হোম গদ্য উপন্যাস শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা
678
0

এই বৃত্তান্তের লেখক সিতারাবানুর হদিস তবে পেল কোথায়? সবিনয় উত্তর, এই প্রশ্ন অবান্তর। লেখক লিখছে সিতারাবানু নামের এক নারী উজানটেকে ছিল, অতএব ছিল। লেখক লিখছে তার স্বামী বাহার দরিয়ার মাঝি ছিল, অতএব ছিল। লেখক লিখছে বাসর রাতে তার স্বামীকে হার্মাদরা অপহরণ করেছিল, অতএব সত্যি সত্যি অপহরণ করেছিল।


পর্ব-১

শিলাবৃষ্টিতে নিহত কয়েক হাজার পাখির সারি সারি লাশ দেখতে দেখতে উজানটেক ছেড়েছিল সিতারাবানু। কত বছর আগের কথা? চার’শ বছর তো হবেই। বেশিও হতে পারে। ঠিক ঠিক বলা মুশকিল। বছরের হিসাব তো হিসাব, বংশধরদের মধ্যে তার নামটিও কেউ মনে রাখে নি। কি দরকার? সিতারাবানু তো ইন্দ্রকুলের পরী ভেলুয়া সুন্দরী নয়, রাজরানী পরীবানুও নয়, চন্দ্রতুল্য নুরুন্নেহাও তো নয়। সিতারাবানু উজানটেকের নগণ্য এক মাঝির বেটি, বাসর রাতে যার স্বামীকে ফিরিঙ্গি হার্মাদরা অপহরণ করেছিল—এটুকুই তার পরিচয়। মধ্যযুগের এই সামান্য পরিচয়ের একজন নারীকে এতকাল মানুষ কেন মনে রাখবে। চার’শ বছরে এই বাংলায় কত কী ঘটে গেছে, বাঙাল মানুষের করোটিতে আনন্দ-বেদনার কত স্মৃতি জমা হয়ে গেছে। দক্ষিণ পূর্ববাংলার কোথায় কোন প্রান্তে উজানটেক গ্রাম, চার’শ বছর আগে সেই গ্রামে কত সিতারা জন্মেছে, কত সিতারা অকালে বিধবা হয়েছে, স্বামীর প্রতীক্ষায় পাঁচগৈরার ঢেউ গুনতে গুনতে কত সিতারা চোখে ছানি ফেলে দিয়েছে, মগ-ফিরিঙ্গি হার্মাদদের ভয়ে কত সিতারা গ্রামছাড়া হয়েছে, কত সিতারার কুমারিত্ব লুট হয়ে গেছে, কত ধর্ষিতা সিতারার আর্তনাদে রাতের ঘুমন্ত পাখিরা জেগে গেছে, কত সিতারার চোখের জল মিশে গেছে তরঙ্গমান বিপুল জলরাশির বঙ্গোপসাগরে, কত সিতারা মরেপচে আবার মাটির সঙ্গে মিশেও গিয়েছে, তাদের কবরেরও তো নাম-নিশানা নেই। মহাকাল কোন সিতারার নাম মনে রেখেছে? রাখেনি। কোটি কোটি সন্তান তার, ক’জনের কথা মনে রাখবে!

এই বৃত্তান্তের লেখক সিতারাবানুর হদিস তবে পেল কোথায়? সবিনয় উত্তর, এই প্রশ্ন অবান্তর। লেখক লিখছে সিতারাবানু নামের এক নারী উজানটেকে ছিল, অতএব ছিল। লেখক লিখছে তার স্বামী বাহার দরিয়ার মাঝি ছিল, অতএব ছিল। লেখক লিখছে বাসর রাতে তার স্বামীকে হার্মাদরা অপহরণ করেছিল, অতএব সত্যি সত্যি অপহরণ করেছিল। লেখক লিখছে সিতারাবানু এই বৃত্তান্তের সাক্ষী, অতএব সাক্ষী। সিতারাবানু কথিত এই বৃত্তান্ত পাঠের শুরুতে সিতারাবানু সম্পর্কিত এসব কথা সন্দেহাতীতভাবে সত্য বলে মেনে নিতে হবে। আচ্ছা, তা না হয় মেনে নেয়া গেল। কিন্তু সিতারাবানু উজানটেক কেন ছেড়েছিল? গ্রামটাতে কি দুর্ভিক্ষ লেগেছিল? ব্যাধির বীজ-ভরা কুঁজ নিয়ে ওলাবিবি ঝোলাবিবি মড়িবিবি হানা দিয়েছিল? নাকি বড় কোনো ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে অথবা সমুদ্রের সর্বগ্রাসী ভাঙনে গ্রামটা তলিয়ে গিয়েছিল? চার’শ বছর আগে বাংলায় এমন দুর্যোগ তো লেগেই থাকত।

