হোম গদ্য খরিদ্দার

খরিদ্দার

খরিদ্দার
646
0

এক.
সেই অদ্ভুত লজ্জাজনক সকালটি দেখার পরে আমি আর কোনোদিনও মীরাদের বাড়িতে যাই নি। এই কোনোদিন বলতে তা প্রায় এক মাস হবে। মীরার মায়ের কাছে আমার প্রাপ্য পয়ত্রিশ’শ টাকার মায়াও না-ছেড়ে পারি নি।

ঘটনার ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক।

আমি যখন নতুন একটা মুদি দোকানের মালিক, তখন চণ্ডীদাসের মতো নানা কিসিমের খরিদ্দার আসার সাথে সাথে কোত্থেকে যেন উড়ে এসে জুড়ে বসল মীরা ও মীরার মা। সবার মতো তারাও মাল কিনত—চিনি, ডাল, নুন, চাল সব। প্রতিদিন যা সামগ্রী কিনত তার টাকা পরিশোধ করার সময় দশ-বিশ টাকা হলেও বাকির খাতায় লিখিয়ে রাখত। প্রত্যেক সপ্তাহের রবিবারে তারা বাকি টাকাগুলো ঠিক পরিশোধ করে দিত।

আমি মা ও মেয়ের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ সততা দেখে বিমুগ্ধ হয়েই প্রতিদিন তাদের বাকির পরিমাণ বাড়িয়ে দিতাম। তারা ব্যাগ ভরে ভরে মালপত্তর নিয়ে যেত। যাওয়ার সময় বলেও দিতাম, ‘যা লাগবে আইসো। কোনো সমস্যা নাই।’


কয়েকদিনের মধ্যে মীরা এগুলো বুঝে ঠোঁটের কোনায় বাকা হাসি রেখে চটপট কথা বলত। কখনো কখনো ঠোঁট উল্টিয়ে হয়তো কিছু বোঝাতেও চাইত। তখন এই আমিই মীরার প্রতি নির্লিপ্ত একটি মুখ প্রদর্শন করতাম।


তারা হাসি দিয়ে চলে যেত। কখনো দোকানে আসত মীরা ও তার মা হাসিনা বানু, আবার কখনো মীরা একাই আসত। আমার এই বানু খানু পানু নাম পছন্দ হয় না—তাই একজন দোকানদার হিশেবে দাবি করেই তাকে হাসিনা অ্যান্টি বলে ডাকার অনুমতি নিলাম। এই ডাকে হাসিনা অ্যান্টি’র চেহারাতেও একটা খুশি খুশি ভাব ভাসমান থাকত। মীরাকে ডাকতাম মীরা বলেই।

আমি সবসময় কামনা করতাম, হাসিনা অ্যান্টি না এসে তার মাখনের মতো শাদা-সুন্দরি মেয়ে মীরা আসুক। মীরা এলে কেন যেন আমার ভেতরটা তরতাজা হয়ে উঠত। অন্যরকম অনুভূতি নিয়ে বেচাকেনা করতাম। আমি কি মীরাকে মনে মনে, অল্প অল্প করে পছন্দ করে ফেলি? লক্ষ করি, কয়েকদিনের মধ্যে মীরা এগুলো বুঝে ঠোঁটের কোনায় বাকা হাসি রেখে চটপট কথা বলত। কখনো কখনো ঠোঁট উল্টিয়ে হয়তো কিছু বোঝাতেও চাইত। তখন এই আমিই মীরার প্রতি নির্লিপ্ত একটি মুখ প্রদর্শন করতাম।

সুন্দর সুন্দর দিন যেতে থাকে আমাদের। একজন দোকানদার ও একজন খরিদ্দারের। এভাবে পাঁচ ছ’মাস মাল নগদ-বাকি বিক্রি করার পর, হঠাৎ টানা সপ্তাহ খানেক তারা দোকানে আসা বন্ধ করে দেয়। এতে আমি শরীরের একটি অঙ্গ খসে পড়ার মতোই বিমর্ষ হয়ে পড়ি। সাথে সাথেই মীরাদের হিশাবের খাতা খুলি, হিশেব-নিকেশ করে দেখি—তাদের সর্বমোট বাকি পয়ত্রিশ’শ টাকা। মাথায় তখনই পাওনা টাকা আদায়ের ব্যাপারে যাতনা তৈরি হলো। সেই যাতনা থেকে মীরাদের ব্যাপারে কয়েকটা সাধারণ প্রশ্ন আমার মাথায়ও চলে আসলো।

