হোম গদ্য কুন্ডেরার অস্তিত্ব পরিক্রমা

কুন্ডেরার অস্তিত্ব পরিক্রমা

কুন্ডেরার অস্তিত্ব পরিক্রমা
813
0

তার দ্য বুক অভ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং উপন্যাসে এক সীমান্তরেখা এঁকেছিলেন কুন্ডেরা, যার সাথে নিজের বোধকে এক সমতলে দেখে আঁতকে উঠেছিলাম এক সময়। অর্থের সীমা থেকে অর্থহীনতায় পৌঁছনোর বিপর্যয়কর উপলব্ধিতে অস্তিত্বকে নিক্ষেপ করা—ঔপন্যাসিক এভাবেই অস্তিত্বের বিভিন্ন তলকে সামনে নিয়ে আসেন। অস্তিত্ব ও এর বিবিধ অবস্থা, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অস্তিত্বের রূপ, স্মৃতি ও বিস্মৃতিকে অস্তিত্বের নিরিখে দেখা, অস্তিত্বকে সময় ও প্রতাপ ভগ্নাংশের বিবিধ বিক্ষেপের মুখে ফেলে দেখা, খণ্ড অস্তিত্বকে নানা পরিস্থিতিতে এর প্রবণতা ও প্রতিক্রিয়াসহ দেখা, এর কবিতা গড়ে তোলা, এর সংগীতকে উপন্যাসের ছাঁচপ্রসারে নির্মাণ এমন নানা প্রয়াস আমরা কুন্ডেরার মাঝে দেখি।

দ্য বুক অভ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং উপন্যাসে মিরেক বলে, ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই হচ্ছে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই। ক্ষমতার নানা বিস্তারের সামনে মানুষ ম্রিয়মাণ হয়, এর প্রতাপ কাঠামোর সামনে নিজের অস্তিত্বকেও ভুলে বসে মানুষ। তার সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিতে উদ্বুদ্ধ হয়, এবং ভেবে নেয় সে কোনো মহতের দ্বারে উপনীত হচ্ছে। দ্য জোক উপন্যাসে আমরা দেখি লুডভিক তার বন্ধু যারোস্লাভকে বোঝাচ্ছিল কেন কমিউনিস্ট শাসন সংস্কৃতিকে নতুন রূপ দেবে। আমরা বুঝতে পারি, প্রতাপ যে সংস্কৃতি উৎপন্ন করে, মঙ্গল উৎপন্ন করে এই বোধ গেঁথে যায় মানুষের মনে কারণ সে প্রতাপকে চিনতে সক্ষম হয় না। এটি এমন এক দশা যা তার নিজের অতীত ও ঐতিহ্যকে ভুলিয়ে দেবার দিকে নিয়ে যায়। মানুষের একাংশ যায় মঙ্গলের আশায় অন্য অংশকে প্রতাপ তার আমলাতান্ত্রিক ও বল প্রয়োগকারী যন্ত্র দিয়ে দমন করে।


ঔপন্যাসিক ইতিহাসবিদ বা নবী নন, তিনি অস্তিত্বের পরিব্রাজক।


প্রতাপ নিজের মতো করে সব কিছু বোঝে, তার নিজের ভাষায়। যেমন দ্য জোক উপন্যাসে ঠাট্টামূলক কয়েকটি কথা লেখার জন্য এর চরিত্র লুডভিককে শাস্তি পেতে হয় শ্রমশিবিরে থাকার ও কাজ করার। যে ঠাট্টা করার জন্য শাস্তি ভোগ করতে হয় লুডভিককে তাতে সমাজতন্ত্র বা এর সেবীদের শাসনের উল্লেখ না থাকলেও কেবল ‘ট্রটস্কি’ শব্দটির উল্লেখ থাকায়—মূলে যার অর্থ পুরুষাঙ্গ, কিন্তু আয়রনী হয়ে এটি রুশ নেতা ট্রটস্কি’র নাম বলে প্রতীয়মান হয়—তাকে তার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়, এর পর আসে শ্রমশিবিরের শৃঙ্খলারূপী অত্যাচারের দিনগুলো, যা প্রতাপেরই যন্ত্রবিশেষ, যা জীবন সম্বন্ধে তার বোধকেই বদলে দেয়। উপন্যাসটিতে দেখা গিয়েছিল লুডভিক ও অন্যরা প্রতাপ-আক্রান্ত এক সমাজে আছে যেখানে প্রতাপ নিজের ওপর দেবত্ব আরোপ করে এবং নিজের ধর্মতত্ত্বও গড়ে তোলে এবং অনুগতগোষ্ঠী গড়ে নেয়। এই নতুন প্রতাপবলয় তার  লঙ্ঘনে শাস্তিও বিধান করে।

ধর্মরাষ্ট্রের মতো সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটায় প্রতাপ, নিজের ধর্ম গড়ে তোলে ও বিচ্যুতিকে শাস্তি দেয়, শিল্পীকে নিয়ন্ত্রণ করে—উপন্যাসটিতে শিল্পী চেনেককে শৃঙ্খলা শিবিরে পাঠানো হয় কিউবিস্ট শিল্প পছন্দ করার দায়ে। প্রতাপ-উৎপন্ন মঙ্গলের সামনে নিজেকে খেলো হতে দিয়েও মোহাবিষ্ট থেকে মানুষ তার অস্তিত্বকে কতটা হেয় করে তার এক ছবি পাই লুডভিকের সহকর্মীদের তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার ঘটনা থেকে, মানুষ কতটা নীচ হতে পারে দেখি আমরা। আমরা দেখি লুডভিককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করার সময় তার বন্ধু ও সহকর্মীরা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তারা লঙ্ঘনকারীকে বহিষ্কার করতে পারে কোনো কিছু না ভেবেই। কাফকা’র দ্য ট্রায়াল উপন্যাসেও দেখি জোসেফ কে. ‘র বিরুদ্ধে অভিযোগ তার পরিচিতরা নির্দ্বিধায় মেনে নেয়।

নিজেকে রূঢ় হাসির পাত্র করে তোলে মানুষ। যেমন লুডভিক করে তোলে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া বন্ধু পাভেলের স্ত্রীকে ভোগ করার মাধ্যমে। কিন্তু তার চেষ্টা যে কত খেলো করে তোলে তাকে একথা বুঝতে পারে যখন সে উপলব্ধি করে, তার বন্ধু পাভেলের কাছে স্ত্রী হেলেনার অন্য পুরুষের ভোগের সামগ্রী হওয়া বরং লুডভিকের বন্ধুটিকে ভারমুক্তই করে। লুডভিকের চেষ্টা তাই আরেকটি হাস্যকর পরিণতি পায়। কুন্ডেরার মতে, ঠাট্টা মানুষকে ট্র্যাজেডির মহত্ব থেকে বঞ্চিত করে।

প্রতাপের এমন আরও কিছু প্রকাশ কুন্ডেরার উপন্যাসে দেখতে পাই চক্র নৃত্যের ছবিগুলোতে। হাত ধরা মানুষগুলো শূন্যে লাফিয়ে উঠছে নাচতে নাচতে—হালকা হয়ে যাচ্ছে সবাই, এক কাতারে এসে ব্যবধান ঘুচে যাচ্ছে ব্যক্তিত্বের, ভাবনার বৈচিত্র্যের, ওজন হারাচ্ছে অস্তিত্ব। এই চক্র আসলে তাদের স্মৃতিহীন করে দেয়া এবং সত্তাকে শৈশবের অপরিণত মানসের দিকে ঠেলে দেয়ার নিমিত্তে সমাজ-ঐকতানের নামে ব্যক্তির অস্তিত্বকে বিলীন করার নামান্তর। বুঝে নিতে পারি আমরা, শিশু সে-ই যার ভাষা গড়ে ওঠে নি, আমাদেরও ভাষাহীন করে প্রতাপ-বলয়, কেবল এক নির্ধারিত মাত্রার বাচনিক বা তর্ক করার মানসিকতাকেই সে জায়গা করে দেয় তার নিজের গ্রহণযোগ্যতার সীমায়, যেখানে একই কথা নানা বাক্যে সবাই বলে চলে, ভাষা অর্থ হারায়। যার ভাষা নেই তার বোধও নেই, সে কেবল ভোগ করে, প্রতিরোধ করে না, কেননা প্রতিরোধ সে শেখে নি। এই বৃন্দ নৃত্য আমরা দ্য জোকদ্য বুক অভ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং কুন্ডেরার এই দু’টি প্রধান উপন্যাসেই দেখি—দ্বিতীয়টিতে একে ‘দেবদূতগণ’ নামের আড়ালে কিছু শিশুপ্রতিম চক্রের রূপে পাই।

প্রতাপ মানুষের অস্তিত্বকে কতখানি বিপন্ন ও পর্যুদস্ত করতে পারে তার আরও কিছু রূপ দেখি যখন এটি অবিশ্বাস তৈরি করে, আতঙ্ক ছড়ায়। যেমন দেখি দ্য বুক অভ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং উপন্যাসে লেখক যখন নিজের জবানিতে বলছেন কী করে তিনি জ্যোতিষচর্চা ধরনের লেখায় সমালোচনা করছিলেন কর্তৃপক্ষের, এবং এরপর যখন রহস্য উন্মোচিত হলো এবং তাকে সহযোগিতা করেছেন এমন এক নারীই বিপদগ্রস্ত হলেন, সেই নারীর স্নায়ু বিপর্যয়ের বিবরণে বিপর্যস্ত অস্তিত্বের এক রূপ দেখি। নারীটি তখন ঘন ঘন বাথরুমে যাচ্ছিলেন পেটের পীড়া বোধ করায়। তার ব্যক্তিগত সামান্য আড়ালও হারিয়ে যাচ্ছিল বারবার। উপন্যাসটির এই অংশটির আরও কিছু গভীরতাও আছে। ওই নারীটিকে ওই মুহূর্তে দেখে লেখকের মনে হলো যেন নিজের ভেতরে তিনি তাড়না অনুভব করছেন তার পুরো সত্তাকে লুটে নিতে, নিজের মাঝে গ্রাস করতে, তার অস্তিত্বের নির্যাস পান করতে, নারীটিকে ধর্ষণ করতে। হিংসার (violence) সৌন্দর্যকে আমাদের সামনে নিয়ে এলেন লেখক। ওই দৃশ্যে নারীটির বিপর্যস্ত আস্তিত্বিক পরিস্থিতি তার ভেতরের বিবমিষাময়তা, ভারহীনতা ও অবিশ্বাসের মুখে অস্তিত্বের রূপায়ন। আবার অন্যদিকে লেখকের মাঝে কাব্যিক সত্যকে আবিষ্কার করার ও উপলব্ধির দরজা খুলে যাবার মুহূর্ত। অস্তিত্ব নিজেকে জাগিয়ে রাখছিল দুজন মানুষের দুই রকম প্রতিক্রিয়ায়।

পূর্বসূরি হেরমান ব্রখকে উল্লেখ করে মিলান কুন্ডেরা বলেছিলেন, এখনো অজানা অস্তিত্বের এমন অংশকে যে উপন্যাস আবিষ্কার করে না তা অনৈতিক। ক্রিশ্চিয়ান স্যামনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজে বলেছিলেন, ‘সব যুগের সব উপন্যাস সত্তার গূঢ় রহস্য নিয়ে ব্যাপৃত থাকে।’ উপন্যাস তার চরিত্র নির্মাণে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয় : ‘সত্তা কী? কী করে সত্তাকে ধরা যাবে?’ অন্যত্র তিনি বলছেন উপন্যাস বাস্তবতাকে নিরীক্ষা করে না, বরং অস্তিত্বকে নিরীক্ষা করে। যা কিছু ঘটে গেছে তার বদলে অস্তিত্বকে তিনি দেখেন মানবিক সম্ভাবনার জগৎ হিশেবে, যা কিছু মানুষের পক্ষে হয়ে ওঠা সম্ভব, যা কিছু তার সক্ষমতার সীমায় আছে। তার মতে ঔপন্যাসিক ইতিহাসবিদ বা নবী নন, তিনি অস্তিত্বের পরিব্রাজক। কুন্ডেরা এই কথাগুলোকে তার উপন্যাস পরিসরে ভাব ও কাঠামো দুই অর্থেই ফলিয়ে তোলেন।


