হোম গদ্য কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের চিঠি

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের চিঠি

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের চিঠি
647
0

তাঁর সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ ঘটে ফেসবুকে। তারপর ২০০৯ সালের শেষ দিকে হঠাৎ একটি চিঠি পাই। ই-মেইলে। তখন আমি সম্পাদনা করছি ‘বনপাংশুল’ পত্রিকাটি। তিনি সেটি পড়ে একটি প্রতিক্রিয়া পাঠিয়েছিলেন, বিশেষত আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে। যেহেতু অভিযোগটি গুরুত্বপূর্ণ, আমি তাঁকে লেখাটি খানিকটা বিশদ আকারে পাঠাতে অনুরোধ করি এবং এ কথাও জানিয়ে দেই, তাঁর প্রতিক্রিয়াটি বনপাংশুলে আমরা ছাপব এবং চেষ্টা করব একটা উত্তর দিতে। 

আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম এই দেখে যে, তিনি আমাদের আক্রমণ করতে গিয়ে অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পুরো পত্রিকাটির একটি রিভিউ লিখে ফেলেছেন। আমি বাচ্চু (নাসির উদ্দীন ইউসুফ) ভাইকে অনুরোধ করেছিলাম, চিঠিটার একটা জবাব দিতে। কিন্তু তিনি ব্যস্ত থাকায় চিঠিটার জবাব দেন মাসউদ ইমরান মান্নু। উল্লেখ্য যে, জাহাঙ্গীর ভাই অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন মান্নুর একটা সেমিনার পেপারকে কেন্দ্র করেই।

তাঁদের দুজনেরই লেখা এখানে তুলে দিচ্ছি পরস্পর-এর পাঠকদের জন্য।


………………………………………………………………………………………

সম্পাদক সমীপে চিঠি
………………………………………………………………………………………

মঞ্চনাট্য লড়াই এবং গল্পকথনে কতিপয় যুক্তকথন

 

আপনাদের প্রকাশিত ও প্রযোজিত বনপাংশুল (২য় বর্ষ, ২য় সংখ্যা), এই তো, গতকালই সংগ্রহ করলাম। প্রথমেই চমকে উঠতে হয়, দরাদরির এই কষ্টাকষ্টির দেশে আপনাদের ছোটকাগজটির দাম রাখলেন মাত্র ৩০ টাকা! তা কিন্তু আমার মাথায় আসছে না, এর দাম এত কম কেন? অফসেট পেপারে (অফসেটই তো?) মুদ্রিত ১৬০ পৃষ্ঠার কাগজটির দাম ৩০ টাকা! কেন ভাই, ছোটকাগজ কি আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম কিংবা রামকৃষ্ণমিশন বা খয়রাতি সম্পদ নাকি যে একভাবে না একভাবে পাঠকের হাতে পৌঁছাতেই হবে? পাঠকের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলাও একটা বিষয়—তবে এ মনোভঙ্গিতে বোধ হয় কম রেটে ছোটকাগজ বিপণন করা সমীচীন হয় না। আসলে এই ট্রাডিশন ভাঙা দরকার। এর বাজারমূল্য তৈরি হতেই হবে তা কিন্তু আমি বলছি না, শ্রমের মূল্যই আপনাদের ভুলে যেতে হবে কেন? এটির দাম কমসে কম ১০০ টাকা হওয়া দরকার ছিল।

আপনাদের কাগজে দুই-দইটি অধিবেশন ছাড়াও একটি সাক্ষাৎকার, গল্প, অনুগল্প, কবিতা, গ্রন্থ-আলোচনা ছাপা হয়েছে। আমি এই ক্ষেত্রে দুইটি অধিবেশন আর সাক্ষাৎকারটি নিয়ে কিঞ্চিৎ কথাবার্তা বলব। সেলিম আল দীনের অংশটি নিয়েই প্রথমত দুই-চার কথা শুরু করি। আচ্ছা, এর শুরুতেই মানে ভূমিকায়, ঢাকা থিয়েটারকে প্রথম সারির দল বলে ডিক্লেয়ার কেন দিয়ে ফেললেন, তা কিন্তু আমার মতো অতি সাধারণ পাঠক হিসাবে একটা প্রশ্ন করতেই পারি? এটি যারাই পড়বেন, তারা কিন্তু নাটকের সামান্য খোঁজ খবর না নিয়ে মনে হয় পড়বেন না। আবার সেলিম আল দীনের নামের পূর্বে আচার্য না লিখলে কি চলত না? মূল কথা হচ্ছে, আচার্য আর প্রথম সারির দল বলার বিষয়টি আমি বোধ হয় ক্লিয়ার করতে পারলাম না। মোদ্দা কথা, আমিও দুইটি বিষয়েই সহমতও প্রকাশ করতে পারি। তবে আমি একটা বিষয়ই বলতে চাচ্ছি যে, এভাবে কাগজের পক্ষ থেকে গুণবাচক বিশেষ্য বা বিশেষণ দিলে পাঠকের মুক্তচিন্তার উপর বাড়তি চাপ পড়ে। আমি কিন্তু তা বলছি না যে, সেলিম বা ঢাকা থিয়েটার যথাক্রমে আচার্য ও প্রথম সারির গুণ ধারণ করে না। এবার বোধ হয় আমি বিষয়টি ক্লিয়ার করতে পারলাম। এভাবে মত প্রকাশ করলে পাঠকের মুক্তচৈতন্যঘেঁষা সৃজনশীলতা ধাক্কা খায়। এও হয়তো কেউ ভাবতে পারেন, যে যাই বলুক, আপনারা কারও মতামতকেই মূল্য দিবেন না, কারণ আপনারা ইতিমধ্যে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে হয়তো বসে আছেন! আমার ধারণা হচ্ছে, গুণবাচক বিশেষ্য কিংবা বিশেষণ পাঠকের জন্য এক পীড়াদায়ক কাজও। আবার এমন বিশেষণই যখন ব্যবহার করা হলো, তখন কলকাতার অরুণ সেনকে অত গুরুত্ব দেয়া সঠিক কিনা তাও ভেবে দেখতে বলব। তিনি কি কলকাতায় প্রথম সারির লেখক? বা, আচার্য টাইপের কেউ? তবে এও স্বীকার করছি, তার সাথে সরাসরি কথা বলে এটাও আমার মনে হয়েছে, তিনি শুধু সজ্জনই নন, তিনি যা বলেন, দায়িত্ব নিয়েই বলেন।

