হোম গদ্য উপান্তে, ভাবুক কারখানায়

উপান্তে, ভাবুক কারখানায়

উপান্তে, ভাবুক কারখানায়
517
0

শরৎ এক ভাবুক কারখানা। কারণ, ঋতুবৈচিত্র্যের এই সময়খণ্ডে প্রকৃতিতে খেলা করে অদ্ভুত উদাসীনতা। প্রকৃতির ও আবহাওয়ার এই মায়া ভর করে শরীরে, মনে। দেখা গেল ঠাসবুনটের শহরে দশটা-পাঁচটা অফিস করছি, হাঁটছি নুয়ে পড়া দালানের ফাঁকে, এভনিউ-ফুটপাত ধরে, প্রাণ আনচান করা ডিহিরি ডিহির ডাকে—হঠাৎ উঁকি দিল অন্যরকম আলো। হয়তো হঠাৎই চোখ গেল আকাশ-আঙিনায়; আর মনে হলো—এত সোনা রোদ, পেজা পেজা মেঘ কোথায় ছিল এতদিন? এই চকিত আবিষ্কার শরৎ ছাড়া আর মিলবে কোথায়? কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন—শরৎকাল স্মৃতির কাল এবং বসন্ত বর্তমান আকাঙ্ক্ষার ঋতু। বসন্তে নবজীবনের চাঞ্চল্য, শরতে অতীত সুখদুঃখময় জীবনের পূর্ণতা। শরৎকালে বায়ু-হিল্লোলের মধ্যে একটি চিরপরিচিত স্পর্শ প্রবাহিত হতে থাকে, কাজকর্ম ভুলে যেতে মন চায়; বেলা বয়ে যায় নাকি মন্ত্রমুগ্ধ আলস্যে অভিভূত হয়ে সময় থমকে আছে, বুঝা যায় না।

শহরে এই আলস্য বা শরৎভাবুকতার সময় ও সুযোগ কোনোটাই হয়তো নেই। সারাক্ষণ রুজিরুটির চিন্তা, যানবাহনের চিৎকার আর মেশিনের ঘটাংঘটাং মনকে থিতু হতে দেয় না। কিন্তু গ্রামবাংলায় এখনও নিজস্ব আভায় উদ্ভাসিত শরৎ। ঋতুরানির আগমনে মাঠে মাঠে সবুজ গালিচা, হাওড়-বাওড়-ভাটিতে দ্বীপের মতো জেগে ওঠা গ্রাম, তার মাঝে গলে পড়া স্নিগ্ধতা আর মিশে থাকা সোনালি রোদ্দুর জীবনধারাকে টেনে নেয় অন্য মাত্রায়। এই যে গ্রাম-নগরের তুলনা, স্মৃতিকাতরতা এটা ভাবুকতা বুঝি শরৎ এসেছে বলেই।


হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে এখনও ওখানকার মানুষ বিশ্বাস করে, ভাদ্রের প্রথম কটা দিন স্বামীর মুখ দেখলে স্বামীর অমঙ্গল হয়। ধেয়ে আসতে পারে অপঘাত। সে কারণে শ্রাবণের শেষ দিকে মেয়ের বাড়ি থেকে লোকজন আসে মণ্ডামিঠাই আর ফলফলাদি নিয়ে। বেয়াইবাড়ির লোক আসায় জামাই বাড়িতেও মহা ধুমধাম।


