হোম গদ্য কবিতার শহিদ : ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা

কবিতার শহিদ : ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা

কবিতার শহিদ : ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা
2.22K
0

ঘুম দেবো আমি এক মুহূর্ত,
এক মুহূর্ত, একটি মিনিট, এক শতাব্দী;
কিন্তু সবাই জেনে রেখ আমি এখনো মরি নি…
—‘কালো মৃত্যুর গজল’, ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা


ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকোর (১৮৯২-১৯৭৫) ফ্যাসিবাদী প্যারামিলিশিয়া ব্ল্যাক স্কোয়াডের সদস্যরা গ্রানাদায় এই দিনটিতে স্পেনের প্রাণস্ফূর্তিভরা কবিকে গুলি করে হত্যা করে।


১৯৩৬ সালের ১৯ আগস্ট ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকার পুনর্জন্ম ঘটল। ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকোর (১৮৯২-১৯৭৫) ফ্যাসিবাদী প্যারামিলিশিয়া ব্ল্যাক স্কোয়াডের সদস্যরা গ্রানাদায় এই দিনটিতে স্পেনের প্রাণস্ফূর্তিভরা কবিকে গুলি করে হত্যা করে। লোরকা তাঁর রক্তাক্ত মৃত্যুর পটভূমিতে নতুন এক জীবনে প্রতিষ্ঠা পান। এরপর দুনিয়াজুড়ে যে মমতাভরা গভীর ঔৎসুক্যে লোরকার নাম ফিরে ফিরে আসতে শুরু করে, তাঁর কবিতা ও তিনি নিজে যে ভালোবাসায় অভিষিক্ত হতে শুরু করেন, তাতে আর কখনো কোনো ছেদ পড়ে নি। তবে তার কারণ শুধু এই নয় যে তিনি ছিলেন কবিতার এক মর্মান্তিক শহিদ; এও তার এক কারণ যে পরবর্তী ইতিহাসপর্বের আত্মিক শূন্যতা ও সৃষ্টিশীলতার টানাপোড়েন, বাস্তবতা ও স্বপ্নের দ্বন্দ্ব, রাজনীতির জটিলতা ও মানুষের সঙ্গে তার যোগের অসংগতি, ক্ষমতার নিষ্পেষণ ও মানুষের মুক্তির লড়াইকে অর্থপূর্ণভাবে বুঝে নেওয়া যায় লোরকার মধ্য দিয়ে—লোরকার কবিতার পাশাপাশি তাঁর জীবন ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। তাঁর কবিতায় যেমন ধরা আছে নবজাত অভিনব ও জটিল নন্দনভাবনাগুলো পেরিয়ে মানুষের বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে অভিন্ন একটি তলে যুক্ত করার অভিপ্রায়, তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডও তেমনই তুলে ধরে আছে সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে ধর্ষক ক্ষমতার চিরন্তন বিরোধের রক্তচিহ্ন।

এই তো, মাত্র তিন বছর আগেও, ২০০৯ সালে, খবরের কাগজের শিরোনাম মন্থন করে কয়েক মাস ধরে আবার খবর হয়ে রইলেন লোরকা। অন্য আর-সব গণবিরোধী অভ্যুত্থানের নায়কদের মতো ফ্রাংকোও তাঁর তৎপরতা শুরু করেছিলেন সৃষ্টিশীল মানুষদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে। লোরকা ছিলেন সেই মৃত্যুময় সময়ের সূচনাপর্বের বলি। ফ্রাংকো ও তাঁর দক্ষিণপন্থি ফালাঞ্জ অনুসারীরা—তাদের প্রায় দীর্ঘ চার দশকের শাসনামলে—লাখ লাখ কবি, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী ও গণতন্ত্রকামী মানুষকে হত্যা করে। স্পেনের গৃহযুদ্ধের তিন বছরব্যাপী সময়েই তারা প্রাণহরণ করে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার মানুষের। এই হত্যাকাণ্ডের কথাই তারা কখনো স্বীকার করে নি। লোরকা-হত্যার দায় নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে কই! তাই কোথায় কীভাবে লোরকাকে হত্যা করা হয়, সে কথা কখনো নিশ্চিত করে জানা যায়নি। লোরকার অন্তর্ধানের পর ফ্রাংকো সরকার তাঁকে নিয়ে লুকোচুরি করতে থাকে। বহু পরে লোরকার আইরিশ জীবনীকার ইয়ান গিবসন লোরকাকে কোথায় হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে—ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বলে দাবিদার কয়েকজন লোকের সঙ্গে কথা বলে—সে রকম একটি জায়গা চিহ্নিত করেন।

১৯৭৫ সালে ফ্রাংকো মারা যাওয়ার পরও স্পেনের শাসনভার থেকে যায় ফ্রাংকো-অনুসারী কট্টর দক্ষিণপন্থিদেরই হাতে। তাঁরা পেছনে ফিরে ইতিহাসের দিকে না তাকানোর ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেন। পাস করেন ‘পাক্তো দে ওলভিদো’ বা ‘বিস্মৃতির চুক্তি’ নামে একটি আইন। সে পরিস্থিতি বদলাতে বদলাতে আরও ৩০ বছর পার হয়ে যায়। জাতির অতীতের ছায়াচ্ছন্ন সত্য খুঁড়ে বের করার তাগিদে ২০০৭ সালে স্পেনের বামপন্থি হোসে লুইস রদরিকেস সাপাতেরোর সরকার ‘ঐতিহাসিক স্মৃতি আইন’ পাস করেন। এ আইনের বলে, অবশেষে, ‘বিস্মৃতির চুক্তি’ ছিন্ন করার অবকাশ ঘটে; ফ্রাংকোবাহিনীর গণকবরগুলো খুঁড়ে প্রিয়জনদের দেহাবশেষ উদ্ধার করে সেসব চিহ্নিত করার সুযোগ পান এতকাল অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ানো উত্তরসূরিরা।

তার পরও লোরকার সম্ভাব্য কবরে হাত পড়ে নি। সেই ক্ষেত্র তৈরি হয় ১৩টি ঐতিহাসিক স্মৃতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান একযোগে আদালতের কাছে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফ্রাংকো ও তাঁর ৩৪ জন সহযোগীর বিচারের দাবি তোলার পর। ধারণা করা হয়, ফ্রাংকো তাঁর ৪০ বছরের শাসনামলে যত মানুষকে হত্যা করেছেন, তার সংখ্যা পাঁচ লাখের কম হবে না। বিচারপতি বালতাসার গারসোন লোরকারটিসহ ১৯টি গণকবর খুঁড়ে ফ্রাংকোর নিষ্ঠুরতার আলামত খুঁজে বের করার আদেশ দেন। লোরকার উত্তরসূরিরা এ থেকে নীরবে সরে থাকতে চেয়েছিলেন। তাঁরা চান নি লোরকার দেহাবশেষ খুঁড়ে বের করা হোক; অহেতুক জনগুঞ্জরণে লোরকার শান্তিভঙ্গ ঘটুক। কিন্তু জনমতের চাপে তাঁরা অটল থাকতে পারেন নি। লোরকার দেহাবশেষ নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করার জন্য শেষ পর্যন্ত ডিএনএ পরখ করতেও তাঁরা রাজি হয়েছিলেন। অতঃপর মাটি খোঁড়া শুরু হলো। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে দিয়ে কোনো দেহাবশেষই সেখান থেকে উদ্ধার করা গেল না। নিজের মৃত্যু ও নিখোঁজ মরদেহ নিয়ে সেই যে অন্তর্দৃষ্টিময় একটি কবিতা লিখেছিলেন লোরকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে, তা-ই যেন একেবারে অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল তাঁর হত্যাকাণ্ডের পরে:

আমি টের পেলাম আমাকে তারা খুন করেছে।
কাফে, গোরস্থান আর গির্জা তন্নতন্ন করে তারা খুঁজল আমাকে,
উঁকি দিল পিপায় আর দেরাজে,
তিনটি কঙ্কাল লণ্ডভণ্ড করে উপড়ে আনল সোনার দাঁত,
কিন্তু তারা আমাকে আর কখনো খুঁজে পেল না,
আমাকে তারা খুঁজে পায় নি?
না। আমাকে তারা আর খুঁজে পায় নি।


গান ও নাটকের প্রতি লোরকার তীব্র আবেগ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একবিন্দুও ম্লান হয় নি।


এ ঘটনায় খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন লোরকার জীবনীকার ইয়ান গিবসন। তারপরও বেশ জোর দিয়ে বলেছিলেন, খোঁড়াখুঁড়ির পরিসর আরও বাড়ালে অবশ্যই কিছু না কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে কেউ কেউ অন্য আরেকটি সন্দেহের কথাও বলেছেন। লোরকার অন্তর্ধানের পর আন্তর্জাতিক বলয়ে ফ্রাংকোর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। সমালোচনা অনেক দূর এগিয়ে গিয়ে যাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলতে না পারে, সেই আগাম সতর্কতা থেকে লোরকার মরদেহ হয়তো ফ্রাংকো অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলেছেন, এই ছিল তাঁদের সন্দেহ।

 

দুই

ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকার জীবন শুরু হয়েছিল, তাঁর সূচনাপর্বের কবিতার মতোই, চারপাশের পৃথিবীর আনন্দময় উদ্‌যাপনের মধ্য দিয়ে। বাবা ফেদেরিকো গারসিয়া রদরিগেস ছিলেন অবস্থাপন্ন খামারি, মা ভিসেন্তা লোরকা শিক্ষয়িত্রী। দুজনই ছিলেন উদার, সংস্কৃতিমান ও প্রগতিশীল। তাঁদের প্রভাব ও প্রযত্নে চিত্তের এক প্রসারতার মধ্যে লোরকার চেতনার উন্মেষ ঘটে। পাশাপাশি আন্দালুসিয়ার গ্রামীণ নিসর্গও তাঁর মন রাঙিয়ে তোলে, আরও পরে এ বর্ণবিভঙ্গ তাঁর কবিতায় উপচে পড়বে। তাঁকে যেমন, তেমনই তাঁর রচনাকেও এই প্রসার ও সজীবতা প্রবল স্বাস্থ্যময় করে রাখবে সব সময়।

৫ জুন ১৮৯৮-তে জন্মগ্রহণের প্রায় পর থেকেই লোরকাকে নানা শারীরিক অসুস্থতার ধকল সইতে হয়েছিল। মুখের অসুস্থতার জন্য তিন বছর বয়স পর্যন্ত তিনি কথা বলতে পারতেন না। পায়ের সমস্যার কারণে চার বছর বয়স অব্দি হাঁটতেও পারেন নি। এ কারণে অন্য কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে খেলতে পারার অক্ষমতা লোরকার চরিত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কল্পনাশক্তি ও চারপাশের জগতের রূপরসগন্ধ শুষে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণ। খামারবাড়ির কর্মীদের গান-গাথা-ছড়ার মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে প্রবেশ করেন আন্দালুসিয়ার সমৃদ্ধ জনসংস্কৃতি ও আরব ঐতিহ্যের জগতে। এভাবে নিজেরই অজান্তে কিশোর বয়সে তাঁর মধ্যে পরবর্তী কবিজীবনের বীজ রোপিত হতে শুরু করে।

কিশোর বয়সেই মা লোরকাকে উন্মুখ করে তুলেছিলেন গান আর নাটকের প্রতি। পিয়ানোয় কিশোর বয়সেই তিনি অসামান্য নৈপুণ্য অর্জন করেন। গিটারও রপ্ত করেন দ্রুত। সংগীত রচনায় হাত দেন কবিতা লেখারও বহু আগে। খুব কম বয়সে নাট্যাভিনয়ের অভিজ্ঞতাও হয়ে যায় তাঁর। গান ও নাটকের প্রতি লোরকার তীব্র আবেগ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একবিন্দুও ম্লান হয় নি। তাঁর কবিতা যে ভরে ওঠে গানের নানা উল্লেখে আর উপাদানে, পাশ্চাত্য সংগীতের স্যুইটস বা প্রাচ্যীয় ঐতিহ্যের গজল বা কাসিদার মধ্যস্থতায় গানের শৈলীর ভেতর দিয়ে যে তিনি অচেনা রূপের খোঁজ করেন কবিতার, ভাষায় নিয়ে আসেন এক অনায়াস ধ্বনিমাধুর্য, তাঁর বইগুলোর নামে যে ফিরে ফিরে হানা দিতে থাকে গান—গভীর গানের কবিতা, গীতিমালা বা স্যুইটস—সেসব তাই কোনো কাকতাল নয়। আর নাটকের সঙ্গে তাঁর সখ্য তো ছিল আমৃত্যু। নিজে লিখেছেন ১১টির মতো নাটক। মৃত্যুর কয়েক মাস আগেও লা বাররাকা নামে এক নাট্যদল নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন স্পেনের গ্রামেগঞ্জে। ১৯২১ সালে, মাত্র ২৩ বছর বয়সে, লোরকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) বিসর্জন নাটকেও অভিনয় করেছিলেন। কবি হুয়ান রামোন হিমেনেথের (১৮৮১-১৯৫৮) স্ত্রী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হিস্পানি ভাষার অনুবাদক সেনোবিয়া কামপ্রুবি আইমারের (১৮৮৭-১৯৫৬) ভাষান্তরিত সে নাটকে তাঁর সহ-অভিনেতা ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরবর্তীকালে বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার লুইস বুনুয়েল (১৯০০-১৯৮৩)।

গান, নাটক ও কবিতার চর্চা পাশাপাশি চললেও কবি হওয়ার বাসনা লোরকার জীবনের প্রথম ধাপে কখনো মুখ্য ছিল না। তিনি তাঁর জীবন পার করতে চেয়েছিলেন গান ও নাটকের ভেতর দিয়ে। লোরকা চেয়েছিলেন প্যারিসে গিয়ে গানে উচ্চতর শিক্ষা নিতে। তাঁর দীর্ঘদিনের পিয়ানো শিক্ষক আন্তোনিও সেগুরা মেসার প্রাণবিয়োগে সে ইচ্ছা অপূর্ণ রয়ে যায়। ১৯১৯ সালে লোরকা মাদ্রিদের রেসিদেনসিয়া দে এস্তুদিয়ান্তেসে দর্শনের ছাত্র হিশেবে ভর্তি হলে শুরু হয় তাঁর জীবনের দ্বিতীয় সোনালি সময়পর্ব। লোরকার বছর দুয়েক আগে সেখানে ছাত্র হিশেবে এসে যোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্রের এক ভবিষ্যৎ মুক্তিদাতা লুইস বুনুয়েল। তাঁরা যেন বন্ধু হওয়ার জন্য আগে থেকেই তৈরি হয়ে ছিলেন। বুনুয়েল তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন:

গ্রানাদা থেকে রেসিদেনসিয়ায় ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা এল আমার দুবছর পরে। ফেদেরিকো ছিল আকর্ষণীয় ও প্রখর। অভিজাত কাপড়-চোপড়ের প্রতি ওর আগ্রহ ছিল লক্ষণীয়। ওর টাইগুলো সব সময় ছিল নিখুঁত রুচির। কালো ঝকঝকে চোখসহ ওর চৌম্বক টান খুব কম মানুষের পক্ষেই এড়ানো সম্ভবপর ছিল। আমার চেয়ে দুবছরের বড়, এক ধনী ভূস্বামীর সন্তান। মাদ্রিদে এসেছিল দর্শন পড়তে। কিন্তু শিগগিরই তার পাট চুকিয়ে দিল, হয়ে উঠল সাহিত্যের নিবেদিত ছাত্র। অতি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ সবার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে গেল। তার রেসিদেনসিয়ার কামরা হয়ে উঠল মাদ্রিদের বুদ্ধিজীবীদের জনপ্রিয় আড্ডাস্থল।

আমরা দুজনই সঙ্গে সঙ্গে একে অপরকে পছন্দ করে ফেললাম। যদিও আমাদের মধ্যে মিল ছিল খুব সামান্যই—আমি ছিলাম আরাহোন থেকে আসা এক অশিক্ষিত গোঁয়ার, আর লোরকা এক অভিজাত আন্দালুসীয়—তবু বেশির ভাগ সময় আমরা একসঙ্গে কাটাতে শুরু করলাম। (অন্তত কিছুটা হলেও এই অমিলই সম্ভবত পরস্পরের প্রতি আমাদের আকর্ষণের কারণ ছিল।) বিকেলবেলায় আমরা বসতাম রেসিদেনসিয়ার পেছনদিকের ঘাসের ওপরে (সে সময়ে খোলা জায়গাটা ছিল আদিগন্ত বিস্তৃত)। লোরকা তার কবিতা পড়ে শোনাত। সে পড়ত আস্তে আস্তে, সুন্দর করে। ওর মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক জগৎ আমার ভেতরে উদ্ভাসিত হতে শুরু করল।


লোরকা-দালি-বুনুয়েলের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, পাগলাটে জীবন এবং ভাবনা ও উপলব্ধির আদান-প্রদান শুধু তাদের নিজেদের নয়, পরবর্তী সময়পর্বের কবিতা-চিত্রকলা-চলচ্চিত্রেও সুগভীর ছাপ রেখে যায়।


তাঁদের সুবিখ্যাত বন্ধুত্রয়ের তৃতীয় সদস্য, সালভাদোর দালি (১৯০৪-১৯৮৯), দৃশ্যপটে এসে ঢুকলেন সামান্য কিছু পরে। বুনুয়েল লিখছেন:

সালভাদোর দালি রেসিদেনসিয়ায় এল আমি আসার তিন বছর পর। সে ছিল কাতালোনিয়ার ফিগেরেস থেকে আসা এক আইনজীবীর সন্তান। একাডেমি অব ফাইন আর্টসে গিয়ে ভর্তি হলো সে। ওকে আমরা ডাকতাম ‘চেকোস্লোভাকিয়ার শিল্পী’ বলে। কেন, জীবনেও সেটা আর ভেবে বের করতে পারি নি। যা হোক, আমার মনে আছে, একদিন সকালে ওর কামরার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উঁকি মেরে দেখতে পেলাম, দারুণ একটা প্রতিকৃতির ওপর ও শেষ আঁচড় বোলাচ্ছে।

আমি দৌড়ে লোরকাকে গিয়ে বললাম, ‘চেকোস্লোভাকিয়া থেকে আসা শিল্পীটা দারুণ একটা ছবি এঁকেছে।’ কথাটা ছড়িয়ে পড়ল। সদ্যসমাপ্ত ছবিটি দেখার জন্য এক দঙ্গল মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ল দালির ঘরে। এক মুহূর্তের মধ্যে দলের একজন হয়ে গেল সে। লোরকার পাশাপাশি সেও হয়ে উঠল আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু।

লোরকা-দালি-বুনুয়েলের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, পাগলাটে জীবন এবং ভাবনা ও উপলব্ধির আদান-প্রদান শুধু তাদের নিজেদের নয়, পরবর্তী সময়পর্বের কবিতা-চিত্রকলা-চলচ্চিত্রেও সুগভীর ছাপ রেখে যায়। লোরকার ছবি আঁকার হাত খারাপ ছিল না, দালির সংস্পর্শে এসে এবার তাঁর গভীরতর চর্চা শুরু হবে। বার্সেলোনা মঞ্চায়নের জন্য লোরকার নাটক মারিয়ানা পিনেদার মঞ্চ পরিকল্পনা করবেন দালি। ১৯২৭ সালে বার্সেলোনার দালমাউ গ্যালারিতে ২৫টি ছবি নিয়ে দালির প্রথম পর্বের যে প্রদর্শনীটি আয়োজিত হবে, তার অন্তত চারটি চিত্রকর্মে কোনো না কোনোভাবে উল্লেখ বা যোগ থাকবে লোরকার। একই বছর লোরকারও চিত্রপ্রদর্শনী হবে বার্সেলোনায়। লোরকার সুরেলা কবিতার মধ্যে—দালির দৌত্যে, কেননা দালি ততদিনে বুনুয়েলসহ প্যারিসে গিয়ে আঁদ্রে ব্রেতোঁ (১৮৯৬-১৯৬৬) ও তাঁর পরাবাস্তব কবিশিল্পী বন্ধুদের মাতিয়ে দিয়ে এসেছেন—খুবই নিজের ধরনে ছায়াসম্পাত ঘটবে পরাবাস্তবের। ভিয়াহে আ লা লুনা বা চাঁদে যাত্রা নামে লোরকা একটি চিত্রনাট্যও রচনা করবেন। দালি আগ্রহী হয়ে উঠবেন চলচ্চিত্রে, লুইস বুনুয়েলের সঙ্গে যোগ দেবেন আঁ শিয়ঁ অন্দালু বা আন্দালুসিয়ার কুকুর এবং লাজ দ’অর বা সোনালি যুগ তৈরির কাজে।

আরও পরে আলফ্রেড হিচককের স্পেলবাউন্ড ছবির স্বপ্নদৃশ্যেরও পরিকল্পনা করে দেবেন তিনি। বুনুয়েল আর দালি অল্প কিছুদিন একসঙ্গে মিলে চলচ্চিত্র ও থিয়েটার নিয়ে লেখালেখিও করবেন পত্রপত্রিকায়। আর এই বন্ধুত্ব থেকে বুনুয়েল শুধু তাঁর ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্রের রসদই পাবেন না, পেয়ে যাবেন সেই মন যা তাঁকে ঠেলে দেবে স্বপ্ন আর বাস্তবে মেশা অভিনব চলচ্চিত্রমালার কাছে। সম্ভবত রেসিদেনসিয়ায় থাকার সময়ে লোরকার মধ্যে সমকামের প্রবৃত্তির উন্মেষ ঘটতে শুরু করে, অথবা তাঁর এই ঝোঁকের কথা কেউ কেউ জানতে শুরু করে। তাঁদের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যের মধ্যেও লোরকার চরিত্রের এই বিশেষ দিকটি বুনুয়েল টের পান নি। এ কথা তাঁর কানে আসে হঠাৎ:

মনে পড়ে, একদিন কে যেন আমাকে বলল, মার্তিন দোমিনগেস নামে বাস্ক অঞ্চল থেকে আসা বড়সড় এক লোক লোরকার নামে এই গুজব ছড়াচ্ছে যে সে সমকামী। এই অভিযোগ আমার কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হলো। একদিন রেসিদেনসিয়ার খাবার ঘরে সভাপতির টেবিলে আমরা পাশাপাশি বসে আছি। আমাদের সঙ্গে আরও আছে উনামুনো, ইউজেনিও দোরস আর আমাদের পরিচালক দোন আলবের্তো।
‘চলো, বাইরে চলো,’ প্রথম কোর্সের খাওয়া শেষ হতেই আচমকা আমি ফেদেরিকোকে বললাম, ‘আমার কিছু কথা আছে। তোমার কাছ থেকে আমাকে জানতেই হবে।’
আমরা কাছের এক পান্থশালায় গেলাম। সেখানে গিয়ে তাকে বললাম, দোমিনগেসের সঙ্গে লড়াই করার জন্য আমি তাকে চ্যালেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
‘কী কারণে?’ লোরকার জিজ্ঞাসা।
আমি এক মুহূর্ত ইতস্তত করলাম। বুঝতে পারছিলাম না কী করে কথাটা তুলি।
‘এটা কি সত্য যে তুমি একজন মারিকোন?’ হতবিহ্বল হয়ে শেষমেশ আমি বলেই ফেললাম কথাটা।
‘তোমার-আমার মধ্যে সব শেষ।’ আহত ও ব্যথিত, সে উঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিল। তারপর বেরিয়ে গেল বাইরে।
বিকেলের মধ্যে আমরা আবার সেই সেরা বন্ধু।


সে ছিল সমকামী, সবাই যেমনটা জানে, আর পাগলের মতো আমার প্রেমে পড়েছিল।


তবে দালির কাছে এই ব্যাপারটির অভিঘাত পৌঁছেছিল বেশ গুরুতরভাবে। তাঁর প্রতি লোরকার তীব্র টান বন্ধুত্বের সাধারণ সীমারেখা পেরিয়ে গিয়েছিল সম্ভবত। তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক খাতে বইবার সম্ভাবনাও তাই এক পর্যায়ে সংকুচিত হতে শুরু করে। লোরকার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে সালভাদোর দালি বলেছেন:

সে ছিল সমকামী, সবাই যেমনটা জানে, আর পাগলের মতো আমার প্রেমে পড়েছিল। সে দুইবার আমার সঙ্গে শারীরিক সংসর্গের চেষ্টা করে।…আমি অসম্ভব বিরক্ত বোধ করেছিলাম। কারণ আমি সমকামী ছিলাম না।…পরে সে একটা মেয়েকে বাগিয়ে নেয়, আর ওই মেয়েটির বিনিময়ে জলাঞ্জলি দেয় আমাকে।

লোরকার সঙ্গে দালি ও বুনুয়েলের সম্পর্কের মাঝখানে ঝঞ্ঝামুখর হাওয়া বইতে শুরু করে তাঁদের যৌথভাবে বানানো ‘আন্দালুসিয়ার কুকুর’ ছবিটিকে কেন্দ্র করে। বুনুয়েল লিখেছেন:

আন্দালুসিয়ার কুকুর বানানোর অল্প কিছুদিন আগে লোরকার সঙ্গে আমার সম্পর্কে ভাঙন ধরে। লোরকা ছিল পাতলা-চামড়ার আন্দালুসীয়। তখন সে ভেবেছিল (বা সে ভাবার ভান করেছিল) যে, ওই ছবিটা আসলে তার ওপরে এক ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ। বুনুয়েল অমন একটা ছোট্ট ছবি বানিয়েছে। তুড়ি মেরে সে বলত, ‘ছবিটার নাম আন্দালুসিয়ার কুকুর। আর ওই কুকুরটা হলাম গিয়ে আমি।’ যা-ই হোক, ১৯৩৪ সালের মধ্যে আমরা ফের আগের মতোই প্রাণের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। আন্দালুসিয়ার কুকুর ছবিটি নিয়ে লোরকা সত্যিই অসম্ভব ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। ১৯২৯ সালের গ্রীষ্মে আঁদ্রে ব্রেতোঁর নেতৃত্বে পরাবাস্তববাদী কবি-শিল্পীরা যখন প্যারিসে বসে মুগ্ধ হয়ে এ ছবিটি দেখছেন, অভিমানী লোরকা তখন মাদ্রিদে বসে লিখছেন ‘চাঁদে যাত্রা’ নামে একটি ছবির চিত্রনাট্য। আপাতদৃষ্টিতে ওই চিত্রনাট্যটি তিনি মেহিকোর শিল্পী-চলচ্চিত্রকার আমিলিও আমেরোর জন্য লিখলেও আসলে সেটি ছিল আন্দালুসিয়ার কুকুর ছবির একটি জবাব। আমিলিও আমেরো অবশ্য নিজে ওই ছবিটি কখনো বানাতে পারেন নি। চিত্রনাট্যটি আঁকড়ে ধরে রেখে অন্য আর কাউকে সেটি বানাতেও দেন নি। বহু পরে, ১৯৯৮ সালে লোরকার জন্মশতবর্ষে, ফ্রেদেরিক আমাত ওই চিত্রনাট্যের চলচ্চিত্ররূপ দেন।

বুনুয়েল বলেছেন বটে যে, তারা ফের আগের মতোই প্রাণের বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন, তবে সেটি অংশত সত্য। তাঁদের মধ্যে আবার যোগ ঘটেছিল, কিন্তু সুর কিছুটা কেটে গিয়েছিল। তাঁদের নিজের নিজের বৃহত্তর জগতে পথচলাও ততদিনে শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে পরস্পরের সান্নিধ্যে, চকমকি পাথরের স্পর্শে, সৃষ্টির আদিম স্ফুলিঙ্গটি তখন তাঁদের মধ্যে জ্বলে উঠছে। বুনুয়েল যে বলেছেন রেসিদেনসিয়ায় ‘গুরুত্বপূর্ণ সবার সঙ্গে’ দ্রুত তাঁদের পরিচয় ঘটে গেল, তাঁদের সেই সংস্পর্শ শুধু স্পেনকে নয়, সারা বিশ্বের শিল্পসাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেই ‘গুরুত্বপূর্ণ সবার’ তালিকায় ছিলেন হুয়ান রামোন হিমেনেথ, হোসে অর্তেগা ই গাসেত (১৮৮৩-১৯৫৫), মিগেল দে উনামুনোর (১৮৬৪-১৯৩৬) মতো কবি-লেখক-দার্শনিক। লোরকার সঙ্গে এই সময়ে ধীরে ধীরে ঘটতে শুরু করেছে স্পেনের তরুণ কবিদের সংসর্গ। লুইস সেরনুদা (১৯০২-১৯৬৩), হোর্হে গিয়েন (১৮৯৩-১৯৮৪), রাফায়েল আলবের্তি (১৯০২-১৯৯০), হোসে বেরগামিন (১৮৯৫-১৯৮৩), দামাসো আলোনসোরা (১৮৯৮-১৯৯০) ছিলেন এই কবিদের দলে।

১৯২৭ সালের ১৬ ডিসেম্বরে এই কবির দল সেভিয়ায় কবি লুইস দে গংগোরার (১৫৬১-১৬২৭) মৃত্যুর তৃতীয় শতবর্ষ পালন করেন। সে অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করেন লোরকার ষাঁড়লড়িয়ে বন্ধু ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াস। মেহিয়াস পরে ষাঁড়লড়াইয়ে প্রাণ হারালে তাঁর নামে লোরকা তাঁর সুবিখ্যাত শোকবিহ্বল কবিতাটি রচনা করেন। গংগোরার স্মরণে সম্মিলিত এই তরুণ কবিরা জোরালো কণ্ঠে স্পেনের জন্য নতুন কবিতার বার্তা ঘোষণা করেন। তারা বলেন, নতুন অভিজ্ঞতাকে ভাষা দিতে হলে চিরায়ত আর লোকায়ত ধারা, জনসংস্কৃতি আর আভাঁগার্দ নন্দনতত্ত্বের তথাকথিত ভেদরেখা মুছে ফেলতে হবে। অভিজ্ঞতা ও নন্দনভাবনার কোনো সীমারেখার তোয়াক্কা কবিতা করবে না। এই কবিরা পরে ‘প্রজন্ম ’২৭’ নামে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। পরে এ দলে এসে যোগ দেন পেদ্রো সালিনাস (১৮৯১-১৯৫১), লেয়ন ফেলিপে (১৮৮৪-১৯৬৮), ভিসেন্তে আলেইহান্দ্রে (১৮৯৮-১৯৮৪), মিগেল হেরনান্দেথের (১৯১০-১৯৪২) মতো নতুন যুগের কবিরা।


স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় প্রজন্ম ’২৭-এর প্রায় সব কবিই ফ্রাংকোর অমানুষিক নিপীড়নের শিকার হন।


স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় প্রজন্ম ’২৭-এর প্রায় সব কবিই ফ্রাংকোর অমানুষিক নিপীড়নের শিকার হন। লোরকাকে তো হত্যা করা হয় শুরুতেই। মিগেল হেরনান্দেথ জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় অকালে প্রাণ হারান। হুয়ান রামোন হিমেনেথ, লুইস সেরনুদা, রাফায়েল আলবের্তি, হোসে বেরগামিন, পেদ্রো সালিনাস, লেয়ন ফেলিপের মতো বহু কবি আত্মগোপন করে প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হন।

 

তিন

জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯-১৯৫৪) মতোই লোরকার কবিতা ও কবিতার বইয়ের প্রকাশকালের ওপর নির্ভর করে তাঁর ক্রমবিকাশ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। লোরকার গবেষকেরাও তাঁর কবিতার পাণ্ডুলিপির নিচে স্বহস্তে লেখা তারিখের নানা পাকচক্রে খাবি খেয়ে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, তাঁর নিজের লেখা তারিখের ওপর আস্থা রাখাও বহু ক্ষেত্রে বিপজ্জনক। কোনো কবিতা শুরু করতে গিয়ে যে তারিখ তিনি নিচে লিখেছেন, সে কবিতাটি শেষ করেছেন হয়তো বহু পরে। অনেক সময়ই দেখা গেছে, একই বছরে লেখা বহু কবিতা নানা ভাগে ছড়িয়ে পড়েছে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে প্রকাশিত আলাদা আলাদা বইয়ে। এমনও হয়েছে, কোনো এক বছরে যে বিশেষ মেজাজের একটি কবিতার বই বেরিয়েছে, সে বছরেই তিনি মগ্ন হয়ে আছেন তার থেকে দূরতর মেজাজ ও ধাঁচের কোনো কবিতা রচনায়। লোরকার বিবর্তনরেখা তাই কোনো সূক্ষ্ম রেখায় আঁকা ঝুঁকিপূর্ণ।

লেখালেখির দিকে লোরকার মন ঝুঁকতে শুরু করে ১৮ বছর বয়সে। কিন্তু কবিতায় তাঁর সত্যিকারের যাত্রা শুরু হয় আরও দু বছর পরে, ১৯১৮ সালে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লোরকা তাঁর কবিতায় অভিজ্ঞতা, শৈলী, উপলব্ধি ও অভিব্যক্তির নানা স্তর পেরিয়ে যেতে থাকবেন। কিন্তু তাঁর অতিবিশিষ্ট কিছু মুদ্রা—যা তিনি বয়ে বেড়াবেন আজীবন—তাঁর এই প্রথম যৌবনের কবিতাগুলোর মধ্যেই আকার পেয়ে যায়। যেমন নিসর্গ তাঁর কবিতায় জোরালো অস্তিত্ব নিয়ে হাজির হতে থাকে—মানুষের পাশাপাশি কোনো একটি উপাদান হিশেবে নয়—বরং নিজেরই এক প্রবল মানবিক দাবি নিয়ে। তাঁর কবিতায় মানুষের অস্তিত্ব নিসর্গ পেরিয়ে নয়। নিসর্গ ছাড়া মানুষ সেখানে অসম্পূর্ণ। আন্দালুসিয়ার খোলামেলা হাওয়া, ঝকঝকে রোদ, প্রান্তর ও কানন, প্রাণী ও পাখির সঙ্গে সেখানকার সরল ও নিপাট মানুষেরা যে সেখানে কেবল জড়িয়ে-পেঁচিয়ে ওতপ্রোত হয়ে থাকে, তা-ই নয়; নিসর্গের উল্লেখ ছাড়া লোরকার চিত্ররচনা সম্পূর্ণ হয় না, প্রায় কোনো উপলব্ধিই আকার পায় না।

প্রথম জীবনের কবিতাগুলোয় লোরকার শৈশব-কৈশোরের আন্দালুসীয় জীবন তার সব রূপরসগন্ধসহ সজীব। এগুলো জড়ো করে, ১৯২১ সালে, বেরোয় তাঁর প্রথম সংকলন কবিতা বই। এসব কবিতায়, বইটির প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধে লোরকা লিখছেন, ‘আমি নিবেদন করেছি আমার বয়ঃসন্ধি ও কৈশোরের দিনগুলির হুবহু চিত্র।…এ বইটির অন্তত একটি ভালো দিক আছে। এটি আমার মনে ফিরিয়ে ফিরিয়ে আনছে আমার আবেগপূর্ণ শিশুবেলা, যখন আমি পাহাড়ি দিগন্তঘেরা তৃণপ্রান্তরের ওপর দিয়ে দৌড়ে ছুটে যেতাম।’

লোরকা যে চিত্রপ্রতিমার কবি, সেটিও তখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেসব প্রতিমা কখনো কখনো গ্রন্থিল হয়ে উঠে নতুন শতকের অদূরবর্তী নিয়তির পূর্বাভাসও দিতে শুরু করেছে। তবু, প্রতিমা রচনা করতে গিয়েও লোরকা এ কথা বুঝিয়ে দিতে ছাড়েন না যে, সে ঝোঁকে আধুনিক কালের অন্য বহু কবির মতো সুরের ওপর তিনি মোটেই তাঁর দাবি ছেড়ে দেন নি। ছন্দ ও অন্ত্যমিলে তাঁর অনুরাগ ও দখল এবং এর সুষম প্রয়োগে শব্দ থেকে সুর নিংড়ে আনার ব্যাপারে তাঁর আকাঙ্ক্ষা দেখা যাবে এ সময়ের প্রায় সব কবিতায়।

লোরকার কবিতার অতি বিশিষ্ট কথোপকথনের ভঙ্গিও উঁকি দিচ্ছে তাঁর প্রথম বইয়ের কবিতা থেকেই। পূর্ববঙ্গের গীতিকাগুলোর মতো ইউরোপীয় ব্যালাডের ঐতিহ্য নতুন একটি রূপে উন্মোচন করতে শুরু করেছেন তিনি। কবিতায় কথা হচ্ছে যদিও ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের মধ্যে, কিন্তু অনেক সময়ই লোরকা কথা বলছেন নিজেরই সঙ্গে, অপরের মধ্য দিয়ে। তাঁর লেখা আদি কবিতার একটি ‘ছোট চত্বরের গাথা’তেও দেখা যাবে তেমনই এক ধরন। এক কবি ও একদল শিশুর মধ্যে সেখানে বিনিময় হচ্ছে কথার। আর দুটি পক্ষেই প্রচ্ছায়ার মতো মিশে থাকছেন লোরকা নিজে। আলাপনের এই ধাঁচটি বিচিত্র ভঙ্গিমায় সারা জীবন তিনি ফিরিয়ে ফিরিয়ে আনবেন।

আর শুরু থেকেই লোরকার কবিতায় দেখা দিতে শুরু করেছে মৃত্যু নিয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত আবিষ্টতা। তবে মৃত্যুর উপলব্ধি তখনো ভ্রুকুটি দিয়ে ওঠে নি। মৃদু পায়ে মৃত্যু আসতে শুরু করেছে সবেমাত্র, জীবনের বর্ণাঢ্য আভা তখনো পুরোপুরি মুছে যায় নি তার নিষ্করুণ মুখ থেকে। কিন্তু কবিতা বই যে বছর বেরোলো, সে বছরই একেবারে বিপরীত দুই ধাঁচের কবিতা লেখায় মগ্ন হয়ে পড়েছেন লোরকা। একদিকে লিখতে শুরু করেছেন ইশারাভরা ভাষায় একেবারে ছোট ছোট কবিতা। যেন সাঁটে লেখা। অস্ফুট চিত্রে গাঁথা। হীরকখণ্ডের মতো তাতে আলোকপাত হয়ে বিচ্ছুরণ ঘটছে নানা তল থেকে। প্রতিমা তাতে অচেনা, ভাষা দূর গ্রহের। আর বছর কয়েক পরে পরাবাস্তব ধাঁচের যেসব কবিতা লিখতে শুরু করবেন তিনি, অনেকটা যেন তারই পূর্বাভাস দিচ্ছে এই কবিতাগুলি। এসব কবিতা লোরকার জীবদ্দশায় বই হয়ে বেরোনোর অবকাশ পায় নি। কিন্তু এ বইয়ের নাম যে হবে স্যুইটস, বন্ধুবান্ধবদের কাছে লেখা চিঠিপত্রে লোরকা সেটি জানিয়ে রেখেছিলেন আগেই। বইটির নাম থেকে অনুমান করা যায়, এর কবিতাগুলো তিনি পরিকল্পনা করছিলেন পশ্চিমা ধ্রুপদি সংগীতশৈলী স্যুইটসের মতো বৈপরীত্যময় স্বর ও ছন্দের চলনে। এই কবিতাগুলো বই হয়ে বেরোয় তাঁর মৃত্যুর বহু পরে, ১৯৮৩ সালে।


লোরকা ঈশ্বরে বিশ্বাস করত না, তবে ধর্মের জন্য এক প্রগাঢ় শিল্পিত অনুভূতি লালন করত।


কবিতা বই প্রকাশের সেই একই বছর মানুয়েল দে ফাইয়ার সঙ্গে মিলে গানের একটি উৎসবের আয়োজনে লোরকা মেতে ওঠেন। আন্দালুসিয়ার মানুষের মুখে মুখে ফেরা গীতি ‘কান্তে হোন্দো’ বা ‘গভীর গান’কে বাণিজ্যের থাবা থেকে বের করে আনতে এ গানের প্রতি নতুন করে মানুষের ভালোবাসা জাগিয়ে তুলতে চাইছিলেন তিনি। এই আয়োজন যখন চলছে, তখন লিখতে আরম্ভ করেছেন তাঁর দ্বিতীয় বই পোয়েমা দে এল কান্তে হোন্দো বা গভীর গানের কবিতা এবং তৃতীয় বই কানসিওনেস বা গীতিমালার কবিতা। এ শুধু কবিতা ও গানের সরল অন্বয় ছিল না। আন্দালুসিয়ার লোকপ্রিয় গানের ভেতর দিয়ে তিনি তাঁর জনপদের আত্মাকে আস্তে আস্তে উপলব্ধি করতে শুরু করেছিলেন। এসব গানের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কয়েকটি ধারায় স্তরান্তর চলছিল তাঁর নিজেরও কবিতায়। ছন্দে ও নিসর্গরূপায়ণে তাঁর এই রূপান্তর প্রত্যক্ষ। এসব কবিতা, লোরকা নিজে তাঁর এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছেন, ‘আন্দালুসিয়ার ইঙ্গিতে ভরপুর। ছন্দ সেই চিরাচরিত জনপ্রিয় ছাঁদের। আর আমি পুরোনো সব কান্তাওরেস (স্থানীয় গায়ক) আর চমৎকার সব গাছপালা ও পশুপাখি দিয়ে কবিতাগুলো ভরিয়ে ফেলব; অপূর্ব এসব গানকে যা টইটম্বুর করে রাখে।’

কিন্তু এ তো নিছক কবিতার ভাষা ও উপাদানের কথা। আন্দালুসিয়ার মানুষ যে বিচিত্র জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন এসব গানে, লোরকা আপ্লুত হয়ে যাচ্ছিলেন সেসবে। আর কবিতায় জায়গা করে নিচ্ছিল মানুষের সাধারণ যাপনের মধ্যে ঠিকরে পড়া সৌন্দর্য; জনসংস্কৃতির পরতে পরতে জমে থাকা আরব, খ্রিস্টীয় ও জিপসি উত্তরাধিকার; ধর্ম ও লোকাচারের নানা অনুষঙ্গে মানুষের প্রকাশ ও যোগের আনন্দময় উদ্‌যাপন। ধর্ম এক সৃষ্টিশীল তাৎপর্যে স্বল্পকালের জন্য উম্মীলিত হতে শুরু করে লোরকার কবিতায়। বুনুয়েল যে বলেছিলেন, ‘লোরকা ঈশ্বরে বিশ্বাস করত না, তবে ধর্মের জন্য এক প্রগাঢ় শিল্পিত অনুভূতি লালন করত,’ তার প্রকাশ ঘটতে থাকে এ সময়ে। সে অনুভূতি আকার পায় মানুষ আর নিসর্গের এক অবিচ্ছিন্ন প্রবাহে, রূপময় এক জগতের প্রতি আকুলতায়। আর এর সবকিছুকে আবৃত করে রাখে জীবনের প্রতি তাঁর মমতাভরা টান। তাঁর দেবদূত বা সন্তরা কোনো অলীক স্বর্গ থেকে অবতরণ করেন না। আন্দালুসিয়ার শষ্পের মতো জগতের নশ্বরতার সামনে তাঁরাও কম্পমান, কিন্তু নশ্বরতার করতলগত এই জগতেরও তাঁরা পুরোপুরি নন।

যে লোকপ্রিয় গানের জগতে লোরকা তখন বাস করতেন—এবং যে জিপসি গান তাঁকে দ্রুতই দখল করে নেবে—কবিতার মধ্যে সেগুলোকে তিনি পুনরাবিষ্কার করতেন। নাগরিক ও লোকসংস্কৃতির ফারাক তাঁর কাছে গ্রাহ্যতা পায় নি। লোরকার কবিতায় এ দুইয়ের ভেদরেখার বিলয় ঘটেছে অসামান্য স্বতঃস্ফূর্ততায়। কখনো কখনো এসব গান এবং তাঁর নিজের কবিতা এমন এক তলে এসে মিশে যেত যে, এ দুইয়ের ভেদাভেদের চেতনাও লুপ্ত হয়ে যেত মাঝেমধ্যে। লোরকার ভাই ফ্রান্সিসকো স্মৃতিচারণা করে বলছেন:

একবার সিয়েররা নেভাদার এক অবকাশে যে খচ্চরচালক আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, সে আপন মনে গান ধরল:

আর কুমারী কন্যা ভেবে তাকে
নিয়ে গিয়েছিলাম নদীর ধারে
অথচ সেই মেয়ের ছিল স্বামী।

কিছু দিন পরে আমাদের মধ্যে যখন ‘অসতী স্ত্রী’ ব্যালাডটি নিয়ে কথা হচ্ছে, ফেদেরিকোকে আমি খচ্চরচালকের ওই গানটি মনে করিয়ে দিলাম। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলাম, ওইটার কথা সে বেমালুম ভুলে গেছে। সে ভাবছিল, বাদবাকি পুরো কবিতাটির মতো এই প্রথম তিন চরণও ওর নিজেরই লেখা।

এটিই লোরকার সেই মন, যা তাঁর কবিতার আত্মপ্রকাশের একটি সহজ বিষয় ও ভাষা খুঁজতে শুরু করে। জুলাই ১৯২২-এ তিনি তাঁর এক বন্ধুকে বলেন, ‘এই গ্রীষ্মে আমি শান্ত ও নির্মল কিছু লিখতে চাই। ভাবছি হ্রদ নিয়ে, পাহাড় নিয়ে, নক্ষত্র নিয়ে কিছু গীতিকা লিখব—ফুলের মতো (ফুলের মতো খামখেয়ালি ও নিখুঁত) স্বচ্ছ ও রহস্যভরা কোনো একটা কাজ। একেবারে সুগন্ধে টইটম্বুর! ওই গ্রামগুলোতে যে ছোট আরব মেয়েরা খেলাধুলা করে, ছায়ার ভেতর থেকে আমি তাদের বের করে আনব। আর আমার কবিতার অরণ্যে আমি তাদের এমনভাবে ছেড়ে দেব, যাতে তারা পথ হারিয়ে ফেলে।’ এই সময়পর্বে তিনি লেখেন ‘তন্দ্রাচারী গাথা’, ‘অসতী স্ত্রী’ ও ‘হিস্পানি সিভিল গার্ডের গাথা’র মতো তাঁর কিছু অসামান্য জনপ্রিয় কবিতা। এসব কবিতা নিয়ে প্রকাশিত প্রিমের রোমান্সেরো হিতানো বা জিপসি-গীতিকার সফলতা লোরকার অন্য সব কৃতিত্বকে ম্লান করে ফেলে। এই সহজ চালের কবিতাগুলোর সাফল্য তাঁর ওপরে একজন স্বভাবকবির মুদ্রা এঁকে দেয় কি না, তা নিয়েও অনেকটা সংশয়েও পড়ে যান তিনি। অথচ এ ছিল তাঁর এক বিপরীত অভিযাত্রা। লোরকা প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন আন্দালুসিয়ার শরীরের মধ্য দিয়ে তার আত্মার গভীরে; যা দেখা যায়, তার মধ্য দিয়ে কবিতায় তুলে আনতে চেয়েছিলেন দেখতে না পাওয়া এক জগৎকে। একবার শ্রোতৃমণ্ডলীর সামনে জিপসি-গীতিকা সম্পর্কে বলতে গিয়ে খুব স্পষ্ট করেই লোরকা জানিয়েছিলেন এই কথা, ‘একে যদিও জিপসি বলা হচ্ছে, এ বইয়ের পুরোটা আন্দালুসিয়ারই কবিতা, আর আমি যে একে জিপসি বলছি তার কারণ জিপসি আমাদের দেশের সবচেয়ে চমৎকার, সবচেয়ে গভীর আর মর্যাদাপূর্ণ এক উপাদান…। বইটিতে দৃশ্যমান আন্দালুসিয়াকে খুব সামান্যই পাওয়া যাবে; পাওয়া যাবে গোপন সেই আন্দালুসিয়াকে, যে কম্পমান। আমি এও বলব যে, এ বই লোকশাস্ত্র, চিত্রলতা ও ফ্লামেংকো-বিরোধী…।’


 লোরকার কবিতা মাত্রেই প্রেম ও শিল্পের জয়ধ্বনি।


সবকিছু ছাপিয়ে জিপসি-অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা ‘অসতী স্ত্রী’ কবিতাটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে লোরকা নিজেই তাতে এক পর্যায়ে বিব্রত ও বিরক্ত হয়ে ওঠেন। তিনি বলতে শুরু করেন, ‘জিপসি তো এই কবিতার বিষয়বস্তুর চেয়ে বেশি আর কিছু নয়। সুচিশিল্পের সুই বা জলবিদ্যুৎ নিসর্গের কবি হতে পারাও তো আমার পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়।’ এই বিরক্তি ও বেদনার কথা পরে তিনি তাঁর বন্ধু ও চিলির কিংবদন্তি কবি পাবলো নেরুদার (১৯০৪-১৯৭৩) কাছেও প্রকাশ করেছিলেন। নেরুদার নিজেরও একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর ‘বিদায়’ কবিতাটি নিয়ে। আত্মস্মৃতিতে নেরুদা লিখেছেন:

লোরকা আমাকে বলেছিল তার ‘অসতী স্ত্রী’ কবিতাটি নিয়েও তার ক্ষেত্রে কী করে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। কারও কাছে তার বন্ধুত্বের উৎকৃষ্টতম প্রমাণ দিতে হলে সেই লোকের সামনে লোরকাকে তার এই অসম্ভব জনপ্রিয় ও অনুপম কবিতাটি আবার পড়ে শোনাতে হতো। অনেকগুলোর মধ্যে আমাদের কেবল এই একটিমাত্র কবিতার অটল সাফল্যে আমরা বিরূপ হয়ে পড়েছিলাম। এটি খুবই স্বাস্থ্যকর ও স্বাভাবিক একটি অনুভূতি। পাঠকদের এ জাতীয় আরোপ করার মানসিকতা কবিকে সময়ের একটি মুহূর্তের মধ্যে বন্দি করে ফেলতে চায়।

লোরকা তখনো জানতেন না, সামনে এমন এক অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে, যা তাঁর কবিতাকে আমূল পাল্টে দেবে। জুন ১৯২৯-এ তিনি যাত্রা করলেন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে। নিউ ইয়র্কে এসে তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষার একটি পাঠক্রমে ভর্তি হলেন। কিন্তু ইংরেজি তাঁর কখনো ভালোমতো রপ্ত হয় নি। সে জন্য কোনো তাড়নাও ছিল না তাঁর। একেবারে শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপরে তাঁর মন বিরূপ হয়ে গিয়েছিল। এই কলকারখানা-অধ্যুষিত ধনতান্ত্রিক নগর তাঁর মধ্যে চরম বিতৃষ্ণা ও বিবমিষার জন্ম দিয়েছিল। তাঁর একমাত্র স্বস্তির জায়গা ছিল কালোদের বসতি: হার্লেম।

লোরকা যুক্তরাষ্ট্রে যে আত্মিক, নৈতিক ও নন্দনতাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি হন, সেটি তাঁকে পুরোপুরি ভিন্নতর এক কবিতার জগতের দিকে ঠেলে দেয়। আকস্মিকভাবে তাঁর কবিতা থেকে সব সুর ও মাধুর্য ঝরে যায়। দুমড়ে যেতে থাকে ছন্দ। কণ্ঠস্বর ওঠে কর্কশ হয়ে। তাঁর কবিতায় উঠে আসতে থাকে ‘তোবড়ানো খুলির ছোট ছোট প্রাণী’, ‘কালির দোয়াতে হাবুডুবু প্রজাপতি’, ‘রক্তাক্ত হাতের জগৎ’-এর চিত্রমালা। মৃত্যুর পরে পোয়েতা এন নুয়েভা ইয়র্ক বা নিউ ইয়র্কে কবি বইটি বেরোলে তার মধ্যে ধরা থাকে ক্ষমতাধর এই দেশটি নিয়ে এক কবির রক্তাক্ত প্রতিক্রিয়া ও ক্ষুরধার সমালোচনা।

পরের বছরই লোরকা চিত্তের শুশ্রূষার জন্য কিউবার উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন। সেখানে মাস কয়েক কাটিয়ে অবশেষে ফিরে আসেন নিজের মাটিতে। এবার তিনি মনোযোগ দেন আন্দালুসিয়ার ইসলামি উপাদানের দিকে। কবিতার রূপ হিশেবে বেছে নেন গজল আর কাসিদা। আরব ও পারস্যের কবিতার সৌন্দর্য বহু আগেই লোরকার হৃদয় হরণ করেছিল। ফারসি, বিশেষ করে হাফিজের কবিতার কাছে আন্দালুসিয়ার ঐতিহ্যবাহী গানগুলো কোথায় কোথায় গভীরভাবে ঋণী, ‘কান্তে হোন্দো’ উৎসবে দেওয়া এক বক্তৃতায় লোরকা তা খুলে খুলে দেখিয়েছিলেন। লোরকার এ কবিতাগুলোও প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পরে, দিভান দেল তামারিত বা দিওয়ান-ই-তামারিত বইয়ে। আরবি ‘তামারিত’ শব্দটির মধ্যেও ধরা পড়েছে মরুনিসর্গেরই ইশারা, যার মানে ‘খেজুরে পূর্ণ’। ‘তামারিত’ ছিল অপূর্ব নিসর্গপটে গড়ে তোলা লোরকার এক প্রিয় তুতোভাইয়ের বাবার ছোট্ট খামারের নাম।

এর পরে লোরকার কবিতা লেখায় যদিও কোনো ছেদ পড়ে নি, কিন্তু তিনি বড় আর কোনো কবিতার বইয়ের পরিকল্পনা করার অবকাশ পান নি। তাঁর এ সময়ের প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে ‘ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের জন্য বিলাপ’ নামে চার পর্বে বিভক্ত বহুল উল্লেখিত শোকগাথা। বন্ধু এবং প্রজন্ম ’২৭-এর পৃষ্ঠপোষক ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াস ষাঁড়লড়াইয়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মারা গেলে যেনবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে লোরকা দীর্ঘ এ কবিতাটি রচনা করেন। একই বছরে, ১৯৩৫ সালে, ছয়টি কবিতা নিয়ে বেরোয় সেইস পোয়েমাস গাইয়েগোস বা ছয়টি গালিসীয় কবিতা। দুটোই চটিবই। তত দিনে তিনি পেয়ে গেছেন তাঁর আজীবনের স্বপ্নলালিত এক কাজ। লা বাররাকা নামে একটি নাট্যদলের শিল্প-পরিচালকের দায়িত্ব পালনের ভার পেয়েছেন তিনি। নাট্যদলটি নিয়ে লোরকা ঘুরতে শুরু করেছেন স্পেনের গ্রাম-গ্রামান্তরে। আর বাকিটা সময় ব্যস্ত হয়ে থাকছেন নাট্যরচনায়। স্পেনের নিয়তির চাকা সে সময়ে উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করেছে, যার তলায় খুব শিগগিরই পিষ্ট হবেন এই কবি।



চার

লোরকার জীবন যেমন, তেমনই তাঁর কবিতারও একটি জরুরি দিক মৃত্যু ছাড়া অপঠিত থেকে যাবে। মৃত্যুর কণ্ঠস্বর নিবিড়ভাবে শোনা, তার হুঁশিয়ারি-সংকেতের তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করা এবং কবিতায় তার রূপ দেওয়াকে লোরকা কবির অন্যতম কাজ বলে মনে করতেন। তিনি নিজে একবার বলেছিলেন, ‘শিল্পী, বিশেষ করে কবি, চূড়ান্ত অর্থে সব সময়েই নৈরাজ্যবাদী। তিনি কেবল তার ভেতরে জেগে ওঠা তিনটি প্রবল কণ্ঠস্বরই মন দিয়ে শোনেন: সব রকম আগাম সতর্কবার্তাসহ মৃত্যুর কণ্ঠস্বর, প্রেমের কণ্ঠস্বর আর শিল্পের কণ্ঠস্বর।’ লোরকার কবিতা মাত্রেই প্রেম ও শিল্পের জয়ধ্বনি। সে প্রেম কখনো নিছক মানব-মানবীর বা সমপ্রেমের। কখনো আবার দৈনন্দিনের চকিত বা ছোট্ট কোনো অতিচেনা ঘটনা কিংবা অকিঞ্চিৎকর কোনো অনুভূতিও লোরকার মমতাভরা স্পর্শে অতিলৌকিক হয়ে ওঠে। প্রেম তাঁর কাছে মুক্তির এক উপায়—বেদনাময় অভিজ্ঞতা থেকে, জীবনের নশ্বরতা থেকে; আনন্দময় এক যোগে, বৃহতের এক অপার অনুভবে। কিন্তু জীবনের আনন্দে উদ্ভাসিত এই কবির কাছে মৃত্যু এত অনিবার্য হয়ে উঠবে কেন? এর কোনো সহজ উত্তর মেলে না। শুধু মৃত্যুকে উন্মিলিত হতে দেখা যায় বিচিত্রভাবে, তাঁর কবিতায় যেমন, জীবনেও।

জীবনের একেবারে সূচনাপর্বের এক কবিতা ‘ছোট চত্বরের গাথা’ দিয়ে শুরু মৃত্যুর সঙ্গে লোরকার বোঝাপড়া। এই কবিতা মৃত্যুলিপ্ত এক সংলাপনাট্য। এখানে একদল শিশুর সঙ্গে কথা হচ্ছে স্বয়ং কবির। শিশুরা তাঁকে অনুযোগ করছে, কেন তিনি ওদের ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলেন দূরে। নানা প্রশ্ন করে কবির মন বুঝে নিতে চাইছে তারা। কবি ওদের বলছেন, তিনি চলে গিয়েছিলেন হারিয়ে যাওয়া ঘণ্টাধ্বনির খোঁজে, হয়তো মরণের ওপারে। কেন? তার উত্তর, শিশুবেলার সব আনন্দের উপাদান ফিরিয়ে আনতে। শিশুরাও মৃত্যুর এক প্রতিস্পর্ধী উপাদান লোরকার কবিতায়। জীবনের শেষে যেমন শারীরিক মৃত্যু হয় আমাদের, শিশুবেলারও তো মৃত্যু ঘটে গেছে আমাদের এই প্রাপ্তবয়স্ক জীবন থেকে। সেই মৃত্যুকে পেরিয়ে শিশুবয়সের আনন্দসম্ভার তা হলে কিভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব? কবির পক্ষেই বা কী করে সেটি পারা সম্ভব? এই কবিতায় লোরকা প্রস্তাব করছেন, পাওয়া সম্ভব ‘কবিদের পথরেখা’ ধরে এগিয়ে গিয়ে। এ তা হলে তাঁর কাছে কবিদেরই এক কাজ, মৃত্যুর অধিকার থেকে জীবনকে উদ্ধার করা?


লোরকা দিনে অন্তত পাঁচবার তার মৃত্যুর কথা বলত। রাতে যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা কয়েকজন মিলে তাকে ‘বিছানায় সোপর্দ করতাম’, সে ঘুমাতে যেতে পারত না।


প্রথম জীবনে লেখা এই কবিতায় লোরকা যেন পুরো কবিজীবনব্যাপী তাঁর নিজেরই এক ব্রত পালনের কথা ঘোষণা করে রাখলেন। এ মৃত্যু সত্তার ছোট ছোট অজস্র মৃত্যু সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করে আমাদের জীবনের ভেতরে ফিরিয়ে আনতে চায়। এ মৃত্যু জীবনেরই এক আনন্দময় পুনরোদ্বোধন। এই মৃত্যুর অনুভব ছাড়া জীবনের সারসত্যে পৌঁছানোর উপলব্ধিটিই যেন অপূর্ণ থেকে যাবে। আর এ কবিতায় লোরকা, যেনবা আলগোছে, লিখে রাখলেন তাঁর নিজের ভবিতব্যময় মৃত্যুরও এক পূর্ব-আলেখ্য।

এর পর কতভাবেই না লোরকা মৃত্যুকে দেখেছেন ও রূপ দিয়েছেন। তাঁর কবিতায় ফিরে ফিরে এসেছে মৃত্যুর কতই না বিচিত্র ছবি: পথের ওপরে বুকে ছুরি গাঁথা নাম না জানা মৃতদেহ; শোকার্ত ঘোড়সওয়ারদের গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারা এক যাত্রা; পান্থশালায় মৃত্যুর আনাগোনা; কবি যাতে কর্দোবা পৌঁছাতে না পারেন, তার জন্য মৃত্যুর অধীর প্রতীক্ষা; কোনো যুবকের আত্মহনন; একটি গরুর জবাইয়ের দৃশ্য; পানির তলায় ডুবে যাওয়া এক তরুণের খোঁজ; ষাঁড়ের শিংয়ে বিদ্ধ হয়ে এক ষাঁড়যোদ্ধার রক্তাক্ত মৃত্যু। লোরকার উক্তি অনুযায়ী এ যেন তাঁর নিজেরই মৃত্যুর এক আগাম সতর্কবার্তা।

লোরকা মৃত্যুকে ভয় পেতেন, জানিয়েছেন লুইস বুনুয়েল। আর সালভাদোর দালি যা বলেছেন, তাতে মনে হয়, মৃত্যুকে যেন লোরকা উদ্‌যাপন করতেন রীতিমতো শারীরিকভাবে। তাঁর মৃত্যুকে, অন্তত মৃত্যুভয়কে, পেরিয়ে যাওয়ার জন্য এ যেন এক মায়াবী ক্রীড়া, এক ভুডু ম্যাজিক। দালি লিখেছেন:

লোরকা দিনে অন্তত পাঁচবার মৃত্যুর কথা বলত। রাতে যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা কয়েকজন মিলে তাকে ‘বিছানায় সোপর্দ করতাম’, সে ঘুমাতে যেতে পারত না। শেষ পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে শুয়েও সে কবিতা নিয়ে তার চরম অতিলৌকিক আলাপটি—যে আলাপ সম্পর্কে কোনো শতাব্দীরই বিন্দুমাত্র ধারণা নেই—অন্তহীনভাবে টেনে লম্বা করে রাখার কোনো একটা উপায় খুঁজে বেড়াত। প্রায় সব সময়েই সে তার কথা শেষ করত মৃত্যু, বিশেষ করে ওর নিজের মৃত্যু দিয়ে।

লোরকা যা কিছু বলেছে, বিশেষ করে নিজের মৃত্যু সম্পর্কে, তার সবটাই হয় সে গেয়ে শুনিয়েছে, নয়তো অভিনয়ে রূপ দিয়েছে। সবটুকুই সে করে দেখিয়েছে। ‘দেখ,’ সে বলত, ‘আমি যখন মারা যাব তখন আমাকে কেমন দেখাবে!’ এই বলে ব্যালে নাচের ধাঁচে আড়াআড়ি কিছু একটা করে দেখাত। শেষকৃত্যের সময়, যখন গ্রানাদার ঢালু খাদের গভীরে কফিনটা নেমে যাবে, ওই সময়কার মরদেহের ভঙ্গুর বিচলনের ছবি ফুটে উঠত ওর ভঙ্গিতে। এর পর মরে যাওয়ার দিন-কয়েক পরে ওর মুখটা কেমন দেখাবে, সে আমাদের সেটা করে দেখাত। তখন ওর চেহারায়, যা এমনিতে খুব সুদর্শন ছিল না, নতুন এক সৌন্দর্য ঠিকরে পড়ত, এমনকি তা অসম্ভব লাবণ্যমণ্ডিত হয়ে উঠত। তারপর আমাদের ওপরে তার কেমন প্রভাব পড়ল, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে ও মুচকি মুচকি হাসত। দর্শক-শ্রোতাদের ওপর নিরঙ্কুশ কাব্যিক আধিপত্য স্থাপনের জয়োল্লাসে উজ্জ্বল হয়ে উঠত ওর মুখ।

এই মৃত্যুরই এক ভয়ঙ্কর নিয়তি নিষ্ঠুর আঘাত হানল লোরকার নিজের জীবনে।

লোরকার জন্মবছরে স্পেনের রাজনৈতিক নিয়তিও এক ঝঞ্ঝামুখর পথে যাত্রার সূচনা করে। স্পেন-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে এ বছর পরাজিত হয় স্পেন। স্পেনের হাত থেকে তার একদা-সাম্রাজ্যের প্রায় সবটাই হাতছাড়া হয়ে যায়। তার অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এ কারণে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়, স্পেন আর কখনো সেটি সারিয়ে উঠতে পারে নি। দেশের কেন্দ্র তছনছ হয়ে ভেঙে পড়ে। রাষ্ট্রের উদ্ধারের উপায় নিয়ে প্রগতিপন্থি ও দক্ষিণপন্থিদের মধ্যে শুরু হয় তীব্র টানাপোড়েন। রাজতন্ত্র, সামরিক বাহিনী আর গির্জা একত্র হয়ে দক্ষিণপন্থিদের সঙ্গে হাত মেলায়। চরম নৈরাজ্য দেশটিকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলে। সামরিক অভ্যুত্থান, রাজতন্ত্রের পুনরুত্থান ইত্যাদির মধ্য দিয়ে দেশটি চলতে থাকে এলোমেলোভাবে।

১৯২৯ সালে একটি নির্বাচনের আয়োজন করা গেলে প্রগতিপন্থিদের সমর্থিত দ্বিতীয় রিপাবলিক ক্ষমতায় আসে। তাদের সমর্থন জানিয়েছিল বিভিন্ন সমাজতন্ত্রী-সাম্যবাদী-নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠীর এক সমবায়ী শক্তি। কিন্তু ক্ষমতা নেওয়ার পরের কয়েকটি বছরে তাদের শান্তভাবে দেশ চালাবার কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না। দক্ষিণপন্থিরা নানা ষড়যন্ত্রে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার আবহাওয়া তৈরি করে রাখে। দেশের ভেতরে তীব্র আতঙ্কের পরিবেশ গড়ে তোলা হয়। স্পেনের সাবেক উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তা ও মন্ত্রী ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকো ততদিনে দক্ষিণপন্থিদের ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। মরক্কোয় গিয়ে তিনি স্পেন সেনা বাহিনীর সবচেয়ে দাপুটে অংশ ‘আর্মি অব আফ্রিকা’র কর্তৃত্ব নিয়ে নেন। নাৎসি জার্মানির অ্যাডলফ হিটলার (১৮৮৯-১৯৪৫) ও ফ্যাসিবাদী ইতালির বেনিতো মুসোলিনির (১৮৮৩-১৯৪৫) সরকার বিপুল সমর-সরঞ্জাম দিয়ে দক্ষিণপন্থিদের সহায়তা দেয়। তাঁদের সামরিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসে ফ্রাংকো স্পেনের মূল ভূমি দখল করে নেন। স্পেনে দীর্ঘদিনের জন্য মুক্তির সূর্য গভীর অন্ধকারে ঢলে পড়ে।

স্পেনের গৃহযুদ্ধ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক আগাম মহড়া। হিটলার আর মুসোলিনির জন্য এটি ছিল তাঁদের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের প্রাকপ্রস্তুতি। তাঁরা যা যা করবেন, তারই এক পূর্বাভিনয় চলল ফ্রাংকোর মধ্য দিয়ে। পৃথিবীর সব নিষ্পেষক বাহিনীর মতো ফ্রাংকোর ফালাঞ্জিস্ট বাহিনীরও চক্ষশূল ছিলেন কবি ও শিল্পীরা। কারণ সুদীর্ঘ অস্তাচলের অন্ধকারেও তাঁরা মানুষের মধ্যে স্বপ্ন জাগিয়ে রাখেন। ফালাঞ্জিস্টরা তাই গৃহযুদ্ধের সূচনাতেই বুদ্ধিজীবীদের সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাদের স্লোগান ছিল, ‘বুদ্ধিজীবী নিপাত যাক’। গৃহযুদ্ধের একেবারে শুরুতেই ফ্রাংকোর ফালাঞ্জ বাহিনীর হিংস্রতার শিকার হন ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা।


সত্য হলো এই যে, লোরকাকে খুন করা হয়েছে সে কবি ছিল বলে।


ফ্রাংকোর গুণ্ডাবাহিনীর শিকার হওয়ার মতো কিছু কারণও লোরকার ছিল। বুনুয়েল যেমন একসময় সক্রিয় রাজনীতি করতেন, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন, লোরকা সে রকম সক্রিয়তা নিয়ে কখনো রাজনীতি করেন নি। কিন্তু তিনি যে বাম গণতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে ছিলেন, সে কথা সবারই জানা ছিল। শ্রমিকদের বামপন্থি এক জোটের পত্রিকায় তিনি লেখালেখি করেছিলেন। বিবৃতি দিয়েছিলেন হিটলার ও পর্তুগিজ স্বৈরশাসক আন্তোনিও সালাজারের (১৮৮৯-১৯৭০) বিরুদ্ধে। তাঁর পরিবার আগাগোড়াই প্রগতিশীল জোটের খোলামেলা সমর্থক ছিল। লোরকার বোনজামাই মানুয়েল ফেরনান্দেস-মন্তেসিনোস ছিলেন সমাজতান্ত্রিক দলের সক্রিয় সদস্য।

গৃহযুদ্ধের শুরুর দিকে, ১৯৩৬ সালে, লোরকা বসবাস করছিলেন মাদ্রিদে। লোরকা আশঙ্কা করছিলেন যে, ফ্রাংকোর ফালাঞ্জিস্ট বাহিনী তাঁর প্রাণ হরণ করতে পারে। জুলাই মাসের মাঝামাঝি সন্ত্রস্ত লোরকা মাদ্রিদ ছেড়ে তাঁর গ্রামের বাড়ি গ্রানাদায় চলে যান। মাদ্রিদ ছাড়ার দিন তাঁর শেষ সাক্ষাৎ হয় বন্ধু রাফায়েল মার্তিনেস নাদাল ও পাবলো নেরুদার সঙ্গে। নাদাল ও নেরুদা লোরকার মাদ্রিদ ছাড়ার ভিন্ন ভিন্ন দুটি তারিখ উল্লেখ করেছেন। তারিখ নিশ্চিতভাবে জানা যায় নি, কিন্তু তাঁর নিয়তি নিশ্চিত হয়ে ছিল। নেরুদা লিখছেন:

আমার দিক থেকে ঘটনার শুরু ১৯ জুলাই ১৯৩৬-এর রাত থেকে। ববি দেহলানে নামে চিলির এক সম্পদশালী হাসিখুশি মানুষ সিরকো প্রিসের মস্ত এরেনায় কুস্তির আয়োজক ছিলেন। এই ‘খেলা’টির গুরুত্ব সম্পর্কে আমি তাঁকে আমার অনিচ্ছার কথা জানিয়েছিলাম। খেলাটা যে সত্যিই কত অকৃত্রিম, সেটা উপলব্ধি করার জন্য সেদিন সন্ধ্যায় তিনি আমাকে গারসিয়া লোরকাকে নিয়ে এরেনায় যেতে রাজি করালেন। ব্যাপারটি নিয়ে আমি লোরকার সঙ্গে কথা বললাম। নির্দিষ্ট একটা সময়ে সেখানে মিলিত হতে রাজি হলাম আমরা। আমরা যাব মুখোশধারী গর্তজীবী, হাবশি জল্লাদ আর অশুভ ওরাংওটাং নামের কুস্তিগিরদের লড়াই উপভোগ করতে। লোরকা এল না। ওই সময়টাতে সে ততক্ষণে তার মৃত্যুর পথে যাত্রা করেছে। আমাদের পরস্পরের আর দেখা হয় নি: অন্য এক জল্লাদের সঙ্গে তার সাক্ষাতের কাল নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। আর এ রকমই ছিল স্পেনের গৃহযুদ্ধ, যা আমার কবিতাকে পাল্টে দেয়। সে পাল্টে যাওয়ার সূচনা একজন কবির অন্তর্ধানের মধ্য দিয়ে।

গ্রানাদায় পা রাখার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উগ্র কিছু লোকের হাতে লোরকা লাঞ্ছিত হন। মাত্র কিছু দিন আগে, ১০ জুলাই ১৯৩৬-এ, তাঁর বোনজামাই মানুয়েল প্রগতিশীল জোটের হয়ে নির্বাচনে জিতে গ্রানাদার মেয়র হয়েছেন। কিন্তু লোরকার কাছে সবকিছু অস্বাভাবিক ঠেকছিল। বেদনাদায়ক সেই লাঞ্ছনার পর অপমানিত ও মুষড়ে পড়া লোরকা আশ্রয় নেন তাঁর ফালাঞ্জ-সমর্থক বন্ধু লুইস রোসালেসের বাড়িতে। ঘড়ির কাঁটা লোরকার চরম নিয়তির দিকে এগোতে থাকে। আশ্রয় নেওয়ার সপ্তাহ খানেকের মাথায় উগ্র ফালাঞ্জরা আরও ২৯ জন প্রগতিপন্থির সঙ্গে তাঁর বোনজামাইকে গুলি করে হত্যা করে। একই দিনে রামোন রুইস আলোনসো নামে এক লোকের নেতৃত্বে উগ্রপন্থি ফালাঞ্জরা লোরকাকে রোসালেসের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে কাছের স্থানীয় সরকার ভবনে নিয়ে যায়। সেই শেষ। পরদিন থেকে লোরকার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি। পাওয়া যায় নি তাঁর অন্তিম প্রহরগুলো সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য। লোরকার শেষ দিনগুলি সম্পর্কে বুনুয়েল লিখেছেন:

একদিন এক রিপাবলিকানের মুখে আমি লোরকার মৃত্যুর খবর শুনতে পেলাম। তিনি কোনোরকমে শত্রুসীমানার ফাঁক গলে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন।…
…ফ্রাংকোর আবির্ভাবের চার দিন আগে লোরকা—রাজনীতি নিয়ে যার কিনা কোনো মাথাব্যথাই ছিল না—হঠাৎ তার দেশের বাড়ি গ্রানাদায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল।
‘ফেদেরিকো,’ অনুনয় করে আমি ওকে বললাম, ‘ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটছে। তোমার ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না। এখানেই তোমার জন্য নিরাপদ।’
আমাদের কথায় সে মোটেই কান দিল না। ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পরদিনই বিদায় নিল। ওর মৃত্যুর খবর ছিল মারাত্মক একটা আঘাতের মতো। আজ পর্যন্ত যত মানুষকে আমি জেনেছি, লোরকা ছিল সবার চেয়ে সেরা। ওর কবিতা বা নাটকের কথা আমি বলছি না। আমি বলছি ব্যক্তি-লোরকার কথা। ও ছিল তার নিজের সেরা শিল্পকর্ম। পিয়ানোতে বসে শোপ্যাঁ বাজাচ্ছে, কি স্বতঃস্ফূর্ত কোনো মূকাভিনয়ের মুদ্রা মেলে ধরছে, বা অভিনয় করছে নাটকের কোনো দৃশ্যে, সে ছিল অপ্রতিরোধ্য। সে পড়ত চমৎকার। তার ছিল আবেগ, তারুণ্য আর আনন্দ। রেসিদেনসিয়ায় ওর সঙ্গে যখন আমার প্রথম পরিচয় হয়, আমি তখন ছিলাম এক অমার্জিত গ্রাম্য তরুণ, যার আগ্রহ ছিল শুধু খেলায়। আমাকে সে পাল্টে দিয়েছিল। পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল একেবারে আলাদা একটা জগতের সঙ্গে। সে ছিল এক অগ্নিশিখার মতো।

কখনোই আর ওর মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায় নি। ওর মৃত্যু নিয়ে নানা খামখেয়ালি জল্পনা ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি সালভাদোর দালি পর্যন্ত একবার বাজে একটা ইঙ্গিত করে বলেছিল যে এর পেছনে সমকামের কোনো ব্যাপার থেকে থাকতে পারে। সত্য হলো এই যে, লোরকাকে খুন করা হয়েছে সে কবি ছিল বলে। গৃহযুদ্ধের সময়কার জনপ্রিয় স্লোগান ছিল, ‘বুদ্ধিজীবী নিপাত যাক’। সাদা চোখে যা দেখা যায়, তা হলো এই: গ্রানাদায় ফিরে গিয়ে লোরকা কবি রোসালেসের ওখানে ছিল। রোসালেস ছিল ফালাঞ্জিস্ট। লোরকা ও তাদের পরিবারের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল। আমার ধারণা, লোরকা ভেবেছিল ওখানে সে নিরাপদ থাকবে। কিন্তু আলোনসো নামে কোনো একজনের নেতৃত্বে একদল লোক (কেউ জানে না তারা কারা, জানলেও এখন আর কিছু আসে-যায় না) এক রাতে এসে হাজির হয়ে তাকে গ্রেপ্তার করল। কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে ট্রাকে চড়িয়ে নিয়ে গেল দূরে কোথাও। যন্ত্রণা ও মৃত্যুর ব্যাপারে লোরকা শঙ্কিত বোধ করত। মধ্যরাতে ট্রাকে করে যখন তাকে গুলি করে মারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন যে সে কী অনুভব করছিল, আমি তা কল্পনা করতে পারি। প্রায় সময়েই সে কথা আমি ভাবি।


লোরকাকে হত্যা করা হয় গৃহযুদ্ধ শুরুর একেবারে দু-তিন দিনের মাথায়।


সেই হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী বলে দাবিদার কারও কারও সঙ্গে কথা বলে লোরকার জীবনীকার ইয়ান গিবসন তাঁর মৃত্যুময় শেষ দিনগুলোর একটি ছবি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর তথ্য বা অনুমান অনুযায়ী, ১৯ জুন ১৯৩৬-এ জাতীয়তাবাদী ফালাঞ্জ মিলিশিয়ারা ফুয়েন্তে গ্রান্দে নামে রাস্তার ওপর একটি জায়গায় লোরকাকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর গ্রেপ্তার করে আনা আরও তিনজন মানুষকে—স্কুলশিক্ষক দিয়োস্কোরো গালিনদো, ষাঁড়যোদ্ধা ও নৈরাজ্যবাদের সমর্থক জোয়াকিন আরকোইয়াস কাবেসাস এবং ফ্রান্সিসকো গালাদিকে লোরকার সঙ্গে গুলি করে হত্যা করে। লোরকাকে হত্যা করা হয় গৃহযুদ্ধ শুরুর একেবারে দু-তিন দিনের মাথায়। কিন্তু এর মাস তিনেক আগে পাবলো নেরুদাকে ডেকে একটি অদ্ভুত ঘটনা শুনিয়েছিলেন লোরকা। নেরুদা তাঁর স্মৃতিকথায় সে ঘটনার এক অসামান্য বিবরণ দিয়েছেন:

লোরকা তার মৃত্যুর পূর্বাভাস পেয়েছিল। একবার, তার নাট্যসফরের অল্প কিছুদিন পরে, অদ্ভুত এক অঘটনের কথা বলার জন্য আমাকে সে খবর পাঠাল। তার নাট্যদল লা বাররাকাকে নিয়ে পথ হারিয়ে সে গিয়ে হাজির হয়েছিল কাস্তিইয়ের এক গ্রামে। শহরের প্রান্তে তাঁবু ফেলেছিল তারা। সফরের চাপে মারাত্মক ক্লান্তির কারণে লোরকা ঘুমাতে পারল না। কাকভোরে উঠে একা একা হাঁটতে বেরিয়ে গেল। ঠান্ডা, পর্যটক ও বহিরাগতদের জন্য তুলে রাখা কাস্তিইয়ের ছুরির মতো ধারালো ঠান্ডা। কুয়াশা সাদা সাদা অবয়ব নিচ্ছিল, আর সবকিছুর মধ্যে উসকে দিচ্ছিল এক ভৌতিক আবহ। জংধরা লোহার একটা বিরাট তোরণ। শুষ্ক পাতার রাশির মধ্যে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা প্রতিমা আর বিধ্বস্ত থাম। পুরোনো একটা জমিদারির প্রবেশদ্বারের সামনে সে থমকে দাঁড়াল। কোনো সামন্ত কাছারিবাড়ির বিরাট বাগানের ফটক। সেই পতিত পটভূমি, সেই প্রহর, সেই হিম আরও তীক্ষ্ম করে তুলল নির্জনতাকে। নিজেকে হঠাৎ চাপগ্রস্ত মনে হলো লোরকার। যেন প্রত্যুষের মধ্য থেকে কিছু একটা বেরিয়ে আসবে, যেন ঘটতে যাচ্ছে কিছু একটা। বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে থাকা একটি স্তম্ভের মাথায় লোরকা বসে পড়ল।

ঘাস খেতে খেতে ছোট্ট এক ভেড়া কোত্থেকে যেন বেরিয়ে এল সেই ধ্বংসাবশেষের মধ্যে। যেন কুয়াশার এক দেবদূত, নির্জনতাকে মানবিক করে তোলার জন্য শূন্য থেকে এর ভেতরে একটা পাপড়ির মতো ঝরে পড়েছে। কবি তখন আর একলা বোধ করছিল না। আচমকা একদল শুয়োর সেই প্রাঙ্গণে এসে পড়ল। চারটা কি পাঁচটা অন্ধকারের জন্তু। পাশব ক্ষুধা আর পাথরপ্রতিম খুরঅলা আধা বন্য শুয়োর। এরপর লোরকা যা দেখল, তা এক রক্ত হিম করা দৃশ্য। একটা শুয়োর ঝাপিয়ে পড়ল ভেড়াটির ওপর। আর কবির মনে গভীর ত্রাস সঞ্চার করে ভেড়াটিকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে খেয়ে ফেলল। নির্জন স্থানের সেই রক্তাক্ত দৃশ্য লোরকাকে বাধ্য করল তার নাট্যদলটিকে পথে ফিরিয়ে আনতে। গৃহযুদ্ধের তিন মাস আগে ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা যখন এই রক্ত হিম করা গল্প আমাকে শুনিয়েছিল, তখনো তার মনে জেগে ছিল সেই বিভীষিকা। পরে আমি ক্রমে ক্রমে আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছি যে, সেই ঘটনাটি ছিল লোরকার নিজের মৃত্যুরই এক পূর্বদৃশ্য, তার অবিশ্বাস্য বিয়োগকাহিনির এক পূর্বাভাস।

লোরকা যেন নেরুদার বহু আগেই উপলব্ধি করেছিলেন এ কথা। আর সে কারণেই সব রকমের পূর্ব-সতর্কবার্তাসহ মৃত্যুর কণ্ঠস্বর শোনার জন্য কবির সংবেদনশীল মনোযোগ তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল এতটা জরুরি। কবিতার পর কবিতায় লোরকা অবিশ্রাম যা রচনা করে গেছেন, কিছুটা প্রতিসরিত অর্থে, সেটি যেন তাই ‘এক পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি’।


পড়ুন : লোরকার দশটি কবিতা
সাজ্জাদ শরিফ

সাজ্জাদ শরিফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক at প্রথম আলো
জন্ম ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬৩, পুরান ঢাকা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর।

প্রকাশিত বই :
ছুরিচিকিৎসা [কবিতা, ২০০৬, মওলা ব্রাদার্স]
যেখানে লিবার্টি মানে স্ট্যাচু [গদ্য, ২০০৯, সন্দেশ]
রক্ত ও অশ্রুর গাথা [অনুবাদ, ২০১২, প্রথমা]

ই-মেইল : sajjadsharif_bd@yahoo.com
সাজ্জাদ শরিফ