 

bono 4 cover
বনপাংশুল ৪র্থ সংখ্যা

যাই হোক, এবার আমি মূল পর্বের কথকতায় ফিরে আসি। আমাকে শুরুতেই বলে নিতে হয়, রুবাইয়াৎ আহমেদ-এর নেয়া শিমূল ইউসুফের সাক্ষাৎকারটি ভালোই হয়েছে। বেশির ভাগ সাক্ষাৎকারই একমুখী হয়ে যায়, এখানে এমনটি হয়নি, এ থেকে বেশ কিছু বিষয় জানা গেল। দুজন ব্যক্তিকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছে। এতে ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটার ইঙ্গিত মেলে। তবে এর ভিতর দিয়ে ঢাকা থিয়েটার নামক নাট্যপ্রতিষ্ঠানটির কতিপয় সীমাবদ্ধতাও আমরা প্রত্যক্ষ করছি। দলটি যে একক সত্তার মালিক হয়ে গেছে, অর্থাৎ এর নাটক তো আর কেউ করতে পারবে বলে মনে হয় না। এর দ্বৈতাদ্বৈতবাদিতা একে এমন পর্যায়ে রেখেছে যে এই দলের মূলস্তম্ভ শিমূলের মতো মঞ্চকর্মীও এ ট্যাবু ভাঙার সাহস রাখেন না! এটিই এই দলের গর্ব, তা-ই এই দলের সীমাবদ্ধতাও বটে। আপনাদের অধিবেশন পর্বে দলটির মূল কর্ণধার নাসির উদ্দীন ইউসুফ বললেন (প্রসঙ্গক্রমে এও বলে রাখি, তিনি নাটকে, জনসংস্কৃতির যুদ্ধে, কথনে, ব্যক্তিত্বের স্ফুরণে আমার অতি প্রিয়জন), ‘বাংলাদেশের নাটক সেলিমই গড়েছেন’—তাতে অবাকও হই। এতে তাদের ভিতর একধরনের ঈশ্বরত্ব নির্মিত হয়, আমরা অবাক বিস্ময়ে, প্রাণে-প্রাণে তাদের কাজ স্মরণ করি। অবশেষে বলতে বাধ্য হই যে, এ হয়তো এক নাট্য-নিওকলোনিয়াল আবহ, যেখানে আমরা বন্দি হয়ে গেলাম না তো? বিশেষ করে মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা কিন্তু করাই যায়।


এরা ইংরেজ-আমলকে কাফের-নাসারা বলে গালি দেয় আর এরা ঐতিহ্যের কথা বলে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠা করার জেহাদি কার্যক্রমে নিজেদের জড়িয়ে-পেঁচিয়ে রাখতে জানে


