হোম গদ্য গল্প অ্যালকোহলিক

অ্যালকোহলিক

অ্যালকোহলিক
575
0

‘বিশ্বাস কর, এই বোতল ছুঁয়ে বলছি, বোতলটা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে আমি ওকে ভুলে যাব। প্রমিজ।’

জানালাটা খোলা ছিল। শাদার উপর আকাশী রঙের ফুল তোলা পর্দা নাড়িয়ে এক টুকরো বাতাস ঘরে প্রবেশ করে। বাতাসের বিপরীতে বসেছি বলে মেঝের কার্পেটে বোতল নিয়ে বসা ওর মুখ-নিঃসৃত একটা ঢেকুর থেকে মদের তীব্র ঘ্রাণটা এসে নাকে লাগে। ওকে বুঝতে না দিয়ে দুআঙুলে নিজের নাকের ছিদ্রগুলো একটু ঘষে দিই। বলি, ‘এত বড় বোতল নিয়ে বসেছিস, মারা যাবি তো!’


‘অনেক চিন্তা করে দেখলাম, ওর সাথে আমার আসলেই হবে না। হওয়ারও নয়। ফর্সা ছেলের সাথে ফর্সা মেয়ের কখনো কিছু হয় না।’


বোতলে একটা চুমুক দিয়ে নিঃশব্দে বোতলটা কার্পেটে রেখে ও একটা সিগারেট ধরায়, ‘বড় বোতল কেন নিয়েছি? কয়েক ফোঁটা জল তো শেষমেষ থাকা লাগবে, নাকি? আর মৃত্যুর কথা বলছিস, সেই ভদ্রলোকের ব্যাপারে গতকালই আমি ভেবে নিয়েছি। এটা ব্যাপার না। ওর ব্যাপারটা যদি আমি মেনে নিই তাহলে পৃথিবীর কোনো ব্যাপারই তো কিছু না, মৃত্যুও না।’

ও তখন সিগারেটে লম্বা করে একটা টান দিয়ে যথাসম্ভব দূরে ফু শব্দে ধোঁয়া ছেড়ে দেয়। হাতের সিগারেট আমাকে দেখিয়ে বলে, ‘খাবি?’

বললাম, ‘দে।’

ও হাতের সিগারেট আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়েও তার ঠোঁটে ফিরিয়ে নেয়, ‘প্যাকেট থেকে ধরা।’

প্যাকেট থেকে আমি সিগারেট নিই। ওকে কথায় পায়, ‘অনেক চিন্তা করে দেখলাম, ওর সাথে আমার আসলেই হবে না। হওয়ারও নয়। ফর্সা ছেলের সাথে ফর্সা মেয়ের কখনো কিছু হয় না।’

কথা শুনে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলি। ওর চোখ কিঞ্চিত লাল হয়ে আসছে। আমি বলি, ‘তুই ভুল লজিক দিচ্ছিস।’

ও আমলে নেয় না, ‘তার উপরে দেখ, কিভাবে আমি শুকিয়ে যাচ্ছি! শুকনা মেয়ের সাথে শুকনা ছেলেরও তো হয় না।’

আমি আবারও মনে করিয়ে দিই, ‘তোর লজিক ঠিক না।’

আমার জবাব উপেক্ষা করে ও বরং আরো ডিটেইলে যায়, ‘দেখ, আমার বাবা একজন কালো মানুষ, রাইট? কালো মানে কালো আর মোটা। আর মাকে দেখ, কী ফর্সা আর মোটেই মোটা না। শেষ পর্যন্ত বিয়ে কিন্তু হয় কিছু অমিলকে সমর্থন দিয়ে। ওর সাথে আমার মিলে না এমন কিছুই নেই। সবই মিলে যায়। আমার বাবা-মায়ের যেসব অমিল ছিল, তুই লক্ষ করলে দেখবি, ওর বাবা-মায়েরও ওইসব অমিল রয়েছে। মানে কী, আমাদের বাবা-মায়েদেরও কত মিল! তাহলে ওর সাথে আমার মিলবে কী করে বল?’

