হোম গদ্য কুকুর ও কবর

কুকুর ও কবর

কুকুর ও কবর
362
0

১.
প্রথম কোপটা মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই শুক্কুর দারুণ চমকে ওঠে, এবং দ্বিতীয় কোপের জন্য কোদালটা উপরে তুলতে গিয়েই টের পায় যে, তা অসম্ভব ভারী হয়ে উঠেছে, ফলে সে পরবর্তী কোপের জন্য তা যথাযথ পরিমাণ উপরে তোলার প্রয়োজনীয় শক্তি হারায়, এবং হঠাৎ করেই বিমূঢ় ও স্থবির হয়ে পড়ে, আর কোদালটা উপরে তোলার পরিবর্তে নিচের দিকে নামিয়ে রেখে ধুপ করে বসে পড়ে মাটিতে!


আজীবন অন্যের বাড়িতে গতর খাটতে খাটতেই কোনো না কোনো মৃত অথবা জীবিত মহাজনের স্বেচ্ছায় কিংবা জোরপূর্বক গছিয়ে দেওয়া উপহারস্বরূপ পৃথিবীতে এনেছিল তাকে…


বেলা যে খুব বেড়েছে তা নয়। যে সময় গ্রামের বাচ্চারা ময়লা জামা-কাপড় আর ছেঁড়া-ফাটা বই নিয়ে বিলের মধ্যে দিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে স্কুলে যায়, আর সে ক্ষেতে কাজ করার সময় ঘাড় ফিরিয়ে মুগ্ধ চোখে তাদের দেখতে দেখতে ফিরে যেত শৈশবে, যখন সে নিজেও কয়েক বছর ওভাবে স্কুলে গেছে নিয়মিত। সেইসব স্মৃতি এভাবে মনে পড়লে নিজের জন্য একটু মায়া তৈরি হতে না হতেই ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমগাছে ঝুলে থাকা বীভৎসভাবে বেরিয়ে আসা জিভসহ মৃত মায়ের মুখটা, যে কিনা আজীবন অন্যের বাড়িতে গতর খাটতে খাটতেই কোনো না কোনো মৃত অথবা জীবিত মহাজনের স্বেচ্ছায় কিংবা জোরপূর্বক গছিয়ে দেওয়া উপহারস্বরূপ পৃথিবীতে এনেছিল তাকে, আর পরবর্তী বছরগুলোতে অন্যের দেওয়া এই অন্যায্য উপহারের তীব্র গ্লানি সহ্য করতে না পেরে ঝুলেছিল আম গাছে!

অন্তত, যতদূর মনে করতে পারে, মায়ের ঝুলে পড়ার আগের দিনও সে গিয়েছিল স্কুলে। প্রতিবারই হুট-হাট করে স্মরণে আসা এই নির্মম স্মৃতি ওকে ভয়ানক অস্থির করে তোলে, আর মায়ের ঝুলে থাকা শরীরটি মনে পড়লে আরও একটি কথা মনে পড়ে যায় অনাবশ্যকভাবে। গোপালভোগের যে আম গাছটিতে মা ঝুলেছিল, সেই গাছটি ছিল ওর খুব পছন্দের, কেননা এই গাছে সে কেবল অসংখ্যবার চড়েই নি শুধু, বরং কতশতবার যে চুরি করে আম পেড়েছে, হিশেব নেই। অথচ সেই প্রিয় গাছটিই, যা থেকে সে আম চুরি করত, চিরদিনের জন্য চুরি করে নিয়ে গেল ওর মাকে, ব্যাপারটি এভাবেই আশৈশব ধরা দিয়েছে ওর কাছে, ফলে সে আর কখনোই গাছটির কাছে আসে নি ভুল করেও, অথচ আজ এত বছর পর সে নিজেই ফিরে এসেছে সেই আম গাছটির নিচে, অজগর মিয়ার কবর খোঁড়ার জন্য, যার বাড়িতে ওর মা জীবনের সবচেয়ে বেশি সময় গতর খেটেছে।

সকালে ঘুম ভাঙে অজগর মিয়ার চাকরের ডাকে। সে-ই মৃত্যুর খবরটা দেয়, আর জানায়, অজগর মিয়ার বড় ছেলে তাকে বলেছে জলদি যেতে, কবর খুঁড়তে হবে, আর খোঁড়া হলেই নগদ ৩০০ টাকা পাবে। প্রথমত সে বুঝতে পারে নি যে, সাধারণ কামলা খাটা অথবা মাটি কাটার সাথে কবর খোঁড়ার কোনো পার্থক্য থাকতে পারে, ফলে চাকরটি বেরিয়ে যাবার সাথে সাথেই কয়েক গ্লাস পানি খেয়ে গামছা আর কোদালটা নিয়ে রওনা দিয়েছিল খালি গায়েই। ওর মাথায় তখন কবর খোঁড়া অথবা কাজ কোনোটাই ছিল না, কেবলমাত্র একটি শব্দ ছাড়া, যা ওকে প্রায় নেশাগ্রস্তের মতো আচ্ছন্ন করে রেখেছিল—‘৩০০ টাকা’; কেননা গত একমাস কাজ-কর্ম নেই বললেই চলে, যে টুকটাক কাজ পেয়েছে তাতে তিন বেলা চাল ফুটিয়ে খাওয়া তো দূরে থাক, এক বেলার প্রয়োজনীয় চাল কিনতেও পারে নি ঠিকভাবে, ফলে গত একমাস তাকে প্রায় প্রতিদিনই না খেয়ে থাকতে হয়েছে, আর রোজ ক্ষুধার জ্বালায় বারবার আল্লার দরবারে নিজের মৃত্যু কামনা করেছে!

কেবল গতকালটি ছিল ওর কাছে হঠাৎ স্বর্গে পৌঁছে যাবার মতো তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বাল্যবন্ধু ওসমান প্রায় জোর করেই ওকে নিয়ে যায় তাড়ির ভাটিতে, আর ফ্রিতে তিন গ্লাস তাড়ি ও কয়েক টুকরো হাঁসের মাংস খাওয়ালে সে অনেকক্ষণ ওসমানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে! যদিও ততক্ষণে ওসমান টাল, এবং একই সাথে মাতলামো ও অকথ্য ভাষায় খিস্তি শুরু করেছে, অথচ সে ওসমানের সেই ভারসাম্যহীন মুখের দিকে তাকিয়ে অমন পরিস্থিতিতেও ভাবতে সক্ষম হয়েছিল ওকে পৃথিবীর মহোত্তম মানুষ হিশেবে, আর বাড়িতে পৌঁছে দেবার সময় ওর মাতাল শরীর প্রায় নিজের শরীর বয়ে আনতে আনতে এও মনে করেছিল, পৃথিবীতে কেবলমাত্র নবী-রাসূলরাই পেরেছে এতটা মহৎ হতে। ওর এই ভাবনার কারণ ছিল খুবই স্বাভাবিক, কারণ গত এক মাসে ঐ তিন গ্লাস তাড়ি আর কয়েকটি ঝাল মাংসের টুকরো ওর কাছে ছিল মানুষের চিরকাঙ্ক্ষিত বেহেশতি নেয়ামতের মতো ব্যাপার, যা তাকে কৃতজ্ঞ করে তুলেছিল আপ্রাণ!