সেলিম আল দীন বিষয়ক অধিবেশনটিতে বেশ দরকারি কাজই হয়েছে। তবে এতে মূল-প্রবন্ধের প্রথম রেফারেন্সটিই নেয়া হলো ছোটকাগজ সকাল থেকে। কেন? এই কাগজের রাজনৈতিক বিশ্বাস সম্পর্কে আশা করি আপনারা জানেন। এর সম্পাদক মনে হয় ইশাররফ হোসেন, ইশরাত হোসেন নন। আপনারা একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন, সকাল বা এই ধরনের গ্রুপসমূহ পোস্ট-মডার্নিজমকে এস্টাব্লিশ করতে চায়, মিথিক কালচারাল ধারাকে ক্রমাগত বেগবান করতে থাকে এবং ঐতিহ্য, লোকজ উপাদান, মুসলিম লোকমানসের উন্মেষ ঘটাতে চায় তারা। এ হচ্ছে, বাইরের চতুরতা। এদের অন্দরমহলে চলে ধর্মের প্রাবল্যকে সৃজনে-কর্মে লালন করার তীব্র-তীক্ষ্ণ খায়েশ। এরা ইংরেজ-আমলকে কাফের-নাসারা বলে গালি দেয় আর এরা ঐতিহ্যের কথা বলে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠা করার জেহাদি কার্যক্রমে নিজেদের জড়িয়ে-পেঁচিয়ে রাখতে জানে। তিনারা আল মাহমুদ গং-এর সমকালীন রাজনৈতিক ধারণাকে এস্টাব্লিশ করার বাসনা রাখেন। এমনই এক ছোটকাগজের উদ্ধৃতি দেয়ার কারণ কী? তা কি সেলিম আল দীনকে ভালোভাবে প্রাতিষ্ঠানিকরূপে পাওয়ার মানসেই করা হলো? প্রসঙ্গক্রমেই উল্লেখ করছি, সেলিম আল দীনকে নিয়ে কিন্তু কম লেখালেখি হয়নি। ছোট বা বড় অনেক কাগজে তাকে নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে বা এখনও হচ্ছে। হাসান শাহরিয়ার সম্পাদিত থিয়েটারওয়ালা  তাকে নিয়ে একটা ক্রোড়পত্র ধরনের বার করেছিল। এতে আমার শাদামাটা এক প্রবন্ধ ছাড়াও মামুন হুসাইন আর বদরুজ্জামান আলমগীরের খুবই চমৎকার দুইটি লেখা ছিল। সেলিম আল দীনের পারিবারিক জীবনের উপর (?) মাহবুব লীলেন কাঠকয়লা নামের একটা গল্প কথার ৫ম সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এটিও একটি ভালো গল্পই হয়তোবা।

এবার নাট্য-অধিবেশন পর্ব নিয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা বলে নিই। এখানে পাভেল পার্থ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, মোহাম্মদ আজম, লুৎফর রহমান, সর্বোপরি মাসউদ ইমরান মান্নুর মূল রচনাটি বেশ চমৎকার। পার্থ তার লেখায় সেলিমের নাটকের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলেছেন, তেমনি সেলিমের সৃজনশীলতায় এথনিক থিয়েটারের প্রকৃত প্রায়োগিক দিক প্রশ্নবিদ্ধ কি না তা খতিয়ে দেখেছেন। এখানকার পারস্পরিক মতবিনিময় ভালো লেগেছে। তবে এই বিষয়ে আমার যেটুকু ভিন্ন মত তাও থিয়েটারওয়ালায় ছাপানো আমার লেখা থেকেই হয়তো উঠে আসবে। আবার মূলপ্রবন্ধে যেমন তার কাজকে একেবারে সরাসরি বি-উপনিবেশীকরণ বলছেন, তাও আমার মনে হয় না। মুনতাসির ফ্যান্টাসি (এই নামেই আমরা সারাজীবন এর মঞ্চায়ন দেখেছি। জনশ্রুতি আছে, বাংলা একাডেমির লাজ-নম্রময় মনোবাসনাকে পাত্তা দিতে গিয়ে ফ্যান্টাসির মতো পাওয়ারফুল একটা শব্দের কবর রচনা করলেন!), শকুন্তলা, এমনকি কিত্তনখোলা নামের মঞ্চনাটকে মেলা আর থিয়েটারকে ঘিরে যে জীবনসমূহ আমরা দেখি তাই কি বি-উপনিবেশিক ঘরানার কিছু? মূলত সেলিমের ভিতর ফিউশন করার দুর্দান্ত কুশলিপনা ছিল। মহাভারত বা কালিদাসের শকুন্তলা তো সেলিমের শকুন্তলা নয়। মিথকে তিনি নবপ্রাণে উজ্জীবিত করেছেন। চাকা নাটকে একটা বেওয়ারিশ লাশকে যেভাবে হাসপাতাল থেকে তার গ্রামের আন্দাজনির্ভর বা অজানা ঠিকানায় পাঠানো হয় তা কিন্তু যথার্থ হয় না। কারণ এটি একটি প্রতিষ্ঠান, তা থেকে মনের ইচ্ছা মিশিয়ে যা ইচ্ছা করা যায় না। তবে কি প্রতিষ্ঠানমুখর সেলিম সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বুড়া আঙুল দেখালেন? তাও নয়, আসলে তিনি একধরনের সাহিত্যিক-বাস্তবতাযোগে দর্শক বা পাঠককে ঘোরের ভিতর রেখেছেন। প্রসঙ্গক্রমে বলছি, তিনি মঞ্চনাটকের পাশাপাশি টিভিনাটকেও উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। লাল মাটির কালো ধোঁয়া, গ্রন্থিকগণ কহে ইত্যাদি নাটকে টিভিনাটকের মেজাজই পাল্টে ফেলেছিলেন।

