হোম গদ্য গল্প অন্ধ পাঠক

অন্ধ পাঠক

অন্ধ পাঠক
393
0

লোকটার নাম ছিল পাঠক। সে বই পড়তে খুব ভালোবাসত। একদিন সে অন্ধ হয়ে গেল। এখন সে বই পড়তে পারে না। তার অন্ধ চোখ দিয়ে পানি পড়ে। লোকটা একা একা গোপনে কাঁদে।

একদিন সে বিজ্ঞাপন দিল। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার টাকা তার নেই। এক পুরনো বন্ধু তার জন্য বিজ্ঞাপন বানিয়ে দিল। সুন্দর বিজ্ঞাপন। কথাগুলো তার নিজের : একজন চলমান জীবন্ত লাঠি দরকার। লাঠিটিকে সুন্দরী ও শিক্ষিত হতে হবে। অন্ধের সহায় হতে চাইলে যোগাযোগ করুন… ইত্যাদি ইত্যাদি। বিজ্ঞাপনটিতে অন্ধকারে একটি সাদা উজ্জ্বল লাঠির ছবি। মনে হচ্ছে লাঠিটির থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। বিজ্ঞাপনটি বিনা পয়সায় ফেসবুকের নানা গ্রুপে আর পেইজে দেয়া হলো। প্রথমে মনে হলো এ বিজ্ঞাপনটি একটি ফালতু ধারণা। কিন্তু ক্রমশ ফোন আসতে লাগল। বিচিত্র সেই সব ফোন।

পাঠকের যেহেতু আপাতত কোনো কাজ নাই সে সবগুলো ফোন ধরল। সে যেহেতু কানে শোনে এবং গুছিয়েও কথা বলে সেহেতু সবগুলো ফোনের উত্তর মনোযোগ দিয়ে দিতে লাগল। লেখার সুযোগ নাই বলে সে ফোনকলগুলো রেকর্ড করে রাখল। দুয়েকটা কথোপকথন শোনা যেতে পারে।

: আপনি কে বলছেন?

: আমি পাঠক।

: আপনিই বিজ্ঞাপনটি দিয়েছেন?

: জি, আমিই বিজ্ঞাপনটি দিয়েছি?

: আপনার কি মনে হয় না ব্যাপারটি হাস্যকর হয়েছে।

: না মনে হয় না।

: আপনি আমাকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলুন।


সে যখন পড়বে তখন বইয়ের গন্ধের সঙ্গে তার ব্যবহৃত সুগন্ধি, কাজল, টিপ, চুলের হাওয়া—সব কিছু আমাকে ঘিরে থাকবে।


: বুঝিয়ে বলার তেমন কিছু নেই, তবু বলছি, শুনুন। আমি পাঠক। পড়তে ভালোবাসি। সম্প্রতি আমি অন্ধ হয়ে গেছি। আকস্মিক নয়। বহুদিন ধরেই গ্লুকোমাতে ভুগছিলাম। ধীরে ধীরে অন্ধ হলাম। কিন্তু বই পড়া ছাড়া আমার বেঁচে থাকা কঠিন। এমন একজন সঙ্গী আমার দরকার যে আমাকে বই পড়ে শোনাবে।

: বুঝলাম। কিন্তু চলমান জীবন্ত লাঠি বলতে কী বোঝাচ্ছেন?

: দুঃখিত, একটু কাব্য করে বলে ফেলেছি। আসলে শুধু বই পড়া নয়, আমাকে টুকটাক সাহায্যও করবে এমন লোকই খুঁজছিলাম।

: আর সৌন্দর্যের প্রয়োজনটা কী?

: আমি চোখে দেখি না। তাই বলে কি সুন্দরকে অনুভব করতে পারি না? আমি চাই আমাকে যে বই পড়ে শোনাবে সে হবে সুন্দর। আপনি কি আগ্রহী?

: জি না। আমি সুন্দরী নই।

বলে মেয়েটি ফোন কেটে দিল। পাঠকের ইচ্ছে হলো, মেয়েটিকে ফোন করে বলে, আসলে সবাই সুন্দর, কোনো না কোনো দিক থেকে। সেই অচেনা দিকটা খুঁজে পেলে আর সমস্যা নেই। কিন্তু মেয়েটিকে এসব বলা হলো না। কারণ সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটা ফোন চলে এল।

: স্লামালেকুম স্যার। আপনি একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, মানে ফেসবুকে দেখলাম আর কি!

: জি।

: স্যার আমি আগ্রহী। সিভি পাঠানোর কোনো ঠিকানা আমার চোখে পড়ল না।

: আমি কোনো ঠিকানা দেই নি। আপনি আগ্রহী হলে আমার ঠিকানা দিতে পারি।

: জি স্যার। আমি অবশ্যই আগ্রহী। স্যার দয়া করে প্যাকেজ সম্পর্কে একটু বলবেন?

