হোম গদ্য উপন্যাস শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা
635
0

৬ষ্ঠ পর্বের লিংক

পর্ব-৭

.
আবার লেগে পড়ল তালেব। পড়ারই কথা। এ এক কঠিন চক্কর। প্রাচীন গুহার মতো। ঢোকার পথ আছে, কিন্তু বেরুবার পথ নেই। এই চক্করে পড়ে গ্রামের কোন লোকটা বেরুতে পেরেছে? গণ্ডায় গণ্ডায় মামলা খায়, বছরে দু-তিন বার জেলে ঢোকে, কিভাবে আবার ছাড়াও পায়। একদিকে মামলা চলে, অন্যদিকে স্মাগলিং চলে। তবে আগের মতো আর রাত জাগতে হয় না তাকে, সীমান্তও পাড়ি দিতে হয় না, এবার তার লাইন আলাদা। আন্তঃজেলা বাসের ইঞ্জিনের পাশে গোপন বাকশোটায় মালগুলো লোড করে দেয় বেগাররা, সে যাত্রীবেশে পায়ের ওপর পা তুলে আরাম করে সিটে বসে থাকে। ভোরে রওনা হয়ে বাস সকাল সাড়ে নটার মধ্যে চট্টগ্রামের কদমতলী স্টেশনে পৌঁছায়। সেখানে চক্করের লোকেরা তার অপেক্ষায় থাকে। মওকা বুঝে বাস থেকে মালগুলো খালাস করে টেক্সিতে তুলে জায়গামতো পৌঁছে দেয়। ব্যাস, তার দায় শেষ। নগদে পেয়ে গেল পাঁচ শ টাকা। মাসে ঠিকঠাক মতো পনের দিন ক্ষেপ মারতে পারলে নগদানগদি পনের হাজার টাকা খাড়া। খায়খর্চা ও যাতায়াত ভাড়া বাদ দিয়ে আট হাজার থাকে। মামলার খরচ চালিয়ে, সংসারে টুকটাক খরচ করার পরও কিছু বাঁচে। কিন্তু ঐ যে পৃথিবীর চিরায়ত নিয়ম, দিন কখনো অপরিবর্তিত থাকে না। তার দিনগুলোও অপরিবর্তিত থাকল না। এবার বলতে গেলে তার জীবনে ঘোরতর তুফান শুরু হলো। কদমতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে মাল নিয়ে জায়গামতো যাওয়ার সময় বহদ্দার হাটের কাছে একেবারে হাতেনাতে র‌্যাবের হাতে। ভেবেছিল এবার বুঝি আর প্রাণটাও রক্ষা পাবে না। র‌্যাব কাউকে ধরলে ক্রসফায়ারে না দিয়ে ছাড়ে! কপাল ভালো তার, দুদিন জিজ্ঞাসাবাদ করে র‌্যাব তাকে থানায় সোপর্দ করে দিল। আজরাইলের কবল থেকে এই যাত্রায় সে বেঁচে গেল।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকতেই হায়দর আলীর সঙ্গে তার পরিচয়। কালুরঘাটে ইয়াবাসহ র‌্যাবের হাতে ধরা খেয়ে পাঁচ মাস ধরে হায়দর জেলে। চেহারায় এক ধরনের গুণ্ডা গুণ্ডা ভাব, হাসিটাও কুৎসিত, কথাবার্তায় কাঠখোট্টা। গাঁজা খেয়ে রাতভর মড়ার মতো পড়ে থাকে, দিনে কয়েদিদের সঙ্গে বসে বসে দাবা খেলে। তবু, কয়েকদিন মেশার পর, লোক হিসেবে তাকে তেমন খারাপ বলে মনে হলো না তালেবের। ফেনসিডিলের কারবার করতে গিয়ে বহু গুণ্ডা মাস্তানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। শহরের ছিঁচকে চোর থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক ক্যাডারের নম্বর তার মোবাইলে সেভ আছে। লিখতে-পড়তে না জানলে কি হবে, মোবাইল নম্বর খুঁজে পেতে তার তেমন কোনো অসুবিধা হয় না। তার মনে হয় হায়দর লোকটার ভেতরে সত্যিকারের একটা ভালো মানুষ আছে, নইলে তার সঙ্গে এমন মিঠা মিঠা কথা বলে কেন। বলে যে, চিন্তার কিছু নেই, শিগগির সে জামিন পেয়ে যাবে। কিন্তু ছাড়া পেয়ে আবার যেন স্মাগলিং শুরু না করে। ভালো মানুষ স্মাগলিং করে না। সেও জীবনে কোনোদিন আর স্মাগলিং করবে না। কথাগুলো মনে ধরে তালেবের। ঠিকই তো, ভালো মানুষ কি স্মাগলিং করে? মনে মনে সংকল্প করে, নাহ্, অনেক হয়েছে, এই পথে কোনো দিন আর পা বাড়াবে না। কিন্তু সংকল্পে বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারে না। তার দ্বিতীয় সত্তা তাকে প্রশ্ন করে, স্মাগলিং না করে খাবে কি তালেব? পৃথিবীতে মানুষ যেসব কাজ করে তার কিছুই তো তুমি শেখো নি। মঈনের মতো একটা দোকান দেবে সেই পুঁজিও তো তোমার নেই। মাটি কাটবে, শরীরে সেই শক্তিও তো নেই। তোমার জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে তো কেউ মাইট্যাল ছিল না, তুমি মাটি কাটতে গেলে বংশের মান-ইজ্জত কিছু থাকবে? করার মতো কাজ তো জানো শুধু একটাই, স্মাগলিং।