নাতিশীতোষ্ণ এই সময়ে হঠাৎ সামনে মানসপটে ভেসে ওঠে পুরনো স্মৃতি, মধুর বিষাদ, আধো ভুলে যাওয়া মুখ। দেখতে পাই— গরুর গাড়িতে করে নাইওরে যাচ্ছে বীনা কাকিমা; সাথে করবী, ছোটন। উত্তরবঙ্গে যে মফস্বল শহরে আমার শৈশব ও বেড়ে ওঠা ওখানকার মানুষ একে বলতো ‘ভাদর কাটানি’। মানে ভাদ্র কাটানো। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে এখনও ওখানকার মানুষ বিশ্বাস করে, ভাদ্রের প্রথম কটা দিন স্বামীর মুখ দেখলে স্বামীর অমঙ্গল হয়। ধেয়ে আসতে পারে অপঘাত। সে কারণে শ্রাবণের শেষ দিকে মেয়ের বাড়ি থেকে লোকজন আসে মণ্ডামিঠাই আর ফলফলাদি নিয়ে। বেয়াইবাড়ির লোক আসায় জামাই বাড়িতেও মহা ধুমধাম। আমি নিজেই দেখেছি, মফস্বল শহরের বাইরে ৮ কিলোমিটার দূরে আমাদের গ্রামের বাড়ির বৈঠকখানায় চাচি-ফুপুরা কথা বলছে; এইবার নাইওরে গিয়ে কী করবে চলছে তার পরিকল্পনা? ‘কেমন মজা হবে, কেমন মজা হবে’ বলে ফোড়ন কাটে বাচ্চারা। আসলে বর্ষার একটানা বৃষ্টি আর ফসল রোয়ার পর এই সময়টাতে একটু অবসর পায় পল্লিবধূরা। এই অবসরে হয়তো বাপমায়ের জন্য মন পোড়ে। পল্লীকবি জসীমউদ্‌দীনের কবিতায় বিষয়টি ফুটে ওঠে অনন্য বর্ণনায়। যেখানে পল্লিবধূর কণ্ঠে ঝরে পড়ে কাতর মিনতি— ‘কে যাসরে রঙিলা মাঝি! সামের আকাশ দিয়া;/ আমার বাজানরে বলিস খবর নাইওরের লাগিয়ারে/ অভাগিনীর বুকের নিশ্বাস পালে নাও ভরিয়া/ ছয়মাসের পন্থ যাইবা একদণ্ডে উড়িয়া। এমনি নাইওর যাওয়ার আকুতি নিয়ে অনেক গীতও আছে উত্তরবঙ্গে। একটার কথা মনে পড়ে, যেখানে পল্লিবধূ রাজার কাছে আকুতি জানায়— একটা হুকুম দাও আজা মশাই/ নাইওর কবে আসিবে/ আহা ফুলমোন আজা রে/ একটা হুকুম দাও আজা মশাই/ মায়ের মুখ দেখে আসি রে।’

বাপের বাড়ি যাওয়ার এই আকুতি যেমন আছে, এর উল্টোটাই দেখি, নাইওর যাবার আগে স্বামীকে চুপিচুপি বলে যাচ্ছ বধূ, তাকে যেন তাড়াতাড়ি নিয়ে আসা হয়। নাইওরের বিরহের কাতর হতে দেখি স্বামীকেও। একলা বাড়ি, একলা দাওয়া পুরুষকে করে পথহারা পথিক। মেঘকে চিঠি করে কালিদাসের মহাকাব্য রচনার রসদ লুকানো থাকে এই শরতেই।

সময় গড়িয়েছে। বদলেছে জলবায়ু, জীবনধারা। তার সাথে খাপ খাইয়ে বদলেছে মানুষের রহন-সহন। তবু অনেক পুরোনো লোকাচার এখনও টিকে আছে আবহমান বাংলায়। রক্তের সাথে মিশে থাকা সেইসব উত্তরাধিকার তাড়া করে নগরজীবনেও। সৈয়দ শামসুল হককেও কবিতায় বলতে হয়— ‘সে কী বিস্ময়! কী যে বিস্ময়! কী করে ভুলি!/ আকাশের নীল ঘন শাদা মেঘ, কবেকার গ্রামপথে ডুলি!/ নাইওরে যাচ্ছে বউ!/ একদিন চুল তার দেখি নাই কারও চুল দীর্ঘ এতটা/ আজ এই নগরের অ্যাভেনিউয়ে এসে যেই দাঁড়ালাম/ সেদিনের কিশোর বেলাকার এই আমাকে বললাম/ ওরে থাম! থাম!’