২.
শুক্কুর মাটিতে বসে থাকে, কেন না কোদালের কোপ দেওয়ার সাথে সাথেই তার মনে হয়েছে, সে নিতান্তই মাটি কাটছে না, বরং কবর খুঁড়ছে, যেখানে একজন মৃত মানুষকে দাফন করা হবে, যা তাকে চরমভাবে হতবিহ্বল ও ভীত করে তুলেছিল! ব্যাপারটা অনেকটাই মাংসের দোকান থেকে মাংস কিনে খাওয়া আর নিজেই কোনো পশুকে হত্যা করে তার মাংস খাওয়ার মতো হয়ে ধরা দিয়েছিল ওর কাছে। এদিকে গতকালের মাংসের টুকরোগুলো সন্ধ্যার পরপরই হজম হয়ে গিয়েছিল, আর বাকি রাত ক্ষুধার জ্বালায় এপাশ-ওপাশ করতে গিয়ে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সমস্ত সুস্বাদু খাবারই হজম হয়ে যায় দ্রুত, আর সেজন্যই বোধ হয় সেগুলো এত সুস্বাদু ও লোভনীয়। মাস চারেক আগে বরকতউল্লার মেয়ের বিয়েতে খেতে গিয়ে এই ভয়েই সে এত খেয়েছিল যে, তিন তিনটি দল খেয়ে উঠে গেলেও সে তখনও বসে খাচ্ছিল দেখে লোকজন জোর করে তুলে ওকে বিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়! খুব কষ্ট হয়েছিল ওর, জোর করে বের করে দেবার জন্য নয়, বরং অত সুস্বাদু ও লোভনীয় খাবারগুলো আরও একটু বেশি খেতে না পারার কারণে, কারণ ওর ধারণা ছিল সন্ধ্যা হবার সাথে সাথেই ভেলকিবাজির মতো সব হজম হয়ে যাবে! হয়েও ছিল, আর সেদিন রাতের মতো গতকাল রাতেও সে একবার খোদার নির্দয়তাকে, যার দরুন তিনি ওকে এমন একটা রাক্ষস পেট দিয়েছেন, যে কিনা সমস্ত ভালো খাবারই হজম করে ফেলে নিমিষেই; আরেকবার নিজের পেটকে, যে চরম অভাবেও ভালো খাবারগুলো জমিয়ে রাখবার মতো ন্যূনতম ধৈর্য ধারণ করতে সক্ষম হয় না কোনোভাবেই, অভিসম্পাত ও তীব্র ভর্ৎসনা করে!

এমন একটি অসহায় রাতের পর সকালের মৃত্যু সংবাদটি ওর কাছে ছিল আশীর্বাদের মতো, এবং কোনো কিছু না ভেবেই আচ্ছন্ন হয়ে ছুটেছিল তিন তিনখানা নোটের লোভে, অথচ প্রথম কোপ দেবার পরই বুঝতে পারে, জীবনে প্রথমবারের মতো সে এমন একটি কাজ শুরু করেছে, যার সাথে পরিচয় ঘটে নি আগে। এদিকে বাসি পেটে খাওয়া পানিগুলো পেটের মধ্যে মোচড় দেয়, এদিক-ওদিক আছড়ে পড়ে, যার শব্দ সে স্পষ্ট শোনে। অল্প অল্প ব্যথা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে যায়, আর সে সম্ভাব্য কবরের পাশে বসে ক্ষুধার তীব্রতার কথা ভেবে অস্থির হয়ে ওঠে, যা তাকে একই সাথে ৩০০ টাকার জন্য ভয়ানক লোভী ও মৃত্যু তথা কবর বিষয়ক চিন্তায় ভীত করে তোলে! সে উঠে দাঁড়ায় এবং গোপালভোগের আম গাছটির দিকে মাথা তুলে দীর্ঘ দৃষ্টি মেলে তাকায়, তারপর নিজেকে করুণা ছুঁড়ে দিয়ে কোদাল তুলে নিয়ে জড়তা ছাড়াই মাটির বুকে চালাতে শুরু করে, এবং একটি লাশ, যা কিনা মৃত, শীঘ্রই দাফন করতে হবে, নইলে দুর্গন্ধ ছড়াবে, এমন ভাবতে ভাবতে সেই লাশের মুখের সাথে নিজের মুখের মিল খুঁজে পেলে কোদাল চালানোর গতি বাড়িয়ে তোলে, আর যন্ত্রের মতো একটানা ওর পিঠ ওঠা-নামা করতে করতে একটু একটু করে ক্রমশ মাটির নিচে নেমে যেতে থাকে!

কতক্ষণ সে ওভাবে করব খোঁড়ে জানে না, হুশ ফেরে অজগর মিয়ার মেজ ছেলের চিল্লানিতে, ‘শুক্কুর, কতদূর হলো, জলদি কর, জহুরের ওয়াক্তে জানাযা হবে’। শুক্কুর থামে, এবং লক্ষ করে প্রায় কোমর সমান মাটির নিচে সে দাঁড়িয়ে। সে হচকচিয়ে যায়, ধড়ফড় করে নিজেরই খোঁড়া কবর থেকে উপরে উঠে আসে! নিশ্বাস ঘন ও গাঢ় হয়! গা গুলিয়ে ওঠে, আর কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস বুক ভরে টেনে নিতে নিতে সদ্য খোঁড়া কবরটির দিকে ফিরে তাকায়। হয়তো সে নিশ্চিত হতে চেষ্টা করে যে, কবরটি তারই খোঁড়া, যা সে স্বপ্নে নয় বাস্তবে খুঁড়েছে, এবং সেখানে তাকে নয় অজগর মিয়াকে দাফন করা হবে। পেটের মধ্যে এবার সে প্রচণ্ড মোচড় ও ব্যথা অনুভব করে, আর তীব্র ক্ষুধা দ্রুত তাকে জাপটে ধরে! যন্ত্রণায় ওর চোখে পানি চলে আসে, দারুণ অসহায় বোধ করে, এবং তৃষ্ণায় এক গ্লাস পানির জন্য মৃতের বাড়ির দিকে মুখ তুলে তাকায়! অনেক লোকজন দেখতে পায়, কিন্তু সেখান থেকে না কেউ পানি নিয়ে আসে, না খাবার। মৃতের বাড়িতে দাফনের পূর্বে খাবারের আয়োজন গর্হিত, ব্যাপারটি সে মেনে নিতে পারে না কিছুতেই, কেননা প্রথম যে কথাটি ওর মনে হয়, তা হলো, জানাযায় যারা আসবে, কিংবা যারা লাশ কাঁধে বয়ে নিয়ে যাবে, তারা সবাই নিশ্চয় ওর মতো ক্ষুধার্ত কিংবা খালি পেটে আসবে না। অনেকেই হয়তো আসবে দুপুরের খাবার খেয়েই, অথচ  সে গতকাল রাত থেকে না খেয়ে আছে, আর কেবলমাত্র ক্ষুধার কারণেই কবর খোঁড়ার নিয়ম-কানুন না জেনেই শুধুমাত্র ৩০০ টাকার লোভে ডাকা মাত্রই ছুটে এসেছে। প্রথমে সে ভেবেছিল ব্যাপারটি খুব সহজ, এবং মাটির উপর একের পর এক কোপ দিয়ে এক মানুষ মতো লম্বা আকারের নাভি অথবা বুক সমান গর্ত করা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু, যখন সে কবর খোঁড়া শুরু করে, প্রথম কোপ দেওয়ার সাথে সাথেই সাধরণ মাটি খোঁড়া আর মৃতের জন্য কবর খোঁড়ার মধ্যে মূল পার্থক্যটা ধরতে পারে, যেখানে একটি ক্রিয়ার সামনে কেউ বসে না থাকলেও, অপরটির সামনে কোথাও যেন স্বয়ং খোদা অলক্ষ্যে বসে আছেন, এমন বোধ প্রতি মুহূর্ত কাজ করতে থাকে, যা একই সাথে মানুষকে ভীত ও দুর্বল করে তোলে।


পেচ্ছাবের প্রচণ্ড বেগ থেকে এমন সহসা মুক্তি যেন তাকে রমণকালীন কিংবা বীর্য স্খলনের মতো সুখ দিতে থাকে, ফলে সে অনেকটা সময় নিয়ে পেচ্ছাব করে, আর চোখ বন্ধ করে নিবিষ্ট মনে তা উপভোগ করে।


৩.
শুক্কুর তার ভীত ভাবনার মাঝেও ৩০০ টাকার কথা স্মরণ করতে সক্ষম হয়, আর সমস্ত মনোবল জড়ো করে পুনরায় নেমে পড়ে কবরে। হয়তো খেয়াল ছিল না, কিন্তু, কিছুক্ষণ খোঁড়ার পরই শরীরে চাপ অনুভব করে। সে টের পায় তার পেচ্ছাব পেয়েছে। প্রায় কোমর সমান হয়ে আসা গর্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে নতুন করে অসহায়তা অনুভব করে, আর পেচ্ছাব করার তাগিদ তীব্রতর হতে থাকলে নতুন এক ভয় তাকে এমনভাবে জাপটে ধরে যে, তার মনে হতে থাকে তারই খুঁড়তে থাকা কবর তাকে যে কোনো মুহূর্তে দুইপাশ থেকে চেপে ধরবে, এবং কখনোই সে আর উঠতে পারবে না সেখান থেকে। কবর তাকে আজ জীবন্ত গ্রাস করবে!