না, উজানটেকে এসবের কিছুই ঘটে নি। উজানটেক বাংলার আর সব গ্রামের মতোই ছিল। আকাশ ছিল, মাটি ছিল, গাছবিরিখের ছায়া ছিল, ফুল পাখি কীট পতঙ্গ সবই ছিল―শুধু মানুষ ছিল না। দীর্ঘ সত্তুর বছরে একটা একটা করে জ্যান্ত মানুষ হারিয়ে গিয়েছিল। হারিয়ে তারা কোথায় গিয়েছিল তার কিছুই জানত না উজানটেকের মানুষ। সিতারাবানুও না। জানত শুধু এটুকু―মানুষটাকে হার্মাদরা ধরে নিয়ে গেছে, হাতের তালু ফুটো করে তার মধ্যে পাতলা বেত ঢুকিয়ে নৌকার খোলে গরু-মোষের মতো বেঁধে রেখেছে। অসহ্য যন্ত্রণায় তারা রক্তাক্ত হাত তুলে ফরিয়াদ জানিয়েছে―রহমত করো খোদা, কৃপা করো ভগবান। কিন্তু না, বঙ্গোপসাগরে তেলেসমাতি নৌকার অন্ধকার খোলে বন্দি সেসব নিপীড়িত মানুষের ফরিয়াদ খোদার কান পর্যন্ত পৌঁছে নি। ভগবানেরও কানেও না। দিনের পর দিন তারা কুকুর-বিড়ালের মতো নৌকার খোলে বন্দি থেকেছে, খিদে পেলে কুকুর-বিড়ালের মতোই ডাক-চিৎকার করেছে। হার্মাদরা উপর থেকে ছুঁড়ে দিয়েছে কিছু চাল অথবা কিছু খুদ অথবা পোকায় খাওয়া কিছু গম। যারা মরেছে তারা তো বেঁচে গেছে, মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে লড়তে…লড়তে লড়তে…লড়তে লড়তে যারা বেঁচে গেছে, দাস হিসেবে তাদের বেচে দেওয়া হয়েছে দাক্ষিণাত্যের বন্দরে বন্দরে ইংরেজ ফরাসি আর ওলান্দাজ সওদাগরদের কাছে। তারা আর কোনোদিন ফেরে নি।

সিতারাবানুর বাবাও ছিল না-ফেরাদের দলে। শ্রীচন্দ্র সওদাগরের ময়ূরপঙ্খী সওদাগরি ডিঙার মাঝি ছিল তার বাবা। শ্রীচন্দ্রের সঙ্গে একবার কোথাও গেলে দেড়-দু মাস আর খবর থাকত না। মস্ত বড় সওদাগর ছিল শ্রীচন্দ্র। বন্দরে বন্দরে ছিল তার কারবার। বাড়িতে বিশাল দোতলা দালান, চারদিকে ফুল-ফলের বাগান, ঘাঁটায় শান বাঁধানো মস্ত দিঘি। ঘাটে ঘাটে তার কত ডিঙা কত সুলুপ কত সাম্পান আর মাঠে মাঠে কত গরু মোষ ছাগল ভেড়া, তার কোনো লেখাজোখা ছিল না। স্বয়ং মা লক্ষ্মী তার ঘরে আসন পেতেছিলেন। কে জানে কি রাগ উঠল মায়ের, একদিন তিনি আসন গুটিয়ে নিলেন। আম-কাঁঠালের মৌসুম ছিল তখন, বাণিজ্য শেষে শাপলা বন্দর থেকে ময়ূরপঙ্খী ডিঙা ভাসিয়ে বাড়ি ফিরছিল শ্রীচন্দ্র। সমুদ্রে তখন পৌর্ণমাসীর জোয়ার। আনন্দের জোয়ার শ্রীচন্দ্রের মনে। ডিঙার আগে আগে ছুটছিল তার উতালা মন। উতলা স্ত্রী-সন্তানের জন্য। কতদিন দেখে না তাদের! বন্দরে যা কিছু ভালো লেগেছে তাদের জন্য কিনেছে। বউয়ের জন্য মসলিনের শাড়ি, সোনার হার ও রুপার আংটি। ছেলেমেয়েদের জন্য কিনেছে বাহারি কাপড়-চোপড় আর মজার সব খাবার। দাসী-বাঁদি আর পাড়াপড়শিদের জন্য কিনেছে ডজন ডজন তাঁতের শাড়ি।

