হোম গদ্য কথাসাহিত্যে যৌনতা প্রকাশের মাত্রা

কথাসাহিত্যে যৌনতা প্রকাশের মাত্রা

কথাসাহিত্যে যৌনতা প্রকাশের মাত্রা
654
0

‘তোমার লাগিয়া যোগিনী সাজিব’। সাজিব এই জন্য যে, তোমার লিঙ্গ আছে। এবং আমিও যে তোমার জন্য যোগী সাজব, তার হেতুও ঐ যোনি। এই দুই অঙ্গ ব্যতীত আসলে প্রেম মিথ্যা

তাসমিমা হোসেন সম্পাদিত পাক্ষিক ‘অনন্যা’ আয়োজন করেছিল একটি গোলটেবিল আলোচনার। বিষয় ছিল ‘শিল্প-সাহিত্যে যৌনতা প্রকাশের মাত্রা’। আলোচকদের মধ্যে আমিও ছিলাম। বিষয়টা চমৎকার। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান―এগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে লোকমুখে প্রচলিত। আমি মনে করি এগুলোর বাইরে আরো একটি অধিকার আছে―যৌনতা। এটি শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, বলতে হবে অপরিহার্য। কেননা যৌনতা একটা প্রাকৃতিক ব্যাপার। এর মধ্যে সৃজনপ্রক্রিয়া নিহিত। যৌনতা না থাকলে পৃথিবীতে আমি বা আমরা আসতে পারতাম না। আদমকে ইভ গন্ধম খাইয়েছিল যৌনতার উদ্রেক ঘটানোর জন্যই। যৌনতার জন্যই আদম-তনয় হাবিলকে হত্যা করেছিল কাবিল। শুধু মানুষ নয়, দেবতাদেরও যৌনতা আছে। ইন্দ্র থেকে ব্রহ্মা-বিষ্ণু―সবাই যৌনকাতর। জিউস থেকে শুরু করে হেফ্যাস্টুস্―কেউ যৌনতার বাইরে নয়। যৌনবিষয়ক অযাচার-ব্যভিচার শুধু মানুষের মধ্যেই নয়, দেবতাদের মধ্যেও ছিল। ভারতবর্ষীয় শাস্ত্রসম্ভারে আর্যদেবতাদের যৌনতা সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। নানা শাস্ত্রমতে, দেবতাদের সংখ্যা তেত্রিশ কোটি এবং অপ্সরাদের সংখ্যা ষাট কোটি। তেত্রিশ কোটি দেবতা ষাট কোটি অপ্সরা নিয়ে কী করত, তা তো আর খুলে বলতে হবে না। ইন্দ্র থেকে ব্রহ্মা-বিষ্ণু সবাই যৌনকাতর। দেবতা ইন্দ্র যে গৌতম ঋষির স্ত্রী অহল্যার সতীত্ব নাশ করেছিল, সেকথা তো রামায়ণেই প্রোক্ত হয়েছে। ইন্দ্রাণী বা শচীর সতীত্ব নষ্ট করে তার পিতা পুলমাকে হত্যা করে ইন্দ্র পরে ইন্দ্রাণীকে বিয়ে করে। এখানেই শেষ নয়, ইন্দ্র মর্ত্যলোকে এসে মানবীদের সঙ্গে মিলিত হতো। এই মিলনেই বালী ও অর্জুনের জন্ম হয়। পৌরাণিক যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা বিষ্ণু পরস্ত্রী বৃন্দা ও তুলসীর সতীত্ব নাশ করে। দেবতা ধর্মও মর্ত্যে এসে মানবীদের সঙ্গে মিলিত হতো। ধর্ম ও কুন্তীর মিলনেই যুধিষ্ঠিরের জন্ম হয়। পবনদেব ও কেশরীরাজের স্ত্রী অঞ্জনার যৌনমিলনে জন্ম হয় হনুমানের।

ঋগ্বেদে দেখা যায় যমী তার যমজ ভাই যমের কাছে সঙ্গম প্রার্থনা করছে। দম্ভ নিজ বোন মায়াকে, লোভ নিজ বোন নিবৃত্তিকে, ক্রোধ নিজ বোন হিংসাকে ও কলি নিজ বোন নিরুক্তিকে বিয়ে করছে। মৎস্যপুরাণ অনুযায়ী, শতরূপা হচ্ছে ব্রহ্মার মেয়ে। কিন্তু ব্রহ্মা মেয়ের রূপে মুগ্ধ হয়ে তার সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হয়। এই মেয়ের গর্ভে জন্ম হয় সায়ম্ভুব মনুর। এই মনু থেকেই মনুষ্য জাতির উদ্ভব। ব্রহ্মার মতো প্রজাপতিও ছিল কামুক দেবতা। প্রজাপতি নিজ মেয়ে ঊষার সঙ্গে সঙ্গম করে। ঊষা হচ্ছে সূর্যের জনয়িত্রী। কিন্তু সূর্য প্রেমিকের মতো ঊষার পিছু ছুটছে ও তাকে স্ত্রীরূপে বরণ করছে। কী যৌনবৈচিত্র্য!

আদিত্যযজ্ঞে দেবতা মিত্র ও বরুণ অপ্সরা ঊর্বশীকে দেখে কামলালসায় অভিভূত হয়ে যজ্ঞকুম্ভের মধ্যে বীর্যপাত করে। অগ্নিদেবতা একবার সপ্তর্ষিদের স্ত্রীদের দেখে কামোন্মত্ত হয়েছিল। ঋক্ষরজাকে দেখে ইন্দ্র ও সূর্য দুজনেই এমন উত্তেজিত হয়েছিল যে, ইন্দ্র তার চিকুরে ও সূর্য তার গ্রীবায় বীর্যপাত করে ফেলে। দক্ষের ২৭টি মেয়েকে বিয়ে করেছিল দেবতা চন্দ্র। তাতেও তার কাম-লালসা তৃপ্ত হলো না। কামাসক্ত হয়ে সে দেবগুরু বৃহস্পতির স্ত্রী তারাকে অপহরণ ও ধর্ষণ করে। বৃহস্পতিও কিন্তু একেবারে সাধু ছিল না। কামলালসায় মত্ত হয়ে সে বড় ভাইয়ের স্ত্রী মমতার অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় জোরপূর্বক তার সাথে সঙ্গম করে।

দেবতাতের যৌনজীবন নিয়ে কথা আর দীর্ঘ না করি। যৌনতা আছে মানবেতর প্রাণীদের মধ্যেও। সুতরাং যৌনতাকে অস্বীকার করা মানে প্রকৃতিকেই অস্বীকার করা। ঔপন্যাসিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন বলেন, ‘সুদীর্ঘকাল ধরে আমি যেটা উপলব্ধি করেছি, আমরা যে সংঘবদ্ধ আছি, তার কারণ, এর মধ্যে একটি নারী আছে। যদি নারী না থাকত, তাহলে এই সমাজ, রাজনীতি, শিল্পসৃষ্টি কিছুই থাকত না। এই থাকাটাই মূল্যবান। আর এর কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে যৌনতা। আমি মনে করি, যৌনতাই প্রাণ। যৌনতাই সৃষ্টির উৎস, যৌনতাই ঈশ্বর।’

‘তোমার লাগিয়া যোগিনী সাজিব’। সাজিব এই জন্য যে, তোমার লিঙ্গ আছে। এবং আমিও যে তোমার জন্য যোগী সাজব, তার হেতুও ঐ যোনি। এই দুই অঙ্গ ব্যতীত আসলে প্রেম মিথ্যা। প্লেটোনিক লাভ অলীক তত্ত্ব মাত্র। এক মহা সংঘর্ষে বিশ্বভূমণ্ডলের সৃষ্টি। একইভাবেই অঙ্গের সংঘর্ষেই প্রেমের উৎপত্তি। কৃষ্ণলীলাও ঐ অঙ্গকে কেন্দ্র করেই। শিরি যদি ক্লীব হতো, ফরহাদ তবে এতটা উন্মাতাল হতো না। কিংবা লাইলি যদি জগৎশ্রেষ্ঠ সুন্দরীও হতো, যোনিহীন হলে মজনু এতটা দেওয়ানা হতো না। ইউসুফের অঙ্গের কারণেই জুলেখার পরকীয়ায় মত্ত হওয়া। অঙ্গ ব্যতীত প্রেম ক্ষণস্থায়ী। অতএব এই তো সংবিধিবদ্ধ হওয়া উচিত, অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থানের মতো যৌনতাও এক মৌলিক অধিকার। একে আড়াল করলে আকর্ষণ বাড়ে বটে, কিন্তু অবদমনে যে ধর্ষণ বাড়ে তাতে সন্দেহ নেই।

যাই হোক, আমার লেখালেখির ক্ষেত্র যেহেতু কথাসহিত্য সেহেতু ঐ দিনের আলোচনায় আমাকে বলতে বলা হয়েছিল কথাসাহিত্যে অর্থাৎ গল্প-উপন্যাসে যৌনতা প্রকাশের মাত্রা প্রসঙ্গে। কথাসাহিত্য কী? কথাসাহিত্য তো বায়বীয় কিছু নয়। এটি আকাশ থেকে পড়ে না। কথাসাহিত্য আমাদের জীবনেরই নান্দনিক উপস্থাপনা, জীবনেরই প্রতিসরণ। উপন্যাসের কথাই ধরা যাক। উপন্যাস মানব-জীবনেরই কথা। উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে মানুষ, মানুষের জীবন; যে জীবন শুধু কাব্যিক নয়, যে জীবন কেবল দ্বন্দ্বময় নয়, যার রূপ শুধু দৃশ্যময় নয়। জীবন সর্বব্যাপ্ত, তাই উপন্যাসও সর্বপ্রসারী। যৌনতা এই সর্বপ্রসারিতার বাইরে নয়। কেননা যৌনতা বায়বীয় কিছু নয়, এটি বাস্তব মানুষেরই প্রবৃত্তি, যাকে ইতিপূর্বে মানুষের অধিকার বলেছি। সুতরাং উপন্যাস যেহেতু মানব-জীবনেরই কথা, সেহেতু উপন্যাসে যৌনতা থাকবে, থাকাটাই স্বাভাবিক। নইলে সেই উপন্যাস মানব-জীবনের সর্বব্যাপ্ততাকে ধরতে পারবে না।

কিন্তু যৌনতা কি প্রকাশ্য? আমরা কি প্রকাশ্যে সঙ্গম করি? আমরা যেমন প্রকশ্যে ধূমপান করি, হোটেলে দশজনের সামনে প্রকাশ্যে খাই কিংবা বিশাল গ্যালারিতে হাজার হাজার দর্শকের সামনে প্রকাশ্যে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলি, যৌনতা কি সেভাবে করি? অবশ্যই না। যৌনতার মধ্যে গোপনীয়তা আছে, আড়াল আছে। আমি ইচ্ছে করলেই দিনেদুপুরে ফার্মগেট ওভারব্রিজের ওপর কোনো নারীর সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হতে পারি না। হোক সেই নারী আমার স্ত্রী, যৌনসঙ্গিনী, প্রেমিকা কিংবা কোনো যৌনকর্মী। যৌনকর্মের জন্য আমাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে যেতে হয়। কেন? এই জন্য যে, যৌনকর্ম একটা গোপনীয়তার ব্যাপার, একটা আড়ালের ব্যাপার; অন্তত আমাদের দেশে, এই বাংলাদেশে। এই গোপনীয়তা বা আড়াল আছে বলেই যৌনতার প্রতি আমাদের এমন দুর্বার আকর্ষণ।

image_1077_303686
ইলিয়াসের উপন্যাস

কিন্তু আমরা তো প্রতিদিন কথাবার্তায় যৌনসংশ্লিষ্ট প্রচুর শব্দ ব্যবহার করি, যেগুলোকে সাধারণত আমরা ‘অশ্লীল শব্দ’ বলে থাকি। সেসব শব্দ কি গল্প-উপন্যাসে আসবে না? অবশ্যই আসবে। না এলে উপন্যাস পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হয়ে পড়বে

যৌনতা যদি গোপন ব্যাপার হয়, তাহলে উপন্যাসে তা প্রকাশ্য আসবে কোন যুক্তিতে? উপন্যাস যদি মানব-জীবনেরই নান্দনিক উপস্থাপনা হয়, তাহলে তো উপন্যাসে যৌনতা প্রকাশ্যে আসতে পারে না। তাহলে কীভাবে আসবে? আখতারুজ্জামান ইলিয়াস থেকে উদাহরণ দিতে পারি। ‘খোয়াবনামা’র ৪২তম পর্বে : “পেটুক বাপের আধপেটা খাওয়া গতরের তাপ নিতে তমিজ হাত রাখে কুলসুমের পিঠে, তমিজের বাপের তাপ পোয়াতে তাকে নিবিড় করে টেনে নেয় নিজের শরীরে। পায়ের দুটো ঘা থেকে তার আধপেটা গতরের গন্ধ নিতে কুলসুম হাত বোলায় তমিজের হাঁটুতে আর উরুতে। আর তমিজের বাপ অনেক দূর থেকে কাৎলাহার বিলের চোরাবালির ভেতর থেকে তার লম্বা হাত বাড়িয়ে কিংবা হাতটাই লম্বা করে আলগোগোছে টেনে নেয় তমিজের তবন আর কুলসুমের শাড়ি। গরহাজির মানুষটার গায়ের ওম পেতে আর গায়ের গন্ধ শুঁকতে দুজনে ঢুকে পড়ে দুজনের ভেতরে।”
দেখুন, তমিজ ও তার সৎমা কুলসুমের দেহমিলনকে কতটা নান্দনিকতাভাবে উপস্থাপন করেছেন ইলিয়াস। তমিজের বাপ যখন তার লম্বা হাত বাড়িয়ে তমিজের তবন আর কুলসুমের শাড়িটা খুলে নেয়, তখন আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না এরপরের দৃশ্যটা কী? এই দৃশ্যটা কী বলে দিতে হবে? না। বলে দিলে যে যৌনতার গোপনীয়তার শর্ত লঙ্ঘন হয়! এটাই হচ্ছে শিল্প। একেই বলে শিল্পে যৌনতার মাত্রা। জীবনের রশ্মি এখানে এসে বেঁকে গেছে। এই বেঁকে যাওয়াই সাহিত্যে সৌন্দর্য সৃষ্টি করে।

কিন্তু আমরা তো প্রতিদিন কথাবার্তায় যৌনসংশ্লিষ্ট প্রচুর শব্দ ব্যবহার করি, যেগুলোকে সাধারণত আমরা ‘অশ্লীল শব্দ’ বলে থাকি। সেসব শব্দ কি গল্প-উপন্যাসে আসবে না? অবশ্যই আসবে। না এলে উপন্যাস পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হয়ে পড়বে। কিন্তু কিভাবে আসবে? আসার ধরনটা কী? আবারও ইলিয়াসের খোয়াবনামার ৭ নং অধ্যায় থেকে উদ্বৃতি দেই : “এই কয়েক দিনে তমিজ জমিটাকে একেবারে মাখনের মতো করে ফেলেছে। সকালবেলার দিকে কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানি প্রায় পড়েই না। বিকালের দিকে আলের ওপর বসে দুই হাতে কাদা ছানতে ছানতে বৃষ্টির গন্ধে, কাদার গন্ধে, একটুখানি আভাস-দিয়ে-যাওয়া রোদের গন্ধে এবং হাতের সঞ্চালনে তমিজের ঘুম ঘুম পায়, এই সময় জমিতে একেবারে উপুড় হয়ে শোবার তাগিদে তার সারা শরীর এলিয়ে এলিয়ে পড়ে। হয়তো সত্যি সত্যি সে শুয়েই পড়তো, কিন্তু বেছে বেছে ঐ মুহূর্তেই শালার বুড়ার বেটা চিৎকার করে বলে, ‘ক্যা রে মাঝির ব্যাটা, মাটি কি মাগীমানষের দুধ? ওংকা কর‌্যা টিপিচ্ছো কিসক?…হাত দিয়া মটি ছানা হয় না। জমি চায় নাঙলের ফলা, বুঝলু? জমি হলো শালার মাগীমানুষের অধম, শালী বড়ো লটিমাগী রে, ছিনালের একশ্যাষ। নাঙলের চোদন না খালে মাগীর সুখ হয় না। হাত দিয়া তুই উগলান কী করিস?”

খেয়াল করার দরকার, উর্ধ্বকমার (“”) মধ্যে যে কথাগুলো সেগুলো কিন্তু ঔপন্যাসিকের নয়, একটি চরিত্রের, হুরমতুল্লার। হুরমতুল্লা কে? জীবন্ত মানুষ, যে মানুষকে নিয়ে উপন্যাসের কারবার। এই জীবন্ত মানুষ যে ভাষায় কথা বলে হুবহু সেই ভাষাই ঔপন্যাসিক তার উপন্যাসে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু ঔপন্যাসিকের যে ভাষা সেই ভাষা কিন্তু মার্জিত, পরিশীলিত। এই ভাষায় ঔপন্যাসিক দৈনন্দিনতা-নিরপেক্ষ। কেননা এই ভাষার মাধ্যমে ঔপন্যাসিক তার পাঠকদের সঙ্গে কমিউনিকেট বা যোগাযোগ করছেন। এটা যোগাযোগের ভাষা। এই ভাষায় দৈনন্দিনতার যৌনতাসংশ্লিষ্ট শব্দগুলো নেই। কেন নেই? আমরা প্রতিদিন প্রচুর কথা বলি, কথার মধ্যে ‘শ্লীল-অশ্লীল’ প্রচুর শব্দ ব্যবহার করি। শ্লীল শব্দগুলো আমরা ব্যবহার করি সর্বসম্মুখে, কিন্তু অশ্লীল শব্দগুলো সর্বসম্মুখে ব্যবহার করতে পারি না। অফিসে সহকর্মীর সঙ্গে কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আমি অশ্লীল ভাষায় কথা বলতে পারি না। কিংবা কোনো প্রচার মাধ্যমে, পত্রিকা কি রেডিও কি টেলিভিশন―যা-ই হোক না কেন, কথা বলার সময় আমরা কথাগুলোকে সম্পাদনা করি। টেলিভিশনের টকশো-তে গিয়ে কেউ কুরুচিপূর্ণ ভাষায়, অশ্লীল বা যৌনসংশ্লিষ্ট শব্দ প্রয়োগ করে কথা বলেন না। কথাগুলোকে তিনি সম্পাদনা করেন। এই জন্য যে, তার কথাগুলো তখন আর তার নিজস্ব পরিমণ্ডলে থাকছে না, সর্বসাধারণের কাছে চলে যাচ্ছে। তার মানে ভাষার মাধ্যমে সর্বসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ভাষার একটা পরিশীলিত রূপ থাকা লাগে। সভ্যসমাজের এই দস্তুর। একইভাবে একটি উপন্যাস যখন আমি লিখছি, সেটা হয়তো নিজের জন্যই লিখছি। কিন্তু পাণ্ডুলিপিটা যখন বই আকারে ছাপতে দিচ্ছি, সেটা আমার জন্য ছাপা হচ্ছে না, ছাপা হচ্ছে সর্বসাধারণের পাঠের জন্য। এ কারণেই উপন্যাসে ব্যবহৃত ভাষাটাকে আমি পরিশীলিতভাবে উপস্থাপন করি। আমার জীবনে বলা সব কথা, সব ভাষা, সব শব্দ আমি ইচ্ছে করলেই উপন্যাসে ব্যবহার করতে পারি না। কেননা আমি উপন্যাসটির মাধ্যমে সর্বসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। উপন্যাসে আমি যখন বর্ণনা দিচ্ছি তখন ইচ্ছে করলেই মানুষ যেগুলোকে অশ্লীল শব্দ বলে সেগুলোকে আমি ব্যবহার করতে পারি না। কেননা সেটা আমার যোগাযোগের ভাষা, আমার শিল্পের ভাষা, আমার উপন্যাসের চরিত্রের দৈনন্দিনতার ভাষা নয়।

যৌনতারও একটা মাত্রা আছে। উপন্যাসে যৌনতাকে উপস্থাপনের জন্য দরকার শিল্পিত ভাষা, শিল্পিত শব্দ; যেহেতু উপন্যাস একটি শিল্পকর্ম

ডিএইচ লরেন্স মনে করতেন, মানবীয় সম্বন্ধের আসল ভিত্তি দেহ এবং সভ্যতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেহের অস্তিত্ব ভুলে মানুষ জগতকে দুস্থ ও দুর্নীতিময় করে তুলেছে। তার ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ উপন্যাসে দেহধর্মের আদিম কামনার জয় ঘোষিত হয়েছে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত পুরুষত্বহীন শিল্পপতি স্যার ক্লিফোর্ডকে পরিত্যাগ করে লেডি চ্যাটার্লি মুক্ত অরণ্যভূমিতে, মৃত্তিকায়, বর্ষাধারায় আদিম নারীর মতো স্বামীর ‘গেম-কিপার’ বা শিকার-রক্ষক নিম্নরুচির অথচ স্বাস্থ্যের আদিম রক্তে তাজা মের্লস-এর কাছে দেহ সমর্পণে ও যৌনসঙ্গমে আত্মার মুক্তি খুঁজে পেয়েছে। এটা করতে গিয়ে লরেন্স তার পুরো উপন্যাসে কটি ‘স্ল্যাং ওয়ার্ড’ বা ‘অশ্লীল শব্দ’ বা যৌনসংশ্লিষ্ট শব্দ ব্যবহার করেছেন? মের্লস-এর সঙ্গে চ্যাটার্লির সঙ্গম কোন ভঙ্গিমায়, কোন রীতিতে বা কোন মুদ্রায় হয়েছিল কিংবা উভয়ের বীর্যস্খলনের দৃশ্য কি লরেন্স বর্ণনা করেছেন? উভয়ের শীৎকারকে কি তিনি লেখ্যরূপ দিয়েছেন? না, দেন নি। নিশ্চয়ই একটা মাত্রা তিনি বজায় রেখেছেন, যেটাকে বলা হয় শিল্পের মাত্রা। এই মাত্রা যদি তিনি বজায় না রাখতেন, তাহলে এটি উপন্যাস হতো না, হতো পর্নোগ্রাফ বা চটি। চ্যাটার্লি ও মেলরস্-এর সঙ্গমকে তিনি এমন শিল্পিত উপায়ে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে অশ্লীল শব্দ বা বাক্যের ব্যবহার কিংবা দৃশ্যের বর্ণনার দরকার পড়ে নি।

কিংবা এমিল জোলার ‘তেরেসা’ উপন্যাসের কথাই ধরুন। জোলা তো তথাকথিত অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত ছিলেন। তার উপন্যাসে যৌনতার মাত্রাটা কেমন? বন্ধুপত্নী তেরেসাকে পাওয়ার জন্য তার স্বামী ক্যামিলাসকে নদীতে ডুবিয়ে মারে লঁরা। তবু সে নিশ্চিত হয় না, ক্যামিলাসের মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে লাশঘরে গিয়ে তার লাশ খোঁজে। লাশঘরে প্রেমের জন্য ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যাকারী এক মেয়ের অনাবৃত বক্ষদেশ দেখে লঁরা যৌনকাতর হয়। একটা ভয়ার্ত কামনায় অনেকক্ষণ ধরে চোখ দিয়ে মৃত মেয়েটার সর্বাঙ্গ লেহন করে। পাঠক হিসেবে আমরা যখন এই দৃশ্য পড়ি তখন কিন্তু যৌনতাড়িত হই না, বরং এক ধরনের বিবমিষা জাগে আমাদের ভেতর। আমরা ভয়তাড়িত হই। কিংবা লঁরা যখন তেরেসার কক্ষে গিয়ে দিনের পর দিন তার সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হয় তখনও কিন্তু আমাদের মধ্যে যৌনতাড়নার সৃষ্টি হয় না, বরং তেরেসার বেচারা স্বামী ক্যামিলাসের জন্য আমাদের মায়া হয়। তেরেসা ও লঁরার শীৎকারকে জোলা তার উপন্যাসে লেখ্যরূপে উপস্থাপন করেন নি। কোন ভঙ্গিমায় লঁরা তেরেসায় উপগত হয়েছিল তার বর্ণনাও দেন নি। দিলে শিল্পের শর্ত লঙ্ঘন হতো। তিনি যৌনতাকে এমন একটা মাত্রায় রেখেছেন, যা শিল্পের মাত্রা। রেখেছেন বলেই ‘তেরেসা’ শিল্প হয়ে উঠেছে।

শুধু যৌনতা কেন, উপন্যাসে যে ডিটেইলিংয়ের কথা বলা হয়, তারও একটা মাত্রা আছে। মাত্রা ছাড়া হলে উপন্যাস ঝুলে পড়ে। উপন্যাসের শব্দ ব্যবহারেরও একটা মাত্রা আছে। কিংবা একটি বাক্যের মধ্যে আমি যদি একই শব্দ দু-বারের বেশি উল্লেখ করি, বাক্যটি দুর্বল হয়ে পড়ে। একইভাবে যৌনতারও একটা মাত্রা আছে। উপন্যাসে যৌনতাকে উপস্থাপনের জন্য দরকার শিল্পিত ভাষা, শিল্পিত শব্দ; যেহেতু উপন্যাস একটি শিল্পকর্ম। ভাষাই হচ্ছে ঔপন্যাসিকের শক্তি। আমাদের দৈনন্দিন জীবন কিন্তু শিল্পিত নয়, আমরা শিল্পিত জীবন যাপন করি না। আমাদের জীবনটাকে যখন শিল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে চাই, তার উপস্থাপনাও হবে শিল্পিত, তার ভাষাও হবে শৈল্পিক। এর ব্যত্যয় ঘটলে সেটা আর যাই হোক, শিল্প নয়।

স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)