এমন ভয় মূলত আর কিছুই নয়, বরং নাপাক শরীরে কবরের মতো একটি পবিত্র স্থানে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে। সকাল বেলা পানি খেয়ে বেরুবার আগে বাড়ির পাশে কলাগাছের ঝোপে সে পেচ্ছাব করেছিল, আর বরাবরের মতোই কয়েক ফোঁটা মুত কাপড়েও লেগেছিল। তাছাড়া সকাল সকাল এমন একটি প্রস্তাব পেয়ে উত্তেজনায় কাজটি সে দ্রুতই সেরেছিল, আর কোদাল হাতে বেরিয়ে আসার পর পথে মূত্রনালিতে জমে থাকা পেচ্ছাবের আরও কিছু ফোঁটা যে চুইয়ে চুইয়ে লুঙ্গিতে লাগে নি, এই ব্যাপারে সে নিশ্চিত হতে পারে না, ফলে নিজেরই খুঁড়তে থাকা তাজা কবরে দাঁড়িয়ে ঘটনাটি মনে পড়ায় নিজেকে ওর সত্যিকার অর্থেই নাপাক ও অপরাধী মনে হলো, আর শুধুমাত্র ৩০০ টাকার লোভে এমন একটি গর্হিত কাজ করার জন্য আল্লাহ পাকের গজব ও অলৌকিক শাস্তি-ভীতি তাকে এতটাই ভীত ও বিহ্বল করে তুলল যে, তার মনে হলো সে পা নাড়াতে পারছে না, এবং আল্লাহ পাক হয়তো তাকে সত্যি সত্যিই শাস্তি দেওয়া শুরু করেছেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই কবর তাকে জীবন্ত গ্রাস করতে যাচ্ছে!

সে প্রায় কেঁদেই ফেলে, এবং কেবলমাত্র ‘তওবা’, ‘তওবা’ শব্দ উচ্চারণ করতে করতে কবর থেকে উঠে পড়ার চেষ্টায় মরিয়া হয়! একবার পড়েও যায়, কিন্তু, শেষ অব্দি সে কবর থেকে উঠতে সক্ষম হলে দীর্ঘ এক নিশ্বাস বুক থেকে যেমন দ্রুত বেরিয়ে যায়, তেমন-ই টের পায় পেচ্ছাব প্রায় মূত্রনালির মুখের কাছে চলে এসেছে, এবং যে কোনো মুহূর্তে তা ছিটকে বেরিয়ে পড়তে পারে। সে আর কিছুই ভাবতে সক্ষম হয় না, এবং ডান হাত দিয়ে যৌনাঙ্গের মাথা টিপে ধরে দৌড় শুরু করে, আর কিছু দূর গিয়ে জংলা মতো দেখে লুঙ্গি তুলে ধরে বসে পড়ে। হাত সরিয়ে নেবার সাথে সাথেই উষ্ণ তরল ছিটকে বেরিয়ে আসে, আর সে এতটাই আরাম বোধ করে যে, কিছুক্ষণ পূর্বের নাপাক বোধ অথবা শাস্তি ভীতি কোনোটাই স্মরণ রাখতে সক্ষম হয় না, এবং পেচ্ছাবের প্রচণ্ড বেগ থেকে এমন সহসা মুক্তি যেন তাকে রমণকালীন কিংবা বীর্য স্খলনের মতো সুখ দিতে থাকে, ফলে সে অনেকটা সময় নিয়ে পেচ্ছাব করে, আর চোখ বন্ধ করে নিবিষ্ট মনে তা উপভোগ করে।

কিন্তু, ব্যাপারটি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না! অন্যায্য সঙ্গমের পর পুরুষ যেমন অপরাধবোধে ভোগে, সে নিজেও তেমন একটি অপরাধবোধের সামনে সহসাই ফিরে এসে পূর্বের ভীতি ফিরে পেতে সক্ষম হয়, যা তাকে এইভাবে ভাবিয়ে তোলে, ভুলবশত সকালের নাপাক ব্যাপারটি আল্লাহ পাক হয়তো মাফ করে দিলেও দিতে পারেন, কিন্তু, নাপাক জানার পরও পুনরায় নাপাক হবার কিংবা অধিকতর নাপাক অবস্থায় কবর খোঁড়ার মতো পাপ কিছুতেই তিনি ক্ষমা করবেন না, ফলে সে পেচ্ছাব করা থেকে উঠে দাঁড়ানোর পরিবর্তে ওভাবেই ঝোপের কাছে বসে থাকে। হয়তো প্রচণ্ড খিদে আর একটানা শারীরিক পরিশ্রম ওর স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনাকে গ্রাস করেছিল, নতুবা সে অনেকবার গ্রামের মুরুব্বিদের দেখেছে লুঙ্গি উঁচু করে বাম হাত ভেতরে ঢুকিয়ে এদিক-ওদিক হাঁটা-হাটি করতে, জোরে জোরে কাশি দিতে, যা তার অমন মুহূর্তে সহসাই মনে পড়ে যাবার কথা।

শেষ অব্দি অনেকটাই অকস্মাৎ ব্যাপারটি তার স্মরণে আসে, এবং খানিকটা আশ্বস্ত হয়ে আশে-পাশে তাকায়। কোনো শুকনা ঢিলাই তার চোখে পড়ে না, বরং কবরের খোঁড়া মাটির ছিটকে আসা দু’একটি ভেজা দলা এদিক-ওদিক পড়ে থাকতে দেখে। অবশেষে বাধ্য হয়ে সে ভেজা মাটির দলাই তুলে নিয়ে লুঙ্গির নিচে ঢোকায়, কিন্তু, বেশিক্ষণ হাঁটা-হাটি বা কাশাকাশি করতে পারে না, তার আগেই কী যেন মনে পড়ায় যৌনাঙ্গের মুখে ধরে রাখা মাটির ঢিলাটি ছুঁড়ে ফেলে দেয় দূরে, আর পরক্ষণেই আরেকটি ভুলের অনুতাপ তাকে নতুন করে গ্রাস করে। সব কিছুই যেন আজ তাকে নির্মম পরিহাসে অতিষ্ঠ ও জর্জরিত করে তুলেছে, ফলে সে ফিরে এসে কবরের পাশে বসে থাকে, আর বেলা বেড়ে মাথার উপরে এসে ওকে স্মরণ করিয়ে দেয়, জোহরের ওয়াক্ত হয়ে এসেছে।

সে সত্যি সত্যিই নিজের এমন অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়, এবং মোনাজাতের ভঙ্গিতে দু’হাত উপরে তুলে কী যেন বিড়বিড় করতে করতে নেমে পড়ে কবরে। দুপুরের রোদ সবসময়ই ক্ষুধা-তৃষ্ণার প্রকোপ বাড়িয়ে তোলে, ওর বেলাতেও ব্যতিক্রম হলো না, ফলে সে পেটের মধ্যে তীব্র ব্যথা নিয়েই মাটি খুঁড়তে থাকল, আর মাঝে মধ্যেই তীব্র ক্রোধ ও ক্ষোভে অস্পষ্টভাবে সম্ভাব্য সবাইকেই এমন তাজা কবরে জ্যান্ত পুঁতে ফেলার প্রতিজ্ঞা করতে থাকল!

