হোম গদ্য কবিতার জনপ্রিয়তা বনাম কবির জনপ্রিয়তা

কবিতার জনপ্রিয়তা বনাম কবির জনপ্রিয়তা

কবিতার জনপ্রিয়তা বনাম কবির জনপ্রিয়তা
100
0

১.
শিল্পসুন্দরের জগতে কবিতাই শিল্পের আদিরূপ। সে তখনও ছিল তৃপ্তির পরিতুষ্টির এবং আনন্দের। প্রয়োজনেই মানুষের এই প্রকাশ নানা বিবর্তনের পথ বেয়ে আজকের রূপে, যেমন প্রাণী থেকে দীর্ঘ রূপান্তরে মানুষ। তবে এই যাত্রা চলমান সভ্যতায় বাহন হয়ে ক্রমশ রূপান্তরিত হচ্ছে নানা তত্ত্বে, নির্মাণে। মানুষের সমাজে কবিতার অস্তিত্ব কৃষিরও আগে এমন কী বিনিময় প্রথারও আগে বলে মনে করেন কেউ কেউ। সংঘাতমুখর সভ্যতায় শিল্প নিছক তামাশার তৃপ্তিদায়ক বিষয় হিশেবে আবির্ভূত হয় নি। হয়েছে প্রয়োজনে, আশা ও আশ্বাস-এর সংকট লাঘবে, কর্মকে লাগাতার ক্রিয়ায় যুক্ত করার ক্ষেত্রে শ্রমকষ্ট সহনীয় করে বহমান রাখতে। সে ছিল উচ্চারণ ছন্দ সঞ্চালন ছন্দে এবং এক লিরিকপূর্ণ উঠতি ও নামতির প্রকাশ। ধাপে ধাপে তা বিষয়যুক্ত হয়ে ওঠে, এবং প্রাথমিক দিকের শিল্প ছিল বিষয়, পরের ধাপে ভাব হয়ে হয়ে ওঠে রোমান্টিক এবং আধুনিক কালে ভাব ও বিষয় সমন্বিত হয়ে নতুন কবিতার শরীর। সুতরাং শুরুতে তার জনপ্রিয়তা ছিল মাঝপথে তা ব্যক্তিপ্রিয়তায় পর্যবসিত হয় এবং আধুনিক সময়ে নানা প্রিয়তায় যুক্ত হয়ে কবিতা হিশেবে পাঠকের কাছে আদৃত হচ্ছে, ভর্ৎসনা পাচ্ছে এবং এক শক্তি হয়ে নতুন সমাজের স্বপ্নও দেখাতে চাইছে। বাস্তবে কবিতা সমাজক্রিয়ার সাথে যুক্তমানুষের অভিব্যক্তির প্রকাশ নানা সংবেদনশীলতায় যুক্ত সামাজিক সংগ্রামকেই ধারণ করে। তবে দখল ক্রিয়ায় শিল্প তার নিজ-জন্মবৃত্তান্ত ভুলে গিয়ে কখনও রাজরাজাদের উপ-পত্নি হয়ে হেরেমে আশ্রয় খুঁজেছে কখনও পথে প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে মানুষের আকাঙ্ক্ষার ধ্বজা হয়েছে, নির্মাণ  করেছে সেই সত্য যা মানুষের মনক্রিয়ায় যুক্ত, তাকে চিনিয়েছে পথ যা সে হারিয়েছে, প্রেরণা হয়েছে তার। আসলে ব্যক্তি ব্যক্ত হয় যা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, এই ব্যক্ত হওয়া সামাজিক ক্রিয়ারই ফল।


ইতিহাস চেতনাকে জীবনানন্দ পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করে যে নির্মাণ রেখে গেছেন তা আমাদের সম্পদ।