উপান্তে আশুলিয়ায় কী ভাটারায় যদি দেখা মেলা শাদা কাশ, যদি সাত বাই তিন ব্যালকনির টবে ফুটে ওঠে নিরীহ দোলনচাঁপা, যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর রমনার এক ঝাঁক কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া আর জারুলের ডালে দেখা মেলে লাল-হলুদ আর বেগুনি আগুন, তবে মনে ভর করে মধুর বিষাদ। উড়ে যায় ইংরেজি ক্যালেন্ডার; বুঝি এসে গেছে ঋতুরানি।


এভাবে থমকে যাই নয়া-নানির চাবির গোছায়। মনে পড়ে শরতে নানাবাড়ি যাওয়ার অনেক কথা। হাসিমুখে নানি বলে— যা তো শিউলি কুড়ে আন কয়টা। তখনও আলো ফোটে নি পুবে। একটু একটু হিমেল বাতাস। স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পরে দে ছুট। ফুল যেন ব্যথা না পায় এমন আলতো করে মাটি থেকে শিউলি কুড়িয়ে গেঞ্জির কোঁচড়ে করে নিয়ে আসি সুবাস। কী তার ঘ্রাণ, এখনও লেগে আছে আঙুলে। সেই ফুলে মালা গেঁথেছে ছোটখালা। আর শিউলি-ফুলের বাঁটের কমলা রঙ ছেঁচে পায়েশে দিয়েছে নানি। আর দুধশাদা পায়েসে খেলে গেছে লুকানো কমলা আভা। এখন অবশ্য সেই চল নেই। সব রেডিমেট। পায়েসও প্যাকেটে মেলে। শুধু মেলে নাই সেই শৈশবস্মৃতি। কতদিন দেখি না বিপুল প্লাবন, টইটুম্বুর মাঠ-ঘাট, নদী-নালা। পাড়ে কিংবা খোলা জায়গায় অযত্নে বেড়ে ওঠা ঘন কাশবন। শাদা ফুল আর শাদা আকাশের ভেতর ট্রেন চলে যাওয়া দৃশ্য দেখা অপু-দুর্গার মতো আমিও থমকে দাঁড়ায় চলে যাওয়া স্মৃতির দরবারে। বলি— ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলা/নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা… ওগো শেফালি বনের মনের কামনা… সকল বন আকুল করে শুভ্র শেফালিকা… আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ… শিউলি-সুরভিত রাতে বিকশিত জ্যোৎস্নাতে… শরৎপ্রাতের প্রথম শিশির প্রথম শিউলি ফুলে… হৃদয় কুঞ্জবনে মঞ্জুরিল মধুর শেফালিকা…

শরতে টানাটানা চোখের প্রতিমার বহর চলে যায় নানিবাড়ির সামন দিয়ে। কী বিপুল সাজপোশাক। পেছনে ভক্তদের উল্লাস-বিষাদ। মেলায় গিয়ে বাতাসা খাওয়ার মজা—বার্গার-সেন্ডউইচে কোথায়! দূর থেকে দেখি— কাঞ্চন নদী, যার ভালো নাম পুনর্ভবা—তাতে বিসর্জন হচ্ছে দেবীর। সেই বিসর্জনের বেদনা নিয়েই হয়তো ছুটে চলি শহরে, অলিতে-গলিতে-চৌরাস্তায়। এর মাঝে ঢাকার উপান্তে আশুলিয়ায় কী ভাটারায় যদি দেখা মেলা শাদা কাশ, যদি সাত বাই তিন ব্যালকনির টবে ফুটে ওঠে নিরীহ দোঁলনচাপা, যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর রমনার এক ঝাঁক কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া আর জারুলের ডালে দেখা মেলে লাল-হলুদ আর বেগুনি আগুন, তবে মনে ভর করে মধুর বিষাদ। উড়ে যায় ইংরেজি ক্যালেন্ডার; বুঝি এসে গেছে ঋতুরানি। তখন এই রিক্সা হয়ে যায় শ্বেতকাঞ্চন, ঝুলতে থাকা লোকাল বাসে ভর করে কল্কেফুলের ছায়া। আর মনেহয় আর কটা দিন—শারদীয় দুর্গোৎসবে এই যান্ত্রিকতা, নাগরিক ক্লেদ সব বিসর্জন দেব। কিন্তু হয় না…। আহা বিষাদ, অপ্রাপ্তি! আহা শরৎ!

Untitled

মাজুল হাসান
মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

কবি ও গল্পকার
জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর।
পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস।।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১০।
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

অনুবাদগ্রন্থ:
টানাগদ্যের গডফাদার, রাসেল এডসনের কবিতা ● চৈতন্য, ২০১৬।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান