হোম গদ্য কে রয় ভুলে তোমার মোহন রূপে

কে রয় ভুলে তোমার মোহন রূপে

কে রয় ভুলে তোমার মোহন রূপে
1.26K
0

এক.

একটি ব্যক্তিগত অনুষঙ্গ দিয়া আজিকার আলাপ শুরি করি। মাত্র ৫২ বছর বয়সে যেদিন আমার বাবা হঠাৎ করিয়া মারা যান, ঘটনাচক্রে সেদিনের তারিখটিও ছিল আজিকার মতোই ২৯ অাগস্ট। সালটি ১৯৭০। আমার বয়স তখন ১৮। গত শতকের ৭০ সালে পশ্চিমবাংলায় ওই বয়সের খুব অল্প তরুণই দিনের পর দিন নিশ্চিন্তে আপন আস্তানায় থাকিতে পারিতেন। একদল বিপ্লবে ঝাঁপ দিয়া গা-ঢাকা দিতেন। আর একদলকে বিপ্লবের বা প্রতিবিপ্লবের আঁচ হইতে বাঁচাইবার জন্য অভিভাবকরাই এইদিক সেইদিক পাঠাইয়া দিতেন। আমাকেও বাবা-মা হাজার মাইল দূরে এক নিরাপদ জায়গায় পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। ফলে নিজে প্রাণে বাঁচিয়া গেলাম বটে, কিন্তু বাবাকে আর শেষ দেখা দেখিতে পাইলাম না।

সেই বছর আগস্টের শেষ দিন হইতে টানা ১ সপ্তাহের বৃষ্টিতে পথঘাট ডুবিয়া গিয়াছিল। রেললাইনও। কালকা মেইল লিলুয়ার পর সামান্য আগাইয়া থামিয়া গেল। স্যুটকেস ঘাড়ে করিয়া জলে-ডোবা লাইনের ওপর দিয়া ছপ ছপ করিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে হাওড়া আসিলাম। তখনও আমায় কিছু জানানো হয় নাই। বাড়ি পৌঁছাইয়া, মায়ের রঙহীন সাদা শাড়ি দেখিয়া টের পাইলাম, কী ঘটিয়া গিয়াছে।

বাবা আমার বিশেষ বন্ধু ছিলেন। বিবর উপন্যাস অশ্লীল কি না, কিংবা ‘যে যত পড়ে সে তত মূর্খ হয়’ চিনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের এই বাণীতে উদ্বুদ্ধ হইয়া পড়াশুনা ছাড়িয়া আমাদেরও গ্রামে চলিয়া যাওয়া উচিত কিনা, এসব লইয়া তাঁহার সাথে দেদার তর্ক করিতে বাধিত না। পাশাপাশি, সকালে দুপুরে বা রাত্রে নিয়ম করিয়া আকাশবাণীর রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠানগুলি শুনিবার একটি গভীর নেশা ছিল তখন। কিন্তু বাবার চলিয়া যাইবার ধাক্কাটি এতটাই জোরাল ছিল যে, বহুদিন অবধি সেইসব গানের সুর আর আমার কানে আসিয়া পৌঁছায় নাই। ইহারই মধ্যে একদিন, প্রতিবেশীর কোনো বেতারযন্ত্র হইতে ভাসিয়া আসিল—অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দমধুর হাওয়া/ দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী বাওয়া। বাহিরে তাকাইয়া দেখিলাম, খুব ঝলমলে একটি শরৎ আসিয়া গিয়াছে। পরপরই ভাসিয়া আসিল আরও একটি গান—তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে/ জানি না কি মরণ নাচে, নাচে গো ওই চরণমূলে। না, শরতের মোহন রূপে আর কিছুতেই ভুলিয়া থাকিতে পারিলাম না। হয়তো ব্যক্তিগত বেদনারবোধ এতটাই আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল, প্রকৃতির শুশ্রূষাও মর্মে আসিয়া পৌঁছাইল না সেইদিন।

একথা স্বীকার করা ভালো, জীবনের একটা বিরাট অংশ জুড়িয়া, রবীন্দ্রনাথের গানের সুর আমায় এমনভাবে ভাসাইয়া লইয়া যাইত যে তাহার কথার খেই হারাইয়া ফেলিতাম প্রায়ই। নহিলে, অন্তত কিছুটা লায়েক হইবার পর এই প্রশ্ন জাগা উচিত ছিল, শরতের মোহন রূপ সেদিনের সদ্য পিতৃহীন আমার না-পছন্দ হইতেই পারে, কিন্তু ঠাকুর হঠাৎ এমন একটা সওয়াল তুলিলেন কেন! আর মরণের নাচের কথাই বা সে-গানে আসিল কিভাবে?


ব্রিটেনের উপনিবেশ হিশেবে ভারতীয় বাহিনীও যুদ্ধে জড়াইয়া পড়িল। শুরু হইয়া গেল ১ম বিশ্বযুদ্ধ। শান্তিনিকেতনের মন্দিরে উপাসনা শেষে রবীন্দ্রনাথ তাহার পরদিন বলিলেন—‘সমস্ত ইউরোপ জুড়ে আজ এক মহাযুদ্ধের ঝড় ওঠেছে।’


কবিতায় কিভাবে যে কী হয়, তাহা স্বয়ং কবিও টের পান কিনা সন্দেহ, আমাদের মতো আনপড় পাঠক তো দুরস্ত। মাঘ মাসের দুপুরে পদ্মার তীর ধরিয়া পুরা সংসার লইয়া হাঁটিয়া চলিয়াছেন এক মহিলা। চিন্তাক্লিষ্ট ও দুঃখদীর্ণ মুখ তাঁহার। সঙ্গে চলিয়াছে অনেকগুলি বালক। তাহাদের মধ্যে যেটি সবচেয়ে বড়, তাহার মাথায় এক বিপুল বোঝা। পরের ছেলেটিও চলিয়াছে অল্প কিছু হাতে লইয়া। আর দুটি শুধুই হাঁটিতেছে। তাহারা বড়ই ছোট। আর, একেবারে শিশুটিকে কোলে লইয়া চলিয়াছেন মা। কে বলিবে, এই দৃশ্যের বেদনা ও সৌন্দর্য হইতে জন্ম লইল বলাকা’র ২৮নং কবিতার এমন সব অবিনশ্বর পঙ্‌ক্তি—

