হোম গদ্য গরু, আমি, দেশ আর হিন্দুয়ানি

গরু, আমি, দেশ আর হিন্দুয়ানি

গরু, আমি, দেশ আর হিন্দুয়ানি
552
0

আমার নাম দিব্য। হতে পারত নাসের, তালাওয়ালা বা রড্‌রিগ্‌স। জন্মাতে ও থাকতে পারতাম কলোনিয়াল ভারতীয় উপমহাদেশের তিনটি কৃত্রিম দেশখণ্ডের যে কোনো একটিতে, বা আরো অনেক আগে মহাভারতবর্ষের, মহাঐরাবতবর্ষের, মহাকৈলাসবর্ষের, অথবা মহাহরিবর্ষের আর কোথাও। কিন্ত জন্মেছি উনিশশ পঞ্চাশে আর উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতে। ফলে সুদূর অতীতে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা, এমনকি ব্রাহ্মণরা যে গো-মাংস ভক্ষণ করতেন তার ব্যাপারে কোনো তথ্য আমায় নাড়া দেয় না। তবুও একটু বলি।

মহাভারতে, এমনকি গুপ্ত আমলে কালিদাসের রচনাতেও, রন্তিদেব নামে এক রাজার ধন সমৃদ্ধির সপ্রশংস উল্লেখ আছে যার রন্ধনশালায় রোজ দুহাজার গরু জবাই করা হতো। চরক ও শুশ্রূতর চিকিৎসাশাস্ত্রে গো-মাংসের রোগনিরাময়িক গুণের কথা আছে। হরিচরণের অমর অভিধানে পড়েছি ‘গোঘ্ন’ বা গো-ঘাতকের একটি অর্থ ‘যাহার নিমিত্ত গো-বধ করে’; অতিথি’, কারণ ‘পূর্বে অতিথির আগমনে মধুপকার্থ গো-বধ বিহিত ছিল’ (হরিচরণ এ প্রসঙ্গে মনুস্মৃতি থেকে উদ্ধৃত করেছেন, মহোক্ষং বা মহাজং বা শ্রোত্রিয়ায় প্রকল্পয়েৎ’)। কিন্তু পরক্ষণেই জানিয়েছেন ‘কলিকালে ইহা নিষিদ্ধ’ (‘মধুপর্কে পশোর্বধঃ’।—বৃহন্নারদীয়পুরাণ’)। মহাপণ্ডিত রাজেন্দ্রলাল মিত্রের একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম, ‘Beef in Ancient India’, এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে (ভলিউম ৪১)। সেখানে উল্লেখ ছিল যে এইচ. এইচ. উইলসন মেঘদূত-এর ভূমিকায় লিখেছিলেন যে অশ্ব-মেধের সঙ্গে গো-মেধও হিন্দু ধর্মীয় আচারের আদিতম কালগুলিতে খুবই চালু ছিল। উইলিয়াম কোলব্রুকের ‘The Religious Ceremony of the Hindus’ প্রবন্ধের উল্লেখও করেছেন মিত্র, যেখানে গোঘ্ন অতিথির জন্য গো-বধের প্রচলন ছাড়াও মনুর তরফে গো-বধের অনুমোদনের কথাও আছে। দেবতা ও পিতৃপুরুষদের যেসব পশুমাংস ভক্ষ্য বলে মনু উল্লেখ করেছিলেন তাদের মধ্যে উট সম্পর্কে নিষেধ আর কয়েকটির সম্পর্কে আদেশের মধ্যে গরুর স্পষ্ট উল্লেখ ছিল না বটে। কারণ অনুমত মাংস ছিল পাঁচ আঙুলের প্রাণীদের মধ্যে—শজারু, গোধিকা মানে গোসাপ, গণ্ডক তথা গণ্ডার, কচ্ছপ, এবং শশক (প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য বইয়ে বিবেকানন্দও এদের কথা লিখেছিলেন)। আর চতুষ্পদদের মধ্যে উট ছাড়া আর সব পশু, যাদের কেবল এক সারি দাঁত আছে। মনু নিশ্চয় জানতেন যে গরু এদের মধ্যে পড়ে। তাদের বাদ দিতে গেলে মনু নিশ্চয় উটের সঙ্গে এদেরও উল্লেখ করতেন। কিন্তু অনুমানের প্রয়োজনওবা কী? মনু তো ব্রহ্মচারীর গৃহে প্রত্যাবর্তনের শুভ মুহূর্তে তার সংবর্ধনার আয়োজনের মধ্যে পিতার উপহৃতব্য বেদ, মাল্যগন্ধ ইত্যাদির সঙ্গে মধুপর্কের আচার অনুযায়ী একটি গরুর উপহারের বিধানই দিয়েছেন। ফলে এই চালু বিশ্বাসটি খুবই ভুল যে মনুর বিধানেই গো-বধ নিষিদ্ধ হয়।