কুন্ডেরার চরিত্রেরা জন্ম নেয় ছবি থেকে, দৃশ্যের অন্তঃশীল সংগীতময়তা থেকে।


সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রে সংগীতকে ব্যবহারের কিছু নতুন প্রবণতা ও মাত্রা লক্ষ করি আমরা—পুরো একটি চলচ্চিত্র আয়তনে ধ্বনিকে জায়গা করে দিয়ে, এর বিবিধ স্তর ও পর্যায়কে বেড়ে উঠতে দিয়ে দর্শকের চেতনায় চলচ্চিত্রটির মূল স্রোতকে জমাট করা ও সংগীত হিশেবে ধ্বনিকে বিশিষ্ট করে তোলা। অন্যদিকে থাকে সংগীতের বেশ মূলধারার প্রবণতাগুলো—স্বরকে বিশিষ্ট করে উপস্থাপন করা, যন্ত্রানুষঙ্গকে পাশে রেখেই, অথবা যন্ত্রানুষঙ্গের ভিন্ন অনুভূতিমালাকে এনে স্বর বা কণ্ঠকে বিশিষ্ট করে তোলা, অথবা ঐকতানিক ও বহুস্বরিক পরিসর গড়ে তোলা যেখানে আবেগ ও মানস প্রক্রিয়ার নানা বিক্ষেপ ও পরিণতি একে অপরকে ছেদ করলে মূল সুর আরও বেশি করে জীবন্ত হয়। কম্পোজিশান তথা শিল্পের স্থাপত্যিক সৌষ্ঠবকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন বলে উপন্যাসে থিম, মোটিফ, ডাইগ্রেশান এবং পলিফনি ও কাউন্টারপয়েন্ট এগুলো নিয়ে কুন্ডেরা ঠিক এমন গভীরতায় কাজ করেন। এমনকি তার বর্ণনাস্বরে এক অনুচ্ছেদ থেকে আরেকটিতে যেতে যে আপাত শিথিল ও আয়েসের আয়তন রচনার প্রবণতা লক্ষ করি তাও পাঠককে সময় ও অনুভবের গভীরতাকে এক করার অবকাশ দিয়ে উপলব্ধিকে গাঢ় করার নিমিত্তে নিয়োজিত। তার নন্দনকে গভীরভাবে পাঠকের চেতনায় অন্তঃশীলের জন্য এগুলো জরুরি তার কাছে। তার ভাষাকে এভাবে বুঝে নেয়া যায়।

তার কিছু থিম : ‘লাইটনেস’, ‘ওয়েইট’, ‘ভার্টিগো’, ‘সৌল’, ‘বডি’, ‘গ্র্যান্ড মার্চ’, ‘স্ট্রেংথ’, ‘উইকনেস’, ‘ফরগেটিং’, ‘কিট্‌ষ’, ‘এঞ্জেল’, ‘ওয়ার্ডস মিসান্ডারস্টুড’। মোটিফ হিশেবে আসে দ্য আনবিয়ারাবল লাইটনেস অভ বিইং এর সাবিনার বৌলার হ্যাট, একই উপন্যাসে বিটোফেনের কোয়ার্টেট ইত্যাদি। তিনি থিমকে এগিয়ে নেয়ার জন্যও মোটিফকে পুনঃপুনঃ উপস্থিত করেন, ঘটনার বাইরে ছদ্ম বিচ্যুতির দ্বারা থিমকেই অবকাশ দেন বেড়ে উঠতে—যেভাবে ফিলার সময় ও ধ্বনি নিয়ে অর্কেস্ট্রার মূল থিমকে প্রধান করে তোলে—বিবিধ গল্পকে সন্নিবেশিত করেন একটি উপন্যাস আয়তনে, নিজের বিশেষ কিছু উপলব্ধি, অভিজ্ঞতা বা ভাবনাকে গল্পগুলোর পাশে লেখকের জবানীতেই নিয়ে আসেন, আর উৎকেন্দ্রিকতা, নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসকে জাগিয়ে তোলেন পরোক্ষ কিন্তু প্রবল বোধ হিশেবে—ধাতুতলে এচিংয়ের ছাপ ফেলে যাওয়ার মতো—এভাবে সাংগীতিক ঐকতানের মতো উপন্যাসের ভাষাকে রূপ দেন। যে জীবনকে আমরা বাঁচি তার বর্তমানকে ধরা যায় না ডায়েরিতে—কুন্ডেরার ভাষ্যে—বরং সেই ভুক্তিগুলো ব্যর্থ হয় অতীতকে, যাকে আমরা স্মৃতি বলে জানি—তার কোনো ছবিকে জাগিয়ে তুলতে। হয়তো তাই কুন্ডেরার চরিত্রেরা জন্ম নেয় ছবি থেকে, দৃশ্যের অন্তঃশীল সংগীতময়তা থেকে।

দ্য আনবিয়ারাবল লাইটনেস অভ বিইং উপন্যাসে প্রধান দুটি চরিত্র টমাস ও টেরেজা যথাক্রমে ভারহীনতা ও ভারকে তাদের জীবনে প্রবলভাবে অনুভব করে। টমাসের প্রচুর নারীসঙ্গ ও যৌন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাওয়া, কিন্তু একই সাথে কোনো নারীর সাথেই তার এক ঘরে স্থির একটি রাত ঘুমানোর ব্যাপারে অনীহাগুলো তার সত্তায় ভারহীনতাকে চালকের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। অন্যদিকে সে ক্ষমতা কেন্দ্রের বিষয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে কাগজে নিবন্ধ লেখে এবং শেষ পর্যন্ত তার নিজের অবস্থানে অনড় থেকে মানবিক গভীরতার প্রতি তার প্রতিশ্রুতিশীলতাকে দেখিয়ে দেয়। চিকিৎসক থেকে অবনমিত সামান্য জানালা পরিষ্কারকর্মী, এরপর সরকারি গোয়েন্দার জেরার পর এবং সরকারি গোয়েন্দাদের ফাঁদে তার স্ত্রী টেরেজার প্রতারিত হওয়ার প্রেক্ষিতে উজ্জ্বল সম্ভাবনাগুলোর মৃত্যুতে কেবল টিকে থাকার জন্য নিজের মেধার অবমূল্যায়ন মেনে নিয়ে আরেক ভারহীনতায় পতিত হয় সে। টেরেজা, অন্যদিকে, ভার-কে প্রবলভাবে অনুভব করে। সে টমাসের জীবনে এক ভরকেন্দ্র হিশেবে আবির্ভূত হয়, সে-ই একমাত্র নারী যার সাথে টমাস এক বিছানায় ঘুমায়—আমরা ভুলতে পারি না প্রথম সঙ্গমের পর জ্বরাক্রান্ত টেরেজা ঘুমের মাঝেও নিজের হাতে টমাসের হাত শিশুর মতো আঁকড়ে থাকে। উপন্যাসে অন্য চরিত্র সাবিনা, যে টমাসকে গভীরভাবে বোঝে, তার সাথে টমাসের শরীরী সম্পর্ক থাকলেও তার সাথে এক ঘরে থাকা বা ঘুমানোর ব্যাপারে টমাস এক মত হয় না। কিন্তু, নিয়তির রূপ হয়ে টেরেজা তার অস্তিত্বের সাথে গেঁথে যায়। হয়তো এই দম্পতি আমাদের দেখিয়ে দেয় সম্পর্কের অমীমাংসিত বাস্তবতাকে।

টেরেজা, টমাস ও সাবিনা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপের প্রশ্ন করে নিজেদের, কিন্তু সবাই নিজেদের সত্তাকেই চিনে নিতে চায়—টেরেজা যখন ভাবে নিজের নাকের দৈর্ঘ্য কিঞ্চিৎ বেশি হলে কী হতো বা তার ছোট আকারের স্তনে বৃন্ত ঘিরে থাকা তুলনামূলক বড় গাঢ় বর্ণের বৃত্তটি যখন তার চোখে পড়ে ও একে পর্নোগ্রাফারের আঁকা মনে হয়; সাবিনা যখন একই বৌলার হ্যাট পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালে তা  টমাস ও ফ্রানৎসের সামনে ভিন্ন অর্থ তৈরি করে, যখন সাবিনার বৌলার হ্যাট একই সাথে তাকে নারীত্ব থেকে বিচ্যুত করে আবার তার পিতৃপুরুষের সাথে একীভূত করে দেয়; টেরেজা যখন নিজের অস্তিত্বে ভালোবাসার জন্য প্রবল কোনো শক্তিকে চালক হিশেবে পেতে চায়, কিন্তু না পেয়ে ‘ভার্টিগো’ বোধ করে যা কিনা টমাসের অবিশ্বস্ততার সামনে তার ‘দুর্বলতা’র প্রকাশ; আবার যখন টেরেজা একজন বার-কর্মী হিশেবে বহু পুরুষের ইঙ্গিতের সামনে রাশ ছেড়ে দেয়ার ইচ্ছে বোধ করে নিজের মাঝে; যখন টমাস ভারহীন থেকেও টেরেজার সাথে, সুখের বিভ্রমের সাথে গেঁথে যায়। এক সময় টেরেজাও ভারহীন হতে চায়, কিন্তু আয়রনীর মতো নিয়তি যেন শোধ নেয় যখন সে ইঞ্জিনিয়ার পরিচয় দাতা এক অচেনা লোকের সাথে শরীরী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে ও বুঝতে পারে সে ফাঁদে পড়েছে। টমাস ও টেরেজার মাঝে মূক দ্যোতক হয়ে থাকে তাদের কুকুর কারেনিন। জীবনের ‘অনন্ত পুনরাবৃত্তি’র স্মারক হয়ে থাকে একটি মাছির ঘূর্ণনের পেছনে কারেনিনের যুক্তিহীন আবর্তন, যেন-বা কক্ষপথে ঘোরা জীবনের রূপ এটি—কোথাও ছেদ নেই, তাই দুঃখও নেই। জীবনে সুখের বিভ্রম ও ওই অনুভূতির প্রবল উপস্থিতির স্মারকও বটে এটি—যে জীবন একটি ‘ফাঁদ’, যা থেকে বেরুবার জন্য বিশ্বের বিশালতাই যথেষ্ট ছিল।


কিট্‌ষকে কুন্ডেরা দেখেন সামূহিক অচেতন থেকে আসা কামজ প্রবণতার মতো, এক অনন্ত সামাজিক কর্তব্যের রূপে : এক শক্তি হিশেবে।


সাবিনাও ভারহীন এক অস্তিত্ব—যে কিট্‌ষ থেকে মুক্ত থাকতে তার দেশ থেকে দূরে চলে যায়। কিট্‌ষ একটি পর্দা যা দিয়ে প্রতাপবলয় ও এর সমর্থকেরা, এবং যারা প্রশ্নকে অপছন্দ করে তারা, যা কিছু অগ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় তার সব ঢেকে রাখে, এবং ওই পর্দায় আলো ফেলে যা কিছু সাধারণ্যে গ্রহণীয় ও মহৎ বলে বিবেচিত তার প্রদর্শনী চলে। রাজনৈতিক অর্জনে বৃন্দ নৃত্য, মহামিছিল, শিশু সাম্রাজ্য, স্বর্গের উত্তেজনাহীন (excitement) এবং সে-কারণেই যান্ত্রিক যৌন আনন্দের প্রতি বিশ্বাস, প্রশ্নহীনতার প্রতি আস্থা, নির্ধারিত কিছু আবেগের প্রকাশ ও নৈর্ব্যক্তিকতার উদ্বর্তনে সমষ্টির উদ্‌যাপন এবং ব্যক্তির মৃত্যু তথা সত্তার অবজ্ঞা—এসবই কিট্‌ষের বিবিধ প্রকাশ। কুন্ডেরা একে সত্তার সাথে নিঃশর্ত চুক্তি বলেন। এই চুক্তির মূলে থাকে যা কিছুকে সমষ্টি ও প্রতাপবলয় বা মহাবয়ানগুলো নিকৃষ্ট, নিন্দনীয়, ঘৃণ্য ও দুর্গন্ধময় বলে মনে করে তার অস্বীকৃতি—যেমন দৈবিক চরিত্রগুলো যে মলত্যাগ করতে পারে একথা স্বীকার করে না এই চুক্তি। এমনকি সাবিনাও এর ফাঁদ এড়াতে পারে না—তার নিজের মনে থাকা ‘ঘর, শান্তি, নীরবতা, সংগতি এবং স্নেহশীল মা ও জ্ঞানী বাবা’, এগুলোই তার কিট্‌ষ। এমনকি, কোনো এক চলচ্চিত্রে এক অকৃতজ্ঞ মেয়ে যখন তার অবহেলিত বাবাকে আলিঙ্গন করে তখন সাবিনা অশ্রু ঝরায়। কিট্‌ষের বিপরীত বিহারও দেখতে পাই কুন্ডেরার বয়ানে—যখন নিউইয়র্কে এক বয়স্ক দম্পতি সাবিনাকে স্নেহে বেঁধে ফেলে, এবং সাবিনা তার সত্তার গহিন থেকে এক অতিনাটকীয় গান শুনতে পায় যা কখনো কখনো সত্তার অসহ ভারহীনতার দিকে পথ খুঁজে নেয়। এই গানকে সাবিনা মিথ্যে বলে চিহ্নিত করতে পারে, আর যখনইকিট্‌ষ মিথ্যের দ্বারা চিহ্নিত হয়, এটি অ-কিট্‌ষ এর প্রেক্ষাপটে চলে যায়, সেক্ষেত্রে এর কর্তৃত্ব লোপ পায় এবং হয়ে ওঠে অন্য যে কোনো মানবিক দুর্বলতার মতো মর্মস্পর্শী।’ কুন্ডেরার উপলব্ধিতে কিট্‌ষকে এড়াবার মতো অতিমানব কেউ নেই, এবং কিট্‌ষ মানবিক অবস্থার অংশীভূত। কিট্‌ষকে কুন্ডেরা দেখেন সামূহিক অচেতন থেকে আসা কামজ প্রবণতার মতো, এক অনন্ত সামাজিক কর্তব্যের রূপে : এক শক্তি হিশেবে। যার ছোঁড়া সাধারণীকরণের পর্দার নিচে ঢাকা পড়ে যাবে বর্তমান, যেন বাস্তব হারিয়ে যায়। যেন আমরা বুঝতে না পারি কোন জীবন আমরা বাঁচলাম।