কবর খুড়তে আর অল্প বাকি ছিল। সে নিচু অবস্থান থেকে মাথা তুলে চারিদিক দেখার সময় লক্ষ করল যে, কোমরের একটু বেশি চলে এসেছে মাটির নিচে, এবং আর একটু হলেই কবর খোঁড়া সম্পন্ন হবে। প্রায় সমাপ্ত হয়ে কাজটি তাকে সুখকর সম্ভাবনার আশায় ৩০০ টাকার জন্য অতিশয় লোভী করে তুলল, কেননা ওকে বলা হয়েছিল, খোঁড়া শেষ হলেই টাকাটা দিয়ে দেওয়া হবে। কোনো রকম পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই জীবনের প্রথম খোঁড়া কবরটির দিকে সে ফিরে ফিরে তাকায়, এবং একটি নির্ভুল কবরের সঠিক গভীরতা কিংবা দৈর্ঘ্য-প্রস্থ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান না থাকায় কিছুটা সন্দিহান হয়ে পড়ে, আর ভুলভাবে কবর খোঁড়ার অভিযোগে নিজেকে অভিযুক্ত করে। ওর এই অভিযোগ ওকে চরম অস্বস্তির দিকে ঠেলে দিলেও, পরক্ষণেই দৃঢ় বিশ্বাস এভাবে ফিরে পায় যে, এত বড় কবরে অজগর মিয়ার মতো ছোটো-খাটো একটি কেন দু’তিনটে মানুষ অনায়াসেই এঁটে যাবে। হারানো বিশ্বাস শুধুমাত্র আকার দিয়ে ফিরে পাবার পরও ওর মনে নতুন শঙ্কার উদয় হয়, যা কিনা কবরের দিক সম্পর্কিত। সেই সকাল থেকে কবর খুঁড়ছে, অথচ সে এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারবে না আসলে সে কোন দিকে খবর খোঁড়া শুরু করেছিল। হয়তো দ্রুত এসে কাজটি শুরু করার ফলে দিক সম্পর্কিত ব্যাপারটি ওর মাথায় আসে নি, ফলে সে নিতান্তই মাটি খোঁড়ার মতো বোধ থেকে কবর খোঁড়া শুরু করেছিল, আর সেজন্য এখন তার অনুশোচনা হয়, এবং সেই সাথে নতুন এই সংশয় থেকে দ্রুত মুক্তির জন্য দিক নির্ধারণে ব্যস্তও হয়, এবং সামান্য বাঁকা ছাড়া সে যে উত্তর-দক্ষিণ বরাবরই কবর খুঁড়েছে তা দেখে প্রথমবারের মতো হাসে, আর এই আনন্দ ও খুশিতে কিছুক্ষণের জন্য হলেও সে ক্ষুধার কষ্ট ভুলে যায়, এবং অসংখ্যবার খোদার দরবারে শুকরিয়া জানাতে জানাতে বাকি কররটুকু ঠিকঠাক খুঁড়তে খুঁড়তে ৩০০ টাকার স্বপ্নে বিভোর হয়।


ওসমানের টানে বুকের মধ্যে পড়ার সময় জান্নাত আরার কাপড় যেমন একদিকে সরে গিয়ে ব্লাউজহীন বুক বেরিয়ে যায়, তেমন সম্পূর্ণ মাতাল এক জোড়া হাত ওর শরীরে যথেচ্ছভাবে মাতলামো শুরু করলে শুক্কুর উত্তেজিত হয়ে পড়ে…


গত একমাসের অমানবিক কষ্ট হতে সে শীঘ্রই মুক্তি পেতে চলেছে—এই আশা ও গতকাল সন্ধ্যার অভূতপূর্ব স্মৃতি তাকে লোভাতুর করে তোলে প্রবল। ওর এই লোভকে অধিক বাড়িয়ে তোলে কাফিরুদ্দিনের বৌ জান্নাত আরা। মনে পড়ে যায়, গতকাল তাড়ির কলসিটা এগিয়ে দিতে আসলে কিভাবে হ্যাঁচকা টানে তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়েছিল ওসমান। পাশে বসে শুক্কুর এই দৃশ্য এতটাই কাছ থেকে দেখেছিল যে, ওর মনে হয়েছিল কোনো সিনেমার নায়ক-নায়িকার বাস্তবিক ঢলাঢলি দেখছে সে, আর ওসমানের টানে বুকের মধ্যে পড়ার সময় জান্নাত আরার কাপড় যেমন একদিকে সরে গিয়ে ব্লাউজহীন বুক বেরিয়ে যায়, তেমন সম্পূর্ণ মাতাল এক জোড়া হাত ওর শরীরে যথেচ্ছভাবে মাতলামো শুরু করলে শুক্কুর উত্তেজিত হয়ে পড়ে, এবং ফ্রি তিন গ্লাস তাড়ির শেষ গ্লাসটি ঢক ঢক করে গলা দিয়ে নামিয়ে দেয়। জান্নাত আরা ওসমানকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে কপট রাগ দেখিয়ে মুচকি হেসে পেছন ফিরে চলে যায়, আর সে আরও কয়েক টুকরো ঝাল মাংস ও প্রস্থানরত জান্নাত আরাকে একইভাবে দাঁতের নিচে, মুখের ভেতর চরমভাবে কামনা করে, যেখানে জান্নাত আরার নগ্ন বুক আর ভারী নিতম্বের মায়াবী ঝলক ওকে ওসমানের দিকে প্রবল ঈর্ষা নিয়ে তাকাতে উসকে দেয়। সে সমানভাবে ঈর্ষান্বিত ও লোভী হয়, আর মুখের ভেতর জমে ওঠা মাংসের ঝাল লালা জিভ দিয়ে তৃপ্তি সহকারে চটাস চটাস করে চাটে, এবং মাড়ি অথবা দাঁতের ফাঁক-ফোকরে লেগে থাকা অবশিষ্ট ঝাল স্বাদ কিংবা আটকে থাকা মাংসের টুকরো বা আঁশ খুব যত্ন সহকারে করে জিভ দিয়ে নাড়ে, ভেতরের দিকে টেনে নেয়, যেনবা জান্নাত আরা ওভাবে চলে গিয়ে পনুরায় ফিরে এসে সবার অলক্ষ্যে সরাসরি ওর মুখের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। শুক্কুর তাড়ি ও মাংসের এই প্রবল নেশা ধ্যানীর মতো চোখ বন্ধ করে উপভোগ করতে থাকে, আর পৃথিবীর সমস্ত যন্ত্রণা, কষ্ট সে ভুলে যেতে সক্ষম হয়, বহুদিন পর।

গতকালের সেইসব ঘটনা লোভনীয় ও আকর্ষণীয় স্মৃতির মতো ওর কাছে ফিরে ফিরে আসে। কবর খুঁড়তে খুঁড়তে সবগুলো এক এক করে মনে করে সফলও হয়। আর বারবার ঝাল মাংসের টুকরো, ফেনা ওঠা তাড়ির গ্লাস ও জান্নাত আরার হাস্যরত মুখ, না মুখ নয় শুধু, লোভাতুর সব কিছুই মনে করে। ফলে ওর উত্তেজনা বাড়ে, এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই পেতে যাওয়া নগদ অর্থের আশা ও এইসব স্মৃতিচারিত লোভ কবর খোঁড়ার গতি আরো বাড়িয়ে তোলে, আনমনেই।

৪.
অবশেষে ওর খবর খোঁড়া শেষ হয়, এবং চাকরটিকে গিয়ে বললে ভেতরে বাড়ি থেকে কয়েক জন এসে দেখে জানায়, ঠিক আছে, আর কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যিই ওকে তিনখানা নগদ ১০০ টাকার নোট ধরিয়ে দেওয়া হয়। বাড়িয়ে ধরা টাকাটি নিতে গিয়ে সে কাঁপে, একটু যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, কিন্তু, শেষ পর্যন্ত যখন সে টাকাটা হাতে নেয়, তখন শরীর থেকে বিশাল একটি ভার যেন মুহূর্তেই নেমে যায়। সে আনন্দ প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়, এবং পারলে তখনই ছুটে গিয়ে কোনো হোটেলে বসে যতক্ষণ পারা যায় ততক্ষণ পেট ভর্তি করে খাওয়া শুরু করে, অথচ হয় না, কেননা টাকা দেওয়ার পর চাকারটি জানায়, অজগর মিয়ার বড় ছেলে নাকি তাকে জানাযা পড়ে যেতে বলেছে, আর খাটলিটাও জলদি করে ধুতে বলেছে। কথাটি শোনার পর ওর অস্বস্তি লাগে! সে মেনে নিতে পারে না এই বাড়তি কাজটুকু, কিন্তু না-ও করতে পারে না, শুধু বোবার মতো চুপচাপ চাকরটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। চাকরটি হয়তো কিছু বুঝতে পারে, কাউকে চিল্লায় বলে এক জগ পানি আনতে, তারপর বলে, ‘কবর খুড়ছ আর লাশ দাফন করবা না মিয়া। আল্লাহ গুনাহ দিব না! তাছাড়া, জানাযায় শরিক হওয়া জরুরি, কারণ অনাত্মীয় বান্দার খাঁটি মনের দোয়া সহজে কবুল হয়, ফলে মুর্দার রুহ শান্তি পায়, গোর-আজাব কম হয়।’