পাখিরে দিয়েছ গান,        গায় সেই গান,
তার বেশি করে না সে দান।
আমারে দিয়েছ স্বর, আমি তার বেশি করি দান,
আমি গাই গান।

বাতাসেরে করেছ স্বাধীন,
সহজে সে ভৃত্য তব বন্ধনবিহীন।
আমারে দিয়েছ যত বোঝা,
তাই নিয়ে চলি পথে কভু বাঁকা কভু সোজা।
একে একে ফেলে ভার মরণে মরণে
নিয়ে যাই তোমার চরণে
একদিন রিক্তহস্ত সেবায় স্বাধীন;
বন্ধন যা দিলে মোরে করি তারে মুক্তিতে বিলীন।

পদ্মাতীর, ২৪ মাঘ, ১৩২১

তবু, চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনি। আমাদের পাঠকমন কবিতার রসাস্বাদনে ক্ষান্ত না হইয়া, কেবলই তাহার মর্মোদ্ধারের কোশেশ করিয়া যায়। সেই চেষ্টা যে শেষতক সুধাসাগরের তীরে বসিয়া হলাহল পানে গিয়া পৌঁছাইবে না, কে বলিতে পারে!

 

দুই.

পশ্চিমের আবহাওয়ায় দীর্ঘ শীতের পর এপ্রিল মাস হইতেই আনন্দিত বসন্তের সূচনা। এলিয়ট সাহেব তবু যে কেন এপ্রিলকে নিষ্ঠুরতম মাস বলিলেন, তাহা লইয়া সারা দুনিয়ার কবিতাবোদ্ধারা হাজার সন্দর্ভ ফাঁদিয়া বসিয়া আছেন। আমাদের দেশে, বাংলায়, শরৎকাল ক্ষণস্থায়ী হইলেও তাহার একটি স্নিগ্ধ উজ্জ্বল চেহারা রহিয়াছে। দুইটি সুস্পষ্ট ও প্রবল ঋতু, বর্ষা ও শীতের মাঝে সে তাহার ফুরফুরে কৈশোরক মেজাজটি ধূপ ও ছায়ার ভিতর দিয়া, মেঘ ও রৌদ্রের ভিতর দিয়া, দিব্য জানান দিয়া যায়। তাহার অন্তরের সংরাগ হইতে আমাদের প্রাণ ও প্রকৃতিতে কেবলই ছড়াইয়া পড়ে উৎসবের তরঙ্গ। এহেন শরতের দিকে তাকাইয়া ঠাকুর কিনা বলিলেন—জানি না কি মরণ নাচে, নাচে গো ওই চরণমূলে!

১০১ বছর আগে শরৎকালের কিছু আগে হইতেই অবশ্য ইউরোপ জুড়িয়া মরণ নাচিয়া উঠিয়াছিল। জার্মানি ইং ১৯১৪ সালের অাগস্ট মাসের ২ তারিখে রাশিয়া, আর ৩ তারিখে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিল। বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা সংক্রান্ত চুক্তি অগ্রাহ্য করিয়া সে-দেশে ফৌজ ঢুকাইয়া দিল। ৪ অাগস্ট ব্রিটেন পাল্টা যুদ্ধ ঘোষণা করিল জার্মানি-অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে। ব্রিটেনের উপনিবেশ হিশেবে ভারতীয় বাহিনীও যুদ্ধে জড়াইয়া পড়িল। শুরু হইয়া গেল ১ম বিশ্বযুদ্ধ। শান্তিনিকেতনের মন্দিরে উপাসনা শেষে রবীন্দ্রনাথ তাহার পরদিন বলিলেন—‘সমস্ত ইউরোপ জুড়ে আজ এক মহাযুদ্ধের ঝড় উঠেছে। কতদিন ধরে গোপনে গোপনে এই ঝড়ের আয়োজন চলছিল।… কোনো রাজমন্ত্রী কূট-কৌশলজাল বিস্তার করে যে সে আগুন নেভাতে পারবে তা নয়; মার খেতে হবে, মানুষকে মার খেতেই হবে।’ (মা মা হিংসী, ৫ অাগস্ট ১৯১৪, ২০ শ্রাবণ ১৩২১)। ইতোমধ্যে ছোট্ট দেশ বেলজিয়াম দারুণ লড়াই করিয়া ৬ অাগস্ট পর্যন্ত জার্মান ফৌজকে ঠেকাইয়া রাখিল। ইহার ফলে অপ্রস্তুত ফ্রান্স-ব্রিটেনের মিত্রবাহিনী কিছুটা তৈয়ার হওয়ার সময় পাইল। বেলজিয়ামের মতো ছোট দেশের এই প্রতিরোধে ঠাকুর কিছুটা উৎসাহিত বোধ করিয়াছিলেন।