দুই-চাইর বছর বাদে দেশত ফিরিয়ারে কদিন নয় জেল খাডিলাই। তারপর বড় একটা উকিল ধরিয়ারে হাইকোর্টেত্তুন জামিন লই লইবা। ব্যাস, মামলা খতম! বাংলাদেশের মামলা, ন বুঝ? হে হে হে।


হায়দর বলে, টেঁয়াপইসা কিছু জমাইছনি বদ্দা, নাকি ঠুণ্ডা বটগাছ?
খুব বেশি না, তালেব বলে, কিছু টাকা সুদের ওপর তোলা আছে। এতদিনে সুদে-আসলে ষাট-সত্তুর হাজার হবে হয়তো।
এইয়েনা এক্কান বুদ্দিমানের কাম গইজ্জ। হুনো, আঁই এক্কান নতুন কাম ফাই, জেলেত্তুন বাইর অইয়ারে শুরু কইজ্জুম। দেশে থাইয়ারে কনো লাভ নাই, বুইজ্জ না। তোঁয়ারে আঁই মালইশিয়া ফাডাইদি, কী কও?
কী যে বলেন ভাই! রসিকতা মনে করে তালেব হাসে।
কী কই? আঁর কতা তোঁয়ার বিশ্বাস ন অর? ঠাট্টা ন গরিয়ের, কতা কিন্তু হাঁছা। তুঁই যাইবা নি খালি কও।
চোখেমুখে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল নিয়ে হায়দরের চোখের দিকে তাকায় তালেব। চোখ দেখে তার ভেতরটা বোঝার চেষ্টা করে। সত্যি তাকে মালয়েশিয়া পাঠিয়ে দিতে পারবে সে? নাকি গুল মারছে? নাহ, তার চোখ দেখে মনে হয় না গুল মারছে। তাকে খুব আপনজন মনে হয় তার। কারণ সে তার মনের কথাটিই বলেছে। কদিন ধরে সেও বিদেশের কথা ভাবছিল। দেশের প্রতি মন উঠে গেছে তার। এসব মামলা-মোকদ্দমা কোর্ট-কাচারি আর ভালো লাগছে না। দেশে থাকলে সারা জীবন চোর-ডাকাতের মতো মামলার ঘানিই টেনে যেতে হবে। সে পালিয়ে যেতে চায়। পালিয়ে এসব ঝামেলা থেকে বাঁচতে চায়।

