হোম গদ্য একটি পাঠপ্রতিক্রিয়া এবং অনুবাদ প্রসঙ্গ

একটি পাঠপ্রতিক্রিয়া এবং অনুবাদ প্রসঙ্গ

একটি পাঠপ্রতিক্রিয়া এবং অনুবাদ প্রসঙ্গ
506
0

কারণ, সে যাকে সমুদ্র ও তার উদারতায় প্রকাশমান করে তুলতে চাইছে সে তো কেবল নাব্যতা হারানো এক অর্ধমৃত খাল মাত্র

বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তিদের সম্বন্ধে নিট্‌শের জরথুস্ত্র বলেন, সত্য চিরকাল বাস করেছে মরু-প্রান্তরে—স্বাধীনভাবের ভাবুক বিরাট প্রান্তরের সম্রাট। আর নগরে বাস করে আহার-বিলাসে পরিপুষ্ট বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তিগণ। তারা ভারবাহী পশু।… সোনার দড়িতে যখন ওরা ঝকমক করে, তখনো ওরা পশু ছাড়া আর কিছুই নয় আমার কাছে।

স্যার নিট্‌শের বিমূর্ত পশু প্রসঙ্গ থেকে মূর্ত পশু প্রসঙ্গে আসা যাক : মূর্ত পশু মানে একটি তৃণভোজী প্রাণী। প্রাণীটি মাটিতে দণ্ডায়মান। মাটিতে লম্বা লম্বা ঘাস। একটু পুরনো। ওই ঘাস খেতে খেতে সে ক্লান্ত। অদূরেই বেড়ে উঠেছে একটি বৃক্ষ| প্রাণীটির ঠিক গ্রীবার নাগালে বৃক্ষটির পরিণত পাতা, কিন্তু একটু উঁচুতেই কচি কচি লোভনীয় পাতা। সে গ্রীবা বাড়িয়ে কচি পাতাগুলোকে গ্রাস করতে চাইছে। কিন্তু হায়, তার গ্রীবা অতখানি লম্বা হয় না! বাধ্য হয়ে তাকে মধ্যম পন্থাই অবলম্বন করতে হলো। সে বুঝতে পারলো ওই অবস্থাতেই বৃদ্ধ-পাতাগুলো চিবানো তার জন্য সুবিধাজনক। এর জন্য তাকে নিচুও হতে হচ্ছে না, উঁচুও হতে হচ্ছে না। কিন্তু বাকি লম্বা-গ্রীবাধারীরা উঁচু-নিচু সব দিকের আস্বাদ গ্রহণ করছে অবলীলায়।  তার মনোপীড়াটা এখানেই, সে ডাক তুলে তার সুবিধাজনক অবস্থাকে আকৃষ্ট করতে চাইল। যেন সে বলতে চাইল, তোমরা দ্যাখো, এটাই সবচে ভালো অবস্থান। বাকিগুলো প্রলোভন মাত্র! আর নিচে মাটি ও মাটিতে বৃদ্ধ ঘাস নোংরা ও বড্ড স্বাদহীন!
ধরা যাক এও এক প্রকার গল্প। হতে পারে কোনো অবস্থান, কোনো উচ্চাশা, অপপ্রকাশ কিংবা বালখিল্যের ডাকডঙ্কা!

এবার মূল প্রসঙ্গের দিকে ফেরা যাক :
আহা, আরভিঙ হো, হ্যারি লেভিন, উত্তর আধুনিকতা যেন এক বৃহৎ পতন; আধুনিকতার ঐতিহ্য থেকে স্খলন! যেমন আমাদের মূল্যবোধ স্খলিত হয় পতিতার ঘরে। না, তাও নয়। ইহাব হাসান, লেসলি ফিল্ডার, আপনারা চুপ থাকুন! সাহিত্য-ফাহিত্য, গণসংস্কৃতি, বিনির্মাণ, অতিমানবীয় এগুলো পরের বিষয়! পরের বিষয় অবধারিত নতুনত্বের নুইসেন্স। ‘এ শুধুই ধারণা মাত্র—আমার মত’। একজন মহান ভাষ্যকারের মুখ থেকে আমরা শুনতে পেলাম ‘উত্তরাধুনিকতা একটি ধারণামাত্র’—এটা তার  মত।

মহান ধারাভাষ্যকার, এ-তো প্রতিষ্ঠিত মত-ই  যে, উত্তরাধুনিকতা একটি ধারণা ! আপনিই না বললেন যে নোয়ান চমস্কি, হ্যারল্ড পিন্টার, জোনাথন লেথাম বলেছেন, ‘উত্তরাধুনিকতা একটি ধারণা মাত্র।’ আপনি তো তাদের কথাই কপি করলেন, হে মহান পণ্ডিত! আপনার প্রতিষ্ঠিত মত বলে তো কিছুই রইলো না তবে! স্ববিরোধিতা দিয়ে যেমন পাণ্ডিত্য হয় না, তেমনি সম্যক ধারণা না থাকলেও তাকে সংশয়বাদীই বলা চলে|

আমি বলছি ধারণা, সেটা হয়ে যাচ্ছে বহুল কোটেশান ও রেফারেন্সসমৃদ্ধ কলেজ-গাইডেড আনসার। মূল বক্তব্যে নয়, স্পষ্টতই  ধারণা; তবে আমি আর নতুন কী বললাম?  স্ববিরোধী? আত্মপ্রকাশের অজ্ঞেয়পনা?  নাকি মূর্খতা?  সত্যি যদি তা থাকে তবে হাজার হাজার রেফারেন্স টেনেও সে অজ্ঞতা, সে উদ্দেশ্যপনাকে ঢাকা  যায় না!

উত্তরাধুনিকতা যদি কনসেপচুয়াল হয় আধুনিকতা কী? সেও তো তবে তাই। শুধু ডায়নামিজম বা ডিলিউশান এর ব্যাপ্তি নয়, আরও বিশাল, আরও সুগভীর মাল্টি ফেনোমেনাল| পোস্ট মডার্নিজমকে এক লাইনে সীমারেখা টেনে ছুড়ে দেয়া অগভীরতা কিংবা মূর্খামি, যা নিয়ে আজও পক্ষে-বিপক্ষে অনেক মতামত আছে। ব্যাপারটি সংবেদনশীলতার, মুখাপেক্ষী নয়, স্বীকার বা অনস্বীকারও নয়। প্রকৃত যার দ্যুতি আছে তাকে নিস্প্রভ বলা যেমন বালখিল্য, তেমনি পাগলের প্রলাপও!

পশ্চিমা সংস্কৃতির রূপান্তর-ওলট-পালট-সংবেদনশীলতার-পালাবদলের যে প্রেক্ষিত, তাতে পোস্ট-মর্ডানিজমকে বাতিক বলে মনে হয়, এটা কেউ  স্বীকার করতে পারে নি। রূপান্তরের গভীরতা প্রসঙ্গে প্রশ্ন থাকতে পারে, প্রশ্ন থাকতে পারে প্রভাব-পরিব্যাপ্তি সম্পর্কে—সেজন্য মগজের গভীরতাও জরুরি। তাদের সংস্কৃতিতে এই সংবেদনশীলতার প্রাকটিস ও ডিসকোর্সে এই পরিবর্তনের হাওয়া এতটাই মূর্ত যে তাকে দু লাইনে অগ্রাহ্য করার কোনো প্রশ্নই আসে না।

দায়টা তখনই অনিবার্য হয়ে পড়ে যখন এমন বিষয়ের অবতারণায় আমাকে আসতে হচ্ছে তার সুস্পষ্টতা, মাত্রা, গভীরতা, উপস্থাপিত বিষয়ের সাথে বাস্তব কানেকশান বা এসোসিয়েশান ইত্যাদি বিষয় সঠিক ও সুনির্দিষ্ট না করলে পাঠকের কাছে আমার বক্তব্য  উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, আকাট বলে পরিচিত করবে। করেছেও তাই! মোটকথা ষাটের দশকে পশ্চিমের যে বিচিত্র-অভিনব ডিসকোর্স-এর জন্ম দিয়েছে তার সঙ্গে পরিচয় না থাকলে একে মূর্খ চিন্তায় ফ্যাশান মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।

পরস্পরে প্রকাশিত একটি লেখায় লেখককে ব্যাখ্যা দিতে শুনলাম, আধুনিকতার বিপরীত নাকি গ্রাম্যতা! হাস্যকর! তিনি নেতিবাচক মানসিকতার্থে ‘গ্রাম্যতা ‘ দাঁড় করাচ্ছেন; তাও আধুনিকতার বিপরীতে। আধুনিকতাকে সালাম-কালাম দিয়ে, পূজার্ঘ্য করে তুলে সে ক্ষেত্রে তিনি নিয়েছেন তার নিজের বন্ধুর আধুনিকতা সম্পর্কিত সাম-আপ; তার মনে হয়েছে সেটাই সবচেয়ে বড় রেফারেন্স। এ ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে দায়মুক্ত রেখে বন্ধুর ডানার নিচে আড়াল নিয়েছেন। এ চালাকিটুকুর প্রশংসা তার করতেই হয়। তার সেই বন্ধুটি আরও একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, আধুনিকতার পরে আর কিচ্ছু নেই। তাদের  জ্ঞাতার্থে বলতে হয়, আধুনিকতা সম্পর্কিত তাদের যে সাম-আপ, যে সিদ্ধান্ত ও আরোহণ—এটাও তাদের নিজস্ব ধারণা নয়, কারণ ‘এটি একটি বৈশ্বিক প্রক্রিয়া-এর বাইরে কিছু নেই, কেউ নেই,’ আধুনিকতা সম্পর্কিত এমন একটি মতবাদ প্রচলিত প্রসঙ্গত সুবিদিত। নিজেকে প্রাজ্ঞ প্রমাণ করার কি অথর্ব প্রক্রিয়া! দাম যাচাই করার জন্য বাজারে ওঠার আগে বাজার সম্পর্কিত সম্যক ধারণা নেয়া যেমন বুদ্ধিমানের কাজ, তেমনি  দম যাচাই করার জন্য গভীর জলে ডুব দিয়ে দ্যাখাও খুব সাধারণ প্রজ্ঞারই বিষয়। তিনি বুঝবেন। কবে বুঝবেন তা? আধুনিকতার জয়গান গেয়ে নিজেকে আধুনিক প্রমাণ করতে যেভাবে মরিয়া হতে চাইলেন, তার এও জানা উচিত যে, আধুনিকতাই ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে। জন্ম দিয়েছে প্রতিক্রিয়াশীলতার। তিনি নিজেই তার আধুনিক অবস্থানে প্রতিক্রিয়াশীলতার বড় একটি প্রমাণ।

এটা অনস্বীকার্য যে আধুনিকতার একটি প্রি-হিস্টোরিক ব্যাপার আছে যাকে’ প্রিমিটিভ’ কিংবা ‘ট্রাডিশনাল’ বলে আখ্যা দেয়া যায়! কিন্তু তার বিপরীতে তাকে গ্রাম্যতা বলা অন্ধত্বেরই লক্ষণ। তা হোক না আচরণ সম্পর্কিত কিংবা মনস্তাত্ত্বিক উচ্চতা-নিম্নতা নির্ণয়ের দাঁড়িপাল্লা এবং  তাও যদি হতো ‘আর্বান’ ফেনোমেনার সাথে সম্পর্কিত, তবেই না হয় অসংলগ্নতা থেকে মুক্তি পেত তার বাচালতা। উপস্থাপিত বিষয়সমূহ দিয়ে নিজেকে পণ্ডিত প্রমাণ করতে কি রকম লেজে-গোবরে অবস্থা করে ফেলেছেন তা যে কেউ  খুব সহজেই আঁচ করতে পারবেন!

রুশোর একটা কথা আছে যে, আধুনিকতা মানে হলো আরোপণ, মূল মানবস্বভাবের ওপর আরেক স্বভাবের আরোপণ, সামাজিক শৃংঙ্খলা বা স্বভাবজাত ব্যাপার নয় এটি। একসময় ‘ প্রিমিটিভ থট’ ও ‘সায়েন্টিফিক থট’-এ পার্থক্য টানা হতো। এ ধারণা থেকে অনেকটা সরে আসতে হয়েছে, কারণ আদিম মানুষের টোটেমবাদ কিংবা জ্ঞাতিতত্ত্ব কিংবা প্রাণী উদ্ভিদ প্রভৃতির শ্রেণীকরণ সমকালীন বিজ্ঞানের মতোই মূল্যবান! এ সব কথা বোঝার জন্য, দেখার জন্য যে প্রজ্ঞার দরকার তা ওই ডিসপ্লে-পাণ্ডিত্বপূর্ণ লেখাটিতে বোধ করি নেই, একদমই নেই!

আমার উদ্দেশ্য আধুনিকতা ও উত্তর-আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য বা তাদের মধ্যে কে উত্তম কে অধম এটা প্রমাণ করা নয়, বরং সুরা নাছ ও সুরা ফালাক-এর এগারো আয়াত পড়ে দুষ্টচক্রের এগারো গেরো খোলা; এ বৈ আধুনিকতা-উত্তরাধুনিকতা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

‘গ্রাম্যতা’ বলে কোনো কোনো মানসিকতার বিচার করা উন্নাসিকতার লক্ষণ, প্রসঙ্গত মারাত্মকভাবে প্রতিক্রিয়াশীলতার অস্ত্র! আঘাত করবার জন্য এই অস্ত্রটি ব্যবহার এক ধরনের মূর্খতা। তাই ওই আধুনিক প্রতিমার আড়ালে দাঁড়িয়ে ‘গ্রাম্যতা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে স্রেফ মূর্খতার অস্ত্র হিসেবে; আর ওটাই হচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীলতার যোগ্য উদাহারণ। উপস্থাপিত প্রতিটি বিষয়ের বিবেচনায় পদে পদে তার যেমন রুগ্‌ণ প্রজ্ঞার পরিচয় স্পষ্ট, তেমনি স্ববিরোধিতার মূর্খতা বড়ই দরিদ্র হয়ে ভেসে ওঠে। কারণ, সে যাকে সমুদ্র ও তার উদারতায় প্রকাশমান করে তুলতে চাইছে সে তো কেবল নাব্যতা হারানো এক অর্ধমৃত খাল মাত্র।

আরেকটি ব্যাপারে আলোকপাত করা যাক : তিনি এডওয়ার্ড সাঈদের ‘ওরিয়েন্টাল’ (ওরিয়েন্টালিজম) ব্যাপারটি উত্থাপন করলেন, মানে  তিনি সাঈদের ওরিয়েন্টালে বিশ্বাসী, অথচ তার প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেল তিনি অজ্ঞাতেই সমর্থন করে গেছেন সাঈদ সমালোচিত ইউরোপীয় ‘টেক্সুয়ালিজম’-কে, যার উদ্ভবের  মনস্তাত্ত্বিক কারণ টেক্সটে হস্তক্ষেপ না করার নীতি থেকে। বিষয়টা এমনই যে, টেক্সটই আমাদের কারবার। সেখানে স্বাধীনতা নয় বরং স্বেচ্ছাচারিতা রয়েছে। স্বয়ং সাঈদকেই বলতে শুনি, ‘সমকালীন সকল পরিস্থিতি থেকে সমালোচনা সরে গেছে; যেন কোনো সমালোচনাই করা যাবে না, যেন ইন্দ্রিয়ের বোধ ও অনুভব থেকে বিযুক্ত হয়ে গেছে সমালোচনা।’

বোঝা গেল সাঈদ প্রসঙ্গটা ওনার জন্য বুমেরাং| শুধু তাই নয়, স্ববিরোধিতার পাশাপাশি পাশ্চাত্যে ফিরে যাবার তার এই প্রবণতা, দ্বিমুখী আচরণকে স্ববিরোধিতা না বলে আসলে মূর্খতা বলাই শ্রেয়; যা কিনা সম্যক ধারণায় না থেকে আধো ধারণায় আপনাকে জাহির করার ফলশ্রুতি। যা বড়ই করুণ। একরকম বলা চলে, উদ্দেশ্যের আদিষ্টতায় অন্ধ বালকের প্রগলভতা।

হায়, তাদের সমুদ্রে আমি সুস্বাদু মাছ ধরার জন্য জাল ফেলেছি। কিন্তু, আমার জালে মাছ কই! ওঠে কেবল বৃদ্ধ প্রতিমার খুলি

এবার অনুবাদ প্রসঙ্গ। কিউই -মার্কিন কবি ক্লোয়ি হোনম-এর Tulip-Flame থেকে এটি পড়া যাক :

Assembling Faith

A huge turkey came
down the path. Serene,
only slightly more
beautiful than ugly.
It looked as though
it had made itself
out of morning’s spare parts.
I wanted to put something
together like that,
without a mirror.
Long feathers.
Waxy, red dribble—
and yet it glided
almost regally
into the misty woods

এবার ধরা যাক এই কবিতাটি নিন্মোক্তভাবে  আপনি ভাষান্তর করলেন—

জড়ো করা বিশ্বাস

এই পথ দিয়ে একজন তুর্কি এসেছিল
অসুন্দরের চেয়ে সামান্য সুন্দর
সে যেন নিজেই নিজেকে সকালের বাড়তি যন্ত্রাংশ
থেকে তৈরি করেছে
আমি একসাথে আয়নার মধ্যে কিছু রেখে যেতে চেয়েছিলাম তার মতো করে
লম্বা পালক
লালাভ কষ,
এমনকি সে
রাজার ভঙ্গিমায় কুয়াশার পিপার মধ্যে উড়ে যায়।

খুবই চমৎকার এবং সুখের কথা যে আপনি অনুবাদটি শেষ করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন। কিছুটা গর্ব-সহকারে কোন গ্রুপের ডিসপ্লেতে রাখলেন। এখন সবাইকে এর প্রশংসা করতে হবে, প্রশংসা বৈ ভিন্ন কিছু নয়। এছাড়া কেউ যদি আপনার প্রাথমিক ধারণার ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তো আপনি তাকে প্রতিক্রিয়াশীল বলবেন। বলবেন নিজের জায়গায় মাতব্বরি করতে। আপনার মূর্তি সেই ইউরোপীয় টেক্সুয়ালিজমকেই ধারণ করবে, যেখানে টেক্সটই আসল কথা, এর বাইরে কেউ নেই কিছু নেই।

হে সাধু, বিদিত সাধারণ জ্ঞানের মধ্যেই আপনি কী কী অসঙ্গতি রেখে গেছেন তার কিছু কিছু দিক ফিরে দেখা যাক—

১) কবিতার শিরোনাম
২)) Turkey
৩) morning spare parts
৪) put something together like that
৫) without a mirror
৬) woods

প্রথমত : একজন অনুবাদককে অবশ্যই co-creator হতে হয়। ‘sense for sense’-এর কমনসেন্স থাকতে হয়। না হয় নিজের বিচার্য বিষয়গুলো অখাদ্যে পরিণত হতে বাধ্য। নিমজ্জন না হলে আপনি ‘Assembling Faith’-কে ভাষান্তর করবেন ‘জড়ো করা বিশ্বাস’ বলে। গোটা কবিতার চলমান বোধের সাথে এসোসিয়েশান ঘটাতে পারলে আপনি বুঝতেন ‘Together something like that’ মানে জড়ো করা বিশ্বাস নয়, সেটা হতে পারত যৌথ বিশ্বাস বা সম্মিলিত চেতনা বা বোধ বা এমন কিছু যা দিয়ে শুধু সাবজেক্টকে সংযুক্ত করেছে।

দ্বিতীয়ত : ‘Turkey’ শব্দটিকে উচ্চারণ করুন ‘টার্কি’, মানে একটি পাখি। কিন্তু ‘তুর্কি’ (জাতি) কখনোই নয়। হ্যাঁ, সুনিশ্চিতভাবে একজন অনুবাদকের স্বাধীনতা আছে, তার মানে এ নিশ্চয়ই নয় যে একটি পাখিকে আপনি জাতি করে ফেলবেন! আত্মরক্ষার জন্য যত প্রকার কৌশল অবলম্বন করা হোক, এখানে একটি পাখি কখনোই জাতি হয়ে উঠবে না। কারণ :

এক : It looked as though/ it had made itself.
সংশ্লিষ্ট ভাষার সাধারণ নিয়ম অনুসারে It ব্যবহৃত হয় ইতর প্রাণীর ক্ষেত্রে; জাতি বা মানুষের ক্ষেত্রে নয়। তবে মানুষের বাচ্চা, মানে শিশুর ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য। এবার আপনি কি ভাষান্তর করবেন যে, এই পথে বড়সড় একটি তুর্কি শিশু এসেছিল?

দুই : ‘and yet it glided’ স্বাভাবিকভাবেই কোনো মানুষ উড়ে যায় না। তবে কি তুর্কিটা ডেভিড কপারফিল্ড ছিল, যে চোখে ধুলো দিয়ে উড়ে গেল?  Glide এর translation-ও কিন্তু ওড়া নয়।

তিন : এখানে ‘ টার্কি’ কখনোই ‘তুর্কি’ হবে না। তার এমন কোনো জৌলুস নেই যে তরুণ তুর্কির সাথে তার তুলনা করা যাবে! ওটা আপনার উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত। কবিতাতেই বলা আছে, ‘only slightly more/beautiful than ugly’—অসুন্দরের চেয়ে সামান্য সুন্দর।’

টার্কি ও তুর্কি কখনোই এক নয়। কস্মিনকালেও ছিলো না। আরও একটু খোলাসা করা যাক :
Turkey পাখির টার্কি নাম হলো একটি  misnomer বা  অপনাম, টার্কি পাখির সাথে টার্কি (Turkey) বা তুরস্ক দেশের-জাতির কোনো সম্পর্ক নেই। এটি মূলত উত্তর আমেরিকার দেশজ পাখি। আমেরিকায় বসতি স্থাপনের সময় ইউরোপীয়রা যখন প্রথম বিরাট আকৃতির মুরগীসদৃশ এই পাখির মুখোমুখি হয় তখন তাঁরা একে তাঁদের বহু পরিচিত পাখি  ‘গিনিফাউল’ (Guinea-fowl)-এর সাথে গুলিয়ে ফেলে। এটা ইউরোপীয়দের খাবার হিসেবে তুরস্ক বা টার্কি দিয়ে চালান হয়ে (রুট হিসেবে তুর্কি) ইউরোপে আসত। তাই এই গিনি ফাউলের চলতি নাম ছিল ‘টার্কি ফাউল’ বা ‘টার্কি হেন’। তাই সেই দিশি আমেরিকান পাখির নামও ভুলবশত টার্কি ফাউল রাখা হয়, পরবর্তীকালে তা সংক্ষেপিত হয়ে টার্কি হয়ে দাঁড়ায়। এই নাম টিকে যাবার আরেকটি প্রধান কারণ হলো, তখনকার মানুষদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল আমেরিকা আসলে এশিয়ারই একটি অংশ।

টার্কি পাখিটি কেবলমাত্র স্বল্প দূরত্বে উড়তে পারে। এটি প্রায় ০.৪ কিলোমিটার বা ০.২৫ মাইল দূরত্ব উড়ে অতিক্রম করে যেতে পারে। অতএব তুর্কি ও টার্কি গুলিয়ে ফেলার কোনোই অবকাশ নেই !

তৃতীয়ত : morning spare parts—শাব্দিক অর্থ করলে দাঁড়াবে ‘সকালের বাড়তি যন্ত্রাংশ’। অনুবাদের ক্ষেত্রে How communicative is the translation? একটি প্রশ্নের পাশাপাশি প্রচলিত শব্দের চেয়ে অন্য কোনো শব্দ দিয়ে sense-টিকে স্পষ্ট করতে হয়।  যার আগেই বলা হয়েছে common sense-এর কথা। সকালকে ধরা যাক স্নিগ্ধতার প্রতীক; কোমলতর সৌন্দর্যের প্রতীক। সকাল যখন তার এই কোমলতাকে ছাড়িয়ে মধ্যাহ্নের দিকে এগিয়ে যায়, তার কোমলতর সৌন্দর্য মুছে আসে ক্রমশ। সেই মুছতে থাকা ম্লান সৌন্দর্যকেই বলা যায় ‘morning spare parts’ বা  বর্ধিষ্ণু সকাল বা ম্লান সকাল । আর সকাল কোনো যন্ত্র নয় যে তার বাড়তি অংশ থাকবে!

চতুর্থত ও পঞ্চমত : wanted to put something/together like that,/without a mirror.

অর্থাৎ শিরোনামার যৌথ বিশ্বাসটি এ লাইনটিতেই এসে উপগত হয়েছে বলা যায়। এ লাইনটিকে বলা যায় কবিতার স্ট্যান্ড-পয়েন্ট, যেখানে আপনি আয়না ছাড়াই একসাথে আয়নার মধ্যে কিছু রেখে যেতে চেয়েছেন। যেখানে আপনার কাজ কো-ক্রিয়েটরের মতো হয় নি। হয়েছে সেই ঈশ্বরের মতো, যে ঈশ্বর অজান্তে নিজেকেই অস্বীকার করে বসে আছে।

ষষ্ঠত : Misty woods. আপনি একে ভাষান্তর করলেন ‘কুয়াশাচ্ছন্ন পিপা’।

and yet it glided/almost regally/into the misty woods। এমনকি সে ঘোরলাগা পিপার মধ্যে উড়ে যায়! হ্যাঁ ,’woods’ মানে পিপা। ধরা যাক কেউ বললো, “আমার রেফ্রিজারেটরের মধ্যে কিছু ‘রাইনো’ (Rhino) আছে। প্রতিদিন সকালবেলা এর কয়েকটি নিয়ে রস বের করে খাই।” আপনাকে এর ভাষান্তর করতে যেয়ে (Rhino) শব্দটিতে এসে আটকে গেলেন, আপনার হাতে ‘রাইনো ‘শব্দের দুটি অর্থ আছে, (এক) গণ্ডার; (দুই) রসালো ফল। এই ক্ষেত্রে ‘রাইনো’ শব্দের অর্থ হিসেবে আপনি ‘গণ্ডার’ শব্দটিকে গ্রহণ করবেন এবং প্রতিদিন সকালে গণ্ডারের রস বের করে খাবেন। তবে পাখিও পিপার মধ্য থেকে উড়ে যাবে। খুবই দারুণ ব্যাপার, মহাজন!

টার্কি পাখির একটি মজার নাম আছে ‘টার্কি ফাউল’। কেউ কেউ একে ফাউলও বলেন। মার্কিন নেতা বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন এই পাখিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পাখি-ই করতে চেয়েছিলেন। ভাগ্যিস করেন নি! তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন বয়লার সদৃশ এই মাংসল পাখিকে দেশের জাতীয় মর্যাদার প্রতীক হিসেবে নেয়া কতটা অদূরদর্শী চিন্তা। তাই তো পরে ‘বল্ড ঈগল’-কে  ওই দেশের জাতীয় পাখি করা হয়। ঈগল তো ঈগলই! টার্কি তো আর ঈগল নয়। প্রতীক বলে প্রশ্ন!

অস্তিত্বহীনতার সংকট সবচেয়ে বড় সংকট। এই সংকট আবার অন্যের অবস্থাকে সংকটাপন্ন করতে চায়। এই অবস্থাকে বলা যেতে পারে একধরনের ডিজঅর্ডার। এই ডিজঅর্ডার-ই আবার ছানাপোনা-সহকারে আপনাকে গ্রাস করতে আসে। গ্রাস করবার আগে প্রচণ্ড শক্তিতে উদরস্থ করতে পিষে ফ্যালে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় প্রথমত নিজেকে অস্বীকার করা; নিজেকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়েই নিজেকে স্বীকার করার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। আর নিজেকে স্বীকার করার বড় স্তম্ভ অকপটে নিজের ভুলকে স্বীকার করা।

নিট্‌শের কথা দিয়েই সমাপ্তির দিকে যেতে চাই। ‘তাদের বীণার সশব্দ বেসুরো আওয়াজ আমার কাছে মনে হয় ভূতের পাখঝাপটা বা কঙ্কালের নিশ্বাসের মতো। বাদ্যের আনন্দরস তাদের একেবারে অজানা। তারা যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন নয়। সমস্ত জল তাদের ঘোলা। ঘোলা এইজন্য, যেন লোকের কাছে দেখতে মনে হয় গভীর। তারা নিজেদের পুনর্মিলনকারী বলতে আনন্দ পায়। কিন্তু আমার চোখে তারা মাঝখানের সাক্ষীগোপাল এবং অযথা গোলমালকারী। তারা বর্ণসঙ্কর এবং ম্লেচ্ছ।
হায়, তাদের সমুদ্রে আমি সুস্বাদু মাছ ধরার জন্য জাল ফেলেছি। কিন্তু, আমার জালে মাছ কই! ওঠে কেবল বৃদ্ধ প্রতিমার খুলি।’


যে লেখাটি নিয়ে এই প্রতিক্রিয়া

আসাদ জামান

জন্ম ৯ জুলাই, ঝালকাঠি, বরিশাল।

কবি, অনুবাদক, গদ্যকার।

পেশা : শিক্ষকতা।

ই-মেইল : Asad.du327@gmail.com

Latest posts by আসাদ জামান (see all)