ওর হাতের সিগারেট শেষ হলে মুখ কুঁচকে অ্যাস্ট্রেতে গুঁজে বোতলে হাত দেয়। আমি ওকে বোঝাবার চেষ্টা করি, ‘এমন অর্থহীন কথা বলিস না। বিয়ের ক্ষেত্রে তোর এই যুক্তিগুলো হাস্যকর। এই অর্থহীন কথাগুলো আমি ইগনোর করলাম।’

ও তখন বোতলের মুখে ধরে বোতলটা মেঝের লাল কার্পেটে ঘোরাতে থাকে, ‘ইগনোর করবি বলেছিস কিন্তু করিস নি। তোর হাসি বলে দিচ্ছে, তুই কথাগুলো সিরিয়াসলি নিয়েছিস। এতটা সিরিয়াসলি নিয়েছিস যে, সিগারেটটা জ্বালাতে পর্যন্ত ভুলে গেছিস!’

একটু লজ্জা পাই। তবু, ‘মোটেই ঠিক বলিস নি’, বলে লাইটার দিয়ে দ্রুত সিগারেটটা জ্বালালাম। ও আঙুল দিয়ে বোতলের গলাটা একটু বাজাবার চেষ্টা করে, ‘শোন, যেহেতু আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি সেহেতু ওকে নিয়ে আমার আর কষ্ট পাওয়া উচিত নয়, কী বলিস?’

আমি সায় দিই, ‘সিওর।’

‘ওর সামনে যাওয়াও আমার উচিত নয়, রাইট?’

‘না না, তা কেন হবে?’

‘না না, সেটাই হতে হবে। এও ঠিক করেছি, যে লোকটার সাথে ওর বিয়ে হবে, আমি তার সামনেও যাব না। প্রয়োজনে দেশ ছেড়ে দেবো।’

আমি আগ্রহ প্রকাশ করি, ‘বিয়ে হচ্ছে না কি ওর?’

‘এখন হচ্ছে না। তবে হবে তো। হবে না?’

‘তা তো হবেই।’

ও একটু মাথা নাড়ায় আর খোলা জানালার দিকে তাকায়, ‘সেটাই। কিন্তু বেলা তিনটায় বা এর কয়েক মিনিট পর ও যে বারান্দায় চুল শুকাতে আসে, ধর, বিয়ের পরও এমন করে এল আর আমার জানালাটাও খোলা। আমি বারান্দায় বসে আছি।’

বললাম, ‘তা তো আসতেই পারে। তুইও বসে থাকতেই পারিস।’

ও বলল, ‘সমস্যা ওখানে না। সমস্যা তৈরি হবে তখন যখন ওর স্বামী এসে ওর পাশে দাঁড়াবে আর আমার জানালাটা খোলাই থাকবে।’

আমি বলি, ‘তুই যদি ওকে ভুলে যাস তাহলে বারান্দায় ওর চুল শুকাতে আসা তো সমস্যা না!’

ও শূন্যে মাথাটা একটু টানে, ‘এই জন্যই তো ওকে ভুলে যাওয়া উচিত, রাইট? বন্ধু, এই বোতল ছুঁয়ে বলছি, বোতলটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওকে আমি ভুলে যাব।’

ওকে সান্ত্বনা দিতে যাই, ‘হ্যাঁ, যত তাড়াতাড়ি ভুলতে পারিস ততই মঙ্গল। এভাবে নিজেকে শেষ করার কোনো মানে হয় না। নিজেকে ভালোবাসতে শিখ। নিজেকে ভালোবাসার কত ইলিমেন্টস ছড়িয়ে আছে চারপাশে।’

ও তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে, ‘যে মানুষ ইলিমেন্টস পেয়ে গেছে তার জন্য ব্যাপার না। কিন্তু যে মানুষ বাল্যকাল থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছে তার জন্য ইলিমেন্টস তৈরি না হওয়াটা একটা বড় ব্যাপার কি না বল? তবে বন্ধু, তোকে কথা দিচ্ছি, ওকে যে আমি ভুলছি সেটা কিন্তু রাইট। বিলিভ মি।’

কথা শুনে আমি নিঃশব্দে হাসার চেষ্টা করি।


‘ডোন্ট ওরি, বন্ধু। আমি হচ্ছি ঠান্ডা মাথার অ্যালকোহলিক। কখনোই মাতাল হই না। কখনো হয়েছি বল?’


কপাল কুচকে ও জেদ দেখায়, ‘বিশ্বাস হলো না, না?’ বলে মুখের উপর বোতল উপুড় করে কয়েক ঢোক গিলে কাহিল হয়ে পড়ে আর হাতড়াতে হাতড়াতে সিগারেটের প্যাকেট হাতে নেয়। কী মনে করে কয়েক পলক প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে থেকে কোঁচকানো কপাল সোজা করে লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরায়।

আমি বলি, ‘বোতলটা শেষ করতে হবে না। এবার তুই থাম।’

কথাটা ওর ব্যক্তিত্বে লাগে, ‘ডোন্ট ওরি, বন্ধু। আমি হচ্ছি ঠান্ডা মাথার অ্যালকোহলিক। কখনোই মাতাল হই না। কখনো হয়েছি বল?’

এরপর আর কথা খুঁজে না পেয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে আমি ওকে সমর্থন করি। ও তখন বলে, ‘চিন্তা করে দেখলাম কি জানিস? ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসা দিয়ে মানে এইসব মামুলি আয়োজন দিয়ে ভুলে থাকার চেষ্টায় কোনো ক্রেডিট নেই। ঠিক মতো ভুলে যেতে কিছু কঠিন ঘৃণা দরকার। ওকে ঘৃণা করার দুয়েকটা বিষয় আমাকে বলতে পারিস?’

কিছু না ভেবেই তখন উত্তর দেই, ‘ঘৃণা করতে হবে না। তুই তোর এই জানালাটা কখনো খুলিস না। তাহলেই তো হয়ে গেল।’

এ কথায় ও একটু অবাক হয়, ‘ও রোজ তিনটায় বা তিনটার কয়েকমিনিট পরে চুল শুকাতে বারান্দায় এসে দাঁড়াবে আর আমি জানালা বন্ধ করে রাখব! এটা ভাবলি কী করে’, বলেই বোতলে মুখ দেয়। সিগারেটেও পড়ে লম্বা টান।

আমি এবার সোফা ছেড়ে ওর পাশে এসে বসি। বোতলটা ওর হাত থেকে নিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে ও তর্জনী উঁচিয়ে তর্জনী ও মাথা এক সাথে ডানে বাঁয়ে নাড়ে, ‘উহু। এখনই না। আগে শেষ হোক।’

আমি কেবল ওকে দেখেই যাচ্ছি। ও বলে, ‘তুই কি সিগারেটও ছেড়ে দিয়েছিস?’

আমি নড়ে উঠি, ‘কই না তো!’

সে মুহূর্তে ও আমাকে যে লজ্জাটা দেয় এর জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না, ‘তবে যে হাতে রেখেই সিগারেটটা পুড়িয়ে ফেললি? এক শলার দাম তো এগার টাকার নিচে নামে নাই। নাকি নেমেছে?’

আমি আমার কণ্ঠ নামিয়ে এনে একটু সিরিয়াস হওয়ার চেষ্টা করি, ‘আমি তোর কথা শুনছিলাম। আমার খুবই খারাপ লাগছে। আমি কি তোর বিষয়টা নিয়ে খালাম্মা-খালুর সাথে কথা বলতে পারি?’

‘নো, মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড। সমস্যাটা তোর খালাম্মা-খালুর না। সমস্যাটা আমার। ধর, একটু পরেই সমস্যাটা আমাকে ছেড়ে যাবে। যেহেতু এই বোতল ছুঁয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তোকে প্রমিজ করেছি। বোতল শেষে তো সবই শেষ। আমাকে নিয়ে তোর ভাবনাও শেষ হচ্ছে। ডিসমিস।’

আমি মানি না, ‘তোর ব্যাপারটা নিয়ে আমি ওর সাথে কথা বলি। একটু বুঝিয়ে দেখি?’

ও তখন আমার হাত ধরে ফেলে, ‘না বন্ধু, এই কাজটা তুই কখনো করিস না, প্লিজ।’

‘তাহলে তুই বলতে চাচ্ছিস, আজকের পর থেকে সত্যিই তোর এইসবের ইতি?’

‘না, সব শেষ না। শুধু ওর ভাবনাটা আমার মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলব। অবশ্য তখন সব শেষ বলা যাবেই। ও নেই মানে তো কিছুই নেই, না?’

আমি ভাবনায় পড়ি। ও থামে না, ‘আচ্ছা, তোকে না বললাম, একটু ঘৃণা করার উপায় বলতে? পারবি নাকি? পারলে বল। বোতল শেষ হতে হতে বল। এইটা কাজে দেবে। ভাবনার জন্য কি তুই আরেকটা সিগারেট ধরাবি?’

আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। ও বলে, ‘নে নে ধরা, প্লিজ। না টানলেও চলবে।’

আমি সিগারেট ধরাই। ওর বোতল শেষ হয় না। ছোট ছোট চুমুকে একবার ও পান করে আরেকবার সিগারেট টানে। আমি লক্ষ করি, এ পর্যায়ে সে একটু শান্ত হয়ে আসে। এমনটা হয় না। ওর মদ খাওয়া মানে যতই সময় যাবে ততই উত্তেজিত হয়ে উঠবে। দুই হাত উপরে তুলে লম্বা করে শরীর টানা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করবে কিন্তু আজ ওর সে রকম কোনো লক্ষণ চোখে পড়ছে না। মদ্যপানের একমাত্র সাক্ষী লেগে আছে কেবল দুটি চোখে। দ্রুত শাদা অংশ ঢেকে যাচ্ছে চোখের। ও মাথা নিচু করে প্রসঙ্গ পাল্টায়, ‘আমি আস্তিক হওয়া শুরু করেছি, জানিস?’

আমি দ্রুত ওর কথা ধরি, ‘তাই নাকি? কী বলছিস তুই?’

‘হু।  চিন্তা করে দেখলাম, অনেক কিছুই আগে থেকে ঠিকঠাক করা থাকে। নিশ্চয় কেউ একজন করে রাখে। যেমন ধর, ও একটা মেয়ে। মেয়ে মানে সুন্দরী মেয়ে আর স্লিম। আমিও ফর্সা শুকনা একটা ছেলে। সবই আগে ঠিক করা ছিল। তুই একটা শ্যামলা ছেলে। নাদুসনুদুস। এটাও কিন্তু ঠিক করাই ছিল!’

‘পৃথিবী একটা সিস্টেমের ভেতর দিয়ে যায়। আমরা সেই সিস্টেমেরই একটা অংশ মাত্র। আমাদের তো এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই!’

ওর মুখে তখন দীর্ঘশ্বাস, ‘হাহ্ সিস্টেম, আসলেই সিস্টেম। কী হতো ধর, যদি আমিও তোর মতো কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়তাম, বল? বিবিএ পড়ে আমার কোন ঘোড়ার ডিমটা হয়েছে?’

‘কেন? তোকে কেমিস্ট্রিই পড়তে হবে কেন? বিবিএতে তুই ভালো করেছিস। একটা ব্রাইট ফিউচার তোর সামনে। সবাই কি সব কিছু পড়বে নাকি? এটা হয়? সবাই সব কিছু পড়বে না। এটাই সিস্টেম।’

ও আঙুল উঁচিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে স্বীকার করে, ‘রাইট, ইউ আর রাইট।’

একটু থেমে আবার সেই কথাটা মনে করিয়ে দেয়, ‘কই বললি না তো, ঘৃণা করার ব্যাপারটা তো বললি না। তোর কেমিস্ট্রি কী বলে?’

আমি ঘোষণা দিই, ‘আমার কেমিস্ট্রিতে ঘৃণা করার কোনো মন্ত্র নেই। আর আমার মনে হয়, এ ব্যাপারটার এখানেই ইতি টানা হোক। তুই যখন ভুলেই যেতে চাইছিস তবে ভুলে যা। প্রয়োজনে ওর সাথে কথা বল। একটা কাউন্সিলিং তো হতে পারে!’

‘না। ওর সাথে কথা বলে কী হবে? ওতো কোনোদিনই আমাকে ভালোবাসে নি। কোনাদিন একটা কথাও দেয় নি! সমস্যাটা ওর না। সমস্যাটা আমার। মাই ডেয়ার ফ্রেন্ড, তোকে কতবার বলব, সমস্যাটা শুধুই আমার। আর এ কারণেই ওকে আমি ভুলে যাব। আমি জাস্ট তোর কাছে ওকে ঘৃণা করার একটু ওষুধ চাচ্ছি। এই মদে ঘৃণা নেই। যত খাই তত ওর কথা মনে পড়ে। খামাখাই মনে পড়ে। এটাই সমস্যা। এই জানালাটার যদি সমব্যথী হওয়ার সুযোগ থাকত, যদি সে কাঁদতে পারত তবে বিলিভ মি মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড, আমার চোখের বিরহে সে এতদিনে গলেগলে পড়ত। বুঝিস কিছু?’

আমি কথা খুঁজে পাই না। এত কথা সে কোথা থেকে পাচ্ছে? ও বলতেই থাকে, ‘আচ্ছা, ওকে মনে রাখতে রাখতে ভুলে যাই, কী বল? এটা কি সম্ভব?’

‘কি জানি, এটা তো ভেবে দেখি নি।’

‘আচ্ছা যা, আর তোকে ভাবতে হবে না। তুই যা। আমি এবার ঘুমিয়ে পড়ব। ঘুমে চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছি না।’


‘পরকালে একটা অনন্ত জীবন পাব, আস্তিক হলে এটা ঠিক থাকবে তো?’


‘তাই ভালো। শুয়ে পড়। একটা লম্বা ঘুম দে’, বলে ওকে বাহু ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করি। ও আমাকে আরেকটু বসতে ইশারা দেয়, ‘আমি যে আস্তিক হয়েছি, এটা বিশ্বাস করেছিস? শুধু এইটুকু বল।’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, করেছি। এবার উঠ।’

ও হাত দিয়ে সিঙ্গেল সোফাটা দেখায়, ‘তবে আরেকটু বোস। একটা জরুরি কথা বলে নিই’, বলে ও আরেকটা সিগারেট ধরায়। আরেকটা সিগারেট প্যাকেট থেকে বের করে আবার ভেতরে ঢুকিয়ে বলে, ‘না থাক।’

আমি হাত বাড়াই, ‘দে খাই।’

সিগারেট ধরাতে ধরাতে ওকে জাগিয়ে তুলি, ‘জরুরি কথাটা শেষ কর।’

ওকে কিছুটা গাম্ভীর্যে পায়, ‘পরকালে একটা অনন্ত জীবন পাব, আস্তিক হলে এটা ঠিক থাকবে তো?’

আমি বললাম, ‘হু।’

ও তখন সরাসরি আমার চোখে চোখ রাখে, ‘যদি পাই তবে সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি তোর সিস্টেমটা ধার চাইব।’

এবার আমার শরীর কেঁপে ওঠে, ‘বলিস কি তুই!’

ও তার কথার রেশ ধরে রাখে, ‘তখন যেন আমি কেমিস্ট্রিটা ভালো বুঝতে পারি। মানে আমি পরকালে কেমিস্ট্রির ভালো একজন স্টুডেন্ট হব। আর রোজ সন্ধ্যায় ওকে কেমিস্ট্রি পড়াতে ওদের বাসায় যাব। তোর মতো শুক্রবারটাও বাদ দেবো না।’

আমি যেন কিছু বুঝি না, ‘তুই কি আমাকে কিছু মিন করছিস!’

ও হাসে, না, ‘একদম না। একটা সিস্টেম তা তোর বা যারই হোক, আমি চাইতে পারি না?’

‘নিশ্চয় পারিস।’

লক্ষ করি, অনেকক্ষণ পর সে আবার বোতলে হাত দেয়। শাদা বোতলে হাঁটু পরিমাণ খয়েরি মদ নড়ে ওঠে। ও বোতল উপুড় করে মুখে নিয়ে দুতিনবার ঢোক গেলে। আর এবার ওর ঠোঁট বেয়ে কয়েক ফোঁটা খয়ের গড়িয়ে পড়ে। এবং ও জোরে একটা নিঃশ্বাস নেয়, ‘কই বললি না, ঘৃণা করার একটা উপায়ও তো বললি না?’

বলি, ‘বাদ দে না। তুই তো বলেছিস ভুলেই যাবি। তবে আর ভাবনা কী?’

‘ভাবনা নেই তবে ঘৃণা করতে পারলে একটু সেটিসফাইড হতে পারতাম আর কি!’

ও তখন আমার হাত ধরে কাঁদোকাঁদো স্বরে বলে, ‘দে না ভাই, প্লিজ, বলে দে না। আমি ওকে ঘৃণা করতে চাই।’

এবার আমাকে বিরক্তিতে পায়, ‘ঘৃণা করতে হবে কেন? যাকে সত্যিকারের ভালোবাসা যায় তাকে কেবল ভালোই বাসা যায়। সে আমাকে বিনিময়ে কী দিল, ভালো বাসল কি বাসল না, সে চিন্তা করলে তো চলবে না।’

ও উৎসাহী হয়ে ওঠে, ‘হ্যাঁ বল বল। আরো বল।’

‘আর ঘৃণার প্রসঙ্গ তখনই আসতে পারে যখন সে তোকে ভালোবাসল আর যে কোনো কারণে তোর সাথে প্রতারণা করে চলে গেল!’

‘সত্যিকারের ভালোবাসলে তখন কি ঘৃণাটা করা যাবে বল, তখন কি সত্যি ঘৃণা করা যাবে?’

‘কি জানি, হয়তো করা যায়।’

ও ঠোঁট উল্টায়, ‘একটা কিছু তো আমাকে করতে হবে। নইলে আমি ওকে ভুলি কী করে? বোতলও শেষ হয়ে আসছে।’

আমি এবার সোজা হয়ে দাঁড়াই, ‘তুই সত্যি ওকে ঘৃণা করতে চাস?’

ওর চোখে তখন অপ্রস্তুত অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। বুঝতে পারি, আমার দাঁড়ানোর ভাষা ও পড়তে পারে না, ‘বল ভুলতে চাস?’

ওর মুখে তখন রাশিরাশি ক্লান্তি। ত্বরিত জবাব দেয়, হুহু।

‘তবে এক কাজ করবি। একটু পরেই তোর যে বমিটা আসবে, সেটা ওর বারান্দার দিকে তাকিয়ে ছেড়ে দিবি, পারবি?’

কথা শুনে ও টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়। হাতে বোতল কাঁপতে থাকে। বোতলের ভেতর অবশিষ্ট খয়েরি মদ কাঁপতে থাকে। দেখি, ওর চোখের শাদা অংশে আর কোনো শাদা চোখে পড়ে না। রক্তাক্ত চোখে সে আমায় জানিয়ে দেয়, ‘তুই একটা বুশ। জর্জ ডব্লিউ বুশ। আই হেইট ইউ। আই হেইট ইউ’, বলে বমি করতে উদ্যত হয়।

আমি ওর কাছে আসার চেষ্টা করি। ও জানালার দিকে কাঁপা কাঁপা আঙুল উঁচিয়ে চীৎকার করে ওঠে, ‘গেট লস্ট। ক্লিয়ারলি লস্ট।’

শাহ ইয়াছিন

শাহ ইয়াছিন বাহাদুর

জন্ম ০৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২; বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক। উপ-সহকারী প্রকৌশলী, বাংলাদেশ টেলিভিশন, নোয়াখালী উপকেন্দ্র, নোয়াখালী।

প্রকাশিত বই :
অন্ধকারের কাছাকাছি [গল্প, মুক্তদেশ, ২০১১]
জলপট্টি [গল্প, পুথিনিলয়, ২০১৬]

সম্মাননা : কেমুসাস (কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট) তরুণ সাহিত্য পুরস্কার, ২০০৪।

ই-মেইল : yeasinbahadur@gmail.com
শাহ ইয়াছিন

Latest posts by শাহ ইয়াছিন বাহাদুর (see all)