লক্ষ্মণ শাস্ত্রী যোশীও অনেক ধর্মশাস্ত্রগ্রন্থের উল্লেখ করেছেন যেখানে প্রাচীন ভারতে গো-মাংস ভক্ষণের উল্লেখ ও অনুমোদন আছে।


১৯৪০-এর দশকের প্রথম দিকে পি. ভি. কানে তার পাঁচখণ্ডের বৃহৎ History of the Dharmaśāṣtra বইতে কিছু বৈদিক এবং ধর্মশাস্ত্রীয় রচনাংশের কথা বলেছেন যেখানে গো-বধ আর গো-মাংসের উল্লেখ আছে। এইচ. ডি. সাঙ্কালিয়া সাহিত্যিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রাচীন ভারতে গবাদি-মাংস খাওয়ার প্রচলের কথা বলেছেন। লক্ষ্মণ শাস্ত্রী যোশীও অনেক ধর্মশাস্ত্রগ্রন্থের উল্লেখ করেছেন যেখানে প্রাচীন ভারতে গো-মাংস ভক্ষণের উল্লেখ ও অনুমোদন আছে। সঙ্ঘ পরিবার আর তার তাত্ত্বিকরা গো-বধের যে কোনো সমর্থনকে ‘সভ্যতার নিরক্ষরতার’ অভিযোগে বিদ্ধ করলেও এদের তিরবিদ্ধ করে নি। করলে বোধহয় লাভও হতো না। মহামহোপাধ্যায় কানে এক রক্ষণশীলতাবাদী মারাঠি ব্রাহ্মণ, যিনি একমাত্র সংস্কৃতজ্ঞ যিনি ভারতরত্ন উপাধি পেয়েছেন। সাঙ্কালিয়ার সংস্কৃত আর সক্রিয় প্রত্নতাত্ত্বিক জ্ঞান প্রশ্নাতীত। রাজেন্দ্রলাল মিত্রকে মহামহোপাধ্যায় ম্যাক্স মুলার বলেছিলেন তার সময়ের শ্রেষ্ঠ জীবিত ভারততাত্ত্বিক, আর রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন জ্ঞানদেবীর প্রিয়তম সন্তান। কিন্তু এদের ধর্মশাস্ত্রীয় সাক্ষ্য ছিল সীমিত, কিছুটা অসংলগ্ন। প্রাক-মুসলিম ভারতে এক দীর্ঘ গো-মাংস ভক্ষণের ঐতিহ্যের বর্ণনা দেয় নি। ডি. এন. ঝা তার The Myth of the Holy Cow (London, New York: Verso, 2004) বইতে সেই ঐতিহ্যের অনুসন্ধান করে সঙ্ঘ পরিবারের এমনকি তার পরিপোষক সরকারের রক্তচক্ষুর সামনে পড়েছেন।

ব্রাহ্মণ আর মুনিদের গো-মাংসে রুচি তো হবেই, যেখানে তাদের দেবতাদের গবাদি পশুমাংস ছাড়া চলত না। ঝা দেখিয়েছেন ইন্দ্র, অগ্নি, সোমআদি বৈদিক দেবতাদের যজ্ঞাহুত গব্যমাংস খাওয়ার ধুম। ঋগ্বেদে প্রায়শই আছে দেবতাদের, বিশেষত ইন্দ্রের জন্য ষণ্ডমাংস নিবেদনের কথা। কোথাও ইন্দ্র বলছেন তার জন্য প্রত্যহ পঁয়ত্রিশটি ষণ্ড রান্না হওয়ার কথা, কোথাও বৃষ-মাংস খাওয়ার কথা, আবার কোথাও কোথাও একশ মহিষ, অগ্নির দ্বারা ঝলসানো তিনশ মহিষ, অথবা হাজার মহিষের কথা। ঋগ্বেদে ২০০ সূক্তের উদ্দিষ্ট অগ্নি ইন্দ্রের চেয়ে অনেক বেশি সমঝে সোমরস খেলেও, আর ঘি তার সব চেয়ে প্রিয় হলেও, সেখানে তার খাদ্য হিশেবে ষণ্ড এবং বন্ধ্যা গাভীর কথা আছে। বীতস্পৃহ ছিলেন না বলেই কিনা যজ্ঞে তার প্রতি নিবেদিত হতো অশ্ব, ঋষভ, উক্ষণ (ষাঁড়), বাশা (বন্ধ্যা গাভী), মেষ ইত্যাদির মাংস। সোমদেবের যজ্ঞেও গবাদি পশুর রোস্ট অত্যাবশ্যক ছিল। গো-পথ ব্রাহ্মণে যে একুশটি যজ্ঞের কথা আছে তাদের সবকটিতে না হলেও কয়েকটিতে ইন্দ্রের জন্যে বৃষভ, মরুৎ-এর জন্য বিচিত্র রঙিন, আর অশ্বিনীদের জন্য তাম্রবর্ণের গাভী দিতেই হতো। মিত্র ও বরুণেরও গাভী চাইই চাই। অশ্বমেধ, রাজসূয়, বাজপেয় সব যজ্ঞেই গরু, ষাঁড়, বৃষমাংস অন্য সব মাংসের মধ্যে থাকবেই থাকবে। ‘অগ্ন্যাধেয়’ নামক প্রস্তুতির চালে একটি গাভী বধ করতেই হবে, আর ‘অধ্ব্যারু’ পুরোহিত একটি বৃষের লাল অন্তঃচর্মের উপর চার রেকাব চাল রেখে ঝলসাবেনই। অশ্বমেধের বন্য বরাহ-সহ ৬০০ প্রাণী আর পাখির বলি তুঙ্গে পৌঁছত ২১টি বন্ধ্যা গাভীবলির সঙ্গে। তৈত্তিরীয় উপনিষদ অবশ্য ১৮০টি অশ্ব, বৃষ, গাভী, ছাগ, মৃগ, নীলগাই বলির কথা বলেছে। গো-সবা বা গাভীবলি রাজসূয় এবং বাজপেয় যজ্ঞের অবশ্যপালনীয় শর্ত ছিল। শতপথ ব্রাহ্মণ মরুৎকে একটি চিত্রল গাভী দেওয়ার কথা বলেছে। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ‘পঞ্চ শারদীয়সবা’ বা ‘দর্শপূর্ণমাস’ উপলক্ষে সতেরটি তিন বৎসরের কম অজননী গাভীর বলির বিধান দিয়েছিল। উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ নেই। এত দেবমাংস ভোজনের পর মিথিলার পরম শ্রদ্ধেয় মুনি যাজ্ঞবল্ক্য যে কচি ষণ্ড বা গাভীই (অংশলা) সব মাংসের মধ্যে বেশি পছন্দ করবেন তাতে অবাক হবার কিছু নেই। আসল কথা হলো মেরঠের হস্তিনাপুর এবং আল্লাপুরের, এটা জেলার অত্রঞ্জিখেরা, হরিয়ানার ভগবানপুরের (কুরুক্ষেত্র জেলা), পাঞ্জাবের রোপারের, এমনকি কৃষ্ণের সঙ্গে জড়িত মথুরার বৈদিক এবং উত্তর-বৈদিক জনপদগুলিতে যেসব ঝলসানো, বা কাটাচিহ্নওয়ালা (মানে খাওয়া) পশুঅস্থির নিদর্শন খনিত হয়েছে তাদের মধ্যে অন্য সব প্রাণীর মধ্যে বারাশিঙ্গা, নীলগাই, গরুবলদ, ষাঁড় ইত্যাদির চিহ্নগুলি সব মিলে খ্রিস্টপূর্ব একাদশ থেকে পঞ্চম, তৃতীয় এমনকি দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত সময়ের। ঝা-র থেকে যা বুঝি, ভারতে জানপদিক গো-ভক্ষণ কোনোভাবেই মুসলিম যুগ থেকে শুরু হয় নি।


বিস্ময়কর ভাবে গো-হত্যা মহাপাতক হয়ে ওঠে গুপ্তদের আমলে, যদিও তারা ছিলেন হিন্দু, আর হিন্দুধর্মে যজ্ঞীয় উদ্দেশ্যে গো-বধের বিরুদ্ধে কোনো বিধান ছিল না।


ধর্মের ক্ষেত্র থেকে রাজশাসনের কথায় আসি। আম্বেদকর তার The Untouchables (Volume 1,  Digital Copy) বইতে দেখিয়েছেন যে অনেকে যদিও আশ্চর্য হন যে সম্রাট অশোক তার জমানায় গো-রক্ষার জন্য কোনো আইন প্রণয়ন করেন নি, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। অহিংসার আর অপশুবলির প্রচারক অশোকের গরুদের জন্য বিশেষ কোনো দুর্বলতা ছিল না। বিস্ময়করভাবে গো-হত্যা মহাপাতক হয়ে ওঠে গুপ্তদের আমলে, যদিও তারা ছিলেন হিন্দু, আর হিন্দুধর্মে যজ্ঞীয় উদ্দেশ্যে গো-বধের বিরুদ্ধে কোনো বিধান ছিল না। গুপ্তরা হিন্দু হয়েও যে মনুর বিরুদ্ধে গিয়ে গো-হত্যাকে মহাপাতক করে তুললেন তার আসল কারণ হলো বৌদ্ধ প্রাধান্যের বিরুদ্ধে হিন্দু পুনরুত্থানের জন্য বৈদিক ধর্মের একটি আবশ্যকীয়তাকে আপাতত স্থগিত বা নিলম্বিত রাখা। আর এই বিশ্লেষণ যদি ঠিক হয় তবে গো-পূজা বৌদ্ধধর্ম আর হিন্দুধর্মের লড়াইয়ে, অর্থাৎ শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায় ব্রাহ্মণ আর শ্রমণদের লড়াইয়ে ব্রাহ্মণদের হৃতমর্যাদার পুনঃপ্রতিষ্ঠার উপায়। তা বলে অবশ্য ভাবলে ভুল হবে যে তার প্রাধান্যের কালেও বৌদ্ধধর্ম পশুহত্যা এমনকি গো-বধকেও নির্মূল করতে পেরেছিল। খাদ্যাভ্যাস বড় কঠিন ব্যাপার। ঝা যেমন দেখিয়েছেন থেরাবাদী বৌদ্ধধর্ম প্রবল এমনকি সরকারি ধর্ম ভারতীয় উপমহাদেশের যেসব দেশে/ রাষ্ট্রে, যেমন মিয়ানমার (বার্মা), শ্রীলঙ্কা, সেখানেও গো-মাংসভক্ষণ আইন সত্ত্বেও পুরোপুরি নির্মূল হয় নি, যদিও মাংস তালিকায় তার স্থান খুব নিচে। হবে কী করে? কথিত আছে ভগবান বুদ্ধ নিজে অহিংসার প্রচারক হয়েও শূকর-মাংসের অন্ন (‘শূকর-মাদ্দব’) খেয়ে মৃত্যুবরণ করেন। অশোকের অনিধন তালিকায় প্রাণীদের মধ্যে গাভীর উল্লেখ নেই। ভারতের ভিতরে ও বাইরে, যেমন লাহুলে গোপনে আর তিব্বতে বৌদ্ধরা বহুদিন অন্যান্য পশুমাংসের সঙ্গে গবাদি পশু খেয়ে জৈনদের তীব্র বিদ্রূপের শিকার হয়েছেন। কালিদাসের দুই শতাব্দী পরে ভবভূতি অতিথি সৎকারের দুটি উদাহরণ দিয়েছেন যেখানে তরুণী গাভী বধ হয়েছিল। দশম শতাব্দীতে রাজশেখর অতিথির সম্মানে ষণ্ডবধের উল্লেখ করেছেন। আরো পরে শ্রীহর্ষ দুই জমকালো বিবাহভোজের বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে গো-বধ ঘটেছিল।

তো কী? আসল কথাটি তো এই যে সুদীর্ঘকাল ধরে ভারতে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা গো-বধ করেন না। আধুনিকীকরণের মোহে ইয়ং বেঙ্গলের অনেকে ঔপনিবেশিক যুগে গো-মাংস খেয়ে আর তার হাড় প্রতিবেশীর বাড়িতে ছুঁড়ে বীরত্ব দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সেই কালের সব চেয়ে বড় আধুনিকীকারী বিদ্যাসাগর মশায়কে এসব কিছু করতে হয় নি। আরো বড় কথা হলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ভারতীয় উপমহাদেশের কার্ষ সমাজে ও সংস্কৃতিতে, যেখানে গো-বলদের গুরুত্ব অপরিসীম, দুই প্রধান ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি গো-বধ ও  গো-মাংস ভক্ষণকে মহাপাপ ভেবেছে, আরেকদল তাকে স্বাভাবিক খাদ্যের এক প্রধান উপাদান ভেবেছে। অথচ মাঝে মাঝে কলোনিয়াল যুগে বাধিয়ে দেওয়া ঝামেলা ছাড়া বেশ মিলে মিশেই থেকেছে। এটা কী করে এই গোটা ভারতীয় প্রাক্-ও-উত্তর মুসলিম উপমহাদেশে সম্ভব হয়েছিল সেটা সমাজবিজ্ঞানের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রধান দুই জনগোষ্ঠীর কোনো একটিকে জোর করে গো-মাংস ভক্ষণে বাধ্য করা (যেমন মধ্যযুগে কোনো কোনো অত্যাচারী নৃপতি ও সেনানায়ক কখনও কখনও করেছিলেন), অথবা তাদের কোনোটিকে জোর করে গো-মাংস ভক্ষণ থেকে নিরত করা (যেমন কোনো কোনো রাজনৈতিক শক্তি কখনও কখনও চেয়েছেন, এখনো চাইছেন) সমানভাবে অগণতান্ত্রিক, ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যতিচারী।

গরুর প্রতি আমার মনোভাব খুবই মেশানো ধরনের। ছোটোবেলা থেকে বাড়িতে বিভিন্ন প্রজন্মের গরু ছিল দু-তিনটি, মায়েরা আর তার পর মেয়েরা। বলদগুলোকে কোথাও একটা পাঠিয়ে দেওয়া হতো। মাইয়াগুলোর সাথে পিতামহীর ব্যতিহারী ভালোবাসাবাসি, আর চাকরিজীবী পিতার প্রতি তাদের অহৈতুকী প্রেম দেখেছি শিশুকাল থেকে। বড় ভালো লাগত তাদের টানা টানা চোখ আর তাদের অসামান্য অভিব্যক্তি, গায়ের মিষ্টি গন্ধ, প্রিয়পোষ্য, পরিবারসদস্য হিশেবে, খাদ্যবস্তু হিশেবে নয়; হঠাৎ দুঃখের/ স্বস্তির ফোঁস করা দীর্ঘশ্বাস। তাদের খাওয়া যায় তা চিন্তাতেও ছিল না। এই প্রেম থেকেই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই অমর গল্পের সঙ্গে মুহূর্তে রিলেট করতে পেরেছিলাম, একটি ‘চিনু মণ্ডলের কালাচাঁদ’, আরেকটি ‘কালাপাহাড়’। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত ছেলেদের দ্বারা বিক্রি করে দেওয়া, কসাইখানাগামী বলদের অকস্মাৎ সাক্ষাৎ পেয়ে সম্পন্ন চাষী ও সফল মানুষ চিনুর ভাবাবেগের মধ্যে ধর্মের কোনো স্থান ছিল না। এ ছিল এক চাষী মানুষ আর তার বলদের ভালোবাসা, যার আরেকটি বড় সাহিত্যিক উদাহরণ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মহেশ’ গল্পে গফুর আর তার বলদ মহেশের মধ্যে পড়ে মথিত হয়েছি। আচ্ছা গরুটির সংস্কৃত, হিন্দুদৈব নাম কে দিয়েছিল? আর গফুর কি পেলে কখনও কখনও গোমাংস খেতেন?


এটা ভাবাও ভুল যে গো-বধ নিষেধ আর গো-রক্ষা কেবল দক্ষিণপন্থি সাম্প্রদায়িক দল ও শক্তিগুলির চিন্তা ও দাবি।


নিজের অস্থির, উদ্ব্যস্ত যৌবনে কখনো বিফ স্টিক ছুঁই নি তা সত্যি নয়, কিন্তু গো-মাংস কখনো নিয়মিত খাদ্য ছিল না। আর হবেও না। অবাঙালি ঘরে জন্মানো আমার প্রিয়তম মানুষটি গরুকে দেখেই বলে গাই মাইয়া! কিন্তু নিজে খাওয়া বা না খাওয়া মানে কি এক সম্পূর্ণ প্রাণী-গোষ্ঠীকে অভয় দেওয়া? নিজে শৈশবে একটি ছাগল পুষেছিলাম, আর নিজের অবস্থা মেরি অ্যান্ড হার লিট্‌ল ল্যাম্ব-এর মতো করে তুলেছিলাম। কিন্তু তা বলে কি নিজের খাদ্যতালিকায় পশুমাংস পুরো বর্জন করেছি, নাকি পৃথিবীর সব ছাগমেষকে অভয় দিয়েছি? ভারতে গবাদি পশুর হাটে-বাজারে বিক্রি, জবাই পুরো নিষিদ্ধ হয়ে যাবে? মানুষের খাদ্যাভ্যাসের উপর পুলিশি ছাড়াও এই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক, পারিবেশিক দিকগুলিকে ভাবতে হবে না? ২০১২-য় করা পালিত প্রাণীর সুমারি অনুযায়ী পৃথিবীর সমগ্র মহিষের ৫৭.৮৩শতাংশ ও সমগ্র গাভীর ১৫.০৬শতাংশ ভারতে ছিল। দেশের মোট ৫.৯ মিলিয়ন টন মাংসোৎপাদনের মধ্যে মহিষ এবং গাভীর ভাগ ছিল ১৯ এবং পাঁচ শতাংশ। এতে সব চেয়ে বেশি ভাগ ছিল উত্তর প্রদেশের এবং অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের (এম. এম. ইসলাম ইত্যাদির ‘Scenario of Livestock and Poultry Production in India and Their Contribution to the National Economy’, International Journal of Science, Environment and Technology (5:3 (2016): 956-965)। ২০১৬ সালে ব্রাজিল এবং ভারত যুগ্মভাবে পৃথিবীর কুড়ি এবং কুড়ি শতাংশের একটু কম করে গো-মহিষ মাংস রপ্তানি করেছিল। মার্কিনী কৃষি দপ্তরের হিশাব অনুযায়ী ২০১৫ সালে ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম রপ্তানিকারক হিশেবে ২.৪ মিলিয়ন টন গো-মহিষ-বাছুরমাংস রপ্তানি করেছিল, যা পৃথিবীর সমগ্র রপ্তানির ২৩.৫ শতাংশ। ২০১৪ সালে এর রপ্তানিমূল্য ছিল ৪.৮মিলিয়ন ডলার। যেহেতু অনেক রাজ্যেই গো-বধ নিষিদ্ধ, সেই কারণে অধিকাংশ মহিষমাংস নির্ভর এই শিল্পে কর্মনিয়োগও ছিল বিশাল। কেবল উত্তরপ্রদেশ, যেখান থেকে এই মহিষ-বাছুরমাংস রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশ হতো, সেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৫ লক্ষ মানুষের কর্মনিয়োগ হয়েছিল।

