হোম গদ্য গল্প আজ দীপার সবকিছু ভালো লাগছে

আজ দীপার সবকিছু ভালো লাগছে

আজ দীপার সবকিছু ভালো লাগছে
1.39K
0

আজ সকাল থেকে দীপার সবকিছু ভালো লাগছে।

ভালো লাগার কোনো কারণ ঘটে নি, বড্ড গরম, বাতাস নাই বললেই চলে, এর মধ্যে দফায় দফায় লোডশেডিং, পানি নাই, গ্যাসও ফুরিয়ে গেছে প্রায়, মাথার পিনপিনানিটা কমে নাই, এর মধ্যে একটা প্যারাসিটামল খেয়েছে, কাজের কাজ কিছু হয় নাই, মায়ের সঙ্গে ফোনে আলাপটা শেষ করতে পারে নি, নেটওয়ার্ক খারাপ, ওদিকে নাকি তুমুল ঝড়-বৃষ্টি, আজ যে শাড়িটা পরতে চেয়েছিল তা পরতে পারে নি, কারণ শাড়ির আঁচলের দিকটায় খানিকটা ছিঁড়ে গেছে, পায়ের সঙ্গে মানিয়ে কিনেছিল যে চামড়ার স্যান্ডেলটা, তারও তলার দিকে খানিকটা উলটে গেছে, ভ্যানিটি ব্যাগের সাইড পকেট হাতড়িয়ে দেখেছে একশ বত্রিশ টাকা আছে, মাসের শেষ হতে আরও তিন দিন বাকি, চোখে সরিষার ফুল দেখার কথা কিন্তু সে তা দেখছে না, রজনীগন্ধার ডাঁটা দুলছে চোখের সামনে, কড়া রোদটাকে ইতালিয়ান মেয়েদের গালের মতো মনে হচ্ছে, হাত থেকে পড়ে ছাইদানিটা ভেঙে গেল, একদম একসেপশনাল কাচের ছাইদানি, ছাইদানি কিসের, সে তো সিগারেট খায় না, তবে কি আড্ডা টাড্ডা হয় খুব? না, একজনই আসে, সে প্রচুর সিগারেট খায়, ঘণ্টায় গড়ে তিনটা, তার জন্যই কিনেছিল, বেচারা তো মরবেই, নিশ্চয় এর মধ্যেই সিগারেটের নিকোটিন ফুসুফসের গায়ে মরণবেড়ি পরাতে শুরু করেছে, মরুক, যতক্ষণ বাঁচে দীপা তাকে কোনোকিছুতেই বাধা দিতে চায় না, হ্যাঁ দেয়, কেবল যখন সিগারেট খেতে খেতে কালো হয়ে যাওয়া পোড়া পোড়া ঠোঁটটা দীপার ঠোঁটের দিকে বাড়িয়ে দেয়, তখন দীপা তার সমস্ত শক্তিতে ফিরিয়ে দেয়, সে তখন খালি হাসে আর বলে, ঘেন্না করে, আমারে ঘেন্না করে…


না, দীপা কিছু মনে করে নি, কিছু মনে করার ক্ষমতা তার ছিল না, উনি তার প্রভু, সে উনার দাস, দাস প্রভুর কথায় কিছু মনে করতে পারে না


তবু আজ দীপার ভালো লাগছে, এত ভালো জীবনে কোনোদিন লেগেছে কিনা কে জানে, শুধু একদিন হয়তো-বা, সেইদিন, যখন সে তার… না, এসব বিষয় পাবলিক করার মানে নাই, সে আজ অলীক ডাহুকের ডাক শুনতে পাচ্ছে, কৃষ্ণচূড়া ওর মনের ভিতর লাল করে দিয়েছে ভাবনার আনাগোনার অদৃশ্য রাস্তাটা, দীপা একবার ঘড়ি দেখল, আরেকটু পরে বেরোলেও চলবে, আজ তাড়াহুড়ার কিছু নাই, কোনো কৈফিয়তের দরকার পড়বে না, আজ সে বাস স্কুটার ধরবে না, একটা রিকশা নেবে, জোয়ান শক্ত সমর্থ এক রিকশাওয়ালা, সে তার পেছন থেকে দেখবে কেমন করে তার হাতের পেশিগুলো একবার ফুলে উঠছে একবার ঢুকে যাচ্ছে, কেমন করে তার শরীরটা প্যাডেলের সাথে সাথে উঠছে আর নামছে, আর ঘামে গলা কাঁধ পিঠ সব ভিজে যাচ্ছে, যা-ই হোক, সে তাকে শুনিয়েও ফেলতে পারে মনগলানো দুই একটা কথা, বলতে পারে, তোমরাই মানুষ, বাকি সবাই অমানুষ, না না, দীপা এসব বলতে পারবে না, সে এমনিতে খুব লাজুক টাইপের মেয়ে, কারও সঙ্গে নিজে থেকে কথাই বলতে পারে না, শুধু সে যখন বাসায় আসে, তখন তার মুখে খই ফোটে, কোত্থেকে যে এত শব্দ আসে কে জানে, দীপা তার সাত দিনের ফিরিস্তি দিতে থাকে, অফিসের কথা রাস্তার কথা ঘরের কথা, কার সঙ্গে কী হলো, কে কী মজা করেছিল, স-ব, সে আবার বিরক্ত হয়ে বলে, ওহ্ মেয়েরা যে সবকিছুর এত ডিটেইল করতে পারে, বাপ রে, বলেই সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দেবে দীপার মুখের দিকে ইচ্ছে করেই, দীপা ওর ওটুকু বদমাইশি সহ্য করে, সপ্তাহে একটা দিন, তাও ঘড়ি ধরে দুই কি আড়াই ঘণ্টা, একটু সহ্য করতেই হয়, বেরোতে ইচ্ছে করছে না, কেমন জানি ভয় ভয় লাগছে, না, ভয় কিসের, সে তো সব ভেবেই রেখেছে, রেডি করে রেখেছে সবকিছু, প্লেনের টিকেট কাটা আছে, কাজটা শেষ করেই ফু-উ-উ করে উড়াল দেবে, আর ফিরবে না, বিদায় জন্মভূমি…

এক কাপ চা খেলে মন্দ হয় না, একটা ইলেকট্রিক হিটার কিনেছিল, খানিকটা ডিস্টার্ব করলেও চলে, বসানো যায়, চা বসিয়ে গুনগুন শুরু করে, আজ দেখি গলায় সুরও খেলা করছে বেশ, গলায় সুর ওর কোনো কালেই ছিল না, সবচেয়ে হিংসা করে গানের শিল্পীদের, এত সুন্দর গলা মানুষের হয়, তবু আজ যখন গুনগুনিয়ে ‘আমার দিন ফুরোল ব্যাকুল বাদলসাঁঝে’ গানটা ধরছে, নিজের কানে খুব একটা বেসুরা লাগছে না, সে বলে, গান শেখো, আমার চেনা জানা ওস্তাদ আছে, একটা মেয়ে গান জানবে না তা কি হয় নাকি? কিন্তু নাচতে খানিকটা পারে দীপা, ছোটবেলায় স্কুলে মেডেল-টেডেল পেয়েছিল, উনিও বলেছেন, দীপা আপনার শরীরে নাচের একটা জেশ্চার আছে, হোয়াট ক্যান আই সে, আপনার ফিগারটা একদম ভারতীয় মডেলে, কিছু কি মনে করলেন?

না, দীপা কিছু মনে করে নি, কিছু মনে করার ক্ষমতা তার ছিল না, উনি তার প্রভু, সে উনার দাস, দাস প্রভুর কথায় কিছু মনে করতে পারে না, কিন্তু আজ দীপা অবশ্যই কিছু মনে করছে, চরমভাবে মনে করছে, সেজন্য নিজেকে সে প্রায় সাতদিন ধরে অন্যরকম ভাবে বানিয়ে তুলছে ভেতরে ভেতরে, আজ আজ… না, এখনই সব ফাঁস করে দিতে চায় না দীপা, এখন সে নিজের ভেতরটা শামুকের মতো গুটিয়ে রাখবে, শামুক ছোটবেলা থেকেই ওর পছন্দ, কী সুন্দর, কী চমৎকার আড়াল, সারাটা জীবন লুকোচুরি খেলেই গেল, না, যথেষ্ট হয়েছে, এবার শামুক না, কিছুক্ষণ পর সে হয়ে উঠবে সাপ, শামুক নয় সর্পিণী, ফণা তুলবে, তার ফণায় কি আঁকা থাকবে আশ্চর্য সব কারুকাজ? মানুষ তার সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে থাকবে, আর এই সুযোগে সে মারবে ছোবল? বাহ্, বেশ হয়, হোক, এরকমই একটা কিছু হোক…

আমি অপার হয়ে বসে আছি… বেজে উঠল, এই রিংটোনটা গত সপ্তায় সেট করেছে, সে মজা করে বলে, কার জন্য বসে আছ? তোমার জন্য না, দুজনে হেসে উঠেছিল, কেন যে গানটা চুজ করেছিল সে নিজেই বলতে পারবে না, হঠাৎ করে এত বেদনার গান কষ্টের গান, অথচ তখনও ওই সিদ্ধান্ত সে নেয় নি, তখনও সে ভেবে ওঠে নি যে এভাবে একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে সবকিছু তার ভালো লাগতে শুরু করবে, উপরে আকাশ নিচে জমিন মধ্যখানে অফুরান হাওয়া, আহ্! কে ফোন করল, নিশ্চয় উনি, গতকালই অফিস শেষে ফেরার পথে দীপা জানিয়েছিল, স্যার, আজ আপনাকে সারপ্রাইজ দেব, মহা সারপ্রাইজ, উনি টেনশনে থাকতে পারেন, থাকারই কথা, কোনো মেয়ে, তাও দীপার মতো, শামুকের মতো গুটিয়ে রাখে সে যদি নিজে থেকে এরকম কথা বলে চোখে মুখে একরাশ দীপ্তি নিয়ে, তাহলে তার একটা উৎকণ্ঠা থাকবে বৈকি,

না, মা, হ্যালো, মা, কী সমস্যা, একটু আগে তো কথা হলো, এখন আবার… পরক্ষণে দীপা নিজেকে সামলিয়ে নেয়, আজ রাগ করা যাবে না, যে যতবার ইচ্ছে ফোন করুক, আজ সে অপার হয়ে আছে, সবার ডাকেই যতবার দরকার সাড়া দেবে, আর এ তো মা, বলো মা, কী সমস্যা? তোর বাপের বুকের ব্যথাটা বেড়েছে, দীপার মনে হয় জাস্ট একটা অতি পুরাতন নাটকের ডায়লগ শুনল, আর? ঘেমে যাচ্ছে, জিভের তলায় নাইট্রোগ্লিসারিন ট্যাবলেটটা দিয়ে দাও, একগাদা কিনে রেখে এসেছিলাম। কই? আমার টেবিলের ড্রয়ারেই আছে। আচ্ছা আচ্ছা। বাবা কি মারা-টারা যাচ্ছে নাকি? না না, মরলেও আজ না, আজ কেন! আজ শুধু ভালো ভালো সুন্দর চমৎকার ঘটনা ঘটার দিন, আজ কারও মরণ নয়, বাবার তো নয়ই, এঞ্জিওপ্লাস্টি করানোর কথা ছিল, দীপা পারে নাই, টাকা তো জমানোই যাচ্ছে না, আরও ধার-দেনা বাড়ছে, কমসে কম তিন-চার জন বান্ধবী ওর কাছ থেকে টাকা পায়, দীপা মনে মনে অঙ্ক কষে—তিন আড়াই এক দুই—তার মানে দশের কাছাকাছি! থাক থাক, একদিন সব শোধ হয়ে যাবে, তবে দীপা কোনো ছেলে-বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে না, কেন করে না? থাক, আজ স্থূল কথাবার্তা চলবে না। একটু পর মা কি খবর দেবে—দীপা রে, তোর বাবা… না, আল্লাহ আছেন, এতটা নির্দয় তিনি নন, একটা দিন তিনি পার করতে দেবেন, অন্তত সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত সময়টা, মোবাইলটা কি বন্ধ রাখবে নাকি, কাজটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর খুলবে? না, রহস্য আরও বাড়বে, সে কোনো রহস্য রাখবে না, এটা একদম শাদামাটা একটা কাজ, পৃথিবীতে এরকম অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, দীপা নিজেকে একেবারে কুল করে রেখেছে, শান্ত সমাহিত, অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট…

চায়ে চিনি বেশি হয়েছে, দুধ শেষ হয়ে গেছে, লিকার চা-ই খেতে হচ্ছে, খুব অপছন্দ, কী আর করা, ঘরটায় একটা মাত্র জানালা, দুই ফুট বাই দুই ফুট, আজ তবু সে দেখতে পাচ্ছে অতটুকু জায়গা দিয়ে আলো একেবারে হুড়মুড় করে ঢুকছে, ওর গায়ে আছড়ে পড়ছে ঝলকে ঝলকে, একটা প্রজাপতি ধরা দেবে দেবে বলে দিচ্ছে না, সত্যি প্রজাপতি, শহরেও প্রজাপতি থাকে, দীপা আজ বোধ হয় অনেক বছর পর প্রজাপতি দেখল, কত বছর? কমপক্ষে পাঁচ বছর, পাঁচ বছর সে গ্রামে যায় নি, মা অভিমান করে, বাপ কেঁদে-কেটে বলে, দীপা রে একবার আয়, না, দীপা বরং তাদের আসতে বলেছে, তারা এসে গেছে, মা বাবা, দাদি বুড়িটা মরার মাস তিনেক আগে একবার এসেছিল, মরার আগে শেষ দেখা, দীপা তার চোখের তলায় মৃত্যুর ছায়া লক্ষ করেছিল, রাতের বেলা বুড়ির চাদরের তলায় নিজের শরীরটা সেঁধিয়ে বুড়ির খসখসে চামড়ায় হাত বোলাতে বোলাতে দীপা বলেছিল, দাদি, তোমার এই নাতনিটারে ক্ষমা করে দিয়ো গো দাদি, দাদির চোখে জল, সেই গভীর রাতে তাদের দুজনের কী এক বোঝাপড়া… আহা রে…


বোতলটাও অদ্ভুত, মেয়েদের শরীরের মতো অনেকটা, ওভাবেই বানানো হয়েছে, স্যার বোতলটা হাতে নিয়ে খুব বিশ্রীভাবে সেটায় হাত বোলাচ্ছিলেন


আবার রিং বাজল, না, এবার মেসেজ-টোন, বিশ্রী একটা টোন, সে-ই সিলেক্ট করে দিয়েছে, ওর সবটাতেই খামখেয়ালি। না না, ওটা রেখো না। কেন, সুন্দর তো! দীপা ভেবেছিল ও চলে গেলে বদলাবে, আর তা হয়ে ওঠে নি, কখনো কখনো আওয়াজটা ভালোও লাগে। কার বার্তা? সুন্দর এক বার্তা হোক, চমৎকার এক বার্তা, দীপা গিয়ে মোবাইল হাতে নেয়, হাত তার কাঁপছে, যেন অসুন্দর কিছু হলে তার দিনটাই মাটি হয়ে যাবে,

মেঘলাদিনের দুপুরবেলায় যেই পড়েছে মনে
চিরকালীন ভালোবাসার বাঘ বেরুলো বনে
আমি দেখতে গেলাম, কাছে গেলাম, মুখে বললাম—খা
আঁখির আঠায় জড়িয়েছে বাঘ নড়ে বসছে না…

অদ্ভুত। ও গড! এত আনন্দ রেখেছ তুমি আজ আমার জন্য! দীপার চোখ ভিজে আসে। ভিজুক, বারবার করে পড়ে, মানে বোঝা যায় না, কার যেন কবিতা, থাক, ভেবে নিচ্ছে এটা ওরই কবিতা, দু’এক লাইন সে লিখতই, একবার লিখেছিল—আমি আর তুমি তুমি আর আমি, আলোতে আলোতে শুধু নিশিযামী… চমৎকার, আলোতে নিশিযামী। ওই ব্যাটা, আলোতে রাত হয়? কবিতায় হয়। ওরে ব্বাপ কবি রে! বাঘটা কে? ভালোবাসার বাঘ। রিপ্লাই করবে? থাক। দরকার নেই। সে তা আশাও করে না। নিজের ইচ্ছা করে লিখেছে। দীপা যদি এ নিয়ে কিচ্ছু কোনোদিন নাও বলে সে দু’কথা বলবে না, এজন্যই তো ওকে এত… কী? না না, ওর সঙ্গে দীপার কিচ্ছু নাই, না, দীপা একা, কেউ পাশে নাই, সব ফেলে এসেছে সে, দূরে, পথে পথে ওর পাথর ছড়ানো, আজ সব পাথর বস্তায় পুরে সে দূরে কোনো নদীতে ফেলে দিয়ে আসবে, তারপর আর কোনো ভার নাই, দাগ নাই, কষ্ট নাই, গ্লানি নাই, ঘৃণা নাই

দীপার কি বমি টমি পাচ্ছে নাকি? কিছু হয়েছে? না, হওয়ার কথা নয়, সে খুব সাবধান ছিল, সঙ্গে সঙ্গে সব ধুয়ে ফেলেছে, একদম গভীর পর্যন্ত, আর সময়টাও সেরকম নয়, বমি হয়তো ঘেন্নায় আসছে, উনার মুখটা হঠাৎ করে ভেসে উঠল বলে, কেমন ছিল মুখটা তখন, একদম কুকুরের মতো, সামনের দিকে দুটো দাঁত উঁচু, তখনও দীপা বুঝতে পারে নি আজ এত ফাইল কিসের? স্যার কাল দেখব? না না দীপা, আগামীকালই এটার ফাইনাল মিটিং, আপনার চোখ ভালো, একটু জাস্ট দেখে যাবেন, সন্ধ্যা নেমে এসেছিল, দীপা হন্যে হয়ে একটার পর একটা ফাইল দেখছিল, মা ফোন করছিল, ধরতে পারে নি, সেও একবার, হয়তো জানতে চাইবে নিরাপদে বাসায় ফিরেছে কিনা, একটা গন্ধ সে পাচ্ছিল অফিসেই, পাশের রুম থেকে, ওটা তো স্যারের রুমই, কেমন একটা মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ, ঠিক তা না, মধু’র মতো, একটা পচা পচা… মদের গন্ধ চিনতে ওর সময় লেগে গিয়েছিল খুব, খাক, মদ তো খেতেই পারে, লোকটা এমনিতেই সুখী নন, প্রায়ই বলেন, বউয়ের যন্ত্রণার কথা, অবশ্য সেগুলি আদৌ সত্য কিনা কে জানে, দীপা নাকে রুমাল চাপছিল, কেন জানি গন্ধটা খুব বেশি বেশি লাগছিল সেদিন, মাকে কি একবার ফোন করবে, মা চিন্তা করো না, ভালো আছি, আর ওকে? বলবে, নিরাপদে বাসায় পৌঁছেছি, না এত মিথ্যা সে বলতে পারবে না, ধরা খেয়ে যাবে, দীপা অবাক হয়ে লক্ষ করছিল ফাইলটা একমদই পুরনো, ডেট ওভার, ওটা আবার দেখার কী আছে, স্যার কি ওর সঙ্গে মজা করলেন? না, উনিও তো যান নাই, অফিস প্রায় খালি, উনি নিজেও আছেন, তার মানে সিরিয়াসই, কিন্তু এ ফাইল কেন? নাকি ভুলক্রমে? খালি দারোয়ানটা থেকে থেকে দীপার সামনে ঘোরাফেরা করছিল, রসিয়ে রসিয়ে পান চিবোচ্ছিল, পানের রস তার ঠোঁট গলে নামছিল চিবুক পর্যন্ত, সে জিহ্বা দিয়ে বিশ্রীভাবে তা চাখবার চেষ্টা করছিল, আর খিক খিক করে দীপার দিকে তাকিয়ে হাসছিল, দীপা তখনও বুঝতে পারে নি এসবের কোনো মানে আছে কিনা, শুধু কেমন যেন সব থমথমে হতে শুরু করেছিল, স্যার কি ভুলে…? স্যারের রুমে গিয়েছিল সে ফাইল হাতে, স্যার তাকে আশ্বাস দিয়েছে একটা বড় ধরনের প্রমোশন তার হতে যাচ্ছে, বেশ কয়েকটা ইনক্রিমেন্টও তার পাওনা, অফিসটা গোছাতে গিয়ে হয়ে ওঠে নাই, সব হবে, বাবাকে একবার এঞ্জিওপ্লাস্টি না করালেই নয়, আর মায়ের চোখের অপারেশন, মায়ের অত বয়স নয়, বিয়ে হয়েছিল আঠারোয়, পঞ্চাশের উপরে হবে না, কেন এখনই তাকে অন্ধকারে ডুবে যেতে হবে…

স্যার। তাঁর চোখ জ্বলজ্বল করছিল, স্যার কি কোনো কারণে রাগ করেছে? বসো। এত ভারি স্বর আগে শোনে নি। স্যার এমনিতে খোশমেজাজি লোক, রাগ-টাগ তেমন করেন না, সেদিন দীপা প্রথম লক্ষ করল লোকটার রাগ, স্যার ফাইলটা তো পুরনো, ফাইল পুরনো হলে কী হবে, মানুষ পুরনো হয় না, মানুষ নতুন হয়, সব সময়, ফাইল পুরনো হোক, ড্যাম কেয়ার। জীবনে প্রথম বোধ হয় দীপা এত কাছ থেকে মদের গন্ধ পেল, বোতলটাও অদ্ভুত, মেয়েদের শরীরের মতো অনেকটা, ওভাবেই বানানো হয়েছে, স্যার বোতলটা হাতে নিয়ে খুব বিশ্রীভাবে সেটায় হাত বোলাচ্ছিলেন, বোতল তো না শরীর একটা, ঐ তো কোমর, স্যার সেখানেই হাত দিয়েছে, দীপা তাকিয়ে ছিল, দারোয়ানটা এর মধ্যেও একবার উঁকি মেরে খিক খিক করে চলে গেছে। স্যার। দীপা কিচ্ছু হয় না, হবে না, নাথিং, জাস্ট ফর এ ম্যাজিক টাচ ফর এ স্টার্টিং আপ, দ্যান অল অব দ্য ম্যাটারস বিকাম হ্যাবিচিউয়েটেড, জাস্ট লাইক এ ডেইলি মেনু অব লাঞ্চ, হা হা হা…  স্যার এত শক্ত করে বোতলটা চেপে ধরেছে কেন, ভেঙে যাবে যে, এত সুন্দর বোতলটা, ছেড়ে দেন ছেড়ে দেন! মোবাইল বেজে উঠেছিল, ওর নাম্বার, স্যার ধরতে দেন নি, মেসেজ আসে, কোনোমতে দেখেছিল—ফিরেছ? বৃষ্টি হবে মনে হয়। বৃষ্টি হচ্ছে, বৃষ্টি, বর্শার ফলার মতো ধারাল বৃষ্টি, সারা শরীরে বিঁধে যাচ্ছে, গেঁথে যাচ্ছে, রক্ত ঝরছে, এত নৃশংস ভয়ংকর ঘাতক বৃষ্টির কণা দীপা তার আগে আর দেখে নাই…

ভাবতে ভাবতে দীপা বমি করতে লাগল, এমন পোড়া কপাল, না আজ বমি কেন? বমি আজ নয়, আচ্ছা বমি না—ও-তো থোকা থোকা মেঘ, অথবা চাঁপাফুলের পাপড়িগুচ্ছ, কদমের রেণু, কী চমৎকার লাগছে দেখতে, যথেষ্ট, আর না আর না, দীপা এবার একটা শিশি বের করে আলমিরার নিচের তাক থেকে, গন্ধ শুঁকে দ্যাখে, একদম খাঁটি, দু’মিনিটের বেশি লাগবে না, সে জানে, তারপর কাজ শেষ, লাশটার সামনে দাঁড়িয়ে সে হাসতে হাসতে বলবে—গুড বাই, স্যার। কিন্তু ওকে যে কিছু বলা হলো না, সে যে সপ্তাহ শেষে আসবে, নতুন কারও কবিতার লাইন বানিয়ে, দীপা দীপা বলে ডাকবে, দীপা তখন নেই, দীপা অন্য দেশে ফুরুৎ, বান্ধবী অপেক্ষা করছে সেই দেশে, প্রিয় বান্ধবী তার, একদম বাল্যকালের, অন্য দেশে চলে গেছে পড়ালেখার জন্য, দীপা ওখানে গিয়েই আত্মগোপন করে থাকবে, না, মরবে না সে, বেঁচে থাকতে হবে, বেঁচে থাকার একটা স্বাদ আছে, ওটা হারাতে চায় না, এই যে আজ এত ভালো লাগছে, বেঁচে থাকলে এরকম দিন যে কত আসবে জীবনে…

তিনি, নিশ্চয় আজ সারপ্রাইজড হওয়ার জন্য উৎকণ্ঠায় আছেন, সেদিনের ঘটনার পর আর কিসের সারপ্রাইজ, তবু তিনি হয়তো ভাবছেন, দীপা গিয়ে বলবে—স্যার, আজ আপনাকে এমনভাবে—এমনভাবে—, থাক, সেটা পরে ভাবা যাবে, দীপা আয়নায় নিজেকে দেখে, আজ আয়নার সামনে নিজেকে খুলে দিয়েই পোশাক পাল্টাবে সে, এই তো একদমই লজ্জা পাচ্ছে না, নিজেকে নিজের কিসের লজ্জা, আহা ওর বেলফলের মতো স্তন দুটো, আজই না প্রথম দেখছে, কী এক মায়া লাগছে ওর নিজেরই, নাভিটাও অন্যরকম, কুচকুচ করে ভেতরের দিকে ঢুকে গেছে, আর গলার নিচে বুকের ওপরটা, ধবধবে শাদা, তার মাঝখানে একটা তিল। সে এদিকে আড়চোখে মাত্র একবার তাকিয়েছিল, দীপা পরের তিন সপ্তাহ কথা বলে নি তার সঙ্গে। আর সেদিন তিনি! তিনি!


দীপাকে খুব সুন্দর লাগছে, আরও সুন্দর হয়ে উঠছে যখন মেঝেতে ওর শরীরটা শীতল হয়ে নেতিয়ে পড়ল


শিশির মুখটা একবার খুলে গন্ধ শুঁকে দেখে দীপা, উৎকট, কিন্তু ওর খুব ভালো লাগছে, এই তো ওর প্রাণের দোসর আজ, মদের গেলাসের ভেতর ডুব মেরে চুপ হয়ে থাকবে, তারপর আস্তে আস্ত কাজ শুরু করবে নীরব ঘাতক, না, দুই মিনিটেই শেষ করবে সব, তিনি তখন তাকিয়ে থাকবেন দীপার গলার আঁচড়টার দিকে, ভাববেন এভাবে আঁচড় খেলেই মেয়েরা বশ হয়ে যায়, নেড়ি কুকুরের মতো আবার আবার আবার আঁচড় খেতে আসে, তিনি ফের তার নখগুলোকে শানাতে থাকবেন, জিহ্বাটাকে লালায় ভরাতে থাকবেন, চোখটাকে লাল করে তুলবেন ভয় ধরানোর জন্য, বারবার চুমুক দেবেন মদের গ্লাসে, আর গ্লাসের ভেতর ওঁত পেতে থাকা বর্ণচোরা মৃত্যু গ্রাস করবে তাকে, ধীরে ধীরে…

সবকিছু তারপর সুন্দর হয়ে উঠবে, আরও আরও সুন্দর, আজকের এই সকালের চেয়েও, তখনই তো ভয়ংকর সুন্দর ধরা দেবে, দীপার যে আজ কী হলো, ঘন ঘন ফোন বাজছে, বেজেই চলেছে, আর সে নড়তে পারছে না, বিষের শিশিটা হাত থেকে পড়ে গেছে, দীপার ঠোঁটের কোণে শাদা কিছু একটা লেগে আছে, ওটা তো শাদা ছিল, এখন কেন লালচে লাগছে। রক্ত? দীপা কি একটু চেখেও দেখেছে নাকি? বোকা মেয়ে সারাটা জীবন বোকামিই করে গেছে, সবাইকে বিশ্বাস করেছে অবলীলায়, আর আজ বিষকে বিশ্বাস করে নি। তারপরও যদি তিনি বেঁচে যান! কোনোমতে! তাই এভাবে নিশ্চিত হতে চেয়েছে! নিজে খেয়ে!

দীপাকে খুব সুন্দর লাগছে, আরও সুন্দর হয়ে উঠছে যখন মেঝেতে ওর শরীরটা শীতল হয়ে নেতিয়ে পড়ল, ঘুম দিচ্ছে দীপা, আজ দীপার সবকিছুই বড় সুন্দর, পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত সবকিছু অনন্য, দীপার ঠোঁট গলে শাদা ফেনা, লাল লাল ছোপ, সুন্দর, আর সব থেকে সুন্দর দীপার মোবাইলে ঘন ঘন বেজে ওঠা রিংটোনটা—

আমি অপার হয়ে বসে আছি, ওহে দয়াময়, পারে লয়ে যাও আমায়…

শুভাশিস সিনহা

জন্ম ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৮, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমিতে নাট্যপ্রশিক্ষক।

প্রকাশিত বই :
ডেকেছিলাম জল (কবিতা)
অক্ষর নতুন করে চিনি (কবিতা)
বেলা দ্বিপ্রহর (কবিতা)
হওয়া না-হওয়ার গান (কবিতা)
দ্বিমনদিশা (কবিতা)
আবছায়াদের রূপকথা (গল্প)
প্রতিরূপকথা (নাটক)
কুলিমানুর ঘুম (উপন্যাস)
ইঞ্জিন (উপন্যাস)
ভাষা, কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ (প্রবন্ধ)
রবীন্দ্রনাথ : গ্রামের ছবি (গবেষণা)
মণিপুরি সাহিত্য সংগ্রহ ২খণ্ড (অনুবাদ ও সম্পাদনা)

ই-মেইল : shuvashissinha@yahoo.com