হোম গদ্য বইমেলায় আগত বই থেকে : আখতারুজ্জামান ইলিয়াস; সুরে ও সেলুলয়েডে

বইমেলায় আগত বই থেকে : আখতারুজ্জামান ইলিয়াস; সুরে ও সেলুলয়েডে

বইমেলায় আগত বই থেকে : আখতারুজ্জামান ইলিয়াস; সুরে ও সেলুলয়েডে
653
0

 ভিন্নতর কালিক পরিসরে দাঁড়িয়েও আমরা দেখি দ্রৌপদীর পিছে অনড় দাঁড়িয়ে আছে সেই দুঃশাসন। এই দুঃশাসন তো কেবল বস্ত্রহরণ করে না, স্বপ্নও লুট করে চলে


নিখিল নিদ্রার কালে ঘুম ভাঙার খোয়াব

ঘুম ঘুম ঘুম ঘুম ঘুম ঘুম ঘুম ঘুম
ভীষণ ঘুম—কুম্ভের ঘুম
তোমার আমার চোখে লেপ্টে থাকা জাপ্টে থাকা
ভীষণ ঘুম

ঘুম ভাঙে না, তমিজের বাপের ঘুম ভাঙে না
হারিয়ে গেছে খোয়াবনামা, তবু ঘুম ভাঙে না
কাৎলাহারের বিলে  চোরাবালিতে
তোমার আমার খোয়াবনামা, হারিয়ে গেছে কবে!
তবু ঘুম ভাঙে না, তবু কেউ জাগে না
তুমি জাগো না, আমি জাগি না, আমরা জাগি না
ঘুম ঘুম ঘুম ঘুম ঘুম ঘুম ঘুম ঘুম

দুঃশাসনের গ্রাসে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ
দু’চোখে রক্তক্ষরণ—দ্রৌপদী কাঁদে
তবু ঘুম ভাঙে না, তবু কেউ জাগে না
তুমি জাগো না, আমি জাগি না, আমরা জাগি না

তবু লক্ষ্যা দিঘির পাড়ে, একা সখিনা জাগে
তার দু’চোখে হেঁসেল জ্বলে
দাউ দাউ করে হেঁসেল জ্বলে
ভীষণ করে হেঁসেল জ্বলে
মোটা ভাত ফোটানোর হেঁসেল জ্বলে

এই চাঁদের ছেলেরা সব ভাঙো
লক্ষিন্দরেরা ভাঙো ঘুম, কুম্ভের ঘুম

(আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা উপন্যাসের প্রেরণায় সমগীত-এর হাওয়া অ্যালবামের ‘ঘুম ভাঙার গান’; কথা ও সুর : অমল আকাশ)

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অনন্য উপন্যাস খোয়াবনামা আলোচনা-প্রত্যালোচনার অন্ত নেই আমাদের তবে সুরের কারিগরবৃন্দ একে পটভূমে রেখে যে ঘুম ভাঙার প্রস্তাবনা রেখে যান তা নতুন অবলোকনের দ্বার খুলে দেয়। খোয়াবনামার পুরো ল্যান্ডস্কেপের রেখা অঙ্কনের সমান্তরালে জীবন ও জগতের আরো অনেক বৃহত্তর পরিসরকেও এই অনুষঙ্গে ধারণ করে সে। ‘ঘুম’ এখানে আসে প্রতীকবাস্তব হিসেবে যে ঘুম আর খোয়াব আবার পরস্পর সহোদরা বোন। উপন্যাস খোয়াবনামা এখানে আক্ষরিক অর্থেই প্রেরণামাত্র; বাস্তবত তা নিজস্ব আধারে ধারণ করে চলে চলমান কুম্ভনিদ্রার কাল যেখানে ঘুম ভাঙে না তমিজের বাপের। বস্ত্রহরণ পালা চলে দ্রৌপদীর। মৌসুম শুরু অনন্ত দুঃশাসনের। ফলত চোরাবালিতে হারায় সাধের খোয়াবনামা।