কিট্‌ষ-এর পর্দা মৃত্যুকে ঢেকে রাখে। টেরেজা যখন স্বপ্নে দেখে যে একটি সুইমিং পুলের চারপাশে একদল উলঙ্গ নারী তাকে ঘিরে ঘুরছে এবং পুলে ভাসতে থাকা লাশগুলোর পাশেই তাকে বাধ্য করছে আনন্দের গান গাইতে, সে তাদের কাউকে কোনো প্রশ্ন করতে পারে না, একটি কথাও বলতে পারে না; তার কাছে একটিই প্রতিক্রিয়া অবশিষ্ট থাকে, তা হলো ওই গানটির পরের স্তবক গাওয়া। যদি সে ওই নারীদের কাউকে কেবল গোপন একটি চোখের ইশারাও দিত তারা তখনই পুলের ওপর একটি ঝুড়িতে দাঁড়ানো পুরুষটিকে (টমাসকে) দেখিয়ে দিত তার দিকে যে তাকে গুলি করে হত্যা করত। অন্যদিকে টমাস কিট্‌ষে্র রাজ্যে এক দানব বলে গণ্য হবে, সাবিনার এই কথা ফলে যায় টমাসের জীবনে যখন সে প্রতাপ বলয়ের রোষে পড়ে।

টমাসকে তার অস্তিত্বের টানে এক ‘Ess muss sein’ বা ‘It must be’ বলে যে পেশায় নিয়োজিত হতে হয়েছিল অর্থাৎ শল্য চিকিৎসা, প্রতাপ বলয়ের কোপ যখন তা থেকে বঞ্চিত করে তাকে, এবং জানালা পরিষ্কারকর্মী হিশেবে তাকে কাজ করতে হয় অর্থাৎ তাকে গুরুত্ব থেকে অবনমিত হতে হয়, তখন এক প্রতিবিস্তার ঘটে তার আপাত স্বাধীনতার—যেনবা এক দীর্ঘ মেয়াদি ছুটিতে প্রবেশ করে সে। নারীসঙ্গের ব্যাপারে তার ‘এপিক’ প্রবণতা নিত্য চরিতার্থ হতে থাকে। তার এই প্রবণতার মাঝে, বিশেষত ভিন্ন ভিন্ন নারীর সাথে তার সঙ্গমেচ্ছার গভীরে, লেখক দেখতে পান প্রতিটি নারীর অজানা আভিব্যক্তিকে আবিষ্কার করে তাদের সত্তার গোপনতম অংশের সন্ধান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে। এটি সঙ্গমের ব্যাপারে কেন ঘটে তার জবাবে লেখক বলেন, কারণ অন্য বহু কিছুই প্রকাশ্য কাজেই আবিষ্কার করার কিছু নেই, কিন্তু ওই মুহূর্তগুলোয় নারীদের অভিব্যক্তি গুলোতে—যা অবশ্যই প্রতি নারীতেই বিশিষ্ট ও অকল্পনীয়—যা সেই নারীর ‘আমি’কে চিহ্নিত করে—প্রবেশাধিকার তাকে প্রবলভাবে টানে। তবে দুই বছর পেরিয়ে তিন বছরে পড়লে এই ছদ্ম ছুটি তাকে ক্লান্ত করে। ভালোবাসা, কর্মস্পৃহা, সহকর্মীদের সঙ্গ ইত্যাদি তার মনে নানা প্রশ্ন নিয়ে হাজির হয়। তার জীবনের সাথে ভার নিয়ে জড়িয়ে যাওয়া টেরেজার প্রতি তার ভালোবাসাকে সে তার অস্তিত্বের চালক প্রশ্ন ‘Ess muss sein’-এর চেয়ে গভীরভাবে অনুভব করে।

