হোম গদ্য কবিতা এবং আমরা

কবিতা এবং আমরা

কবিতা এবং আমরা
892
0

তারকোভস্কির ‘নস্টালজিয়া’ ও ‘দ্য মিরর’ ছবি দুটো পরপর দেখার পর এ-লেখা লিখতে বসা, ফলে এটা একটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল যে, সিনেমা আর কবিতার মধ্যে পার্থক্য কী বা কোথায়? তারকোভস্কি বলছেন পার্থক্য নাই। দুটো ছবি দেখে এ-কথার বিপরীতে দাঁড়ানো মুশকিল। নিজের বা নিজেদের কারবারটা ঠিক রাখতে হবে বলে হুট করে বলে ফেলি যে পার্থক্যটা ভাষার। একটা দেখা থেকে শোনার ইন্দ্রিয়গত জগতে টেনে নিয়ে যায়, আরেকটা তার উল্টো। একটা দৃশ্যের কবিতা, আরেকটা শ্রুতির। তাহলে কি দুটোই কবিতা—সিনেমা আর কবিতা?

একথা অস্বীকারের উপায় নেই যে, ভাষাকে নিয়েই নান্দনিকতার কাজকারবারের হিশাবে কবিতা অনেক এগিয়ে। কবিতা আসলে ভাষা সৃষ্টি করে। বয়ান বা আখ্যান বা ইমেজ-প্রতীক-মেটাফর সবকিছু কবিতায় ভাষা হয়ে যায়, ঘটনা হয় না। যেকোনো ভাষাতেই লিখি না কেন সেটা কবিতার নিজস্ব ভাষার শক্তি না পেলে হতে পারে না।


দর্শন কবিতা নয়। দর্শনের ভাষা আর কবিতার ভাষা কখনোই এক হতে পারে না।


আমরা এই কবিতা লিখি। ভাষার অসমাপ্ত বিন্দুগুলো তৈরি করি। আর এটা অসমাপ্ত হলেই সার্থক। সমাপ্ত কিছুই কবিতা নয়। নস্টালজিয়ার মানুষটা অতিলৌকিক পানির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় পৌঁছুতে চায়। কোথাও না। (নাকি?) ডু ইউ ওয়ান্ট অ্যা গার্ল অর অ্যা বয়? দ্য মিরর-এ প্রেমিকের বা স্বামীর এ প্রস্তাবের পরেই পর্দায় যে মাশাকে, যে দুই শিশুকে টাইম-স্পেসের সীমারেখার বাইরে দেখতে পাই, তার নির্মাণের বিষয়টা শুধু কাব্যিক নয়, কবিতামূলক। কাব্যিকতা আর কবিতা আলাদা জিনিস। কাব্যিক হলেই তা কবিতা হয় না, আবার কাব্যিকতা ছাড়াও কবিতা নৈবচ।

আমাদের কবিতা আশা করছি এসব সূত্র নিয়েই গড়ে ওঠেছে। এক সময় রোমানরা সাহিত্য-আলোচনাকেও কবিতা করতে চেয়েছিল। তারা পরে বুঝেছে সেটা কবিতা না। হোরেস কাব্যে ‘আর্স পয়েটিকা’ লিখেছেন, কিন্তু কবিতা লিখেছেন আলাদাভাবে। দর্শন কবিতা নয়। দর্শনের ভাষা আর কবিতার ভাষা কখনোই এক হতে পারে না। দর্শন ভাষাকে আশ্রয় করে হয়, সে ভাষা কথ্য বা লেখ্য, আর কবিতা নিজেই ভাষা। মানুষের ইনার পার্সোনালিটি বোঝার ভাষা হচ্ছে কবিতা। জিনিসটা ধোঁয়াটে হয়ে থাকল বুঝি-বা। অমীমাংসিত। নস্টালজিয়া বা দ্য মিরর বা দ্য স্যাক্রিফাইস প্রত্যেকটাই অমীমাংসিত। দৃশ্যের কবিতা। এ আলোচনাটুকুও ব্যাখ্যার কবিতাই না হয় হলো।

আমাদের কবিতা। এখন—একটা ভাষা তৈরি করতে চায়। মুশকিল হলো, কবিতা নিজেকে যে ভাষা হিশেবে দাঁড় করাতে চায়, সেটা স্বয়ম্ভু বা স্বেচ্ছাচারী হতে পারে না। ভাষা বিশৃঙ্খলা থেকে সামাজিক রূপ নিয়েছে। কিন্তু কবিতার শুরুতেও সে স্বেচ্ছাচারের ক্ষমতা নেই। দেশকাল, অর্থ, বিচার-আচার, সমাজ, প্রতিষ্ঠান সবকিছু তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। সবকিছুর ভেতর দিয়ে যে মাপকাঠির নাম পাঠক বা পাঠ, সেটা কবিতার সঙ্গে হাঁটার সময় এটা মনে রাখে যে কে কবিতাটা পয়দা করেছে, তার গাঁও-দেশ কোথায়। আমরা কি তার সে হিশাবটাকে আমলে নিচ্ছি, নাকি নিচ্ছি না—এটা বিচার করার বিষয়।


সাহিত্যের বা কবিতার ভাষা পাল্টিয়ে পরিবর্তন বা বিপ্লব আনা যাবে না, ভাষার শ্রেণিকে ভাঙার জন্য নিজের বা নিজেদের শ্রেণিটাকে না-ভাঙলেই নয়।


আমাদের বলার একটা প্যাটার্ন তৈরি হয়ে যায়। যা বলতে চাই, তারও। আর তার একটা পরম্পরাও। সেটা না বুঝলে মানুষের ভেতরে যাওয়া যাবে না। ভেতরে কী, ঘরের বারান্দাতেও গিয়ে ওঠা যাবে না। তবে আত্মরক্ষার হাতিয়ার হলো—আমরা একটা শ্রেণি তৈরি করে ফেলেছি। আমরা যারা কবিতা বা শিল্পসাহিত্য করি, আমাদের শ্রেণিটা ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত হয়ে গেছে। অস্বীকারের উপায় নেই। আমাদের চাওয়া-পাওয়া, ভালো-মন্দ, বোঝাপড়া, ভঙ্গি-বিষয় আমাদের শ্রেণিটার মধ্য দিয়ে সূচিত।

ফলে তার নিজস্ব একটা ভালো লাগার বা ভালো লাগাবার তৎপরতা আমাদের করতে হয়। তার আলাদা নন্দন তৈরি হয়ে যায়। সে নন্দনের চর্চায় যারা ঢোকেন, তারা শিল্পী বা শিল্পউপভোক্তা। নিজস্ব একটা প্রকরণ তার ইতিহাস লিখতে থাকে বলেই অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষও মহা ‘মহাভারত’ স্বাদ নিতে পারে, ‘মনসামঙ্গল’ দেখে শুনে কাঁদে, হাসে। সে ভাষা নিত্যকার ভাষা না, প্রয়োজনের জন্য তৈরি করা ভাষা না, তবু নিরক্ষররাও বুঝে নিতে পারে তার মর্ম-সৌন্দর্য-মেসেজ। ইউসুফ-জোলেখা গ্রামকে-গ্রাম আলোড়িত হয়। কিন্তু এখনকার এ আধুনিক কাব্য? তার ‘জনবিমুখতা’ কি শুধুই কৃত্যহীনতার অনিবার্যতা?

প্রাচীন গ্রীসে ট্র্যাজেডিগুলো আপামর জনগণের জন্যই হতো। আর তার ভাষা নিশ্চয় নিরলঙ্কার বা দৈনন্দিন ছিল না। নৈমিত্তিকতার বাইরে ছিল সে ভাষার বা বাক্যবিন্যাসের জগৎ। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ভাষাটাই মূল ব্যাপার না। শ্রেণি নির্ধারিত হয়ে গেছে। আমরা জ্ঞানে-অজ্ঞানে মেনে নিয়েছি। (নেই নি?) আমাদের সব চিন্তা বা কাজ কিংবা তৎপরতা আমাদের শ্রেণিটাকে বলবৎ রাখা ব্যতিরেকে হচ্ছে না। আমরা গণতন্ত্র-এর শরীরকে আপাতত চাঙ্গা ও রোগমুক্ত রাখার ব্রত নিয়েছি। সাহিত্যের বা কবিতার ভাষা পাল্টিয়ে পরিবর্তন বা বিপ্লব আনা যাবে না, ভাষার শ্রেণিকে ভাঙার জন্য নিজের বা নিজেদের শ্রেণিটাকে না-ভাঙলেই নয়। এটা সোজা কথা। অধিবিদ্যার মধ্যে ডুবে ভাষা নিজের শ্রেণির আলাদা আলাদা তলানি খুঁজে নিয়েছে মানি, কিন্তু আধুনিক মানুষ তার নিজকে যে গুপ্ত বিশাল অধিবিদ্যার মধ্যে ডুবিয়েছে, তার সুরাহা না হলে ভাষাকে অতল থেকে তুলে আনবে কে?


সুতরাং সম্পূর্ণত নিজেকে না বদলিয়ে কবিতাকে বা কবিতার ভাষাকে বদলানো যাবে না।


শিল্পকলা এ পথগুলো কখনোই দেখায় নি—আশ্চর্য হলেও সত্য। সে টিকে আছে নিজের শ্রেণি তৈরি করে তার আলোছায়ায়, ক্ল্যাসিক-রোমান্টিক-রিয়েলিস্টিক-সিম্বলিক-মডার্ন-পোস্ট মডার্ন সব ভাষাই অধিবিদ্যার পোশাক পরে সাহিত্যবাবু হয়েছে। এটা সাহিত্যের নিয়তি। নইলে দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি আয়ু নিয়ে অধিবিদ্যামূলক সাহিত্যগুলোই টিকে থাকত না। এটা থিওরি না, প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতার ব্যাপার। আর কবিতাকে আলাদা একটা ফর্ম ধরে বা মেনে নিলে বলতে হয় কবিতা সবচেয়ে মেটাফিজিক্যাল।

সুতরাং সম্পূর্ণত নিজেকে না বদলিয়ে কবিতাকে বা কবিতার ভাষাকে বদলানো যাবে না। নিজেকে এবং নিজের নিজকে মানুষের সাথে একাত্ম, অভেদ না করে ভাষাকে মানুষিক করা যাবে না। আপাতত এ ‘অমানুষিক’ ভাষার কবিতা নামক নিজস্ব নন্দন-এলাকার মধ্যে ফুল ফোটানোর বা ফল ফলানোর খেলায় মেতে ওঠা জরুরি। তার মহত্তম চাষীর নামই কবি। এক্ষণে কবি হতে পারলেই আমাদের সার্থকতা। দীর্ঘায়ু আর মহত্তম কবি। তার জন্য ধ্যান আর সাধনা ছাড়া পথ নেই।

আপাতত এক একজন কবি হতে পারলেও ঢের!

শুভাশিস সিনহা

জন্ম ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৮, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমিতে নাট্যপ্রশিক্ষক।

প্রকাশিত বই—

ডেকেছিলাম জল (কবিতা)
অক্ষর নতুন করে চিনি (কবিতা)
বেলা দ্বিপ্রহর (কবিতা)
হওয়া না-হওয়ার গান (কবিতা)
দ্বিমনদিশা (কবিতা)
আবছায়াদের রূপকথা (গল্প)
প্রতিরূপকথা (নাটক)
কুলিমানুর ঘুম (উপন্যাস)
ইঞ্জিন (উপন্যাস)
ভাষা, কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ (প্রবন্ধ)
রবীন্দ্রনাথ : গ্রামের ছবি (গবেষণা)
মণিপুরি সাহিত্য সংগ্রহ ২খণ্ড (অনুবাদ ও সম্পাদনা)

ই-মেইল : shuvashissinha@yahoo.com