কথাগুলো কাজে দেয়, এবং জানাযায় অংশগ্রহণের জন্য থেকে যেতে নিজেকে রাজি করায়। পানি আসে, তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে আসার ফলে সে তড়িঘড়ি করে জগ হাতে নেয়, এবং মুখের উপরে তুলে ধরেই ঢগঢগ করে গিলে নেয় অর্ধেকরও বেশি পানি, এবং তারপর-ই বুঝতে পারে এই ভর দুপুরে আবারও খালি পেটে পানি খাওয়া উচিত হয় নি তার। কিন্তু, ততক্ষণে তা পেটের ভেতরে চলে গেছে, আর এখন একমাত্র পেচ্ছাবের রাস্তা ছাড়া শরীর থেকে বের করে দেবার কোনো উপায় নেই। পানি খেয়ে নোট তিনখানা সে কোমরের কাছে লুঙ্গির ভাঁজে গুঁজে খাটলি ধুতে চলে যায়। খাটলি ধোয়া শেষ হলে ওর মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে, আর নতুন পানি যেন পেটের ভেতর সকালের পুরোনো পানির সাথে মিশে বিষাক্ত হয়ে তার ক্রিয়া শুরু করে দেয়। সে সহ্য করতে ব্যর্থ হয়, এবং জানাযার জন্য সমবেত হতে থাকা লোকজন থেকে দূরে সরে গিয়ে পেট চেপে ধরে বসে থাকে, চুপচাপ  লোকজনের আসা-যাওয়া দেখে। সাদা সাদা পাঞ্জাবি আর মাথায় টুপি পরা লোকগুলোকে তার কেমন জানি শুদ্ধ ও উদার মনে হয়। এতদূর থেকেও সে অনেক লোকের শরীরে মাখা আতরের গন্ধ ও মৃতের পাশে জ্বালানো আগরবাতির সুবাস পায়, আর হয়তো সেই সুবাসের কারণেই তার সব শুদ্ধ মনে হয়। সে বসেই থাকে, এবং এক সময় সবাই বাড়ির পাশের মাঠে জড়ো হয়ে খাটলিসহ লাশ সামনে রেখে সার বেঁধে জানাজার জন্য দাঁড়ায়। সামনে ইমাম সমবেত সবার দিকে ফিরে কী সব বলা শুরু করলেও সে বসেই থাকে, কারণ উঠে দাঁড়ানোর মতো বিন্দুমাত্র শক্তি সে জড়ো করতে ব্যর্থ হয়।

সে ভেবেছিল এভাবেই দূর থেকে দেখে জানাযা শেষ হলে ফিরে যাবে, কিংবা সোজা গিয়ে বসবে কাফিরুদ্দিনের তাড়ির ভাটিতে, কিন্তু, কেউ একজন তাকে দেখে ফেলায় তা হয় না আর, বরং জোর করে টেনে নিয়ে গিয়ে জানাযায় দাঁড় করিয়ে দেয়! সে খুব অস্বস্তিতে পড়ে যায়, এবং সম্পূর্ণ নাপাক কাপড়ে নামাজে দাঁড়াতে তার হাত-পা কাঁপে, সে আবারও ভীত হয়, আর একটি মৃতকে সামনে রেখে পবিত্রবোধে জড়ো হওয়া এতগুলো মানুষের মধ্যে কেবল নিজেকেই খুঁজে পায় ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। তার এও বোধ হয়, তার নাপাক শরীরের সাথে লাগলে অপরজনও নাপাক হয়ে যাবে, যা তার পাপের মাত্রা বাড়িয়ে তুলবে আরও, ফলে পাশের জন থেকে দূরে সরে দাঁড়ায়, আর মহান আল্লাহকে সাক্ষী রেখে কায়মনে ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে শুরু হয়ে যাওয়া জানাযা কয়েকবার ভুল তাকবিরসহ আদায় করে, এবং জানাযা শেষ হওয়া মাত্র কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা হাঁটা দেয় বাড়ির পথে।

বেশি দূর আসতে পারে নি, হঠাৎ তার মনে হয় কিছু একটা ভুলে গেছে সে। এতক্ষণ হুশ ছিল না, কিন্তু মুহূর্তেই সে টের পায় কোমরের কাছে লুঙ্গির যেখানে টাকাটি রেখেছিল জায়গাটা ফাঁকা। দ্রুত সে হাত দেয়, এবং নোটগুলো সেখানে নেই দেখে মুহূর্তেই তার মনে হয়, প্রাণবায়ু যেন বেরিয়ে গেল মাত্র। নিথর, নির্বাক সে হতভম্বের মতো হাউমাউ করে চিৎকার করে ওঠে, এবং আশে-পাশে হারিয়ে যাওয়া নোটগুলো উদ্ভ্রান্তের মতো খুঁজতে শুরু করে! সে এতটাই অসহায়, হতাশ ও কষ্ট বোধ করে যে, কিছুতেই কান্নার তীব্র শব্দ থামাতে পারে না, বরং ওভাবে কাঁদতে কাঁদতেই দিকভ্রান্তের মতো অজগর মিয়ার বাড়িরে দিকে দৌড় দেয়। হয়তো দৌড়ে আসতে আসতেই তার চিন্তার সুযোগ হয়, কিংবা মৃতের বাড়ির কাছে আসতেই স্মরণ হয়, অত লোকজনের মাঝে সে নিশ্চয় এভাবে চিৎকার করে কাঁদতে পারে না, কিংবা কাউকে জানাতে পারে না যে, তার কবর খোঁড়া বাবদ পাওয়া ৩০০ টাকা হারিয়ে গেছে। মৃত্যুশোকাচ্ছন্ন পরিবেশে সামান্য এই অর্থের শোক কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, তারপরও সে ছুটে আসে, আর ছুটতে ছুটতেই পথের প্রতিটি অংশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হারানোর নোটগুলো খোঁজে, কিন্তু পায় না। অবশেষে কান্না সংবরণ করে চোখ মুছতে মুছতে সে সেই জায়গাটায় আসে যেখানে সে বসেছিল। জায়গাটি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও টাকাটা পায় না, ফলে সে লুঙ্গির বাঁধন খুলে আবারও ভালোভাবে দেখে, অথচ টাকার হদিশটি পর্যন্ত পায় না। এরপর সে ঘাটে যায়, যেখানে খাটলি ধুয়েছিল, অথচ সেখানেও না পেয়ে তার কবরের কথা মনে পড়ে। সীমাহীন কষ্ট আর সেই সাথে ভয়ানক খিদে তাকে প্রচণ্ড কান্নার জন্যই কেবল আকুল করে তোলে না, বরং একটি মানুষ যতটা নিরাশ ও আশাহত হলে নিজের জীবন শেষ করে দিতে পারে, তারও অধিক নিরাশায় সে বুক চেপে ধরে বসে পড়ে।


উন্মাদের মতো তাকাতে তাকাতে প্রথমে সে আল্লাহকে কবর দেয়, তারপর যে টাকাটা পেয়েও ওকে ফেরত দেয় নি কিংবা লুকিয়ে রেখেছে, তাকেসহ তার চৌদ্দগুষ্টিকে অনন্তকালের জন্য হাবিয়া দোজখে পোড়ায়।


তারপর চুপচাপ অপেক্ষা করে, আর আশপাশ ভালোভাবে দেখে নিয়ে লুকিয়ে চোখ থেকে অঝোর ধারায় নেমে আসা জল মোছে, এবং মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে, নির্বাক। কতক্ষণ কেটেছে ওভাবে বলতে পারবে না সে। এরপর সবাই কবর দেয়া শেষে এক এক করে ফিরে এলে সে ধীরে ধীরে কবরের দিকে এগিয়ে যায়। যদিও টাকাটি ওকে দেওয়া হয়েছিল কবর থেকে একটু দূরেই, তারপরও সে যেমন প্রথমবার টাকাটা না পেয়ে একবার লুঙ্গি খুঁজে দেখার পরও আবারও লুঙ্গি খুলে ভালোভাবে দেখে কোনো ভাঁজে রয়ে গেছে কিনা, ঠিক তেমন-ই মনোভাব ও আশায় কবর থেকে দূরে টাকাটা দেওয়া হলেও, সে নির্দিষ্ট জায়গাটি ছাড়াও কবরের চারপাশও ভালোভাবে খুঁজে দেখে, এবং না পেয়ে আবারও বসে পড়ে বুক ফাটা কান্নার চিৎকার ও আহাজারি নিয়ে। ওর সেই কান্নার শব্দ দূর হতে কেউ হয়তো শুনে থাকতে পারে, আর তাদের ধারণা হতে পারে যে, মৃতের জন্য সীমাহীন কষ্টেই সে অমন করে কাঁদছে, কিন্তু, কেবলমাত্র সেই জানে তার কী হারিয়েছে, এবং সম্ভবত ঐ মুহূর্তে পৃথিবীর আর কোনো কষ্টই তার কষ্টকে ছাপিয়ে যাবার ক্ষমতা রাখে না। সে কাঁদতেই থাকে, আর কাঁদতে কাঁদতেই মনে নতুন এমন এক সম্ভাবানার দেখা দেয়, যা কেবল অবান্তরই নয় শুধু, অসম্ভব, অথচ ওর  মনে হতে থাকে, টাকাটি কবরে পড়ে যায় নি তো কোনোভাবে। সে একটু এগিয়ে যায়, চারপাশে তাকায়, এবং সদ্য দেওয়া কবরের নরম মাটিতে হাত রাখে, আর তখনই অদূরে অজগর মিয়ার বড় ছেলের গলার স্বর শোনে!

সে কিছুতেই ফিরে আসতে চায় না, অথচ তাকে ফিরতেই হয়, আর সারাপথ ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত শরীরে সম্পূর্ণ আশাহীনভাবে ধীর পায়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। পথে সে আবারও থামে, এবং হয়তো তড়িঘড়িতে ভুল হবার সম্ভাবনায় নির্জন মতো একটি জায়গা দেখে লুঙ্গি খুলে ফেলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে হাতে নিয়ে শক্তি দিয়ে ঝাড়ে। বাতাসে লুঙ্গি ঝাড়ার শব্দ হয় আর সে টাকা পড়ার শব্দ ভেবে মাটির দিকে চমকে তাকায়! না, টাকা নয়! পুনরায় ভয়ানক কান্না এসে তাকে প্রায় বিহ্বল করে তোলে, আর উলঙ্গ অবস্থাতেই লুঙ্গিটা হাতে নিয়ে ধুপ করে বসে পড়ে। এতক্ষণ বোবা কান্না আর সীমাহীন কষ্ট ওকে প্রায় বধির করে তুলেছিল, কিন্তু, এত খোজাখুঁজির পর যখন সে নিশ্চিত হলো যে টাকাগুলো সে চিরকালের জন্য হারিয়েছে, তখন সে আর কাঁদতে পারে না, বরং ভয়ানক এক হিংস্রতা ওকে পেয়ে বসে। তারপর চারিদিকে উন্মাদের মতো তাকাতে তাকাতে প্রথমে সে আল্লাহকে কবর দেয়, তারপর যে টাকাটা পেয়েও ওকে ফেরত দেয় নি কিংবা লুকিয়ে রেখেছে, তাকেসহ তার চৌদ্দগুষ্টিকে অনন্তকালের জন্য হাবিয়া দোজখে পোড়ায়। এভাবে সে খানিকটা আরাম বোধ করে, ক্রোধ প্রশমিত হয়ে আসে কিছুটা, অথচ সময় যত এগিয়ে যেতে থাকে সন্ধ্যার দিকে, ততই সে নিজেকেই টের পায় জাহান্নামের ভয়াল আগুনে। ক্ষুধা সেই মুহূর্তে ওকে এতটাই গ্রাস করে যে, সে পেটে হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠে, আর কোনোভাবেই সহ্য করতে না পেরে সামনের মাটিতে হালকা সবুজ ঘাস দু’হাতে মুটো করে ছিঁড়ে এনে মুখে ঢুকিয়ে দেয়! একটা তৃণভোজী পশুর মতোই সে চোখ বন্ধ করে সেগুলো চিবুতে থাকে, আর চোখ থেকে অঝোর ধারায় বেরিয়ে আসা জলের ফোঁটা কোনোভাবেই তাকে শান্ত করে তুলতে পারে না আর। ঘাস চিবুতে চিবুতেই সে উঠে দাঁড়ায়, আর লুঙ্গিটা পরে হাঁটা শুরু করে।

৫.
জীবনে প্রথমবার ওর বাড়ি ফিরতে এতটা সময় লাগে, এবং এও মনে হয় যে, কমছে কম কয়েকশ’ মাইল পাড়ি দিয়ে সে ঘরে ফিরেছে। সীমাহীন ক্লান্তিতে সে বারান্দায় বসে পড়ে, কিন্তু, কিছুক্ষণের মধ্যেই এক ধরনের অস্বস্তি ও শরীরে সারাদিনের লেগে থাকা ঘাম তাকে বাড়ির পাশের পুকুরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। পুকুরে নেমে সে অনেকক্ষণ পানিতে শরীর ডুবিয়ে বসে থাকে, এবং তাতে পেটের ব্যথা কিছুটা কম অনুভূত হয়। সারাদিন পর এই প্রথম সে এতটা আরাম বোধ করে, তাই সে পানির মধ্যেই কেবল মাথা বাদে সমস্ত শরীর ডুবিয়ে বসে থাকে। মাঝে মাঝে শরীর, পিঠ ও বগলের নিচে ভালোভাবে কচলায়, যেন বা সারাদিনে অনেক ময়লা জমেছে ত্বকের পরতে পরতে, যা কেবল মাটির নয় শুধু কবরেরও, কিংবা সকালে পেচ্ছাব করে পানি না নেওয়া নাপাক শরীরে কবর খোঁড়া, আর ওভাবেই জানাযায় অংশগ্রহণের ফলে যে দারুণ নাপাক বোধ ওর মনে পোক্ত হয়ে বসেছে, তা ভালোভাবে ঘষে ত্বক থেকে যেমন, তেমনি মন থেকেও দূর করতে থাকে।

সে ওভাবেই পানির মধ্যে ডুবে থাকে, আর ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসা পৃথিবীকে ওর মনে হয় একটা প্রকাণ্ড গুহা, যার মধ্যে সে একাই বন্দি হয়ে পড়েছে, আর রাত হয়ে আসার সাথে সাথেই মস্ত এই গুহা গাঢ় অন্ধকারে ভরে উঠবে, এবং পৃথিবীর সমস্ত মৃতরা জেগে উঠবে একসাথে। কিছুটা ভয় ভয় করে, আর সেই ভয়ের মাঝেই ওর চোখে একটি দৃশ্য ধরা পড়ে। এতক্ষণ হয়তো সে খেয়াল করে নি, কিন্তু, একটি নারী শরীরের আকার পুকুরপাড় থেকে কলসি কাঁখে ধীরে ধীরে চলমান হলে সে বুঝতে পারে কিসমত আলীর বিধবা মেয়ে পরীবানু গোসল সেরে পানি নিয়ে ফিরছে। হয়তো সারাদিনের কাজ শেষে সেও এসেছিল পুকুরে গোসল করতে, আর ওকে পানির মধ্যে ডুবে থাকতে দেখে নিজের উপস্থিতি গোপন করে, অথচ দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও সে উঠছে না দেখে বাধ্য হয়েই পুকুর থেকে উঠে পড়ে।

ভেজা কাপড়ে জড়সড় পরীবানু কলসি কাঁখে দারুণ ছন্দে এগিয়ে যায়। ওর শরীরের তুলনায় শাড়ি যেন অনেক ছোট হয়ে পড়েছে, কিংবা ভেজা শাড়িই হয়তো সংকুচিত হয়ে ওভাবে অনুদার হয়ে পড়েছে। শেষ বিকেলের আলোতে দূর থেকে বুভুক্ষের মতো সে পরীবানুর চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকে, আর পেছন থেকে দেখা সম্পূর্ণ পরীবানু কিংবা কেবলমাত্র তার হাঁটা অথবা তার স্বাস্থ্যবান নিতম্ব ওকে রীতিমতো মোহগ্রস্ত করে তোলে, যার ফলে সে একদিকে যেমন ক্ষুধার যন্ত্রণা ভুলে যায়, তেমন-ই ভুলে যায় ৩০০ টাকার শোক।