তারা দুইজন কি কোথাও চলে গেছে? নাকি দুজন একই সাথে অসুস্থ? ভেতরে প্রশ্নের পর প্রশ্ন চলতে থাকল। সেই ধারাবাহিকতায় একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণও হয়ে উঠল। মীরার বাবা কোথায় থাকে? মিরার বাবাকে মনে হয় সব মিলিয়ে দেখেছি মাত্র দুবার। লোকটা কী কাজ করে?

মীরাদের সংসারের সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা দুইটাই আমি দেখেছি। এ সচ্ছলতা আর অসচ্ছলতার বিহিতে কি শুধুমাত্র মীরা আর মীরার মায়েরই দায়িত্ব? পুরুষ মানুষটার এক্ষেত্রে কি কোনো ভূমিকাই নেই? নানারকম প্রশ্নের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে আমার মনে হলো—সবচে ফলদায়ক কাজ হবে সরাসরি মীরাদের বাড়ি পৌঁছে পয়ত্রিশ’শ টাকার তাগাদা দেওয়া—সেই উছিলায় মীরাকে দেখে আসা এবং ওদের সম্পর্কে পরিপূর্ণ খোঁজও নিয়ে আসা।

দুই.
আমার দোকান থেকে প্রায় পৌনে এক কিলো দূরে মীরাদের বাড়ি। একদিন কাক ডাকা সকালে উঠে মীরাদের বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। সেদিন গিয়ে শুধু মীরার মাকে দেখার ভাগ্য হয়েছিল। আমাকে দেখে সে অনেকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। লজ্জামিশ্রিত কণ্ঠে বলল, ‘ভালো আছ বাজান! বসো বসো।’ বলে ঘর থেকে প্লাস্টিক চেয়ার টেনে দিল। আমি না বসে মেজাজ খারাপের ভান করি। হয়তো মীরাকে দেখতে পেলে ভানের মেজাজে এতটা উত্তাপ থাকত না।

—‘কী ব্যাপার হাসিনা অ্যান্টি! টাকা পয়সা দেওয়ার কোনো খোঁজ নাই যে!’

হাসিনা অ্যান্টি আমার কথা কেমন যেন মাটিতে পড়তে দেওয়ার আগেই বলে উঠল, ‘কালই দিয়ে দেবানে, মীরার আব্বা আসুক।’


অনেকদিন পর ওকে দেখে আমার ভেতরে সেই পুরনো ভালো লাগা জেগে উঠল। আমি টাকার কথা আর না তুলে মীরাকে ভালো-মন্দ কথা জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম।


একথা বলতে না বলতে মীরা ঘুম ঘুম চোখে ঘর থেকে বের হয়ে ফাঁকা উঠোনে এসে হাই ছাড়ল। অনেকদিন পর ওকে দেখে আমার ভেতরে সেই পুরনো ভালো লাগা জেগে উঠল। আমি টাকার কথা আর না তুলে মীরাকে ভালো-মন্দ কথা জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম।

এরপর হাসিনা বানু অর্থাৎ মীরার মায়ের কথা মতো টাকা আনতে মীরাদের বাড়িতে আমি দ্বিতীয় দিন যাই, তৃতীয় দিন যাই—কতদিন যে গেলাম তার ঠিক নেই। কিন্তু মীরার মায়ের সে আগামীকাল আর কখনো ফুরায় না। তারপর থেকে ঐ বাড়িতে আমার যাওয়ার ঘ্রাণ পেলে সে আড়ালে চলে যেত এবং আমার অবস্থানের সময়সীমা বেশি মনে হলে সে অন্যের বাড়ি অবস্থান নিত।