এই সময়কালের মধ্যে গীতিমাল্য’র লেখা শেষ করিয়া কবি হাত দিতে চলিয়াছেন গীতালি-তে। গীতালি’র প্রথম কবিতা ‘দুঃখের বরষায়/ চক্ষের জল যেই নামল’র রচনা সম্ভবত ৩১ শ্রাবণ ১৩২১। শরৎকাল শুরু হইতেই গীতালি’র রচনাস্রোত আসিয়া আছড়াইয়া পড়িল তাঁহার ওপর। হয়তোবা যুদ্ধের অভিঘাতেইগীতালি’র ৩নং কবিতায়, যাহা গানও বটে, লিখিলেন—বাধা দিলে বাধবে লড়াই, মরতে হবে (৪ ভাদ্র/ ২১ অাগস্ট)। পরদিনই লিখিলেন বলাকা’র ১২নং কবিতা—মত্তসাগর পাড়ি দিল গহন রাত্রিকালে। ৯ ভাদ্র (২৬ অাগস্ট) মন্দিরের উপাসনা শেষে ঠাকুর পাঠ করিলেন পাপের মার্জনা প্রবন্ধটি। সেখানে বলিলেন—‘বিশ্বপাপ মার্জনা কর। আজ যে রক্তস্রোত প্রবাহিত হয়েছে, সে যেন ব্যর্থ না হয়। রক্তের বন্যায় যেন পুঞ্জীভূত পাপ ভাসিয়ে নিয়ে যায়।’ আমাদের কবি তখন ভাবিতেছেন এই বিশ্বযুদ্ধ এক নতুন যুদ্ধহীন পৃথিবী লইয়া আসিবে। এদিকে ভারত হইতে এন্তার সৈন্য দুনিয়ার বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাড়ি দেওয়ায়, দেশে ফৌজের সংখ্যা তখন ভালোরকম কম। দেশের বিপ্লবীরা স্বপ্ন দেখিতে লাগিলেন সশস্ত্র অভ্যুত্থানের। ঘটনাচক্রে ওইদিনই (৯ ভাদ্র, ২৬ অাগস্ট) অস্ত্রব্যবসায়ী রডা কোম্পানির আমদানি করা ৫০টি মাউসার পিস্তল আর ৫০হাজার রাউন্ড কার্তুজ লুঠ হইয়া গেল। যাহার পুরাটা পুলিশ উদ্ধার করিতে পারে নাই। দমন-পীড়ন নামিয়া আসিল বাংলার তরুণদের ওপর। দেশের নেতারা অবশ্য যুদ্ধের ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের পাশে। এমনকি কলিকাতায় এক সন্ধ্যায় বাল্মীকি প্রতিভা’র অভিনয় হইতে টিকিট বিক্রি বাবদ টাকা যুদ্ধের ত্রাণ তহবিলে তুলিয়া দেওয়া হইল।

বাহিরের দুনিয়ার এই মৃত্যু-উৎসবের পাশাপাশি, কবির ভিতরেও তখন চলিয়াছে এক কঠোর আত্মদহন ও আত্মশুদ্ধির সাধনা। আলো ও অন্ধকারের দোলাচলের ভিতর দিয়া তাঁহার বেদনাদীর্ণ অভিযাত্রার কিছুটা আঁচ আমরা টের পাইতে পারি গীতালি’র প্রথম কয়েকটি গান বা কবিতার উল্লেখেই—

তারিখ                   রচনা                                           গীতালি নং              গীতবিতান পর্যায়

৬ ভাদ্র        আমি হৃদয়েতে পথ কেটেছি                           ৪                        পূজা : দুঃখ

         ওই আলো যে যায় রে দেখা                            ৫                        পূজা : আশ্বাস

৭ ভাদ্র        ও নিঠুর আরো কি বাণ তোমার তূণে আছে       ৬                        পূজা : দুঃখ

          সুখে আমায় রাখবে কেন                                ৭                         পূজা : দুঃখ

          বলো আমার সনে তোমার কী শত্রুতা           সং ৮  x

৮ ভাদ্র        ওগো আমার প্রাণের ঠাকুর                             ৮                        পূজা : দুঃখ

          আঘাত করে নিলে জিনে                                ৯                        পূজা : দুঃখ

৯ ভাদ্র         ঘুম কেন নেই তোরি চোখে                            ১০                      পূজা : দুঃখ

           আমি যে আর সইতে পারি নে                        ১১                      প্রেম বৈচিত্র্য

           পথ চেয়ে যে কেটে গেল কত দিনে রাতে         ১২                      পূজা : বিরহ

ফর্দ আরও লম্বা না করি। ৪ দিনের ১০টি রচনা হইতেই তাঁহার প্রত্যাশা আর হতাশার চিত্রটি স্পষ্ট হইয়া উঠে। দেখিতেছি, গীতবিতান-এ এই গানগুলির বেশিরভাগ পূজা-দুঃখ পর্যায়ে বিন্যস্ত করিয়াছিলেন ঠাকুর। সেইসময় কবির এই গভীর ও প্রলম্বিত বেদনাযাপন আর সেই তড়িৎ ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করার জন্য নিরন্তর কবিতাপ্রয়াস আমাদের শিহরিত করে। ১৩২১ সালের ৪-৩১ ভাদ্রের ২৮দিনে তাঁহার রচিত কবিতা বা গানের সংখ্যা ৪১।


এইখানেই ঠাকুর দিলেন তাঁহার সেই চমকপ্রদ প্রস্তাব–‘অন্তত একজন হিন্দু ও একজন মুসলমানকে আমরা এই সভার অধিনায়ক করিব—তাঁহাদের নিকটে নিজেকে সম্পূর্ণ অধীন, সম্পূর্ণ নত করিয়া রাখিব; তাঁহাদিগকে কর দান করিব; তাঁহাদের আদেশ পালন করিব; নির্বিচারে তাঁহাদের শাসন মানিয়া চলিব।’


কবিতার ভিতর দিয়াই কবির মন পড়ি আমরা। সেইটাই দস্তুর। তবু অন্য অন্য নথিও কখনও কখনও এ বিষয়ে আমাদের কমবেশি সাহায্য করিতে পারে। ১৩২১ সালের শরৎকালে নিজের ভিতর ঠাকুর ঠিক কেমন লড়াইয়ের মধ্য দিয়া যাইতেছিলেন, তাহা তিনি নিজেই খোলাসা করিয়াছেন পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লিখা সমসাময়িক একটি চিঠিতে। চিঠিটি সম্ভবত আশ্বিন ১৩২১ (২৫ সেপ্টেম্বর ১৯১৪)-এ লিখা। পড়া যাক সেইখান হইতে কিছু অংশ। কিন্তু তাহার আগে কবির স্বাস্থ্য বিষয়ে একটি তথ্য উল্লেখ করা দরকার। ১৩১৬ সাল (মে ১৯০৯) হইতে কবি মাঝে মাঝেই neuralgia নামের একটি অসুখে ভুগিতেন। ইহাতে বাঁদিকের কানে ও মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব হইত। ১৩২১-এ আমাদের আলোচ্য সময়ে, এই ব্যথা আবার খুব বাড়ে এবং ইউনানি ডাক্তারের ওষুধ খাইয়া তাহার উপশমও হয়। কিন্তু ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় কবির একধরনের স্নায়ুবৈকল্য দেখা দেয়। সে এক চরম মানসিক বিপর্যয়—

দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করেছে। মনে হয়েছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না, আমার জীবনটা যেন আগাগোড়া ব্যর্থ; … কাল সন্ধ্যার সময়ে ক্ষণকালের জন্য এই অন্ধকারের ভিতর দিয়ে একটা আলোর আবির্ভাব দেখতে পেয়েছি। আমার বিশ্বাস এইবার থেকে আমি এই ভয়ঙ্কর মোহজাল থেকে নিষ্কৃতি লাভ করে আবার আমার প্রকৃতি ফিরে পাব। … আমি deliberately suicide করতেই বসেছিলুম—জীবনে আমার লেশমাত্র তৃপ্তি ছিল না। যা কিছু স্পর্শ করছিলুম সমস্তই যেন ছুঁড়ে ফেলছিলুম। এ রকম একেবারে উল্টোমানুষ যে কি রকম করে হতে পারে এ আমার একটা নতুন experience—সমস্তই একেবারে দুঃস্বপ্নের ঘনজাল। তোদের ভয় নেই এ আমি ছিন্ন করব—এর ওষুধ আমার অন্তরেই আছে। … মৃত্যুর যে গুহার দিকে নেবে যাচ্ছিলুম তার থেকে আবার আলোকে উঠে আসব কোনো সন্দেহ নেই।

তবে কি, আজ হইতে ১০১ বছর ১ দিন আগে, ২৮ অাগস্ট ১৯১৪ (১১ ভাদ্র ১৩২১), অমনই কোনও দুঃস্বপ্নের ঘনজালে জড়াইয়া যাইতে যাইতে, মৃত্যুগুহার অন্ধকার কোনও ছায়ানৃত্য দেখিতে পাইয়া, তিনি লিখিয়া ফেলিয়াছিলেন গীতালি’র ১৬ নং এই কবিতাটি—

তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে।
জানি না কি মরণ নাচে, নাচে গো ওই চরণমূলে।।
শরৎ-আলোর আঁচল টুটে কিসের ঝলক নেচে উঠে,
ঝড় এনেছে এলোচুলে।।
কাঁপন ধরে বাতাসেতে—
পাকা ধানের তরাস লাগে, শিউরে ওঠে ভরা ক্ষেতে।
জানি গো আজ হাহারবে তোমার পূজা সারা হবে
নিখিল অশ্রু-সাগর-কূলে।।

আবার, সেই ঘনজাল ছিন্ন করিয়া, সেই তামস গুহা হইতে আলোতে উঠিয়া আসার ব্রতে উত্তীর্ণ হইয়া, কী আশ্চর্য, ওই একইদিনে তিনি লিখিয়া ফেলেন আরও ৩টি কবিতা বা গান—

শরৎ আলোর কমল বনে (গীতালি ১৫)
যখন তুমি বাঁধছিলে তার সে যে বিষম ব্যথা (গীতালি ১৭)
আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে (গীতালি ১৮)

তিন.

আগুনের পরশমণির ছোঁয়ায় নিজেকে তো মৃত্যুর গহ্বর হইতে তুলিয়া আনিলেন রবীন্দ্রনাথ। আমাদের জন্য রহিয়া গেল তাঁহার এই গানখানি। এইখানে কিছু আউলাঝাউলা প্রশ্ন আসিয়া আমাদের বিদ্ধ করে। এ-গান কি নিছক কবির আত্মসংকটের এক নির্মম সাক্ষ্য হিশাবে গীতবিতান আর গীতালি’র পাতায় রহিয়া গেল মাত্র? শুধু কি ১ম বিশ্বযুদ্ধের অস্ত্র প্রতিযোগিতার পটে বিপন্ন মানবতার হাহারবে আর অশ্রুপাতে সেদিনের শরতের পূজা সারা হইতে দেখিলেন তিনি? নাকি এ-গান রহিয়া গেল এক মর্মান্তিক সত্যের মতো, আমাদের, বাঙালিদের, আগামী প্রজন্মের জীবনে? প্রশ্নগুলির জবাব খোঁজার জন্য ইতিহাসের কিছু নিষ্ঠুর নির্বিবেক আর রক্তভেজা পাতায় উঁকি মারিতে হইবে আমাদের। আর দেখিতে হইবে, অসহায় কবি কিভাবে বারবার আমাদের শুভবুদ্ধির কাছে মিনতি করিয়া গিয়াছেন, আর বারবারই তাহা ব্যর্থ হইয়াছে।

আসুন, প্রথমে আমরা পিছাইয়া যাই গীতালি’র দিনগুলি হইতে কয়েক বছর আগে। ততদিনে বঙ্গভঙ্গের দাফতরিক ঘোষণা হইয়া গিয়াছে। কলিকাতার হিন্দু বাবুসমাজে তখন তাহা লইয়া বেজায় তোলপাড়। সে আন্দোলনের প্রথম দিনগুলিতে কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কোনও সাড়াশব্দ নাই। তিনি তখন নিভৃতে শান্তিনিকেতনে বা কলিকাতায় বসিয়া খেয়া’র কবিতাগুলি লিখিয়া চলিয়াছেন। এমনকি স্টার থিয়েটারে বিপিনচন্দ্রের ডাকা যে-সভায় তাঁহার সভাপতিত্ব করিবার কথা, সেইখানেও তিনি গরহাজির! তাঁহাকে পহেলা দেখা গেল টাউন হলের একটি সভায়। দিনটি ২৫ অাগস্ট ১৯০৫, বাংলার ১৩১২ সালের ৯ ভাদ্র, অর্থাৎ শরৎকাল। সেইখানে তিনি পড়িয়া শুনাইলেন অবস্থা ও ব্যবস্থা প্রবন্ধটি। বলিলেন যে, রাজার খেয়ালে বাংলা যদি ভাগও হইয়া যায়, ‘হিন্দু ও মুসলমান, শহরবাসী ও পল্লীবাসী, পূর্ব ও পশ্চিম’ সবাইকে ‘সামাজিক সদ্ভাবে আরো দৃঢ়রূপে মিলিত হইতে হইবে।’ কিন্তু মিলন তো বিমূর্ত কিছু নয়, ‘একত্রে মিলিয়া কাজ করিলেই মিলন ঘটে, তাহা ছাড়া যথার্থ মিলনের আর-কোনো উপায় নাই।’ সেই কাজের পরিধি, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, পূর্ত এমনকি বিচারব্যবস্থা অবধি বিস্তৃত। নিজেদের অভাব নিজেদেরই মিটাইতে হইবে। আর তাহা করিতে হইবে সরকার-নিরপেক্ষ এক বিকল্প সামাজিক উদ্যোগ লওয়ার মধ্য দিয়া। তাহার জন্য চাই একটা ‘কর্তৃসভা’। আর এইখানেই ঠাকুর দিলেন তাঁহার সেই চমকপ্রদ প্রস্তাব–‘অন্তত একজন হিন্দু ও একজন মুসলমানকে আমরা এই সভার অধিনায়ক করিব—তাঁহাদের নিকটে নিজেকে সম্পূর্ণ অধীন, সম্পূর্ণ নত করিয়া রাখিব; তাঁহাদিগকে কর দান করিব; তাঁহাদের আদেশ পালন করিব; নির্বিচারে তাঁহাদের শাসন মানিয়া চলিব।’ হোঃ হোঃ, বাঙালি বর্ণহিন্দু জমিদার আর বাবুসমাজ সরকার-নিরপেক্ষ উদ্যোগে সামিল হইবেন, আবার একজন মুসলমানকেও সে-কাজের অধিনায়ক হিশাবে মানিয়া লইবেন! ইহা যে অসম্ভব, ঠাকুরও সেই কথা জানতেন। তাই সাথে সাথেই তিনি বলিলেন –‘আমি জানি, আমার এই প্রস্তাবকে আমাদের বিবেচক ব্যক্তিগণ অসম্ভব বলিয়া উড়াইয়া দিবেন…। কিন্তু…।’ তবু তিনি আশা প্রকাশ করিয়াছিলেন–‘কিন্তু সম্প্রতি নাকি বাংলায় একটা দেশব্যাপী ক্ষোভ জন্মিয়াছে, সেইজন্যই আমি বিরক্তি ও বিদ্রূপ উদ্রেকের আশঙ্কা পরিত্যাগ করিয়া আমার প্রস্তাবটি সকলের সম্মুখে উপস্থিত করিতেছি।’ দেশব্যাপী ক্ষোভ জন্মানোর বাস্তবতার আগে ঐ ‘নাকি’র সংশয়াত্মক ঠেসটুকু আজও আমাদের নজর না-কাড়িয়া পারে না।

ওই শরৎকালেরই আর একটি সভার কথা এবার। তারিখ, ২৩ আশ্বিন। উপলক্ষ, বিজয়া সম্মিলন। স্থান, বাগবাজারের পশুপতিনাথ বসুর বাড়ি। ঠাকুরকে গান গাওয়ানো আর বক্তৃতা দেওয়ানোর জন্য গিরিডি হইতে লইয়া আসা হইয়াছে। আর মাত্র ৭দিন বাদে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হইবে। কবি সেইখানে পড়িলেন বিজয়া-সম্মিলন  নামে এক আবেগপূর্ণ লিখা। তাঁহার মতে, হিন্দুসমাজের এই বিজয়া উৎসব এতদিন নিছক পারিবারিক ও আত্মীয়-বন্ধুদের মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ ছিল। তাই তাহার কোনও সার্বিক সার্থকতা ছিল না—‘বাঙালি জননীর কোলে জন্মগ্রহণ করিয়া যে-কেহ একটি করিয়া বাংলা কথা আবৃত্তি করিতে শিখিয়াছে… সেই আমাদের বন্ধু, সেই আমাদের আপন—এতকাল ইহাই আমরা যথার্থভাবে উপলব্ধি করিতে পারি নাই।’ আজ তাই তিনি নতুন করিয়া ভাবিতে বলিলেন, নতুন ভাষায় ভাবিতে বলিলেন–‘যে চাষি চাষ করিয়া এতক্ষণে ঘরে ফিরিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ কর, শঙ্খমুখরিত দেবালয়ে যে পূজার্থী আগত হইয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ কর, অস্তসূর্যের দিকে মুখ ফিরাইয়া যে মুসলমান নামাজ পড়িয়া ওঠিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ কর। আজ সায়াহ্নে গঙ্গার শাখা-প্রশাখা বাহিয়া ব্রহ্মপুত্রের কূল-উপকূল দিয়া একবার বাংলাদেশের পূর্ব-পশ্চিমে আপন অন্তরের আলিঙ্গন বিস্তার করিয়া দাও।’

তাহারপর গঙ্গার শাখা-প্রশাখা আর ব্রহ্মপুত্রের কূল-উপকূল দিয়ে অনেক জল আর মাঝে মাঝেই কিছু রক্তস্রোতও বহিয়া গিয়াছে। রাজার খেয়ালে বাংলাদেশ একবার ভাগ হইয়া আবার জোড়া লাগিয়াছে। কিন্তু ‘অন্তরের আলিঙ্গন’ বিস্তৃত হয় নাই। বরং ব্যবধান কেবলই দুস্তর হইয়াছে। তাহার কারণগুলি হয়তো অনেকসময়ই রাজনীতি-অর্থনীতির আরও গভীরে। ইহা লইয়া তাঁহার নিবিড় পর্যবেক্ষণগুলি রবীন্দ্রনাথ বারবার পরবর্তী বিভিন্ন রচনায় তুলিয়া ধরিয়াছেন—


পূর্ববাংলার জমিদারির ওপর রাশ আলগা হইয়া যাইবে, এমন ভয় হইতেই নাকি ঠাকুরের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধিতা।


১. আমরা জানি, বাংলাদেশের অনেক স্থানে এক ফরাশে হিন্দু-মুসলমান বসে না—ঘরে মুসলমান আসিলে জাজিমের এক অংশ তুলিয়া দেওয়া হয়, হুঁকার জল ফেলিয়া দেওয়া হয়।—ব্যাধি ও প্রতিকার, শ্রাবণ ১৩১৪।

২. কিছুকাল পূর্বে স্বদেশি অভিযানের দিনে একজন হিন্দু স্বদেশি-প্রচারক এক গ্লাস জল খাইবেন বলিয়া তাঁহার মুসলমান সহযোগীকে দাওয়া হইতে নামিয়া যাইতে বলিতে কিছুমাত্র সংকোচ বোধ করেন নাই।—লোকহিত, ভাদ্র ১৩২১।

৩. অল্পকাল হলো একটা আলোচনা আমি স্বকর্ণে শুনেছি, তার সিদ্ধান্ত এই যে, পরস্পরের মধ্যে পাকা দেওয়ালের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও এক চালের নিচে হিন্দু-মুসলমান আহার করতে পারবে না, এমনকি, সেই আহারে হিন্দু-মুসলমানের নিষিদ্ধ কোনও আহার্য যদি নাও থাকে।—বাতায়নিকের পত্র, আষাঢ় ১৩২৬।

এইসব শতাব্দীবাহিত সামাজিক বর্বরতাগুলি একদিকে বাঙালি মুসলমান ও তথাকথিত অন্ত্যজশ্রেণি, অপরদিকে বর্ণহিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিচ্ছেদের প্রাচীর পাকা করিয়া গাঁথিয়াছিল। সমাজের এই দুর্বলতার দিকে বারবার চোখ ফিরাইতে চাহিয়াছেন ঠাকুর। এই কথাও বলিয়াছেন যে, বাবুসমাজের আপন প্রয়োজনের সময় সেইসব তথাকথিত ম্লেচ্ছ এবং অশুচিদের বন্ধুতা প্রার্থনার কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। নৈবেদ্যর ওপর কাঁঠালি কলা বানাইয়া সামাজিক মণ্ডপে তাঁহাকে সাজাইয়া রাখিতে চাহিলেও, তাঁহার বিবেচনাগুলি বর্ণহিন্দু সমাজপতিদের রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচে কোথায় তলাইয়া গিয়াছে। বরং কখনও কখনও গোঁড়া হিন্দুত্ববাদীরা তাঁর মুণ্ডপাত করিতেও কসুর করে নাই। অন্যদিকে বাংলার মুসলমান সমাজের কেহ কেহ আবার ভাবেন, পূর্ববাংলার জমিদারির ওপর রাশ আলগা হইয়া যাইবে, এমন ভয় হইতেই নাকি ঠাকুরের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধিতা। বেচারা রবীন্দ্রনাথ!

 

চার.

কিন্তু আমরা কি শরৎকালের সেই গানটির মরণের নাচ হইতে অনেক দূরে সরিয়া আসিলাম? তাহা হইলে আসুন, সেই গানের রচনাদিন হইতে ঠিক ৩২ বছর পরে প্রকাশিত একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে আসিয়া পৌঁছাই। ২৮ অাগস্ট ১৯৪৬-এর সেই প্রতিবেদনে দেওয়া হইতেছে কিছু নিস্পৃহ সংখ্যা—মৃত ৪,৪০০, আহত ১৬,০০০ আর গৃহহীন ১০,০০০। এগুলি ১৬-১৯ অাগস্ট-এর মধ্যে কলিকাতা শহরের বুকে ঘটিয়া যাওয়া সেই নৃশংস গৃহযুদ্ধ, যাহা the great Calcutta killing নামে  কুখ্যাত, তাহার খতিয়ান। সেও এক শরৎকালের শুরু! বাংলার ১৩৫৩ সাল। সেই শরতেই, কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রি হইতে শুরু হইল নোয়াখালির বীভৎসতম দাঙ্গা। ১০ অক্টোবর হইতে যাহা চলিল অন্তত সপ্তাহকাল ধরিয়া। হত্যা ধর্ষণ গৃহদাহ ধর্মান্তর করণের ধারাবাহিক নারকীয়তা। মৃতের সংখ্যা ৩০০, গৃহহীন ৩,০০০, সম্পত্তিনাশ কোটি কোটি টাকার। বাংলাদেশের বাহিরে হইলেও ইহার পরেই বিহারের দাঙ্গার উল্লেখ না করিলে অধর্ম হইবে। কারণ সে-দাঙ্গা শুরু হইয়াছিল নোয়াখালি দিবস পালনের নাম করিয়া, অর্থাৎ প্রতিশোধস্পৃহা হইতে। ২৫ অক্টোবর হইতে শুরু হওয়া সেই মৃত্যু-উৎসবের বলি অন্তত ৭,০০০। এই অবধি আসিয়া সমর সেনের কবিতার কয়েকটি লাইন মনে পড়ে—

মৃত্যু হয়তো মিতালি আনে:
ভবলীলা সাঙ্গ হলে সবাই সমান—
বিহারের হিন্দু আর নোয়াখালির মুসলমান
নোয়াখালির হিন্দু আর বিহারের মুসলমান।

জন্মদিনে/ সমর সেন, ১৯৪৬

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠিক কতদূর দেখিতে পাইয়াছিলেন, যখন গীতালি’র সেই ব্যক্তিগত আত্মমন্থনের দিনে, সেই ১ম বিশ্বযুদ্ধের রক্তপাতের দিনে, এক শারদ সকালে লিখিয়া ফেলিয়াছিলেন এই গান–তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে।/ জানি না কি মরণ নাচে, নাচে গো ওই চরণমূলে? সে-গানের চিরকালীন বেদনাটিকে স্পর্শ করিবার জন্য তাহা হইলে বঙ্গভঙ্গ হইতে আমাদের একেবারে বাংলা ভাগে আসিয়া পৌঁছাইতে হয়। ১৩১২ সালে যে-বাঙালি ভদ্রজন একদিন ‘বাংলা মা বাংলা মা’ করিয়া কলিকাতার রাজপথ চোখের জলে ভিজাইয়া দিয়াছিলেন, তাঁহারাই ১৩৫৪-তে আসিয়া মরিয়া জনসভা করিয়া বেড়াইতেছেন বাংলাকে ২ টুকরা করিবার দাবি লইয়া। শেষতক তাঁহাদের দাবিরই জয় হইল। সেই বিজয়-উৎসব দেখিবার জন্য রবীন্দ্রনাথ তখন আর নাই। থাকিলে নিশ্চয়ই গীতবিতান-এর একটি সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করিতেন। আর সেইখান হইতে নির্মোহভাবে বাতিল করিতেন ১৩১২ সালের শরৎকালে গিরিডিতে বসিয়া লিখা বাংলাদেশের হৃদয়-কাঁপানো সেই ২০-২২টি গান। সত্য কথা বলিতে কি, ইতিহাসের গবেষক ছাড়া, বিভাগকামী বাঙালির কাছে সেইসব গানের তো আর কোনও তাৎপর্য রহিল না।

বাংলা ভাগ হইবে। ভাগ হইবে পঞ্জাবও। কিন্তু সীমানা আঁকিবে কে? কোনওদিন যিনি ভারতবর্ষ চোখে দেখেন নাই, বিলাত হইতে উড়াইয়া লইয়া আসা হইল তেমন একজন আইনজীবীকে। তাঁহার নাম র‍্যাডক্লিফ। মাত্র ৭ সপ্তাহ সময় দেওয়া হইল তাঁহাকে। তাহার ভিতরেই তৈয়ার করিতে হইল ব্যবচ্ছেদের মানচিত্র। আজ আমরা কথায় কথায় বলি র‍্যাডক্লিফের ছুরির কথা। যেন দেশভাগের যাবতীয় দায় সেই ইংরাজ আইনজীবীর। বিভাজনের মর্মান্তিক পরিণতি দেখিয়া তিনি কিন্তু তাঁহার কাজের দক্ষিণা হিশাবে প্রাপ্য ৪০,০০০ টাকা, যা তখনকার ৩,০০০ পাউন্ডের সমান, তাহা ফিরত দিয়া দিয়াছিলেন। অনেক পরে, ইং ১৯৬৬ সালে কবি অডেন সেই র‍্যাডক্লিফকে লইয়া একটি কবিতা লিখেন। কবিতাটির নাম Partition। এই সূত্রে কবিতাটির একটি তর্জমা আমরা একবার পড়িয়া লইতে পারি—

ছিলেন অপক্ষপাতী, অন্তত যখন তিনি ডাক পেয়ে পৌঁছালেন এসে
কখনও চোখে না-দেখা এই দেশে
যা তাঁকে দু’ভাগ করে দিতে হবে দুই জনগোষ্ঠীর ভিতরে
যারা আছে তীব্রভাবে নানা গরমিলে, খাদ্যাখাদ্যে, নানাবিধ অমিল ঈশ্বরে।
লন্ডনে তেনারা বলে দিয়েছেন—‘সময় সংক্ষিপ্ত’। ঢের দেরি হয়ে গেছে, আজ আর
কোনও অবকাশ নেই আপসরফা বা যুক্তিপূর্ণ বিতর্কসভার:
এখন বিচ্ছেদই হলো একমাত্র সমাধান।
ভাইসরয় মনে করেন, যদি পড় তাঁর চিঠির বয়ান,
তাঁর সাথে একত্রে তোমাকে যত কম দেখা যায়, ততই মঙ্গল,
তোমার থাকার ব্যবস্থা করেছি তাই আলাদা মহল।
পরামর্শক হিশাবে আমরা দিতে পারি চারজন জজ,
দু’জন হিন্দু ও মুস্লিম দু’জনা, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কিন্তু তোমারই ফরজ।

নির্জন প্রাসাদে বন্দি, বাগানের কোণে কোণে বন্দোবস্ত কড়া
খুনিরা যাতে কাছে ঘেঁষতে না-পারে কিছুতে, রাত্রিদিন পুলিশি প্রহরা
তারই মধ্যে জড়ালেন কাজে, কোটি মানুষের নিয়তি নির্ধারণের ব্রতে।
মান্ধাতার আমলের কিছু মানচিত্র তাঁর হেফাজতে
আর আদমশুমারির হিশাবগুলি যে ভুলে-ভরা তা একরকম নিশ্চিত,
সেসব যাচাই ক’রে দেখার সময় নাই, যেসব এলাকা নিয়ে বিবাদ, বিহিত
করার জন্য সরেজমিনে দেখার সময় নাই। আবহাওয়া ভীতিপ্রদ রকমে গরম
সঙ্গে আমাশার হামলা তাঁকে দৌড় করাচ্ছে বেদম,
তবুও সীমান্তগুলি হলো নির্ধারিত, সাত সপ্তাহের মধ্যে কাজ শেষ
ভালোমন্দ যা হোক কিছুর জন্য টুকরো হলো এক মহাদেশ।

ঠিক পরের দিন ইংল্যান্ড যাত্রা, যেখানে দ্রুতই তিনি মামলার মামুলি
খুঁটিনাটি ভুলেছেন, ভালো আইনজীবীকে তা ভুলতেই হয়। দেবেন না ফিরতি পদধূলি,
তিনি ভীত, যেমনটা বলেছেন ক্লাবে, ফিরলেই হয়তো তাঁকে করা হবে গুলি।

র‍্যাডক্লিফ আসলে পলাইয়া গিয়া, প্রাণে নয়, তাঁহার বিবেকদংশন হইতে বাঁচিলেন। ‘ছিন্ন খঞ্জনার’ মতো এই দেশে ১৩৫৪ সালের (১৯৪৭) শরৎকালটি শুরু হইল হঠাৎ-গজাইয়া-ওঠা আঁকাবাঁকা এক অলীক সীমানার দুই পারে লক্ষ লক্ষ শিকড় উপড়ানো মানুষের আহাজারির ভিতর দিয়া। এইখানেই শেষ নয়। ১৫ অাগস্টের স্বাধীনতার পর কয়েকদিনের উন্মাদনা ও আপাতশান্তির পর, ৩১ অাগস্ট এক শারদীয় রাতে বেলেঘাটার শান্তিশিবিরে গান্ধি স্বয়ং হিন্দু গুণ্ডাদের হাতে আক্রান্ত হইলেন। পরদিন হইতে কলিকাতায় আবার বড় ধরনের দাঙ্গা। ১ সেপ্টেম্বর নিহত ৫০, আহত ৩৭১। প্রতিবাদে গান্ধির আমরণ অনশন শুরু। তবু, ২ সেপ্টেম্বর নিহত ৮, আহত ৭৫। ৪ সেপ্টেম্বর সকাল হইতে অবস্থার উন্নতি হইলে, রাত্রিবেলা অনশন ভাঙিলেন গান্ধি।

ইহারপর আর বলিবার বিশেষ কিছু থাকে না। আমার জীবনে, আমাদের জীবনে, হয়তো কতগুলি তারিখের সমাপতন না-ঘটিলে এই বেদনাগাথাটি রচিত হইত না। কিন্তু মুখের কথা আর ছুঁড়িয়া দেওয়া তির যেমন ফিরানো যায় না, তেমনই ঘটিয়া যাওয়া ঘটনার কালক্রমও বদলানো যায় না। আর তাহারই সূত্র ধরিয়া শরৎকাল আসিলে, অন্তত আমার কেবলই মনে হইতে থাকে—জানি না কি মরণ নাচে, নাচে গো ওই চরণমূলে! মনে হইতে থাকে, কোনো নিখিল অশ্রুসমুদ্রের তটরেখায় দাঁড়াইয়া আরও কত হাহারবের ভিতর দিয়া আমাদের শরতের পূজা সাঙ্গ হইবে, কে জানে?

আপনাদের প্রণাম ও সালাম।
২৯ অাগস্ট ২০১৫


স্বায়ত্তশাসন লাভের অলীক আশায় ১ম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ রাজশক্তিকে সমর্থন যুগাইয়া যে ভারতবর্ষীয়দের বরাতে শেষতক কিছুই জুটে নাই, বরং বিপদ কাটিলে শাসকের তরফে যে আরও ঘোর আক্রমণ নামিয়া আসিয়াছিল, তাহা টের পাইতে ঠাকুরের দেরি হয় নাই। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেতাদের দিক হইতে ওই একইরকম প্রস্তাব উঠিলে, ঠাকুর তাঁহার দ্বিধা গোপন করেন নাই। ৩০ অক্টোবর ১৯৩৯ কবি অমিয় চক্রবর্তীকে লিখা একটি চিঠিতে এই প্রসঙ্গে তাঁহার মন্তব্য—‘যাঁরা আমাদের দেশের রাষ্ট্রনেতা তাঁরা কল্পনা করছেন যুদ্ধে যদি রাজশক্তির সহায়তা করি তাহলে বর লাভ করব। এই যে সহায়তার সম্বন্ধ এটা দর কষাকষির হাটে। এটা আন্তরিক মৈত্রীর নয়, …যুদ্ধের যখন অবসান হবে তখন শক্তির জয় হবে মৈত্রীর নয়। শক্তির পক্ষে কৃতজ্ঞতা একটা বোঝা, …গত যুদ্ধে ভারতবর্ষ তার পরিচয় পেয়েছে। ঠিক যে সময়টাতে হিশাব-নিকাশের অবকাশ এসেছিল ঠিক সেই সময়টাতেই প্রভূত পরিমাণে ঘনিয়ে এল বেত চাবুক জেল জরিমানা গোরাগুর্খা ও প্যুনিটিভ পুলিশ!’
গৌতম চৌধুরী

গৌতম চৌধুরী

জন্ম ১৮ ফাল্গুন ১৩৫৮, ২ মার্চ ১৯৫২, কানপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত। শিক্ষা : উচ্চ মাধ্যমিক। পেশা : লেখালেখি।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
কলম্বাসের জাহাজ [১৯৭৭, উলুখড়, হাওড়া]
হননমেরু [১৯৮০, উলুখড়, হাওড়া]
পৌত্তলিক [১৯৮৩, উলুখড়, হাওড়া]
অমর সার্কাস [১৯৮৯, আপেক্ষিক, হাওড়া]
চক্রব্যূহ [১৯৯১, আপেক্ষিক, হাওড়া]
নদীকথা [১৯৯৭, যুক্তাক্ষর, হাওড়া]
আমি আলো অন্ধকার [১৯৯৯, অফবিট, কলকাতা]
সাঁঝের আটচালা [২০০২, কীর্তিনাশা, কলকাতা]
আধপোড়া ইতিহাস [২০০৪, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া]
অক্ষর শরীরে মহামাত্রা পাব বলে [২০০৬, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া]
নির্বাচিত কবিতা [২০১০, সংবেদ, ঢাকা]
আখেরি তামাশা [২০১৩, ছোঁয়া, কলকাতা]
ঐতরেয় [২০১৩, রূপকথা, ক্যানিং]
উজানি কবিতা [২০১৪, মনফকিরা, কলকাতা]
ধ্যানী ও রঙ্গিলা [২০১৫, চৈতন্য, সিলেট]
কলম্বাসের জাহাজ (২য় সং) [২০১৬, রাবণ, কলকাতা]
বনপর্ব [২০১৬, সংবেদ, ঢাকা]

গদ্য—
গরুররচনা (বৈ-বই বা ই-বুক) [২০১২, www.boierdokan.com]

যৌথ সম্পাদনা—
অভিমান (১৯৭৪-৯০), যুক্তাক্ষর (১৯৯২-৯৬), কীর্তিনাশা (২০০২-০৫)

ই-মেইল : gc16332@gmail.com
গৌতম চৌধুরী