চারিদিকে অপরূপ হুর-পরীগণের মাঝে পরীবানুকেও দেখতে পায়, ভেজা কাপড়ে আবৃত, জড়সড়, কিংবা সম্পূর্ণ উলঙ্গ, আর কেবলমাত্র তাকেই ওর মনে হয় দোজাহানের সবচেয়ে রূপসী রমণী হিশেবে।


পরীবানুর গমন পথে সে তাকিয়ে থাকে অপলক আর হালকা ছন্দে কেঁপে ওঠা ওর নিতম্বকে তখন আর পৃথিবীর কোনো বস্তু মনে হয় না, বরং মনে হয় অপার্থিব বা আসমানি কিছু, আর অমন মহামূল্যবান জিনিস দেখতে দেখতে কখন যেন সে জাহান্নামের আগুন থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে কল্পনা করে বেহেস্তের সবচেয়ে সুন্দরতম স্থানে, যেখানে চারিদিকে অপরূপ হুর-পরীগণের মাঝে পরীবানুকেও দেখতে পায়, ভেজা কাপড়ে আবৃত, জড়সড়, কিংবা সম্পূর্ণ উলঙ্গ, আর কেবলমাত্র তাকেই ওর মনে হয় দোজাহানের সবচেয়ে রূপসী রমণী হিশেবে। এমন মোহনীয় ভাবনায় কোথায় যেন সে হারিয়ে যায় সম্পূর্ণরূপে, আর ধীরে ধীরে যখন চোখ বুঝে আসে, তখন ওর হাত জলের নিচে বিশেষ উদ্দেশ্য গন্তব্যে পৌঁছে যাবার জন্য সচল হয়।

পরম এক শান্তি যেন নেমে আসতে শুরু করে, ফলে সে চোখ খোলে না, বন্ধই রাখে, আর পরীবানুর গমনের পথ থেকে একটুও মুখ না ফিরিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ছেড়ে দেয় হাতের কাছে। পরীবানু ফিরে তাকায় না, যেন বা সত্যি সত্যিই সে আসমানের পরী, আর সে এমন অবজ্ঞাকেও প্রেমের লক্ষণ হিশেবে ধরে নিয়ে স্বপ্ন ও চরম কল্পনার পথে এগিয়ে যেতে থাকে। পানির নিচে ডুবে থাকা ওর শরীরের হালকা হালকা ঝাঁকুনিতে পুকুরের স্থির পানিতে ছোট ছোট ঢেউ ওঠে, এবং একটি দুটি করে ঢেউয়ের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে, যা এক সময় ওর শরীরের প্রবল কাঁপুনির মধ্য দিয়ে হঠাৎ করে থামে, অথচ কিছু সময় পর পুনরায় ঢেউ তৈরি হতে থাকে, এবং এবার তা পূর্বের চেয়ে বড় আকারে তৈরি হয়, আর তা দু’হাতে মুখ ঢেকে রাখা শুক্কুর হৃদয়বিদারী কান্নার বিপন্ন পরিধি থেকে ক্রমশ বাড়তে বাড়তে পাড়ের দিকে নীরব, করুণ ও মলিনভাবে এগিয়ে আসে!

৬.
অতঃপর সন্ধ্যা নামে গাঢ় হয়ে, এবং অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকের সন্ধ্যাটি যেন অনেক দেরি করে ও সময় নিয়ে নামে, আর কখনোই এমন সন্ধ্যা পেরিয়ে পৃথিবী পুনরায় ভোরের মুখ দেখবে না, এমন বোধ হতে থাকে শুক্কুরের, এবং কোথাও যেন এমনই অনন্ত এক অন্ধকার তার কাছে ভীষণ কাম্য হয়ে উঠে। ঘরের দাওয়ায় বসে অনেকটা ঝরঝরে শরীরে সে সময় নিয়ে সন্ধ্যা নামা দেখে। ওর ভালো লাগে, এবং পৃথিবীকে মনে হয় সুন্দর। মেঘমুক্ত আকাশ নিয়ে সন্ধ্যা নামলে স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবী উজ্জ্বল ও তাৎপর্যময় হয়ে উঠে। হঠাৎ আজান পড়ে, এবং জীবনের প্রথমবারের মতো আজান ওর কাছে ধরা দেয় সুললিত ধ্বনির মতো, যা তাকে আরেকটু শান্ত ও পবিত্র বোধে নির্ভার করে তোলে। এখন সে সত্যিকার অর্থেই যেন সব কিছু থেকে মুক্তি পেয়েছে, এবং টাকার শোক অথবা তীব্র ক্ষুধার জ্বালা কোনোটাই টের পায় না সেভাবে। তাছাড়া দীর্ঘ সময় সহ্য করলে খিদে আপনা-আপনিই থিতিয়ে আসে। মাঝে মধ্যে একটু-আধটু ব্যথার উদ্রেক করলেও তা সহ্য করা যায়। সে ওভাবে বসে থাকতে থাকতেই নিজের শৈশব কল্পনা করে, টুকরো টুকরো স্মৃতি, সন্ধ্যায় পাতা খেজুর পাতার পাটি, মায়ের আদর কিংবা চাঁদনি রাত মনে পড়ে, ফলে তার কেন জানি মনে হয়, আজও চাঁদ উঠবে আকাশে, আর প্রকাণ্ড সেই চাঁদ যখন সমগ্র পৃথিবী জুড়ে আলো ছড়াবে, তখন হয়তো সে জেগে উঠবে, এবং দেখবে কেউ একজন হয়তো ওর পাশে শরীর ঘেষে বসে আছে, যে ওর সাথে একটানা কথা বলবে আর জানতে চাইবে কষ্টগুলো, যা এতকাল সে বলতে পারে নি কাউকেই।

এসব ভাবতে ভাবতেই কোথা থেকে গভীর ও ভারী কান্না ওকে বিবশ করে তোলে, ফলে সদ্য নেমে আসার সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকারে সে ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসে, আর ধীরে ধীরে বারান্দার একপাশে গড়িয়ে পড়ে। পুরোপুরি শুয়ে পড়ার পর সে আকাশটা আরও ভালো ও পরিষ্কারভাবে দেখতে পায়, আর মিটমিট জ্বলতে থাকা অসংখ্য তারার মাঝে সে তার শৈশবের প্রকাণ্ড উজ্জল চাঁদটিকেও দেখে, যা সে মায়ের পাশে শুয়ে শুয়ে দেখত, আর মা তাকে বাস্তবিক নিয়ে যেত সেই চাঁদের দেশে। হয়তো তার ভুল হয়, কেননা ততক্ষণে চোখ বুজে আসতে শুরু করেছে, কিন্তু, সে অনুভব করতে সক্ষম হয় যে, আকাশ জুড়ে জেগে আছে বিশালাকার এক চাঁদ, যা থেকে থেকে অপার্থিব আলোর ঢল ছিটকে এসে ওর ঘর-দোর, শরীরসহ সমস্ত কিছু ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে। দূর থেকে বয়ে আসা শীতল বাতাস আচমকা ওর শরীরে লাগে, আর বাড়ির পাশের ঝোপ-ঝাড় থেকে রাত পোকাদের ঝিঁ ঝিঁ শব্দ একটানা ভেসে আসতে থাকলে সে সম্পূর্ণ নির্ভার ও নিশ্চিন্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে, এবং ঘুমিয়ে পড়ে।

