হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : শেষ পর্ব

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : শেষ পর্ব

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : শেষ পর্ব
1.05K
0

২৭ পর্বের লিংক

শেষ পর্ব :

ফিডার, কোলবালিশ, মশারি, দোলনা, জিরো সাইজের জামাকাপড় ইত্যাদি দিয়ে ঘর ভরে ফেলল অনিতা। ভীষণ ব্যস্ত সে ফজলুল হককে নিয়ে। ছেলেটি সামান্য কেঁদে উঠলে সে অস্থির হয়ে পড়ে। হাসলে আনন্দের রেশ বয়ে যায় তার চোখে-মুখে। অফিসেও যায় না। নিজের বাড়িতেও যায় না। সারাদিন ওকে নিয়েই থাকে। যেন ওই মাসুম বাচ্চাটি ওর সব। আনন্দ, বেদনা। অবলম্বন। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে? সবকিছুরই তো একটা সীমা-পরিসীমা থাকা উচিত। অবস্থা বেগতিক দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ অবিবাহিত দু’জন নারী-পুরুষ এক বাসায় থাকার নিয়ম নাই। দেখতে অসুন্দর দেখায়। পাড়ার মানুষজন জানলে আমি নির্ঘাত বিপদে পড়ে যাব। এ কথা ভাবতেই ভয়ে শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল।

লেখার টেবিলে বসে এসব কথা ভাবছিলাম। ব্যস্তভঙ্গিতে অনিতা এল। ফজলুল হককে আমার কোলে দিয়ে বলল, ‘এ তোমার কেমন কাণ্ড বলো তো শুনি!’

আমি বোকা মানুষের মতো ভীত-সন্ত্রস্তভঙ্গিতে বললাম, ‘কেন, কী হয়েছে?’

‘আবার বলছ কী হয়েছে! ছেলেটাকে নিয়ে আমি পুরো বাসাটি সামলাচ্ছি। তোমার কি একবারও মনে হয় না আমার দিকে একটু নজর দেওয়া উচিত?’

অনিতার গৃহিণীসুলভ সংলাপ শুনে আমি কাঁদব না হাসব বুঝে উঠার আগেই আমার শিরদাঁড়া চিনচিন করে উঠল ব্যথায়। কে যেন আমার কানে কানে বলল, বগা, ফান্দে ফড়িয়া গিয়াছ!

অনিতা চলে গেল। আমি ফজলুল হককে কোলে নিয়ে বসে রইলাম। মাসুম বাচ্চা। আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমিও তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এক সময় বাচ্চাটি হেসে উঠল।

আমি বললাম, ‘আমি তোমার বাবা নই। তোমার বাবা মরে গেছে।’

কথাটা বলে নিজেই নিজের জিহ্বায় কামড় কাটলাম। না না না মাসুম বাচ্চাকে এসব কথা বলা ঠিক না। ফলে নিজের বাক্যটি এডিট করে আবার বললাম, ‘হেই যে ফজলুল হক! তোমার বাবা কোথায়? বাবাকে ডাকো! তাকে এক্ষুনি আসতে বলো!’

ফজলুল হক আনন্দে গোঁ গোঁ করে উঠল!

‘বাব্বাহ! এরই মধ্যে বাবার সাথে দেখি খুব খাতির হয়ে গেছে!’

এই কথা বলতে বলতে অনিতা ঘরে ঢুকল। সে ঘরের ঝুল পরিষ্কার করছিল। খুবই ব্যস্তভঙ্গিতে ঢুকল। ফজলুল হককে টুস করে একটা চুমো খেয়ে ব্যস্তভঙ্গিতেই চলে গেল।

আমি ঠোঁটে আটকে থাকা কথাটা বলতে পারলাম না। কথাটা হলো : কার সাথে কি পান্তা ভাতে ঘি!


‘ও বুচ্ছি! আপনি ঘাড়ত্যাড়া! এ জন্যই বুড়া বয়সে নিকাহ করণ লাগতেছে! তা আগের বউকে কি তালাক দিছেন নাকি মইরা গেছে?’


বসে বসে ভাবতে লাগলাম, আর কী কী ঘটাবে অনিতা। কল্পনায় আশু ঘটনার চলমান চিত্র দেখতে লাগলাম। প্রতিটি ঘটনাই লোমহর্ষক। তাই বারবার কেঁপে উঠলাম।

বুঝতে আর বাকী রইল না, আসলেই আমি ফান্দে পড়া বগা।

আসগর এল উইথ একজন ছাগলদাড়িঅলা হুজুর।

ব্যাপার কী?

জানা গেল, অনিতা ম্যাডাম একজন জানাশোনা হুজুরকে নিয়ে আসতে বলেছেন যে বিয়ে পড়াতে পারে।

হুজুর সাহেব রাম ছাগলের মতো পান চিবোতে চিবোতে আমার দিকে পিটপিট করে তাকাতে লাগল। যেন আমি কোরবানির গরু। আমাকে তার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। এক্ষুনি কোরবানি দেবে। কোরবানি শেষে অতি দ্রুত আমার গতর থেকে চামড়া ছিলে লবণ লাগাবে।

রামহুজুর বলল, ‘আপনার বয়স কত সাহাব?’

‘বলব না।’

‘কেন?’

‘বলার ইচ্ছা নাই।’

‘ও বুচ্ছি! আপনি ঘাড়ত্যাড়া! এ জন্যই বুড়া বয়সে নিকাহ করণ লাগতেছে! তা আগের বউকে কি তালাক দিছেন নাকি মইরা গেছে?’

‘জি না, আমার ছার আনমেরিড!’—আসগর বলল।

‘আরে বলো কি! বুড়া বয়সে আনমেরিড!’

‘মুখ সামলে, কেমন, মুখ সামলে?’

‘আপনি পুরুষ মানুষ। বয়স বলতে অসুবিধা কী?’

‘এত বলার দরকার কী? অনুমান করে নিতে পারেন না?’

‘আচ্ছা নিলাম।’

আমি যে ক্ষেপে গেছি তা আসগর বুঝতে পেরেছে। কিন্তু রামহুজুর বোঝে নাই। তাই সে পান চিবোতেই লাগল। কাঁহাতক আর সহ্য হয়! আচ্ছামতো একটা ধমক দিলাম রামহুজুর বেটাকে।

ধমকের সাথে বললাম, ‘আমার সামনে পান চিবানো যাবে না!’

রামহুজুর অবাক হয়ে বলল, ‘মানে! পান চিবানো যাবে না কেন?’

‘কেন যাবে না, সেটা বলব না। কিন্তু আপনার পান চিবানো বন্ধ!’

‘না না না—তা তো সম্ভব না। দুই যুগ= ২৪ বছরের অভ্যাস। বললেই হবে নাকি? আপনি হামাদিস্তা দিয়া পিটালেও বন্ধ করতে পারবেন না। র‌্যাব-পুলিশ-সেনাবাহিনী লাগালেও না।’

রামহুজুরের কথাটা ভালো লাগল। যে যেটা প্রতিদিন করে সেটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। যেমন আমি একজন লেখক। লেখালেখিও আমার অভ্যাস। কেউ যদি আমাকে লেখালেখি বন্ধ করতে বলে, তখন আমার কেমন লাগবে? আমি লেখালেখি বন্ধ করতে পারব? চোখ বন্ধ করে কথাটা একবার চিন্তা করলাম। না, এটা সম্ভব না। সুতরাং রামহুজুরের পান চিবানো বন্ধ করাও সম্ভব না। আমি অনুধাবন করলাম। কাউকে পান চিবানো বন্ধ করতে বলা মানে কারো স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা। এটা আমি করতে পারি না।

‘ওকে বন্ধ করার দরকার নাই। চিবোতে থাকেন।’

রামহুজুর আর একটি পান মুখে পুড়ে চিবোতে লাগল। এক ফাঁকে একদলা জর্দা মুখে দেওয়ার সময় আমার  সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলে সে বলল, ‘সুরভি জর্দা! ডোন্ট মাইন্ড!’

আমি কিছু বললাম না।

রামহুজুর বলল, ‘আজকেই করবেন নাকি পরে?’

‘কী?’

রামহুজুর বিস্মিত হয়ে আসগরের দিকে তাকাল। চোখের ইশারায় আসগরের কাছে কী যেন জানতে চাইল। আমি যতটুকু বুঝলাম তার অর্থ হলো এই যে, কী মিয়া, তুমি আমাকে যার কাছে নিয়ে আসছ সে তো একজন পাগল! পাগল-ছাগল!

আসগর তখন ভয়ে কাঁপছে। একবার আমার দিকে আর একবার রামহুজুরের দিকে তাকাল। কিছু বলার সাহস পেল না।

হঠাৎ অনিতা এসে হাজির হলো। অনিতার আগমনে আসগর যেন উদ্ধার পেয়ে গেল। অনিতা সুন্নতি কায়দায় সুরেলা কণ্ঠে রামহুজুরকে সালাম প্রদর্শন করল।

‘আসসালামু আলাইকুম!’

‘ওয়া লাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ!’

রামহুজুর আসগরের কাছে ফিসফিসিয়ে জানতে চাইল, ‘ইনি কে?’

আসগর ছোট্ট করে উত্তর দিল, ‘পাত্রী।’

‘বলো কী! পাত্র-পাত্রী তো বিয়ের আগেই এক বাসায় থাকা শুরু কইরা দিছে। তাইলে আর আমারে ডাকছ কিয়ের লিগা?’

‘না মানে, আপনি যা ভাবতেছেন, ব্যাপার তা না। এই ব্যাপারে আমি আপনারে পরে বুঝায়া বলবা নি।’


একটা কথা চিন্তা করতে করতে আমি সারারাত ঘুমাতেই পারলাম না। কথাটা হলো, কাল থেকে আমি আর সিঙ্গেল থাকতে পারব না।


কী বলে তারা ফিসফিস করে? আমি আসগরের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকালাম। আসগর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

আমি আসগরকে ডাকলাম, ‘আসগর!’

‘জি, ছার।’

‘তুমি নিচে যাও।’

‘জি, ছার?’

‘তুমি তোমার কাজে যাও।’

‘ওকে, ছার!’

আসগর চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলে অনিতা বলে উঠল, ‘না না। আসগর যাবে না। এখানে ওর দরকার আছে। ওই তো প্রধান।’

‘কিসের প্রধান?’

‘কেন, তুমি কি কিছুই বুঝতে পারছ না? বাসায় কাজীর আগমন ঘটেছে আসগরের মাধ্যমে। তাছাড়া আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আসগর হবে উকিল।’

‘উকিল! কিসের উকিল?’

‘আরে বাবা বিয়ের উকিল!’

তার মানে আসগরকে উকিলবাবা বলতে হবে? কথাটা আমি মনে মনে বললাম। বাস্তবে কোনো কথাই বললাম না।

অনিতা বলল, ‘এখন থেকে আসগর আমাদের মুরব্বি।’

অনিতার কথা শুনে আসগর মুরব্বিদের মতো তাকানোর চেষ্টা করল। আর আমি, চোখে সর্ষেফুল দেখতে লাগলাম।

রামহুজুর বলে উঠল, ‘তাইলে কী দাঁড়াল, কাজটা কখন হইতেছে?’

আমি বললাম, ‘আপনি কাল আসবেন। এখন যান।’

অনিতা অবাক হয়ে বলল, ‘কাল আসবে মানে?’

‘হ্যাঁ কাল।’

‘কেন? আজ নয় কেন?’

‘আজ আমার মাথা ব্যথা!’

‘আচ্ছা ঠিকাছে। তোমার কথাই সই।’

একটা কথা চিন্তা করতে করতে আমি সারারাত ঘুমাতেই পারলাম না। কথাটা হলো, কাল থেকে আমি আর সিঙ্গেল থাকতে পারব না। তারচেয়েও কষ্টদায়ক হলো, আসগর মিয়াকে বাবা বলতে হবে!

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com