নিটশের ‘Eternal return’ তত্ত্ব ও এর ফলস্বরূপ সম্ভাবনা হিশেবে মানব অস্তিত্বের সাথে অসহ্য ভারি দায়িত্বের বিপরীতে একটি সম্ভাবনা হিশেবে মানুষের অস্তিত্বের উজ্জ্বল ভারহীনতাকে দাঁড় করাতে দেখি আমরা। পরের দিকে এই এই ছুটি পর্যায় ও নতুন উপলব্ধিতে পৌঁছনো টমাসের সামনে আরও এক প্রশ্ন নিয়ে আসে—Einmal ist keinmal—যা মাত্র একবার ঘটেছে তা কখনোই নাও ঘটে থাকতে পারত। চেকদের ইতিহাসের কিছু ঘটনা আর ফিরে আসবে না। লেখক ইতিহাসকে বলেন ‘মানব জীবনের মতো হালকা, অসহ রকমের ভারহীন, পালকের মতো হালকা, বাতাসে পাক খাওয়া ধুলোর মতো, আগামীকাল যার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।’ ইতিহাসের ধারাবাহিকতাহীনতা বা এই রকম সন্দেহ পোষণ করা বয়ানগুলোর উপস্থিতি কুন্ডেরার সময়ে আমরা পেয়েছি। তিনি একে অস্তিত্বের সাপেক্ষে দেখেন, যা ঔপন্যাসিকের বিশিষ্ট অন্তর্দৃষ্টির স্মারক। প্রাগ ছেড়ে কোনো এক গ্রামে চলে যাবার ব্যাপারে টেরেজার প্রস্তাবে টমাস সায় দেয়। সেই গ্রামে তাদের ঘর ছোট হলেও প্রিয় কুকুর কারেনিনের ছোটাছুটির পর্যাপ্ত জায়গা থাকবে। আমরা টমাস হার্ডির ধারাবাহিকতা দেখছি কি এখানে? অস্তিত্বের প্রশ্নগুলো এখানে অবশ্যই ভিন্ন, পরিস্থিতি ভিন্ন, উপলব্ধির ধারা স্বতন্ত্র। তার ক্লান্তির সময়ে ভালোবাসা ও তার পাশে টেরেজার উপস্থিতি নিয়ে নানা বিরোধী ও তিক্ত অনুভূতির পর টমাস উপলব্ধি করে ভালোবাসাই আমাদের মুক্তি। ভালোবাসা থাকে ‘Ess muss sein!’ পার হয়ে। ভালোবাসা এবং ‘Ess muss sein!’-এর  অন্য অর্থও দেখতে পায় সে। এক স্বপ্নে দেখা নারীকে খুঁজে বেড়ায় সে, যার নাম সে জানে না, যাকে সে তার অস্তিত্বের অর্ধাংশ বলে বোধ করে, এবং তার ভালোবাসার ‘Ess muss sein!’ বুঝতে পারে। কিন্তু টেরেজার সাথে তার জীবন বাঁধা পড়ে থাকে এবং টেরেজার ভারি অস্তিত্ব তাকে আটকে রাখে। অনেক কিছু থেকে অবনমিত হলেও বিবিধ উপলব্ধির পরিক্রমায় টমাসের সত্তা নতুন জীবন লাভ করে। ‘ভারহীনতা ও ওজন’ এই দুইয়ের নানা মাত্রায় নিজের সত্তাকে দেখে নেয় সে।


স্মৃতি ছাড়া আমরা শূন্যতা,  স্মৃতিহীনতা সত্তাহীনতার নামান্তর।


ভারহীনতার আরেক বিক্ষেপ দেখি দ্য বুক অভ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং উপন্যাসে মূল চরিত্র তামিনার মাঝে। যার জীবন সীমিত হয়ে যায় গত্যন্তরহীন প্রবাসজীবনে এক কাফেতে কফি পরিবেশন করা ও অন্যদের কথার সামনে ধীর ও নীরব শ্রোতার ভূমিকা নেয়াতে। দুনিয়া যখন তাকে ‘দেয়ালের মতো’ ঘিরে ফেলছিল, নিজের আত্মার লনে তখন কেবল তার মৃত স্বামীর স্মৃতিই ‘একা গোলাপ’ হয়ে বিরাজ করছিল। কিন্তু সেই স্মৃতিও ধীরে ফিকে হয়ে আসতে থাকায় নিজের অস্তিত্বে তামিনা বিপন্ন বোধ করে। চেষ্টা করে যায় নিজ দেশ থেকে তার নোটবই এবং তার ও তার স্বামীর মাঝে আদান প্রদান করা চিঠিরগুচ্ছকে। আর নোটবইটিতে ছিল জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ও বিশেষ মুহূর্তে—যেমন তার মায়ের মৃত্যুর পর তাকে তার স্বামীর দেয়া বিশ বা ত্রিশটি ডাকনাম, সে যাদের মনে করতে পারে না। মনে পড়তে পারে, কাফকার উপন্যাসে চরিত্রগুলোর নাম, তারা ‘সারভেয়ার’, ‘কে.’ এইসব। হেরমান ব্রখের দ্য গিল্টলেস এ দেখি চরিত্রকে ডাকা হচ্ছে ‘এ.’ বলে। এরা নামহীন বা নাম হারানো কিছু মানুষ। ব্যক্তি তার নাম হারায় যখন সে আর বিশেষ কেউ নয়, ব্যক্তি হিশেবে তার মৃত্যু ঘটেছে, সে পরিসংখ্যানের বা গবেষণার উপাদান মাত্র, ইতিহাসের চাপে যার অস্তিত্ব বিলীন—দ্য বুক অভ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং উপন্যাসে এরই বিস্তার ঘটান লেখক। নাম কেবল শব্দগুচ্ছ নয়, বরং স্নেহ, পরিচয়, স্মৃতি—যেখানে আমাদের অস্তিত্ব ধরা থাকে। তার স্মৃতিকে সে যা দিতে চায় তা ‘কাব্যময়তা নয়, শরীর’। লেখকের ভাষ্যে তামিনার এ বাসনা সৌন্দর্যের জন্য নয়, জীবনের জন্য। শীর্ণ হয়ে আসতে থাকা অতীতের দিকে তাকিয়ে তামিনা যা দেখতে পায় তাই ধরে রাখে তার পুরো সত্তাকে। কাজেই সেই স্মৃতি ক্ষীণ হয়ে যাওয়া তার সত্তাকেই ক্ষীণ করে দেয়। স্মৃতির ক্রমাগত হারিয়ে যাওয়া এক সামূহিক ফেনোমেনাও বটে—সমাজ থেকে, সংস্কৃতি ও জীবনচর্যা থেকে ‘ধীরতার’ বিলোপে স্মৃতি এমনকি গড়েই ওঠে না আর, কেবল বিস্মরণের মতো ভয়ংকর বিচ্যুতি ছিটকে পড়তে থাকে, অনেকটা যেন ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ এর মতো সব ঝরে পড়তে থাকে—এক সময় আর ঝরে পড়ার অনুভূতিও থাকে না। এই পতনের কোনো ট্র্যাজিক মহত্ত্ব নেই, বিবমিষা আছে। স্মৃতিই কোরক বলে সেখানে ফিরতে চাওয়ার নাম নস্টালজিয়া। স্মৃতি ছাড়া আমরা শূন্যতা, স্মৃতিহীনতা সত্তাহীনতার নামান্তর।

