হোম গদ্য গল্প অন্ধকূপ

অন্ধকূপ

অন্ধকূপ
584
0

প্রথম দিকে কেউ কেউ বদর মুন্সি, কেউবা আবার বদর কবিরাজ ডাকলেও বর্তমানে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার বদৌলতে এইসব ঠুনকো উপাধিতে সম্বোধন করাটা বেয়াদবির শামিল। নিরন্তর এমনটাই মনে করে চলেছে নিমগাছি গ্রামের সর্বসাধারণ। আধ্যাত্মিক সাধনা ও রূহানী ক্ষমতার দৌরাত্ম শুধু যে এ-গাঁয়ের আলোবাতাসে সীমাবদ্ধ তা নয়—সারা তল্লাট জুড়েই তার সর্বনাম। দু’চোখে দুর্মর হতাশা নিয়ে উপায়হীন পা রেখেছিল এ-গাঁয়ে। ভেতরে সঞ্চিত ছিল অবিচল আস্থা। সে-আস্থা শুধুই নিজের প্রতি, চতুর বুদ্ধিমত্তার প্রতি। অচেনা জায়গায় সহসা ঠাঁই হবে না জেনে দিনমান মসজিদের বারান্দাকেই আবাসন জেনেছিল। ক্ষুধা নিবারণে শুকনো চিঁড়া আর চাপকলের পানি। এইতো, হপ্তা দেড় আগের ঘটনা। জুম্মাবারের মিলাদ শেষে তবারকের জিলাপি নিতে নামাজি-বেনামাজি অনেকেই হাত বাড়িয়েছিল। তবারক নিয়ে যুবকবয়সী একজন ভিড় সামলে এগিয়ে যেতে যেতে নিজ কানে গুঁজে রাখা আতরভেজা তুলা জাতকুলহীন নরেনের নাকের ছেঁদায় ঠেলে দিয়ে বলেছিল—

—জীবনভর খালি চামারগিরি করলি, এইবার কুদ্দুর হালাল জিনিসের ঘ্রাণ লইয়া দ্যাখ।


জলের তলদেশে অন্তরিত এক বিশেষ যৌনঝলক! পুলকে প্রলুব্ধ হতে হতে বদর শীতল জলেও উষ্ণতা অনুভব করে।


পেশাগত কারণে মরা, পচা গরু-ছাগলের বিকট বিকট দুর্গন্ধজনিত চামড়া সংগ্রহের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা নরেন সুঘ্রাণের তীব্র বিক্রিয়ায় অবিশ্বাস্যভাবে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে! নরেনের অজ্ঞানতা ঘিরে ব্যস্ততার অন্ত ছিল না। পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন তৎপরতার অংশ হিশেবে চাপকলের নিচে মাথা রেখে অনর্গল পানি ঢাললেও কোনো গতি হয় না। ইমাম সাহেবের সূরা-কালাম পড়ে ফুঁ-ফজিলত বিফলে গেছে। অবস্থার বিপাকে চটজলদি গ্রামের একমাত্র পল্লী চিকিৎসককে জরুরি তলব করা হয়েছে। ডাক্তার হাতের পাল্‌স গণনা করে, বন্ধ চোখের পাপড়ি উঁচিয়ে পর্যবেক্ষণ করেও মর্মোদ্ধারে ব্যর্থ হয়। আশাহত ডাক্তার বিদ্যা গুটিয়ে রুগীকে দ্রুত গঞ্জের হাসপাতালে নেবার পরামর্শ দিয়ে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। যেহেতু সব ধরনের প্রচেষ্টাই বিকল, সেহেতু প্রাণবায়ু যে কোনো মুহূর্তে দেহ ত্যাগ করতে পারে—এমন আশংকা সমবেতদের ভীষণ ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ, গঞ্জে নিয়ে যাবার কাজটা মোটেও সহজ নয়। পানির মৌসুমে একমাত্র নির্ভরতা নৌকা। পৌঁছাতে পৌঁছাতে পাক্কা ২ ঘণ্টার বিরামহীন অভিযান। তার আগেই যে পটল তুলবে না, সে নিশ্চয়তাই বা কোথায়?

এমতাবস্থায় মেম্বার-মাতব্বর সবাই উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত। ঘটনাটা সুচারু প্রত্যক্ষ করছিল বদর। সুযোগ কখনো বলে-কয়ে আসে না, তাই কার্যকারণ বিবেচনা করেই ঝোপ বুঝে কোপ বসায়। লোকচক্ষুর অন্তরালে, তড়িঘড়ি উপায়ে বেড়াবেষ্টিত টাট্টির ভেতরে ঢুকে ক্ষয়ে যাওয়া ডান পাতের জুতোয় টাটকা মল মাখিয়ে ফিরে আসে। মুখাবয়বে কৃত্রিম গাম্ভীর্য ধারণ করে, দু’হাতে ভিড় সরিয়ে, নিথর-শায়িত নরেনের নাকের ডগায় জুতো ঠেকিয়ে দেয়। কি আশ্চর্য! মুহূর্তেই নরেন জ্ঞান ফিরে সোজা হয়ে ওঠে বসে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়! সফল হবার কৃতিত্বে নিজের কার্যসিদ্ধিকে প্রাকৃতিক করে তোলার জন্য ইল খাজা ধ্বনিতে চিৎকার দিয়ে নরেনের সর্বাঙ্গে ফুঁ দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় উপস্থিত সকলের চোখ তখন কপালে। এমন কেরামতি কেবল পীর-আউলিয়ার পক্ষেই সম্ভব! যার সাক্ষাৎ নজির সবাই স্বচক্ষে দেখেছে। অতএব এই সিদ্ধান্তে উপমিত হওয়াই স্বাভাবিক—আগন্তুক কখনোই কোনো সাধারণ মানুষ হতে পারে না! প্রতিটি স্বতন্ত্র প্রাণে তখন ভয়মিশ্রিত বিস্ময়, জিজ্ঞাসা! বৃদ্ধগোছের দু’তিনজন সাহস করে খাতির জমাতে তৎপর। অতীব সম্মানের সাথে এই অপরিচিত-বিশেষ আচানকজন সম্পর্কে জানতে উদ্‌গ্রীব। কিন্তু বদর কোনো প্রকার তোয়াক্কা করে না, পুনরায় ইল খাজা ধ্বনি বিলিয়ে মসজিদের বারান্দার কোনায় দেহ বিছিয়ে, চোখ নিভিয়ে ধ্যানের ভান করে।

এতে সরল সমবেতদের বিশ্বাস ঘন থেকে ক্রমেই ঘনীভূত হতে থাকে। তার ঠিক তিন দিন পর, ভাদ্র মাসের নরকতুল্য গরমের জ্বালা প্রশমনে মসজিদের পেছনের আরাক্ষেত পেরিয়ে পুকুরে নেমেছিল। অর্ধেক পুকুর জুড়েই ঘের দেওয়া কচুরিপানার সবুজ ভিড়। গরমে যেখানে শরীরে শরম রাখা দায়, সেখানে কচুরিপানার নিচে ছায়াসর্বস্ব শীতল পানি অনেকটা বরফজলের সুবিধা-সুখ। নিজেকে শান্তি দানের জন্য কচুরিপানার ঘন অরণ্যের নিচে শরীর ডুবিয়ে, মুখ ভাসিয়ে আরাম নিচ্ছিল। এমন সময় দুপুরের নির্জনতা ভেদ করে মেম্বারের তৃতীয় বউ জলে নামে। সাঁতারের শব্দ কানে আসতেই সচকিত বদর মাথাটা জাগিয়ে, কচুরিপানা আলতো সরিয়ে শকুন-চোখ স্থাপন করে। খোলাচুলে ষোড়শী দেহের ভাঁজে-ভাঁজে, অঙ্গে-অঙ্গে সাবান লাগায়। যত্নের হাত বুকের ভিটায় ছন্দময় খেলা করে। যে খেলা জলের তলদেশে অন্তরিত এক বিশেষ যৌনঝলক! পুলকে প্রলুব্ধ হতে হতে বদর শীতল জলেও উষ্ণতা অনুভব করে। উষ্ণতার তরঙ্গগতি লোমকূপে পৌঁছে গেছে ঝনঝন। বড় খায়েশ জাগে দিলে, আফসোস ধরে সাবান হবার। আহা, যদি হওয়া যেত—তাহলে বাধামুক্ত স্বাচ্ছন্দ্যে নেমে যাওয়া যেত দৃশ্যমাদক যুবতী শরীরের প্রত্যন্ত বন্দরে!

ফন্দিটা হঠাৎ করেই করোটির ভেতর হাজিরা দিয়েছে। বাস্তবায়ন করতে পারলেই নিশ্চিত নিজেকে বহুধাপে এগিয়ে নিতে পারবে। সেজন্যে যতটা বুদ্ধিদীপ্ত সাহসের দরকার, তা অন্তত বদরের আছে। প্রথমে রাজহাঁসের মতো গ্রীবা তুলে পুকুরের চারপাশ গোয়েন্দার মতো পরখ করে নেয়। নির্জনতা আশান্বিত করে, প্ররোচনা দেয়। তারপর ষোড়শীর অবস্থান দূরত্বকে আন্দাজ করতে থাকে। ফিতায় মাপলে বড়জোর ২০গজ হবে। ষোড়শী গলা পানিতে নেমে এলেই সুযোগটা কাজে লাগাতে আর বিলম্ব করে না। ডুবুরি কায়দায় পানির তলদেশ সাঁতরে ঠিকই ষোড়শীর সন্ধান করে নেয়। কোমর চেপে পানির আরেকটু গভীরে টেনে আনে। ধস্তাধস্তির শক্তিক্ষয়ে দম ফুরিয়ে যাবার আগেই, পিঠের নরম নিচে সজোরে ধারাল নখ বসিয়ে ফিরতি সাঁতারে পুনরায় কচুরিপানার নিরাপদে জায়গা নেয়। নিঃশ্বাসের আনন্দ নিয়ে অবলোকন করতে থাকে। ষোড়শী প্রায় নগ্ন প্রায়, কোনোমতে জান নিয়ে পাড়ে ওঠে। কয়েককদম দৌড় ফেলতেই আতঙ্কের একটা চিৎকার রেখে মূর্ছা যায়। তারপর থেকেই ষোড়শীর ঘন-ঘন জ্বর আসে। পানি দেখলে ভয়ে আঁৎকে ওঠে। ঘটনা জিজ্ঞাসিতে বোবা মেরে বসে থাকে। সামান্য জেরাতেই কেঁদে-কেটে অবিরাম বুক ভাষায়। আদরের ছোট বউয়ের বেহাল পরিণতিতে বড়ই অসুখে আছে মেম্বার। কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে নরেনের ঘটনা সাক্ষী করে বদরের শরণাপন্ন হয়।

মাথার নিচে পরিধানবস্ত্রের পুঁটলিটাকে বালিশ বিবেচনা করে পূর্ব-পশ্চিম সোজাসুজি চিতশোয়ায় বদর। মেম্বারের উপস্থিতি টের পেতেই চোখ বন্ধ, ঘাপটি মেরে অনড় পড়ে থাকে। অস্থিরতাকে সামলে, খুব আদবের সাথে মেম্বার বদরের পায়ের কাছে বসে অপেক্ষা করে। কামেল মানুষের ঘুম ভাঙানো অপরাধের শামিল কি-না—মনোদ্বন্দ্বটা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বেশকিছুক্ষণ বিড়ি টানতে না পারায় কেমন যেন গলার ভেতরটা চুলবুল করছিল। তাই নিজের অজান্তেই ঝেড়ে কাশে। শব্দ শুনে বদর একরাশ বিরক্তি নিয়ে শক্ত শিরদাঁড়ায় বসে, ক্ষীণ স্বরে জিকির শুরু করে। তাতে মেম্বার বেশ ইতস্তত, ভেতরে অপ্রস্তুত।

—গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। বড় নিরুপায় হইয়া আপনের কাছে আইছি।

—উপায় থাকতে আমার কাছে কেউ আসে না, এইডাই হক কতা।

—আমার বউ…

মেম্বারকে হস্ত উঁচিয়ে কঠিনভাবে থামিয়ে দিয়ে বদর নিজেকে নিজেরই চিন্তার ঊর্ধ্বকুঠুরিতে নিয়ে যায়। প্রত্যাশা বাস্তবের রূপ নিতে চলেছে—এ আনন্দউল্কা অসম্ভব সুন্দর! সংযত নজরে অর্জনের উপত্যকাগুলো দখলের আগে যাচাই করে নিচ্ছে। বদর স্পষ্ট দেখছে, অনুগত চেলা হতে মেম্বারের আর বাকি নাই। তাই নির্ভাবনায় তুই সম্বোধনে নামাই উত্তম। সহজাত ভঙ্গিতে ইল খাজা ধ্বনিতে মুখ খোলে।

—তর বউ পুকুইরে নাইতে নামছিল। হেরে কালা দেও মারতে আইছিল মানুষের আকার লইয়া। অল্পের লাইগা রক্ষা পাইছে। আমার কতা বিশ্বাস না অইলে দ্যাখ গিয়া, তর বউয়ের পিডের নিচে বিষনখের লাল দাগ কেমুন লাঙ্গল টানা মাডির লাহান চির ধরছে।

কালক্ষয় না করে মেম্বার সত্যতা যাচায়ের জন্য দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ফেরে। ঘরের খিল আটকে জিজ্ঞাসাবাদ চালায়, বন্ধ ঘরের আবছা অন্ধকারে তিন ব্যাটারির টর্চের আলোয় উদলা করে দাগ দেখে তো তাজ্জব! বউয়ের বর্ণনা আর পিঠের দাগ দেখে হুজুরের প্রতি অন্ধবিশ্বাসে দিলের ভেতরটা ফুলে-ফেঁপে ওঠে। পর্বতপ্রতিম বিশ্বাস আর আস্থায় হুজুরের কাছে ফেরে। অতি আদব ও বিনয়ের সহযোগে সর্বোচ্চ আস্থায় হুজুরের মুখোমুখি হয়। মনেপ্রাণে অযাচিত, বিশেষ ধরনের ভয়! তার সাথে যুক্ত হয়, সাক্ষাৎ পীর-দরবেশের নৈকট্য পাবার স্বচ্ছ অভিলাষ।

—অহন উপায় কী হুজুর?

—ভয়-ডর বাদ দে, তর কামেল চিনতে ভুল অয় নাই।

কথাটা বলেই বদর পুটলির তলা থেকে তিন-তিনবার ফুঁ দেওয়া একখানা তাবিজ মেম্বারের হাতে ধরিয়ে দেয়।

—হাদিয়ার বিষয়ডা যদি কইতেন হুজুর?

—তুই আমার ভালোবাসা অর্জন করছত, এইডাই বড় হাদিয়া।

আহ্লাদে গদগদ মেম্বার ভেতর-গহিনে গোপন অছিয়ত পোষণ করতে থাকে। এমন পীরে-কামেল মানুষের মুরিদ হওয়ার সোনালি সুযোগ হাতছাড়া করে ইহলোকে পাপ বাড়াতে মোটেও রাজি নয় আর। যে কোনো মূল্যে সাহচার্য চাই-ই চাই। তাই অনুগ্রহ লাভের আশায়, পরম ভক্তি ও আবেগে উড্ডীন হয়ে প্রস্তাব রাখে বদরের দরবারে।

—অহন থাইকা এইহানে আপনের থাকনের দরকার নাই। আপনে আমার বাইত চলেন। খাতির-যত্নের একরত্তিও কমতি অইব না।

—তর বাইত মাইয়া মানুষ বেশি, পর্দা-পুসিদা নাই। মাইয়া লোক ইবাদত পয়মাল কইরা দেয়। পারলে নিরালা কোনোহানে ব্যবস্থা কর।


ও মিয়ারা মনে রাইখ, অধমেও থাহে উত্তমের বাস।


হুকুম-প্রস্তাবটা নির্ভাবনায় লুফে নেয় মেম্বার। সর্বাঙ্গ প্রবলানন্দে খলবল করে। নিজের নির্জন পরিপাটি আলগা বাড়িটা হুজুরের জিম্মায় বন্দোবস্ত করে ধন্য হয়। শুধু তাই নয়, দৈনিক তিনবেলা ভোজনবিলাসের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করে। হুজুরের পায়ে কদমবুসি রেখে ধনী-বর্ণাঢ্য হৃদয় নিয়ে বিদায় নেয়। ওখানেই ক্ষান্ত থাকে নি মেম্বার। দরবার-শালিসে কিংবা কোথাও লোকজনের সমাগম দেখলেই, হুজুরের কেরামতির সম্প্রচার করে গর্বিত বোধ করে। যে কোনো ঘটনা প্রচারের সাথে সাথে, নিজের বানানো কল্প-গল্পের মেদ সংযোগ করতেও বিন্দুমাত্র পিছপা হয় না। হুজুর গোপন চোখ কবরের আজাব দেখতে পায়—এ রটনা সর্বস্তরে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। ইদানীংকার কর্মকাণ্ড দেখলেই মনে হয়, মেম্বারগিরি সিকেয় তুলে অব্যর্থ মুরিদানে মশগুল। ফলে বেশ দ্রুততালে বদর হুজুর থেকে বড়হুজুরে পরিণত হয়। মেম্বার তার মজমাবাড়িটা বড়হুজুরের কল্যাণে উপযুক্ত করে তোলে। গাছ-গাছালিবেষ্টিত, সম্পূর্ণ কোলাহলমুক্ত বৃহদাকারের চারচালা ঘর, সামনে প্রশস্ত খোলা আবাসন পেয়ে বদর তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের দিশা পায়। মোমবাতি, গোলাপজল, আতর ও লাল গিলাফে আখড়া সাজায়। বাতাসেও ঘ্রাণের মৌতাত। সময় সর্বদা তেজি ঘোড়া—অগ্রগামী গতির সাথে পালা করে বাড়তে থাকে ভক্ত-অনুসারীদের আনাগোনাক্রমবৃদ্ধি।

বদরের অলৌকিক ক্ষমতা যে কতটা ফলপ্রসূ, তার নজির পাওয়া যায় দূর-দূরান্তের আগত উপস্থিতি দেখে। কোনো অভাব-অনটনের বালাই নেই। বরং নিদারুণ দীনতা ভোগ-বিলাসের অনাবিল স্বাচ্ছন্দ্য দেখে চিরতরে বিতাড়িত হয়েছে। সপ্তায়-সপ্তায় ওমরা হজ পালনের গায়েবি কথা প্রচারের আড়ালে, দূরের কোনো জেলা শহরের বেশ্যাপল্লীতে একাধিক নারীতে উপগত হয়ে রাত্রিযাপনের ক্ষেত্রে আর কোনো বাধা রইল না। চারদিকে যখন প্রশান্তির ঝাণ্ডা সদর্পে সটান, ঠিক তখনই মারাত্মক বিপত্তির করাল আগ্রাসন ধেয়ে আসে। পূর্বাভাসটা অবশ্য যথাসময়েই টের পেয়েছিল বদর—আজ মধ্যাহ্নভোজের পর গ্রামের বাজারে ফাও পান খাওয়ার পার্বণমুহূর্তে। মুদির দোকানে খরিদরত একটা মুখ দেখে হঠাৎ বুকের ভেতর ধড়ফড় করছিল। দুরবস্থাটা হজম হচ্ছিল না। কেমন যেন পূর্বপরিচিত ঠেকছিল লোকটাকে। নিশ্চিত হবার মানসে স্মৃতির সাহায্য নিতে থাকে। দুশ্চিন্তাজনিত উত্তেজনায় ছাগলা দাড়িতে ঘনঘন হাত বুলায়। মুঠোপরিমাণ ছাগদাড়ির বেশ কয়েকটাতে পাকন ধরেছে, যেখানে রোদের আলো নিপতিত হলে গুনার তারের মতো রূপালি ঝিলিক দেয়। হ্যাঁ, মনে পড়েছে! এ গাঁয়ে আসার আগে, উজানগাঁয়ের এক বনেদি বাড়িতে জায়গীর থাকত বদর। বিনিময়ে ছেলে-মেয়েদের আমপারা পড়াত। একদিন ভরদুপুরে সে বাড়ির কর্ম-কিশোরী বদরের ঘর ঝাড়ু দিতে অন্দরে প্রবেশ করে। ফাঁকা বাড়ির সুযোগটা লুফে নিতে অতর্কিত হামলে পড়েছিল। কিশোরীর নারাজ চিৎকারে পাড়ার লোক জড়ো হয়ে নিম্নাঙ্গ-নগ্ন অবস্থায় আটক করেছিল বদরকে।

পঞ্চায়েত রায়ে জুতার মালা গলায় ঝুলিয়ে সারা গ্রাম ঘুরানো হয়। উপরন্তু ১০০ দোররা তো ছিল অবধারিত। পরিষ্কার মনে পড়েছে বদরের। সড়ক নির্মাণে মাটি কাটতে যাওয়া এ-লোকটিই ঝাঁঝাল গলায় বলেছিল—বান্দির পুতের দাড়ি আগুন দিয়া জ্বালাইয়া দেওন দরকার। বদরের বর্তমান অবস্থাও তদ্রূপ। ভেতর-বাইরে সীমাহীন আতঙ্কের বিস্তার। তাহলে কি আশায় গুড়েবালি? না, পরিত্রাণের উপায় বরাদ্দ করতেই হবে। নিজেই নিজেকে প্রবোধ দেয়। লোকটা দৃষ্টির বাইরে চলে যেতেই কিঞ্চিৎ হালকা অনুভব করে। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাঁশের বেঞ্চে বসে। বড়হুজুরকে পেয়ে দোকানদারদের মধ্যে খেদমতের ধুম লেগে যায়। পারে তো কেউ কেউ আস্ত দোকানটা দিয়ে দিতে পারলে তৃপ্ত হয়। মুখের গুদামে পরপর কয়েক খিলি পান চালান করে ব্যস্ত চাবাতে থাকে। কপালে, গলার নিচে বিন্দু বিন্দু শঙ্কাগ্রস্ত ঘাম। অত্যন্ত আগ্রহবশে দোকানদারদের কাছ থেকে লোকটার আদ্যপ্রান্ত খোঁজখবর সংগ্রহ করে। বিদায় নেবার প্রাক্কালে হুঁশিয়ারি প্রদানে ভুল করে না।

—ও মিয়ারা মনে রাইখ, অধমেও থাহে উত্তমের বাস। আমি যে হের এত খবরাদি করছি, হেইডা গুনাক্ষরেও তারে কইবা না। জীবন বরবাদ কইরো না কেও। জিব্বা পাত্থর হইয়া যাইব।

বদরের কড়া নিষেধাজ্ঞায় গজবের আলামত পেয়ে সবাই বাকরুদ্ধ, ভয়ার্ত। দু’একজন প্রতিনিধি হয়ে নিশ্চয়তা দিতে থাকে।

—তওবা, তওবা। তার আগে যেন মরণ অয় হুজুর।

বজ্রপাতে মেজাজ ভস্ম-ভাব নিয়ে বদর তার দরবারশরীফে ফেরে। দর্শনার্থীদের সমাগম উপেক্ষা করে ঘরের দরজা বন্ধ করার আগে সবাইকে উদ্দেশ্য করে জানিয়ে দেয়—আজ সকল প্রকার পানি-তাবিজপড়া, ঝাড়-ফুঁক এমনকি সাক্ষাৎও বন্ধ। দিনমান চিন্তা-ভাবনার অশেষ পেরেশানির পর একটা পথ ঠিকই আবিষ্কার করে রাখে। গন্ধবিতারক আগরবাতি জ্বালিয়ে কলকিতে কষে টান লাগায়। সিদ্ধির ধোঁয়া ইটের ভাটার মতো ব্যাপক নির্গত হয়। ঘরের মৃদু অন্ধকারে সেই ধোঁয়া মেঘের আচরণে বিচরণ করে।

এশার আজানের রেশ বিলুপ্ত হওয়া মাত্রই গ্রামের অধিকাংশ ঘর গভীর ঘুমে ডুবে যায়। আপাতত একমাত্র উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের বেপরোয়া তাগিদে বদর নিস্তব্ধ অন্ধকারের বহুস্তর ভাঙতে-ভাঙতে উত্তরপাড়ার ঈদগাঁ’র সন্নিকটে কুঁড়েঘরটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ক্ষুদ্র উঠোনলাগোয়া মাটির চুলোয় ভাতের হাঁড়ি চড়িয়ে নিবিষ্ট রান্নারত লোকটার পেছনে অব্যর্থ অবস্থান নেয়।

—কদম…। স্বনামের ডাক শুনে কুপি হাতে উঠে এসে আলোর উদ্‌ঘাটনে অবাক হয়ে পরখ করে বদরের বদ চোখের বিষ।

—আফনে ঐ লুচ্চা মুন্সি না?

প্রচণ্ড রাগের উদ্রেগ হলেও কণ্ঠে শীতল ধারা অব্যাহত রাখতে সচেষ্ট বদর।

—কেমুন আছো তুমি?

—বালাই তো আছিলাম, অহন মনে অইতাছে আর বালা থাকন যাইব না।

—তোমারে দেখলে বড় মায়া অয় কদম। লঞ্চ ডুইবা মা-বাপ একলগে মরল। ছোড বইনডা সোয়ামীর হাতে গলা টিপায় অকালে গেল। মোকদ্দমা লড়তে গিয়া শেষ সম্বল জমি-জিরাত বেইচা নিঃস্ব হইছ।

কথাগুলো কদমের কোমল মনে আছড়ে পড়ে আর বেদনায় বিদীর্ণ হয়।

—আফনে জানলেন ক্যামনে?

—তিন তিনডা বিয়া করলা, কেউ ঘর করল না। রাইতের আন্ধারে পলাইছে।

গ্রামে যে পীর-দরবেশের আগমনবার্তা শুনেছে—উনিই সেই সুমহান ব্যক্তি। জাদুমন্ত্রের মতো তার চেতনাজুড়ে বদরের কুকর্মের যে নমুনা ছিল, মুহূর্তেই তা দূরীভূত হয়ে বিশ্বাসে পরিণত হলো।

—কইতে পারেন আমার লগে ঘর করত চায় না কেরে?

—করব ক্যামনে? তর জিনিসে মর্দামি নাই। গর্তে ঢুকলেই বমি কইরা দেয়!

অন্তর্যামী, দৈব ক্ষমতার অধিকারী না হলে এমন গোপন শরমের কথা জানা অসম্ভব! তার মানে বড় হুজুর অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পায়! ভাবতেই কদম বিশ্বাসের আসমানি উচ্চতায় দোল খেতে খেতে খেই হারিয়ে ফেলে।

—তাইলে কী উপায় অইব হুজুর?

—এমুন জান্নাতি পানিপড়া আর তাবিজ দিমু, যার তেলেছমাতিতে—হয় মাইয়া মাইনসের কোমর ভাঙব, নাইলে চকি!


বাৎসরিক উরস-মোবারকের নামে সমৃদ্ধ হচ্ছে চিরস্থায়ী অর্থভাণ্ডার।


—অভাগারে বাঁচান হুজুর। আচমকা বদরের পা জোড়া সাপটে ধরে মিনতি করে কদম। সফল হবার আয়েশে বদর আন্দোলিত! খায়েশ পূরণে কোনো কিন্তুর অবকাশ নেই আর!

—তয় একটা শর্ত আছে।

—একটা ক্যান, হাজারটা মানতে রাজি।

—উপর থাইকা হুকুম হইছে, তরে আমার খাস মুরিদ অইতে অইব।

—আইজকা, অহন থাইকাই আফনের নামে জান কুরবান।

কদমকে পুরোপুরি ফাঁদে ফেলে আসল পরীক্ষার প্রশ্ন ছুঁড়ে বদর।

—উজানগাঁয়ে যেইডা ঘটছে, হেইডা কি তর একিন অইছে?

—নাউজুবিল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ! আফনে এমুন কাম জিন্দেগিতেও করতে পারেন না। হগলতানই ষড়যন্ত্র হুজুর।

উনুনে চড়ানো ভাত ততক্ষণে সিদ্ধ, গলতে-গলতে জাউ হয়ে আবার তা শুকিয়ে যাচ্ছে। খড়ের দাউ দাউ আগুন নেভানোর খেয়ালও ছিল না কদমের। খালি হাত-পা নিয়ে বড়হুজুরের একান্ত অনুগত হয়ে নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়। বদর যখন-তখন তৃপ্তির ঢেঁকুর ছাড়ে। যে দিকে তাকায়, সে দিকেই বাসনার বিমান উড়ে উড়ে যায়! এদিকে আখড়ায় বেড়েই চলছে মানুষের পদচারণা, আশাতীত বাড়ছে মুরিদের সংখ্যা। কদম ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রমাণ দিতে দিতে আখড়ার প্রধান খাদেম। সাধারণ ভক্তদের মানতের হাঁস-মুরগি, ছাগলসহ বিভিন্ন উপহার গঞ্জের দালাল মারফত বিক্রি হয় রাতের তৃতীয় প্রহরে। লোকচক্ষুর অন্তরালে। বাৎসরিক উরস-মোবারকের নামে সমৃদ্ধ হচ্ছে চিরস্থায়ী অর্থভাণ্ডার। উরসের দিন-ক্ষণটা আসন্ন কুরবানি ঈদের ঠিক পরেরদিন। উরস উপলক্ষে দান-খয়রাতের গরু-মহিষ প্রাপ্তির বিষয়টিকে খুব শীতল মাথায় প্রাধান্য দিচ্ছে। নয়-ছয় তো বুদ্ধিবলেই সাবাড় করা মঙ্গলজনক। প্রতিটি দিন-রাত সুষম অতিক্রান্ত—নির্ভাবনার বেগবান স্রোতে। বর্তমানে বদরের যে আউলিয়াতুল্য কদর তা শুধু লাখে একটা নয়, কম করে হলেও কয়েকলাখে এক! চিন্তার অধিক শাহী পদনাম! দাওয়াত রক্ষার সিরিয়াল সামাল দিতে কদমকে খুব বেগ পেতে হচ্ছে! কাকে রেখে কার মন রক্ষা করবে—নিত্য এমনই দুর্বিপাক। দাওয়াত খাওয়ার ছহি আয়োজনে তরকারির ক্ষেত্রে নিদেনপক্ষে সপ্তব্যঞ্জন থাকা চাই। শুধু কি তাই, ভক্ষণপরবর্তী দোয়া কারবারে উপযুক্ত হাদিয়া প্রদানে বড়হুজুরের মন জোগাতে সবাই সচেতন, সমান তৎপর।

স্বর্গীয়সুখে বিভোর, অতিবাহিত কোনো এক দিনে, কঠিন জটিলতা নিয়ে গেদু বেপারি সহসা উপস্থিত পীরসাবহুজুরের দরবারে। বংশ পরম্পরায় এ-গাঁয়ের সবচে বড় জোতদার। ইউনিয়ন নির্বাচনে মেম্বারের প্রতিপক্ষ হয়ে পরপর দু’বার ফেল মেরেছে। তবুও মনের জোর সামান্য টলে নি। যতদিন নিজে মেম্বার না হতে পারবে, ততদিন আমৃত্যু লড়ে যাবার সংকল্পে অটল। সমস্যাটা নিজের নয়, একমাত্র কলিজাকন্যা ময়মনার। উচ্চ বংশের সুপাত্রের সাথে বিবাহ ঠিক হয়েছিল। পাকা কথা হবার পর থেকেই মাথায় ছিট উঠেছে। একা একা বিড়বিড় করে, নিজের দীঘল কালো কেশ নিজেই ছিঁড়ে। রাত-বিরাতে এদিক-সেদিক দৌড় দেয়। কখনো কখনো অকারণে দা, বটি হাতে তেড়ে আসে। কেউ বলে জিনপরীতে আছড় করেছে, কেউবা বলে কু-বাতাস। মেয়ের করুণ দশায় গেদু বেপারি দিশেহারা। গেলো ৫ মাসে অঞ্চলের নামকরা সব কবিরাজ, ডাক্তার বৃথা গেছে। তবুও কোনো উন্নতির লক্ষণ নেই। বরং পাগলামি বেড়েই চলেছে। মান-ইজ্জত ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে। শেষতক প্রবল হতাশায় গেদু বেপারি বড়হুজুরকেই একমাত্র রক্ষাকর্তা বিবেচনা করে শরণাপন্ন হয়। বিস্তারিত পেশ করে অনুকম্পা ভিক্ষা চায়।

—তর মাইয়ার হেফাজত বিরাট মুস্কিলের কাম। বড়হুজুরের সংশয়গ্রস্ত দীর্ঘশ্বাসে গেদু বেপারির চোখ জলে ছলছল করছে।

—হুজুর, আমার একটাই কইন্না, বাপ হইয়া ক্যামনে সহ্য করি। একজল্লা দয়া করেন। মস্কিলডারে আছান কইরা দেন। আমি আফনের পাওয়ের নিচে দুনিয়া ডাইল্লা দিমু। ঈমানে কইলাম হুজুর।

অন্ধিসন্ধির অনুপুঙ্খ যাচাই করে বদর অন্তর্গূঢ় লালিত বাঞ্ছার কথা সুনিপুণ উপস্থাপন করে।

—নিয়ত করছি এতিম পোলাপাইন এহাত্তর কইরা হেফজখানা খুলমু। রোজ হাশরে একজন হাফেজ ৭০ জনরে বেহেশতে ঠাই দেওনের হিম্মত রাহে।

—আফনে খালি আমার ময়মনারে বালা করণের ইদ্দত লন, জমিন যত লাগে আমি ব্যবস্থা করতাছি।

আসছে মঙ্গলবার গেদু বেপারির বাড়িতে তসরিফ রাখার দৃঢ় নিশ্চয়তা দিয়ে, অদ্যকার সান্ধ্যজিকির ও বয়ানের আসর বাতিল ঘোষণা করে। বদর আশ্চর্যরকম অভিভূত! পরিতৃপ্ত! সকল দুরভিসন্ধি বাস্তবে রূপান্তরিত হতে চলেছে। হেফজ ও এতিমখানা চালু হলেই নিজেকে সার্বিক নিরাপত্তার বলয়ে সমাসীন করতে পারবে নিশ্চিন্তে। তখন সুন্নতি তরিকায় চার-চারটা বিবি ভোগ করা সামান্য ইচ্ছে পূরণের নামান্তর মাত্র! এখন মনে হচ্ছে, এই অন্তিম বাসনা চরিতার্থের জন্যই বেঁচে আছে। নিজেকে সম্ভোগ-সর্দার কল্পনা করার পুলকিত মধুক্ষণে, সহসা দুঃস্বপ্নের মতো পতিত স্ত্রী আম্বিয়ার বিষণ্ন মুখ ভেসে উঠতেই ভীষণ হোঁচট খায় বদর। যেন হাড়কামড়ানো শীতে কম্বলের মনোময় উষ্ণতার উপর কেউ ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়েছে। সেহেতু বদর বেদম ত্যক্ত-বিরক্ত। একঘেয়ে যে কোনো স্মৃতি বহন করা মানেই আয়ুক্ষয়। খিস্তি ভিড় করে জিবের ডগায়। আম্বিয়া নামের কালো মাগীটা ৬বছরেও পোয়াতি হতে পারে নি। অথচ বুনিদ্বয় লাউয়ের মতো ঝুলে পড়েছে রসকষহীন। টানশক্তি না থাকলে তারে কি আর চুম্বক বলা যায়? নিজের গোপন বহুগামীতার বিপরীতে আম্বিয়া এক কদাকার-পরিত্যক্ত অধ্যায়। কাজেই যে কোনো পন্থায় ভুলে থেকে বদর শুধু নিজেকেই চাঙ্গা রাখতে চায়।

নির্দিষ্ট দিনের সেই মঙ্গল শোভাযাত্রায় বদর তার অনুগত খাদেম কদমকে নিয়ে গেদু বেপারির উঠোনে পা রাখে। বড়হুজুরের আবির্ভাবে আত্মহারা গেদু বেপারি খেদমতের কোনো কমতি রাখে নি। বাড়ির মহিলারাও আড়াল থেকে এক নজর দেখার জন্য ব্যাকুলপ্রাণ। বলতে গেলে, সের-পরিমাণ  চিকন চাউলের ভাতের সাথে কত পদের তরকারি গোগ্রাসে গিলেছে ইয়ত্তা নেই। ভাতঘুমের তন্দ্রা নিয়েই আসল কাজের তদারকি করে!

—কদম।

—আফনের হুকুম ছাড়া লইনা দম।

—জানায়া দে, যেই ঘরে ময়মনা আছে, হেই ঘরের আশেপাশে মানুষ ত দূরের কতা, কাকপক্ষীও যেন না থাহে।

আজ্ঞা বাস্তবায়নে কদম ততদিনে পুরোদস্তুর ফুলে পরিণত। গেদু বেপারি রাজসিক খেদমত দিতে জানে, অখুশি হওয়ার কোনো ছিদ্রই রাখে নি। পায়ুপথ অসাধু বায়ু ত্যাগের মাধ্যমে সেটারই জানান দিয়েছে বেশ ক’বার। চাইলে অর্ধেক শুয়ে পড়া যায়, এ-জাতীয় কাঠ-কেদারার আরাম বদরকে আবেশে চেপেছিল। কিন্তু বৃহৎ স্বার্থ হাসিলের নিয়তে ক্ষুদ্র বিসর্জনে উঠে গিয়ে জলচৌকিতে বসে পাঞ্জাবির হাত গুটায়। কদম পিতলের চকচকা বদনায় পরমাদবে পানি ঢালে। ধীরলয়ে অযু করতে থাকে বদর। যে লয়টা অন্যের মনোযোগ আকর্ষণে কাজ দেয় খুব। সুগন্ধযুক্ত তোয়ালা হাতে গেদু বেপারি বড়হুজুরের সন্নিকটে উদ্‌গ্রীব দাঁড়িয়ে, তাসের গোলামের মতো। অযু শেষ হতেই সেবাদাস হয়ে তোয়ালা এগিয়ে দেয়। কিন্তু বদর তোয়াক্কা করে না। মাথায় টুপি বসিয়ে, চোখবন্ধ-স্বভাবগম্ভীর ভাব ধারণ করে মুহূর্তের ভেতর থমথমে পরিবেশ তৈরি করে ফেলে। গেদু বেপারি বড়হুজুরের তোয়ালা পরিহার নিয়ে আতঙ্কচাপে ঘামছে। পদ্ধতি মোতাবেক উঠোনের ঠিক মধ্যমায় রাখা পানিভর্তি গামলার ভার দুহাতে উঠিয়ে লম্বা পায়ে ঘরে ঢুকেই ছিটকিনি আটকে দেয়।


দৃষ্টিতে শুধুই মোহাবিষ্টটা, রিরংসার প্লাবন। নাভির সামান্য নিচে তাই জেগেছে সন্ত্রাস।


তরপর দুদিকের খোলা জানালা দুটো। বয়ে আনা মোমবাতির সলতে-সুতায় আগুন ধরায়। আলোয় সপ্রভিত চারপাশ। দালানঘরের কোণে, মেঝেতে অঙ্গ ছড়িয়ে এলোচুলে ময়মনা বসে আছে উদাস। বদ্ধঘরে বড়হুজুরের উপস্থিতিও কোনো আমল পায় নি। গামলাটা টেনে নিয়ে বদর মুখোমুখি বসে। শাড়ির আঁচল বক্ষচ্যুত হয়ে কোলের উপর জমে আছে। ময়মনার অনাঘ্রাত স্তনের গৌরব ও বিভা বড়হুজুরের নজরে পলক ফেলবার সুযোগও দিচ্ছে না। দৃষ্টিতে শুধুই মোহাবিষ্টটা, রিরংসার প্লাবন। নাভির সামান্য নিচে তাই জেগেছে সন্ত্রাস। তারই প্রতীকী-প্রয়োগ হিশেবে অশ্লীল ইঙ্গিত ছুঁড়ে দেয়। তৎক্ষণাৎ ময়মনা শাড়ির আঁচল পুনঃস্থাপন করে বুক বিভাগের লজ্জা ঢাকে। সূক্ষ্ম মনোবিশ্লেষণ আর বুদ্ধির বদৌলতে যা দরকার, তার সবটাই বোঝে যায় বদর। বৃথা সময় অপচয় না করে আচমকা লুঙ্গি উঁচিয়ে পানির গামলায় বসে নিজের শিশ্ন ও অণ্ডকোষ কচলে কচলে ধোয়। তারপর খাড়া হয়ে প্রস্রাব সারে। চোখের সামনে বড়হুজুরের এমন অকল্পনীয় বেহায়াপনায় ময়মনা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। অসহ্য বিবমিষা সয়ে, দুহাতে চোখ-মুখ ঢেকে অসহায় ফুঁসতে থাকে। কর্মসম্পাদন শেষে জলভরা কুকীর্তির গামলাটা উঠোনের মাঝখানে রেখে কেবলামুখী দাঁড়ায়। প্রত্যাশিত দূরত্বসীমানার বেশ বাইরে, পাড়ার লোকজন অশেষ কৌতূহলে বড়হুজুরের কেরামতি প্রত্যক্ষ করে ধন্য হতে চাইছে। ‘ইল খাজা’ হাঁক ছুঁড়ে বিড়বিড় করে সুরা-কালাম আওরায়। তারপর, পরপর তিনবার গামলার পানিতে ফুঁ মারে।

—খবর অইছে!

—কী খবর হুজুর?

একটা খালি কাচের গ্লাস গামলার পানিতে ভরাট করে গেদু বেপারির হাতে তুলে দেয়।

—তর মাইয়া যদি পাগলী অয়, তাইলে এই গেলাসের পানি ঢকঢক কইরা খাইব। আর যদি ভং ধইরা থাকে, একফোটা পানিও খাইব না।

টেনে-হিঁচড়ে ঘর থেকে উঠোনে আনা হয়েছে ময়মনাকে। গেদু বেপারি মেয়েকে পড়াপানি পান করাতে যত তৎপর, ময়মনা ততই অনীহা দেখিয়ে পিছিয়ে যায়। সম্মতি পেয়ে কদম শক্ত হাতে পেছন থেকে জাপটে ধরেছে। জোরপূর্বক পানি পানে বাধ্য করাতে গেলে ময়মনা দাঁতে-দাঁতে খিল আটকায়। এবার আরও সক্রিয় হয় গেদু বেপারি। একহাতে চোয়াল আটকায়, অন্যহাতে ঠোঁটের সাথে গ্লাস চেপে ধরে। জোরাজোরির নিরুপায় পর্যায়ে ময়মনা তার শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করে নেয়। ক্রোধে, প্রতিবাদে কাঁপে। শাসায়।

—মইরা গেলেও এই পানি আমি খামু না!

অনন্ত সুজন

জন্ম ২৭ নভেম্বর ১৯৭৭; ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
শিক্ষা : স্নাতকোত্তর (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)। পেশা : লেখালিখি।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
পিপাসাপুস্তক
জেল সিরিজ
লাল টেলিগ্রাম
সন্ধ্যার অসমাপ্ত আগুন

সম্পদনা :
শূন্যের সাম্পান [প্রথম দশকের নির্বাচিত কবি ও কবিতা]
অনতিদীর্ঘিকা [প্রথম দশকের দীর্ঘ কবিতা সংকলন]

সম্পাদিত ছোটকাগজ : সুবিল

ই-মেইল : anantasujon77@gmail.com

Latest posts by অনন্ত সুজন (see all)