তবে আপনাদের অধিবেশনচর্চা নিয়ে আরও বাড়তি ধারণা সহযোগে এগোনো যায়। এই সমস্ত অধিবেশনকে ইন্টারনেটের সহযোগিতা নিয়ে ওপেনও রাখা যায় হয়তো। এখানে ওপেন বলতে আমি শুধু অধিবেশন-কালকেই ওপেন বুঝাতে চাইনি, পুরো কাগজটি এই সময় থেকে এবং প্রকাশনার পরেও পাঠকের অংশগ্রহণের ভিতর রাখা যায় কি না, তাই বলছিলাম। আর অধিবেশন চলার সময়ও গল্পকারদের জন্যও যে তা ওপেন ছিল, তা কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি। ওপেন বিষয়টি নানাভাবে আসতে পারে। ইমেইল/ফেসবুক এমনকি এই নামে ব্লগও হতে পারে। এই যেমন ধরেন, এখন আমরা যদি এ বিষয়ে কথাসমূহ চালিয়ে যেতে চাই, এবং তা যদি দায়িত্বশীলতার ভিতর দিয়ে হয়, তাই কিন্তু আপনারা পরবর্তী সংখ্যায় ছাপাতেও পারেন। বা, আপনাদের সেলিম আল দীন পাঠশালার এমন বিষয় ইন্টারনেটে রাখলেন, যা পরবর্তী অধিবেশনে আলোচনা হলো।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, সেলিমের বনপাংশুল সম্পর্কেও একই কথা, আমি আসলে কোনো কিছুতেই, বিশেষত, এই ধরনের মননশীল সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার কৌশলে জানানোটা ঠিক গ্রহণ করতে পারি না। আমার একটা জিনিস মনে হয়, আমাদের দেশে সৃজনশীল পাঠকের সংখ্যা এমনিতেই কম, আবার তাদের সাথে সম্পর্কটা এমন যে তারা যেন আজীবন আমাদের ছাত্রই থাকবেন। এটা কিন্তু শুধু বনপাংশুল/কথা  বা অন্য কোনো ছোটকাগজ সম্পর্কে বলছি না, অনেকেই তাই করছে। আর গাণ্ডীব, অনিন্দ্য, শিড়দাঁড়া, প্রতিশিল্প, নিসর্গ, দ্রষ্টব্য, লিরিক ইত্যাদির মতো লিটল ম্যাগের গেরিলা ধারা (এটি আমার দেয়া পরিচয়—ভালো অর্থেই দিলাম আর-কি) তো এই কাজের ব্যাপারে খুবই মনোযোগী। আশা করি, আমার প্রবণতাটা বুঝাতে পেরেছি। কোথাও আপনাদের খাটো করতে চাচ্ছি না। কারণ আমি অবশ্যই বুঝতে চাইছি যে, অধিবেশনমুখর কাজটি অনেক অনেক কঠিন এবং দরকারি।

আপনাদের পত্রিকা বনপাংশুল গল্প অংশের আয়োজনটিতে নতুনত্বের অংশীদার। এতে তিন গল্পের প্রকাশ, এর উপর মূল কথকের কথাবার্তা, আবার মুক্ত-আলোচনা ইত্যাদি মিলিয়ে বিষয়টি আপাতত খারাপ মনে হচ্ছে না। কিন্তু তাদেরকে মূল আলোচক কাজল শাহনেওয়াজ সহ (ব্যতিক্রম মাজুল হাসান) সক্কলে যেভাবে নছিহত করলেন, ভবিষ্যতে কোনো গল্পকার তাতে যাবেন কি না আমার কিন্তু সন্দেহ আছে। আমার তো মনে হচ্ছিল, অত্র তিনজন মানে জাকির তালুকদার, রবিউল করিম, শাহনাজ মুন্নী গল্প লিখে কী যে অন্যায়টা করলেন। যাই হোক, এই কাজে অন্তত আমাদের মতো দূরবর্তী, অপরিপক্ব, অনালোকিত লেখকদের ডাক পড়বে না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, গল্পকার থেকে আলোচকগণ, এরা প্রত্যেকেই আমার এমন পরিচিত যে, এখানে কথা বলাটাই একটা মুশকিলের ব্যাপার আর-কি।

সত্যি বিষয় হচ্ছে, আমার তো মনে হচ্ছে, এটা আপনাদের জন্য একটা গ্যাঞ্জামের কর্ম না হয়ে যায়? অনেক কথাই বলা যায়, কাজল শাহনেওয়াজও আমার প্রিয় লেখকদের একজন। আচ্ছা, রবিউলের সামনে তারই গল্পের আলোচনা করার সময় ৭০ বছরের বুড়ির হাস্যজনিত আচরণে দ্বিমতকরত তিনি নিজেই হেসে গড়িয়ে পড়ছিলেন?! বুড়ির হাসি খিলখিল হতে পারে না? এই বাস্তব তো রবিউলের হতে পারে, জাদুবাস্তবতা বা পরাবাস্তবতার হতে পারে—এর জন্য হেসে উঠতে হবে?! কী জানি, নাকি আমিই বোধের কোনো ঝামেলাই আটকা পড়ে গেলাম। কাজলের ব্যক্তিত্বে এমনটি তো থাকার কথাও নয়। আমার কিন্তু রবিউলের গল্পটিই অধিক ভালো লেগেছে।

