হোম গদ্য খোঁজ

খোঁজ

খোঁজ
720
0

এখনও খোঁজ চলছে তার। খুঁজে বেড়াচ্ছে ওরা সর্বত্র, ধরতেই হবে তাকে। কত বছর কেটে গেছে, অথচ মনে হচ্ছে এই-তো সেদিন, যখন একটা সংক্ষিপ্ত বার্তা এসেছিল ই-মেইলে। মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়েছিল সহস্র লক্ষ মেল বক্সে, তড়িৎ গতিতে। রঙ গেরুয়া, মাঝবয়সী, গড়ন দোহারা, পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি, কালো ক্রু-কাট চুল—অচঞ্চল চোখ। খুবই উদ্ভ্রান্ত বিপজ্জনক মানুষ, একের পর এক নিপুণ দক্ষতায় ভুল করে যায় সে। স্মৃতি দুর্বল, কিন্তু চোখে এক অবিচল উদ্ভাস। আর বিশেষ কিছুই জানা যায় নি তার সম্বন্ধে। এই ছিল স্পেশাল ব্রাঞ্চের সংক্ষিপ্ত বিবরণী। কোনো কোডিফায়েড টেক্সট নয়, এনক্রিপশান নয়। সরল ও সর্বজনীন রোমান অক্ষরে।

সুতরাং বাদবাকি যা কিছু শোনা যায় তার সম্বন্ধে, তার সবটাই লোকমুখে ছড়িয়ে পরা কল্পকাহিনি। গুজব, প্রচল ও কঞ্জেকচার। অথচ জানা খুব জরুরি ছিল তার কোনো নেশা আছে কিনা, মুদ্রাদোষ আছে কিনা। সে যেমন ধ্রুবতারা চেনে না, কালপুরুষ চেনে না। কখনো দেখে নি ব্রহ্মকমল ফুল।


চার জনের যে দলটা আজও খুঁজছে, তাদের ক্যামোফ্লাজ আউটফিট। সাথে দুটো স্নিফার ডগ, ডার্ক বাদামি—তারা ঐ পেনের গন্ধ চিনে নিয়েছে।


কিন্তু জানা দরকার, তার মুখের ডান ভাগ কি বাঁ দিকের হুবহু মিরর-ইমেজ? নাকি, বাঁ চোখ একটু নিচুতে, ঠোঁট একটু ডান দিকে নামানো। কী তার খাদ্যাভ্যাস? দুধ-রুটি, ছোলা-গুড়, কর্ন-ফ্লেক্স,  স্যুপ, ওটস, স্যালাড, ম্যাকারনি? রক্তে তার হিমোগ্লোবিন কত? কত তার অ্যাড্রেনালিন? সে কি ঘন কুয়াশায় একটা অচেনা মাঠ হাঁটতে হাঁটতে পেরিয়ে যেতে পারে, একা ও অবিচল? সে কি মরিয়া, মায়াচুর, ম্যাচো? তার কপালে পিঠে ঘাড়ে বাহুতে কোনও ট্যাটু আছে কিনা। সে কি বাঁ হাতে লেখে? থেমে থেমে কথা বলে? কী রকম তার পেন-হোল্ড? কতগুলো কলম সে ব্যবহার করত? যদিও মাত্র একটাই এ’পর্যন্ত শোনা গেছে—একটা প্রাচীন কালো রঙের পার্কার পেন, যার সোনালি নিবে কত কালের রয়্যাল ব্লু শুকিয়ে জমাট বেঁধে আছে।

চার জনের যে দলটা আজও খুঁজছে, তাদের ক্যামোফ্লাজ আউটফিট। সাথে দুটো স্নিফার ডগ, ডার্ক বাদামি—তারা ঐ পেনের গন্ধ চিনে নিয়েছে। চামড়ার বকলেসে চকচক করছে পেতল। স্কোয়াডের সঙ্গে আছে জিপিএস, আর রুট ম্যাপ। তারা ঘুরে এসেছে শহরের প্রাচীন বাড়িগুলো, বইপাড়া, মনাস্টেরি, কচৌড়ি গলি, পৌরসভা, অরফানেজ, মীনা বাজার। এত দিনে জীবনযাপনের অনেক কথাই জেনে গিয়েছে তারা। নাগরিক সুশীল সভ্যতার গম্ভীর ছেনাল ধূর্ত ক্লীব নির্লজ্জ আপ্রাণ ও রহস্যময় দিকগুলোর কথা।

Khnoj_2 sniffer dogs

২.
ফুড প্রসেসিং জোনের বিশাল ক্যাম্পাসের গেটে গাড়িটা থেমে ছিল। গেটে এক প্রস্থ কাগজপত্র দেখিয়ে পার্কিং লটে গাড়িটা পার্ক করা হয়েছে। চওড়া রাস্তার দুধারে অনেক বড় বড় শেড। তাতে মজুত করা আছে আলু পেঁয়াজ আদা চাল গম মুগডাল মসুরডাল সয়াবিন সরষে। আছে নানা রকমের শস্যদানা, উদ্ভিদ, সবজি, ফল, তরিতরকারি। ক্যাপ্সিকাম লেটুস পার্সলে মাশরুম পুদিনা টমেটো গাজর বিন্স শসা ন্যাশপাতি। হলুদ স্কার্ট পরা বাদামি রঙের সুঠাম মেয়েরা, তাদের হাতে হাতে দস্তানা, সাজিয়ে প্যাকিং করছে ঐসব আনারস আপেল কলা সজনেডাঁটা জিরে হলুদ শুকনো লংকা নারকেল। বড় বড় ট্রাক ও ট্রেলার, মেরিন কন্টেনার। সে সবের মধ্য দিয়ে, কখনো পাশ কাটিয়ে, ফুটপাথে, কালভার্টে, কখনো ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে চলেছে রোদে ঘর্মাক্ত ক্যামোফ্লাজ বাহিনী। টান টান বকলেসে আগে আগে দুটো স্নিফার ডগ। কী ভীষণ সংযত তারা। কর্ন-ফ্লেক্সের পেটি আর সসেজের টিনের পাশ দিয়েও গিয়েছে। বড় বড় বিস্কিটের বাক্স লোড হচ্ছে ভ্যানে। বেকারির স্পেশালি বেকড্ কেক, বাতাসের পরতে পরতে তার গন্ধ ছড়ানো। কিম্বা কোল্ড স্টোরেজে প্যালেট ভর্তি প্রসেসড্ চিকেন-বীফ-মাটন। জমাট বরফের হিম বাস্প বেরিয়ে আসছে দরজার ফাঁক দিয়ে। উচু উচু রীচ-ট্রাক আর ফর্কলিফ্ট-ট্রাক তাদের বয়ে নিয়ে যাচ্ছে এদিক থেকে ওদিকে। শুকনো মাছের আঁশটে ঝাঁঝাল গন্ধ। কিন্তু স্নিফারদের কোনো হেলদোল নেই। সময়ের এই ভীষণ কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়েও সংযত নির্লোভ উদাসীন হেঁটে যাচ্ছে ওরা, চারপায়ে। শুধু একটা প্রাচীন কালো কলমের জমাট রয়্যাল ব্লুর গন্ধ তারা নাকে ধরে রেখেছে অবিকল।

এরকম অবস্থায় যা যা হয়। অনেকেই ভেবেছিল কোনো টেররিস্ট গ্রুপের সন্ধানে নেমেছে প্রশাসন। অথবা কোনো বম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াড। কিন্তু ওরা যখন অবিচল হেঁটে গেল, শুধুমাত্র পথের বাঁকগুলোতে ঘুরে, ট্রাক ট্রেলার ও অসংখ্য পিকআপ ভ্যানকে ভ্রূক্ষেপ না করে, বিকেলের কোরাল আলোয় মনে হলো এতটাই তারা সিনেম্যাটিক। ক্রমে ওরা পেরিয়ে গিয়েছে ওয়ে-ব্রিজ ও কোল্ড স্টোরেজগুলো। পশ্চিম প্রান্তে পিচ রাস্তা ও কাঁটা তার পেরিয়ে এক পাশে বিস্তৃত শস্যক্ষেত, ফলের বাগান, ফুল চাষ, পোলট্রি পর পর। অন্য দিকে মেছো ভেড়ি, শরবন, হাঁটু জল। সেইখানে থেমে, যেন সবই পূর্ব-নির্ধারিত, দু হাতে শাপলা ফুল সরিয়ে অজস্র ব্যাঙাচি আর পুঁটি মাছের ঝাঁককে বিপর্যস্ত করে, ওরা  সবাই উঠে বসেছে একটা ছোট নৌকায়। দড়ির বাঁধন খুলে, লগি মেরে, ক্রমে সুতিখাল ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা, পড়ন্ত সূর্যের দিকে।


কী ছিল তার পাঠাভ্যাস? ইতিহাসের কোন পিরিয়ড? ভূগোলের কোন অক্ষরেখা, দ্রাঘিমা? কী কী ভাষা রপ্ত ছিল তার?


৩.
মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্টের বিশাল চত্বরে এক পাশে লাইব্রেরি ভবন। অন্য দিকে বিস্তৃত কলাভবন ও মিউজিয়াম ভাগ করা আছে আটটা জোনে। তেরোটা ম্যানিকিওর্ড ঘাসের লন, বড় দুটো ওয়াটার বডি। সেই লেকের চারপাশ ঘিরে কার্পেট ঘাসের বাইরে দিয়ে আলাদা পথ করা আছে শুধু সাইকেল-আরোহীদের জন্য। সেই পথ দিয়ে হেঁটে চলেছে চারজনের ঐ দলটা। সঙ্গে দুটো স্নিফার ডগ। টুপি পরা বেতনভোগী লোকগুলো। সবুজ ইউনিফর্ম আর হাই-বুট। বাদামি মুখের ভূগোলকে নির্দিষ্ট করেছে তাদের উদ্ধত কঠিন চোয়াল। কিন্তু চোখগুলো উজ্জ্বল গভীর, টানা ও মায়াবী। বোঝা যাচ্ছে দীর্ঘ দিন ধরে কাউকে খুঁজছে তারা। অথচ বিশেষ কিছুই যার সম্বন্ধে জানা নেই। সেই এক বিপজ্জনক উদ্ভ্রান্ত মানুষ। একের পর এক নিপুণ দক্ষতায় ভুল করে যায় সে অবিবেচক। তার জন্য একটা কালো রঙের প্রাচীন পার্কার কলম, যার সোনালি নিবে…। অথচ কে না জানে, এভাবে বলা যায় না কিছুই। এত অল্পে কোনো মানুষকে কখনো জানা যায়?

কী ছিল তার পাঠাভ্যাস? ইতিহাসের কোন পিরিয়ড? ভূগোলের কোন অক্ষরেখা, দ্রাঘিমা? কী কী ভাষা রপ্ত ছিল তার? সংস্কৃত, পালি, স্প্যানিশ, ইদ্দিস, অ্যাস্পেরান্তো? সে কি গাইতে পারত কম্যুনিস্ত ইন্তারন্যাসিওনাল? ‘জেন্টাইল অর জিউ, ইউ হু লুক উইন্ডয়ার্ড…’ বললে সে কি মুখ তুলে তাকাত দূর আকাশের দিকে? কী তার পছন্দ ছিল, টেরাকোটা না গ্রানাইট? অমিত্রাক্ষর না আবহমান পয়ার? কলার মদ না স্কচ? সারেঙ্গি না স্যাক্সোফোন? কীর্তন না কাওয়ালি?—তার কি ভালো লাগত নারীসঙ্গ? কোনো ঘটিহাতা ডুরে শাড়ি? নাকি মেরুন সিল্কের লঞ্জারিতে মদালসা কোনো ডিভা? ‘রাত্রি যবে হবে অন্ধকার…’ পড়তে গিয়ে কি তার কণ্ঠস্বরে ছুঁয়ে যেত রোমান্টিক আবেশ অথবা বিষাদ?

টানা করিডোর দিয়ে অন্ধের মতোই সোজাসুজি হেঁটে চলেছে ঐ চারজন। সঙ্গে দুটো স্নিফার ডগ। ধূসর কাঁচে ঘেরা বিশাল লাউঞ্জগুলোয় শীতসকালে সূর্যকিরণের জ্যামিতিক ডিফিউশান। কফি বিন্সের ভাজা গন্ধে বাতাস অভিজাত, আদরণীয়। দেওয়ালে প্রাচীন পার্চমেন্টের ওপরে আঁকা ক্যালিগ্রাফি। পোড়ামাটির প্যানেলে বিবৃত জাতকের কাহিনি, রেড উড ফ্রেমে বাঁধানো তেল রঙের পোর্ট্রেট। তারপর বিশাল হলঘর ক্রমে ভাগ হয়ে গিয়েছে জোনে। মুঘল পিরিয়ড, মৌর্য যুগ, সেন যুগ, নন্দ বংশ, বিক্রমাদিত্য, কনফুসিয়াস, চেত্তিয়ার, ছত্রপতি, ভিক্টোরিয়ান, গ্রেকো রোম্যান। নালন্দা, এথেন্স, আলেকজান্দ্রিয়া, মেসোপটেমিয়া, হরপ্পা।

এই প্রথম ওদের দাঁড়াতে দেখা গেল। একটা বিরাট ক্যানভাসের সামনে। তার স্বল্প আলোয় রঙ-তুলি-ব্রাশের বলিষ্ঠ নিপুণ টানে ফুটে উঠেছে একজন শ্রমিকের পারিবারিক ছবি, পেশায় যে কামার। কালো টিন শেডের ভেতরে কয়লার আগুনের এক পাশে উবু হয়ে বসে কামারের ছোট মেয়েটা। আগুনের লালচে অ্যাম্বার আভায় উজ্জ্বল তার লাল রঙের ইজের। ছোট ছেলেটা, হাপরে যে হাওয়া টানছে, কয়লা গুঁড়োর উড়ন্ত ফুলকিতে ধোঁয়ায় তার ঠোঁটচাপা, দমবন্ধ চোখমুখ। আর গরম হলুদ লোহার ওপর নেমে আসছে যে প্রবল হাতুড়ি, বলিষ্ঠ পেশীর সেই এক ঘর্মাক্ত অবিচল কামার।


সে কি আবিষ্কার করতে পারে কোনও অন্তিম বিস্ময়? সে কি ক্রমশ আরও বিপন্ন করে তুলছে সুশীল সমাজকে?


স্নিফার দুটো গ্রাহ্য করল না, কিন্তু থমকে দাঁড়িয়েছিল চারজনই ঐ বিশাল ক্যানভাসের সামনে। কয়েক মুহূর্ত থেমে, দেখে কিম্বা না দেখে, হয়তো পূর্বাপর ভেবেই, তারা—ঐ পবিত্র আত্মারা—বাঁক নিলো ডানদিকে। মার্বেল সিঁড়ি যেখানে ক্রমে নেমে গেছে,—সেই বেসমেন্টে। যেখানে রেস্টোর করা হচ্ছে দুষ্প্রাপ্য ছবি, পাণ্ডুলিপি, আর খুব সূক্ষ্ম সুচ ও লেসার রশ্মি দিয়ে সারিয়ে তোলা হচ্ছে নকশা করা সিল্কের প্রাচীন পোশাকগুলো। মার্বেলের ঘোরানো স্টেপ দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চারজন নেমে যাচ্ছে ব্যারিকেডের এরিয়াগুলো পেরিয়ে, নিচে, অনেক নিচে।

৪.
মনে হয়েছিল বুঝিবা কোনো সংকেত, যা লুকিয়ে আছে ঐ ক্যানভাসে। কবি নয়, তাঁতশিল্পী নয়, ব্যান্ডমাস্টার নয়, বেহালাবাদক নয়। অথচ এমন কিছু তো ছিল না ঐ কামারের পারিবারিক ছবিতে যার জন্য সন্দেহ হতে পারে। ঐ রকম শীর্ণ সুঠাম পেশিহুল হাতের হাতুড়ি আর আগুনের আঁচে বার্ন্ট সিয়েনা রঙের ঘর্মাক্ত মুখ তো ওরা আগেও দেখেছে—পেছন থেকে একথা সে নিজেই বলেছিল।

তবুও পরদিন নতুন টিম তৈরি হলো। অন্য চারজন নতুন, সঙ্গে তাদের সেই দুটো স্নিফার ডগ, যারা এবার আরও বড় প্রেক্ষাপটে সাজিয়ে দেখবে ব্যাপারটা। শুধু কামারশালা নয়, একটা ইস্পাত কারখানার রন্ধ্রে রন্ধ্রে খুঁজে দেখা জরুরি, আগুনের হাপরগুলো কারা টেনে যাচ্ছে অবিচল। সেখানেই কোথাও লুকিয়ে রয়েছে সেই মানুষ। উদ্ভ্রান্ত, বিপজ্জনক, একের পর এক নিপুণ দক্ষতায় ভুল করে যাচ্ছে যে, তাকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। সে কি ভয়ঙ্কর কোনো মারণ রোগের বাহক? সে কি আবিষ্কার করতে পারে কোনো অন্তিম বিস্ময়? সে কি ক্রমশ আরও বিপন্ন করে তুলছে সুশীল সমাজকে?

ভীষণ সন্তর্পণে এগোচ্ছে ওরা। ঐ চারজনের স্কোয়াড। স্টিল প্লান্টের জটিল রাস্তার একপাশ দিয়ে আগে আগে ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে সিকিউরিটির জিপ। অজস্র ট্রেন লাইন আর লেভেল ক্রসিং। রেল ইয়ার্ডে সারি সারি মালগাড়ির রেক। আকরিক লোহা, কয়লা, লাইমস্টোন, ম্যাঙ্গানিজ, ডলোমাইট। কাস্ট হাউসের গলিত লোহার স্রোতধারাকে পাশ কাটিয়ে, রোলিং মিলের ধাবমান তপ্ত ধাতু-চাদরের এলাকাগুলোর গা ছুঁয়ে, বিষাক্ত হুইস্লিং স্টিম লাইনগুলো ও কনভেয়রের তলা দিয়ে ওরা এগিয়ে যাচ্ছে। ঘন সালফার বাস্প থেকে বাঁচতে ওদের মুখে বাঁধা গ্যাস-মাস্ক। আর সারা গায়ে চুলে লোমকূপে কুচি কুচি জলীয় বাস্প, ধূলিকণা, ছাই। কোনো এক অলিখিত অটুট বোঝাপড়ায় সারা দিন আগে আগে চলেছে চেনে বাঁধা স্নিফার ডগ দুটো।

দূরে, স্টকইয়ার্ডের শেষ প্রান্তে রাস্তা যেখানে সরু হয়ে এসেছে আর ক্রমশ উচু হয়ে উঠেছে ঘাসের বন, সীমানা সেখানে নির্দিষ্ট করা আছে অ্যাম্বার হলুদ আলোয়। অনেক উচুতে সারি সারি কোল বাঙ্কার, আর ইয়ার্ডে কয়লার পাহাড় থেকে চাপা আগুনের হাল্কা নীল ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ওর পরেই সেই বিশাল নীল জলের লেক, যেখানে এখন বাতাসের বিপরীতে পরিযায়ী পাখিদের ঝাঁকগুলো নেমেছে। যেখানে অজস্র বালিহাঁস, সরালি, হেরন, ইগ্রেট, পোচার্ড। জলপিপি, গাঙচিল, পেলিক্যান, হর্নবিল, পিন্টেইল। স্কোয়াড ক্রমে ওইদিকে এগোলো। ঐ লেকের প্রান্ত থেকে খাড়া পাহাড় উঠে গেছে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বিশাল বিমূর্ত গুহাগুলো, যেখানে চামচিকেদের কলোনি। হ্রদের এক অংশ ঢুকে  গেছে সেই গুহার ভেতরে। জল বয়ে গেছে পাথরের নিচ দিয়ে বহুদূরে নীলাভ অন্ধকারে, গোপনে।

Birds in Gharana wetland


কতদূর যাবে ওরা? খুঁজে পাবে কি তাকে, যাকে ওরা প্রতিদিন খুঁজে চলেছে?


ওইখানে একটা ইনফ্লেটেবল্ নৌকো বাঁধা আছে। তার দুটো দাঁড়। তাকে জলে ভাসিয়ে স্কোয়াডের চারজন তাতে উঠে বসল। দূরে কারখানার শিফট্ ডিউটির হুটারকে এখান থেকে দৈব শঙ্খের মতো মনে হয়। স্টিল প্লান্ট, শরবন আর পরিযায়ী পাখিদের ঝাঁককে পিছনে ফেলে রেখে ঐ তারা শান্ত দাঁড় বেয়ে জল কেটে কেটে এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রমে ঢুকে যাচ্ছে হ্রদের গোপনীয় অংশ দিয়ে গুহার ভেতরের নীলাভ অন্ধকারে।

কতদূর যাবে ওরা? খুঁজে পাবে কি তাকে, যাকে ওরা প্রতিদিন খুঁজে চলেছে? এই বিপুল অন্ধকার জলরাশি পেরিয়ে, পাথরের বাঁকগুলো সমঝে বুঝে, পাহাড়ের অন্য প্রান্তে অন্য কোনও আলোয় একদিন ফের উদয় হবে তাদের, ভাবল সে।

৫.
বাথরুমে শাওয়ার কার্টেন সরিয়ে নিভৃতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আলো জ্বালতে গিয়েই তার মনে পড়ল, দুবার বিল জমা না দেওয়ার জন্যে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন। ক্রমে মোমবাতি জ্বেলে সিগারেট ধরিয়ে, স্বল্পালোকে, আয়নায় আজ কতদিন পর তার নজরে পড়ল নিজেরই চেহারা। রোদে ঘুরে ঘুরে বেশ বাদামি ট্যান্ড হয়েছে তার স্কিন। শাওয়ারের নিচে অনেকক্ষণ স্নান করে, ধুলোবালি লাইমস্টোন আর কয়লার গুঁড়ো সব ধুয়ে ফেলে, নিজেকে অনেক সজীব লাগছে তার।

জীবনের সমূহ অন্ধকারে কোথায় কখন কে কাকে কেন প্রতিদিন খুঁজে বেড়াচ্ছে, পবিত্র আত্মারাই জানেন, ভেবে এই প্রথম শিহরিত হলো সে।

আর তখনই আয়নায়, অবিশ্বাস্য, নিজের বিম্বিত মুখ সহসা লক্ষ করে মনে হলো—রঙ তারও প্রকৃতই গেরুয়া। মাঝবয়সী, দোহারা গড়ন। পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি প্রায়। কালো ক্রু-কাট চুল। চোখ অচঞ্চল, ও  চেহারা প্রকৃতই উদ্ভ্রান্ত। খেয়াল হলো, বাথরুমে ওয়াশ-বেসিনের একপাশে কাচের গ্লাসের ঈষৎ জলে ডোবানো রয়েছে তারও একটা পুরনো পার্কার কলম। যার দীর্ঘ দিনের জমাট রয়্যাল ব্লুর শুকনো নীল রঙ সরু সূক্ষ্ম রেখায় ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে জলে।

bleeding ink pen_blue tint

শংকর লাহিড়ী

জন্ম ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫০, জামশেদপুর। তৎকালীন বিহার, এখন ঝাড়খন্ড।

শিক্ষা : শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়, কলকাতা। রিজিওনাল এঞ্জিনীয়ারিং কলেজ, দুর্গাপুর।

পেশা : পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। জামশেদপুরে টাটা স্টীল ইস্পাতপ্রকল্পে ৩৭-বছর কর্মজীবনের শেষে অবসরজীবনে এখন কলকাতায়।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
শরীরী কবিতা (১৯৯০, কৌরব প্রকাশনী)
মুখার্জী কুসুম (১৯৯৪, কৌরব)
উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ (১৯৯৬, কৌরব)
বন্ধু রুমাল (২০০৪, কৌরব)
কালো কেটলি (নির্বাচিত কবিতা, ২০১২, ৯’য়া দশক প্রকাশনী)
সমুদ্রপৃষ্ঠাগুলো (কবিতাসমগ্র, ২০১৪, কৌরব)

গদ্য—
মোটরহোম (২০০৩, কৌরব)
কোরাল আলোর সিল্যুয়েট (নির্বাচিত গদ্য, ২০১২, কৌরব)

তথ্যচিত্র (রচনা, প্রযোজনা ও পরিচালনা) :

১. ‘রাখা হয়েছে কমলালেবু’
–কবি স্বদেশ সেনের সময়, জীবন ও কাব্যভাবনা নিয়ে ২০১৫ সালে নির্মিত ১২৭ মিনিটের তথ্যচিত্র।

২. দ্বিতীয় ছবি ‘উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ’। কবিতাকে আশ্রয় করে, কবিদের নিয়ে, কবিদের জন্য ২০১৬ সালে নির্মিত ১৩২ মিনিটের তথ্যচিত্র। এতে অংশগ্রহণ করেছেন বাংলা ভাষার নয়জন নবীন ও প্রবীণ কবি, যাঁদের মধ্যে আছেন কবি মণীন্দ্র গুপ্ত, সমীর রায়চৌধুরী ও আলোক সরকার।

ই-মেইল : slahiri4u@gmail.com