বেমান সাগরে ভাসতে ভাসতে কালাপানির কাছে পৌঁছল তার ডিঙা। কালাপানি, সমুদ্র যেখানে ভয়ঙ্কর, ঢেউ যেখানে লাফিয়ে গলুইর ডগা ছোঁয়, যে স্থান পাড়ি দেয়ার সময় দুর্ধর্ষ মগ-ফিরিঙ্গিরাও ফরা ফরা গড গড বলে মুখে ফেনা তোলে। জয়কালী নাম নিয়ে কালাপানি পার হয়ে শ্রীচন্দ্রের ডিঙা যখন নয়াচরের বাঁকে পৌঁছে দিনের সূর্য তখন বিদায় নিচ্ছে, সোনারঙের সাজ বঙ্গোপসাগরের জলে, গাঙচিলেরা শেষ চক্করটি দিচ্ছে আকাশে। ঠিক তখন, সূর্যটা জলের তলে ডুব দিতেই দেখা গেল জলদানবের মতো হার্মাদদের পালতোলা মস্ত সেই তেলেসমাতি নৌকা। ভগবান! আঁতকে উঠল শ্রীচন্দ্র। জয়কালী জপতে জপতে ডিঙার মাঝিদের বলল, জোরে বাও। মাঝিরা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে দাঁড় বায়। কিন্তু হার্মাদদের তেলেসমাতি নৌকায় তো স্রোতের গতি। জলে-স্থলে তারা শক্তিমান। তাদের ভয়ে উপকূলীয় জনপদ থরথরিয়ে কাঁপে। তাদের বাহুবল আর অস্ত্রবলের কাছে মাঝিরা কোন ছার! চোখের পলকে ঘিরে ফেলল তারা শ্রীচন্দ্রের ডিঙা। শ্রীচন্দ্র বাঁচতে চেয়েছিল, সব কিছুর বিনিময়ে হলেও। কিন্তু হার্মাদরা তো ভোলে নি সেদিনের কথা, শাপলা বন্দরে যেদিন সওদাগরি নৌকার মাঝিরা তেরজন ফিরিঙ্গিকে দাঁড় দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছিল। প্রতিশোধের নেশায় উন্মাতাল এক হার্মাদের বন্দুকের গুলিতে উড়ে গেল শ্রীচন্দ্রের খুলি। তার বীভৎস মুখখানা দেখে ডিঙার দুজন মাঝি যমের কবল থেকে বাঁচতে ঝাঁপ দিল উত্তাল সাগরে। না, জোয়ারমত্ত সাগর কাউকে কোনোদিন ঠাঁই দেয় নি, তাদেরকেও দিল না―বিক্ষুব্ধ ঢেউ ভাসিয়ে নিল তাদের লাশ। বাকিরা বন্দি হলো। বন্দিদের মধ্যে ছিল সিতারার হতভাগ্য বাবাও। সবার মতো তারও হাতের তালু ফুটো করে বেত ঢুকিয়ে নৌকার খোলে বেঁধে রাখল। পরে কোথায় কোন দেশের কোন বন্দরে তাকে নিয়ে গেল উজানটেকের কেউ কোনোদিন সেই খবর পায় নি। সিতারাবানুও না।

পরে, স্বামীর আশা ছেড়ে সিতারার মা যখন সন্তানদের আগলে জীবনের নতুন বাঁকে পা দিল, বেহাল সংসারটা যখন আবার গুছিয়ে আনল, এক অমাবস্যার ভয়াল অন্ধকার রাতে, উজানটেকের মানুষেরা যখন নিশাঘুমে, হানা দিল দুরন্ত হার্মাদের দল। আক্রান্ত মানুষের হাঁকডাক উঠল চারদিকে। যে যেদিকে পারল পালিয়ে বাঁচল। যারা বাধা দিতে এল প্রাণ নিয়ে আর ফিরতে পারল না তারা। রাতভর মানুষের লাশের ওপর দিয়ে চলে লুটপাট, চলে ধর্ষণ, চলে অপহরণ। শেষরাতে হানা দিল সিতারাদের বাড়িতে। কিশোরী সিতারা চকির নিচে পালাল ভয়ে। দরজা ভেঙে মশাল হাতে ভেতরে ঢুকল হার্মাদের দল, সিন্ধুক ভেঙে মায়ের গয়নাগাটি যা ছিল সব লুটে নিল। ভাই দুটিকে ধরে উঠোনে নামিয়ে দড়ি দিয়ে দু-হাত পিঠমোড়া বাঁধল। রুখে দাঁড়াল তার মা। দেহে প্রাণ থাকতে সন্তানের কোনো ক্ষতি সে হতে দেবে না। হাতে তার ধারালো কুড়াল, চোখে সিংহিনীর তেজ। চিৎকার করতে করতে সে কুড়ালটা ঘোরায়। যেন এক সুদর্শন চক্র। পৃথিবীর সব অসুর বধ করার আগে যেন থামবে না সেটি। বন্দুকের বিরুদ্ধে তুচ্ছ কুড়াল দেখে মাথায় কালো ফেট্টি বাঁধা এক ফিরিঙ্গি অট্টহাসি দিল। হাসি থামার আগেই গর্জে উঠল তার হাতের বন্দুক। সারা গ্রাম কেঁপে উঠল, পাখিদের ঘুম ভেঙে গেল। যা বোঝার বুঝে গেল সিতারা, খাটের নিচে বসে দু-হাতে মুখ চেপে ধরে সে ফোঁপাতে লাগল। মশালের আলোয় তার দুই ভাই শেষবারের মতো মায়ের নিথর মুখখানার দিকে তাকিয়ে দেখল, মুক্তোর মতো দুটি অশ্রুবিন্দু দু’চোখের কোণ বয়ে গড়িয়ে পড়ছে।


কিন্তু খোদা তো নিষ্ঠুরতারও মালিক। নইলে বাসর রাতে মেহেদি রাঙানো হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে যখন ঘুমাচ্ছিল সুখশ্রমে ক্লান্ত সিতারা, শেষরাতে হার্মাদদের নিষ্ঠুরতা নামবে কেন?


