হোম গদ্য কাফকার ভুবন : অন্তহীন গোলকধাঁধার গদ্যকবিতা

কাফকার ভুবন : অন্তহীন গোলকধাঁধার গদ্যকবিতা

কাফকার ভুবন : অন্তহীন গোলকধাঁধার গদ্যকবিতা
2.02K
0

এপুলিয়াস তার স্বর্ণ গর্দভ-এ দেখিয়েছিলেন কিভাবে লুসিয়াস গাধায় রূপান্তরিত হলো; আর কাফকা দেখিয়েছেন গ্রেগর সামসা কিভাবে একটা বিরাট আকৃতির পোকায় রূপান্তরিত হয়। সচেতন পাঠক জানেন, কী ছিল লুসিয়াসের পাপ, তার উৎসাহ ছিল ডাকিনীশাস্ত্রে, অধিকন্তু সে ছিল প্রচণ্ড কামুক। কিন্তু সামসার অদ্ভুত পরিণতির কারণ হিশাবে এ রকম কিছু জানা যায় না। তা ছাড়া কেই-বা তার শাস্তিদাতা তাও দৃশ্যাতীত। এমনকি তার নাম বা অবয়ব—কোনোটাই আপাতভাবে জানার উপায় নেই। লুসিয়াস গাধায় রূপান্তরিত হওয়ার পর প্রায় সারা গ্রিস পরিভ্রমণ করেন এবং বিস্ময়কর, ভয়ংকর, এমনকি চিত্তবিনোদক অজস্র ঘটনায় পূর্ণ হতে থাকে তার রূপান্তরিত জীবন। তার জীবন অতিবাহিত হতে থাকে কখনো দস্যু, গুপ্তঘাতক, দাস এবং দুশ্চরিত্র ভূস্বামী ও কৃষকদের সংস্পর্শে। সামসার ক্ষেত্রে এরকম অভিজ্ঞতা দূরের কথা, সে তার রূপান্তরিত অস্তিতের ফাঁদ থেকেই বেরিয়ে আসতে পারছে না। অথচ তার অফিসের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। অফিসের কথা ভেবে সে দারুণ উদ্বিগ্ন!


কাফকা শুধু ঔপন্যাসিক বা গল্পকারই নন, একজন কবিও, তবে, এক গদ্যকবি।


গ্রেগর সামসার এই অবস্থা দেখার সাথে সাথে নিশ্চয়ই আমরা লক্ষ করব, কাফকার এই চরিত্রটির সাথে এপুলিয়াসের সেই স্বর্ণ গর্দভের নিকট সাদৃশ্য। কিন্তু এই সাদৃশ্য নিতান্তই বহিরাঙ্গিক, এর স্বভাব বা প্রকৃতি এপুলিয়াসের সেই সময়ের দেশ এবং কালের বৈশিষ্ট্যকে বহন করছে না। সামসার যে জগৎ—কাফকার প্রিয় এবং সতর্ক পাঠক মাত্রই স্বীকার করবেন—তা এই সময়ের জগৎ। কিন্তু কাফকার এই সৃষ্টিছাড়া অদ্ভুত প্রাণীটির বাস্তবতা কতটুকু? কোথায় পেলেন তিনি এই সামসাকে? এ রকম প্রশ্ন উঠা খুবই স্বাভাবিক। এটা যে তার নিতান্ত কল্পনা-মনীষার অভূতপূর্ব কোনো সৃষ্টি নয় তা আমরা এপুলিয়াসের স্বর্ণ গর্দভ কাহিনির সাথে কিঞ্চিৎ মিলের কারণ থেকেই বুঝতে পারি। পাশাপাশি এটাও তো সত্যি যে এপুলিয়াসের হুবহু অনুকরণও এটা নয়।

 

kaf-1

 

কাফকার এই সামসা—বাস্তবতার প্রশ্নে—কোনো সৃষ্ট চরিত্র নয়; সে রকম হলে তা লেখকের জন্য নিদারুণ দুর্ভাগ্যই ডেকে আনত। কেননা, যে কোনো অবাস্তব সৃষ্টি—যার কোনো সামাজিক, রাজনৈতিক, বাস্তব কিংবা কালিক ভিত্তি নেই তা লেখককে অনতিবিলম্বে বিলুপ্ত করার জন্যই জন্ম নেয়। এবং লেখকের মৃত্যুর সাথে সাথে কিংবা তার আগেই চরিত্রটিরও মৃত্যু ঘটে। কাফকার সৌভাগ্য এই যে তিনি এ রকম কোনো ধ্বংসের পথ নিজের জন্য রচনা করেন নি। সে রকম কোনো চরিত্র সৃষ্টি না করে বরং কতগুলো অদ্ভুত চরিত্র আবিষ্কার করেছিলেন বিশ শতকের এই মৌলিক লেখক। আবিষ্কারের বিষয়টি একটু পরিষ্কারভাবে বুঝবার সুবিধার্থে অখ্যাত এক চেক কবির একটি কবিতা থেকে সামান্য উদ্ধৃত করা যেতে পারে :

Poets don’t invent poems
The poems is somewhere behind
It’s been there for a long long time
The poet merely discovers it.

(Jan Skacel)

একটু আগেই বলেছি যে, কাফকা হচ্ছেন বিশ শতকের মৌলিক লেখকদের একজন। কিন্তু এখন, এই কবিতার বক্তব্যের সাথে একাত্ম হয়ে বলা যায়, কাফকা শুধু ঔপন্যাসিক বা গল্পকারই নন, একজন কবিও, তবে, এক গদ্যকবি।

ইয়ান স্কাসেল তার  কবিতায় Invent এবং Discover শব্দ দু’টি ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভবত এদের বাস্তব এবং যৌক্তিক ভিত্তির দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। এই কারণে তিনি ‘সৃষ্টি’ বা ‘উদ্ভাবন’ (Invent) না বলে ‘আবিষ্কার (Discover) বলতে চান যে আবিষ্কারের রয়েছে বাস্তবতা। ঠিক একই কারণে আমরা কাফকার রচনাকর্মকে অবাস্তব কল্পনা বা উদ্ভাবন না বলে বরং আবিষ্কার বলতে চাই যার যৌক্তিকতা এবং বাস্তব ভিত্তি আমাদের ধনতান্ত্রিক সভ্যতার মধ্যে নিহিত।

বিখ্যাত জার্মান সাহিত্য সমালোচক ওয়াল্টার বেঞ্জামিন বোদলেয়ার প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে, বোদলেয়ার হচ্ছেন ‘চূড়ান্ত পুঁজিবাদী যুগের এক গীতিকবি’। কাফকার ক্ষেত্রেও বেঞ্জামিনের এই বক্তব্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কাফকা হচ্ছেন এই চূড়ান্ত পুঁজিবাদী যুগেরই এক গদ্যকবি। এই কবি এমনই এক সমাজ ব্যবস্থা এবং যুগের সাক্ষী যেখানে তার আবিষ্কৃত চরিত্রগুলোকে, যেমন তার বিচার উপন্যাসের জোসেফ কে’কে অদ্ভুত এক শক্তির সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত অবস্থায় দেখতে পাই, যে শক্তির স্বভাবের মধ্যে এক অন্তহীন গোলকধাঁধা লক্ষ করা যায়। বলা বাহুল্য, জোসেফ কে এই গোলকধাঁধার কোনো শেষ খুঁজে পায় না। একই অবস্থা দুর্গ (ক্যাসেল) উপন্যাসের ভূমিজরিপকারী কে’এরও। কাফকার এই দুই ‘কে’ আসলে একজনই এবং একই জগতের বাসিন্দা। অন্তহীন এই গোলকধাঁধাময় জগৎ থেকে তারা কেউ পালাতে পারে না, এমনকি একে তারা পুরোপুরি বুঝেও উঠতে পারে না। কাফকার আগে ঔপন্যাসিকরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যেন এগুলো রণক্ষেত্রে বিশেষ, যেখানে ব্যক্তির সাথে গোষ্ঠীস্বার্থের সংঘাত লক্ষ করা যেত। এই সংঘাত অবাস্তব ছিল না এবং এখনও নয়। কিন্তু কাফকার মধ্যে, শুধু সংঘাতই নয়, দেখা যাচ্ছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো এমন কিছু নিজস্ব নিয়মের অনুবর্তী যার বাইরে এর কাঠামো কিংবা সাংগঠনিক রূপটি চিন্তাই করা যায় না। কেউই জানে না কে এই নিয়মগুলোর প্রণেতা এবং পরিচালক।