কিন্তু ভাই, এত টাকা আমি পাব কই। মালয়েশিয়া যেতে তো মেলা টাকা লাগে।
ওমা! তুঁই না কইলা জমা টেঁয়া কিছু আছে।
তা আছে। কিন্তু ষাট-সত্তুর হাজার টাকায় কি মালয়েশিয়া যাওয়া যায়?
ঐ চিন্তা আঁর উপরে ছাড়ি দ্যাও। জাহাজত গরিয়ারে মালইশিয়া যাইতে এত্তুন বেশি লাগিবদে কিয়ল্লাই?
তার মানে চোরাইপথে?
ধুর মিয়া! চোরাইপথ আবার কী? পথ কি চোরাই হয়? পথের কোথাও লেখা থাকে এটা চোরাইপথ ওটা ডাকাতি পথ? ঠিকঠাক মতো তুঁই জায়গামতো যাইত পাল্লিই তো হইল, নাকি?
তালেব মাথা দোলায়। হোক চোরাইপথে, সে যেতে রাজি। চোরাইপথে মানুষ কি বিদেশ যাচ্ছে না? জাদুর কাঠির নাগাল পেতে যে-যেভাবে পারছে দেশ ছাড়ছে, ছড়িয়ে পড়ছে গোটা দুনিয়ায়। তাদের পাশের গ্রামের এক কলেজছাত্র, দেশে ফেরার পর সড়ক দুর্ঘটনায় তার নিহত ভাইয়ের পাসপোর্টে নিজের ছবি বসিয়ে দিব্বি দুবাই চলে গেছে। গ্রামের হাজীবাড়ির অনেকে ওমরাভিসায় সৌদি আরব গিয়ে দু-হাতে টাকা কামাই করে দেশে পাঠাচ্ছে। শুধু দুবাই-সৌদি কেন, অবৈধভাবে বাঙালিরা তো লন্ডন আমেরিকা গ্রিস তুরস্কও চলে যাচ্ছে। কিন্তু বিদেশ চলে গেলে তার মামলার কী গতি হবে! নিয়মিত হাজিরা না দিলে তো শাস্তি হয়ে যাবে পরে। হায়দর বলে, খেতা পুরো ত ভাই ঐসব মামলার। টেঁয়া থাইলে এ্যান মামলার হুতাও ন থায়, বুইজ্জ না? ডান হাতের বুড়ো আঙুলের সঙ্গে তর্জনি ঘষতে ঘষতে হায়দর ভুরু নাচায়, সবই টেঁয়ার খেলা বুঝলা ভাই। বিদেশ যাইয়ারে শতে শতে টেঁয়া কামাইবা, দুই-চাইর বছর বাদে দেশত ফিরিয়ারে কদিন নয় জেল খাডিলাই। তারপর বড় একটা উকিল ধরিয়ারে হাইকোর্টেত্তুন জামিন লই লইবা। ব্যাস, মামলা খতম! বাংলাদেশের মামলা, ন বুঝ? হে হে হে।

ছাড়া পেতে তালেবের প্রায় এগারো মাস লেগে গেল। তার আগেই হায়দর জামিনে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার সময় তাকে একটা ফোন নম্বর দিয়ে বলেছে জেল থেকে বেরিয়ে যেন এই নম্বরে যোগাযোগ করে। এত বড় সুযোগ হেলায় হাতছাড়া করতে চাইল না তালেব, ছাড়া পেয়ে প্রথমেই হায়দরের সঙ্গে দেখা করল। পরবর্তী পাঁচ মাসে তিন-তিন বার চট্টগ্রাম এসে কথাবার্তা সব পাকাপাকি করে শেষবার তার হাতে তুলে দিল নগদ পঁচাত্তর হাজার টাকা। তারও দেড় মাস পর একদিন হায়দর তাকে মালয়েশিয়া যাত্রার দিন-তারিখ জানিয়ে দিল। আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাত্রা করল তালেব, তাকে এগিয়ে দিতে সঙ্গী হলো বন্ধু মঈনউদ্দিন। তাকে জাহাজে তুলে দিয়ে তারপর বাড়ি ফিরবে মঈন। তা ছাড়া কোনোদিন সে সমুদ্র দেখে নি, এই সুযোগে কক্সবাজার ঘুরে আসা যাবে। হায়দরের তত্ত্বাবধানে রাতটা চট্টগ্রাম শহরের এক হোটেলে কাটিয়ে পরদিন ভোরে যথারীতি তার সঙ্গেই কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হলো দুজন। সঙ্গে আরো একজন, মাওলানা জুলফিকার। মাথায় ধোপদুরস্ত সাদা পাগড়ি, কপালে গভীর এবাদতে মশগুল মুসল্লির কালো দাগ, গায়ে সাদা লম্বা জোব্বা এবং টাখনু গিরার উপরে পরা সাদা পায়জামা। চোরাইপথে এমন একজন মাওলানা মালয়েশিয়া যাচ্ছে, প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারে নি তালেব, জুলফিকারের মুখ থেকে শুনলে পরে তার কুঁকড়ে থাকা বুকটা বড় হয়ে গেল। চেহারায় মনমরা যে ভাবটা ছিল, উবে গেল। কিন্তু খটকা লাগল টেকনাফ পৌঁছে। সে ভেবেছিল কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কোথাও বুঝি জাহাজ অপেক্ষমাণ। কক্সবাজার পৌঁছে হায়দরের কাছ থেকে জানল জাহাজ ছাড়বে আসলে টেকনাফ থেকে। অথচ টেকনাফ পৌঁছে জানল জাহাজ আরো দূরে, সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে গভীর সমুদ্রে। শাহপরীর জেটিঘাট থেকে ট্রলারে চড়ে জাহাজ ধরতে হবে।


হায়দর তার মুখ চেপে ধরে ঘাড়ে প্রচণ্ড একটা ঘুষি মেরে বলল, খবদ্দার, চিক্কুর ন দিবি। গুলি গরিয়ারে জাগাত ডেরাই ফেলামু বাইঞ্চোত।


তালেবের মনে কোথা থেকে সন্দেহের একটা বিন্দু টুপ করে পড়ে টলমল করতে লাগল। কথা এত ঘুরাচ্ছে কেন হায়দর? প্রথমেই তো জাহাজের সঠিক অবস্থান জানিয়ে দিতে পারত। সব কিছুই তো এখন তার হাতে, সে-ই তো একমাত্র ভরসা। তাকে সে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস না করলে কোনো সাক্ষী-সাবুদ ছাড়া শুধু মুখের কথায় এতগুলো টাকা দিত না। সন্দেহের বিন্দুটা সিন্ধুতে রূপান্তরিত হয় শাহপরীর জেটিঘাটে। তখন শেষ বিকেল, নাফ নদীতে ভরা জোয়ার, সৈকতে পর্যটকদের ভিড়। সবার আগে হায়দর, তার পেছনে মাওলানা জুলফিকার, তারও পেছনে মঈন আর তালেব। টেকনাফে মঈনকে বিদায় দিতে চেয়েছিল তালেব, কিন্তু সে জেটিঘাট পর্যন্ত যেতে চাইল। বন্ধুকে ট্রলারে তুলে দিয়ে তারপর সে বাড়ির উদ্দেশে রাওনা দেবে। ততক্ষণে আবার রাত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় একইসঙ্গে দোনোমনায়ও ভুগতে লাগল। অজানা-অচেনা জায়গা, রাতে থাকবে কোথায়। অভয় দিল হায়দর, টেকনাফে হোটেলের অভাব নেই। কম টাকায় থাকার মতো ভালো হোটেল আছে। সব ব্যবস্থা সে-ই করে দেবে। জীবনে আবার কোনোদিন টেকনাফ আসতে পারবে তার তো কোনো ঠিক নেই। দেখার মতো জায়গা জেটিঘাট, এসেছে যখন দেখেই যাক। জেটিঘাট পৌঁছে জীবনে প্রথমবারের মতো এত বিশাল নদী দেখে মনটা কেমন যেন হয়ে গেল তালেবের। এমন বিশালতার সামনে সে কখনো দাঁড়ায় নি। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত নদী, দক্ষিণে আকাশের সঙ্গে মিশে যাওয়া বিশাল সাগর। এত বিশাল সাগর তাকে পাড়ি দিতে হবে! তার ভয় ভয় করে, পা-দুটো কেমন অবশ অবশ লাগে, যেমন অবশ লেগেছিল র‌্যাবের হাতে আটক হওয়ার দিন সকালে বাড়ি থেকে বাসস্টেশনে যাওয়ার পথে। চেহারায় অজানা এক উদ্বেগের ছাপ ভেসে ওঠে। চেহারা দেখেই বুঝি তার মনের কথা টের পায় হায়দর। পিঠ চাপড়ে বলে, তুঁই ডরদ্দে না বদ্দা? ন ডরাইও। জীবনে বড় অইতে গেলে বড় বড় রিস্ক নেয়া লাগে। তুঁই তো জাহাজে চড়িয়ারে যাইবা। ন হুনো, যারা গিরিসে যায় তারা ত সাগর হাঁছুরি যায়। আঁই মিছা কইলে মোলইসাবেত্তুন পুছাল্ল। কী কন মৌলইসাব? জুলফিকার হালকা কাশে। খাকারি দিয়ে গলায় জমে থাকা কফ পরিষ্কার করে বলে, মৌলবি না ভাই, মাওলানা। মাওলানা মোহাম্মদ জুলফিকার আলী।
ঐ একই কথা। হে হে হে।
তালেব বলল, আপনি আছেন না ভাই, চিন্তা কিসের!
সবার আগে আল্লাহ আছেন। যেন নিজেকেই বলল জুলফিকার।

বাতাসের দাপাদাপি, মাঝিদের ডাকাডাকি, পর্যটকদের হৈচৈ আর ঢেউয়ের দূরাগত শব্দ উজিয়ে তারা জেটিঘাটে পৌঁছে। কোস্টগার্ড কি নৌবাহিনীর একটা জাহাজ সাইরেন বাজিয়ে উজানে ছুটছে। স্মৃতিভরা দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে জুলফিকার। ঠিক এমন একটি সাদা জাহাজে চড়িয়ে তাকে গুয়ান্তানামো বে কারাগারে নেওয়া হয়েছিল, মনে পড়ে তার। সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসে―ইয়া মাবুদ! সূর্য আড়াল হলো। তবে আঁধার তখনো নামে নি। নদীর ওপার থেকে দাঁড় বাইতে বাইতে এপারে আসছে আঁধার। ঘাটে নোঙর করা একটা ট্রলারের দিকে এগিয়ে গেল তারা। গলুইর কাছে দাঁড়িয়ে তিনটা লোক বিড়ি ফুঁকছে। পান-জর্দার গাদ জমে যাওয়া কুৎসিত দাঁত প্রত্যেকের। পরনে লুঙ্গি, গায়ে হাফহাতা শার্ট, চেহারায় উদ্বেগ। হয়তো ট্রলারের মাঝি, আন্দাজ করে তালেব। হায়দরের উদ্দেশে একজন বলল, এত দেরি গরিলা বদ্দা, ইবা ক্যান কথা! হায়দর তার আঞ্চলিক ভাষায় কী উত্তর দিল ঠিক বুঝে উঠতে পারল না তালেব। জুলফিকারও না। তবে তাদের কেলানো হাসি দেখে বুঝল তারা বেশ আনন্দিত। মাথায় গামছাবাঁধা লোকটার ডান হাতের কব্জি নেই, উপরের পাটির একটা দাঁতও নেই। ফোঁকড় দিয়ে সে বিড়ির ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, তুঁই তো দেখি বদ্দা ডঁর সেয়ানা! হায়দর আলী হাসে। কে জানে কেন, তার হাসি অস্বাভাবিক ঠেকে তালেবের। জেলে প্রথম তার গুণ্ডা মার্কা চেহারাটা দেখে মনে যে ভয় জেগেছিল সেই ভয় এখন আবার চাড়া দিয়ে উঠতে লাগল। ভুরু কুঁচকে সে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সন্দেহের বিন্দুটা ধীরে ধীরে প্রসারিত হতে থাকে। ঠিক তখনই ঝাঁঝালো গলায় হায়দর বলল, বেকুবের মতো মুখের মুই চাই রইঅদে কিয়ল্লাই, তরা গরিয়ারে নুকায় উডো মিয়া। জুলফিকার ততক্ষণে ট্রলারের পাটায় মাথার পাগড়িটা বিছিয়ে শোকরানার নামাজে দাঁড়িয়ে গেছে। সেজদা দিচ্ছে উত্তর দিকে। মানে দিক হারিয়ে ফেলেছে। দেখে মাঝিরা হাসাহাসি করছে, কিন্তু মুখে কিছু বলছে না। তখনই ঘটে গেল ঘটনাটা। মঈনের সঙ্গে কোলাকুলি করে তালেব ট্রলারে উঠে গেলে মঈন যখন তার উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছিল ঠিক তখনই আচমকা পেছন থেকে হায়দর তার কাঁধে ধাক্কা মেরে বলল, তুঁই কডে যদ্দে?
মঈন ভাবল হায়দর বুঝি দুষ্টুমি করে তাকে ধাক্কা দিয়েছে। মুচকি হেসে বলল, টেকনাফ গিয়া দেখি বাস পাই কিনা।
হায়দর বলল, টেকনাফ আর যন ন পড়িব, তরা গরিয়ারে নুকায় উঠি পড়।
বুঝলাম না!
তার কাঁধে আবারো ধাক্কা দিল হায়দর, ওঠ ব্যাটা, কম মাত।
আশ্চর্য! আমি কেন উঠব?
তুই উডিবা ন তই তোর বাপ উড়িবদে মুগ্গার পো?
আরে! গালি দিচ্ছেন কেন? মঈনের চোখে-মুখে বিস্ময়।
গালি দিইয়ুম না তই আদর গরমু শালা! কতা না বাড়াইয়ারে উঠি পড়।

বাতাসের শব্দে তাদের কথপোকথন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল না তালেব। কোমরের বেল্টের ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে, হাতকড়া পরানোর আগে দাগি আসামিকে পুলিশ যেভাবে ধরে, মঈনকে হায়দর ট্রলারের দিকে টেনে আনতে দেখে বিস্ময়ে সে হাঁক দিল―কী হলো মঈন? বন্ধুর গলা শুনে মঈন জোরে একটা চিৎকার দিল। হায়দর তার মুখ চেপে ধরে ঘাড়ে প্রচণ্ড একটা ঘুষি মেরে বলল, খবদ্দার, চিক্কুর ন দিবি। গুলি গরিয়ারে জাগাত ডেরাই ফেলামু বাইঞ্চোত।

৮ম পর্বের লিংক

স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)