই। ফলে আব্বুকে ফোন দিয়ে আমি জিগ্যেস করি, ‘ফেনী আসার বাস ঢাকার কোত্থেকে ছাড়ে?’

‘বলিস কী! তুই বাসে আসবি?’ অবাক হয় আব্বু, আর নিশ্চিত হয়ে নেয়, ‘তোর না বাসে চড়লে বমি হয়?’

‘তা হয়, সেজন্য বমির ট্যাবলেট খেয়ে নিব নে,’ দুখি কণ্ঠে আমি বলি।

Tanim Kabir

তানিম কবির

জন্ম ২৫ মার্চ, ফেনী।

প্রকাশিত বই :
ওই অর্থে [কবিতা, শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
সকলই সকল [কবিতা, শুদ্ধস্বর, ২০১৫]
মাই আমব্রেলা [কবিতা, আদর্শ, ২০১৬]
ইয়োলো ক্যাব [গল্প, ঐতিহ্য, ২০১৬]
ঘরপলায়নসমূহ [আত্মজীবনী, ঐতিহ্য, ২০১৭]

ই-মেইল : tanimkabir@gmail.com
Tanim Kabir