গল্প তিনটিই পড়লাম। এক-একজন এক-এক ধারণা থেকে লিখেছেন। নয় দশকের গল্পকারদের ভিতর জাকির হচ্ছেন সবচেয়ে শ্রেণীসচেতন লেখক। তার গল্পে ম্যাসেজ থাকে, অথবা, বলা যায়, কখনও কখনও তার গল্পে যেন আগেই ম্যাসেজটি লেখা হয়ে যায়, যা হয়তো পরবর্তী সময়ে গল্পে শিল্পময়তার সাথে এঁকে যান তিনি। কিন্তু তাই বলে, গল্পে দাড়ি-টুপিওয়ালাকে ঘায়েল করতে গল্প লিখেন তিনি! আমার তা কখনও মনে হয় না। মাহবুব মোর্শেদের এই ধরনের মন্তব্যের সাথে সহমত প্রকাশ করা যাচ্ছে না। কাজল কী বলেন তা শোনার জন্যই তিনি তথায় গিয়েছিলেন। তাই তো? এতে পুরো অনুষ্ঠানটির প্রতি একধরনের উন্নাসিকতা প্রকাশ পায়। এই সহজ সত্যটি তিনি, মাহবুব মোর্শেদ, বলে ফেললেন। কেউ মধ্যবিত্তীয় ভড়ং থেকে ভদ্রতার প্রতিভাযোগে কাজটিকে আড়াল করেন। তিনি সহজ সত্যটি বলেছেন। এবার গল্পপ্রসঙ্গে আসা যাক। রবিউল গল্প বলেন বাস্তবতার ভিতর নিজস্ব বাস্তবতার কোলঘেঁষে। খুব বেশি এক্সপেরিমেন্ট তিনি করেন বলে মনে হয় না। গল্পটিতে বুড়ি কর্তৃক হেগে রাখার যে বিষয়টা (যা সে করেছে তার অস্তিত্ব প্রমাণের দায় থেকেই) আনা হয়েছে, এবং তা যে একসময় উন্মোচিত হলো তা বেশ দরকারি একটা কাজ। তবে এও আমার ধারণা করতে ইচ্ছা করে, বুড়ির এই কর্মটি আরও সিম্বোলাইজ করা যেত। রবিউল যদি দেবেশ রায়ের তিস্তাপুরাণ পাঠ করে থাকতেন (এটি একজন পাঠক হিসাবে নিতান্তই আমার ধারণা; এভাবে কোনো গল্পকারকে উপদেশ বিতরণ করাটা শিষ্টাচার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে—রবিউল ক্ষমা করবেন) তা হলে গল্পটি আরও হয়তো জীবন্ত হতো। আর শাহনাজ মুন্নী যা দেখেন, বা, তথ্যসূত্রে পান, তাই গল্পে জায়গা দেন। তার গল্প পড়লে মনে হয়, তার ব্যক্তিত্ব গল্পের ওরাল ধারাকে যেন নিত্য পূজা করছে। এভাবেই যেন তিনি গল্পে সংযুক্ত থাকতে সাধনা করে যাচ্ছেন! তার গল্পে কাহিনি একটা থাকে। শেষতক একটা ম্যাসেজ প্রদানের দায়বদ্ধতাও তার আছে। দুই-একটা গল্পে শহীদুল জহির কখনও কখনও হয়তো উঁকি মারেন। তবে তার গল্পে আলাদা পাঠস্বাদুতা আমি পাই।

আবারও বলতে হয়, এ ধরনের আয়োজনে শৈল্পিক বোঝাপড়ার চেয়ে আপনাদের হয়তো বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হবে। বনপাংশুল-এর এ স্টাইল বদলানো যায় কি না ভেবে দেখতে পারেন আপনারা।

নিত্যসৃজনশীল হোন, ভালো থাকুন।

 

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

সম্পাদক, কথা
২২-০১-২০১০

10899984_860843763938296_1050620448144759239_o
কথা পত্রিকার শেষ সংখ্যা ।। সম্পাদক : কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর (৩১ জানুয়ারি ১৯৬৩—৭ মার্চ ২০১৫)

……………………………………………………………..

চিঠির উত্তর
…………………………………………………………….

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর এবং বাংলাদেশের সেক্যুলার বুদ্ধিচর্চার মৌলবাদ-বিরোধী সমরূপী ব্যাখ্যান

 

সেলিম আল দীন বিষয়ক অধিবেশনটিতে বেশ দরকারি কাজই হয়েছে। তবে এতে মূল-প্রবন্ধের প্রথম রেফারেন্সটিই নেয়া হলো ছোটকাগজ সকাল থেকে। কেন? এই কাগজের রাজনৈতিক বিশ্বাস সম্পর্কে আশা করি আপনারা জানেন। এর সম্পাদক মনে হয় ইশাররফ হোসেন, ইশরাত হোসেন নন। আপনারা একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন, সকাল বা এই ধরণের গ্রুপসমূহ পোস্ট-মডার্নিজমকে এস্টাব্লিস্ট করতে চায় মিথিক কালচারাল ধারাকে ক্রমাগত বেগবান করতে থাকে এবং ঐতিহ্য, লোকজ উপাদান, মুসলিম লোকমানসের উন্মেষ ঘটাতে চায় তারা। এ হচ্ছে, বাইরের চতুরতা। এদের অন্দরমহলে চলে ধর্মের প্রাবল্যকে সৃজনে-কর্মে লালন করার তীব্র-তীক্ষ্ণ খায়েশ। এরা ইংরেজ-আমলকে কাফের-নাসারা বলে গালি দেয় আর এরা ঐতিহ্যের কথা বলে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠা করার জেহাদি কার্যক্রমে নিজেদের জড়িয়ে-পেঁচিয়ে রাখতে জানে। তিনারা আল মাহমুদ গং-এর সমকালীন রাজনৈতিক ধারণাকে এস্টাব্লিস্ট করার বাসনা রাখেন। এমনই এক ছোটকাগজের উদ্ধৃতি দেয়ার কারণ কি? তা কি সেলিম আল দীনকে ভালোভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপে পাওয়ার মানসেই করা হলো? প্রসঙ্গক্রমেই উল্লেখ করছি, সেলিম আল দীনকে নিয়ে কিন্তু কম লেখালেখি হয়নি। ছোট বা বড় অনেক কাগজে তাকে নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে বা এখনও হচ্ছে।