 

kaf-2

 

ক্যাসেল উপন্যাসের ‘কে’ চরিত্রটির কথা অনেকেরই মনে পড়তে পারে। সে এমনই এক রাষ্ট্রব্যবস্থার অধিবাসী যেখানে দেখা যায়, আমলাতান্ত্রিক ভুল বোঝাবুঝির এক জটিল ধারাবাহিকতা এবং তা বছরের পর বছর গড়িয়ে যাচ্ছে এক অন্ধকারের দিকে। ‘কে’ এই জটিল ধাঁধার বাইরে যেতে পারছে না। ফলে তার সমগ্র অস্তিত্বটাই ভুল ও অর্থহীন হয়ে পড়ে।


ধর্মীয় বা অতিপ্রাকৃত নয়, পশ্চিমা পুঁজিবাদের ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতায় মানুষের বাস্তব জীবনের অবস্থাটিই ছিল কাফকার দেখার বিষয়।


কাফকার এই জগতে অফিস আদালতের ফাইলগুলোই সবচেয়ে বেশি বাস্তব গুরুত্ব নিয়ে আবির্ভূত যেখানে মানুষের শরীরী অস্তিত্ব বিভ্রমের পর্দায় একটি ছায়ামাত্র। কিংবা তারা হচ্ছে, ফাইলের মধ্যে তাদের ভুলেরই ছায়া। মানুষের জীবনকে যদি শুধুই এক ছায়ারূপ অস্তিত্ব ধরে নেয়া হয়, এবং প্রকৃত বাস্তবতা যদি হয় অন্য কোথাও তাহলে কাফকার রচনাকর্ম সম্পর্কে আমাদের সিদ্ধান্ত কী রকম হওয়া উচিত? কাফকার প্রথম দিককার কোনো কোনো সমালোচক, যেমন তার বন্ধু ম্যাক্স ব্রড লেখার এই বৈশিষ্ট্যের জন্য, উপন্যাসগুলোকে রূপককাহিনি হিশাবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। হেলমুথ কেইজার, এইচ জে স্কোয়েন্স, বের্নহার্ড র‌্যাঙ্গ এবং উইলি হ্যাস-এরা কেউ কেউ ভুল পথে কিংবা ব্রডের রাজপথ ধরেই এগিয়ে গেছেন কাফকার প্রতিভার প্রাসাদকে স্পর্শের জন্য। উপন্যাসগুলোকে তারা সেভাবে ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেনও। কিন্তু তাদের এই ভাষ্য ছিল বেশিরভাগই মনগড়া; গভীর বাস্তববোধের কোনো ধারণা ও প্রতিফলন তাতে নেই। অন্যদিকে, কাফকার কোনো লেখা পড়ে, এমনকি তার চিঠিপত্রগুলো পড়লেও মনে হয় না তিনি সে রকম কোনো উদ্দেশ্যের দিকে হাত বাড়িয়েছেন। ধর্মীয় বা অতিপ্রাকৃত নয়, পশ্চিমা পুঁজিবাদের ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতায় মানুষের বাস্তব জীবনের অবস্থাটিই ছিল কাফকার দেখার বিষয়। তিনি খুব ভালোভাবেই দেখেছিলেন যে পুঁজির শক্তিমত্তা যেখানেই নিজেকে দেবতুল্য করে তুলেছে সেখানেই সে ধীরে ধীরে তার নিজের ধর্মীয় আবহটি তৈরি করে নিয়েছে। এবং যেখানেই সে ঈশ্বরের মতো আচরণ করতে শুক্ত করেছে সেখানেই সে নিজের প্রতি মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছে ধর্মীয় অনুভূতিগুলো। অবস্থাটি যখন ঠিক এ রকম হয়ে ওঠে তখন তাকে ধর্মীয়ভাবে ব্যাখ্যা করার অবকাশ থাকে বৈকি। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে এটা ঈশ্বরের প্রত্যাদিষ্ট সেই ধর্মগুলোর কোনোটাই নয়; এ হলো পুঁজির নিজের হাতে গড়া এক ধর্ম। এবং পুঁজি নিজেই এই ধর্মের সার্বভৌম ঈশ্বর। আর আমরা হচ্ছি এই পুঁজির পিঁচুটি মাখা ধর্মীয় জগতের বাসিন্দা।

কাফকার আবিষ্কৃত এই জগৎ যে কত অদ্ভুত এবং ভিন্ন স্বভাবের তার একটি নমুনা দেখা যাক। দস্তয়েভস্কির অপরাধ শাস্তি উপন্যাসের রাস্কলনিকভ-এর কথা অনেকেরই মনে থাকতে পারে। উপন্যাসের একটি পর্যায়ে আমরা দেখতে পাই যে রাস্কলনিকভ তার অপরাধের বোঝা বহন করতে পারছে না, সে সুখের অন্বেষণ করতে গিয়ে নিজের স্বাধীন ইচ্ছাকে শান্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ ‘অপরাধ অনুসন্ধান করছে শাস্তির।’

কিন্তু কাফকার ক্ষেত্রে ব্যাপারটি একেবারে উল্টে গেল। যেমন বিচার-এর দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত জোসেফ কে’ তার শাস্তির কারণ জানে না। দেখা যাচ্ছে এই শাস্তিকে সে মেনেও নিতে পারছে না, এই শাস্তির কারণ না জানা পর্যন্ত তার স্বস্তি নেই। এই কারণে কাফকার উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই ‘শাস্তি  খুঁজে ফিরছে অপরাধকে’।

 

kaf-3

 

কাফকার উপন্যাসে এই বিপরীত গতিকে আমরা যে প্রেক্ষিতে ঘটতে দেখছি তা কি কাফকার কল্পনার জগৎ থেকে এসেছিল নাকি বাস্তবেই বিদ্যামান ছিল—এই প্রশ্নটি আমাদের কাছে খুবই জরুরি। এটা সত্য যে কাফকা যে সময়ে লিখেছিলেন তখনও পর্যন্ত ধনতান্ত্রিক সমাজ তার ঐতিহাসিক বিকাশের শীর্ষে পৌঁছায় নি। কিন্তু তার ঝলমলে আয়োজন থেকেই কাফকা পরবর্তী অবস্থাটি এবং এর বিপত্তিগুলো অনুমান করে নিয়েছিলেন প্রায় নির্ভুলভাবেই। এ প্রসঙ্গে আর্হেন্তিনার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক এর্নেস্তো সাবাতো’র একটি মন্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। তার মতে :

উনিশ শতকে যখন প্রগতির ধুম চলছে তখন দস্তয়েভস্কি, নীটশে এবং কিয়ের্কেগার্ড-এর মতো লেখক এবং চিন্তাবিদরা তাদের কালে গণ্ডীভূত ছিলেন না; ঐ সময় তারা বিজ্ঞানীদের আশাবাদকে উপেক্ষা করে আমাদের জন্য পুঞ্জীভূত করে রেখে গেছেন বিপত্তির এক পূর্বাভাস—যা কাফকা, সার্ত্রে এবং ক্যামু চিত্রিত করেছেন।

সাবাতো ভুল বলেন নি। এবং কাফকাও ভুলভাবে দেখেন নি তার সমকাল ও মানবজাতির ভবিষ্যৎকে। কাফকার উপন্যাসগুলোয় আমরা যে সমাজ এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা দেখতে পাই তা ধনতান্ত্রিক। এই ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা তার শক্তিমত্তা বিকাশের স্বার্থে সমাজের ক্রিয়াকর্মকে এক ধরনের আমলাতান্ত্রিক জালে আবদ্ধ করে রাখে। প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে ওঠে অন্তহীন গোলকধাঁধার মতো। আর এ কারণে ব্যক্তি ক্রমশ হয়ে পড়ে নৈর্ব্যক্তিক। কাফকা তার উপন্যাসে এই বিপত্তিরই পূর্বাভাস দিয়েছেন যা দেশে দেশে আমলাতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর মধ্যে অভিব্যক্ত। Totalitarian এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিশেষ করে, তার চূড়ান্ত বিকাশের পর্যায়ে, ব্যক্তি ও সমষ্টির বিভেদ রেখাটি মুছে যায়, রাষ্ট্র ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে একটি বিশাল পরিবার। এমনই এক পরিবার যেখানে প্রতিটি নাগরিকই ছোট্ট শিশুর মতো যে তার বাবা মার কাছ থেকে কোনো কিছুই লুকাতে পারে না।


কাফকা যে-জগৎ আমাদের সামনে উন্মোচন করেছেন তা হচ্ছে Totalitarian রাষ্ট্রেরই কাজ যেখানে শ্রমিক আর শ্রমিক নয়, বিচারক আর বিচারক নয়; এমনকি মোল্লা পুরুতও রাষ্ট্রের কর্মচারী বা প্রতিষ্ঠানের নিয়মের দাস।


কাফকার উপন্যাসের চরিত্রদের সম্পর্কে একটি কথা খুবই প্রচলিত তারা নাকি মানসিকভাবে উদ্বাস্তু এবং নিঃসঙ্গ। উদাহরণ স্বরূপ বিচারএর কে’র কথা বলেন অনেকেই। এই মন্তব্য শুধু আমাদের এখানেই নয়, পশ্চিমের সমালোচকরাও করেছেন এক সময়। এই মন্তব্যকে আরও প্রসারিত করা হয় এই বলে যে উল্লেখিত চরিত্রগুলো তাদের নিঃসঙ্গতার অভিশাপ কাটিয়ে ওঠার প্রাণপণ চেষ্টা করে। তাদের এই ধারণা কাফকা সম্পর্কে শুধু বিভ্রান্তিকরই নয় তা একই সাথে অসত্যও বটে। উপরন্তু, কাফকার মহত্বকে খাটো করে দেখারও চেষ্টা এটি। কাফকার লেখায় এই ধারণার বরং উল্টোটাই দেখতে পাই। বিচার-এর শুরুতেই আমরা জোশেফ কে’ নামের এক ভদ্রলোককে দেখতে পাই যিনি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। একটি বাসায় তিনি একাকী থাকেন। সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য তিনি প্রায় প্রস্তুত। অবশ্য নাস্তাটা এখনও করা হয় নি। বাড়িওয়ালীর রাঁধুনি রোজই সকাল আটটায় তার নাস্তা দিয়ে যায়। কিন্তু আজ সে আসছে না কেন? ব্যাপার কী? এ রকম তো কোনো দিন হয় না। অবশেষে কিছুটা বিরক্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে সে ঘণ্টা বাজায়। আর তখনই তার দরজায় এনা নয়; এক অচেনা লোক এসে দাঁড়ায়। জোশেফ কে’ ধীরে ধীরে জানতে পারে লোকটি একজন প্রহরী এবং কে’কে গ্রেফতার করা হয়েছে। এবং আমরা এও লক্ষ করি যে কে’-এর একাকিত্বের জীবনকে তারা প্রতি মুহূর্তে ক্ষুণ্ন করছে। সে আদৌ একা হতে পারছে না। কোর্ট তাকে অনুসরণ করছে, তার সাথে কথা বলছে—এটা তার ভাবনার মধ্যে কাটার মতো বিধে আছে। তার একাকিত্বের জীবন প্রতি মুহূর্তে ধর্ষিত হচ্ছে। তার ক্যাসেল উপন্যাসেও একই অবস্থা।

 

kaf-4

 

ভূমিজরিপকারী কে’ নামের এই চরিত্রটির গতিবিধি লক্ষ করার জন্য ক্যাসেল থেকে একজন লোক দেয়া হয়; তারা প্রতি মুহূর্তে তাকে অনুসরণ করে। সে কখনোই একা হতে পারে না। যখন সে ফ্রিডার সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলছে তখনও সেই লোক দুটি কাছাকাছি অবস্থান করছে। অর্থাৎ প্রতিটি মুহূর্তে রহস্যময় প্রতিষ্ঠানগুলো কাফকার চরিত্রগুলোর একাকিত্বকে হরণ করছে নানান ছলছুতোয়। আর এটাই হচ্ছে চরিত্রগুলোর ট্রাজেডি। কাফকার আবিষ্কৃত চরিত্রগুলোর আরেকটি দিকও খুবই লক্ষ করার মতো, কাফকা তার চরিত্রদের মন কিংবা মননের দিকে আলোকপাত খুব একটা করছেন না। এ ব্যাপারে কাফকা আমাদের প্রায় কিছুই বলেন না। কিন্তু ঘটনা, চরিত্র এবং পরিবেশ ও পরিপ্রেক্ষিতকে যেভাবে উপস্থাপন করছেন তাতেই আমরা বুঝে নিতে পারছি কেন তিনি সেই দিকটা উল্লেখ করেন না। কিংবা সে সবের মধ্য দিয়েই পরোক্ষে তিনি সব বলে যাচ্ছেন। যেমন মেটামরফসিস-এর গ্রেগর সামসার কথাই ধরা যাক; সে একটি বিশাল পোকায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। এই অবস্থায় আমরা লক্ষ করি সে কিভাবে যথাসময়ে অফিসে যাবে এটাই তার একমাত্র চিন্তার বিষয়। অফিসের নিয়ম শৃঙ্খলা এবং অফিসের প্রতি কর্মনিষ্ঠা ছাড়া তার মাথায় আর কিছুই নেই। কাফকার অন্যান্য চরিত্রের মতো এই সামসাও একজন কর্মচারী ছাড়া নিজেকে আর কিছুই ভাবতে পারছে না। এই আমলাতান্ত্রিক কর্মচারীর জগতে কোনো উদ্ভাবনার অবকাশ নেই, কোনো স্বাধীন চিন্তা বা কর্মকাণ্ড নেই; কেবল নিয়মের শৃঙ্খল আর শৃঙ্খলের নিয়ম ছাড়া। এটাই হচ্ছে কর্মচারীর আনুগত্যের জগৎ। এই জগতে কর্মচারী হচ্ছে বিশাল প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের একটি ছোট্ট অংশ যার লক্ষ এবং ব্যাপ্তি সে জানে না। কাফকার দেখা এই জগৎ এমনই অদ্ভুত যেখানে সবকিছুই যান্ত্রিক হয়ে ওঠে এবং এই জগতের বাসিন্দারা যা করছে তার অর্থ তাদের জানা নেই।

কাফকা যে-জগৎ আমাদের সামনে উন্মোচন করেছেন তা হচ্ছে Totalitarian রাষ্ট্রেরই কাজ, যেখানে শ্রমিক আর শ্রমিক নয়, বিচারক আর বিচারক নয়; এমনকি মোল্লা পুরুতও রাষ্ট্রের কর্মচারী বা প্রতিষ্ঠানের নিয়মের দাস। আসলে এই রাষ্ট্র হচ্ছে কতগুলো অফিসেরই সমষ্টিমাত্র যেখানে অফিস  ও কর্মচারীদের কাজ হচ্ছে অচেনা মানুষ আর ফাইলপত্র নিয়ে। যান্ত্রিক এই রাষ্ট্রে মানবীয় সব কর্মকাণ্ডই দপ্তরকেন্দ্রিক কিংবা নথি-কেন্দ্রিক। মানুষের যাবতীয় কাজকর্ম—এখানে—অফিস থেকে অফিসে ঘুরে বেড়ায়। বাস্তবতার এই ভূতুড়ে স্বভাব এবং নথিপত্রের জাদুকরী বাস্তবতায় কোনো ব্যক্তি নেই, সমষ্টি ছাড়া।

মিলেনার কাছে এক চিঠিতে একবার কাফকা অফিসের প্রকৃতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে চমৎকার এক মন্তব্য করেছিলেন :

অফিস কোনো নির্বোধ প্রতিষ্ঠান নয় বরং নির্বোধের চেয়ে অনেক বেশি খামখেয়ালিতে ভরা।

কাফকা এই খেয়ালি বাস্তবতাকে ধরতে চেয়েছিলেন যেখানে সত্য খামখেয়াল থেকে অবিভাজ্য এবং সে নিজেই নিজেকে বুঝে উঠতে পারে না; যখনই কেউ একে বুঝতে চায় তখনই তা মিথ্যা হয়ে যায়। ধাঁধাময় এই বাস্তবতার আধুনিক পুরাণকে কাফকা উপস্থাপনের কৌশলে চমকপ্রদ করে তুলেছেন। কাফকার ক্ষেত্রে এই কৌশলটি ছিল কবিতায় রূপান্তরের। বলা যেতে পারে বিষয়কে উপন্যাসের বৃহত্তর কবিতায় রূপান্তর করেছেন তিনি। মানুষের খুবই সাধারণ একটি গল্প তিনি এমনই এক গদ্যকবিতায় রূপান্তর করেছেন যার সৌন্দর্য, তার আগে কখনো দেখা যায় নি।

 

[কাফকা বিষয়ক মিলান কুন্ডেরা, অক্তাবিও পাস এবং কাফকার রচনাসম্ভার পাঠের অভিজ্ঞতা এই লেখার মূল ভিত্তি।]
রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন

জন্ম ১৯৬৫, শরিয়তপুরে। লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। কর্মজীবনের শুরু থেকেই সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে জড়িত। ভিন্ন পেশার সূত্রে মাঝখানে বছর দশেক কাটিয়েছেন প্রবাসে। এখন আবার ঢাকায়। ইংরেজি এবং স্পানঞল ভাষা থেকে অনুবাদের পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি সাহিত্য নিয়ে নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বিশ।

প্রকাশিত বই :
অনূদিত কাব্যগ্রন্থ—
গেয়র্গ ট্রাকলের কবিতা (মঙ্গলসন্ধ্যা প্রকাশনী, ১৯৯২)
সি পি কাভাফির কবিতা (শিল্পতরু প্রকাশনী, ১৯৯৪)
টেড হিউজের নির্বাচিত কবিতা (বাংলা একাডেমী, ১৯৯৪)
আকাশের ওপারে আকাশ (দেশ প্রকাশন, ১৯৯৯)

অনূদিত সাক্ষাৎকার গ্রন্থ—
সাক্ষাৎকার (দিব্যপ্রকাশ, ১৯৯৭)
কথোপকথন (বাংলা একাডেমী, ১৯৯৭)
অনূদিত কথাসমগ্র ( কথাপ্রকাশ)

সংকলন, সম্পাদনা ও অনুবাদ—
মেহিকান মনীষা: মেহিকানো লেখকদের প্রবন্ধের সংকলন (সাক্ষাৎ প্রকাশনী, ১৯৯৭)
খ্যাতিমানদের মজার কাণ্ড (মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৭)
হোর্হে লুইস বোর্হেস: নির্বাচিত গল্প ও প্যারাবল (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
হোর্হে লুইস বোর্হেস: নির্বাচিত কবিতা (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
হোর্হে লুইস বোর্হেস: নির্বাচিত সাক্ষাতকার (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
হোর্হে লুইস বোর্হেস: নির্বাচিত প্রবন্ধ ও অভিভাষন (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
প্রসঙ্গ বোর্হেস: বিদেশি লেখকদের নির্বাচিত প্রবন্ধ (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০)
রবীন্দ্রনাথ: অন্য ভাষায় অন্য আলোয় (সংহতি প্রকাশনী, ২০১৪)
মারিও বার্গাস যোসার জীবন ও মিথ্যার সত্য (সাক্ষাৎ প্রকাশনী, ২০১৫)

গৃহীত সাক্ষাৎকার—
আলাপচারিতা ( পাঠক সমাবেশ, ২০১২)

কবিতা—
আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি (শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০১৪)

জীবনী—
হোর্হে লুইস বোর্হেসের আত্মজীবনী (সহ-অনুবাদক, সংহতি প্রকাশনী, ২০১১)

প্রবন্ধ—
দক্ষিণে সূর্যোদয়: ইস্পানো-আমেরিকায় রবীন্দ্র-চর্চার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস( অবসর প্রকাশনী, ২০১৫)

ই-মেইল : razualauddin@gmail.com
রাজু আলাউদ্দিন