খোয়াবনামা উপন্যাসের সকল সাহিত্যিক করণকৌশল ছাপিয়ে তার অন্তর্বস্তুগত অভীপ্সাই এখানে বাণীরূপ লাভ করে। যে জনপদ-গোষ্ঠীর আখ্যান ধরা আছে খোয়াবনামায় তাদের সামনে ইলিয়াস কোন যান্ত্রিক মীমাংসার সড়ক বাতলে দেননি। তিনি শুধু সুপ্তিদশার চকিত দর্শন ঘটিয়েছেন আমাদের চর্মচক্ষে আর সমগীত তাদের গানে মরণঘুমের ছবি আঁকার পাশাপাশি করাল-নিদ্রার নিদান-রাস্তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যখন সামূহিক ঘুমের আয়োজনের বিপরীতে একলা একা সখিনা জেগে বসে থাকে তখন বুঝতে হয় প্রবল ক্ষুধার ঢলে নিদ্রার কূলও হারিয়ে ফেলেছে সে। তার এক ফোঁটা অন্নের খোয়াব সাকার করতে দরকার চাঁদের সন্তানদের মিলিত জাগরণ।

অতঃপর লক্ষিন্দরের প্রতি ডাক আসে ঘুম ভাঙা অভিযানের নেতৃত্বদানের। উপন্যাস খোয়াবনামা এভাবে মিশে যায় বাংলার প্রবহমান পুরাণে। এক অভূত অন্বয়ে চাঁদ সদাগর-বেহুলা-লক্ষিন্দর আর তমিজের বাপ-সখিনার মধ্যকার বিভাজনরেখা ভোজবাজির মতো মিলিয়ে যায়। কারণ ভিন্নতর কালিক পরিসরে দাঁড়িয়েও আমরা দেখি দ্রৌপদীর পিছে অনড় দাঁড়িয়ে আছে সেই দুঃশাসন। এই দুঃশাসন তো কেবল বস্ত্রহরণ করে না, স্বপ্নও লুট করে চলে। ফলে খোয়াবনামার দেহকাঠামো ক্ষয় হয়ে আসে। তাই কালগোত্রনাম ভুলে কাঙ্ক্ষিত খোয়াবের কসম খেয়ে সবাইকে জাগার ধ্বনি তোলে সমগীতের এই গান। মাকান্দোর মানুষকে মার্কেজ শোনালেন শতবর্ষী নিস্তব্ধতার গল্প আর উত্তরবঙ্গবিধৌত বিস্তৃত অঞ্চলের জল ও ডাঙাকে সাক্ষী রেখে ইলিয়াস তার খোয়াবনামা বিস্তার করে চলেন। ব্যক্তি ও সমষ্টিস্বপ্নের কোনো আলাদা রূপরেখা নেই ইলিয়াসের হাতে; কারণ খণ্ড খণ্ড দ্বিধা-দোলাচলে মোড়া ব্যক্তি স্বপ্নদল ক্রমশ ধারণ করে বিশাল মানুষের অজেয়- উত্থানী খোয়াবের আকার।

নানান সাহিত্যতত্ত্ব দিয়ে অদ্যাবধি খোয়াবনামাকে ব্যাখ্যার চেষ্টা চলছে। সাহিত্যের নিষ্ঠ ছাত্র-শিক্ষক বিচিত প্যারাডাইমে আলো ফেলে চলেছেন খোয়াবনামায় কিন্তু আদতে এই উপন্যাস নিজে তত্ত্বের ধূসর তন্তু ছিঁড়ে বয়ন করে চলে নবতর স্বপ্নসমুজ্জল। হ্যাঁ, জীবনের প্রয়োজনে এইবার এই খোয়াব-সত্যে নিজেদের শোধন না করলেই নয়।

 

মগজের সাজগোজ এলোমেলো করে দেয়া ইলিয়াসের খোঁয়ারি

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ১৯৭৫ সালে রচনা করেন ‘খোঁয়ারি’ শীর্ষক গল্প। নামগল্প ‘খোঁয়ারি’ ও আরো কয়েকটি গল্প সমবায়ে ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর গল্পগ্রন্থ খোঁয়ারি। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে ইলিয়াসের কবিবন্ধু রণজিৎ পাল চৌধুরীকে। এই উৎসর্গ-তথ্য এখানে উল্লেখ প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে আমাদের আলোচ্য শিবু কুমার শীল গ্রন্থিত ও পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্র ইলিয়াসের খোঁয়ারির কেন্দ্রীয় চরিত্রও কিন্তু এই রনজিৎ পাল চৌধুরী, পুরো নাম রনজিৎ কুমার পাল চৌধুরী। ইলিয়াসের গল্পে সমরজিৎ নামে তিনি আত্মগোপন করে আছেন আর বছর কয়েক হল এই পৃথিবী থেকে চিরগোপনে চলে গেলেন তিনি।

এই আলোচনায় ইলিয়াসের গল্প ও শিবু কুমার শীলের সমান্তরাল পাঠ অত্যাবশ্যক। দুই অংশে বিভাজিত এই প্রামাণ্যচিত্র ‘গল্পের আত্মা, কলকব্জা’ এবং ‘অন্যান্য অনুষঙ্গ’। ইলিয়াসের সংক্ষেপিত পরিচিতি দিয়ে এই প্রামাণ্যচিত্রের প্রারম্ভ আর তার পরেই কাহিনির অকুস্থল সমরজিৎ বা রনজিৎ পাল চৌধুরীর বাড়ির দিকে দর্শকের ভ্রমণ শুরুর প্রস্তাবনা হিসেবে আসে পুরানো ঢাকার চকিতচেহারা দর্শন। গণ-নলকূপ থেকে পানি পড়ছে কলসে, দোকানে বিক্রি হচ্ছে মধুর শাহী পান-মাঠা, মানবশিশু ও খরগোশ শাবকের হল্লা, খোলা নর্দমা আর শেফালি ফুলের মালা গাঁথা চলে সমতালে এবং অতঃপর অনেকক্ষণ থেকে কড়া নাড়ার পর উপরতলা থেকে জবাব আসে ‘আসি’।

গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর জাতিগত ক্ষয়ের পরিস্থিতি ত্রিকালদর্শী টেরেসিয়াসের মতো আমাদের সামনে জাজ্বল্য করেন রণজিৎ পাল চৌধুরী কিংবা সমরজিৎ। শ্রোতা-দর্শকের কানে ‘রণপা’র (রণজিৎ পালকে বন্ধুরা ‘রণপা’ নামেই সম্বোধন করতে ভালোবাসতেন)  কথা যেমন অব্যর্থ-তিরের মতো বিঁধতে থাকে তেমনি নেপথ্যে প্রায় পরিত্যক্ত কুয়া, ইতস্তত বিড়ালের পায়চারি আর এলোমেলো একরাশ বইপত্রের উপস্থিতি এ প্রামাণ্যচিত্রের শরীরকে মুহুর্মূহু জীবন্ত রাখে।

রণজিৎ পাল যখন বলেন—’ইতিহাসকে  আমরা স্বীকার করি না কিন্তু ইতিহাসের ঘাত-প্রতিঘাত মানুষের জীবনে যে কতটা প্রভাব ফেলে, তার একটা প্রমাণ হয়ত আমি’—তখন ১৯৭১-এ জীবন নিয়ে বহিঃশত্রুর আগ্রাসী থাবায় নিজ বাড়ি থেকে পলায়ন আর ১৯৭১ এর পর স্বাধীন স্বদেশে তাকে নিজ বাসভূমে পরবাসী করার যে পাঁয়তারা তার সূত্রও কিছুটা হলে ঠাহর করা যায়।


 রণজিৎ পালের ভাষ্যেই আমরা পাই সে রূঢ় সত্য যে এতবড় একটা মুক্তিযুদ্ধও গণমানুষকে কোন স্বস্তি দিতে পারল না


রণজিৎ পাল নিজে যেমন সে ইতিকথা বিধৃত করেন তেমনি এ বিষয়ে নানান ব্যাখ্যা-বয়ান নিয়ে এখানে আমরা হাজির হতে দেখি ইলিয়াসের অনুজ অধ্যাপক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ এবং কথাশিল্পী শাহাদুজ্জামানকে। খালিকুজ্জামান ইলিয়াস গল্পের রচনাবলি ও পটভূমি বর্ণনার পাশাপাশি মাইনরিটি সমস্যার দিকেও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন; ঢাকা শহরের উর্দু স্পিকিং ও বাঙালি হিন্দু মাইনরিটির সমস্যার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার চেয়ে তার বর্ণনায় সরস হয়ে ওঠে ষাটের দশকের আড্ডা। যে আড্ডার কথা ‘খোঁয়ারি’ গল্পে খুঁজে পাওয়া যায়। ইলিয়াস-রণজিৎ পাল যে জম্পেশ আড্ডা রেক্সে, বিউটি বোর্ডিং-এ দিতেন আর নেশারু কণ্ঠে কখনো আবৃত্তি করে উঠতেন উর্দু গান বা কবিতার কলি। আবদুল মান্নান সৈয়দ যোগ করেন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাসঞ্জাত ব্যাখ্যা, ‘সবদেশেই সংখ্যালঘু সমস্যা আছে। আমি নিজেও সে সমস্যার জাতক। আমি  সংখ্যালঘু হিসেবে একটি দেশ থেকে বিতাড়িত। যে এখনও এ সমস্যার জের ধরে যাতনা সহ্য করছে সে হচ্ছে রণজিৎ পাল চৌধুরী।’ আর রণজিৎ পালের চেয়ে ‘খোঁয়ারি’ গল্পের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মনোযোগ দেন শাহাদুজ্জামান ‘মাইনরিটি এক্সপ্লয়টেশনের সোশিও-পলিটিক্যাল অ্যানালাইসিস হতে পারে। তবে শিল্পীর কাজ একটু ভিন্ন। ‘খোঁয়ারি’ গল্পে ইলিয়াস যে শিল্পদক্ষতায় সংখ্যালঘু সংকটের রূপায়ণ করেছেন তা সমাজতাত্ত্বিকের কাজ নয়, সাহিত্যের কাজ।’

Cover Book of Article 584_o
অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫; প্রকাশক : কথাপ্রকাশ; প্রচ্ছদ নিয়াজ চৌধুরী তুলি

এই সব অতিথি-কথকের ফাঁকে ফাঁকে মন্দিরার মৃদু তালে একজন রণজিৎ পাল চৌধুরীর সাথে সাথে আমরা দেখে উঠি বিউটি বোর্ডিং। রণপার স্মৃতিচর্যায় আর বিউটি বোর্ডিং-এর দৃশ্যায়নে আমাদের মানসপটে একে একে স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয় শহীদ কাদরী-আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-বিপ্লব দাশ-মুশররফ রসুল বুড়ো ভাই-নবাবপুর রোড এবং পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া ষাটের দশক।

হারমোনিয়ামের ধ্বনিরণনে রণজিৎ পাল চৌধুরী আয়েশ করে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে ১৯৭১-এ পাকবাহিনী দ্বারা তার বাড়ি লুটপাটের বর্ণনা দেন নির্বিকার-নিরাসক্ত ভঙ্গিতে। বলেন তার বৃদ্ধা ঠাকুমা, বাবা অমৃতলাল আর ছোটবোনের কথা। এই সব একান্ত স্বজনের চেয়েও তার কথ্যচালে বড় হয়ে ওঠে গোটা বাংলাদেশের রিক্ত দশা। ৭১-এ ও ৭১-র পর তো রণজিৎ পালদের মতো কারো কারো বাড়ি লুট কিংবা দখল হয়েছে কিন্তু রণজিৎ পালের ভাষ্যেই আমরা পাই সে রূঢ় সত্য যে এতবড় একটা মুক্তিযুদ্ধও গণমানুষকে কোন স্বস্তি দিতে পারল না। আর তিনি আদর্শবাদী সমাজের ক্ষয়িষ্ণু প্রতিনিধিদের একজন, অর্থকড়ির ব্যাপারে যিনি এই দেশে যিনি ‘কোন সুবিধা করে উঠতে পারেন নি।’ তাই জীবনে তার সাফল্যের মধুর হাসি নেই। আছে শুধু ব্যর্থতার অবসাদ। আর থাকার মধ্যে শুধু আছে এক মাধবীলতার ঝাড়।

ইলিয়াসের গল্পে পাই ‘…এই মেঘ ছিঁড়ে উড়ে চলে যায় এবং সমরজিৎ দ্যাখে, গেটের মাধবীলতার ঝাড় ও বারান্দায় হৃষ্টপুষ্ট থাম পর্যন্ত  স্থলকেলি করে বেড়াচ্ছে অমৃতলাল’। শিবু কুমার শীলের বর্ণনায় এই দৃশ্য আরো গভীর অর্থদ্যোতক ব্যঞ্জনা পায় এভাবে ‘মাধবীলতার ফিকে সুবাসের সঙ্গে কাঁঠালিচাপা ফুলের ঘন গন্ধ জীবজন্তুর করোটিতে হঠাৎ ঢুকে মগজের সাজগোজ এলোমেলো করে দেয়’ আর অমৃতলাল পুত্র সমরজিৎ ওরফে রণজিৎ পাল চৌধুরী বলেন ‘এই মাধবীলতা থাইক্যা যা একটু সুবাস-উবাস আসে আর কী!’ আর আমরা বলি মাধবীলতার এই ঘ্রাণ আসলে বিলীয়মান সময়ের অস্তমিত শোভারই শেষ স্মারকচিহ্ন।


 যে লাল বৃষ্টিপাতের তোড়ে সমরজিতের এই পলায়ন, যে পলায়ন জন্ম দেয় অন্তহীন হ্যাংওভার কিংবা খোঁয়ারির সে বিমানবিক বৃষ্টিপাতের উৎস এখনও বন্ধ হয় নি। ‘খোঁয়ারি’র প্রাসঙ্গিকতা তাই ফুরোয় না


পরিচালক-নির্মাতা বলেন—‘দোতলা, ছাদ, ছাদের এক পাশে চিলেকোঠা নড়বড় করতে করতে শ’খানেক বছর দিব্যি চালিয়ে দিল’ কিন্তু ধারাবর্ণনায় অধিক মূর্ত হয় ক্রমশ ভেঙে পড়া রণজিৎ পালের বাড়ি। শ্যাওলা জমে ওঠে এর সমুদয় প্রাচীরের গায়ে। এ তো পুরানা আমলের একটি স্থাপত্য বা ব্যক্তির বাসগৃহের ভাঙনদশা নয়, এটা এই নষ্ট-পতিত সময়েরই প্রকৃত মুখচ্ছদ। যেখানে সৃষ্টি নেই শুধু ভাঙনের শব্দ শোনা যায় অবিরত।

এই প্রামাণ্যচিত্রে রনপার ভ্রাতুষ্পুত্র সুব্রত পাল চৌধুরী প্রজন্মের উত্তরাধিকার হিসেবে বলেন, ‘ইলিয়াসের গল্পের মধ্য দিয়ে এই বাড়ি বেঁচে রইবে আর তাই বাড়ির একজন বাসিন্দা হিসেবে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি।’

কিন্তু ভাগ্য যার সাথে মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে নির্বিশেষে প্রতারণা করে তিনি কিন্তু তার মৃত্যুকেও ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিতে ছিলেন নারাজ। নিজ দেহ মেডিকেলে দিয়ে যেতে চেয়েছেন যেন তার মরদেহ নিয়ে কাউকে ভোগান্তি পোহাতে না হয়। ‘একদিন চইলা যাইব আর কী’ এমন সরলোক্তির সমান্তরাল যখন তার কণ্ঠে ‘মরণরে তুঁহু মম শ্যামসম’র পাঠ শুনি তখন ইলিয়াসের গল্পে চোখ ফেরাতে বাধ্য হই এবং বুঝি সমরজিতের জবানিতে যেন তিনি বলেন, ‘খোঁয়ারির মধ্যে রাত কাটে, সারা সকাল জুইড়া খালি খোঁয়ারি’। এই খোঁয়ারি শুধু কি রণজিৎ পাল বা সমরজিতের? না এ তো সমসময়, সমাজ ও পরিপার্শ্বের গায়ে লেপ্টে থাকা খোঁয়ারি ‘সমরজিতের শরীরের রক্ত উজানে উঠে বসে তার করোটির ছাদে, ছাদের বীমে এবং মেঘ হয়ে কিছুক্ষণ থমকে থেকে অবশেষে বৃষ্টিপাত শুরু করে। এই বৃষ্টির উৎস করোটির মেঘ, করোটির মেঘের উৎস তার শরীরের রক্ত। সুতরাং বর্ষণের রঙও লাল, অবিরাম লাল বৃষ্টিপাত চোখের সামনে একটি সীমাহীন জলপর্দা টাঙিয়ে দেয়। পর্দায় দ্যাখা যায়, হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে সমরজিৎও পালিয়ে যাচ্ছে।’ যে লাল বৃষ্টিপাতের তোড়ে সমরজিতের এই পলায়ন, যে পলায়ন জন্ম দেয় অন্তহীন হ্যাংওভার কিংবা খোঁয়ারির সে বিমানবিক বৃষ্টিপাতের উৎস এখনও বন্ধ হয় নি। ‘খোঁয়ারি’র প্রাসঙ্গিকতা তাই ফুরোয় না।

রণজিৎ পালের কণ্ঠে ‘মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে’ বা ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকের…’র শান্ত-সৌম্য-প্রেমবিরহদীপ্ত গানের ঝংকার বুঝিবা বলে জীবনকে সুরময় করতে খোঁয়ারিটা এবার না ভাঙলেই নয়।

 

 ‘কামু মার্কেস ইলিয়াস ও অন্যান্য’ প্রবন্ধ-গ্রন্থ থেকে নির্বাচিত অংশ