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর ‘সেলিম আল দীনের নাটকে বি-উপনিবেশীকরণ এবং এথনিক থিয়েটার হেজিমনি’ নামে আমার প্রকাশিত প্রবন্ধে সকাল  পত্রিকায় প্রকাশিত শামীম রেজা ও অন্যান্যের সাথে আল দীনের দেয়া একটি সাক্ষাৎকার থেকে আল দীনের ভাষ্যকে তুলে ধরায় প্রতিক্রিয়া-মতামত দিয়েছেন। তার ওপরের বক্তব্যটিকে যদি আমি ঠিকঠাক বুঝে থাকি তবে বিষয়টি এরকম যে, মুসলিম জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জেহাদে লিপ্ত একটি পত্রিকাকে এরকম একটি লেখার প্রাথমিক তথ্যসূত্র বা লেখার তথ্যসূত্র হিশেবে কেন ব্যবহার করা হবে?

যদি এই হয় প্রশ্নটি তবে উত্তর দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই কতগুলো বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার হওয়া জরুরি। প্রথমত, যে বক্তব্যটি ঐ পত্রিকাটি থেকে নেয়া হয়েছে তা কি পত্রিকাটির নিজস্ব বক্তব্য? দ্বিতীয়ত, সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের বক্তব্য? তৃতীয়ত, আমার লেখাটি কী কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের ভাষ্য মতে ‘সকাল’ পত্রিকাটি যে রাজনৈতিক অবস্থানকে লালন করে অর্থাৎ ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার জেহাদ’ সেই রাজনীতিকে সমর্থন করে রচিত? চতুর্থত, তাদের রাজনীতি উৎসাহিত হয় এরকম কোনো বক্তব্য দেয়া হয়েছে কি? পঞ্চমত, আল দীন তার বক্তব্যটি কি মৌলবাদী রাজনীতিকে উৎসাহিত করার জন্য দিয়েছিলেন?

আমার লেখাটি যদি এরকম দোষে দুষ্ট না হয়ে থাকে তবে কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের যৌক্তিকতা কোথায়? এক্ষেত্রে আমার একটি পর্যবেক্ষণ রয়েছে। একে আমি অতি সেক্যুলার সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী-বামপন্থী বুদ্ধিচর্চার মৌলবাদ-বিরোধী অবস্থানের একটি একরৈখিক মনোভঙ্গি ও প্রতিরোধী ব্যবস্থা হিশেবে দেখি। এটা দীর্ঘ দিনের চর্চিত একটি সংকট। এ বিষয়টি বিস্তৃৃত করার পূর্বে ‘সকাল’ পত্রিকার সম্পাদক ইশাররফ হোসেনের নাম ভুলে ইশরাত হোসেন ছাপা হওয়ায় আমি দুঃখ প্রকাশ করছি এবং দ্বিতীয়ত বিষয়টি হলো, এ পত্রিকাটি সম্পর্কে আমি পূর্বাপর তেমন কিছুই জানি না। তবে আমার লেখার ক্ষেত্রে তাদের পত্রিকায় প্রকাশিত কোনো বিষয়কে চয়ন করার কোনো রাজনৈতিক আপত্তি আমার নেই। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে যদি আমি পরিষ্কারভাবে জানতামও তাতেও আমার কোনো সমস্য হতো না আল দীনের সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ চয়ন করার ক্ষেত্রে।


বাঙালির বাঙালিত্ব প্রকাশের সকল জাতীয়তাবাদী আয়োজনে কবি ফররুখ আহমদকে ত্যাজ্য করা হয়েছে


একাত্তর-উত্তর বাংলাদেশ ধর্মীয় মৌলবাদী ক্যান্সার দ্বারা চরমভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এ এক দারুণ ‘জুজু’তে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় মৌলবাদ যত না বড় তাকে আরেকটি জাতীয়তাবাদী ও মার্ক্সবাদী মৌলবাদ রেপ্রিজেন্ট করছে এক বিরাট সমস্যা হিশেবে। পশ্চিমা সেক্যুলার-এর সারসত্তা হলো ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রগতিশীল, আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিনির্ভর, উদার একটি ব্যবস্থা। এখানে মত প্রকাশের এবং গ্রহণের উদারতা চরম। মজার ব্যপার হলো, বর্তমান বাংলাদেশে গত কয়েক দশক থেকে শুরু হওয়া সেক্যুলার চর্চা একটি চরম মৌলবাদী আকার ধারণ করেছে। এটা আমরা স্পষ্ট হতে দেখি আহমদ ছফার ইসলামি ফাউন্ডেশনের সভায় বক্তৃতা দেয়ার প্রতিক্রিয়ার দিকে লক্ষ্য রাখলে অথবা কবি ফররুখ আহমদকে ইসলামি ভাবাপন্ন লেখালেখি করায় সবসময়ই আল মাহমুদ, শাহেদ আলীদের কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। বাঙালির বাঙালিত্ব প্রকাশের সকল জাতীয়তাবাদী আয়োজনে কবি ফররুখ আহমদকে ত্যাজ্য করা হয়েছে। আহমদ ছফাকে দেখার ক্ষেত্রে নানামাত্রিক সন্দেহের চোখ তৈরি করা হয়েছে। যদিও আহমদ ছফাকে তার বক্তব্যের যাতনায় কবি ফররুখ আহমদের দলে এ ধরনের সেক্যুলারগণ ফেলতে পারেন নি।

