হোম গদ্য গল্প আগুন অথবা বাৎসল্যের রূপক

আগুন অথবা বাৎসল্যের রূপক

আগুন অথবা বাৎসল্যের রূপক
296
0

রায়হান বিয়ে করে নাই। একদিন শুকনো যৌবনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে তবু সে আবিষ্কার করল তার পিতৃত্ব জেগে উঠেছে। বউ নয়, বরং এই ছেচল্লিশোত্তর জীবনে তার প্রয়োজন একটা ফুটফুটে সন্তান। বিশেষত তাজুলের মেয়েটিকে দেখলে ইদানীং তার মনে হয় একটু জড়িয়ে ধরুক না মেয়েটি। না হয় তাকেও ‘আব্বু’ বলে ডাকুক। যেমন ডাকে সে তাজুলকে এবং জড়িয়ে ধরে। যতবার সে এই দৃশ্য দেখেছে তাজুলের জায়গায় নিজেকেই কল্পনা করেছে সে। আর গনগনে ভেতরটা দৃশ্যের অনন্য পুলকে শীতল হয়ে গেছে তার। কিন্তু সে তো কয়েক মুহূর্ত মাত্র। যতক্ষণ সে এই দৃশ্যের কাছাকাছি থাকে। সরে এলেই কল্পনার এই শীতল সংস্রব তার তড়পানো বুকে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। তখন সে ভাবে, পৃথিবীর পূর্বাপর নিয়ম যদি এমন হতো মানুষ যেভাবে বিয়ে করে ঘরে বউ তুলে আনে, সেরকম কাউকে মেয়ে করে ঘরে তুলা যায়। তাহলে ডানা অর্থাৎ তাজুলের ওই সেভেনে পড়ুয়া মেয়েটিকে সে ঘরে আনত। ঘটা করে বৌভাত করত সে। ঠিক বৌভাত নয়। কারণ এ তো আর বিয়ে করা নয়, মেয়ে করা। অর্থাৎ মেয়ে বানানো। তাহলে মেয়ে ঘরে তুলবার পর বৌভাতের মতো জাঁকজমকপূর্ণ ওই পর্বটির কী নাম হতে পারতো? কী নাম? না, সে ভেবে পায় না। কিন্তু তার চিন্তা কয়েকটি শব্দের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে হোঁচট খেতে থাকে: মেয়ে করা, বিয়ে করা এবং বৌভাত। ঠিক তখনই তার মনে পড়ে বৌভাতের পূর্ব রাত্রির কথা। যাকে আমরা বাসর রাত বলে জানি। দুরন্ত সেই শিহরনের রাত্রিতে ডানাকে সে কিভাবে পেত? ডানার বেলায় কী হতো সে রাতের নাম?


তেলচিটচিটে বালিশের গন্ধ মানুষের সঙ্গ’র চেয়ে সুখকর। অথচ সে ঘরকুণো নয়। হয়তো ঘরমুখো।


এ রকম অনেকগুলো প্রশ্নের শেকড় সে উপড়ে ফেলতে চায়। পারে না। বরং প্রশ্ন আরও দানা বাঁধে। তখন একটা ওৎ-পাতা ভয় তেড়ে আসলে আকাশ দেখলেও আতঙ্ক হয়। যেন ওটা আকাশ নয়। জলে টইটুম্বুর সাগর যেন উবু হয়ে আছে পৃথিবীর দিকে। আর অদৃশ্য নাটাইয়ে সুতো প্যাঁচিয়ে কেউ বুঝি ধরে রাখে সেটা। সুতোটা ছিঁড়ে দিলেই নূহের প্লাবন এসে জগৎ ভাসিয়ে নেবে। তখন ঘরে ফিরতে তার মন খুব ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। সেই এলেবেলে ভয়টা এড়াতেই কি না, সে জানে না। অবশ্য তার ঘরটাতেও সবসময় একটা জলছোঁয়া ভাব। গ্রীষ্মে সিমেন্টের ফোর ঘেমে স্যাঁতসেঁতে। বর্ষায় দেয়াল ভিজে একাকার। দেয়ালের এ পাশটাও শুষে নেয় সেই জল। শাদা চুনকামে সেই জলের ছায়া ছড়িয়ে পড়ে। আর শীতে জানালার ফাঁকফোকরে হুড়মুড় ঢুকে পড়ে কুয়াশা। হাড়-কাঁপানো শীত তখন সাড়া ঘরময় জেঁকে বসে। মোটা লেপ মুড়ি দিয়ে থাকলেও টের পাওয়া যায় শীত আসলে ভিন্ন কিছু নয়। জলেরই সহোদর। মোটমাট জলের মধ্যেই তার বসবাস। অথচ আকাশে সেই অথই জল কল্পনা করে শেষটায় আজ ঘরেই ফিরে এল সে। অবশ্য বেরোনোটা জরুরি কিছু ছিল না। এই একটু রাস্তায় হাঁটাহাঁটি, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, সবার সঙ্গে একটু সুর মেলানো। তার জীবন থেকে কোনো সুরের খেই যেন সে হারিয়ে ফেলেছে। সেই খেই ধরবার চেষ্টা। ঘরে ফিরে অনেকদিনের আধোয়া চাদর জড়ানো বিছানায় সটান শুয়ে পড়ে সে। তখন মনে হয় এই ঘর তার আসল নোঙর। বড় নিরাপদ। তেলচিটচিটে বালিশের গন্ধ মানুষের সঙ্গ’র চেয়ে সুখকর। অথচ সে ঘরকুণো নয়। হয়তো ঘরমুখো। আসলে জল নয়, সে এড়াতে চায় মানুষ। কিন্তু যে-সুরের খোঁজ সে করছে তার জন্যে সংস্পর্শ চাই। মানুষের সংস্পর্শ। বিশেষত মেয়ে মানুষের। তাই চল্লিশ ছুঁইছুঁই বয়সে বিয়ের আলুনি ইচ্ছেটা একবার নাড়া দেয় মনে। তাও সমাজে বাস করতে হয় বলে দায়সারাগোছের একটা সামাজিকতা টিকিয়ে রাখতে। আর মেয়েটিও দেখতে খারাপ ছিল না। রায়হানের নিজের বয়সের মতোই একটা ভারি ভাব ছিল তার চোখে মুখে—সর্বাঙ্গে। আসলে কোনো উচ্ছলতাই রায়হানকে টানে না। যেমন টানে না ঘরের বাহির। বাহির মানে কোলাহল। অকারণ উচ্ছ্বাস। ভারিক্কি চালচলনের এই মেয়েটির দিকে তাই সে একটু ঝুঁকে পড়ে। প্রেম টেম কিছু নয়। হৃদয়ে ছলকে-ওঠা মামুলি আবেগ। তাই অনেক কাটছাঁট করে মেয়েটির একটা উপমাও সে স্থির করে। নদী নয়, দিঘি। গভীর শান্ত নীল দিঘি। মনে মনে কবিতার মতো আওড়িয়েছিল কিছুদিন। তারপর চুপিচুপি ঘটক পাঠায়। একদিন সেই ঘটকের সঙ্গে স্বয়ং মেয়েটিকে আসতে দেখে তার চোখ ছানাবড়া। চোখমুখ লাল করে আসে সে। আঙুল উঁচিয়ে ওকে দেখিয়ে ঘটককে সে বলে, এই বুড়ো দামড়াটার কাছে বিয়ে বসবো? ওকে বলো একটা কম বয়সী বিধবা দেখে নিতে। ভয় পেয়ে চট করে সরে পড়েছিল রায়হান। সেই থেকে বিয়ের যৎকিঞ্চিৎ ইচ্ছেও উবে গেছে তার। এখন বিয়ের কথা ভাবতেই বুক ধড়ফড় করে। অবশ্য ছেচল্লিশ পার করে এখন নিজেকে সে চিরকুমার বলে চালিয়ে দেয়। এতে বেশ কাজ হয়। নিজের ভিতরে একটা চকচকে ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। আর দশজন মানুষের চেয়ে সে তখন আলাদা কেউ। প্রশ্নকারীর চোখেও সমীহের ছায়া থাকে। মেকি ভদ্রতা দেখিয়ে চুপটি মেরে থাকে। মনে মনে হয়তো ভাবে প্রেমে ছেঁকা খেয়ে তার এই দশা। পাছে অনধিকার চর্চা হয়, এই ভয়ে আর কোনো প্রশ্ন করে না কেউ। রায়হানের স্বস্তি মেলে। কিন্তু একটা আত্মপ্রবঞ্চনার দায় থেকে যায় মনে। তখন তার রাগ হয়। বিষণ্ন অভিমানে মৃত বাবার মুখটা ছিঁড়েখুঁড়ে তবে তার সাধ মেটে। তার মানে ছেলের বিয়ের ব্যাপারে একটা নিয়ামক শক্তি ছিল তার বাবা। রায়হানের বাবা সেই শক্তি কাজে খাটান নি। কিন্তু তার ভাবনা আরও বহুদূর গড়াবার আগেই সটান শোয়া থেকে উঠে বসে সে। তার মুখ বরাবর সামনের দেয়ালে বেতের ফ্রেমে আটকানো ছোট আয়না। কী মনে হতে ওই আয়নাতে দুদণ্ড দেখে নেয় নিজের মুখখানা। ভাবে, বয়স ঝুলে পড়ছে তার। মুখের বলিরেখায় স্পষ্ট হচ্ছে সেই হিজিবিজি দাগ। তারপর চোখ ফেরাতেই ঘরের পশ্চিম কোনায় রাখা শোকেসটার দিকে দৃষ্টি পড়ে তার। অপলক দৃষ্টির ঘোরে অস্ফুট শব্দের মতো বলে ওঠে সে : পুতুল! ডানার নিষ্পাপ মুখ মনে পড়ে। আর এক পা দু পা করে সে এগিয়ে যায় শোকেসটার দিকে।

টুকিটাকি আসবাব ছাড়া তেমন কিছু নেই ওর ঘরে। তাও রং চটে গিয়ে, ঘুণে ধরে সব কেমন জীর্ণ হয়ে আছে। এদের পাশে শোকেসটার ঠাট বুঝা যায়। খুব আপটুডেট বলে নয়। শুধু এর চকচকে কাঁঠালি রংটার জন্যে। যেমন কুচকুচে কালো নিগ্রোর ফকফকে শাদা দাঁত। তবু একটা বেখাপ্পা অবস্থান নিয়ে ওটা নিজের প্রেস্টিজ খুইয়েছে বলে মনে হয়। পুরনো ধাঁচের এই একতলা বাড়িটাও এই অবস্থানে কিছুটা খাপছাড়া ঠেকে। যেন আশেপাশের উঁচু উঁচু দালানের পাশে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। তাই এইসব বড় বড় দালান ডিঙিয়ে সুবিধে মতো আলো পৌঁছোয় না ওর ঘরে। একটা আলো-আঁধারি সারাক্ষণ ঘিরে আছে। রায়হানের জীবন যেমন আলো-আঁধারি। তার বাবা গোড়া থেকেই বড় বৈষয়িক। কী এক ব্যবসার সূত্র ধরে প্রায়ই ঢাকায় আসতেন। মা’সহ তারা চার ভাই-বোন তখন মফস্বলে। ছোট দুই বোনের তখনো জন্ম হয় নি। একদিন বাবা এসে বললেন, বুঝেছ জুবেদা, মাটি হইল খাঁটি। তাই ঢাকাশ্বহরের পাশেই কাঠা পাঁচেক জমি রাইখা দিলাম। সময়ে কামে দিবো। জায়গাটা তখনো শহরতলী। ঝিল, এঁদো ডোবা, ময়লা আবর্জনাভর্তি খাদ—এসবের পাশেই জায়গাটা। ভুরভুরে গন্ধে নাক ঠেসে দাঁড়াতে হয়। তাই মা খুব আগ্রহ দেখান নি। কিন্তু স্বাধীনতার পর ওরা যখন আসে তখন ঘর বাড়ি উঠতে শুরু করেছে। শহরমুখো মানুষের ঢল নামে এদিকে। প্লটের পর প্লট বিক্রি হতে থাকে। এ তল্লাটে আরও দু’তিন কাঠা জমি রাখেন বাবা। কিন্তু হঠাৎ কী হয়। দুর্দান্ত বৈষয়িক মানুষটি পার্থিব সবকিছুর প্রতি নিদারুণ উন্নাসিকতায় ডুবে যান। পাশের দালানগুলো একতলা দু’তলা করে পাঁচতলা সাততলা পর্যন্ত উঠে গেল। কিন্তু তাদের এই বাড়ি সেই-যে হাঁটুগেড়ে বসল, আর ঊর্ধ্বমুখী হলো না। শুধু বাবার মাথায় সার্বক্ষণিক গোল টুপি সেঁটে যায়। লম্বা দাড়ি হয় নাভি ছুঁইছুঁই। তার আঙুলের ডগায় তখন সারাক্ষণ তসবিহ্ ঘোরে। আর তার নির্বিকার ভঙ্গি দেখে মনে হয় দুশ্চিন্তায় তার মাথাটাও বুঁদ হয়ে আছে। কেননা বড় দুই বোন তখন আইবুড়ো। তৃতীয় বোনটিও বিয়ের লায়েক। তার পরের দুজনও লকলকিয়ে উঠছে। ইতোমধ্যে পাড়ার কোন বদ ছেলেদের সঙ্গে চিঠি আদান প্রদানে পিটিসপাটিস ফস্টিনস্টি করছে বলে বদনাম ছড়ে। হঠাৎ স্ট্রোক করে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত মা বিছানায় শুয়ে শুয়ে এসব নিয়ে গড়গড় করতেন। কে খোঁজ রাখে বাড়িটার? সবার নজর এড়িয়ে দুর্বল পলেস্তরা খসতে আরম্ভ করে। স্থানে স্থানে দেখা দেয় তিন নম্বর ইটের নাজুক গাঁথুনি। যেন বাড়িটার সারা গায়ে ঘা হয়েছে। কুষ্ঠরোগীর মতো দুষ্ট ক্ষত নিয়ে হঠাৎ ধসে যাবে। এ তো গেল বাইরের দশা। ভেতরটাও বেহাল করে দেয় বোনেরা। বিয়ের পর বাবার বাড়ির অধিকার নিয়ে বড় দুই বোনের বিবাদ বাঁধে। বড়জন নিয়ে নেয় ফ্রিজ আর সোফাসেট। অন্যজন তার সমতা আনতে গুঁই ধরে থাকে কিছুদিন। একদিন পুরনো আমলের খাটটা খসিয়ে তার সঙ্গেই ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে দেয় স্টিলের আলমারি। বাবা সব দাঁড়িয়ে দেখেন। রায়হানকে শুনিয়ে বলেন, লইয়া যাক না। মেয়ে মানুষের এইসব না নিলেও চলে না। শাশুড়ির কাছে মাথা হেট হয়। বাবা মারা গেলে তার ঠিক পরের বোনটিকে কে রুখবে? কিছুদিন মায়ের সেবা করে ভুলিয়ে ভালিয়ে কিছু সোনার গয়না আর সেগুন কাঠের বড় ডেস্কটা নিয়ে নেয় এক ফাঁকে। মা-ও যখন মারা গেলেন ছোট দুই বোন আর কার কাছে আবদার করবে। ওরা ভাইয়ের কাছে বলে, ওদের ঠকানো হয়েছে। অগত্যা আর কী করা। বাবার একাউন্টের সব টাকা তুলে দেড় লাখ টাকা দুই বোনকে সমান ভাগ করে দেয়। বাকি টাকা সম্বল নিয়ে নিজে দেয় একটা স্টেশনারি দোকান। এখন সেটাই চলছে। নিজের রুমটা রেখে বাকি রুমটা সে ভাড়া দেয়। সেই ভাড়াটেরা তিন মাসের ভাড়া বাকি রেখে দেশের বাড়ির কথা বলে পালিয়েছে। ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে বলে নতুন ভাড়াটে আসতে চায় না। তবু টু-লেট দেয়া আছে।

এক সময় নিজের জীবন নিয়ে গর্ব হতো ওর। মনে হতো বড় নির্ঝঞ্ঝাট জীবন তার। এখন সে ঠিকঠিক বোঝে নির্ঝঞ্ঝাট জীবন নিরঙ্কুশ সুখের নয়। বড় একা লাগে নিজেকে তার। ভয়াল নিঃসঙ্গতা যেন ওর চারপাশের হাওয়ায় দম আটকানো বোবা স্বপ্নের জীবাণু ছড়িয়ে দিয়েছে। মন বিষিয়ে উঠলে লেপের নিচে বড় একটা কোলবালিশ জাপটে ধরে কতদিন কুঁকড়ে থেকেছে সে। আর আলতো প্রলেপের মতো বিছানায় হাতদুটো প্রসারিত করে দিয়েছে। না, শুধু চাদরের খসখসে নির্জীব অনুভূতি। কিন্তু এভাবে কতদিন? তবে কি বিয়ে? তখনই মনে পড়ে দিঘির মতো মেয়েটির লাল টকটকে চোখ। নাক মুখ খিঁচিয়ে সে যেন কানের কাছে বিড় বিড় করে : বুড়োর আবার বিয়ের শখ। তখনই সে ভাবে, না, এ সব হবার নয়। তবু মনের সব বাঁধন ছিঁড়েছুঁড়ে একটা যৌন তাড়না চাড়া দিয়ে ওঠে। দেহের আগুন চায় একটা বিপরীত দেহকে পুড়িয়ে দিতে। নাকি এই বুড়ো বয়সেও নিজের হাতকেই ব্যবহার করবে সে? টয়লেটের নির্জন কুঠুরিতে কাজ সারবার পর একটা ক্লান্তিকর অনুশোচনা সারাক্ষণ ছেয়ে থাকবে তার মন। ‘না’, ‘না’। মনে মনে বলে রায়হান। মাঝে মাঝে তার মনে হয় যে-আগুন নেভাতে মানুষ ও পথে পা বাড়ায়, সে-আগুন তার নিভে গেছে। কিংবা আছে কিন্তু উত্তাপ নাই। জোছনার মতো। পূর্ণিমায় ঝলসে ওঠে জোছনা। কিন্তু কাউকে পোড়ায় না। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে একবার ডাক্তারের কাছে যায়। স্থূলকায় ডাক্তার বিচ্ছিরিভাবে হেসে বলে : মনটাকে শক্ত করুন। বিয়ে করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তার সমস্ত শরীর লজ্জায় শির শির করে ওঠে। জোছনার ভিতরে আরও একটা জিনিস আবিষ্কার করেছে সে। তা হলো নিঃসঙ্গতা। যেন জোছনা মূলত আগুন। আর উত্তাপ নেই বলে নিঃসঙ্গ। ঠিক তার নিজের মতো। তাই রাত বিরেতে মাঝে মধ্যে সে চন্দ্রভুক প্রাণী হয়ে যায়। তার একতলা বাড়িটার পর আরও পাঁচ সাতটি দালান পার হলে একটা মজা ঝিল। ঝিলের ধারের মাঠের কোনায় একটা পরিত্যক্ত বাড়ি। মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প হলেই ধসে যাবে। ওই পড়ো বাড়ির ছাদে বসে বহুদিন সে জোছনার সঙ্গ নিয়েছে। একা একা। রাত গভীর হলে ফিরে আসবার পথে কখনো বুড়ো তমিজুদ্দিনের সঙ্গে দেখা হতো। তমিজুদ্দিন এই মহল্লার পাহাড়াদার। সহানুভূতির ছলে টিপ্পনি কাটত সে : এই ভর রাইতে কই আছিলেন ভাই? আর ঘরেই থাকবেন ক্যামনে? নাদানের জীবন বাইছা নিছেন। বিয়া করেন মিয়া। বিয়াডাই সব। তার গহনে পৌঁছে নাড়া দেয় না এসব। নিজের পৌরুষ নিয়ে শুধু এক আশঙ্কার বরফ জমতে থাকে। তবু ওই দিন নিঃসঙ্গ বিছানা ছেড়ে হঠাৎ সে উঠে বসে। আর নিজের জীবন ঘিরে একটা সহজ সরল মীমাংসার জন্য উতলা হয়ে ওঠে তার মন। প্রথমত সে ভাবে উপযুক্ত সময়ে বিয়ে করলে তার ধূসর জীবনে কিছুটা রং হয়তো লাগত। কিন্তু বিয়ের ফুরসৎ তার হয় নাই। নিঃসঙ্গতার ঘোরপ্যাঁচ যে-ভাবে জড়িয়ে আছে তাকে আর সময় যেহেতু বয়েই গেছে, এখন তার বিকল্প হলো এক ক্লাস টপকে যাওয়া। অর্থাৎ বউ নয়, সন্তানের দিকে ঝোঁকা। এক ঝলক আনন্দ ফোটে তার মনে। ভাবে আজিজের মতো ‘আব্বু’ ডাক শোনাটাই তার জন্য মুখ্য এখন। তখনই মনে পড়ে ডানার মুখ। নিজের বয়সের চাইতে একটু বেশিই বোধহয় বেড়ে উঠেছে মেয়েটা। বেশ একটু নাদুস নুদুস। দ্বিতীয়ত তার বাসনাকিভাবে ফলবে এ নিয়ে যেন এক গেরিলার প্রস্তুতি চলে তার মনে মনে। ডানা তাকে ‘আঙ্কেল’ বলে ডাকে। ভালোলাগে না তার। সে চায় জোরাল অধিকার নিয়ে তার ওপর দস্যিপনা করবে ডানা। আজিজের ওপর যে-ভাবে চলে তার অবোধ শাসন। তখন স্নেহে প্রেম কাম ডিঙিয়ে একটা অবুঝ পিতৃত্বই যেন কুঁরে খায় রায়হানকে। অথবা সব প্রেষণা একসঙ্গে কাজ করে। অভিন্ন রেখায় এসে দাঁড়ায়। তখনই আচমকা তার মনে হয় ডানার মুখের আদলে একটা প্রতীকী পুতুল কিনে আনলে কেমন হয়? কিলবিলে ইচ্ছেটা রুখতে না পেরে পরদিনই পুতুলটা কিনে আনে সে। কিন্তু ঘরে ঢুকে মনে হয় কোনো উপযুক্ত আসবাবে পুতুলটা সাজিয়ে রাখতে না পারলে এর প্রকৃত জৌলুসটাই মারা পড়বে। তাই সেদিনই জমানো টাকা থেকে সে কিনে আনে এই কাঁঠালি রঙের শোকেস। পুরো শোকেসে সেদিন থেকে শুধু এই পুতুলটা শোভা পায়।


মাঝে মধ্যে তার মনে হয় শব্দেরও শরীর আছে। বিশেষ করে ডানা যখন কথা বলে তখন ওর ভাষার শরীর তাকে জড়িয়ে থাকে। বড় অলৌকিক সেই সংবেদ।


আকাশভীতি কাটিয়ে ঘরে ফিরলেও পুতুলের হাতছানি ফেরাতে পারে না সে। আর মনে মনে ডানাকে সে ‘পুতুল’ বলেই ডাকে। আয়না থেকে মুখ সরিয়ে শোকেসের গ্লাসটা সে খুলে নেয় প্রথমটায়। তারপর পুতুলটা হাতে নিয়ে সারা গায়ে হাত বুলায়। মোলায়েমভাবে বুকে চেপে ধরে। কী কোমল শিরশিরানি! যেন তুলোর মতো নরম কোনো হাত পড়েছে বুকে। তার চোখে ডানা এক বহুরূপী মায়াবি আদল। কখনো সে স্নেহ-পুষ্ট কেউ। কখনো সে প্রেমজ হাওয়ার মতো দোলা দেয়। তার বাড়ন্ত শরীরে কখনো আবার ভারিক্কি ঢেউ খেলে যায়। তখন সে-ও দিঘি। গভীর শান্ত নীল দিঘি। এখন সেই দিঘি প্রবঞ্চনায় বশ হতে থাকে রায়হান। আচ্ছন্ন ভঙ্গিতে পুতুলটার দিকে তাকিয়ে কথা বলে ওঠে : বাসায় আছিস তো,পাকা মেয়ে? আমি আসছি। যদি না থাকিস, তোর সঙ্গে আড়ি দেবো। আড়ি। আড়ি পাতা শেষ হলে দ্রুত চুল আঁচড়িয়ে নেয় সে। বয়স বাড়ার প্রসঙ্গটি আর মনে থাকে না। কী মনে হতে তার বন্ধু আজিজের বাসার দিকে রওনা হয় সে।

আজিজের বাসা রামপুরায়। তার বাসার সঙ্গে লাগোয়া কয়েকটি বস্তিমতো ঘর। হয়তো আগে পুরো জায়গাটা বস্তি ছিল। এখন তার সাবেকী হাল ধরে রেখেছে এই ঘর কয়টি। কী এক ব্যাপার নিয়ে অনবরত খিস্তি করছে দুটো পরিবার। মৌচাকের ট্রাফিক জ্যামে এমনিতে মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। তার ওপর কলহমত্ত একগাদা নারী পুরুষের মিলিত কণ্ঠস্বর জায়গাটাকে কুরুক্ষেত্র করে ছেড়েছে। পৃথিবীটা ক্রমেই আর বাসযোগ্য থাকছে না। এই বোধ বেশিক্ষণ টেকে না। আজিজের দু’তলা বাড়ির সিঁড়িতে পা দিতেই একটা ত্রস্ত আনন্দ খেলে যায় মনে। এখন প্রতি মুহূর্তের বুকের ঢিপ ঢিপ সে টের পাচ্ছে। এও এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা তার। এখানে এলে প্রতিবারই একটা অসংযত স্থিতি এসে পা খামছে ধরে। অথচ সামনে এগোনোর তুমুল আগ্রহও আঁকু-পাঁকু করে মনে। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে রায়হানের মনে হয় কোন অমূল্য প্রাপ্তির সন্নিকটে সে। কে দরজা খুলবে? ডানা? কলিং বেল টিপলে সত্যি সত্যি ডানাই দরজা খুলে দেয়। চোখে মুখে বিস্ময়, আঙ্কেল আপনি? ইস কতদিন পরে এলেন। একদম ভুলে গেছেন বুঝি? রায়হানের অভিব্যক্তি গুমোট হয়ে থাকে। কথার ফুলঝুরি ভেতরে তিড়িং বিড়িং নাচছে। অথচ কিছুই যেন বলার নেই। মাঝে মধ্যে তার মনে হয় শব্দেরও শরীর আছে। বিশেষ করে ডানা যখন কথা বলে তখন ওর ভাষার শরীর তাকে জড়িয়ে থাকে। বড় অলৌকিক সেই সংবেদ। আর তার ভারে সে নিজে বোবা হয়ে যায়। যেমন এখন ‘ইস কতদিন পরে এলেন,’ অথবা ‘একদম ভুলে গেছেন বুঝি’ এই কথাগুলো শোনার জন্যে কানদুটো খরগোশের মতো সজাগ রেখে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়। সেই ইচ্ছে গোপন রেখে সে বলে : কই, এই না সেদিন এলাম।

আপনার কিচ্ছু মনে থাকে না। আমি ঠিক ঠিক গুনে রেখেছি। পাক্কা উনিশ দিন পর এলেন আপনি।

ডানার কাছে জানা যায় আজিজ বাসায় নেই। বউকে নিয়ে শপিং-এ গেছে। রুমে ঢুকে হাতের প্যাকেটটা ডানাকে দেয়। চুইংগাম, কিছু বিদেশি চকলেট আর ওর প্রিয় কোন আইসক্রিম আছে ওতে। স্ফুর্তিতে টগবগিয়ে ওঠে না ডানা। তবু খুশির মিশেলে ক্ষীণ চঞ্চলতা ঠাওর করা যায়। কথার ভেতরে কিঞ্চিৎ শাসন : এত্তকিছু এনেছেন আবার? আব্বু জানলে ভীষণ বকবে আপনাকে। মৃদু হেসে রায়হান বলে, আমাকে বকলে তোমার আব্বুর কান মলে দেবো আমি। ফিক করে হেসে ওঠে ডানা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিজে কেমন আলুথালু হয়ে পড়ে রায়হান। কেবল চোখ দুটো ডানার দিক থেকে নড়ে চড়ে না। জুলজুল তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ বুকের ভেতরটা খচখচ করে। সেই উদগ্র বাসনা উগরে উঠতে চায়। মাথার ওপরে ফুল স্পিডে ফ্যান ঘুরছে। অথচ শরীর ঘামছে খুব। সোফায় বসে চোখ বুজে সে। পাঁজর ফুঁড়ে ঢুকে যায় তৃতীয় নয়নের শুঁড়। সে দেখে টেপা মাছের পেটের মতো স্ফীত হচ্ছে ফুসফুস। পরক্ষণেই মিইয়ে গিয়ে চুপসে যাওয়া বেলুন। একটু আদর বুলিয়ে দিলে কী হবে এমন? বছর দেড়েক আগে ব্যবসার কাজে আজিজ একবার ঢাকার বাইরে যায়। ফেরার পথে মৌচাকে দেখা হয় রায়হানের সঙ্গে। এক সঙ্গে বাসায় ফেরে ওরা। অনেক দিন পর বাবাকে দেখে ওপর থেকে দৌড়ে নেমে আসে ডানা। আজিজকে জড়িয়ে ধরে। কী অপার আনন্দে মেয়েকে ধরে চুমো খায় আজিজ। ভেতরটা জ্বলে ওঠে রায়হানের। ঈর্ষার আগুনে পুড়ে মনে হয়, তাকেও যদি জড়িয়ে ধরতো এমন। সে-ও যদি ওভাবে চুম্বন দিত। এমন সুখে লেপ্টে যেতে কার না মন চায়? সেই থেকে উপোস মনটা হাঁ করে আছে। ওই তো তার দেয়া জিনিসগুলো নেড়ে চেড়ে দেখছে ডানা। হাসছে মিটিমিটি খুশিতে। জড়িয়ে ধরবে নাকি এখনি? সীমানা ডিঙানো যায় না আজও। ডানার মামা মিন্টু এসে বাদ সাধে। তেঁজগা কলেজে বিএ পড়ছে সে। এখানেই থাকে। কলেজে ওর রাজনৈতিক ভূমিকার কথা এ এলাকার ছড়েছে বেশ। মাস্তানির প্রভাবও বেড়েছে তাই। সে কারণে আজিজের কাছেও একটু বেশি পাত্তা পায়। মাঝে মধ্যে ঘরে বসে বসে সেই প্রসন্নতার জাবর কাটে। পাশের ঘর থেকে ওঠে আসে মিন্টু। কপট রাগ দেখিয়ে বলে, কাল না তোমার ক্লাস টেস্ট। পড়াগুলো কমপ্লিট করেছ? যাও, যাও পড়তে বস।

মামাকে যমের মতো ভয় পায় ডানা। ইতোমধ্যে সে আইসক্রিম শেষ করেছে। এবার হাতের জিনিসগুলো নিয়ে দ্রুত সরে পড়ে। মিন্টু ওগুলো দেখে নি বোধহয়। নইলে তাকেও দু’চার কথা শুনিয়ে দিত। রায়হানকে সে বলে : চুল পেঁকে-যে সব তামার তার হয়ে গেল। বিয়ের সিদ্ধান্ত কিছু নিলেন?

মিন্টুর কথায় সবসময় একটা জবরদস্তি থাকে। যেন সে জেরা করছে। জবাব দিতে ভয় হয়। এ প্রশ্নেরও যুৎসই জবাব খুঁজে পায় না সে। সম্ভবত সেই ভয়েই। এরও একটা পটভূমি আছে। সেদিনও এমনি এক বিকেল বেলা আজিজ বউকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যায়। হাতে কয়েকটি কোন আইসক্রিম নিয়ে সে ডানাকে দেখতে আসে। অবাধ্য হাত দুটো কখন যে ডানার গালে চলে যায় সে বুঝতে পারে না। হিস হিস নিশ্বাস ছেড়ে বলে, আমাকে ছেড়ে কখনো উড়াল দিবি না তো, ডানা? কিছুই বুঝে উঠতে পারে নি ডানা। তার আগেই পাশের রুম থেকে ক্ষীণ তন্দ্রা ভেঙে উঠে আসে মিন্টু। ধমক দিয়ে বলে, বড়দের সঙ্গে ন্যাকামো কিসের? যাও এখান থেকে। তারপর রক্তচক্ষু করে রায়হানকে শোনায়, আপনিই বা কেমন মানুষ বলুন তো? এভাবে লাই দিলে যে মাথায় উঠবে।

সেই থেকে রায়হান এলে ডানাকে একটু চোখে চোখে রাখার প্রবণতা মিন্টুর। আসলে সে নিজেই একটু লাই পেয়ে গেছে তারই ইঙ্গিত কি দেয় নি মিন্টু? সে যাই হোক। ওর এখনকার প্রশ্নের কী জবাব দেওয়া যায়? শুধু বলে : এখন বিয়ে করলে লোকে বলবে বুড়ো বয়সের ভীমরতি। জবাবটা দিয়েও মনে সংকোচ থাকে। বার বার বিয়ের কথা বলে কী বুঝাতে চায় মিন্টু? বিকৃত কিছু ভাবছে নাকি? কী জানি, সে নিজেই তার বোধের অতল খুঁজে পায় না। আজিজ তার ক্লাসমেট। এসএসসি পর্যন্ত একসঙ্গে পড়েছে ওরা। সময়ে বিয়ে করলে ডানার মতো মেয়ে তার নিজেরও হতে পারতো। যৌবনের সোনালি উৎপাদন সে রেখে যেতে পারতো পৃথিবীর কাছে। এখন কি সেই উৎপাদনের সময় চলে গেছে? হয়তো গেছে। নইলে সে কোনো উত্তাপ টের পায় না কেন? নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে। ভাবে, ডানা তার জীবনের মনোরঞ্জন। অনিবার্য তার সঙ্গ। স্রেফ এই। এর কিছু ঘাঁটার প্রয়োজন নেই। ফের প্রশ্ন করে মিন্টু, তা কোন ভীমরতি পেয়েছিল বলে সময়ে বিয়েটা করলেন না?

এবার একটা মোম প্রশ্ন করে বসেছে ছোকরা। কিন্তু এ নিয়ে এই নাছোড় বান্দাটার এত মাথা ব্যথা কিসের? ছুঁচলো গালি দিয়ে এর জবাব দেয়া যায়। মনে মনে বলে, মর্দামি থাকে তো তুই-ই শালা বিয়ে করে দেখা না। আমার বিয়ে নিয়ে তোর এত টাটানি কিসের? কিন্তু মিন্টুকে ও কথা বলা যায় না। আর উঠতি বয়সের ভাগনির গাল ছুঁয়ে দিলে কোনো মামাই কি পারে শঙ্কাহীন ছেড়ে দিতে? সে হয়তো চায় সেদিনের দৃষ্টিকটু ব্যাপারটা আর অগ্রসর না হোক। আর ভদ্রতা বজায় রেখে রায়হানের বিয়ের মাধ্যমেই তার নিষ্পত্তি সম্ভব। কিন্তু যাদের অধিকার ছিল তারা তো ওর বিয়ের কথা ভাবে নি। বাবার ওপর অভিমানটা উসকে ওঠে। অব্যক্ত ক্ষোভে স্মৃতির ঘন ঘোর কেটে যায়। খাঁ খাঁ শূন্যতার ছেলেবেলাটা আদ্যপান্ত ভেসে ওঠে। একমাত্র ছেলে হলেও বাবা-মার অবাধ আদর পেয়ে মানুষ হয় নি সে। অথচ তারই লাই পেয়ে পেয়ে মাথায় উঠার কথা ছিল। এরকম ক্ষেত্রে যা প্রায়শ হয়ে থাকে। সে বেড়ে ওঠে একা একা, সন্তর্পণে। সবার মাঝে থেকেও অনেক নিঃসঙ্গতায়। শান্ত সুবোধ ছিল বলে বোনেরাও যেন তার উপস্থিতি টের পায় নি। মাঝে মধ্যে তার মনে হয় তার জন্মটা বাবা-মার ইচ্ছা প্রসূত নয়। প্রকৃতি অযাচিতভাবে তাকে জন্ম দিয়েছে। এসময় তার সঙ্গী হয় ‘শরৎ রচনাবলী’, ‘দস্যু বনহুর’ অথবা পর্ণ পত্রিকার এক গাদা নগ্ন ছবি। স্কুল ছুটির পর এক বন্ধু চুপিচুপি এই ছবিগুলো তাকে দেয়। হাইস্কুল জীবনে সেই থেকে তার চোখে নতুন দিগন্ত। বেশ কয়েক বছর আগেও এসব সংগ্রহে সে নেশার মতো সময় দেয়। পোকায় খাওয়া এসব পত্রিকার স্তূপ এখনো খাটের তলায় পড়ে আছে। সেই স্কুল জীবন থেকেই একটা ঈর্ষার আগুন পাক খেয়ে খেয়ে ওঠে। আর বোনেরা সেই আগুনের ইন্ধন। কিন্তু আসামীর কাঠগড়ায় তার মনে কেবল বাবার আসন পাকাপোক্ত হয়। সেই ধৃতিমান বাবা। মুখে ইয়া লম্বা দাড়ি। ধ্যানগম্ভীর। কথাবার্তায় কী দারুণ রহস্য ছড়াতেন। অথচ ওসবে কখনো শ্রদ্ধা আসে নি রায়হানের। বরং একটা প্রচণ্ড অভিমান ধীরে ধীরে শেকড় গেড়ে বসেছে। ধীরলয় চলাফেরা থামিয়ে প্রায়ই ডেকে বলতেন, তোরে নিয়া আমি ভাবি না। ফকির হইলেও তোর দুঃখ নাই। তুই পুরুষ না? এতে উল্টো ফল হয়। তার মনে হয় বাবার এই আত্মবিশ্বাস তাকে সত্যিসত্যিই ফকির করে দেবে। আর বাবা ছেলের দুঃখ দেখে তার পৌরুষের পরীক্ষা নেবেন। দুবার ইন্টার মিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েও পাস করতে পারে নি সে। রাগ করা তো দূরে থাক একটু আফসোস পর্যন্ত করলেন না বাবা। ভাবটা এমন—সে পাস করলেও তার কিছু আসে যায় না। অথচ সে চাইতো বাবা চোখে রক্ত ঝরাক। অধিকার ফলিয়ে চপেটাঘাত করুক। চরাচর বুঝে নিক এ সংসারে তার সফলতার গুরুত্ব আছে। কিংবা ব্যর্থতার দায়। কিন্তু বাবা আসেন তসবীহ্‌তে আঙুল ঘুরিয়ে। মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, ফেল করছস তাতে কী? পড়াশোনার দরকার নাই। পুরুষ মানুষের দুঃখ কিসের? তার মনে হয় ওই হাতে কোনো আশীর্বাদ নেই। হিমালয়ের মতো ভারী কোনো পাথর ব্যর্থতার সাগরে ডুবিয়ে দিচ্ছে তাকে। হঠাৎ বাবার কপাল কুঁচকে যায়। উৎকণ্ঠার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, মেয়েদের লইয়াই তো ভাবি। আমি মরলে যে কী হইব। ওরা তো অবলা? মেয়ে মানুষের দুঃখ সওয়া যায় না বাবা। বড় লাগে। কোনো উত্তপ্ত শিক কেউ যেন রায়হানের কানে ঢুকিয়ে দেয়। বোনদের কাছে তার অধিকার পর্যুদস্ত হচ্ছে বার বার। বাবার সঙ্গে দূরত্বের পরিধি বাড়ছে। কে রুখবে এসব? রাত জেগে জেগে ওর চোখে কালি পড়ে। আর কিছু নয়, কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্নের ছায়া। কিন্তু বাবার চোখে আঙুল দিয়ে সেই কালিমা দেখায় কে? মনের গতিবিধি উল্টে গেলে কখনো মনে হয়, এ সংসারে তার উপস্থিতি অর্থহীন। দুচোখ যেদিকে যায় চলে গেলে কেমন হয়? বড় বোনটা যখন একটা হাভাতে যুবকের হাত ধরে পালিয়ে যায়, তখন রায়হানের পঁচিশ। বাবার মুখে দুশ্চিন্তার রেখাপাত নেই। রাশভারি ভাবটি আরও জোরাল করে শুধু তসবীহ্ জপেন। তাতে যতটা বিশ্বাস তার চেয়ে বেশি আত্ম-প্রবোধ। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার প্রতি খোদার এই রহমতে বাবা মনে মনে কৃতজ্ঞই হয়েছেন। তাই মাস চারেক পর বোনটি যখন ভুখা-নাঙ্গা হয়ে ফিরে আসে, পাশের জমিটা বিক্রি করে বরটিকে একটা ব্যবসা ধরিয়ে দেন। এখন তারা দিব্যি আছে। এসময় দ্বিতীয় বোনটির জয়জয়কার। বহু যুবকের নাকে দড়ি লাগিয়ে ঘুরাচ্ছে। এসএসসি পার হবার আগেই তার পড়াশোনা লাটে ওঠে। ময়ূরীর মতো পেখম তুলে ঘরে বসে গুন গুন করতে কি-যে সুখ তার। আর তোঁতলানো ভাষায় মা-ও খুব ঝাঁঝাল বকাঝকা করেন, বড়টা তো ইজ্জত খুয়াইয়া গেছে। এখন তুই পার হইতে পারস না? বাবার সংসার পার হতে সত্যিই সে একজনকে ধরে আনে। বলে, আব্বা, আমি তোমাদের সম্মানের কথা ভাবি। তাই বড় আপার মতো হবো না। আমি একে বিয়ে করব। ব্যবস্থা কর।


কামজ বোধ আসে, শারীরিক সাড়া নেই। জোছনা মতো ঝলসে ওঠে বোধ, অথচ পোড়ানোর শক্তি নেই। উত্তাপ নেই।


মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি পেয়ে বাবার ব্যবস্থার সমারোহ দেখে কে? কিন্তু কয়েক মাস পর বরটি চোরাকারবারিতে ধরা খেয়ে জেলে যায়। নিজের গাঁটের টাকা ব্যয় করে ছাড়ান বাবা। হাতে লাখ দেড়েক টাকা ধরিয়ে বলেন, এইবার হালাল ব্যবসা কর মিয়া। মা হলেন সুখে দুঃখে নির্বিকার এক অবুঝ মানুষ। জাগতিক সব কিছুর প্রতি তারও নিস্পৃহতা। কিন্তু তা বাবার মতো আকস্মিক কিছু নয়। বংশগত ধাত। বাবা-মার মধ্যে একটা ভেদ-রেখাও দেখতে পেত রায়হান। সাংসারিক কোনো ব্যাপারে বাবাকে মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করতে দেখা যায় নি। মা এসব তোয়াক্কা করতেন না। কোনো সময় চৈত্রের গরমেও লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতেন। অনিচ্ছা হলে বাবা দরজা ধাক্কালেও খুলতেন না। বাবা তখন বলতেন, ফকির বংশের মাইয়া। মাথায় গণ্ডগোল হইব জানতাম। আমার তকদির।

মা যখন প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন, বোনদের কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। রায়হানও কষ্ট পায় না খুব। শুধু সেবাটাই করে যায় বেশি। জোয়ালটানা গরুর মতো সেই সেবাদান। অথচ একটুও বিরক্তি আসে নি। মনে কোনো অভিযোগ বা অনুযোগের প্রশ্রয় মেলে নি। কিন্তু বাবার প্রতি অতটা সদয় হওয়া যায় না। তিনি কখনো বুঝেন নি কতটা কষ্ট নিয়ে দিন দিন বুড়িয়ে যাচ্ছে তার ছেলেটি। দিনভর আত্মনিমগ্ন থেকে এক ঘরে হয়ে পড়ছে। তার একটু নজর এসব ঠেকাতে পারতো। কিন্তু মেয়েদের দিক থেকে তার একপেশে চোখ কখনো সরে নি। মৃত্যুর আগে রায়হানকে ডেকে বলেন, মেয়ে গুলাইনরে ফালাইয়া গেলাম বাপ। তুই ছাড়া তাগো আর কেডা আছে? ওগো কিছু না কইয়া নিজের কিছু ভাবিস না বাবা।

স্বার্থপরের মতো বেমালুম কেটে পড়েন বাবা। ছেলের ওপর চাপিয়ে যান জগদ্দল পাথর। সেই পাথর সরাতে তার পাঁচ বছর লেগে যায়। ছোট তিন বোনের বিয়ে দেয় সে। ইতোমধ্যে ভোগান্তির চরম অভিজ্ঞতা নিয়ে মা মরেন। যে-রেশ রেখে যান তার ক্লান্তি দূর হতে আরও দু এক বছর লেগে যায়। নিজের দিকে নজর দেবার যখন ফুরসত আসে তখন সে চল্লিশ ছুঁইছুঁই। তারপর সময় গড়াল আরও কিছু। এখন শুধু নিঃশেষ হবার পালা। এই তো গেল সপ্তাহে বড় দুই বোন আসে একমাত্র বাড়িটার হিস্যা নিতে। নিজেদের মধ্যে ক্যাঁচাল করে নরক গুলজার করে ছাড়ে। এসব দেখে দেখে অবসাদ এসে গেছে ওর। কোনো রকমে এই দুষ্ট গ্রহ ছেড়ে যেতে পারলে হাঁক ছেড়ে বাঁচা যায়। কিন্তু এইসব প্রেক্ষাপট মিন্টুকে বলা যায় না। ‘উঠি আজ’ বলে উঠে পড়ে সে। জবাব দেওয়া হয় না। দরজা বন্ধ করতে মিন্টুও ওঠে আসে। জবাব শোনার তাগিদ তারও নেই। নিচের সিঁড়িতে আজিজের সঙ্গে দেখা হয়। বউটা পেছনে। তাকে দেখে আজিজ বলে, কখন এসেছিলি? এখনি যাচ্ছিস যে? ওপরে চল। কথা বলা যাবে।
আজ থাক। পরে আসবো একদিন।
এবার বউটি বলে, ঘরে বউ নেই। কার টানে এমন ব্যস্ততা বলুন তো?

আজিজ ভাগ্যবান। কালে ভদ্রে এমন সুন্দরী বউ মেলে। নামটাও চমৎকার : মিষ্টি। আইএ পাস করার পর আজিজ হঠাৎ বড় লোক হয়ে যায়। মিষ্টির সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করত আগে থেকেই। রামপুরার বাসটা ধরিয়ে দিয়ে বিয়ে করে বসে। অথচ তার নিজের কোনোদিন প্রেম করা হয় নি। সামান্য অভিমানে একটু খুনসুটিতে বুকভরা মেয়েলি কান্নার সুখ দেখা হয় নি তার। আর সবি আদিখ্যেতা। এইসব নকশা করার কোনো মানে হয় না জীবনে। কিন্তু না করেও তার জীবনের কোনো মানে হয়েছে কি? মিষ্টির কথার জবাবে সে বলে, আমার সব টান তো আপনাদের ঘিরেই। ঘরে বউ থাকলে এই সুযোগ হতো?

তাই বুঝি? কিন্তু যে-ভাবে চলে যাচ্ছেন তাতে কোনো টান আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।

সত্যিই কোনো টান নেই তার। শুধু সৌজন্য রক্ষার্থে ও কথা বলা। তার সমস্ত টান, অন্তর্লীন মমতা শুধু একটা বিন্দুতে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে। তারই উদরজাত সেই বিন্দু ডানা। আর ভয়ঙ্কর সেই টান।

রামপুরা থেকে আসতে সন্ধ্যা পার হয়। রাতের প্রহরগুলো প্রায় নির্ঘুম কাটে। পরের দুদিনও একই ধাঁচে কেটে যায়। একটা ঘোরের মধ্যে যেন দিনাতিপাত। বুড়ো মতো বুয়া এসে ভাত পাকিয়ে রেখে যায়। তার আনমনে ভাব দেখে জিজ্ঞেস করে, আপনেরে এমন উদাস লাগে ক্যান? সে কিছু বলে না। কোনো কিছুতেই মন লাগে না তার। বেনোজলে ভাসতে হলেও খরকুটো চাই। তার কোনো অবলম্বন নেই। মানুষ কি শুধু নিজের জন্য বেঁচে থাকতে পারে? সকালে দোকানটা খুলে দুপুরের আগে ঝাঁপ নামিয়ে চলে আসে সে। উদভ্রান্তের মতো বাকি সময়টা কাটিয়ে দেয়। হয় বিছানায়, সেই প্রাসাদোপম পুরনো বাড়িটার ছাদে, অথবা ঝিলের পশ্চিম কোনার সেই মাঠটায়। আজও সে মাঠের দিকে হাঁটে। চারপাশের সব কিছু কেমন রূঢ় মনে হয়। সঙ্গতিহীন। নাকি বাবা মার ভুত এসে মাথায় চেপেছে তার? নিস্পৃহতার ভুত? বিকেল গড়ানো আলোয় পশ্চিম কোনার পরিত্যক্ত বাড়িটা এখন থমথম করছে। একটা নির্জন স্থান বেছে নিয়ে বাড়িটার সামান্য তফাতে চুপটি মেরে বসে থাকে সে। অনেক পুবে মাঠের একাংশে খেলা করছে ছেলেরা। সেই কোলাহল এখানে এসে পৌঁছায় না খুব। মাঠের মাঝখান দিয়ে যে-কৌণিক রাস্তাটা গড়ে উঠেছে তাতে দু’একজন পথিকের চলাচল দেখা যায়। তাদের দৃষ্টি থেকেও সে অনেক আড়ালে এখন। সামনের পাশাপাশি দুটো বাড়ির ফাঁক দিয়ে পশ্চিমে ঢলে-পড়া সূর্যের একটা ফিনফিনে রশ্মি ঠিক ওর চোখ বরাবর। কুশের মতো তা বিঁধে যায়। তার চোখে নয়, বোধে। সে-ও কি ঢলে পড়ছে না আরও বয়সের দিকে? প্রৌঢ়ত্বের প্রান্ত কি ছুঁয়ে যায় নি তার বয়স? ভাবলেশহীন সে তাকিয়েই থাকে। ইতোমধ্যে একজন মেয়ে মানুষ, না বরং মহিলা বলাই ভালো, সামনের ছাদে উঠে আসে। হাতে ন্যাকড়া জাতীয় কিছু। রায়হান সপ্রতিভ হয়ে ওঠে। নিজের ভেতরে এক তুমুল আগ্রহ তার। কিসের আগ্রহ? মহিলাটিকে দেখার? নাকি তার অবিন্যস্ত হাবভাব? গত মাসে ব্যাপারটা সে প্রথম দেখে। সময়টা এরকমই হবে। ওই পরিত্যক্ত বাড়িটার ছাদে সে বসে আছে। আর মহিলাটি ছাদে উঠে এসে চারদিকে উঁকিঝুঁকি মেরে হাতের ন্যাকড়াগুলো নিচের ড্রেনে ফেলে দেয়। রায়হান বোঝে, ওগুলো স্যানিটারি ন্যাপকিন। নির্লজ্জের মতো চুপিচুপি তাকিয়ে থাকে সে। প্রথমটায় এক পলকা সুখের মতো হাওয়া লাগে মনে। তার পরেই সেই লাগাতার বেদনাবোধে সে টালমাটাল। এই দৃশ্য দেখবে বলে গত কয়েকটি দিন সে এদিকে ঘুরঘুর করছে। আজও কি কোনো বেদনাবোধ দুমড়ে মুচড়ে ওঠে? নাকি শুধু রক্তাক্ত ন্যাপকিনগুলো দেখবে বলে সে ওদিকে তাকায়? তারপর রক্ত আর দিগন্তের লালাভা তার চিন্তায় লীন হয়ে যায়। মহিলাটি ছাদ থেকে সরে পড়েছে অনেক আগেই। তার মনও ওদিকে নেই। লাল লালে ভরে যায় তার চিন্তার জগৎ। দিগন্তের লাল পোছ দেখে দেখে আরেকটি লালের কথা তার মনে পড়ে। তা হলো আগুনের শিখা। দাউ দাউ আগুন জ্বললে একটা লাল শিখা লকলকিয়ে ওঠে না? তখন তার ভাবতে ভালো লাগে এরকম আগুন তার ভেতরেও ছিল। ষোল সতের বা আঠার বছর বয়সে। সমবয়সী কোনো মেয়ের ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দেখলে সেই আগুনে সে পুড়ে যেত। অবদমনের জল ঢেলে নেভাত। এখন সেই আগুন আর দাউ দাউ জ্বলে না। ঢলে-পড়া সূর্যটার মতো স্তিমিত হয়ে পড়েছে। তবে ধিকিধিকি তুষের আগুনটা? বুকের কোনায় যেটা জ্বলে? সেটা কি শূন্যতা, অপ্রাপ্তি, নাকি অনির্ণীত কিছু? সেই আগুন আর পোড়াবে না তাকে। আহা যৌবনের চিহ্ন আঁকা কোনো প্রদীপ্ত উৎপাদন থাকবে না তার? জীবন্ত কিছু? এ কথা ভাবতেই তার বুকে ঢেউ ওঠে। বেদনার, বিষণ্নতার। হাঁটুতে মুখ লুকিয়ে রায়হান কাঁদে।

সন্ধ্যার অনেক বাদে ঘরে ফেরে সে। আজ কোনো জোছনা নেই। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ে। চোখ বুজলেও ঘুম নেই। ঈষৎ ফাঁক হওয়া দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। বহুতল বাড়িগুলোর জানালায় হলুদ আলো। ওর চোখে নক্ষত্রের মতো জ্বলে। মিটিমিটি সেই আলোর সঙ্গে খেলা চলে অনেকক্ষণ। ফ্লোরে ঢেকে রাখা খাবার অমনি পড়ে থাকে। তারপর নিশিরাত। সুনসান নীরবতা। পরিপাটি স্বপ্নালোকের মতো ঘরের ডিম লাইট। অথচ ঘুম আসে না। বুকের হেঁসেলে ধিকিধিকি আগুন। কাঁথার নিচে হাত দুটো মেলে ধরে। নাভি বরাবর আরও নিচে চলে যায় হাত। সেই একই খসখসে অনুভূতি। পুরো শরীরে একটা মৃদু কাঁপুনি লাগে। সজারুর কাঁটার মতো দাঁড়িয়ে পড়ে লোম। কাঁথা সরিয়ে বিছানায় ওঠে বসে সে। গোখরো সাপের মতো ফোঁস ফোঁস নিশ্বাস ছাড়ে। একাকী ঘরেও পা টিপেটিপে খাট থেকে নেমে আসে। যেন কেউ দেখে ফেলবে। এবার টিউব লাইট জ্বালিয়ে দিলে সারা ঘরময় আলো ঝিলিক দিয়ে ওঠে। খাটের নিচে পুরনো পর্ণ পত্রিকার স্তূপ ঘাঁটতে থাকে সে। অসংখ্য তেলাপোকা ছড়িয়ে পড়ে। হসহস শব্দ করে বেরিয়ে যায় কয়েকটি ইঁদুর। বুকের ভেতরে সেই শব্দের অনুরণন। নগ্ন ছবিগুলো বিছানায় মেলে ধরে সে। কয়েকটি নারী মূর্তির দিকে লুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। পেলব শরীরে হাত বুলায়। পা থেকে শুরু করে উরু, নাভিমূল, স্তন—না, কেবলই ছবি। কেবলই এক নিস্তেজ পৃষ্ঠাকে ছেনে যাওয়া। কামজ বোধ আসে, শারীরিক সাড়া নেই। জোছনা মতো ঝলসে ওঠে বোধ, অথচ পোড়ানোর শক্তি নেই। উত্তাপ নেই। আবারও চেষ্টা করে সে। আরও তীক্ষ্ণ বোধ, আরও লোলুপ অনুভূতির জিভ লেলিয়ে দেয়। কিন্তু এ কী? সব কিছু ছাপিয়ে ওঠে আরেকটি শরীর। যেন শরীরের সমস্ত ভাঁজ খুলে উদোম দাঁড়িয়ে আছে ডানা। দেহের ভাঙন খাদ আর অর্বুদ মিলিয়ে যেন এক পূর্ণাঙ্গ নারী। এবার লিকলিকে জিভ গুটিয়ে নেয় রায়হান। দৃঢ় মুষ্ঠিতে কুঁচকে যায় নগ্ন ছবিগুলো। দেড় বছর আগের দৃশ্যটা মনে পড়ে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরছে আজিজ। তারপরেই কি অবিনাশী সুখ। ও কথা ভাবতে ভেতরটা কেমন হুহু করে ওঠে। চিলের মতো ছুঁ মেরে সেই সুখ কেড়ে নিতে মন চায়। টিউব লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ে সে। বুকে জাপটে ধরে পুতুলটা। যেন সে পিষে ফেলছে ডানাকেই।

পরদিন ঘুম ভাঙে প্রায় দুপুরে। কিছুক্ষণ বিছানায় ঝুম মেরে বসে থাকে। তারপর হাতমুখ ধুয়ে গতরাতের বাসী খাবারটিই খেয়ে নেয়। কোনো কারণে বুয়া তখনো আসে নি। আজ দোকান খুলবে না বলে মনস্থির করে আবার গা এলিয়ে দেয় বিছানায়। এরই মধ্যে সব বোনেরা এসে হাজির। কথার দাপদাপিতে ওর আয়েসি ভাবটাকে ছত্রখান করে দেয়। আজ তারা এসেছে তাদের হিস্যার একটা হিল্যে করতে। এই উৎপাত সামলে উঠতে পারে না রায়হান। ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে এমন সময় বড়জন বলে, তোর তো আর সংসার করা হবে না। আমি বলি কী তোর দুলাভাইয়ের ব্যবসাটায় হাত লাগা। তার পরের জন তেড়ে ওঠে : সে কী, ব্যবসাই যদি করবে তো আমি কি দোষ করেছি? দোকানটায় যেহেতু আয় তেমন হচ্ছে না, তুই বরং আমার ওখানে চলে আয় রায়হান। বাকি তিনজন বাধ্য শ্রোতার মতো এই ক্যাঁচাল শোনে। কার পক্ষ নিলে সুবিধে হবে এই নিয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে।

একটা জাঁকাল ধ্বংসলীলার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রায়হানের কল্পনায় পৃথিবীর যান্ত্রিক কাঠামো তুষার কণার মতো ঝুরঝুর পড়তে থাকে। কষ্টবাহিত একটা হাসির উদ্রেক হয় বলে চুপচাপ বসে থাকে। ভয় হয়, বোনরা না কখন আবার তার হাত পা মাথার হিস্যে নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া শুরু করে। সব দায় ছেড়ে দিয়ে সে বলে, তোরা সব বুঝে নে। আমার কোনো আপত্তি নেই। তারপর অবলীলায় বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। হাতে সেই ওলের পুতুল।


এবার তাকে জাপটে ধরে রায়হান। বিপুল চুম্বনে ভরিয়ে দেয় ওর চোখ মুখ নাক গাল। নরখাদক মাংসের স্বাদ পেলে যেমন সব গিলে খায়, সেই পাগলপারা বিভোরতা।


দোকানের সামনে এসে একটু দাঁড়ায়। দোকান বন্ধ রাখার আগের সিদ্ধান্ত অটুট রেখে সোজা চলে আসে বড় রাস্তায়। ডান দিকের পথ ধরে অনেকক্ষণ হাঁটে। একটা চলন্ত বেবিটেক্সি প্রায় ওর গা ঘেঁষে চলে যায়। পেছনে আরেকটা ট্রাক এসে জোরে হর্ন বাজিয়ে ওকে সচকিত করে। এবার চোখ কান খোলা রেখে উল্টো পথে হাঁটা দেয় সে। কেননা সে দেখে এটা তার গন্তব্য নয়। গন্তব্য যে কোথায় তাও জানা নেই। তবু একটা অদৃশ্য অঙ্কুশ তাকে যেন উল্টো পথেই টানতে থাকে। শাহজাহানপুর রেল ক্রসিং পার হয়ে মালিবাগ এসে হুট করে গাড়িতে চেপে বসে। রামপুর স্টপেজে এস তবে গন্তব্য স্থির হয়। আজিজের বাসা। তখন সবে দুপুর গড়িয়েছে। এই অসময়ে যাওয়াটা ঠিক হবে কি না এ নিয়ে দোটানায় পড়ে। তার হাত পুতুলটা আঁকড়ে আছে তখনো। যে কেউ কেড়ে নিতে পারে, যেন সেই সর্তক প্রহরা। এটা ডানাকে দিয়ে দিলে কেমন হয়? খুঁতখুঁতে ভাবটা কেটে যায়। এই অজুহাতে ও বাসায় যাওয়াটা এখন খুব একটা খারাপ দেখায় না।

নিচের সিঁড়িতে পা দিতে আজ আর বুকের ঢিপঢিপ নেই। মনের ভেতরে কি এক চাপা মৌতাত। দুপুর গড়ানো এই চোরা স্তব্ধতায় একটা লেলিহান সাধ ইনিয়ে বিনিয়ে উঠতে চায়। সেই একটু আদরের, সেই জড়িয়ে ধরার সাধ। আজিজ এখন বউকে নিয়ে ঘুমায় কি? অকর্মার ধাড়ি ওই মামা ছোকরাটা? দু’তলায় এসে সামান্য ফাঁক-করা দরজা দেখে একটু সন্দেহ হয়। একটু ভয় এসে নাড়ায় শরীর। ডানা আছে কি ঘরে? এই পুতুল? তার মনোরঞ্জন? সেই গভীর শান্ত নীল দিঘি? আছে তো?

আঙ্কেল!

আচমকা ডেকে ওঠে কেউ। কাচভাঙা শব্দের মতো সেই দ্যোতনা। একটু কেঁপে উঠে সে। বুকের ধুকধুকানি দস্যুগিরি চুকিয়ে দেয়। সিঁড়ি ভেঙে ওপর থেকে দৌড়ে নেমে আসে ডানা।

ছাদ থেকে আপনাকে দেখেছি আঙ্কেল। আপনার হাতে ওটা কী?

পুতুল। তোমাকে দেবো বলে এনেছি।

খিল খিল হেসে ওঠে সে, পুতুল? রায়হানের ভেতরটা ভিজে যায়। চাতকের মুখে বৃষ্টির ফোঁটার মতো সেই সুখ। ডানা হাতে নেয় পুতুলটা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে চোখ মুখ নাক। আম্মুরা ঘুমুচ্ছে। আপনার কথা ডেকে বলি। নিজের মুখে তর্জনী ঠেসে ধরে আবার বলে, আমি যে ছাদে ছিলাম বলবেন না যেন। রায়হান ওর হাত ধরে বাধা দেয়। ডাকতে হবে না। আমরা দুজন কথা বলি। ড্রয়িং রুমের দরজাটা ধাক্কা দিলে ক্যাচক্যাচ শব্দ করে খুলে যায়। তার ওপর একটু মিইয়ে যাওয়া হাসির মিশেলে সব কেমন ভৌতিক লাগে। বুকের আগুন যেন চোখ দিয়ে ঠিকরে বোরোবে তার। ডানার দিকে তাকিয়ে সে বলে, বুকের আগুন নিভিয়ে দে পুতুল। কাছে আয়।

ওর পরিচিত মুখটা ডানার কাছে কেমন অচেনা ঠেকে। মাথাটা বিগড়ে গেল নাকি আঙ্কেলের? বলছে যে, পুতুল? ওর নামটিও কি ভুলে গেল? ভয়ে সে পাংশুটে হয়ে যায়। পুতুলটা পড়ে থাকে সোফার ওপর। ঢোক গিলে বলে, কী বলছেন আঙ্কেল?

এবার তাকে জাপটে ধরে রায়হান। বিপুল চুম্বনে ভরিয়ে দেয় ওর চোখ মুখ নাক গাল। নরখাদক মাংসের স্বাদ পেলে যেমন সব গিলে খায়, সেই পাগলপারা বিভোরতা। ইস, ওহ বলে বলে যন্ত্রণায়, ভয়ে কঁকিয়ে ওঠে ডানা ওর পাঁজায়। ‘আব্বু’ বলে চিৎকার করে ওঠে। আঠালো লালায় যখন ওর মুখ মাখামাখি, ঠিক তখনই একটা দুর্দান্ত ঘুষি এসে লাগে রায়হানের নাকে। তৎক্ষণাৎ ছিটকে পড়ে সে। তার মনে হয় সমস্ত শরীরে শয়ে শয়ে পাথর ছুঁড়ে দিচ্ছে কেউ। সোফার হাতলে মাথা লেগে ‘ঠক’ করে শব্দ হয়। আরও কিছু অস্পষ্ট শব্দ আসে কানে। অনেকটা ধমক মেশানো, আজিজের কণ্ঠের মতো : পাগল হোসনে মিন্টু। পাথর ছোঁড়া থেমে যায় হঠাৎ। থ্যাবলানো নাক চুইয়ে পড়া রক্তের ধারা তখনো আড়াল থাকে। প্রচণ্ড চোটলাগা মাথায় ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে গুঞ্জরন। বাকি চরাচর, এই সদ্য বিকেলছোঁয়া সময়টাও নৈঃশব্দ্যের হাতে বন্দি বলে মনে হয়। ঝাপসা চোখে ভারী মাথাটা একটু নাড়ানো যায়। অদ্ভুত থমথমে অভিব্যক্তি নিয়ে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা সব অন্য গ্রহের মানুষ। তিন জোড়া চোখ গত রাতের স্বপ্ন-বিধুর নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বলে। কী আছে ওতে? তুখোড় প্রশ্নবাণ? করুণা, না উত্তপ্ত অঙ্গার? নৈঃশব্দ্য ভাঙে। যে দানব খিস্তি করে চলে সে তো মিন্টুই? কলেজ থেকে ফিরেছে বুঝি? ওই তো মাকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে পুতুল, অর্থাৎ ডানা। আজিজটা ড্যাব ড্যাব তাকিয়ে আছে। কেবল দানবটার চোখেই অঙ্গার ঠাওর করা যায়। এবার অশ্রাব্য শব্দবাণে হৃদয় চিড়ে যায়: ভণ্ডটার শখ দেখে বাঁচি না। বলি এতই যদি রক্তের চিরিক তো এদিকে নজর কেন? আশে পাশে মেয়ের আকাল পড়েছে? ঘরে বসে বসে বয়স পাকাচ্ছে আর বলে কিনা চিরকুমার। বুজরুকি মারার আর জায়গা পাওনা শালা। অসভ্য জানোয়ার কোথাকার!

আরও কিছু বলে মিন্টু। মুষ্ঠিবদ্ধ হাত দুটো তখনও জোরাল বোধহয়। চেদভেদহীন রায়হান ফ্লোরেই বসে থাকে। নিজের নাক থেকে টপটপ রক্ত পড়তে দেখে ফ্লোরে। এবার আস্তে আস্তে পুতুলটা সে হাতে তুলে নেয়। ভাবে, কোথাও কোনো ভুল হয়েছে তার। অথবা সবার। চিৎকার করে কৈফত দিতে মন চায়। কেউ বোঝে না তা। আজিজ টের পায় হঠাৎ। তবে অন্যকিছু। তাই বলে : ছি, রায়হান! ছি! ছি! মিষ্টি আঁচলে চোখ মুছে মেয়েকে নিয়ে ভেতরের ঘরে ফিরছিল বোধহয়। তখন কাবু শরীরে রায়হান সোফার হাতল ধরে উঠে দাঁড়ায়। কাতর দৃষ্টি মেলে বলে : দাঁড়া, পুতুল। ফের তার মনে হয় কোথাও কোনো ভুল হয়েছে তার। অথবা সবার। কিন্তু সে-কথা বলতে পারে নি সে। কেননা মিন্টু দ্বিতীয়বার গেঁজিয়ে উঠবার আগেই পাশের বস্তিতে আগুন ধরে। জনতার প্রচণ্ড হট্টগোল দু’তলার এই ভেতর বাড়িটা পর্যন্ত শঙ্কিত করে তোলে। সবাই তখন ছুটছিল আগুনের দিকে। বস্তির দিকে দৌড়ে গিয়েছিল মিন্টুও। তাই এ ঘটনার পরের দিন ফ্যানে ঝুলে-পড়া রায়হানের লাশের খবর যখন আসে এ বাড়ির সবাই হকচকিয়ে যায়। তারা কেউ মনে করতে পারে না উদগ্রীব বাসনায় ডানাকে সে ‘আব্বু’ বলে জড়িয়ে ধরতে বলেছিল কি না। তাদের শুধু মনে পড়ে ভেতরের ঘরে যাবার সময় তার ডাক শুনে ভয়ে তটস্থ ডানা তার মা’কে জড়িয়ে ধরেছিল। আর তা দেখে বুকফাটা চিৎকারে আচমকা হু হু করে কেঁদে উঠেছিল রায়হান। থকথকে রক্তে তার মুখ ছিল মাখামাখি। বুকে পিষ্ট ছিল পুতুলটা। জানালায় লালাভা ছড়িয়ে বস্তির আগুন তখন লকলকিয়ে ওঠে। আর বাইরের শোরগোল থেকে আতঙ্কিত জনতার একটি কথাই শুধু তাদের কানে আসে : আগুন! আগুন!

Kazi Nasir

কাজী নাসির মামুন

জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩; মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : অধ্যাপনা।

প্রকাশিত বই :
লখিন্দরের গান [কবিতা, লোক প্রকাশন, ২০০৬]
অশ্রুপার্বণ [কবিতা, আবিষ্কার প্রকাশনী, ২০১১]

ই-মেইল : kazinasirmamun@gmail.com
Kazi Nasir