তারপর তো সিতারা একা। অকূল দরিয়ার নিঃসঙ্গ বয়ারের মতো। একাকিত্ব মানুষকে স্বপ্নহীন করে তোলে। কিন্তু সিতারার বুকভরা স্বপ্ন ছিল―বেঁচে থাকার স্বপ্ন। তার নানা তাকে স্বপ্নটা দেখিয়েছিল, বীরবিক্রমে লড়ে হার্মাদের কবল থেকে যে নিজেকে তিন তিন বার রক্ষা করেছিল। মৃত্যুশয্যায় সে নাতনিকে বলেছিল, বুকে হিম্মত রাখ বোন। যার কেউ নেই তার খোদা আছে। তোকে আমি তার হাতে সোপর্দ করলাম। কিন্তু খোদা তো নিষ্ঠুরতারও মালিক। নইলে বাসর রাতে মেহেদি রাঙানো হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে যখন ঘুমাচ্ছিল সুখশ্রমে ক্লান্ত সিতারা, শেষরাতে হার্মাদদের নিষ্ঠুরতা নামবে কেন? ঘরে চাল ডাল ঘটিবাটি যা ছিল সব লুট হবে কেন? সিতারা আবারো চকির নিচে পালাল, কৈশোরে যেভাবে পালিয়ে রেহাই পেয়েছিল। অন্ধকারে সে স্বামীকে হাতড়ায়। স্বামী কাছে থাকলে কেউ তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। অথচ রেহাই সে পেল না। চন্দ্রক্ষয়ের সেই শেষরাত দেখেছে, গাছগাছালি কীট-পতঙ্গরাও দেখেছে, হার্মাদরা কী নিষ্ঠুরভাবে তার তলপেটে আদিম লাঙল চালিয়ে দিয়েছিল। কর্ষণ করতে করতে যখন তাকে জীবন-মৃত্যুর সীমান্তে নিয়ে গেল তখন স্বপ্নটা জেগে উঠল তার―বেঁচে থাকতে হবে। তার নানা বুঝি কবর থেকে ইশারায় তাকে বলেছিল, বেঁচে থাকার চেয়ে সত্য পৃথিবীতে কিছু নাই সিতারা। তাই বেঁচে থাকার জন্য সে দম বন্ধ করে রাখে, চোখ বন্ধ করে রাখে, বুকের ওঠা-নামাও বন্ধ করে রাখে। তাকে মৃত ভেবে হার্মাদরা তার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল। সে শুনতে পাচ্ছিল তার আর্তনাদ। সিতারা সিতারা বলে করুণকণ্ঠে চিৎকার করছিল তার হতভাগ্য খসম। সে জবাব দিতে চেয়েছিল, জীবনের শেষ দেখা দেখবার জন্য তার কাছে ছুটে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পারে নি। কারণ বেঁচে থাকার চেয়ে সত্য যে পৃথিবীতে কিছু নেই!

দশ মাসের বেশিও হতে পারে, কমও হতে পারে, অথবা ঠিক ঠিক দশ মাস দশ দিনও হতে পারে―একদিন আশ্চর্য সুন্দর এক সন্তানের জন্ম দিল সিতারা। চোখা নাক, লম্বা চিবুক আর চওড়া কপাল দেখে সে নিশ্চিত হতে পেরেছিল এই শিশুপুত্র তার স্বামীরই ঔরসজাত। কোনোদিন চোখের আড়াল হতে দেয় নি তাকে। যদি হারিয়ে যায় বাবার মতো! যদি হার্মাদরা অপহরণ করে দূরের বন্দরে বেচতে নিয়ে যায়! পুত্রকে আগলে রেখে সাতটি বছর সে স্বামীর প্রতীক্ষা করেছে। কত রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে, এই বুঝি উঠানে তার পায়ের আওয়াজ শোনা গেল! কতদিন সাগরতীরে দাঁড়িয়ে থেকেছে, এই বুঝি তাকে নিয়ে কূলে ভিড়ল কোনো নৌকা। ঘাটে কোনো নৌকা ভিড়লে মাঝি-মাল্লাদের জিজ্ঞেস করেছে তার বাবার দেখা কেউ পেয়েছে কিনা, তার ভাই দুটি কোথায় কেউ জানে কিনা, তার ছেলের বাবা কোনোদিন আর ফিরবে কিনা। না, সিতারার বাবা ফেরে নি, ভাইয়েরাও ফেরে নি, স্বামীও ফিরল না আর। ততদিনে হার্মাদদের অত্যাচারে উজানটেক প্রায় উজাড়। মানুষ দলে দলে উত্তরে চলে গেছে। মাটির মায়া যাদের বুকটা দখল করে রেখেছিল তারা যায় নি। যেমন সিতারা। সবাই চলে যাক, কোনোদিনও সে স্বামীর ভিটা ছাড়বে না―স্থির সংকল্প ছিল তার। মন বলছিল নিশ্চয়ই কোনো একদিন ফিরবে তার স্বামী। ফিরে যদি তাকে না পায়! কিন্তু না, শেষ পর্যন্ত তাকেও গ্রাম ছাড়তে হলো। ভয়ঙ্কর এক দুঃস্বপ্ন তাড়া করতে করতে তাকে গ্রামছাড়া করল। বৃষ্টিমুখর এক মধ্যরাতে সে স্বপ্নে দেখল তার শিশুপুত্রকে সাগরের মস্ত এক কুমির গিলে ফেলেছে, বড়পীরকে যেভাবে গিলেছিল। দুঃস্বপ্নের তাড়নায় অথবা ঠাটার শব্দে তার ঘুম ভাঙে। কুপি জ্বালিয়ে দেখে ধসে পড়ার প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতে ক্লান্ত চালাটার একদিক বৃষ্টির তোড়ে ধসে গেছে। পৃথিবীর সব বিপন্নতা ভর করে তার ওপর, জল ও স্থল একাকারকারী ঝড় ঢুকে পড়ে তার বুকের ভেতর। সে থরথর করে কাঁপে, পুত্রকে বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদে। তার মন, নাকি কবর থেকে তার নানা কানে কানে তখন বলে, পালা সিতারা, পালিয়ে যা।