কবি ফররুখ আহমদকে কেন শাহেদ আলীদের কাতারে দাঁড়াতে হয়? এর বড় কারণ, তিনি একটি মুসলিম পরিবারের সদস্য হিশেবে মুসলিম জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোতে বড় হয়ে কলেজ জীবনে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে আবার পীরের মুরিদ হয়ে মুসলিম অভিজ্ঞতাবাদী জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোতে ফিরে এসে সেই চেতনার ঝাণ্ডা তুলে ধরেন। তার দোষ হলো একটি বিজ্ঞানমনস্ক, উদারনৈতিক মতাদর্শিক অবস্থানে উন্নীত (?) হবার পরে কেন আবার ফিরে গেলেন একটি ধর্মভিত্তিক মতাদর্শিক রাজনৈতিক অবস্থানে। এটাই সেদিন সেলিম আল দীন স্মারক বক্তৃতায় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলতে চেয়েছেন। তাই তিনি তাঁকে শাহেদ আলীর কাতারে দাঁড় করালেন। এখানে মজার ব্যপার হলো, শাহেদ আলী একটি প্রকাশ্য ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলের নেতা হয়ে মন্ত্রিত্ব গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সেখানে ফররুখ আহমদ শুধুমাত্র ইসলামিক চেতনার ওপর দাঁড়িয়ে লেখালেখি করা এবং রেডিওর সামান্য স্ক্রিপ্ট রাইটারের চাকুরি করতে করতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগের মাধ্যমে কোনো ধর্মনির্ভর রাজনৈতিক দলে যোগদান না করেই একই দলভুক্ত হলেন। এক্ষেত্রে আমার মনে পড়ে যায়, ‘সক্রেটিসের জবানবন্দী’ নাটকে দেবদেবীতে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ডায়লেক্টস-এর কথা। এখানে খানিকটা তুলে ধরা হলো :

মেলেতুস : আমি বলতে চাই সক্রেটিস নাস্তিক।
সক্রেটিস : বন্ধুগণ, মেলেতুস আপনাদের কাছে একটি ধাঁধা উপহার দিয়েছেন। ধাঁধাটি সমাধান করুন।
মেলেতুস : ধাঁধা?
সক্রেটিস : আচ্ছা বন্ধু, নাস্তিক কে?
মেলেতুস : যে দেবদেবীতে বিশ্বাস করে না।
সক্রেটিস : চমৎকার। আমি দেবদেবী বিশ্বাস করি না, অতএব আমি নাস্তিক।
মেলেতুস : ঠিক।
সক্রেটিস : অর্থাৎ আমি নতুন দেবদেবীকে বিশ্বাস করি। ঠিক?
মেলেতুস : ঠিক।
সক্রেটিস : অর্থাৎ আমি একদল দেবদেবীতে বিশ্বাস করি। অতএব আমি নাস্তিক নই। ঠিক?
মেলেতুস: ঠিক। (বুঝতে পেরে) না-না, মানে আপনি রাষ্ট্রস্বীকৃত দেবতায় বিশ্বাস করেন না, তাই নাস্তিক।

কবি ফররুখ আহমদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই ঘটনা। যখনই তিনি সেক্যুলার বামপন্থি রাজনীতি ছেড়ে ইসলামিক চিন্তায় অধিষ্ঠিত হলেন তখনই মৌলবাদী হয়ে উঠলেন। কারণ তিনি একটি বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী, প্রগতিশীল, সেক্যুলার মতাদর্শকে ছেড়ে আরেকটি মতাদর্শে নিজেকে রূপান্তরিত করেছেন। এ কারণে সেক্যুলার রাজনীতির কর্তাব্যক্তিরা গেল-গেল বলে চিৎকার করেছেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ইসলামি ভাবাপন্ন হবার পরেও কি বাংলাসাহিত্য ও ভাষার জন্য অবদান রাখতে পারেন নি? অথবা তার ছেলে মুর্তজা বশীরকে চিত্রশিল্পী হওয়া থেকে কি রদ করেছিলেন?