ওর ঘুম ভাঙ্গে প্রচণ্ড যন্ত্রণার চোটে! প্রায় চিৎকার করে উঠতে গিয়ে টের পায় সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আছে। সে কিছুতেই উঠতে পারে না, আর পেটের মধ্যে তীব্র যন্ত্রণার চোটে কাতরাতে থাকে। সন্ধ্যা বেলায় যখন সে শুয়েছিল, তখনকার আকাশ ও পৃথিবী কেমন ছিল, এখন সে আর মনে করতে পারে না, কিন্তু, ব্যথায় জেগে উঠার পর সে স্পষ্ট দেখে চারিদিকের সবকিছু অপূর্ব রুপালি আলোয় ঝলমল করছে, আর গাছের পাতা, খড়ের ছাউনি যেখানে যেখানে আলো পড়েছে মনে হচ্ছে আলোর ফোঁটা সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে! এমন প্রচণ্ড ব্যথাতেও সে পৃথিবীর এই রূপ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করে, এবং তার মনে হয়, সুখী ও সুন্দর পৃথিবীর স্বর সে শুনতে পাচ্ছে। অনাবিল প্রশান্তি আর আলোর মাতাল গন্ধে ওর বুক ভরে ওঠে। সমস্ত শক্তি দিয়ে পেট চেপে ধরেই সে এসব লক্ষ করতে থাকে, এবং হঠাৎ উঠোনের দিকে চোখ পড়তেই শীতল একটা ভয় ওর শিড়দাঁড়া বেয়ে নেমে যায় নিমিষেই। মুহূর্তের এই ভয় তাকে অল্প সময়ের জন্য বিহ্বল করলেও একটু ভালোভাবে লক্ষ করতেই ব্যাপারটা বুঝতে পারে, আর পরীবানুর কুকুরটা যে এর আগেও ওর বাড়ির উঠোনে অমন আলস্য, আয়েশ আর লোভী চোখে শুয়ে থেকেছে, মনে পড়ে।

ফলে সে হাসে, এবং তা প্রশস্ত হয়, কেন না প্রতিবেশী হয়েও পরীবানু তাকে কখনও গুরুত্ব না দিলেও মাঝে মধ্যেই ওর কুকুরটা এই নির্মমতার ব্যতিক্রম ঘটায়, এবং ওর কাছে আসে, বারান্দা বা উঠোনে শুয়ে থাকে, রাত কাটায়। ওর দীর্ঘ নিঃসঙ্গ জীবনে এই কুকুরটিকেই কেবল সে বলতে বা ভাবতে পারে বিশুদ্ধ সঙ্গী হিশেবে, যে কোনোরূপ অভিযোগ বা প্রতিবাদ ছাড়াই তাকে সঙ্গ দেয়। লোভ হয়তো ওরও আছে, কিন্তু তা নিতান্তই সামান্য, আর যেদিন যেদিন সে তাড়ির ভাটি থেকে বেচে যাওয়া হাঁস অথবা গরুর কসানো মাংস কলাপাতায় মুড়িয়ে ঘরে নিয়ে আসে, তখন কিভাবে যেন সে টের পায়, এবং ওর পেছন পেছন লেজ নাড়াতে নাড়াতে আসে। হয়তো পুরো মাংসের টুকরো কিংবা ভরপেট খাবার সে কখনোই পায় না, কিন্তু, মাংসের উচ্ছিষ্ট হাড় অথবা ছোট্ট দু’এক টুকরো শুক্কুর ওকে না দিয়ে খায় না। হয়তো আজও ভেবেছে যে, সে মাংস নিয়ে এসেছে, তাই কখন সন্তপর্ণে এসে ওভাবে উঠোনে শুয়ে ওর জেগে ওঠার অপেক্ষা করছে। শুক্কুরের ব্যাপারটি ভালো লাগে, এবং নিজের নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র বিশ্বস্ত ও অনুরক্ত সঙ্গীর দিকে মমতা নিয়ে তাকায়, অথচ পেটের মধ্যে খিঁচড়ে ওঠা ব্যথায় পুনরায় সে কঁকিয়ে ওঠে, এবং সহ্য করতে না পেরে বারান্দায় আবারও শুয়ে পড়ে কাটা পশুর মতো হাত-পা ছুড়তে থাকে! বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই চলতে থাকে, তারপর সে উঠে বসে, দেখে কুকুরটি শোয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বিস্ময় ও সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের চোখাচোখি হয়, আর সে কী মনে করে হেসে ওঠে, তারপর সমস্ত শক্তি জড়ো করে উঠে দাঁড়ায় এবং টলোমলো পায়ে ছুটে যায় ঘরের দিকে, আর বেরিয়ে আসে বাঁশ কাটার দা নিয়ে।


দুটো বিস্ফারিত, বিশ্বস্ত ও আশান্বিত চোখ তখনও যেন বেঁচে আছে, আর ওর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন বরাবরের মতো এখনও সে উচ্ছিষ্ট হাড় বা মাংসের টুকরো ওর দিকে ছুঁড়ে দেবে।


৭.
মানুষের জীবনে একটি রাত যত বেশি সুন্দর ও সুখকর হতে পারে তারও অধিক সুন্দর ও সুখকর হয়ে আজকের রাত শুক্কুরের উঠোনে নেমে আসে, আর এমন তীব্রতর সুখে ওর ঘোর লাগে। চারিদিকে উপচে পড়া চাঁদের আলোয় ও নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ও সফলতম মানুষ হিশেবে ভাবতে সক্ষম হয়, আর সামনে রাখা লোহার কড়াইয়ে ওর প্রলুব্ধ দৃষ্টি অপলক নিবিষ্ট থাকে, আর তা থেকে উপরের দিকে উঠে যাওয়া গরম ভাপকে মনে হয় আলোর কণা, কিংবা যে গাঢ় ও লোভনীয় ঘ্রাণ ওর চারপাশে ছুটে বেড়াচ্ছে, তা ধরা দেয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুগন্ধি ও পবিত্র আতর হিশেবে। ওভাবে কড়াইয়ের দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অজগর আলীর তাজা কবর, গোপালভোগের আমগাছ, মায়ের বীভৎস মুখ, জান্নাত আরা, ওসমান, পরীবানু কিংবা ফেনা ওঠা তাড়ির গ্লাসের কথা মনে হয়, এবং সবকিছু ছাপিয়ে সে নিশ্চিন্ত মনে খানিকটা আগাম তৃপ্তি ও প্রাপ্তির রেশে স্মিত হাস্যে কড়াইয়ের উষ্ণ তাল তাল মাংসের দিকে হাত বাড়ায়, এবং তুলে মুখে দেবার পর চোখ বন্ধ করে। সে পরম তৃপ্তি ও সুখে মাংস চিবুতে থাকে, আর হঠাৎ থমকে থাকা পৃথিবী পূর্বের চেয়ে অধিক উজ্জ্বল হয়ে ওর মাংস চিবানোর তালে তালে সকালের দিকে এগিয়ে যাবার সমূহ গতি পায়! এইভাবে চোখ বন্ধ করে সে একের পর এক মাংসের টুকরো কড়াই থেকে তুলে চিবুতে থাকে, এবং ওর মনে হয়, এভাবেই যেন সে জীবনের শেষ মুহূর্ত অব্দি মাংস চিবুতে থাকবে। কিন্তু, একসময় সে চোখ খোলে, এবং মুখে আরেকটি বড় মাংসের টুকরো পুরে দিতেই অদূরে উঠোনের ভিজে মাটিতে পড়ে থাকা পরীবানুর কুকুরের শরীরবিহীন কাটা মাথার দিকে চোখ যায়। দুটো বিস্ফারিত, বিশ্বস্ত ও আশান্বিত চোখ তখনও যেন বেঁচে আছে, আর ওর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন বরাবরের মতো এখনও সে উচ্ছিষ্ট হাড় বা মাংসের টুকরো ওর দিকে ছুঁড়ে দেবে। শুক্কুর আলী নির্বিকারভাবে পূর্বের তৃপ্তি আর সুখ সহকারেই মাংস চিবুতে চিবুতে ওর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকে, তারপর লুঙ্গির বাঁধন আলগা করে দিয়ে আরাম করে খেতে থাকে। মুখ ভর্তি ঝাল লালা আর উষ্ণ মাংসের লোভনীয় ঘ্রাণ তাকে এতটাই নেশাতুর ও আগ্রহী করে তোলে যে, সে সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে পৃথিবীর এমন সুন্দর রাত উপভোগ করে, আর দূরে কোথাও এক বা একাধিক কুকুর ডেকে ওঠে!

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.।

প্রকাশিত বই :
যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা]
কাক সিরিজ [কবিতা]
এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প]

ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com
অরণ্য