আমি মীরার মাকে না পেয়ে তাদের বারান্দার উঁচু সিঁড়িতে খানিকক্ষণ বসে থেকে মীরার সাথে মিষ্টি আলাপে মেতে উঠতাম। মনে মনে আওড়াতাম, আমার এতদূর কষ্ট করে আসা কিছুটা বোধহয় সার্থক হয়েছে। ওদের বাড়ি থেকে চলে আসার সময় যখন দেহে শারীরিক অবসন্নতা বিরাজ করত; তখন আমার খুবই ভাবতে ইচ্ছা করত যে, দুনিয়ার এত খরিদ্দার রেখে কেন মীরাদেরকে বাকি দিতে গেলাম? সেটা কি আমার বড় ভুল ছিল? আমি ভেবে কিছু পেতাম না।

এর ঠিক সপ্তাহ খানেক পরে এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় আধভেজা কাপড়ে মীরা দোকানে এসে বলল, ‘ভাইয়া, ডারবি সিগ্রেট আছে আপনার দোকানে?

আমি মীরাকে সিগারেট চাইতে দেখে খুব অবাক হয়ে বললাম, ‘তুমি সিগারেট দিয়া কী করবা?’

—‘আরে আমি নাকি, আব্বা টানবে।’ বলে হেসে দিল।

আমি দুটো সিগারেট ওর হাতে দিতে দিতে খেয়াল করলাম, আমার দোকানের এগার হাত সামনে রাস্তার ঐপারে যে শুটকো নারকেল গাছটা, তার সাথে একটি চক্রাবক্রা শার্টের লোক হেলান দেওয়া। মীরা সিগারেট হাতে নিয়ে ঐ লোকটার সাথেই বাড়ির পথে হাঁটা দিলো। আমি শুধু দেখেই গেলাম—কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না।

আমি ভাবতে লাগলাম লোকটা আসলে কে? আর কেনই-বা এমন আড়ালে রইল? উদ্ভট একটা চিন্তাও মাথায় খেলে গেল—ঐ লোকটা মীরার হবু বর-টর নয়তো! অতঃপর আমি চিন্তাটাকে ঝেড়ে ফেলারও চেষ্টা করলাম।

মীরার ব্যাপারে আমার ভাবনাগুলো দেখছি তীব্রতর হচ্ছে—কিন্তু কেন হচ্ছে? ও তো স্রেফ আমার একজন বাকির খরিদ্দার। এই ভাবনায় থাকাকালীন সময়ে একদিন মাছ-বাজারে হাঁটতে হাঁটতে দেখি, মাছের আড়তে মীরার আব্বা বড় বড় ধোঁয়া তুলে সিগারেট ফুঁকছে আর তার সাথে সেই বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যার চক্রাবক্রা শার্টঅলা লোকটা খুব ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলছে।

আমি কৌতূহল ভরা চোখে দেখতে থাকি। হঠাৎ করে আমার আরো মনে পড়ে গেল—লোকটাকে আমি দেখেছি বছরখানেক আগে। ছোট আপুর বিয়ের বরযাত্রীতে এসেছিল। হ্যাঁ, ভালোভাবেই মনে আছে—সে এসেছিল এবং সবার পেছনে পেছনে হাঁটছিল। অবশ্য এতটুকুই মনে আছে—তারপর আর মনে নেই। আমার চিন্তাভাবনার পাখাগুলো বড় শব্দ তুলে ওলটপালট ঝাপটা মারতে শুরু করল।

তিন.
পরপর কয়েকদিন আমার মন ভালো যাচ্ছে না। ইদানীং দুইটা টেনশন আমার ভেতরে অবস্থান করতে শুরু করেছে—প্রথমত মীরার মায়ের কাছ থেকে পয়ত্রিশ’শ টাকা আদায়, দ্বিতীয়ত ঐ চক্রাবক্রা শার্টের লোকটাকে চেনা! কৌতূহল দুটি আরো একদিন আমাকে সেখানে টেনে নিয়ে গেল।


ও তো মীরা নয়। মীরার গায়ের জামাটা কোনো জামা নয়; বরং একটি চক্রাবক্রা শার্ট ঝুলে আছে ওর গায়ে। তাহলে কি ও ঐ লোকটাই?