আমাদের রাজনীতি সেক্যুলারের ব্যাখ্যা বুঝতে এবং আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির উপযোগী করে বুঝতে নিয়মিত ভুল করায় বামপন্থি আন্দোলন আজকের পরিণতিতে উপনীত হয়েছে অসম্ভব সম্ভাবনাকে জাগানোর পরেও। সেক্যুলারিজম যে ধর্মহীনতা নয় তা পরিষ্কার করতে আমাদের জাতীয়তাবাদী ও মার্ক্সবাদী রাজনীতি মোটাদাগে ব্যর্থ হয়েছে। ধর্মীয় মৌলবাদ সেক্যুলারের অর্থ ধর্মহীনতা প্রচারের মাধ্যমে ধর্মপরায়ণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। কবি ফররুখ আহমদের মতো লেখকদের মৌলবাদী রাজনীতিকদের কাতারে ঠেলে দিয়ে এ পথকে আরও সুগম করেছে। এ ভুখণ্ডে মানুষের যাপনের দিকে একটি দীর্ঘ সময় জুড়ে ফিরে তাকালে দেখা যাবে মানুষের যাপনটাই তার কাছে আরাধনা। এটাই তার ধর্ম ছিল। আলোকময়তার জ্ঞান আমাদের এখানে আসার পূর্বে ধর্ম ও সংস্কৃতির কোনো ভিন্ন সংজ্ঞায়ন করা একটি জটিল প্রক্রিয়া। মানুষ উৎপাদনের সকল বিষয়কে আহরণ এবং আহারের কৃত্যের মাধ্যমে নিজেকে পরমের সাথে সম্পৃক্ত করেছে নানা সম্প্রদায়গত আচারের মাধ্যমে। এখানে বহুত্ব ছিল নিশ্চিত কিন্তু ধর্ম ও কৃত্যের বিভাজন খুবই জটিল এক প্রক্রিয়া। আদি ও মধ্য পর্বের সাহিত্যের দিকে ফিরে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। আমরা আমদানিকৃত আধুনিক শিক্ষার ভোক্তায় পরিণত হওয়ার মাধ্যমে একটি বিভাজনীকৃত এবং শ্রেণিকরণের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়কে বোঝার কৌশলের মধ্য দিয়ে সবকিছুকে বিপরীত জোড়ের অংশ হিশেবে স্টেরিওটাইপ রেপ্রিজেন্টে করে চলেছি।

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের বক্তব্যর সাথে আমি মিল খুঁজে পাই ইংরেজ সময়ের মুসলিমদের ইংরেজি ভাষা শিক্ষা সম্পর্কে মনোভঙ্গির। অর্থাৎ ইংরেজি শিখলে কাফেরে পরিণত হওয়ার ধর্মীয় ভাবনা। এজন্য শেষ পর্যন্ত আলিগড় মাদ্রাস ও পরে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে এবং কোরআন ও হাদিস ইংরেজিতে অনুবাদ করে এ ধরনের ভয়কে তাড়ানো হয়েছি। অবশ্য এ ভূত এখনও তাড়া করে ফিরছে গোঁড়া ইসলামপন্থিদের।

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর শুদ্ধবাদী একটি অবস্থান তৈরি করতে চাচ্ছেন। এখানে তিনি অস্বীকার করতে চাচ্ছেন তারই ভাষাভাষী ভিন্ন মতালম্বীদের। এজন্য মওদুদি পড়া বা জামায়াতের পত্রিকা পড়া বা তাদের পাঠকে বিশ্লেষণের ভয়ে ভীত হয়ে পড়ছেন। এ ধরনের ভীতি নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের দৃঢ়তার অভাববোধে ঘটে থাকে। মদ্যপানকে রক্ষণশীলরা যেভাবে বন্ধ করতে চায় নিজের ব্যক্তিত্বের দুর্বলতাকে আড়াল করতে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের একাংশ একইরকম সংকটে ভুগছেন বলেই আমার মনে হচ্ছে। উদার-পরিচয়দানকারী রক্ষণশীল বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এই মধ্যবিত্তীয় জাতীয়তাবাদী-বামপন্থার সংকটের সমরূপতা আজ বিদ্ধ করেছে গোটা সমাজকে।

একটি কথা স্পষ্ট যে, যদি আল দীন সাক্ষাৎকার দিতে পারেন তবে তার সাক্ষাৎকার পাঠ কেন মৌলবাদের সহযোগিতা হিশেবে বিবেচিত হবে? এ সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ তাকে নিয়ে আলোচনার বিষয়ের সাথে যুক্ত হলে তা অপরাধের কোন পর্যায়ে অধিষ্ঠিত হবে? এ প্রশ্নগুলো কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের প্রতি। তবে তার উল্লেখিত রাজনৈতিক অবস্থান যদি ‘সময়’ পত্রিকাটার থাকে তা বিস্তৃত-পরিসরে আলোচনার দাবি রাখে। আমার আহ্বান কামরুজ্জান জাহাঙ্গীর তা দায়িত্বের সাথে প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচনা করবেন। আরেকটি কথা, সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের আমি ব্যক্তিগতভাবে যতদূর চিনি তা কোনোভাবেই কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের বক্তব্যকে সমর্থন করে না। অবশ্য রাজনৈতিকভাবে তাদের অবস্থান আমার লেখায় আল দীনের বক্তব্যকে উপস্থাপনে কোনো সংকট তৈরি করত বলে আমি মনে করি না।

 

মাসউদ ইমরান

শিক্ষক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যায়

সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব