হোম গদ্য এজরা পাউন্ডের হাউ আই বিগান

এজরা পাউন্ডের হাউ আই বিগান

এজরা পাউন্ডের হাউ আই বিগান
1.38K
0

ইংরেজি সাহিত্যে আধুনিক কবিতার সূচনা যে কয়জন কবির হাতে তাদের মধ্যে এজরা পাউন্ড অন্যতম। চিত্রকল্পবাদ বা Imagism ধারণার প্রবক্তা হিশেবে সুপরিচিত এজরা পাউন্ড ছিলেন সে সময়কার অনেক কবি লেখকদেরই গুরু স্থানীয়। টি. এস. এলিয়ট, রবার্ট ফ্রস্ট, জেমস জয়েস, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এমন অনেকেরই লেখক জীবনের শুরুতে তিনি তাদের পরিচয়-প্রতিষ্ঠা এবং দিক নির্দেশনার কাজ করেছেন।

ইংরেজ বংশোদ্ভূত আমেরিকান এই কবি, জন্মেছেন ১৮৮৫ সালের ৩০ অক্টোবর। শৈশব থেকেই কবিতার প্রতি তার আগ্রহ। আমৃত্যু কবিতার প্রতি তার আকর্ষণ রয়ে গেছে। তীব্র আকর্ষণ ছিল নারীর প্রতিও। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই আরেক বিখ্যাত কবি হিল্ডা ডলিটলের সাথে তার পরিচয়। পরবর্তীতে বিয়েও করেন হিল্ডাকে। হিল্ডার সাথে বিবাহিত অবস্থায়ও আরও অনেক নারীর সাথে সম্পর্ক গড়েছেন পাউন্ড। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও সুন্দর চেহারার জন্যে মেয়েদের কাছেও বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। তার ব্যাপারে যেমন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছেন—

“তিনি তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিতেন ধনী মহিলাদের সাথে। প্রকাশকদের কাছে তদবির করতেন তাদের বই ছাপাবার জন্যে”

কেবল নিজেও নয় সমসাময়িক অন্যান্য কবিদেরও তিনি বিভিন্ন মহিলাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। আর এ কারণে “লেডিস ম্যান” হিশেবে তার খ্যাতিও ছিল বেশ। এই নারী ঘটিত ব্যাপারেই ১৯০৭ সালে কলেজে পড়াবার চাকরিটা হারান। এরপর আবারও বেড়িয়ে পড়েন ইউরোপ ভ্রমণে।

তার পরের বছর জুলাইয়ে প্রকাশ করেন তার প্রথম বই A Lume Spento। ১৯১৪ সালে তিনি ডরোথি শেক্সপিয়ারকে বিয়ে করেন। ডরোথি শেক্সপিয়ার ছিলেন ঔপন্যাসিক অলিভিয়া শেক্সপিয়ারের কন্যা। অলিভিয়ার মাধ্যমে তিনি পরিচিত হন উব্লু বি ইয়েটস এর সাথে। এবং বাকিজীবন ইয়েটস এর সাথে তার বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল বেশ ঘনিষ্ঠ।

লন্ডনে থাকাকালীন অবস্থায়ই পাউন্ড পরিচিত হন জাপানিজ কবিতার সাথে। সে সময়ে পাউন্ড তার বন্ধু রিচার্ড আলডিংটন (আলডিংটন পরবর্তীতে পাউন্ডের প্রথম স্ত্রী হিলডা ডলিটলকে বিয়ে করেন) ও হিলডা মিলে নতুন ধারায় কবিতা লেখার প্রতি প্ররোচিত হন এবং চিত্রকল্পবাদের মূল সূত্রগুলো লিপিবদ্ধ করেন। যদিও চিত্রকল্পবাদী কবিতার বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাথমিকভাবে দেখা যায়, T.E. hulme এর কবিতায়। 1914 সালে পাউন্ড প্রকাশ করেন চিত্রকল্পবাদী কবিতার প্রথম সংকলন Des Imagistes

পাউন্ড ছিলেন নিরীক্ষাধর্মী কবি, সাহিত্যজীবনের পুরো সময়টাই কবিতার বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করে গেছেন। আর এর ফলস্বরূপ তার প্রতিটি কাব্যগ্রন্থই আমাদের নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করায়। এ প্রসঙ্গে টি এস এলিয়টের মন্তব্য—

“পাউন্ডের কবিতা কেবল যেমন ভাবা হয়—তার চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণই নয়, বরং তা ধারাবাহিক উন্নতিরও চিহ্ন রেখেছে।”

পাউন্ডের কবিতা পরবর্তী অনেক কবিকেই প্রভাবিত করেছে। কবিতার পাশাপাশি তিনি লিখেছেন সমালোচনা ও কবিতা বিষয়ক গদ্যও। করেছেন বিস্তর অনুবাদও। প্রাচীন চৈনিক কবিতাকে তিনি পশ্চিমাসাহিত্যজগতের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরেন।

পাউন্ডের সাহিত্যকর্মের কথা বলতে গেলে আলাদাভাবে কোনও কবিতাগ্রন্থের কথা উল্লেখ করা মুশকিল, বরং তার সমগ্র কাব্যকীর্তিকেই অখণ্ড এক অভিযান হিশেবে বিবেচনা করা যায়। এমনকি তার অনুবাদ কবিতাগুলিকেও মৌলিক সাহিত্যের মর্যাদা দিতে কারও কুণ্ঠাবোধ হবার কথা নয়। গদ্যগ্রন্থ ABC of reading কবি ও কবিতাপ্রেমী পাঠকদের জন্যে অবশ্যপাঠ্য একটা বই।

জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি ভ্রমণ করেছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং ফ্যাসিবাদের সমর্থক হয়ে উঠেন। ফ্যাসিবাদের সমর্থন ও ফ্যাসিবাদী প্রচারণার জন্যে ১৯৪৫ সালে ইতালিতে তিনি আমেরিকান সৈন্যদের হাতে বন্দি হন। সামরিক কারাগারে বন্দি অবস্থায় মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় ওয়াশিংটনের সেন্ট এলিজাবেথ মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে, সেখানে তার প্রায় বার বছর কেটে যায়। বিভিন্ন কবি-লেখকদের প্রতিবাদের মুখে আমেরিকান সরকার তাকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। জীবনের শেষ বছরগুলো তিনি ইতালিতেই কাটিয়ে দেন। ১৯৭২ সালের পহেলা নভেম্বর পাউন্ড মৃত্যুবরণ করেন।

এই লেখাটি ১৯১৩ সালে রচিত How I Began থেকে অনূদিত।


                  আমি যেভাবে শুরু করলা
                             .
                       
এজরা পাউন্ড


ক্রিয়াপদটিকে যদি অতীতকালেই স্থাপন করা হয় তবে এ বিষয়ে বলার তেমন কিছুই থাকে না।

প্রতিমুহূর্তেই শিল্পীর আরম্ভ। যেকোনও শিল্পকর্মই যেটা প্রারম্ভ নয়, নয় উদ্ভাবন অথবা উদ্‌ঘাটন তার মূল্য খুবই সামান্য। Troubadour (কবি) নামটির অর্থই “অনুসন্ধানকারী”, যিনি উদ্‌ঘাটন করেন।

লোকে যেমনটা জানে, আমার “পেশাজীবন” অতিমাত্রায় আড়ম্বরহীন; শুরুর পাঁচ বছরে ছোট একটি কবিতা কেবল ছাপা হয়েছিল আমেরিকার একটি ম্যাগাজিনে, যদিও সেই সময়টাতে “La Fraisne” সহ আরও অনেক কবিতাই পাঠিয়েছি যেগুলি এখন আমার সেরা কাজগুলির মধ্যে কয়েকটা বলে বিবেচিত। আমার কাজকর্মের আর্থিক ফলাফল মোটে পাঁচ ডলার যা গিয়ে ঠেকে বাৎসরিক প্রায় ৪ সিলিং ৩ পেনিতে (4s. 3d.)।

লন্ডনে আমার প্রথম প্রকাশক ছিলেন মি. এলকিন ম্যাথিউস, যার কাছে আমি পাণ্ডুলিপি পাঠিয়েছিলাম। নিজ খরচে তিনি আমার প্রথম তিনটি বই “Personae,” “Exultations,” আর “Canzoni,” ছাপিয়ে দেন। যতদূর মনে আছে আমাদের একমাত্র ব্যবসায়িক কথোপকথন ছিল :

মি. ই. এম. : “হুম, ছাপানোর খরচ কি আপনি কিছুটা বহন করতে চান?”
মি. ই. পি. : “আমার পকেটে আছে মাত্র এক সিলিং, সেটা যদি আপনার কোনও কাজে আসে।”
মি. ই. এম. : “ওহ আচ্ছা, এমনিতেও অবশ্য আমি ওগুলো প্রকাশ করতে চাই”

এখন পর্যন্ত আমি এই বইগুলি থেকে একটা কানাকড়িও পাই নি, এমনকি আমার মনে হয় না মি. ম্যাথিওসও তার সব খরচ উঠিয়ে আনতে পেরেছেন। একটি বইয়ের নাম বেশ পরিচিত, এবং যতদূর জানি বইটির নাম ব্যাপকভাবে পরিচিত কেবল জনশ্রুতি আর সমালোচনা এবং পাইকারিহারে উদ্ধৃতির মাধ্যমে।

আমার লেখা বইগুলি আমাকে বন্ধু উপহার দিয়েছে অনেক। মাত্র তিন পাউন্ড হাতে নিয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত লন্ডন শহরে চলে এসেছিলাম।


আমি ঘৃণা করি সেইসব লোককে যারা ত্রুটিপূর্ণ কাজে সন্তুষ্ট থাকে।


“কৌতূহলোদ্দীপক মানুষজন” আমাকে সারাজীবনই প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছে। সেইসব মানুষদের সাথে সাক্ষাতে আগ্রহী ছিলাম যাদের কাজের আমি তারিফ করতাম। এবং তাদের সাথে সাক্ষাৎও করেছি। ভালো ভালো আড্ডা হয়েছে অনেক।

নিশ্চিত মূল্যও দিতে হয়েছে আমাকে, যথেষ্ট ঝামেলাও পোহাতে হয়েছে, অামোদ-ফূর্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবার জন্যে যথেষ্ট। আমার বিশ্বাস সমবয়সী যে কারও চেয়ে আমার জীবনে নিখাদ আনন্দের পরিমাণ অনেক বেশি।

“অনেক মানুষের আচরণ লক্ষ করেছি আমি আর দেখেছি অনেক শহর।”

জীবিত শিল্পীদের পাশাপাশি মৃত শিল্পীদেরও ঐতিহ্যের সংস্পর্শে এসেছি আমি। স্কুলের বাচ্চারা অতীতের তারকা খেলোয়াড়দের খেলার বিবরণ শুনে যেমন আনন্দ পায় তেমনই আনন্দ পেতাম এতে। কৈশোরবয়সটাকে পুনরায় ফিরিয়ে এনেছিলাম। টি. ট্রাক্সটন হেয়ার [১] এর কীর্তি শুনে যেমনটা রোমাঞ্চ অনুভব হতো সেটাই আবার ফিরে পেলাম আমি। ঠিক যেমনটা ভবিষ্যতের নবীন ছাত্ররা অনুভব করবে মাইক বেনেট কিভাবে পুরো সপ্তাহ মাতিয়ে রেখেছিল তার বর্ণনা শুনে। “প্রাচীন ব্রাউনিং” অথবা শেলির সম্মুখবারান্দা ধরে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় হেঁটে যেতে যেতে তাদের ব্যাপারে ঠিক এমনটাই অনুভব করেছি আমি।

যাই হোক, এরকম এপোস্টলিক উত্তরাধিকারে আজগুবি গল্প থেকেও আরও বেশি কিছু ছিল, কারণ প্রতিভাবান মানুষদের সংস্পর্শে এসে যাদের মনন সমৃদ্ধ হয়েছে এর প্রভাবটা তারা ধরে রাখে।

ভিক্টোরিয়ান, প্রি-রাফেলাইট এবং নব্বই-এর দশকের মানুষদের সাথে তাদের বন্ধু মারফত পরিচিত হয়েছি আমি, এবং উপভোগ করেছি ব্যাপারটা। কিটস-এর প্রুফশিট দেখেছি আমি,পরোক্ষভাবে পালন করেছি তার সময়ের নিজস্ব ঐতিহ্য। লন্ডনবাসী কারও কাছে এটা হয়তো তেমন কিছুই মনে হবে না, কিন্তু কেউ যদি চেঙ্গিস খান অথবা লোপ দে ভেগার সময়ের মতো দূরবর্তী কিছুকে চেতনায় লালন করে বড় হয়ে ওঠে তাহলে তার কাছে এটা বেশ মজার অভিজ্ঞতা মনে হবে।

“আমি কিভাবে শুরু করলাম?” এই প্রশ্নের দ্বারা যদি বুঝানো হয়ে থাকে “কিভাবে আমার পেশাগত দক্ষতা অর্জন করলাম?” তবে এর উত্তরে অনেক কিছুই বলার আছে, এবং এর খুঁটিনাটি বিষয়গুলো বেশ টেকনিক্যাল।

পনের বছর বয়সেই আমি কী করতে যাচ্ছি সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম। আমার বিশ্বাস প্রেরণাটা আসে ঈশ্বরের নিকট হতে; আর কৌশল থাকে মানুষের নিজের হাতে। কেউ মহৎ কবি হবে কি হবে না তা তার নিজের হাতে নেই, বরং তা স্বর্গ থেকে নেমে আসা এক বজ্রবিদ্যুৎ , “দেবতাদের প্রেরিত এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ” অথবা যাই বলা হোক না কেন একে।

কিন্তু তার যন্ত্রপাতি থাকে তার নিজের নিয়ন্ত্রণে। যদি সে ভালো শিল্পী হয়ে উঠতে না পারে—এমনকি হয়ে উঠতে না পারে নিখুঁত—তবে সেটা তার নিজেরই দোষে।

ত্রিশ বছর বয়সে এসে সীদ্ধান্ত নিলাম আমি, কবিতা বিষয়ে যে কোনও জীবিত ব্যক্তির থেকে আমাকে বেশি জানতে হবে, কবিতার পরিবর্তনশীল উপাদানগুলি বুঝে নিতে হবে একেবারে খোলস থেকে, আমাকে জানতে হবে সর্বত্রই কোনটিকে কবিতা হিশেবে বিবেচনা করা হয়, কবিতার কোন অংশ “অবিনশ্বর”, কোন অংশ অনুবাদে হারিয়ে যায় না, এবং—যা কোনও অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, কোন ফলাফল কেবল এক ভাষাতেই পাওয়া সম্ভব অন্য ভাষাতে নয় এবং যা সম্পূর্ণভাবে অনুবাদ অসম্ভব।

এর খোঁজে কম বেশি নয়টি বিদেশি ভাষা রপ্ত করেছি আমি, অনুবাদের মাধ্যমে পড়েছি ওরিয়েন্টাল সাহিত্যকর্ম, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান ও অধ্যাপকদের সাথে লড়াই করেছি যারাই এই ব্যাপারটি ছাড়া অন্য কিছু শেখানোর চেষ্টা করেছে আমাকে, কিংবা জ্বালাতন করেছে “ডিগ্রির প্রয়োজনীয়তা” নিয়ে।

অবশ্যই কোনও পরিমাণ পাণ্ডিত্যই কাউকে কবিতা লেখায় সাহায্য করে না, এটা এমনকি বিশাল এক বোঝা মনে হতে পারে, কিন্তু বেশ কিছু ব্যর্থতাকে এড়িয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে তা। এবং তাকে অসন্তুষ্ট রাখে মাঝারি মানের প্রতিভার প্রতি।

কবিতার কলাকৌশল নিয়ে প্রচুর লিখেছি আমি কেননা কবিতায় অথবা নির্বোধ যন্ত্রের মাঝে যে কোনও প্রকারের ত্রুটিই আমি ঘৃণা করি। আমি ঘৃণা করি সেইসব লোককে যারা ত্রুটিপূর্ণ কাজে সন্তুষ্ট থাকে। দ্বিতীয় শ্রেণির কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা আমি ঘৃণা করি।

আর উদ্দীপনার সংস্পর্শে আসা, সেটা ভিন্ন বিষয়। একে এমনকি “অনুপ্রেরণাও” বলা যায়। পরিভাষা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, যদিও যারা এর আলো কখনও চোখে দেখে নি তাদের জন্যে এটা বেশ দুর্ভাগ্যের ব্যাপার।

এই উদ্দীপনা লেখার তাড়না থেকে ভিন্ন কিছু, যেই তাড়না কিনা আমার মতে দুর্বলতার প্রতি একধরনের মানসিক উত্তেজনা, এবং তা প্রায়শই প্রারম্ভিক কাজগুলোর উদ্দীপক ও সহায়ক হয়ে ওঠে। এর মানে বিষয়ই লেখককে নিয়ন্ত্রণ করছে লেখক বিষয়কে নয়। এই উদ্দীপনার জন্যে কোনও ফরমুলা নেই। প্রতিটি কবিতাকেই যদি তা লেখার যোগ্য হয়ে থাকে, হতে হবে নতুন এবং অচেনা এক অভিযান।

বেশ অনেকদিন ধরেই আমি বুঝতে পারছিলাম যে “Night Litany” কবিতাটি আমার নিজের লেখা হিশেবে মোটেই মানায় না ফলে নিজের কবিতা হিশেবে এর নিচে সাইন করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না আর। “Goodly Fare” [sic]2 এর ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল, এটা লেখবার কয়েকঘণ্টার মধ্যে আমার মধ্যে কোনও উত্তেজনাই কাজ করে নি। এর আগে সন্ধ্যায় সোহোতে “টার্কিশ কফি” নামের এক ক্যাফেতে বসে ছিলাম। এদের সস্তা সার্ভিসে আমার বেশ মেজাজ খারাপ হয়েছিল। প্রায় সারা রাত জেগে ছিলাম। সকালে দেরি করে ঘুম ভাঙল আর কবিতাটির প্রথম চারটি লাইন মাথায় নিয়ে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের পথে রওনা হলাম। রিডিংরুমের এক কোনায় বসে প্রায় কোনও কাটাছেড়া ছাড়াই লিখে ফেললাম বাকি কবিতাটা। ভিয়েনা ক্যাফেতে দুপুরের খাবার সেড়ে নিলাম, বিকাল বেলায় আর পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছিলাম না, কবিতাটা নিয়ে ছুটে গেলাম ফ্লিট স্ট্রিটে, আমার একটা অনুভূতি হচ্ছিল যে প্রথমবারের মতো আমি এমন কিছু লিখতে পেরেছি যা কিনা “সকলেই বুঝতে পারবে”, আমি চেয়েছি কবিতাটি মানুষের হাতে গিয়ে পৌঁছাক।

কবিতাটি কেউ ছাপে নি। সম্ভবত “Evening Standard” একমাত্র অফিস যেখানে এটাকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল। প্রায় তিনমাস পরে মি. ফোর্ড ম্যাডক্স হফার প্রথম কবিতাটি ছেপেছিলেন তার একটি রিভিউ-এ।

আমার আরেকটি ‘তেজস্বী’ কবিতা, “Alta forte” ও লেখা হয়েছিল ব্রিটিশ মিউজিয়ামের রিডিংরুমে। তখন আমার মাথায় ঘুরছিল ডি বর্ন। তাকে আমার মনে হয়েছে অনুবাদ অযোগ্য। তখন আমার মাথায় আসল তাকে এভাবেও উপস্থাপন করা যেতে পারে। “Sestina”কে নতুন এক বিবর্তিতরূপে পুনরাবৃত্তি করতে চেয়েছিলাম আমি। এর বিন্যাস সম্পর্কে কম বেশি জানা ছিল। এর প্রথম স্তবক আমি লিখে ফেলি, তারপর চলে যাই মিউজিয়ামে, এর বিন্যাস ঠিকঠাক আছে কিনা তা দেখে নিশ্চিত হতে। তখন আমি থাকতাম ল্যাঙহাম স্ট্রিটে, একটা পাবের পাশে। বইপত্রও তেমন একটা ছিল না আমার কাছে। কবিতার বাকি অংশ আমি লিখে ফেলি একবসাতেই। আসলে এটা আমার সেরা কবিতাগুলির মধ্যে একটা যদিও এরকম বিষয় নিয়ে একটা কবিতা কখনই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।


যদি চিত্রকর হতাম তবে চিত্রকলার সম্পূর্ণ নতুন এক ধারা সৃষ্টি করে যেতে পারতাম।


“Piccadilly” কবিতার শব্দগুলো খুঁজে পেতে আমার তিন বছর লেগে যায়। আট লাইনের একটা কবিতা। এখন অনেকেই আমাকে বলে এটা কেবলই “সেন্টিমেন্ট”। প্রায় বছরখানেক ধরে প্যারিসের আন্ডারগ্রাইন্ডে চমৎকার এক অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করছিলাম। সম্ভবত লা কঁকর্ডে আমি ট্রেন থেকে নেমে যাই, হঠাৎ করেই আমার চোখে পড়ে সুন্দর একটা মুখ, ঠিক তার পরপরই ঘুরে দেখি আরও অনেক, তারপর সুন্দর এক শিশুর চেহারা দেখতে পাই আমি, তারপর আবারও আরেকটা সুন্দর মুখ। সারাটি দিন আমি চেষ্টা করে গেছি আমার এই অনুভূতিকে শব্দে স্থাপন করতে। সে রাতে রু রেনোয়াঁর পথ ধরে বাড়ি ফেরার সময়ও আমি চেষ্টা করে গেছি। কেবল কিছু রঙের ছোপ ছাড়া আর কিছুই আমার মাথায় আসে নি। মনে আছে আমি ভাবছিলাম যদি চিত্রকর হতাম তবে চিত্রকলার সম্পূর্ণ নতুন এক ধারা সৃষ্টি করে যেতে পারতাম। কয়েক সপ্তাহ পরে ইতালিতে আবারও কবিতাটি লেখার চেষ্টা করতে গিয়ে মনে হল পণ্ডশ্রম। তারপর অন্য এক রাতে, এই অভিজ্ঞতার কথা কিভাবে বর্ণনা করা যায় ভাবতে ভাবতেই আমার মাথায় আসল জাপানে কোনও শিল্পকর্মকে তার আয়তন দ্বারা বিচার করা হয় না, এমনকি ষোলটি সিলেবলই একটা কবিতার জন্যে যথেষ্ট হতে পারে যদি তা সঠিক বিন্যাস ও বিভাজনে সাজানো হয়ে থাকে, কেউ চাইলে বেশ ছোট কবিতাও লিখে ফেলতে পারে যা কিনা অনূদিত হতে পারে এভাবে—

“The apparition of these faces in the crowd : Petals on a wet, black bough.”

এবং সেখানে অথবা অন্য কোনও প্রাচীন, স্থিতিশীল কোনও সমাজে, কেউ হয়তো এর তাৎপর্যও অনুভব করতে পারবে।

পাদটিকা :
১. টি ট্রাক্সটন হেয়ার : আমেরিকান ফুটবলার। ১৮৯৭ থেকে ১৯০০ পর্যন্ত তিনি পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে খেলেছেন। তিনি প্রায় সব পজিশনেই দক্ষ ছিলেন। শেষ দুই বছর দলনায়ক হিশেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯০০ সালে হাতুড়ি নিক্ষেপ প্রতিযোগিতায় অলিম্পিকে রৌপ্যপদক জয় করেন।
২. “Goodly Fare”: পাউন্ডের কবিতা “Ballad of the Goodly Fere”। কবিতাটি ফোর্ড ম্যাডক্স হফার এর ইংরেজি রিভিউ (তৃতীয় সংখ্যা, অক্টোবর ১৯০৯, ৩৮২-৮৪) তে প্রথম ছাপা হয়। সে মাসেই নিউইয়র্কের লিটারারি ডাইজেস্টে (অক্টোবর ৩০, ১৯০৯, ৭৩০-৩১ পুনরায় ছাপা হয় কবিতাটি। সে বছরই হ্যামিলটন কলেজের সাহিত্য ম্যাগাজিন এর অ্যালামনাই ইস্যুতে আবারও প্রকাশ পায় কবিতাটি।
তানভীর আকন্দ

তানভীর আকন্দ

জন্ম ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৪; গফরগাঁও, ময়মনসিংহ।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত।

ই-মেইল : tanvirakanda09@gmail.com
তানভীর আকন্দ