২.
সমাজ বিশাল রসায়নাগার। প্রতিমুহূর্তে বাতিল করছে, বহুকিছু তৈরি করছে বহুকিছু। এই বহুর মধ্যে পুরান ও নতুন মিশে রয়েছে।  কোনোটার ঐতিহ্য নবায়িত হচ্ছে নতুন উপাদান যুক্ত হয়ে, কোনোটা টায় টায়। এলিয়ট কবিতায় ঐতিহ্যের নবায়নকেই আধুনিক বলে মনে করতেন, এবং ইতিহাস চেতনাকে জীবনানন্দ পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করে যে নির্মাণ রেখে গেছেন তা আমাদের সম্পদ। সমাজ প্রতিমুহূর্তে যেমন বাতিল করছে এবং গ্রহণ করছে, সৃষ্টিতেও গ্রহণ বর্জন এক ক্রিয়া যা না’হলে সৃষ্টি গতি পায় না, প্রয়োজনকে ঊর্ধ্বগামী করে না, হয়ে পড়ে স্থবির। সমাজভঙ্গি কোনো শিল্পী ভালোভাবে অনুধাবন করতে না পারলে তিনি সৃষ্টিতে নতুনত্ব দিতে পারেন না, রয়ে যান অতীতে। পিছিয়ে পড়ে তার প্রকাশ। সে কারণে কডওয়েল কবিতাকে সামাজিক সংগ্রামের যুথবদ্ধ ইতিহাস বলে মনে করতেন। আমাদের সমাজে সমাজ চেতন শিল্পীর অভাবে সৃষ্টি হচ্ছে পিছিয়ে পড়া কাব্যশিল্প, যা এতটা অনগ্রগতির যে সেখানে পাঠকের মন বসে না। এক্ষেত্রে কাদার উপর প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত শক্তিমানদের অবদান খুবই কম। মৌলিক শক্তি মানুষ। যারা শোষিত নিপীড়িত, অধিকার হারা, যারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত এবং সবটুকু শ্রম বিক্রি করে দেয় উপযুক্ত শ্রমমূল্য হারিয়ে, সেই তারাই ইতিহাসের গতিশক্তি। আর তাদের বদল যাতে তাদের মতো না হয়ে উঠতে পারে তা যেন ধনপতিদের তল্পিবাহক হয়, অধীন থাকে, তার জন্য ছক কাটে, শোষক তার প্রতিনিধি। কিন্তু রাজনৈতিক স্বচ্ছ চিন্তার পশ্চাৎপদতায় এই বিশাল মানবগোষ্ঠী সেই কাল থেকে এই কালে তাদের শত চেষ্টা শ্রম ঢাললেও পরিবর্তনের সামান্যই নাড়িয়ে নিজলগ্ন করতে পেরেছে। ফলে একটা অভ্যেস একটা স্বভাব সকল মানুষের মধ্যে চর্চার মাধ্যম হয়ে পড়ছে আর তাই হয়েছে তাদের নিত্য বিশ্বাসের রূপ। এই বিশ্বাসগুলো রূপে ও রঙে সংমিশ্রিত হয়ে হচ্ছে প্রকাশ। ফলে পাঠক বাড়ছে না, পাঠক এসব সৃষ্টিকে নিজের কথা নিজের দিকের মানস ভাবছে না, তারা একে এক উৎকট বিষয়ই মনে করছে, যাতে তার কোনো প্রয়োজন নেই। ১৬ কোটি দেশের মানুষের হিশেবে ২৫ ভাগ যদি শিক্ষার হিশেবে ভুক্ত হয় তা হলে পাঠক মাত্র কয়েক হাজার, আর কবিতার ক্ষেত্রে আরো কম কেন? ধরে নেয়া যায় যে কবিতার পাঠক কম, আর আধুনিক কবিতার মনোপ্রিয়তা এখনও নিম্নপর্যায়ে, তা হলে স্বীকার তো করাই যায় যে সামাজিক চৈতন্য এখনও একটা মাত্রায় পৌঁছায় নি এবং নতুনের সাথে তার সংযুক্তি এখনও ঘটে নি। আর সেখানেই অসুখটা চিহ্নিত করতে হয় একজন লেখকের। মনে রাখা দরকার পড়তে পারে না, শোনে এমন অভ্যেস ছিল এককালে গ্রাম্য মানুষের, সন্ধ্যের পরে মাদুর পেতে কুপি জ্বালিয়ে একদিন মানুষ ভক্তিমূলক গান, পুঁথি শুনত। যদিও সামাজিক রূপান্তর ক্রিয়ায় আজ আর সেই গ্রাম নেই, প্রযুক্তি আজ তাদের নানামুখী করে রেখেছে এবং নানাকিছু যা সংস্কৃতিতে ভেজাল তাই তারা গিলছে, কিন্তু হাল্কা এই বিষয়গুলো তাদের আমোদিত করছে, কিন্তু সাহিত্যের নিগূঢ় তত্ত্ব নিয়ে তারা কোনো উৎসাহ বোধ করছে না। কারণটা নিশ্চয়ই একজন লেখক প্রথমে অনুধাবন করবেন, এবং প্রেক্ষিতকে বিবেচনায় রেখে তার পরিবর্তনগুলো যার ধারাবাহিকতায় ছেদ রয়েছে তা তারা ভুলে গেছে তাকে তার চেতনায় ফিরিয়ে দেয়া যদিও সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের বিকাশের উপর নির্ভরশীল, সেই আন্দোলন সংগঠনে লেখকদের যথাযথ হতে হবে। তার প্রকাশ সমকালকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বাঁধা নেই, কিন্তু চেতনার ছেদ-পর্বটিকে যুক্ত করেই অর্থাৎ ঐতিহ্যকে সাঙ্গিকরণের মধ্য দিয়ে নতুন সৃষ্টিতে মনোযোগী হওয়া দরকার। তা’হলে হয়তো বিচ্ছিন্নতাকে প্রশমিত করে পাঠককুলকে উৎসাহিত করা সম্ভব। জীবনবদলের শত্রুরা এইরূপকেই নানাভাবে মসৃণ করে ব্যবহার করছে তাদের স্বার্থে। ফলে অভ্যন্তরে যে উষ্ণতা তা দমে থাকছে এবং শিল্পসাহিত্য তার বিকাশে, মুক্তিতে যে হাওয়া দখল করতে পারতো তা আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। তবু সমাজ নতুন কিছু চায়, চাইতেই থাকে আর কবি শিল্পীর প্রকাশভঙ্গিতে তার খানিকটা আঁচ দেখা যায় কখনও কখনও।

কখনও কখনও এমন কতক বিষয় অনুমোদন দেয় যে আপাত দৃশ্যে মনে হয় খুবই উদার, কিন্তু সত্য সেখানে নয়; বরং জনপ্রিয় কোনো বিষয়কে এর মাধ্যমে কুক্ষিগত করে নিজ সেবায় লাগায়। একটি জাতির গৌরবের অনেক বিষয়ই শাসকদের, তার শ্রেণির দখলভুক্ত হয়ে তাদেরই সেবা করে, প্রচারে, প্রোপাগান্ডায় লাগে। মনে রাখা দরকার আন্দোলনের নেতা আর ক্ষমতার নেতা চরিত্র এক নয়। এইখানে সবকিছু গুলিয়ে যদি জনগণ মনে করে আমাদের লোক আমাদের রাষ্ট্র, তা হলেই সে হারায়। যেমন একুশে ফেব্রুয়ারি একটা লড়াই একটা চেতনার, যারা অনেকদিন ক্ষমতায় ছিলেন বা যারা এখন ক্ষমতায় তারা বলতে পারেন যে এই আন্দোলনে আমরাই নেতৃত্ব দিয়েছি, কাজেই এ এখন অনুষ্ঠান, আর জনগণ যদি তেমনটাই মেনে নেয় তো সে হলো মূল চেতনা থেকে ভিন্ন কারণ ক্ষমতা এবং আন্দোলন এক অর্থের নয় যতদিন সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা পাওয়া না যায়। ন্যায়ের জন্য জনগণকে তার ঐতিহ্যের লড়াইকে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করে সংরক্ষিত করতে হয়, এবং ক্রমাগত ওই চেতনাকে সমৃদ্ধ করতে হয়। বাস্তবে একুশ এখন ব্যবসায়ী পুঁজির বাহন হয়েছে। চেতনা এখন চেতনার নামে বই বিক্রির প্রতিযোগীতায় পরিণত হয়েছে। এর লড়াই, মৌলিক সত্তা এইভাবে মূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যেমন ‘মুক্তি যুদ্ধের চেতনা’ নিয়ে আজ বহুমুখ চিৎকার করে, তারা জানেও না চেতনাটার গতিটি ছিল কোনদিকে, কী, কার কল্যাণের, তারা শ্লোগান দেয়, তর্ক করে, টেবিল চাপড়ায়, দরকার বোধে প্রশ্নকারীকে রাজাকার বলে। বাস্তবে তাদের কর্মকাণ্ড, লুটপাট, আত্মসাৎ, প্রমাণ করে তারাই সেই গোষ্ঠীভুক্ত যারা স্ব্ধাীনতার বিরোধিতা করেছিল, কিছুই করে নি। কলকাতায় আনন্দফূর্তিতে মেতে ছিল। তারা তাদের বুদ্ধির জোরে কর্ম ও কৌশলের জোরে ক্ষমতায় সংযুক্ত হতে পেরেছে, আর যারা প্রকৃত যুদ্ধটাই চালিয়েছে ত্যাগ করেছে তারা বিস্মৃত, অতীত। সংস্কৃতি তো কেবল কবিতা, গল্প-প্রবন্ধ-উপন্যাস, রম্য, নাটক, জারি সারি সংগীত নয়, সে হলো একটি জাতির সকল বিশ্বাস রাজনৈতিক ও সামাজিক, অভ্যেস রুচি, ব্যবহার, ভাবনার গতিধারা, চিন্তা এবং মূল্যবোধ।


সঙ্গত কারণে প্রতিটি মানুষই রাজনৈতিক অস্তিত্ব, যা সে উপলব্ধি করতে পারে না তার অজ্ঞতার কারণে।


৩.
কিন্তু তারপরও সূর্য  যেমন তার দহণক্রিয়ায় শক্তি হারায় এবং নতুন বিস্ফোরণে আবার নতুন শক্তির বিকাশ ঘটায় তেমনি সমাজজীবন বা গণজীবন প্রতিমুহূর্তে শাসক-শোষকদের নিষ্ঠুরতায় শক্তিহীন হয় আবার নতুন করে জেগে ওঠে মানুষের মুক্তির আশা, তার বিস্ফোরণ ঘটে, এটাই দ্বান্দ্বিক। এই দ্বান্দ্বিক বিষয়ের মধ্য দিয়ে সমাজ নতুন নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। এই আমজনতার মধ্য থেকে উদ্ভব ঘটে চিন্তাবিদের, কবির, দার্শনিকের এবং নতুন মানুষের। কারণ সমাজ তাই চায়। সে কারণে জন্ম হয় রবীন্দ্রনাথের, জন্ম হয়  গ্যোটের, সেক্সপিয়ার বা কালিদাসের। কেবল সে কারণে যুগে যুগে জন্ম হয়ছে নানা দার্শনিক চিন্তার। একালে আর রবীন্দ্রনাথ বা কালিদাস আমাদের সমাজ তৈরি করতে পারে না। ছাপাখানা তৈরি হবার পর আর হোমার আসে না, বসে না  বাল্মীকি কাব্যে, একিলিসও আর পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে না মহাকাব্য। মেগা ন্যারেটিভের যুগ শেষ হয়ে গেছে। এখন সিমুলাক্রাগুলো বহু বাচনিক ভাষ্যের। তবু যদি কেউ আজ মহাকাব্য লেখে তা হলে তা পাঠকের মুখ ফিরানোর মধ্যেই পড়বে, কারণ একালটা মহাকাব্যের নয়। এই অবস্থাটা একদিনের তৈরি নয়, একদিনেই মহাসড়ক তৈরি হয়ে যায় না। এর জন্য সামাজিক চাহিদার প্রয়োজন। নানা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেমন সমাজজীবন বদলেছে ঠিক তেমনি বদলে যাচ্ছে এর প্রকাশ, রীতি, ব্যবহার্য, অভ্যেস রুচি। যা কিছু অতীতের তার কেবল একটি রূপান্তরীত ধারা তির তির করে বয়, বয়ে নেয় মানুষ, কিন্তু সামাজিক প্রয়োজনটাই যদি রূপান্তরিত হয়ে যায় নানা ছেদের মধ্য দিয়েই তা ঘটছে, নির্মাণও তদ্‌সংলগ্ন হচ্ছে, ফলে কবির দৃষ্টিভঙ্গিরও বিভ্রান্তি বাড়ছে প্রতিফলিত হচ্ছে কবিতায়। এ যুগটাই তো গতির। তবে হ্যাঁ এটা সত্য যে মানুষ পুরনো মূল্যবোধগুলোকে সুদীর্ঘ সময় ধরে বয়ে নিয়ে আসে, যাকে বদলের মধ্য দিয়ে বদল করে নিতে হয়, এভাবে সমৃদ্ধ হয় ঐতিহ্য আর এর প্রেরণা শক্তি জোগায় রাজনীতি। রাজনীতিই সমাজের মূল শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং তার মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয় সমাজের সকল মানুষের চিন্তা-কর্ম-হিত-অহিত।

সঙ্গত কারণে প্রতিটি মানুষই রাজনৈতিক অস্তিত্ব, যা সে উপলব্ধি করতে পারে না তার অজ্ঞতার কারণে। আরও সংগত যে কবি বা সৃজনশীল মানুষও সেই রাজনৈতিক ধ্যানধারণার মধ্যে যুক্ত থেকে তাদের ভাবনা নির্মাণকে অস্তিত্বময় করে তোলে। চলমান বিশ্ব-সমাজ মানুষের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, কারণ তারা শঙ্কিত থাকে যে এই শুদ্ধ মুক্তি তার স্বার্থকে উপড়ে ফেলবে। যা সুন্দর তাই সত্য এই তথ্যের ভিন্ন মত করা যায় এ ভাবে যে সুন্দর ব্যক্তি ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত হলে সমাজ যদি আবদ্ধ হয় এবং জ্ঞান যদি কুক্ষিগত কোনো বিষয় হয় তা হলে ব্যক্তির কাছে সুন্দরের হেরফের হবেই।

৪.
প্রাগ-সমাজ এক সঙ্গে একই ভাবে সকল গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের মধ্যে একই ধারায় বিবর্তিত হয় নি। একই রকম ভাব-ভাবনা নিয়ে এগিয়েও আসতে পারে নি। রূপান্তর ক্রিয়াটি ঘটেছে প্রত্যেকটি সমাজের মানুষের ভাবনা ও কর্মধারার মধ্যে। কেউ এগিয়েছে দ্রুত কেউ থেকে গেছে অনেক পিছনে। কিন্তু প্রত্যেকটি সমাজে মানুষ বেড়ির মধ্যে পড়েছে। আর বাকীরা হয়েছে নিয়মের দাস। এমনি এক দীর্ঘপরিক্রমায় দাস সমাজ থেকে উত্তীর্ণ হয়ে মানব সমাজ প্রবেশ করেছে সামন্ত সমাজে তারপর পুুঁজিবাদী সমাজে। কিন্তু যে দাগরাজি তার মনে সে বয়ে এনেছে আজকের সময়েও সে তার অনেক অনুকণা ধারণ করছে। তাই প্রভুর দাস, প্রভু হয়েছে ঈশ্বরের প্রতিভূ। ঈশ্বরের গুণ মানব প্রভুর উপরও আরোপিত হয়। এই মনোবৃত্তি এখনও মানুষ ধারণ করে। তার নাম হয় আব্দুল মানে দাস। মনস্তাত্ত্বিকভাবে যেখানে প্রভু সেখানে দাস। প্রভুর মনোরঞ্জনের মধ্যে দাসের মুক্তি। এই ধারণা যেমন তার বন্দিত্বকে শক্তগিরার আংটায় আটকে  রেখেছে তেমনি সমাজে বিরাজমান নানা ঘাত প্রতিঘাত তার বাহ্যিক রংটা খসে গিয়ে তার মুক্তি বলে প্রভু শক্তির ঘোষণায় মূলত দাসের নতুন সংস্করণ ঘোষিত হচ্ছে।

মানুষের অতীত ইতিহাসে তার জৈব বিবর্তনের দুটো ধারা বর্তমান। অবস্থার ফেরে নানা সময়ে নানা রূপান্তর ঘটেছে। আর সে রূপান্তরের চিহ্নগুলো প্রত্যক্ষ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাটির নিচের নানা স্তরের মতো দেহে ও মনে ও সামাজিক ব্যবস্থায় সেই সব চিহ্নরাজির উপস্থিতি আজও আমরা দেখতে পাই। কবে যুথবদ্ধ জীবনে নেতার একছত্র আধিপত্যে মানুষ বাস করেছে এবং নেতার ইচ্ছা কর্ম আদেশ নির্দেশ সে মান্য করেছে এবং করতে করতে সে যে  পোষা মানব সন্তানে পরিণত হয়েছে আজও আমরা তা প্রত্যক্ষ করি ব্যাপক মানুষের স্বভাবে। আবার সে কালেও বিদ্রোহ এক গোষ্ঠী আরেক গোষ্ঠীকে পদানত, অধীন করা, এমনকি নতুন শক্তিমানের ক্ষমতা দখল ও কুক্ষিগত করণ এও লক্ষ করলে বিফল হবার কথা নয়, দালালি, চতুরতা, দখল ইত্যাদিও মানুষের জীবনপ্রণালি খুঁজলে আজও সমান ভাবে পাওয়া যায়। একদিকে যেমন একদল মানুষকে অধীন করতে চাইছে, অন্যদিকে চাইছে বন্ধনছিন্ন করার উপায়।

রূপান্তর ক্রিয়া তাই জটিল, কখনও সামনে কখনও পিছিয়ে কখনও সোজা কখনও বক্র লাইনে প্রবেশ করেছে আজকের সমাজে। এতে রয়েছে বিশাল সময়ের ইতিহাস এক দু’বছর নয়, একশ দু’শ বছরও নয়, হাজার হাজার বছর। ঝরে গেছে বহু কিছু, পাওয়া গেছে অনেক কিছু, আবার তা ঝরে যাচ্ছে নতুনে, কিন্তু একটা রেশ বয়ে নিচ্ছে মানুষ ধারাবাহিকতায় তার মনোজগতে। ‘সামাজিক জীবনে যা মানুষ করে থাকে তাই রীতি; তাকে যখন বিশ্লিষ্ট করে ঔচিত্যের দাবিতে খাড়া করা হয় তখন তার নাম হয় নীতি। আর প্রত্যেকের ব্যক্তিগত এবং যৌথ ব্যবহারে এই রীতি এবং নীতির যেটুকু আপনা হতেই সক্রিয় সেই টুকুকেই বলা হয় ঐতিহ্য’। এই ঐতিহ্য মানব সমাজ মানসের ঐক্যের মূলসূত্র, কিন্তু এই ঐতিহ্যও অনড় অচল কোনো বিষয় নয়, বরং বলা চলে নতুন সময়ের নতুন রূপায়নে আরো অনেক কিছু এতে যুক্ত হয়, নবায়িত হয়। তাই এলিয়ট শিল্প সাহিত্যে ঐতিহ্যের নবায়নেই আধুনিকতার সড়কে পা রেখেছিলেন। তাই প্রকাশগুলো রীতি আর নীতির নবায়ন প্রস্তাবনায় যখন নতুনকে ডাক দেয় তখন তা কাঁপিয়ে দেয় সমাজে অনাকাঙ্ক্ষিতের বাহুবেষ্টন। তখন তারা সেই প্রকাশকে কিনতে চায়, কিনে নেয়, দমন নিপীড়ন চালায়, প্রকাশকে পুড়িয়ে ফেলে, প্রকাশকারীকে হত্যা করে। আর যারা কেনা বেচার হাটে বকরি ছাগলের মতো গলায় দড়ি পরে, তারা কুড়ায় প্রাপ্তি ছিটে  ফোটা, যা পায় তাই চাটে ও চোষে। তারা বড় কেউ ছোট কেউ বনে যায়।

৫.
একে তো ঘা তার উপর বিষফোঁড়া। বিষফোঁড়ার মতো এইসব লেখক শিল্পীরা এমন আচরণ করে যে তা হয়ে ওঠে আরো বিভ্রান্তিকর। তারা সমাজে আবর্জনার স্তূপ তৈরি করে কখনও অজ্ঞতায় কখনো জেনেশুনে। তাদের লেখায় সৃজনে সেই সব বিকৃতিরই স্থান ঘটে যা করে শাসকের তুষ্টি অর্জন করা যায় এবং এর জন্য প্রকাশকের অভাব হয় না। প্রয়োজেনে দাদনও মেলে, মেলে বিশেষ বিশেষ দিনের দাওয়াত। কিন্তু তারা এ কথা ভাবে না তারা যা করছে তা তারা দায়িত্ব নিয়ে করছে কিনা। সে দিকে দৃকপাত করতে পারে না কারণ তারা  চেতনা হারানোর দিকে ঝুঁকে আছে।


দুর্বল সবল দ্বারা লাঞ্ছিত হয়, সবল দুর্বলকে দখল করে, দাসে পরিণত করে।


লেখক বা সৃজনশীল মানুষের মুখ্য কাজ সমাজের অসংগতি, জীবন আবদ্ধতা প্রসঙ্গে মানুষকে সচেতন করা। তার লেখা হয়ে উঠবে মানবমুখী, মানবতার জয়গান সে গাইবে কারণ এটা তার নৈতিক দায়িত্ব। সে কাজ ভুলে গিয়ে তারা হয়ে ওঠে আঁতেল নামের একপ্রকার জীব। তারা এমন সব বিষয়-আশয় তাদের লেখায় আমদানি করে যাকে কোনোভাবেই সুস্থতা বলা চলে না। যারা সৃষ্টিকে উদ্দেশ্যহীন ভাবেন এবং ভাবেন শিল্প কারো বিশেষ দাবিকে গ্রাহ্য করে না, তার অর্থ দাঁডায় তারা একটা বিষয়ে ওকালতি করেন সেই তাদের হয়ে, যারা মুক্ত মন, মুক্ত সমাজ, মুক্ত জীবনের বিরোধিতা করে নিজদের সুবিধা গুছিয়ে নেন। তারা তাদের স্বার্থকেই সমুন্নত রাখতে চান। যারা বিপুল মানুষের দুঃখের কারণ অথচ তারা সামান্যই। এই সামান্যের সেবা না করে বহুর সেবায় নিজ শ্রম লাগুক—এটাই একজন সচেতন মানুষের কাজ হওয়া উচিত। হায় হায় রব উঠবে, কারণ আঁতেলগিরি ফলাতে হলে তো সাধারণের কাছে যাওয়া যাবে না, থাকতে হবে সেই ভিড়ে  যেখানে একদল লোক তাকেই বাহবা দেবে, এবং তাকে নিয়ে হৈ হৈ করবে।

দুর্বল সবল দ্বারা লাঞ্ছিত হয়, সবল দুর্বলকে দখল করে, দাসে পরিণত করে। সমাজ সচেতন লেখক শিল্পীরা সমাজের  সেই অংশেরই প্রতিচ্ছবি তুলে আনবেন, যা মানুষের মনে স্বপ্ন তৈরি করবে, এজন্য তাকে বিষয়টি নির্বাচন করতে হবে প্রথম। বিষয়ের পরে প্রকাশের রূপটি যদি লেখকের আয়ত্ত্বে না থাকে তা হলে বিষয় গতানুগতিক হয়ে পড়বে। টলস্টয়ের মত ছিল ‘শিল্প শিল্পের জন্য নয়, শিল্প মানুষের জন্য, অধিকে কী করে যাওয়া যায় কী করে তাতে শিল্পগুণাগুণ আরোপ করা যায়, এবং নান্দনিক হয়ে ওঠে।’ একজন  লেখকের/ শিল্পীর তাই নিয়ে ভাবতে হবে। কেন  বেশিকে পাওয়া গেল না  সে কি নির্মাণের জটিলতার কারণে নাকি উপলব্ধির অভ্যেসের কারণে তাও একজন সৃজনশীল মানুষকে প্রতিনিয়ত ভাবতে হবে। হিটলারের কথা বিশ্বাস করেছিল সেকালের জার্মান সমাজ এবং কোনোভাবে কোনো বিপরীত মতপ্রকাশ অসম্ভবই শুধু নয় জীবনহানীকর ছিল। ফলে হিটলারের পরাজয় কেবল তার যুদ্ধপারঙ্গমতার অভাবে ঘটেছিল তেমন নয়, বরং ওই সমাজের অভ্যন্তরের ক্রিয়ায় সমাজশক্তির নিষ্পৃহতার কারণও তার পরাজয়কে সহজ করেছিল। সুতরাং ‘সাইলেন্ট মেজরিটি’ কেবল পাবলিক তাও কিন্তু নয়, যদি তারা এ কথাটি উপলব্ধি করতে পারে যে তার স্বপ্ন আছে, আর তা অর্জনে তার শ্রম জরুরি তাও তারা দেয়, যেমন দিয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে। অথচ আমরা ভাবি তারা কিছুই বোঝে না, গরুগুলো শুধু খায় আর হাগে, তো লেখকই ভুল করলেন। বরং লেখকের এই ভাবনাটা যদি একটু বদল ঘটে, এই ভাবে যে সভ্যতার অগ্রগতিকে স্বীকার করে আমি লিখব আমার লেখা, যা বেশি মানুষ এখন তাদের দিকে চায়। এবং সেই লেখাটার জন্য নিশ্চয়ই বেশি মানুষ অপেক্ষমাণ। তা হলেই জনপ্রিয়তা ফিরবে, নইলে অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটবে কবিতার ভবিষ্যৎ।

মতিন বৈরাগী

জন্ম ১৬ নভেম্বর, ১৯৪৬; লাকুরতলা গ্রাম, বরগুনা।

প্রকাশিত কাব্য ১৮টি।

প্রবন্ধ—
কাব্য শিল্প আনন্দ-২০১৫
কবিতা এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ-২০১৭

ই-মেইল : matin_bairagi@yahoo.com