: কিসের প্যাকেজ?

: না মানে, বেতন, সুযোগ সুবিধা।

: বেতন তো নেই। মানে বেতন দেয়ার সামর্থ্য আমার নেই। তবে আমার এখানে থাকার সুবিধা আছে। একেবারে থাকতে পারেন অথবা যতক্ষণ খুশি থাকতে পারেন। রান্নাবান্না বা অন্যান্য ঘরোয়া কাজ নিজেই তদারকি করবেন। আমরা যা খাব একসাথেই খাব। যা মনে চায় দুজনে মিলে খাব।

: ফাজলামির জায়গা পান না! আপনে তো বিরাট বদ। অন্ধের লাঠি খোঁজেন! লাঠি দিয়া বাইড়ায়া আপনার ঘিলু বাইর কইরা দেয়া উচিত। মিয়া, বউ খুঁজতাছেন, হ্যাঁ! আন্ধার আবার শখ, যত্তসব।

পাঠক বেশ আহত হলো। যা বলার তা তো সুন্দর করে বলা যায়। মেয়েটি তো তাকে বুঝিয়ে বলতে পারত। সে কোনো অন্যায় করলে থাকলে অবশ্যই নিজেকে সংশোধন করে নিতে পারত। পাঠকের অন্ধ চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।

এবার একটি পুরুষের ফোন এল।

: ভাই চাকরিটা আমার খুব দরকার।

: দেখুন, আমি বোঝাতে পারি নি হয়তো, এটা কোন চাকরি নয়। এটা এক ধরনের সেবামূলক কাজ।

: ও, মাগনা?

: ঠিক তাও না। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

: ও, ফুড ফর ওয়ার্ক। আচ্ছা, আমার তো থাকার জায়গা দরকার। আপনার জায়গাটা দেখা যাবে? আর কয় ঘণ্টা কাজ করতে হবে? কী কী কাজ?

: কিছু মনে করবেন না, আমি তো কোনো পুরুষকে চাচ্ছি না।

: কেল্লাইগ্যা, পুরুষ মানুষ কাম পারে না?

: না তা নয়, আমি চাই খুব সুন্দর, মিষ্টি কেউ আমাকে বই পড়ে শোনাবে। জানেন তো, সবাই পড়তে জানে না। সবার পড়া শুনতেও ভালো লাগে না।

: আরে, আমি তো নিউজ রিডিংয়ের কোর্স করছি।

: আপনি হয়তো যোগ্য, কিন্তু আমি একজন নারীকে চাইছি, তরুণী, সুন্দরী কেউ। সে যখন পড়বে তখন বইয়ের গন্ধের সঙ্গে তার ব্যবহৃত সুগন্ধি, কাজল, টিপ, চুলের হাওয়া—সব কিছু আমাকে ঘিরে থাকবে। পাঠ হয়ে উঠবে সুন্দরতর এক উপাসনা।

: আন্ধায় কয় কী!

সত্যি কথা বলতে কি, কেউই শেষ পর্যন্ত রাজি হলো না। আবার দুয়েকজন যারা আগ্রহী হলো তাদের কাউকেই পাঠকের পছন্দ হলো না। পাঠক শেষ পর্যন্ত আশাই ছেড়ে দিল। সে একা একা ঘরের মধ্যে কাঠের লাঠি ঠুকে হাঁটে। হাঁটে আর হাঁটে। মাঝেমাঝে তার বিশাল লাইব্রেরিতে যায়। বইয়ের তাকগুলো হাতায়। হাতড়ে হাতড়ে বইগুলো বের করে। অনুমান করার চেষ্টা করে কোনটা কী বই। বইয়ের ঘ্রাণ শোঁকে। মাঝে মাঝে বইগুলোকে চুমু খায়।

দিন যায়। পাঠক ভাত খায়, ঘুমায়, জাগে, ঘুমায়, বেঁচে থাকে। কিন্তু বেঁচে থাকা তার ভালো লাগে না। অন্ধ হয়ে যাওয়ার বিয়াল্লিশ দিন পার হয়ে যায়। বিয়াল্লিশ দিন সে কিছু পড়ছে না। নিজের উপরই তার রাগ হয়। সে জানত একদিন সে অন্ধ হয়ে যাবে। কেন আগেভাগেই ব্যবস্থা করে নি! বই না-পড়ে তার বেঁচে থাকাটা অন্ধত্বের চেয়ে বেশি বেদনাদায়ক।


একদিন পাঠক বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। অন্যকোনো দেশে, অন্যকোনো স্টেশনে সে যাবে।


রাতে তার ভালো ঘুম হয় না। ভোর তার দেখা হয় না। শেষরাতে চোখ লেগে আসে। একটু ঘুমায়। কখন দুপুর গড়িয়ে যায়। কোনোরকম একটা কিছু খায়। কখন সন্ধ্যা নামে। পাঠক কিছুই টের পায় না। তার শরীরে ব্যথা হয়। মগজে ব্যথা হয়। বুকে ব্যথা হয়। কোনো ওষুধে কাজ করে না। ডাক্তার কত কী ভাবে, কিছুতেই যেন কিছু হবার নয়।

পাঠক জানে, বই পড়তে না পারলে সে সুস্থ হবে না। পাঠক মনে মনে চোখের মণি খোঁজে। ধূসর, কালো, নীল, সবুজ যেকোনো রকম এক জোড়া চোখ হলেই সে আবার পড়তে পারত। কিন্তু চোখ তো চাইলেই মেলে না। নেশাখোরের মতো পাঠকের খিঁচুনি ওঠে। দাঁতে দাঁত লেগে জিভ কেটে যায়। মুখ দিয়ে ফেনা বের হয়। পাঠক কিছুতেই আরাম পায় না। স্বস্তি পায় না।

দুএকজন শুভাকাঙ্ক্ষী তখনও তার চারপাশে আছে। কেউ কেউ এসে এক পাতা দু’পাতা পড়ে দিয়ে যায়। ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে সব সময় তারা আসতে পারে না। ব্যস্ততার কারণে এলেও বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। ওরা যেটুকু পড়ে তাতে পাঠকের তৃষ্ণা বাড়ে, মন ভরে না।

তারপর একদিন পাঠক বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। অন্য কোনো দেশে, অন্য কোনো স্টেশনে সে যাবে। যেখানে এখনও মানুষ একজন পাঠককে ভালোবাসবে সেখানে সে যাবে। ঝোলার ভেতরে গোটা বিশেক বই নিয়ে সে বের হয়। ট্রেনে চড়ে চলে যায় অচেনা স্টেশনে। এখানে কেউ তাকে চেনে না। স্টেশনের নিরিবিলি এক কোনায় চাদর বিছিয়ে সে বসে থাকে। কারো পায়ের শব্দ শুনলেই সুর করে বলে, ‘বাবাগো মাগো, আমি অন্ধ পাঠক, আমারে দুয়েকটা পাতা পইড়া শুনায়া যান। আমি না-পড়লে মরে যাই।’

দুয়েকজন তাচ্ছিল্য করে, তামাসা করে। অধিকাংশই এড়িয়ে যায়। একজন হয়তো হঠাৎ কাছে আসে। সে হয়তো সুন্দরী নয়, সে হয়তো মমতাময়ী নয়। তবু সে আগন্তুক মায়া দিয়ে পাঠকের জন্যে দু’পাতা-চারপাতা পড়ে দেয়। পাঠক কৃতজ্ঞচিত্তে নুয়ে তাকে কুর্নিশ করে। এইভাবে একদিন বিশটা বই শেষ হয়ে যায়। পাঠক আবার ঘরে ফেরে। তালা খোলে। আবার নতুন বিশটা বই ঝোলাতে নিয়ে চলে যায় আরেক অচেনা স্টেশনের খোঁজে।

মুম রহমান

জন্ম ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহ। এমফিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা লেখালেখি।

প্রকাশিত বই :

উপন্যাস—
মায়াবি মুখোশ
কমৎকার

ছোটগল্প—
অন্ধকারের গল্পগুচ্ছ
ছোট ছোট ছোটগল্প
শতগল্প
হয়তো প্রেমের গল্প

কবিতা—
চার লাইন

চলচ্চিত্র বিষয়ক—
বিশ্বসেরা ৫০ চলচ্চিত্র
বিশ্বসেরা আরো ৫০ চলচ্চিত্র
১০ রকম ১০০ চলচ্চিত্র
বিচিত্র চলচ্চিত্র
বিশ্বসেরা চলচ্চিত্র সমগ্র
বিশ্বসেরা শত সিনেমা
অস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র

নাটক—
দুইটি ব্রিটিশ নাটক
তিনটি মঞ্চ নাটক

অনুবাদ—
সাদাকো ও সহস্র সারস
বব ডিলান গীতিকা
কাফকা : অণুগল্প
সাফোর কবিতা

শিশুতোষ—
মজার প্রাণীকূল

চিত্রকলা বিষয়ক—
বেদনার রং তুলিতে একটি জীবন

প্রবন্ধ—
বই কেনা, বই পড়া
বই বিশ্ব
কিতাবি কথা

অন্যান্য—
তিতা কথা

সম্পাদনা—
অনির্ণীত হুমায়ূন

ই-মেইল : moomrahaman@gmail.com