এটা ভাবাও ভুল যে গো-বধ নিষেধ আর গো-রক্ষা কেবল দক্ষিণপন্থি সাম্প্রদায়িক দল ও শক্তিগুলির চিন্তা ও দাবি। কিভাবে ব্রিটিশদের গো-বধের পরিমাণ ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উত্তর প্রদেশের স্থানীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব ব্রিটিশদের নির্মমতা ও অসততার উদাহরণ হিশেবে দেখাতেন, আর গো-চর্বির অস্তিত্ব  দূষিত ব্রিটিশ বস্ত্রবর্জনের দোহাই হিশেবে ব্যবহৃত হয়েছিল তার চিত্তাকর্ষক চিত্র পাই উইলিয়াম গোল্ডের  Hindu Nationalism and the Language of Politics in Late Colonial India (Cambridge: Cambridge University Press, 2004) বইতে (পৃঃ ৭৮-৮১)। এদের প্রেরণা একমাত্র গান্ধী ছিলেন একথা ভাবা ভুল। তবে গো-রক্ষা বিষয়ে গান্ধীর সুর চড়া ছিল তাতে সন্দেহ নেই। কামাথ দেখিয়েছেন যে গো-রক্ষা ছিল গান্ধীর কাছে হিন্দুত্বের তথা হিন্দুধর্মের কেন্দ্রীয় সত্য (‘central fact’), বিশ্বে হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠ অবদান (‘the gift of Hinduism to the world’)। হিন্দুধর্ম তদ্দিন বাঁচবে যদ্দিন গো-রক্ষার জন্য হিন্দু থাকবে (‘Hinduism will live so long as there will be Hindus to protect the cow’)। তাই হিন্দুদের বিচার করা হবে তাদের তিলক দিয়ে নয়, শুদ্ধ মন্ত্রোচ্চারণ দিয়ে নয়, তাদের তীর্থযাত্রা দিয়ে নয়, জাতপাতের নিয়মগুলির সব চেয়ে নিখুঁত পালন দিয়ে নয়, গোরক্ষায় তাদের সামর্থ্য দিয়ে (‘but their ability to protect the cow’) শুধু (M. V. Kamath, Gandhi, A Spiritual Journey (New Delhi: Indus Source Books, 2007), p. 126-27)। এই তীব্র গোরক্ষা যে গ্রামস্বরাজ ভিত্তিক গান্ধীবাদী পরিকল্পনার মতোই সিধে হেঁটে সংবিধানে ঢুকে যেতে পারে নি তার কৃতিত্ব কতখানি নেহরু-প্যাটেলের আর কতখানি আম্বেদকরের তা নিয়ে গবেষণা হয়তো বেশ কিছু হয়েছে, কিন্তু অনেক বাকি। তবে যতটুকু হয়েছে তার থেকে জানা যায় যে সংবিধান রচনা গণপরিষদে শেঠ গোবিন্দ দাস যখন গো-নিধনের উপর নিষেধাজ্ঞাকে সংবিধানের মৌলিক অধিকারগুলির মধ্যে নথিবদ্ধ করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তখন আম্বেদকর দাসের এক নিকট সঙ্গী ঠাকুরদাস ভার্গবকে সাথে নিয়ে এক সংশোধনী আনলেন যা গো-রক্ষাকে অনেক মোলায়েমভাবে সীমিত ক’রে সংবিধানের তৃতীয় অংশের স্থলে আইনী অর্থে অবলবৎযোগ্য চতুর্থ অংশ ‘রাষ্ট্রপরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিগুলির মধ্যে ঠেলে দিল। এই সংশোধনীর বয়ানটি চূড়ান্ত নির্দেশমূলক নীতিগুলির ৪৮ নং ধারায় কৃষি এবং পশুপালন সংক্রান্ত নীতিটির এতই হুবহু যে আমি সেটাইউদ্ধৃত ও বাংলায় অনুবাদ করছি। ‘রাষ্ট্র কৃষি এবং পশুপালনকে আধুনিক এবং বৈজ্ঞানিক পথে সংগঠিত করার প্রয়াস করবে এবং বিশেষত গবাদি পশুর বংশগত শ্রেণি সংরক্ষণের আর উন্নয়নের উদ্দেশ্যে পদক্ষেপ নেবে এবং গরু ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় গবাদি পশুর, বিশেষত দুধেল আর হালটানা গরুর ও তাদের তরুণ বংশরক্ষকদের, নিধন নিষিদ্ধ করবে। গান্ধী আর দাস যে নিতান্ত অনিচ্ছায় আম্বেদকরের এই সংশোধনীকে আর মৌলিক অধিকারের জায়গায় রাষ্ট্রপরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিগুলির মধ্যে তার অন্তর্ভুক্তিকে মেনে নিয়েছিলেন, ঠাকুরদাস ভার্গব তার উল্লেখ করেছেন। এই ব্যাপারে নেহরুর ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৯-৫০ সালে সংবিধান রচনা পরিষদে একদিকে নেহরু আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এবং আরেকদিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও কংগ্রেস সাবেকপন্থীদের দীর্ঘায়িত বিতর্কের পর ৪৮ নং ধারায় বিধৃত সীমাবন্ধনগুলির সংশোধনীর এই অস্থির আপোষের পর নেহরু হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের স্থায়ী আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন। নেহরু ডেঁটে বসেছিলেন যে গো-নিধনের বিরুদ্ধে আইন কেবলমাত্র রাজ্যগুলির প্রাসঙ্গিক বিষয় হবে। এর পর আবার সুপ্রিম কোর্টের এক রায় গো-নিধনের বিরুদ্ধে যে কোনো আইনের পরিধিকে কেবল মালটানা, ভারবাহী বলদেই সীমিত করে দেয়। কেরল অবশ্য এইটুকুতেও রাজি হয় নি। তার পর থেকে সঙ্ঘ পরিবার আর বিভিন্ন গো-রক্ষক সংগঠন গো-নিধনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে এলেও তাতে চিঁড়ে ভেজে নি। এমনকি কেন্দ্রে বাজপেয়ীর নেতৃত্বে এন.ডি.এ. সরকারও জোটসঙ্গী আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে চলার তাগিদে গো-নিধনের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নে খুব বেশি জোর দেয় নি। অবস্থা বদলেছে কেন্দ্রে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মোদীর নেতৃত্বে ভাজপা সরকার আসার পর আর বিশেষ করে আদিত্যনাথ যোগীর নেতৃত্বে উত্তর প্রদেশে ভাজপা সরকার আসার পর। গো-রক্ষা আর গো-শালা নির্মাণ উত্তর প্রদেশ সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় উঠে আসার পর গো-নিধন বন্ধ করার উন্মাদনায় গো-রক্ষকদের তাণ্ডব ভীতিকর চেহারা নিচ্ছে। তার খুঁটিনাটি এই প্রবন্ধের বিবেচ্য নয়।


ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে বিবাহের পরদিন ভোজসভায় গো-মাংস সামাজিকভাবে অনুমত।


প্রশ্ন হলো ভারতের মতো বিচিত্র, বহুসাংস্কৃতিক দেশে এই আগ্রাসী গো-রক্ষা কি গণতান্ত্রিক, এমনকি উপকারী? এনডিএ-র আমলে মেঘালয়ে ভাজপা উঠে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল গো-নিধনের বিরুদ্ধে ফতোয়ায়। এবারও, ভারত সরকার সারা দেশ জুড়ে পশুবাজারে নিধনের জন্য নথিভুক্ত পশুখামারগুলির ছাড়া অন্য পালক/ বিক্রেতাদের দ্বারা গো-মহিষ কেনা বেচা বন্ধ করে দেওয়ার পর রাজ্যে রাজ্যে প্রতিবাদ ঘনীভূত হচ্ছে। এখনও মেঘালয়ের কংগ্রেস সরকারই কেবল বিধানসভায় এর বিরুদ্ধে প্রস্তাব নেয় নি, দুজন ভাজপা নেতা পদত্যাগ করার পর প্রতিবাদে রাজ্যে একটি গো-মাংস উৎসবের আয়োজন করেছেন। হাজার হাজার সদস্যও দল ত্যাগ করেছেন। মেঘালয়ে কেবল প্রতি দশ জনের মধ্যে আটজন গো-মাংস খান, গো-মাংস খাওয়াকে মেঘালয়িক সংস্কৃতির অঙ্গ মনে করেন। অরুণাচলেও প্রতিবাদ বাড়ছে, কংগ্রেসের নেতৃত্বে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার আর তার সর্বময়ী নেত্রীও এই সিদ্ধান্তকে নিন্দা করেছেন। তামিলনাড়ুতেও রাজ্য জুড়ে প্রতিবাদের মধ্যে ডিএমকে এআইএডিএমকে সরকারকে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ না করার জন্য সমালোচনা করেছে। কেরালার বাম সরকার যে একে ফ্যাসিবাদী বলেছে তা রাজনৈতিক কারণে নয়। আমি কেরলে একটি সেমিনার শেষে খাওয়ার আসরে পানীয়ের সঙ্গে বিফ স্টিক খেতে দেখেছি হিন্দু, এমনকি ব্রাহ্মণ অধ্যাপকদের। জেনেছি যে অব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে বিবাহে/ উৎসবে সাবেকি খাবার সাডিয়াতেও অন্য লাল মাংসের সঙ্গে গো-মাংসও থাকে। ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে বিবাহের পরদিন ভোজসভায় গো-মাংস সামাজিকভাবে অনুমত। কেরলে মেঘালয়ের মতোই প্রতিবাদী গোমাংস উৎসবের আয়োজন হয়েছে। মজার কথা হলো ওই সেমিনারান্তিক ভোজসভা, যার কথা বললাম, সেখানে বিফ স্টিক ছোঁন নি কেবল এক কাশ্মিরী মুসলমানি গবেষিকা, কারণ কেরলের ব্রাহ্মণ গো-মাংস খেলেও কাশ্মিরী মুসলমানরা সাধারণত খান না। কারণটা আর্থসামাজিক।

শেষে বলি—এক রামাশ্রয়ী রিডাকশনিস্ট হিন্দুত্ব যে আগ্রাসী গো-রক্ষার নামে দেশে এক সংকীর্ণ অখণ্ড ভারতের ধ্বজা ওড়াতে চাইছে তাকে দেখলে যাজ্ঞবল্ক্যসহ অন্যান্য মুনিরা কী বলতেন?

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল : dibyaupadhyay@gmail.com

Latest posts by অমর্ত্য মুখোপাধ্যায় (see all)