হোম গদ্য একটি সুইসাইড নোটের সম্ভাবনা

একটি সুইসাইড নোটের সম্ভাবনা

একটি সুইসাইড নোটের সম্ভাবনা
600
0

প্রতিটি সফল স্বপ্নের পর আমার আয়ু-রোগ এতটাই প্রবল ও তীব্র হয়ে উঠে যে, কেবল-ই মনে হয়, ‘কবি না হলে খুনি হতাম’। ‘হত্যা’, শব্দটি আমাকে সমগ্র বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রাখে, আর জীবনের দিকে আরেকটু গভীরভাবে ফিরে তাকাবার সুযোগ করে দেয়, দারুণভাবে। ক্রোধ অথবা আক্রোশ কোনোটাই আমার ভেতর ততটা প্রবল নয়, কেননা ঋতুচক্র ও সময়ের হিশাব মাঝে মাঝেই বুঝিয়ে দিয়ে যায়, প্রকৃতি নিজেই প্রতিশোধ-পরায়ণতায় আমূল ডুবে আছে। শঙ্কা, যা কিনা অস্তিত্বহীনতার দাবি প্রকট ও প্রবল করে তোলে, তার বিপরীতে মানুষের আর্তি কেবল প্রতিধ্বনির রূপেই ফিরে আসতে পারে, আর এমন প্রতিধ্বনির সাথে ভেসে যাবার নিরন্তর প্রচেষ্টা স্বভাবতই অস্থির করে তোলে। যে কোনো দূর থেকে তাই পুনরায় ফিরে আসার পর পরিবর্তিত মায়া করুণার রূপে নিজেকে জাপটে ধরে, আর তখন যে কোনো প্রকার সুইসাইড নোট তার বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে জেগে ওঠে!


নিজেকে খুনি ভাবতে ভাবতে তুমি শিশু হয়ে উঠতে পার।


মূলত এ আমার নিজেরই দৃষ্টি, যা করুণা নিয়ে তাকিয়ে আছে, আর ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে উঠা শরীর যতবার খুনির জন্য মায়া আগলে রাখে, নিজেকে বলি, ‘তুমি তবে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাও, পাহাড়ে উঠো অথবা সমুদ্র পাড়ে দাঁড়িয়ে থাক, অতঃপর মুছে ফেল সমস্ত প্রতীক ও সংকেত, যেন কোনো সম্ভাব্য অথবা কল্পিত বাতিঘরের দিকে তোমার আশাবাদী দৃষ্টি তোমাকে ব্যর্থ প্রতিপন্ন না করে। প্রবল স্রোতের মাঝেও যেন তুমি ভেসে যাও যে কোনো দিকে, আর ডুবন্ত শরীরের মায়া ছেড়ে কল্পনা করো নিরামিষাশী হাঙর, যারা তোমার সাথে সাথে পাড়ি দেবে অনন্ত কালো-দ্বীপ, উত্তপ্ত জলাধার আর শিকারি স্বপ্নের সীমানা। নিজেকে খুনি ভাবতে ভাবতে তুমি শিশু হয়ে উঠতে পারো, আর হাস্যরত কোনো অসহায় পিঁপড়ে ধরে জলে ছেড়ে দিতে পারো নির্বিকার, কিংবা ছিঁড়ে দিতে পারো বর্ণিল ফড়িংয়ের মাথা অথবা লেজ। মাছিদের মারতে মারতেই তুমি খেয়ে নিতে পারো দিনের খাবার, তারপর পুনরায় উল্লাসে বেরিয়ে পড়ো নির্ভার ঘাসের দেশে, মেঘের কোলে অথবা জলের মায়ায়। খুনি হবার জন্য অবশ্যই তোমার নিষ্পাপ বোধের অধিক কোনো প্রস্তুতিই প্রয়োজন নেই। তুমি সহাস্যে বেরিয়ে যাবে যেমন, তেমনি হাস্যরত ফিরে আসবে কোনো এক ভীত কাছিম নিয়ে, অতঃপর বিস্ময় ও জিদে তাকে বাধ্য করবে মৃত্যুর জন্য বেরিয়ে আসতে, আঘাতে আঘাতে!’

এতসব ভিন্ন ভাবনা ও টুকরো টুকরো বেঁচে থাকা অভিন্ন এক ভিন্ন আমার, এবং এমন বোধে অস্থির হয়ে উঠলে প্রাণ, ঘরের মধ্যে সুগন্ধ ছড়িয়ে দিই, তারপর শরীরে মেখে বসে থাকি চুপচাপ। বেশ লাগে, কিনে আনা সুগন্ধির আবেশে মনে হয়, মেকি সুগন্ধেও কেমন স্থির হয়ে উঠতে পারে প্রাণ। মানুষের যদি নিজস্ব কোনো সুঘ্রাণ থাকত এমন, তবে হয়তো হত্যার সম্ভাব্য কারণগুলো খতিয়ে দেখতে হতো না আর। এই সময়গুলো এত বেশি সংবেদনশীল আর প্রতিক্রিয়াপূর্ণ যে, ঘড়ির কাঁটার শব্দও মুহূর্তে মুহূর্তে হয়ে উঠে প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ার শব্দের মতো, যা কিনা সম্ভাব্য দুর্যোগ ও সাবধানতার জন্য সচকিত করে তোলে হৃদয়কে, আবার বিপরীত কোনো সুন্দর স্মৃতিতেও ভাসিয়ে নিয়ে যায় আকুল। যেমন, মেঘলা দিনে আকাশের দিকে চেয়ে থাকা বালক, যে আকাশের অদৃশ্য ওপারে নির্দিষ্ট করার চেষ্টা করছে, কোন সে প্রকাণ্ড মানব বিশালাকায় চাকা গড়িয়ে চলেছে ছোটার আনন্দ ও উল্লাসে, আর বালকের ঊর্ধ্বমুখী মুখমণ্ডল ধুয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির অনাবিল পরশে, যা হাত দিয়ে মুছে নিতে নিতে ভাবছে, একদিন সেও অমন বিশালকায় চাকা ছোটাবে আকাশে, আকাশে। এইসব কারণগুলোর জন্যই বোধকরি সুইসাইড নোটগুলো সবসময়-ই হয়ে উঠে সুন্দর, আর তখন সেখানে হুড়হুড় করে ঢুকে পড়ে কত না দৃশ্য, কত না বোধ আর অস্থিরতা। অথচ জলদিই সুঘ্রাণহীনতার বছর শেষ হয়ে যায়, আর বিশুদ্ধ ঘ্রাণ এসে দাঁড়িয়ে পড়ে মৃত্যু-দরজায়, আর অদূরে বিমুগ্ধ এক বালক সুদৃশ্য চাকা ও ছড়ি হাতে অপলক চেয়ে দেখে আমাকে!

যে কোনো মৃত্যুপূর্ব প্রস্তুতি স্মৃতির সহায়তায় সাহসী ও নির্দিষ্ট হয়ে ওঠে, যা কিনা একাধারে ব্যক্তিকে খুনি ও নিষ্পাপ হিশেবে পরিগণিত করতে সফলভাবে সমর্থ। এসব কথা তখন মনে আসে না, যখন একটি কালো হৃদয় চিন্তার মধ্যে বসে থাকে, আর মাংসাশী পশুটি শিকারের লাশটি দারুণ ক্ষুধায় চেটেপুটে খেয়ে হাড়গুলো ফেলে রেখে ফিরে যায়। মূলত খুনি নয়, বরং রেখে যাওয়া হাড়ের সামনে বসে থাকার বিচ্ছিন্ন অনুভূতি আত্মহত্যার নোটটিকে দীর্ঘ করে তোলে, কেননা পরিত্যক্ত হাড়গুলো পুনরায় সাজাবার ইচ্ছা যত তীব্র ও নিখুঁত হোক না কেন, কখনোই তা মানুষের আকার পায় না, বরং ভিন্ন এক মাংসাশী পশু অথবা বিশালকায় কোনো নিষ্ঠুর দৈত্য’র আকৃতি পায়, যাকে আমরা চিনি অথবা কখনোই চিনি না; যার সাথে আমাদের বসবাস চিরকালীন কিংবা কখনোই যে আমাদের জীবনে প্রবেশ করে নি। সম্ভাব্য আত্মহত্যার নোটে তাই অনিবার্যভাবেই কিছু অপ্রয়োজনীয় বিষয় উঠে আসতে থাকে।


একটি সুসাইড নোটের তালিকায় একটি নিষ্ঠুর খুনিও অনায়াসে মহৎ হয়ে ওঠে


১. চপল কিশোরী, বর্ণিল ফিতা, দোদুল্যমান বেণী; কিছুটা শঙ্কিত ও আশ্বস্ত, পিতার হাত ধরে, পাশাপাশি শীতের উজ্জ্বল সকালে স্কুলগামী।

২. পরিচ্ছন্ন রাস্তায় মস্তকহীন ছাগলের রক্তাক্ত নিথর দেহ, আর প্রমাণ স্বরূপ ঝুলিয়ে রাখা কাটা মাথা, যাতে তীব্রভাবে জেগে আছে মৃত্যু যন্ত্রণার সাক্ষ্য দেয়া এক জোড়া অসহায় চোখ।

৩. একটি পাগল যে কিনা রোজ সন্ধ্যায় চুপচাপ বসে থাকে ল্যামপোস্টের নিচের সম্ভাবনাহীন আঁধারে।

৪. জমজমাট মাংসের দোকানে তাজা রক্ত, সতেজ মাংস ও উচ্চস্বরের রক মিউজিক।

৫. এক শীর্ণ মানবী তার শীর্ণ স্তন তুলে ধরেছে শীর্ণ এক মানব শিশুর মুখে, শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাতে, আনমনে, দায়ভারে।

৬. প্রেমিকার সকরুণ আর্তি, ‘তুমি আমাকে চুড়ির আলনাটা কিনে দিলে না!’

৭. দারুণ উজ্জ্বল দিন, চৌরাস্তায় অচেনা যুবক গাড়ি চাপা পড়ল আর মাথা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল তরতাজা মগজ ও রক্ত।

৮. শহরের সবচেয়ে অভিজাত এলাকা, পাশের বাড়ির উচ্চশিক্ষিত, আধুনিক, পৌঢ় দম্পতি; যারা রোজ রাতে নির্লজ্জের মতো অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে, একে অপরকে শাসায়, চিৎকার করে, অতঃপর থেমে যায় এবং পুনরায় সুর করে পরবর্তী রাতে।

৯. খোঁড়া কুকুরটি যে ছুটতে গিয়ে বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছে, অথবা বীভৎসভাবে বেড়ে উঠা তার যৌনাঙ্গের বিরাট মাংসপিণ্ড নিয়ে ক্লান্ত, অসহায়, অথচ পরম যত্ন ও মমতায় জিভ বুলিয়ে দিচ্ছে জীবনের এমন বিকৃত ক্ষততে।

১০. পাশাপাশি, শহরের অভিজাত ক্লাব, মৃত ইঁদুরের শূন্য চোখের কোটর এবং সিটি কর্পোরেশনের দুগর্ন্ধময় ডাস্টবিন।

হয়তো এসব থেকে সরে আসাই ছিল সহজাত ও সহজ, কিন্তু, নিজেকে ক্ষমা করা মানুষের পক্ষে সবচেয়ে দুরূহের, আর এমন উপলব্ধির অবস্থানে পৌঁছে প্রতিটি হত্যাকারীই হয়ে পড়ে স্থবির। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে বহুদূর অব্দি দেখার পর হৃদয় যেমন দীর্ঘশ্বাস জমা করে অজানা বাতাসে ভারি হয়ে উঠে, ঠিক তেমনই ভার নিয়ে মৃত্যুগামী মানুষ আকাশের স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখে শুভ্র পোশাক কিংবা ধর্মগ্রন্থ দিয়ে লাশ ঢেকে দেবার আয়োজন, কেননা একমাত্র মৃত্যুর পরই মানুষ হয়ে উঠতে পারে প্রকৃত নির্মল ও শঙ্কাহীন। একটি সুইসাইড নোটের তালিকায় একটি নিষ্ঠুর খুনিও অনায়াসে মহৎ হয়ে ওঠে, কেননা মৃত্যু মহাবিশ্বের সবচেয়ে নির্বিকার এক ঘটনা, যা মানুষকে সহজ ও স্বাভাবিক রূপে ফিরিয়ে আনতে পারে সমাপ্তির সম্ভাবনাহীন বিকাশে।

স্মৃতি, যা কিনা সবসময়ই পুরোনো দিনের বর্ণিল আসরের উজ্জ্বল আলোর মতো, যার দিকে আমরা ছুটে ছুটে আসি বিমুগ্ধ পতঙ্গের মতো, উত্তাপ অথবা শঙ্কা দূরে রেখেই, এবং মৃত্যুসমেত নিচের দিকে ঝরে পড়ার মুহূর্তেও ভাবি, আলো তুমি ছুটে এসো আমার অভিমুখে। প্রতিটি কালো হৃদয় তাই লুকিয়ে থাকে এবং আমরা তাকে ধরতে গেলে সে ঢুকে পড়ে এমনই কোনো না কোনো সুইসাইড নোটের সুগভীরে, আর যতক্ষণ তাকে খুঁজতে থাকি, ততক্ষণে সময় ফুরিয়ে আসে, আর সুইসাইড নোটের শেষপ্রান্তে এসে পৃথিবীর দীর্ঘতম সুন্দর নিঃশ্বাস থেমে যায় চিরতরে! একটি সুইসাইডের নোটের সমূহ সম্ভাবনা শেষ অব্দি এভাবেই বিকশিত। যেসব স্মৃতি আমাদের প্রয়োজন ছিল অধিক, যেসব আনন্দ আমাদের ক্ষয় করত না এতটা, যেসব সম্পর্ক ও মানুষগুলো আমার করতে পারত অধিক সহনশীল, সেসবের অনুপস্থিতি হয়তো নোটটিকে আনমনে ভারাক্রান্ত করতে পারে, কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় এই যে, পৃথিবীর সকল সুইসাইড নোট একটিমাত্র ভাষাতেই লেখা, যা ‘খুনি’ নামক এক ব্যক্তির একান্তই নিজস্ব, যে একই সাথে জীবন ও মৃত্যুর ঠিক মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে গাইতে থাকে সেই অপার্থিব সুন্দর সংগীত, যা সে না গাইলে কোনোদিনই তা মানুষ তথা মানবতার অথবা জীবন সভ্যতার কাছে এভাবে পৌঁছাত না।


হত্যাকারীর নীতিবোধ আমি ব্যক্তিগতভাবে সমীহ ও শ্রদ্ধা করি।


একটি সুইসাইড নোট এভাবেই হয়ে উঠে মহৎ ও সুন্দর। হয়তো হেরে যাবার অপবাদ অথবা ভীরুতার দায় চাপিয়ে দেয়া হবে। বলা হবে, এ গ্রহণযোগ্য নয় কোনোভাবেই, অথচ হত্যাকারীর নীতিবোধ আমি ব্যক্তিগতভাবে সমীহ ও শ্রদ্ধা করি, যতক্ষণ না তা হয়ে পড়ে অপরগামী। আত্মা যখন বিকশিত হবার পথ খুঁজে পায় না, কালো হৃদয় যখন আলোর সামনে এসে দাঁড়াতে ভয় পায়, কিংবা মাংসাশী পশুটি হিংস্র ও ক্ষুধার্ত হয়ে উঠে বারবার, তখন আয়নার ওপারের সমস্ত কিছুই ধ্বংস করে দেওয়া বাঞ্ছনীয় হয়ে ওঠে। মানুষ স্বপ্ন-প্রবণ ও আবেগী বলেই এই নিষ্ঠুরতা জরুরি হয়ে পড়ে, নতুবা প্রতিটি দৃষ্টি ও বোধ আমাদের অদৃশ্য ভাবতে বাধ্য হবে, আর তখন বিজাতীয় প্রতিপালক তার নীতিমালা ও আদর্শ দিয়ে পৃথিবীর মুখ সম্পূর্ণ বদলে দেবে।

একটি সম্ভাব্য সুইসাইড নোটের সমস্ত সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে হত্যাকারীর নিষ্পাপ মনোভাবে, যা কিনা তাকে পূর্বেই মুক্তি দিয়ে রাখে। এমন সম্ভাবনাপূর্ণ সুইসাইড নোটের জন্য আমাদের কোনো অপেক্ষা বা আক্ষেপ থাকে না, বরং আর দশটা খুনির মতোই তাকেও নিক্ষেপ করি কোনো না কোনো অন্ধ কারাগারে। অথচ সুইসাইড নোট লেখা প্রতিটি মানুষই একেকটি বিশাল প্রাচীন বৃক্ষ এই পৃথিবীতে, যারা বৃক্ষদৃষ্টিতে দেখে কিভাবে তারই ফিরিয়ে দেওয়া অনুদানে বেঁচে থাকা প্রাণীসকল তাকে ক্রমশ নিঃশেষ ও হত্যা করে, আর সে দেখে নি কিংবা বোঝে নি এমন নির্বিকার বোধে চোখ বন্ধ করে রাখে, আর তাকে জাগতিক প্রয়োজন ও নিষ্ঠুরতার আঘাত মৃত্যুপথে একটু একটু করে ঠেলে দিতে থাকলে সে নিশ্চিত হয়, প্রতিটি সুইসাইড নোটের সম্ভাব্য বিকাশে মানুষ চিরকাল হত্যা করেছে মানুষের মধ্যে গোপনে বাস করা চিরসুন্দর এক প্রভুকে!

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.।

প্রকাশিত বই :
যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা]
কাক সিরিজ [কবিতা]
এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প]

ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com
অরণ্য