হোম গদ্য এক আত্মবিশ্বাসী দ্রষ্টা-কবি

এক আত্মবিশ্বাসী দ্রষ্টা-কবি

এক আত্মবিশ্বাসী দ্রষ্টা-কবি
815
0

‘পৃথিবীর সর্বশেষ কবি আমি অহংকার আমার কবিতা’

খোন্দকার আশরাফ হোসেন তার দীর্ঘ কবি-জীবনে কবিতার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন। একদম ব্যক্তিগত কবি-জীবনের আবেগ কামনা বাসনা বিষণ্নতা থেকে শুরু করে (তিন রমণীর ক্বাসিদা, পার্থ তোমার তীব্র তীর) ইতিহাস ঐতিহ্যের স্মারকচিহ্ন (বেহুলা বাঙলাদেশ, যমুনাপর্ব) আয়(না) দেখে অন্ধ মানুষ (মিস্টিক) পর্যন্ত নতুন নতুন কাব্যভাবনা, বিষয়-আশয়ে নিজেকে উজাড় করেছেন। এই যাত্রা ঘটেছে তার আত্মপরিক্রমণের সাথে সাথে, কবিতার নতুন পথ অনুসন্ধানী ভ্রামণিক চোখের প্রখর কিন্তু একটি আত্মমগ্ন দৃষ্টির সাথেই। খোন্দকার নিজেকে একটি ককুনের মতো প্রথমে গুটিয়ে রেখে ধীরে ধীরে সমাজ সংসার, মানুষের কীটদষ্ট মানসিকতা, তথা কালের কৃপাণে ধরা জীবনের কলুষিত চরিত্রকে আঁকতে বা কখনো আক্রমণ করতে চেয়েছেন। এতে তার হৃদয়ে রক্ত ঝরেছে অবিরত, তিনি একা থেকে আরো একা হয়েছেন, নার্সিসাসের মতো অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করেছেন শূন্যতার সিম্ফনি-স্রোত। তাই তার কবিতা পাঠে কখনো আমার কাছে মনে হয়েছে একজন বুদ্ধ-ধ্যান মনস্ক কবির সেল্ফ রিয়েলাইজশেনের সাথে সাথে প্রতি মুহূর্তের সামাজিক ইন্টারপ্রিটেশন, ব্যক্তি আর সংগঠনের ভেতর লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য মুখোশের আবিষ্কার তিনি করে চলেছেন। কিন্তু তাই বলে তিনি উচ্চকণ্ঠের কবি নন কখনও। তার বলা মৃদু স্বরের, তার আহ্বান কোনো এক সন্তের আহ্বান, যার ধ্যান আর চিন্তা থেকে বের হয়েছে কবিতার থরোথরো আলো। আবার তার এই আপাত বিষণ্নতা তার কণ্ঠকে মাঝে মাঝে রক্তাক্ত করেছে বটে, তিনি বেদনার শরে তীরবিদ্ধ পাখির মতো কেঁপে উঠেছেন, কিন্তু তা কখনই মৃত্যুকামী কোনো অবসেসড, মেলানকোলিক, বিষাদগ্রস্ত কবির মরবিডিটি নয়। বরং তার ভেতরের একটি বৌদ্ধিক তথা অ্যাম্পেথেটিক মানসিকতা কাজ করেছে। তাই তিনি এই আগ্রাসি হিংস্র সভ্যতাকে করুণা আর ভালোবাসার বাতাবরণে গ্রহণ করে নিয়েছেন।

এ কথা সত্য যে তার কবিতায় ধীরে ধীরে সমাজ সংসার, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবই এসেছে। তিনি বেশিদিন আত্মমগ্ন থাকতে পারেন নি

খোন্দকার শুরু করেছেন একদম নিজেকে তৈরি করেই, একটু দেরিতে হলেও। কবি ছিলেন ভেতরে ভেতরে, সমাহিত ছিলেন সৃষ্টির পাতালভূমে। সৃষ্টি যখন চলছে মনের গহীনে লিখিত প্রকাশে কী এসে যায়! তার সমসাময়িকেরা যখন কালের কোলাহল, সমাজের চলতি হাওয়ার হালকা স্থূল বিষয়-ভাবনার কবিতা নিয়ে অনেকটা বিজয়ীর দেশ দখলের সার্থকতায় হাসি মেলে ধরেছেন; কখনো শামসুর রাহমানীয় তালিকা করণের পদ্ধতি কখনো আল মাহমুদীয় মাটি ও কাদার বা নারী মাংসের কাঁচা গন্ধ শোকার প্রতিজ্ঞা করে কবিতার পর কবিতা সাজিয়েছেন, খোন্দকার তখন সেই অপেক্ষাঋদ্ধ, কবিতার সঠিক টিউন চিহ্নিতকরণের হাতটিকে শক্তিশালী করেছেন। ফিরে গেছেন বাংলা কবিতার মৃন্ময়ী, ইতিহাস ঐতিহ্য আশ্রিত ধারাটির সাথে। কবিতায় এনেছেন ভাব আর ফর্মের সংহতি, সৃষ্টি আর প্রকাশের জাদু। তলে তলে আরোহণ করেছেন ধ্যানির স্থির দৃষ্টি, প্রজ্ঞাবান ঋষির ভিশন। নিজেকে কবিতার বেদিতলে সঁপে কুড়িয়ে ফিরেছেন এর বাল্মীকিয় ভাষা আর প্রকাশের প্রাতিস্বিক উচ্চারণ। আর তার এই সৃষ্টি-কৌশল আশির দশকের সমস্ত কবিকেই যেন দিয়েছিল নতুন পথের সন্ধান।
সব কবিরই একটি বিশেষ ট্রেডমার্ক থাকে যা তার নিয়তি হয়ে যায়। আমার মনে হয়েছে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ট্রেডমার্ক হতে পারে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের কবিতার ’সন্ত কবি’ হিসাবে। আমার কাছে যে খোন্দকার আশরাফ হোসেন আজো তীব্র অহংকার আর আহ্বান নিয়ে বারবার ফিরে আসেন তার উপস্থিতি জানান দেন, তিনি হলেন সেই আত্মমগ্ন সন্ত কবি। যিনি শুধু কবিতা-সৃষ্টিবীজ রহস্যের জাদুতে দেখতে চেয়েছেন আপনাকে, এই পৃথিবীকে।

আমাকে পাবে না প্রেমে, প্রার্থনায় নম্র হও পাবে,
কামে-ঘামে আমি নেই, পিপাসায় তপ্ত হও পাবে।

পাখিরা প্রমত্ত হলে সঙ্গিনীকে ডেকে নেয় দেহের ছায়ায়
ছায়া নয়, রৌদ্রতাপ জ্বালাবার শক্তি ধরো, কেবলি আমাকে
তপ্তজলে দগ্ধ করো, রুদ্ধ ক্রোধে দীপ্ত করো, পাবে।

পৃৃথিবীর সর্বশেষ কবি আমি অহঙ্কার আমার কবিতা
বিষাদে বিশ্বাসে পূর্ণ হৃদয়ের জলাধারে ধরো,
আমাতে নিবদ্ধ হও পূর্ণপ্রাণ ফলবন্ত হও
আমাকে পাবে না ফলে, পরাগ-নিষিক্ত হও, পাবে।

প্রার্থনায় নম্র হও পাবে

এ কথা সত্য যে তার কবিতায় ধীরে ধীরে সমাজ সংসার, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবই এসেছে। তিনি বেশিদিন আত্মমগ্ন থাকতে পারেন নি। যে দেশ রক্ততাড়িত, যে দেশে মুক্তিযুদ্ধ নামের ইতিহাস সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটেছে, যে দেশে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি বার বার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, যে দেশে নুরজাহানের মতো অসহায় মেয়েকে মধ্যযুগীয় কায়দায় পাথর ছুঁড়ে মারা হয়েছে—সে দেশের কবি নিজের প্রকোষ্ঠে তো বেশিদিন বন্দী হয়ে থাকতে পারেন না। খোন্দকার কবিতায় এসব বিষয় এনেছেন, তা যে সব সময় কবিতার আরাধ্য সেই শিল্পসুষমাকে তার প্রাপ্য মিটিয়ে দিয়েছেন তা তো নয়। কিন্তু বিষয়গুলি ঘটেছে তার সেই ট্রেডমার্ক ভঙিমায়— নম্র, নমিত, মগ্ন আর ঋষিসুলভ নিম্ন স্বরে। এইখানেই খোন্দকারের বিজয়, কবিতার জয়। আমার ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকায় কবির প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘তিন রমণীর ক্বাসিদা’ এর সেই আল্টিমেটাম—‘পৃথিবীর সর্বশেষ কবি আমি অহংকার আমার কবিতা’ সেই অহংকারী কিন্তু প্রতিশ্রুতিশীল, ঘোষণাবিদ্ধ কিন্তু কবিতার নিজস্ব বসতবাড়িতে ফিরে আসার মন্ত্রসম উচ্চারণই একটি গাঢ় আসন নিয়ে বসে আছে। কারণ ব্যক্তিগতভাবে আমি যে কবিতার কথা চিন্তা করি আদর্শ হিসাবে, তারই একটি রূপরেখা যেন পাই এই কবিতায়। যেমন এর সংহত উচ্চারণ এর মিতকথন, এক সৃষ্টিশীল নির্জন কবি-সত্তায় প্রবাহিত ‘কবি-আমি’র ঘোষণা এবং সর্বোপরি সত্তরের পয়েটিক ফ্যালাসি সেই সর্বব্যাপী আত্মভূক ন্যারেটিভিটি এবং তার সাথে আসা উদ্দাম তরলতাকেই যেন একটি প্রচণ্ড চপেটাঘাত করল এই কবিতা।

এই কবিতায় ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ—প্রার্থনা, পিপাসা, দগ্ধ, বিষাদ, বিশ্বাস, হৃদয়ের জলাধার, নিবদ্ধ, পূর্ণপ্রাণ ফলবন্ত, পরাগ-নিষিক্ত, বিষাক্ত আঙুর, এবং রক্তরস যিশুর রুধির ইত্যাদি যে প্রতিবেশ তৈরি করে এতে করে আমরা দুটি ধারণায় আসতে পারি। এক. কবির কাজ হলো সৃষ্টিশীল ধ্যান-মগ্নতা; আর দুই. কবি এমনভাবে নিজেকে ব্যবহার করেন যে কবি হয়ে পড়েন যিশুর ক্রুশবিদ্ধতার জীবন্ত প্রতিকৃতি। কবিতার প্রতি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের নিবেদন, তার একনিষ্ঠ চর্চা যেন বাংলা সাহিত্য’র তথা বিশ্ব কবিতার সৃষ্টিশীল ঝোঁকটাকেই অংকিত করে। কারণ প্রকৃত কবিতা চায় কবির সম্পূর্ণ সমর্পণ, সৃষ্টির সাথে এক হয়ে যাওয়ার একাগ্রতা। ‘আমাকে পাবে না প্রেমে’ ‘কামে-ঘামে আমি নেই’ কিন্তু ‘প্রার্থনায় নম্র হও পাবে, পিপাসায় তপ্ত হও পাবে’ অবধানের মধ্যে ধ্যান আর সৃষ্টির যুগপৎ নিরাসক্তি আর সাবমিশনের সাবলিমিটিকেই প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এখানে ব্যক্তি খোন্দকার আর ব্যক্তি থাকেন না, তার পরিচিতি তার আর্তি পৃথিবীর সকল সৃষ্টিশীল কবির আত্মাতেই যেন বিলীন হয়ে যায়।

216084_1341276789648_1121936_n
কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন (৪ জানুয়ারি ১৯৫০—১৬জুন ২০১৩)

কবির সফলতা শেষ পর্যন্ত কবিতার সফলতাই। মানে কবি তার পোয়েটিক অ্যাসপিরেশনের নামে কেবল কোনো দায়িত্ব কর্তব্যের বা সমাজস্বীকৃত কোনো নৈতিকতাবোধে আটকে থাকেন না। যদি থাকেন তাহলে তার কবি-প্রতিভার অকাল মৃত্যু ঘটে। কারণ কবিতার কাজ মানুষের নীতিবোধ মানুষের দর্শন শিক্ষা বা প্রচার নয়। এভাবে তার উদ্দেশ্য পাঠক মনোরঞ্জন নয়, বরং পাঠকের পাঠশক্তিকে জাগিয়ে তোলা, তার পাঠবীক্ষাকে পরীক্ষা করার জন্য তার কবিতায় তিনি বোধ আর বিস্ময়ের, অজানা আর অনিশ্চয়তার পৃথিবী খুলে ধরেন। কবি লিখবে তার জন্য, কবিতার জন্য প্রথমে। যদি কেউ তার অভিজ্ঞতার সাথে নিজেদের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে নিতে চায় তাহলে সেটি হবে কবির বাড়তি পাওনা। পৃথিবীর সর্বোত্তম কবিতাগুলি এই কথাই বলে। সেই কারণে কবিতার আঁধার কোনো সত্য মিথ্যার আঁধার নয়, নয় কোনো সামাজিক রাজনৈতিক আন্ডারটেকিং। এটি একটি স্বাভাবিক আর্তি, একটি স্বয়ং প্রকাশ যার মাধ্যমে কবি তার ভেতরের পাওয়া ভিশন আর স্বপ্নধ্বনিকে কাব্যরূপ দেন। একজন কবি তার দেশ সমাজ সবকিছুকেই কবিতায় ধারণ করতে পারেন কিন্তু এর কবিতার দায়টুকু মিটিয়ে না দিলে যেন সেই কবিতা আমার কাছে অনেক দূরে সরে রইল। যুদ্ধ করা কবির কাজ নয়। এ কথায় অনেকেই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। কিন্তু ভেবে দেখা যায় কবিতায় কেউ কি কোথাও কোনো বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে? কোনো দেশ কি স্বাধীনতা পেয়ে যায় কবিতার জন্য? কবিতার প্রাণ তার নিজস্ব হয়ে যাওয়াতে, সমাজ রাজনীতি, সংঘ আর সংগঠনের উত্থান বা পতন প্রকাশ ব্যতিরেকেই। কবিতার ভাষা কবিতাকেই প্রতিষ্ঠিত করে শুধু। তাই যেন ঘটেছে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তিন রমণীর ক্বাসিদা’য় । তিনি এখানে হাজির হয়েছেনে সম্পূর্ণভাবে একজন কবি হিসাবেই। তার ভেতরে দেশ আছে, আছে ইতিহাস ঐতিহ্য কিন্তু কখনোই তা তার কবি সত্তাটিকে তথাকথিত দায়িত্ববোধের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখেনি। বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে এই কাব্যগ্রন্থটির পাঠ বিভিন্ন কারণে জরুরি হয়ে থাকবে। এর আগে কবিতায় কবিতার সত্তা তার মাধ্যাকর্ষণ থেকে চ্যুত হয়ে চারিদিকের সামাজিকতা আর রাজনৈতিকতার একটি মেটা-ন্যারেটিভিটির দিকে রওনা হচ্ছিল। খোন্দকার সেখানে আনলেন একটি কন্ট্রোল, এঁকে দিলেন কবিতার রেলিজিয়ন তথা রহস্যের উল্কি। ফর্মকে দিলেন রাজকীয় অধিকার, কথা আর ভাষ্যে আনলেন পরিমিতি, পঙ্‌ক্তিতে রাখলেন স্বপ্ন—বোধতাড়িত চকিত উপলব্ধি।

নজরুল যেখানে দৃপ্ত, গমগম করা কণ্ঠস্বরের জানান দেন, জীবনানন্দ সেখানে নির্জন একাকিত্বের ঘোষণাকারী হিসাবে আসেন। খোন্দকার আরো এক ধাপ এগিয়েছেন

তার ‘সর্বশেষ কবি আমি’ বলার পেছনে আমার আবার মনে হয়েছে এখানে কবির দুটি উপলব্ধি কাজ করেছে। ১. কবিতা অপচয়িত হয়েছে, ২. কবিতাকে অকবিতা থেকে মুক্তি দিতে হবে। তাহলে কবিকে কী করতে হবে? তিনি কবিতায় তুলে আনলেন ঋষিসুলভ তান্ত্রিকতা, যেখানে শুধু কথা সাজানোর তালিকা নয়, কোলাহলের বিচরণ নয়, নয় রাস্তায় রাস্তায় মিছিল শেষে গলা বাজানো কোনো নেতার কথা শুনতে আসা কবির কলমের বীরগাথা। তিনি কবিতার পক্ষে নেমেছেন, নেমেছেন কবির পক্ষে ‘আমাকে পাবে না প্রেমে, প্রার্থনায় নম্র হও পাবে, কামে-ঘামে আমি নেই, পিপাসায় তপ্ত হও পাবে।’ এমন কি কবিতা পাঠ আর পাঠকের একটা নতুন ক্যারেক্টার দিতে চাইছেন। পাঠককে তিনি জাগিয়ে দিতে চাইছেন। চাইছেন তাকে কবির মগ্নতার সহগামী হতে। এই কবিতা পাঠ শেষে কেউ কেউ এই ধারণায় আসতে পারেন একটা বাল্মীকিসুলভ উচ্চারণ এক সময় কবিকে পেয়ে বসে। এটি নিজেকে নিঃশেষ করে ভেতরের এক ঘোরলাগা সৃষ্টি সময়ের কাছে টোটাল অ্যানিহিলেশন যেন। মানে একটি ফানাবিল্লাহ-মুহূর্ত। যুগ সন্ধিক্ষণের বন্ধ্যা-কবিতা-জমির উপর দাঁড়িয়ে কবি তার ভিশন পাওয়া শ্লোকবাক্য তথা নিজের উপস্থিতি ঘোষণা করেন। কবির গর্ভ তখন কবিকেই জন্ম দেয়, নতুন কবিকে। বাংলা সাহিত্যে কয়েকবারই এসেছে এই ঘোষণা। একবার কাজী নজরুল ইসলামের ‘বল বীর বল উন্নত মম শির’ আর একবার জীবনানন্দ দাশের ‘কেহ যাহা জানে নাই.. .. কোনো এক বাণী.. .. আমি বহে আনি.. .. আমার মতন আর নাই কেউ’। এইসব উক্তিতে দুটি আইডিয়া থাকে। ১. পুরাতন কবিতার যুগ শেষ, নতুন যুগের শুরু; ২. কবি আছেন কিন্তু কবি একা। নজরুল যেখানে দৃপ্ত, গমগম করা কণ্ঠস্বরের জানান দেন, জীবনানন্দ সেখানে নির্জন একাকিত্বের ঘোষণাকারী হিসাবে আসেন। খোন্দকার আরো এক ধাপ এগিয়েছেন। তিনি কবিকে তার স্বমহিমায় মানে তার আত্মমগ্নতার শীর্ষ আরোহণের পথটিকে আমাদের সামনে খুলে দিয়েছেন। তার আহ্বান ‘প্রার্থনায় নম্র হও পাবে’। এই প্রার্থনায় আমরা কবির সেই আদিরূপটিকেই দেখতে পাই। এ যেন কবি আর কবিতার নতুন জন্ম।

খ.
‘তিনটি রমণী বসে বুকে আঁটে ছায়ার বোতাম’

কবির কাজ শুধু ভাবনাকে বিবরণমুখী করে তোলা নয়। তার আত্মমগ্নতার শীর্ষ চূড়া থেকে যে আলো ভাষার পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে সেখানে যেমন ব্যক্তি-বোধের সত্য-মিথ্যা ঝলসে ওঠে, তেমনিভাবে আরো একটি রশ্মি আগামীদিনে যা ঘটতে পারে বা হতে পারে তার বার্তা নিয়ে আসে। কবি সচেতনভাবে যে এটি করেন তা নয় বরং তার দ্রষ্টা-গুণ প্রবল হলে এক সময় হীরক উজ্জ্বল কিছু মুহূর্ত আয়নার মতো প্রতিবিম্বিত হয়ে যায়। খোন্দকার আশরাফ হোসেন একাধারে আত্মমগ্ন, সন্ত ও বহির্মুখী কবি। তিনি এক সময় ডুব দিয়েছেন ভাবের যমুনায় অন্য সময় ঘুরে বেড়িয়েছেন সেই বাউসি ব্রিজের মুক্তিযোদ্ধার পায়ে পায়ে। দেখছেন সন্তানেরা উড়ে যাচ্ছে পাশ বালিশের তুলোর মতো, জীবনকে মাপতে চেয়েছেন জীবনের সমান চুমুকে। কিন্তু তার উপরিভাগের ভ্রমণ ক্ষণিকের তরে। ঋষিসুলভ আত্মমগ্নতাই তার কবিতার প্রধান দিক বলে আমি মনে করি। আর সেখানেই তিনি কখনো কিছু ভিশনের মুখোমুখী হন, তার কলম থেকে বেরিয়ে আসে ধ্যানমগ্ন ঋষির শ্লোকগাথা- যেখানে অতীত-বর্তমান আর ভবিষ্যতের সীমারেখাটি বিলুপ্ত হয়, টনটন করে বেজে ওঠে আত্মমগ্নতার সংগীত। বাংলাদেশের কবিতায় এই জোনটি তেমন দেখা যায় না। কবিরা শুধু যা বোধ করেন বা দেখেন বা যা হয়েছে সেই ঘটনা বা অভিজ্ঞতাকে আঁকেন, কখনো উপলব্ধিকে বেশ ন্যারেটিভের অতিকথনে জর্জরিত করে ফেলেন। খুব কমই দেখা যায় যেখানে কবি একজন দ্রষ্টা, একজন ভিশনপাওয়া মুহূর্তের লেখক। তার ধ্যান মগ্নতায় পাওয়া বস্তু আর বস্তুর ভেতরের গুণ—কখন যে স্তব্ধতার বাইরে চারদিকে এক মগ্নতায় ছড়িয়ে পড়েতিনি তা অনুভব করতে পারেন। অভিজ্ঞতাকে ভাষায় ধারণ করা আর তাকে বর্ণনার কারুকার্যে লিপিবদ্ধ করার জন্য কবির অতিব্যবহৃত, সৃষ্টিহীন ভাষাজ্ঞান জরুরি হয়ে পড়ে—যেখানে একটি গোপন ফাঁকির কাজ থাকে। কবির প্রতিবিম্বে তখন কবি বহির্বাসী, অচেনা। কারণ তখন তার ভেতরের প্রথম ভাবনাটি স্তরিভূত হয় না। কবি হয়ে পড়েন কোনো সত্য ঘটনার লেখক, ইতিহাস-প্রবণ। তখন তার কাজ হয়ে পড়ে সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, ধর্ম, নীতিকথা ইত্যাদি অতিচেনা, ইতোমধ্যেই ভাষায়িত কমনসেন্সের বিষয়াবলি নিয়ে কবিতা লেখা। তখন তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ, তার দায়িত্ব হয়ে পড়ে বিষয়কে বা বস্তুকে বিবরণ করা, মানুষের রুচির সাথে তাল মিলিয়ে, মানুষের প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের কাছে দাঁড় করানো। সেইসব লেখা পাঠককে মোটেই ভাবায় না, পাঠককে প্ররোচিতও করে না, পড়ার পরই শেষ হয়ে যায় তার আবেদন।

কিন্তু কবি যখন দ্রষ্টা তখন তার কবিতা আগমন ঘটে শ্লোকের মতো, ভাষা তখন তার দ্রষ্টা সত্তার বাহন হয়, তিনি ভাষাকে পরিচালিত করেন, ভাষা তাকে নয়। তার উচ্চারণ হয় তখন প্রায় অটোমেটিক। এই যে প্রাপ্তি, এই প্রাপ্তি তার জন্য একটি প্রফেটিক ব্যাপার। এখান থেকে যে কবিতার বিচ্ছুরণ ঘটে সেখানে কবির অঙ্গীকার থেকে প্রধান হয়ে পড়ে তার আত্মোপলদ্ধি তার আত্ম-দর্শনের ম্যাজিক মুহূর্ত। এমনটিই ঘটেছে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ‘তিন রমণীর ক্বাসিদা’ নামক কবিতাটিতে। এই কবিতাটি আমাকে এক সময় ম্যাকব্যাথের সেই তিন ডাইনির কথা মনে করিয়ে দেয়। হতে পারে তিনি ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন বলে, ম্যাকবেথ পড়ার কারণে সেই ‘ডাইনি’ ইল্যুশনটি তার ভেতরে কাজ করতে পারে। কিন্তু খোন্দকারের ভিশনটি ঘটেছে একটি বাঙালি আবহে, বাংলাদেশের জল, মাটি, আকাশ আর বাতাসে। এটিতে রাজনৈতিক মেজাজের চেয়ে বেশি বেজে উঠেছে আশির দশকের এক কবির নীরব কিন্তু ট্রেডমার্ক বাহিত আত্মবিশ্বাস আর আত্মমগ্ন কবিতার ঘরে ফেরে আসার টান টান যাত্রাধ্বনি। এটি যেন এক কবির ব্যক্তিগত লড়াই, লড়াই অস্বীকৃতি আর অবহেলার বিরুদ্ধে, লড়াই জমে যাওয়া পুরনো হয়ে যাওয়া ক্লিশে বিবরণধর্মী এক কাব্য ভাষার বিরুদ্ধে। খোন্দকারের পাশাপাশি তার সমসাময়িক আরো অনেকে ছিলেন কিন্তু যেহেতু তার ধীর প্রকাশ, তার পতাকা উত্তোলন অপেক্ষাকৃত দেরিতে ঘটেছে তাই তাকে কবি জীবনের এই রক্তকালটির ভেতরে প্রথমে শহীদ হতে হয়েছে।

কবিতাটির মধ্যে দেখা যায় তিন রমণী—জননী, প্রেয়সী ও বোন। আসলে তারা একজন রমণীই। হিংসা, মায়া আর প্রেমের ট্রিনিটি

তিন রমণীর ক্বাসিদা কবিতাটি আসলে একটি জার্নি কবিতা। কবির ভিশন পাওয়া মুহূর্তের তিন ধাপের খণ্ড খণ্ড মানসিক জার্নি। কবিদের ফিজিক্যাল/মানসিক জার্নি ঘটে, জীবনানন্দ জার্নি করেন লেখেন— বনলতা সেন, রবীন্দ্রনাথও জার্নি করেন, লেখেন শত শত কবিতা গল্প উপন্যাস। বনলতা সেনের জার্নি একটি ব্যক্তিগত জার্নি হয়েও আজ বহুবাচনিক এবং বাংলা কবিতার একটি ঐতিহাসিক মাইল ফলক। মূলত এটি কবির শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের সময়ে দু-দণ্ড শান্তিলাভের আশায় প্রকৃতি নামক এক নারীর কাছে নিজেকে সমর্পণ। তাতে হাহাকার আছে, আছে পূণর্জন্মের আশা। কিন্তু জীবনের ভিশন পাওয়া আচানক প্রতীতিগুলোর দেখা পাওয়া যায় না। সময় আর সময়ের ভেতরে ধরা আর ব্যক্তি বিশেষের মগ্নতায় ডুব দেওয়ার গহীন গভীর ধারাগুলো দেখা যায় না। মানুষের জীবন আর সময় পাল্টানোর সাথে সাথে, সভ্যতার সাথে সাথে কবির জীবনের চিন্তা আর ভাষার পরিবর্তন ঘটে। আশি দশকের কবি খোন্দকারও এই জলে পা ডুবিয়ে দেন। খোন্দকারের এই জার্নি যেন সেই কাহিনির দরবেশের মতো—যেখানে স্থির থাকার মধ্যেই তার আত্মদৃষ্টি বিকশিত হয়, ধীরে ধীরে এক অনন্য আপন-কেন্দ্রীকতায়, এক ধ্রুব শূন্যতায় তাদের ধ্যানের চূড়ান্ত অনুবাদ হয়। তার ভিশনপ্রাপ্তি ঘটে, তিনি ধাপে ধাপে সমর্পণ, নিষ্পেষণ ও সব শেষে- আত্মোপলব্ধিতে নিজেকে স্থাপিত করেন। শক্তিশালী কবিদের এই ভ্রমণ ঘটে তাদের সেই কবি হওয়ার জন্মকালীন সময়েই। তখন সে কেবলি ধারক, এক ডাইনি শাসিত সময়, এক অসীম গহ্বর খচিত সভ্যতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি তখন কেবলি কবি-দ্রষ্টা। তার প্রাণ থেকে বের হয়ে আসে থরো থারো আত্ম-উপলব্ধির বাক-বিভূতি।

কবিতাটির দিকে আরো একটি গভীর দৃষ্টি দেওয়া যাক। এই কবিতাটি একটি ছোট একাঙ্কিকার মতো, তিনটি ধাপে সাজানো। এর পাত্র-পাত্রী তিন রমণী আর কবি নিজে। এছাড়াও আরো কিছু ইশারা আছে। একটি ইশারা যেন বাংলাদেশের একটি আত্মঘাতি সময়কে মনে করিয়ে দেয়। যেদিন এক দঙ্গল হিংস্র নেকড়ে ছিঁড়ে খুঁড়ে খেয়ে ফেলেছিল বাঙালির জাতীয় বীরকে, মুক্তিযুদ্ধের মহান নায়ককে। কিন্তু কবিতাটি শেষ পর্যন্ত এক তরফাভাবে একটি রক্তপাতের কথায় শেষ হয় না।
শেক্সপিয়ারের বিয়োগান্তক নাটকের নায়কদের মতো মানুষ নিজেই নিজের পতনের বীজ নিজের কাছে ধরে রাখে। মানুষের নিয়তি হয়ত তাই। এইখানেই প্রথম আমরা দেখি খোন্দকার তার রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিষয়টি জানান দেন, পরবর্তী সময়ে যা ধীরে ধীরে তার কবিতার একটি প্রধান অঙ্গ হয়ে পড়ে। সময় আর সভ্যতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ মানুষের আর্তি মানুষের মৃত্যুমুখী মুখ প্রবলভাবে ভাষা পেয়ে যায় তার কবিতায়।

কারা নাকি রাজা হবে, কারা হবে রাজার জনক;
গর্গনের তিন মেয়ে চুলে ওড়ে সাপের ছোবল,
কানে গোঁজা কম্রফুল, পদতলে রতি শঙ্খচূড়;
‘দেখা হবে পুনর্বার’, বলে ওঠে তারা আচানক।

‘এই যে দীপিত রোদ এইখানে আঁধার ঘনাবে,
এই যে পুরুষ যায় এই হবে প্রমত্ত নায়ক-
তারপর শেষ হবে পৌরুষের সব ছলাকলা,
রক্তমাখা উত্তরীয় কালপ্রাতে মাছেরা জড়াবে।’

এই বলে তিন নারী ছুড়ে দেয় সুতলির টাক,
নিবদ্ধ শিকার শুধু জলে দেখে ঘূর্ণ্যমান পাক।

কবিতাটির দ্বিতীয়ভাগে কবি আবারও তিন রমণীর মুখোমুখী হন। এখানে এক সময় তারা কবির চোখ তুলে নেন আর আহ্বান করেন তাদের কলসের ভেতরে জায়গা করে নিতে। এই পুরো ব্যাপারটিতে সৃষ্টি আর সৃষ্টি-চৈতন্যের মেটাফরের পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে ম্যাজিক ‘কলস’ অবশ্যই একটি প্রতীকি বার্তা নিয়ে আসে। নারীর জন্মদানির মতো এই কলস কবির নতুন কবিতার বীজাধার যেন। এখানে সকল বন্ধ্যাত্ব আর অন্ধত্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। এই কলস এক আই-ট্রান্সপ্ল্যান্ট হাসপাতাল—যেখানে হারানো আলোক খুঁজে পাওয়া যায় অবশেষে। আবার এ যেন কবি আর মানুষের যৌথ পারগেটরি অবস্থা—নিজের পাপস্খলন আর পাপমুক্তির যাত্রাবিন্দু। এখানে প্রশ্ন জাগে—কবির চোখ কেন তুলে নেয়া হল? বহুদিনের ব্যবহৃত জীর্ণ, বন্ধ্যা দৃষ্টিকে বাতিল করে আজ তার নতুন চোখ পাওয়া প্রয়োজন। তিনি যেন পেয়ে গেলেন তার সময়, আশির দশকের ট্রেন্ডকে দেখার ম্যাজিক মিরর। সেখান থেকেই তার ভবিষ্যৎ কবিতা জ্বলে উঠল ধীরে ধীরে। এখানে ‘মগ্নতা’ আর ‘পূর্ণতা’ শব্দ দুটি খোন্দকারের সারা জীবনের আরাধ্য, তার কবিতার প্রধান দুটি বাঁক, প্রধান দুটি স্বরকেই যেন ধরে রাখল। তার ধ্যান তার ভিশন তার সমর্পণের পর পাওয়া ‘সেকেন্ড আই’ যেন তার আত্মোপলদ্ধির মর্ম কথাকেই জানান দিচ্ছে।

একজন হাত তুলে বলল, ‘দাঁড়াও কথা আছে’।
একজন কলস নামিয়ে বুকে আড়াআড়ি রাখলো দু’হাত,
অন্যজন তিরস্কারে বিদ্ধ করে চোখ দুটো খুলে নিল।

আমি চিৎকার করে বললাম, ‘তোরা কারা’?

আমি বলি, ‘আমার তো চোখ নেই, অন্ধকার মুখ
কী করে দেখাব বলো, ওরা যদি আমাকে না নেয়?’

বলে তারা, ‘তুই আয়, কলসীর মগ্নতায় তোকে ভরে নিই,
পূর্ণতা প্রকাশ হলে তুই-ই হবি একমাত্র আলোর গোলক।’

তিন নম্বরের কবিতাটির মধ্যে দেখা যায় তিন রমণী—জননী, প্রেয়সী ও বোন। আসলে তারা একজন রমণীই। হিংসা, মায়া আর প্রেমের ট্রিনিটি। এখানেই খোন্দকারের তিন রমণী ম্যাকবেথের তিন ডাইনিদের থেকে আলাদা হয়ে যান। নাটক থেকে কবিতা আলাদা হয়ে যায়। এখানে কোনো ভবিষ্যৎ বাণী নয়, নয় কোনো নির্দেশ, এখানে কবি মিশে যান তার ধ্যানগ্রস্ত মুহূর্তটিতে, কবি জীবনের সেই আর্কিটাইপাল সৃষ্টিভূমিতে—যেখানে কবির মুক্তি আসন্ন হয়ে পড়ে, কবি তার সৃষ্টিতে এক হয়ে যান।

এক নারী কাছে এসে তুলে নিল চিবুক দু’হাতে,
চুমু খেল চুলের সীমান্ত এসে কাঁটাতার তুলে রাখে
যেইখানে, বলল, আমি তোর একক জননী
আমাকে চুম্বন কর-
আমার উত্থান ছাড়া নীল নিসর্গের জল অর্থহীন, বৃথা।

মধ্যাহ্ন দুপুরে এক ভিন্নতর নারী এসে দিল হাতছানি,
বলল, এসো, আমার চুলের মধ্যে মুখ রাখ, হাত রাখ
হাতের ভেতর,
জগৎ ও জন্মের খেলা তোমাকে দেখাব চলো-
কোথায় শম্বর কাঁদে নষ্টনীল চাঁদের জ্যোৎস্নার নিচে
অথবা কোথায়
জলের ঘূর্ণির মধ্যে ভেসে ওঠে ক্রমাগত চৌষট্টি গোলাপ।
আমি তার বিনম্র হাতের নিচে ক্রমে গলে যেতে থাকলাম,
সামনে বাড়ব কুণ্ড
আর আমি নিজেই তখন এক প্রজ্বলন্ত গীজারের চোখ।

মগ্নতার যে আবিলতা যে একাগ্রতা তার থেকে কোনো কবি তার সৃষ্টিকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেন না। কারণ কবিতা শেষ পর্যন্ত কবির সেই গভীর আত্ম-সম্মোহনেরই সাক্ষী। তার সারা জীবনের কাব্য ভাষাতে এই বিশেষ সম্পদটুকুই শুধু থাকে। বাকীটুকু শুধু বাষ্প, ধোঁয়ার কুণ্ডলি। ‘তিন রমণীর ক্বাসিদা’ কবিতায়, খোন্দকারের এই মগ্নতা আর পূর্ণতাই প্রমাণ করে যে আশরাফ আসলে কোনো রাজনৈতিক ধারার বা উচ্চ কণ্ঠের কবি নন। তিনি তার সামগ্রিক কাব্যে সমাজ সচেতনতা বা সংগ্রামী চিন্তা চেতনার দ্বারা যতটুকু আন্দোলিত হয়েছেন ততটুকু শুধু তার সুপারফিসিয়াল মোহগ্রস্ততা যা কিনা সমাজের সৃষ্টি, কবির নয়। কবি আত্মবিশ্বাসী আর দ্রষ্টা হয়ে যে সব উচ্চারণমালা আমাদের কাছে কমিউনিকেট করেছেন তার ভেতরই আমরা সত্যিকারের একজন কবির কণ্ঠস্বর আবিষ্কার করি।

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

জন্ম ০৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫; কিশোরগঞ্জ। পৈর্তৃক নিবাস: রায়পুরা, নরসিংদী। ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স), এমএ।

পেশা: ইংরেজির শিক্ষক, নাভিটাস ইংলিশ ফেয়ারফিল্ড কলেজ, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
সিজদা ও অন্যান্য ইসরা [চৈতন্য, ২০১৬]
ক্রমশ আপেলপাতা বেয়ে [চৈতন্য, ২০১৫]
নো ম্যানস জোন পেরিয়ে [শুদ্ধস্বর, ২০১২]
জল্লাদ ও মুখোশ বিষয়ক প্ররোচনাগুলি [নিসর্গ, ২০১২]
শাদা সন্ত মেঘদল [নিসর্গ, ২০১১]
গানের বাহিরে কবিতাগুচ্ছ [নিসর্গ, ২০১০]
পলাশী ও পানিপথ [নিসর্গ, ২০০৯]
বাল্মীকির মৌনকথন [জুয়েল ইন্টারন্যাশনাল, ১৯৯৬]
শীতমৃত্যু ও জলতরঙ্গ [জুয়েল ইন্টারন্যাশনাল, ১৯৯৫]

গদ্য—
কবিতার ভাষা [চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : abusayeedobaidullah@gamail.com

Latest posts by আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ (see all)