আমরা যখন নিজের চিন্তার দেয়ালে আটকে পড়ি, নিজের বৌদ্ধিক সীমানাকে শেষ বিন্দু জ্ঞান করি তখন একত্রিত হয়েও নিজের গণ্ডিতেই বদ্ধ থাকি, অন্য কারো ভাষা বুঝি না, আমাদের আগ্রহ থাকে নিজের কথাটুকু কেবল বলে যাওয়া, তাই কথা তৈরি হয়, লেখাও তৈরি হয়, আইডিয়া বাড়ে, আওয়াজ বাড়তে থাকে, আর ভাষা হারাতে থাকে। এরই এক রূপ ‘গ্রাফোমেনিয়া’—অদৃশ্য পাঠকগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষায় লিখে চলা। বিশ্বজুড়ে গ্রাফোমেনিয়ার সময়ে ‘সবাই তাদের নিজেদের কথা দিয়ে দিয়ে ঘেরা থাকে, একটা কাঁচের দেয়াল দিয়ে ঘেরা, বাইরের কোনো কন্ঠকে যে দেয়াল ভেতরে আসতে দেয় না।’ মাঝ থেকে নীরবতায় ঠাঁই নেয়া কিছু মুখ হারিয়ে যায়। উপন্যাসে বানাকা চরিত্রটি যখন মন্তব্য করে অন্যকে বুঝবার চেষ্টা এক বিভ্রম মাত্র, তখন সে অন্যকে বোঝার জন্য তার নিজের ইচ্ছের ঘাটতিকে অচেতনভাবেই প্রকাশ করে ফেলে। তামিনা যে পরিপার্শ্বে ছিল তার প্রবাসে সেখানে সবাই তাকে পছন্দ করত কিন্তু কেউই তাকে বুঝত না, কারণ কাউকে বোঝার বিষয়টাই তাদের চেতনায় ছিল না। তামিনা তথাকথিত ‘নির্দোষ আত্মকেন্দ্রিকতা’র শিকার ছিল। তামিনাকে বুঝবার বদলে সবাই নিজেদের আইডিয়া ও বুদ্ধিজীবীতা নিয়ে ব্যস্ত—কেউ শুনছে কিনা বা বুঝছে কিনা তার তোয়াক্কা না করেই।

স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য তার চেষ্টা এবং জীবন থেকে তার বিচ্যুতি—এ দু’য়ের মাঝে নিজের ভারহীনতার বোধ তামিনাকে গ্রাস করে। স্মৃতিকে না হারানোর জন্য তার চেষ্টা তাকে এত বেশি নিমগ্ন রাখে যে সে কোনো কিছুতেই নিজেকে যুক্ত করতে পারে না, এমনকি শরীরী সঙ্গমেও তার বিযুক্তি প্রবল ভাবে বিরাজ করে। আমরা মনে করতে পারি হুগোর সাথে তার সঙ্গম দৃশ্য, যেখানে সে একদমই নিরুদ্যম, বরং একে তার মনে হয় তার জীবনে এর আগে কোনো এক সময়ে ঘটা চেতনানাশক প্রয়োগ করা ছাড়া এক শল্য চিকিৎসার মতো—তার হারানো নোট বই নিয়ে ভেবে সে সময়টা পার করতে চায়। এরপর তামিনাকে আমরা আবিষ্কার করি যেন অনেকটা উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের লর্ড অভ দ্য ফ্লাইয উপন্যাসের অসুর শিশুর জগতের মতো এক শিশু সাম্রাজ্যে, যদিও এখানে মাত্রা ও চেতনা স্বতন্ত্র, যেখানে তার ব্যক্তিগত আড়ালের কোনো স্থান থাকে না, যেমন কাফকার উপন্যাসে চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত আড়াল থাকে না। তার যৌন চেতনার রূপান্তর ঘটে শিশুদের দ্বারা, সে তার শরীরে আত্মার উপস্থিতি ছাড়া আনন্দ বোধ করে, এমন বিস্মৃতির নিগড়ে সে এক পর্যায়ে শিশুদের দ্বারা নিয়মিত যৌন নিপীড়নের শিকারও হয়।

ভারহীনতা তামিনার ক্ষেত্রে চরমে পৌঁছে এবং ভয়ংকর হয়ে ওঠে—রূপ নেয় ভারহীনতার ওজনে, এবং তামিনার সলিল সমাধি ঘটে। তামিনার সমাধি জলে কারণ জল হরণ করে, আশ্রয় দেয়, ভাষা কেড়ে নেয়—তার তলদেশে তথা নির্জ্ঞানে, যেখানে আলো পৌঁছে না।

তামিনার মৃত্যু ‘গ্রাফোমেনিয়া’র ভিড়ে সাহিত্যের, ক্যাকোফনীর নিচে সংগীতের, শত শত শরীরী ক্ষণ-পুলকের অশ্লীলতার কাছে ব্যক্তির ধীর ও উদ্দীপক প্রেমের ও কামনার সৌন্দর্যের, শ্লোগানধর্মীতার নিচে মৃদু স্বরের, চিৎকারের পীড়নে কথার, বিস্মৃতির নিচে স্মৃতির। এটি নীরবতা নয় স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। এই মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে, সেই দ্বীপে যেখানে তামিনার মৃত্যু ঘটে, থাকে তথাকথিত দেবদূতদের অট্টহাসি। এই উপন্যাসের সপ্তম অংশে দেখি অপদেবতার হাসি যা সবকিছুকে ধোয়ায় পরিণত করে, অর্থাৎ বিলীন করে।

নীরবতার অনির্বচন সৌন্দর্য গড়ে ওঠার বদলে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য কেটে ফেলা হয়েছে কন্ঠ তথা প্রকাশ, চিন্তা, বোধ ও ভাষাকেঅন্য বয়ান, ইতিহাস, সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দেবার জন্য—এমন সব বিকৃতি আমরা তামিনা ও তার দেশের নানা ক্ষেত্রে ঘটতে দেখি। যেখানে লেখকের বাবা শব্দ তথা প্রকাশকে হারিয়ে ফেলতে থাকেন তরুণ পুত্রের জিজ্ঞাসার কাছে—সংস্কৃতির জনপ্রিয়করণের ধ্বংসকাণ্ডের এক রূপ এটি, যখন অগুনতি মেধাবীদের নিস্তব্ধ করে দেয় প্রতাপবলয়, শিশুতন্ত্রের উদ্‌যাপনের দিকে তথা বিবেকহীনের সাম্রাজ্যের দিকে এগোয় সবাই, অস্তিত্ব ক্ষীণ হয়ে আসে বহু জীবনের, তখন তামিনার মতো মানবীর মুখে নিস্তব্ধতার ‘সোনালি আংটি’ ভীষণ হয়ে দেখা দেয়।

এমন সব দমনের প্রতিক্রিয়ায় ভাষাহীনেরও প্রতিশোধ থাকে। স্মৃতি হারানো ব্যক্তি এক মূক প্রতিরোধ গড়ে তোলে, লেখক যাকে দেখান ‘লিটস্ট’ এর রূপে। প্রবলের ক্রোধকে উন্মত্ততার পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে, প্রয়োজনে নিজের মৃত্যু দিয়ে হলেও তাকে অমানুষিকতার সীমায় ঠেলে দিয়ে ভাষাহীনেরা তাদের জবাব দেয়।


কুন্ডেরার ভাষায় ‘হিউমার’ এমন এক জগৎ যেখানে নৈতিকতা অকার্যকর


স্মৃতি ও বিস্মৃতির পরিক্রমার মাঝে ব্যক্তির অস্তিত্ব ‘সীমানা’ বলে এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। এটি স্মৃতি ও বিস্মৃতির সীমা, অর্থময়তা ও অর্থহীনতার, গুরুভার ও লঘুতার, নৈরাজ্য ও স্থীরতার সীমা। যার থেকে আমাদের দূরত্ব অতি অল্প। দ্য বুক অভ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং উপন্যাসকে এর দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায় দেশ ছেড়ে আসা চরিত্র যান এর বোধ থেকে, যখন সে দেশের প্রতি তার ও অন্যদের টানকে ও দেশের জন্য তাদের জীবন দেয়াকে এক মোহের জন্য অযথা জীবনপাত করা বলে বোধ করে। সে বস্তুত এক অধিবাদী সীমানাকে ছুঁয়ে ফেলে যা অতিক্রম করলেই সবকিছু তাদের অর্থ হারায়। হয়তো হিউমারের অবকাশও তৈরি হয় এখানেই। যেমন ওই একই উপন্যাসে দেখি এক দাফন অনুষ্ঠানে একটি কালো টুপি বাতাসে এদিক-ওদিক গড়িয়ে শেষে কবরে পড়ে গিয়ে কী করে পুরো পরিস্থিতির গুরুত্বকে খেলো করে দেয়। এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিকে ধরেন কুন্ডেরা এখানে। গুরুভারের বিপরীতে হিউমারের উপস্থিতি। কুন্ডেরার ভাষায় ‘হিউমার’ এমন এক জগৎ যেখানে নৈতিকতা অকার্যকর—অর্থহীনতার হাস্যকর প্রকাশ দেখলাম আমরা এখানে, যেন অস্তিত্ব নিজেকে কিছুটা স্বস্তি দিল অর্থহীনতার ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতার সামনে। তামিনার মৃত্যু ঘটে অর্থহীনতা ও ভারহীনতায়। উৎকেন্দ্রিকতার কূল ঘেঁষা, সন্ত্রাস জাগানিয়া এক বাস্তব এটি। অস্তিত্বের অর্থ হারানোর নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস আমাদের গ্রাস করে এই উপলব্ধির সামনে।

তলস্তয়ের জিজ্ঞাসা সত্তার ‘আমি’র কাছে। প্রুস্তের কাছে মানুষের অন্তর্বিশ্ব গড়ে তোলে এক অলৌকিককে, এক অন্তবিহীনতাকে যার বিস্ময় কখনই থামে না। বিপরীতে, কাফকা দেখতে চান বহির্জগতের শক্তিগুলোর সামনে তাদের আতিশয্যের কারণে মানুষের অন্তর্গত আবেগগুলো গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে তখন মানুষের কোনো সম্ভাবনা অবশিষ্ট থাকে কিনা। কাম্যু দেখতে পেয়েছিলেন মানুষের সারশূন্যতার বোধের মাঝেও নিবিড় এক বিদ্রোহীর উপস্থিতি, যে সূর্য বা প্রতাপের সামনে বিস্ফোরণ ঘটায়। অন্যদিকে কুন্ডেরা টের পান বিশ্বের সাথে যেহেতু মানুষ বাঁধা থাকে ‘শামুকের সাথে তার খোলসের’ মতো, কাজেই বিশ্ব বদলালে মানুষের অস্তিত্বও বদলাবে। তার উপলব্ধিতে খুঁজে পাই বিবিধ সুন্দর, আবার তাদের হারানোর শমিত হাহাকার, প্রকৃতির প্রভুর আসন থেকে মানুষের পতন এবং প্রযুক্তি, রাজনীতি ও ইতিহাসের—যারা প্রতাপবলয় ও মহাবয়ানের ভিন্ন রূপ—বশীভূত হওয়া : যার পরবর্তী পর্যায় হলো গ্রহণকাল এবং সত্তাকে বিস্মৃত হওয়া; ঈশ্বরহীন বিশ্বে যখন এমনকি মানুষও আর ইতিহাস ও প্রকৃতির প্রভু নয় তখন সত্তার অর্থহীনতা এবং ভারহীনতার সন্ত্রাস, বহির্জগৎ ও প্রতাপবলয়ের প্রবল ভয়ংকর উপস্থিতি ও এর সামনে মানুষের সত্তার নানা বিক্ষেপ ও সম্ভাবনাসমূহ, সত্তার পরিচয় ও এর প্রকৃতির অনিশ্চয়তা। তার উপন্যাসে একই সাথে অন্তঃশীল স্রোতের মতো মানুষের তথা সত্তার অন্তর্দেশের গূঢ় সুরগুলো বিরাজ করে, এবং আমাদের ধ্যানী দৃষ্টির প্রতীক্ষায় থাকে।


গ্রন্থপঞ্জি :

  1. Susan Sontag: Forward—‘Ferdydurke’ by Witold Gombrowicz;
  2. Testaments Betrayed: Milan Kundera;
  3. The Art of the Novel: Milan Kundera;
  4. Encounter: Milan Kundera;
  5. The Curtain: Milan Kundera;
  6. The Book of Laughter and Forgetting: Milan Kundera;
  7. The Joke: Milan Kundera;
  8. The Unbearable Lightness of Being: Milan Kundera;
  9. Laughable Loves: Milan Kundera;
  10. Life is Elsewhere: Milan Kundera;
  11. Slowness: Milan Kundera;
  12. Ignorance: Milan Kundera.

­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­

তানভীর মাহমুদ

তানভীর মাহমুদ

জন্ম ৯ অক্টোবর, ১৯৮০, ঢাকা। ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এমবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অপরাধতত্ত্ব ও বিচার-এ এমএসএস।
পেশা : চাকরি।

প্রকাশিত বই : প্রতিবিহার (কবিতা)

ই-মেইল : editor.hansadhani@gmail.com
তানভীর মাহমুদ