ভোরে বৃষ্টি থামলে পরে সে পালায়, শেষ সম্বল রুপার একজোড়া কানের দুল শাড়ির আঁচলে বেঁধে, এক হাতে একটা পুঁটলি আর অন্যহাতে শিশুপুত্রের তর্জনী ধরে। হাঁটতে হাঁটতে দেখে, রাস্তার দু-ধারে নিষ্প্রাণ পাখিরা চিৎ হয়ে পড়ে আছে। হাজার হাজার পাখি। শিলাবৃষ্টিতে পাখিদের এমন করুণ মৃত্যু সে কোনোদিন দেখে নি। তার বুকে মাতৃশোক জাগে। পুঁটলিটা নামিয়ে রাস্তার ধারে বসে মাটি চাপড়ে সে বিলাপ শুরু করে। মায়ের কান্না দেখে ছেলেটাও কাঁদে। ছেলের কান্নার শব্দ রাতে দেখা দুঃস্বপ্নটার কথা আবার মনে করিয়ে দেয় তাকে। বিলাপ থামিয়ে সে আবার হাঁটা ধরে। হাঁটতে থাকে বাবা মা ভাই আর স্বামীর স্মৃতিঘেরা উজানটেক পেছনে ফেলে। পুবের সূর্য পশ্চিমে গড়ায়, তবু তার হাঁটা থামে না। তারপর তো কেটে গেল চার’শ বছর। ফিরিঙ্গিরা ফিরে গেল নিজেদের দেশে, ফিরে গেল কোম্পানির সৈন্যরাও। শাপলা বন্দরে কত শত ডিঙা ভিড়ল, আকাশে কত হাজার বার সূর্য উঠল, কত চাঁদ আলোর বন্যায় উজানটেক ভাসিয়ে দিল, কত কোটি বার তারারা জাগল, বঙ্গোপসাগরে কত লক্ষ বার জোয়ার-ভাটা হলো, কত ফুল ফুটল, কত পাখি জন্মে আবার মরেও গেল―মরল না শুধু সিতারাবানু। হয়তো মরেছে। মরে আবার জন্ম নিয়েছে। হয়তো সে জাতিস্মর, জন্ম-মৃত্যুর পাকে সে ঘুরপাক খাচ্ছে। নইলে বাংলার পথে-ঘাটে তার বিলাপ এখনো শোনা যাবে কেন? মৃত মানুষ কি বিলাপ করতে পারে! প্রতীক্ষায় এখনো কে দাঁড়িয়ে বঙ্গোপসাগরের তীরে? মৃত মানুষ কি কারো প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে! মরেই যদি যেত সিতারা, কী করে হলো তবে এই বৃত্তান্তের কথক?

অতএব বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গমালা সাক্ষী, সিতারাবানু মরে নি। এই বৃত্তান্ত সাক্ষী, ইতিহাস কখনো মরে না।

২য় পর্বের লিংক
স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)