সূর্যের কাঁচা রশ্মি থাকতে থাকতে চলে গেলাম মীরাদের বাড়িতে। মীরা দাঁত মাজছিল। বাড়িতে প্রবেশ করা মাত্রই দেখলাম, মীরা দাঁত মাজতে মাজতে দু’তিন লাফে উঠোন থেকে ঘরের দরজায় নিকট দৌড়ে গেল। অস্ফুট ও আতঙ্কিত স্বরে উচ্চারণ করল, ‘মা, তামিম ভাইয়া আইসে টাকা নিতে।’

মীরার কথা শেষ হতে না হতে তড়াক করে দরজা খুলে গেল। এবং সেই চক্রাবক্রা শার্টের লোকটাকেই দেখলাম খালি গায়ে লুঙ্গি গিট্টু দিতে দিতে বের হয়ে যাচ্ছে। আমি উঠোনে দাঁড়ানো—মীরা দরজার মুখে। অথচ লোকটা কাউকে ভ্রুক্ষেপ না করে হড়হড় করে ঘরের পিছন দিয়ে চলে গেল।

মীরার চোখে গোপন কিছু ফাঁস কিংবা লজ্জার সংমিশ্রণ ছিল, যা আমার দিকে তাকাতে বাধা সৃষ্টি করল। আমি এমন দৃশ্যে ঠিকমত নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পেরে মাথা নিচু করে চলে আসলাম। মীরার মা অন্ধকার ঘরে কী করছিল! এই পরিস্থিতিতে আমি কিভাবে চাইব আমার পাওনা পয়ত্রিশ’শ টাকা? বরং এই পরিস্থিতিটা দেখে আমার কৌতূহল কিছুটা যেন স্বস্তিই পেল।

ঠিক একমাস পরে, একদিন—তখন মীরাদের পয়ত্রিশ’শ টাকার মায়া ছেড়ে আমি স্বাভাবিকভাবে দোকানদারি করছি। এমন এক বিকালে দোকানের সামনে থেকে মীরাকে ধীর পায়ে যেতে দেখলাম। আমি কিছুটা সামনে এগিয়ে মীরার কাছে যেয়ে বললাম, কেমন আছ?

—‘ভালো আছি।’

আমার কথার দায়সারা উত্তর দিয়ে কটমট চোখে তাকাল। মনে হলো, সেই আমার কাছে পয়ত্রিশ’শ টাকা পাবে অথবা আমি অন্য কোনো অপরাধে অপরাধী! বুঝতে পেরেছি, আমাদের দুজনের এই সংলাপটুকুর পেছনে ছিল সেইদিন সকালের ঘটনায় জমে থাকা অনেক প্রশ্ন।

মীরা আমাকে সাইড কেটে চলে যায়। আমি তাকিয়ে থাকি মাথাভর্তি সেই প্রশ্নগুলো নিয়ে। মীরার কিছুদূর গেলে মনে হলো, ও তো মীরা নয়। মীরার গায়ের জামাটা কোনো জামা নয়; বরং একটি চক্রাবক্রা শার্ট ঝুলে আছে ওর গায়ে। তাহলে কি ও ঐ লোকটাই?

আমার ইচ্ছে হয় না আর কাছে গিয়ে দেখে আসতে।

আবু উবায়দাহ তামিম
Abu Ubaidah

আবু উবায়দাহ তামিম

জন্ম ২৯ অাগস্ট ১৯৯৫, মীরেরডাঙ্গা, খানজাহান আলী, খুলনা। সবে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন। কথাসাহিত্যই তাঁর আগ্রহমূল।

ই-মেইল : abuubaidahtamim@gmail.com
আবু উবায়দাহ তামিম
Abu Ubaidah

Latest posts by আবু উবায়দাহ তামিম (see all)