হোম গদ্য উপন্যাস শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা
438
0

৪র্থ পর্বের লিংক

পর্ব-৫

প্রচণ্ড খিদায় বুকের খাঁচা থেকে যখন প্রাণপাখিটা উড়াল দেয় দেয় করছিল তখন তাকে খেতে দেওয়া হলো এক বাটি মাংস। সুস্বাদু গরুর গোস্ত মনে করে সে গোগ্রাসে গিলল। খাওয়া শেষ হলে সৈনিকটি পাহাড়ের নির্জন গুহায় গুপ্তজ্ঞান সাধনারত জাদুকরের মতো হাসতে শুরু করল। হাসির কারণ বুঝে উঠতে পারে না জুলফিকার, অবোধ শিশুর মতো তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বুঝতে পারল দুদিন পর, যেদিন তার হাতে-পায়ে পরিয়ে দেওয়া হলো লোহার শিকল, গলায় ডাণ্ডাবেড়ি ও মাথায় লোহার ভারী ক্যাপ এবং যেদিন তাকে খেতে দেওয়া হলো এক বাটি কুকুরের মাংস। ঘৃণায় সে মুখ ফিরিয়ে নিল। সৈনিকটি তার দুর্বোধ্য ইংরেজি ভাষায় হাসতে হাসতে বলল, যার অনুবাদ করলে এই দাঁড়ায়, খাবে খাবে। সেদিনের শূকরের মাংসের মতো আজও খাবে।

না, বহু চেষ্টা করেও শরিয়ত যে প্রাণীর মাংস হারাম ঘোষণা করেছে, যে প্রাণী ঘরে ঢুকলে সাতদিন ঘর নাপাক থাকে, তার মাংস মুখে তুলতে পারল না জুলফিকার। ‘ইট বাস্টার্ড ইট’ বলে সৈনিকটি তার তলপেটে প্রচণ্ড লাথি মারল। কুকুরের মতো সে কঁকিয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে দুই সৈনিক এসে গলা ধাক্কাতে ধাক্কাতে ছোট্ট একটা লোহার খাঁচায় ঢোকাল তাকে, দড়ি দিয়ে দু-হাত পিছমোড়া বেঁধে পায়ের উপর বসিয়ে রাখল টানা আট দিন। আত্মহত্যাকারীদের ঘৃণা করত জুলফিকার। পাকিস্তান থেকে শেষবার যখন দেশে ফিরল তার গ্রামের এক ছেলে বিষপানে আত্মহত্যা করেছিল। জুলফিকার ফতোয়া জারি করেছিল তাকে যেন মুসলমানদের গোরস্তানে দাফন করা না হয়। কেননা জাহান্নাম তার জন্য নির্দিষ্ট হয়ে গেছে, সিজ্জিনের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে সে অনন্তকাল বিষপান করতে থাকবে, কবরে তার আযাব দেখে অন্য মুর্দারা কষ্ট পাবে। অথচ সেদিন, লোহার খাঁচায় বন্দিত্বের পঞ্চম দিন, নিজের পায়খানা-পেশাবের ওপর বসে থাকতে থাকতে, সাত তবক আসমানের উপর থেকে খোদার রহমতের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে নিরাশ হয়ে জীবনের প্রতি তার এমনই বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছিল, পারলে সেও আত্মহত্যা করত।


শাস্ত্রপ্রোক্ত হুরের মতো সেই জেনানা তার বেলুনের মতো স্তন দুটি জুলফিকারের মুখের সামনে ঝুলিয়ে ধরল। লজ্জায় চোখ বুজল সে।


নির্যাতনের কত না কায়দা তাদের―শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে জুলফিকার বলে। একদিন তাকে নেংটো করে হাত দুটো বেঁধে আলো-অন্ধকার একটা কুঠুরিতে শুইয়ে দেওয়া হলো। মাহমুদার চেয়ে শতগুণ সুন্দরী এক রমণীকে তার দিকে সে এগিয়ে আসতে দেখল। পরনে সুতাটি পর্যন্ত নেই। কোমরটি কলসির সরু কাঁধি এবং নিতম্ব দুটি পাকা তরমুজের মতো। শাস্ত্রপ্রোক্ত হুরের মতো সেই জেনানা তার বেলুনের মতো স্তন দুটি জুলফিকারের মুখের সামনে ঝুলিয়ে ধরল। লজ্জায় চোখ বুজল সে। চোখ বোজার শাস্তি যদি আগাম জানত, যতক্ষণ পারত পলক না ফেলে ওই কামাতুর রমণীর দিকে তাকিয়ে থাকত।

চোখে লোহার সুঁচালো কাঁটার খোঁচা খেয়ে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে সে চোখ মেলার চেষ্টা করল। পারল না। কিন্তু পারতেই হবে, নইলে আবারও নেমে আসবে আজরাইলের ভয়ঙ্কর নখ। বাতাসে ঝিরিঝিরি কম্পমান পাতার মতো ঘন ঘন পলক ফেলতে ফেলতে সে চোখ দুটি মেলে রাখার চেষ্টা করল। তাকে উত্তেজিত করার জন্য রমণীটির আদিম অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি চলতে থাকে। জুলফিকার তো তখন কালহাশরের পচা-গলা পুঁজের নদীতে সাঁতার কাটছে। কখন, কোথায়, কতদিন আগে অথবা জীবনে একবারও যৌনতাড়নায় তার লিঙ্গ উত্থিত হয়েছিল কিনা সে মনে করতে পারে না, উত্তেজিত সে হবে কেমন করে! তাকে উত্তেজিত করে তোলার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ায় রমণীটি ক্ষুধার্ত সিংহিনীর মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, কামড়ে কামড়ে জোঁকের মতো কুঁচকে থাকা তার লিঙ্গটি রক্তাক্ত করে দিল। শেষে তাকে বাধ্য করল রমণীটির যৌনাঙ্গ লেহনে। বিস্বাদ নোনা মাংস লেহন করতে করতে হাজার বছরের ক্লান্তি যখন তার শরীরে এসে ভর করল তখন সে অচেতন হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। পড়ে থাকল ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

জীবনে কোনোদিন আর জেহাদের নাম মুখে না আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিন বছর পর গুয়ান্তানামোর মৃত্যুকূপ থেকে ছাড়া পেয়ে পাকিস্তানে ফিরল জুলফিকার। জেহাদের শখ তার চিরতরে মিটে গেছে। শুধু আফগানে কেন, কার্পেট বোমা মেরে কাফেরেরা সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ধ্বংস করে দিলে, পুরুষদের ধরে ধরে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করিয়ে মাথার খুলি উড়িয়ে দিলে, নারীদের গলায় পা দিয়ে ধারালো ছুরির এক টানে জরায়ু ছিড়ে গর্ভের শিশুটা বের করে আনলেও সে জেহাদ শব্দটি কখনো মুখে আনবে না। এক টেক্সটাইল মিলে অল্প টাকা বেতনের চাকরি নিয়ে জীবনের বাস্তবতায় ডুব দিয়ে অতীতকে সে ভুলে যেতে চাইল। কিন্তু কে জানে কেন, করাচি শহর থেকে তার মন উঠে গেল। যেন এক অভিশপ্ত নগরী। প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি অলিগলি, প্রতিটি বাড়ি এবং খেলার মাঠটিও যেন শয়তানের আখড়া। প্রতিটি মানুষ যেন একেকটা ভূত। হাজার হাজার ভূত যেন রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাতে সিথানে মাথা রাখলে চোখে ভেসে ওঠে তার জন্মগ্রাম, গ্রামের সবুজ বনানী, মজাপুকুর, ধুলোধূসরিত পথ, কুয়াশাঢাকা প্রান্তর, টিনের চালে শিশিরের শব্দ, বর্ষার অবিরাম বৃষ্টি এবং বৃষ্টিস্নাত বাঁশবাগানে মাহমুদার নিথর মুখ। শোয়া থেকে ওঠে তখন সে কাঁদতে থাকে। অশ্রুর বন্যায় ভিজে যায় তার গোঁফ, দাঁড়ি আর বুক। তার মনে হয়, শত শত মাইল লম্বা একটা অদৃশ্য রশি যেন তার কোমরে বাঁধা। রশিটার গোড়া মাহমুদার হাতের মুঠোয়। বাঁশবাগানে শুয়ে শুয়ে সে রশিটা গুটাচ্ছে।

অদৃশ্য সেই রশির টানে বাধ্য হয়ে একদিন সে দেশে ফিরল। মাহমুদার কবরটা দু-হাতে আগলে ধরে কাঁদল। কাঁদতে কাঁদতে প্রতিজ্ঞা করল কোনোদিন আর দেশের বাইরে যাবে না। মাহমুদা, যার খোঁপার ঘ্রাণ একদা তাকে মতোয়ারা করে রাখত, মরলে তার কবরের পাশেই কবর হবে।


কিন্তু মেয়েমানুষ তো আর পোষা বেড়াল নয় যে সকাল-বিকাল এঁটো-কাঁটা ছুড়ে দিলেই তার চলে যাবে।


কিন্তু মানুষের মন তো ইস্পাতের কোনো টুকরো নয় যে চিরকাল একরকম থাকবে। মন বদলায়। বদলাতে হয়। নইলে জীবনে একঘেয়েমি আসে। জুলফিকারের মনও বদলাল। দেশে ফেরার ছ’মাসের মাথায় মাহমুদার কবর জিয়ারত করে দ্বিতীয়বারের মতো সে কবুল বলল। এক বাস ড্রাইভার এক লাখ দশ হাজার টাকা যৌতুকের সঙ্গে মোটামুটি সুন্দরী কিন্তু টাইফয়েডে এক পা খোঁড়া তার একুশ বছরের মেয়েটাকেও জুলফিকারের ঘরে পাঠিয়ে দিল। কয়েক মাস বউয়ের বুকের ওম নেওয়ার পর গ্রাম থেকে প্রায় আট মাইল দূরে এক জামে মসজিদের ইমামতির চাকরি নিল জুলফিকার। ততদিনে তার বাপ তো কবরে চলে গেছে, অশিতিপর মা-টাও এক পা কবরে ঢুকিয়ে রেখেছে, তাই বলতে গেলে বউ তার বাড়িতে একা। সপ্তায় একদিন, কখনোবা দুদিন বউয়ের কাছে আসে। এলে আর যেতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু না গেলে খাবে কি? আসমান থেকে তো তার জন্য মান্না-সালওয়া পড়বে না। তার জন্য না হয় পড়লই। পড়ে বৈকি। সে মসজিদের ইমাম, তার খাবারের অভাব হয় না। সপ্তাহের পাঁচ দিনই মুসল্লিদের বাড়িতে দাওয়াত থাকে। মাছ-মাংসের গুণে তার বপুটাও হয়েছে দেখার মতো। রাস্তায় হাঁটার সময় চেহারার আগে বপুটাই লোকের নজরে আসে। নিজেকে নিয়ে তার চিন্তা নেই, চিন্তা শুধু বউকে নিয়ে। তাই বাধ্য হয়ে তাকে যেতে হয়। মাস শেষে বেতন যা পায় তাতে বউয়ের চাল-ডাল পেঁয়াজ-পটলের খরচ কুলিয়ে যায়। কিন্তু মেয়েমানুষ তো আর পোষা বেড়াল নয় যে সকাল-বিকাল এঁটো-কাঁটা ছুড়ে দিলেই তার চলে যাবে। কত কি দরকার হয় তার। হুজুরের বউ, স্নো-পাউডার-টিপ-লিপিস্টিকের দরকার হয় না, ব্রা-ব্লাউজ না হলেও চলে, লাক্স-কসকো সাবানের বদলে আলমের এক নং পচা সাবান দিয়েই না হয় চালিয়ে নিল, কিন্তু বছরে দুই জোড়া কাপড় আর দুই জোড়া স্যান্ডেল তো অন্তত লাগে। এছাড়া মেয়েমানুষের কত রোগ। আজ দাঁতে ব্যাথা তো কাল মাজায় ব্যাথা, পরশু আবার পেটে ব্যাথা। ডাক্তার তো তার শালা-সমুন্ধি লাগে না যে মুফতে ওষুধ দিয়ে দেবে। রোগ-বালাইর কথা না হয় থাক, সামাজিকতা বলে তো একটা ব্যাপার আছে। বোন-বোনাইদের খোঁজ-খবর নিতে না পারুক, বছরে অন্তত দু-তিন বার তো বউকে বাপের বাড়ি নাইওর পাঠাতে হয়। বউকে পৌঁছে দিতে সঙ্গে তাকেও যেতে হয়। যাওয়ার সময় অন্তত দু-কেজি মিষ্টি আর শাশুড়ির জন্য কিছু পান-সুপারি তো নিতে হয়।

সংসারে শুধু প্রয়োজন আর প্রয়োজন। প্রয়োজনের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। এত প্রয়োজন কিভাবে মেটাবে দিশা কিছু খুঁজে পায় না সে। যেন প্রয়োজনের সমুদ্রে সে সাঁতার কাটছে। খুব অসহায় মনে হয় নিজেকে। মানুষের বাড়িতে দাওয়াত খেতে গেলে অসহায়ত্বটা বেশি করে টের পায়। মানুষের ঘরে কত দামি দামি খাট-পালঙ্ক, কারুকাজ করা সেগুন-গামারির কত সুন্দর সুন্দর চেয়ার-টেবিল, গদিঅলা আরামদায়ক কত ধরনের সোফা, থালায় থালায় কত কিসিমের খাবার, অথচ তার ঘরে কিনা শোয়ার মতো একটা খাট পর্যন্ত নেই। বাপের আমলের আসবাবপত্রের কিছু ভাইদের দখলে আর কিছু মায়ের কাছে। মাহমুদাকে ঘরে আনার পর হাঁট থেকে আমকাঠের একটা চকি কিনে এনেছিল সেই কতদিন আগে, তাতেও এখন ঘুনপোকা বাসা বেঁধেছে। এদিক থেকে ওদিক ফিরতে গেলে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ ওঠে। কাপড়-চোপড় রাখার জন্য একটা আলনার কথা বউ তাকে কতবার বলেছে, টাকার অভাবে এই মামুলি আবদারটাও সে মেটাতে পারছে না। বেড়ার সঙ্গে রশি টানিয়ে গাদাগাদি করে কাপড় রাখতে হয়। বাড়িতে কখন গরুর মাংস নিয়েছে ঠিক মনে করতে পারে না। শ্বশুরবাড়ি থেকে শালা-শালী কেউ বেড়াতে এলে পোলাও-মাংস তো দূরে থাক, অনেক সময় এক কেজি ওজনের একটা বয়লার মুরগি কেনার টাকাও থাকে না।

মাঝেমধ্যে তার মনে হয়, যে জীবনটা সে কাটাচ্ছে তা আসলে মানুষের জীবন নয়, পশুর। ঠিক পশুরও নয়, তার চেয়েও খারাপ। পশুর টাকা লাগে না, মানুষের লাগে। টাকা ছাড়া দুনিয়ার বুকে মানুষের মতো বাঁচতে পারে না কেউ। পকেটে টাকা না থাকলে এবাদ-বন্দেগিতেও মন বসানো যায় না। সে দেশ-দুনিয়া ঘুরেছে, টাকা কিভাবে বাতাসে ওড়ে তার দেখা আছে। টাকার জন্য মানুষ কিনা করছে! জীবন-যৌবন ব্যয় করছে টাকার পেছনে। দিনরাত গাধার মতো খাটছে, অফিস-আদালতে দৌঁড়াচ্ছে, মিল-কারখানার চাকা ঘোরাচ্ছে, পাহাড় কেটে সমান করে দিচ্ছে, আকাশছোঁয়া বিশাল বিশাল ইমারত গড়ে তুলছে, হাজার হাজার টন লোহাকে সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছে, আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছে, কম্পিউটারের মাধ্যমে গোটা দুনিয়াটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। অথচ সে, করাচি দারুল উলুম থেকে পাস করা এত বড় একটা জবরদস্ত মাওলানা, দেখতে-শুনতে আস্ত একটা পালোয়ান, দান-খয়রাতের আশায় কিনা মানুষের মুখের দিকে কুকুরের মতো তাকিয়ে থাকে! থুতুয় তার গাল ভরে ওঠে। দলা পাকিয়ে থুতুগুলো নিজের মুখে মারতে ইচ্ছে করে।


এত বড় একজন মাওলানা সে, টাকার জন্য বউয়ের গায়ে হাত তুললে লোকে কী বলবে!


কোনোদিন আর দেশের বাইরে না যাওয়ার যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল তাতে আর স্থির থাকতে পারল না জুলফিকার। দেশে তাকে দিয়ে কিছু হবে না, বুঝে গেছে। ঢাকায় একটা চাকরির জন্য অনেক ঘুরেছে, পায়নি। শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা শুনে কেউ চাকরি দিতে চায় না। বেশভূষা দেখে অনেকে জঙ্গি বলে সন্দেহ করে। সুতরাং বিদেশ চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো গতি নেই তার। কিন্তু যাবে কোন দেশে? করাচি শহর তো আর আগের মতো নেই। চাকরির বড় আকাল সেখানে। তা ছাড়া ওই ভূতের দেশে সে আর যেতে চায়ও না। ভূতেরা মসজিদে বোমা ফাটায়, প্রতি শুক্রবারে আল্লাহর ঘরে শত শত মানুষ মারে। তার ইচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে যাওয়ার। সৌদি আরব, দুবাই অথবা বাহরাইন। যেতে চায়, কিন্তু ভিসা কে দেবে? এত টাকা সে পাবে কোথায়? নিজেকে বেচে শ্বশুরের কাছ থেকে নেওয়া এক লাখ দশ হাজার টাকার এক পয়সাও এখন আর অবশিষ্ট নেই, ধারদেনা পরিশোধ করে বহু আগেই হাওয়া করে দিয়েছে। বিয়ের সময় এতগুলো টাকা নিয়েছে, দ্বিতীয়বার শ্বশুরের কাছে টাকা চাইবার মুখ তো নেই। লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে চাইলই না হয়, কিন্তু শ্বশুর তার স্বল্প আয়ের মানুষ, চাইলেই কি তার পক্ষে দেওয়া সম্ভব? গ্রামের ছলিমুদ্দিন কলিমুদ্দিনের মতো বাপের বাড়ি থেকে টাকা এনে দেওয়ার জন্য বউকে মারধরও করতে পারে না। এত বড় একজন মাওলানা সে, টাকার জন্য বউয়ের গায়ে হাত তুললে লোকে কী বলবে! লোকে কিছু না বলুক, তবু তার পক্ষে এমন কাজ করা সম্ভব নয়। বউটার জন্য তার বুকে ভালোবাসার অন্ত নেই। বউয়ের মুখের দিকে তাকালে তার বড় মায়া লাগে, কেবলি আদর করতে ইচ্ছে করে। গায়ে হাত তোলা দূরে থাক, একটা কটু কথা পর্যন্ত বলে না কখনো।

এক শুক্রবার মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুতবা পড়তে পড়তে একটা বুদ্ধি খেল গেল তার মাথায়। সামনের কাতারে বসা ছিল বিদেশ-ফেরত এক লোক। গায়ে টাখনু-গিরা পর্যন্ত ধবধবে সাদা লম্বা জোব্বা, কাঁধে সৌদির বাহারি রুমাল, মাথায় সৌদিদের মতো পাগড়ি। দেখে যে কেউ বলবে লোকটা সৌদিপ্রবাসী। গ্রামবাসীও তাই জানে। কিন্তু আদৌ সে সৌদিপ্রবাসী কিনা তার কোনো সাক্ষী-সাবুদ নাই। সৌদি-প্রবাসীও হতে পারে, দুবাই-প্রবাসীও হতে পারে, কাতার বা বাহরাইন-প্রবাসীও হতে পারে। হয়ত সৌদির কোনো মরুভূমিতে দুম্বা চরায়, অথবা কোনো খেজুর বাগানে কাজ করে, অথবা দুবাই শহরের কোনো বাসাবাড়িতে দারোয়ানের কাজ করে। কে জানে, এমনও হতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের বড় কোনো শহরে ভিক্ষা করে। বিচিত্র কিছু নয়। জেদ্দা বা মক্কা-মদিনায় বহু বাঙালি ভিক্ষুকের কথা তো শোনা যায়, ভিক্ষাকেই যারা পেশা হিসেবে নিয়েছে। তার ধারনা লোকটা সৌদি-প্রবাসীই হবে। তার বেশভূষা সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। তাকে ধরে সৌদি আরবের একটা ভিসার ব্যবস্থা তো করা যায়―খুতবা শুরুর আগে এমন একটা চিন্তা মাথায় এসেছিল তার। নামাজের পর তার সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করবে, মনে মনে স্থির করে রেখেছিল। কিন্তু খুতবা পড়তে গিয়ে মাথায় এল, আচ্ছা, ওমরা হজ্বের ভিসা নিয়েও তো সৌদি আরব চলে যাওয়া যায়। কত মানুষই তো ওমরা-ভিসায় চলে যাচ্ছে। টাকাও বেশি লাগে না, পঞ্চাশ-ষাট হাজারেই হয়ে যায়। পবিত্র রওজার দেশে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াটা অবৈধ, সে জানে, কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য অবৈধ একটা কাজ করলই না হয়। আল্লাহ তো রাহমানুর রাহিম, তওবা করে মাফ চাইলে বান্দার গুনাহ কি তিনি মাফ করবেন না?


শ্বশুরবাড়ির কাউকে কোনোদিন নিজগ্রামে নেয় নি। বউকেও না


এসব ভাবতে ভাবতে খুতবায় দু-দুবার ভুল করে ফেলল। শুধু খুতবায় নয়, নামাজেও ভুল হয়ে যায়। জুমার নামাজ দু-রাকাত, অথচ দ্বিতীয় রাকাতের সেজদা থেকে উঠে না বসে দাঁড়িয়ে গেল। পেছন থেকে মুসল্লিরা তকবির দেওয়া শুরু করলে সে ভ্যাবাচেকা খায়। পাঞ্জেগানা নামাজে তার ভুল হয়েছে, জুমার নামাজে এই প্রথম। নামাজ শেষে মুনাজাত ধরে সে খোদার দরবারে ফানা চায়। হে মাবুদ, তোমার গুনাহগার বান্দাদের উপর তুমি রহমতের বৃষ্টি নাযিল করো―বলতে বলতে কেঁদেও ফেলে।
নামাজ শেষে মুসল্লিরা চলে গেলে সৌদিফেরত লোকটা তার মুখোমুখি দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস করে, হুজুর কি কোনো কারণে পেরেশান?
মুসাবার উদ্দেশে জুলফিকার হাত দুটো বাড়িয়ে দেয়। দু-হাতে তার ডান হাতখানা ধরে রেখে বলে, মানুষের মন তো ভাই। মনটা, বুঝলেন ভাই, রাব্বুল আলামিনের পয়দা বড় আজব একটা চিজ। এই ভালো, এই খারাপ।
বলতে বলতে সে কেঁদে ফেলল। না, তার মনের পেরেশানির জন্য নয়, কাঁদল পাক-মাবুদের কুদরতের কথা ভেবে। নামাজ শেষে যার সঙ্গে কথা বলার জন্য মনটা এত পেরেশান সে-ই কিনা যেচে তার মনের খবর জানতে চাইছে! খোদা আলেমুল গায়েব, কোনো কিছুই তার জানার বাইরে নয়, বান্দার মনের খবর পর্যন্ত রাখেন তিনি।

প্রায় তিন দিন পর লোকটার সঙ্গে আবার দেখা। ততদিনে লোকটা সম্পর্কে কমবেশি জানা হয়ে গেছে তার। নাম তার মনসুর, কিন্তু ‘জামাই’ নামের নিচে চাপা পড়ে গেছে আসল নামটি। ছেলেবুড়ো সবাই তাকে জামাই বলে ডাকে। যারা তার দূরসম্পর্কের শালা-সমুন্দি লাগে, তারাও। জামাই, কারণ সে এই গ্রামে বিয়ে করেছে। বাড়ি ফেনী কি নোয়াখালী জেলায়। বিয়ের পর থেকেই ঘরজামাই। শ্বশুরবাড়ির কাউকে কোনোদিন নিজগ্রামে নেয় নি। বউকেও না। শ্বশুরের দেশে বছর তিনেক ক্ষেতে-খামারে কাজ করেছে। ততদিনেও সন্তানাদি কিছু হলো না। হঠাৎ একদিন উধাও। দু-বছর আর কোনো পাত্তা নেই। সবাই ভাবল হয়তো নিজগ্রামে ফিরে গেছে। যাওয়ারই কথা। তিন বছরেও বউ তাকে সন্তানাদি কিছু দিতে পারে নি, কোন মায়ায় সে পড়ে থাকবে বাঞ্জা বউয়ের কাছে?

৬ষ্ঠ পর্বে লিংক

স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)