হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৭

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৭

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৭
429
0

২৬ পর্বের লিংক

পর্ব-২৭

এইসব ফাঁকিবাজিমূলক কথাবার্তা বলে টাইম পাস করতে করতে এক সময় আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে পৌঁছালাম। বিল্যাই মিঞা আধ ঘুম আধ জাগরণের মধ্যে ছিল। আমরা তার বেডের কাছে যেতেই সে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। আমাকে দেখে সে যেন সুস্থ হয়ে উঠল। চিকচিক করে উঠল তার চোখের পাতা। কালো ঠোঁটজোড়া মৃদু কেঁপে উঠল। একদম সুস্থ মানুষের মতো উঠে বসতে গেলে আমি তাকে বাধা দিয়ে বললাম, ‘উঠার দরকার নাই। তুমি অসুস্থ। শুয়ে থাকো।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘তাই কি হয়, ছার? আপনারা বসে থাকবেন আর আমি শুয়ে থাকব—এটা তো রীতিমতো বেয়াদবি।’

অনিতা বলল, ‘না না মোটেও বেয়াদবি না। আপনি শুয়ে থাকুন।’

অনিতা ডাক্তারিসুলভ যত্নের সাথে বিল্যাই মিঞার সাথে কথা বলতে লাগল। আর আমি বিল্যাই মিঞাকে দেখতে লাগলাম। বিল্যাই মিঞা আর আগের বিল্যাই মিঞা নাই। সম্পূর্ণ বদলে গেছে। একটা উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে কতটা বদলেছে। ধরা যাক ক্যান্সার ধরা পড়ার আগে তার ওজন ছিল ৫৫ কেজি। কিন্তু ক্যান্সার ধরা পড়ার পরে তার আনুমানিক ওজন হবে ৩৫ কেজি। অর্থাৎ সে পাটখড়ির মতো শুকিয়ে গেছে। একেবারে হাড্ডিসার। কঙ্কাল।


আমি বেঁচে থাকলে তাকে বাংলাদেশের পলেটিকসে ঢুকাতাম। তাকে দিয়ে এদেশের পলেটিকসের চোহারা পাল্টায়া দিতাম।


কিন্তু শরীরে সে যতই শুকিয়ে যাক বা তার যত বড় মরণব্যাধিই হোক, মনোবলে একটুও চির ধরে নি। সে আগের মতোই ফুরফুরে মেজাজে আছে। আমাকে আর অনিতাকে পেয়ে তার ফুরফুরানি এখন চরমে। একটা ব্যাপার খেয়াল করে সামান্য অবাক হলাম। সেটা হলো, আসগরের মতো বিল্যাই মিঞাও অনিতাকে দেখে কিঞ্চিৎ লজ্জা লজ্জা পাচ্ছে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমিও কিঞ্চিৎ মজা পেলাম।

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘বাংলার বাঘ ঢাকা মেডিকেলে আর বাংলার বিল্যাই আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে—এইটা তো একটা বিরল ঘটনা। তাই না, ছার?’

‘হুম। অবশ্যই বিরল ঘটনা।’

‘যদি তাই হয় তাহলে সাংবাদিক ভায়েরা এখন পর্যন্ত আসে না কেন? এসে নিউজ করে না কেন?’

‘ওদেরকে দাওয়াত দিতে হয়। দাওয়াত না দিলে ওরা আসে না।’

‘বলেন কি ছার! এটা তো অত্যাশ্চার্য ব্যাপার! যদি বাংলার বাঘ আর বাংলার বিল্যাই মরেও যায়, তারপরও তাদেরকে দাওয়াত দিয়ে আনতে হবে?’

অনিতা ইঙ্গিত করল আর যেন কথা না বাড়াই। ফলে কথা থামাতে হলো। বিল্যাই মিঞাও থেমে পড়ল। ভেবেছিলাম সে কথা বলার জন্য জোড়াজুড়ি করবে। কিন্তু তা করল না। চুপচাপ হয়ে পড়ল। বুঝলাম, ক্যান্সার ধরা পড়ার পর বিল্যাই মিঞার সবকিছুই বদলে গেছে।

বিল্যাই মিঞার সাথে ঘণ্টাখানেক কাটালাম। এই দেড় ঘণ্টার মধ্যে সে আর কোনো কথা বলে নি। কিন্তু ফেরার সময় সে প্রথমে আমার ও পরে অনিতার হাত টেনে নিলো। আমাদের দুজনের হাত একত্র করে দেখতে লাগল। একজনের হাত শ্যামলা আর একজনের হাত ধবধবে ফর্শা।

হাতের রং দেখার জন্য নিশ্চয়ই বিল্যাই মিঞা আমাদের হাত টেনে নেয় নি। তার একটা উদ্দেশ্য আছে। সেটা কী? কী হয় দেখার জন্য আমি আগ্রহীভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম বিল্যাই মিঞা যদি আমাদের মধ্যে বিয়ের ইঙ্গিত করে তাহলে মেনে নিব না। এই হলো আমার মনে অবস্থা।

কিন্তু অনিতার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার আনন্দ যেন উপচে পড়ছে। সে বিল্যাই মিঞার কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘কিছু বলবেন?’

‘জি ম্যাডাম, বলতে চাই।’

‘আচ্ছা বলেন।’

‘বলতে ভয় করে, ম্যাডাম!’

‘না না ভয় পাবেন না। আপনি নির্ভয়ে বলুন।’

বিল্যাই মিঞা তার পাট-কাঠির মতো শুকনো হাতে আমাদের দুই জনের হাত একত্রে বেড় পাচ্ছিল না। তবু সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল হাত ধরে রাখার। এরই মধ্যে হঠাৎ তার নখের আঁচড়ে আমি ব্যথা পেয়ে উফ করে উঠলাম। সঙ্গে সঙ্গে বিল্যাই মিঞা খুব স্যরি হলো। বলতে লাগল, স্ত্রী বিয়োগের পর থেকে চুল-দাড়ি-নখ এসবের কিছুই কাটে নি সে। আর কাটবেও না।

আমি বললাম, ‘না এটা তো ঠিক বললে না বিল্যাই মিঞা। তোমার হাতের নখ অন্তত কাটা উচিত।’

‘সেটা আমিও বুঝি, ছার। কিন্তু কথা হলো, আমার চুল-দাড়ি-নখ এইগুলা আমার পরিবার কেটে দিত। যেহেতু কেটে দেওয়ার মানুষ নাই সেহেতু সিদ্ধান্ত নিছি আর কাটব না।’

‘চুল-দাড়ি থাক। নখ কাটো।’

‘দেখি। যদি হাসপাতাল থেকে ফিরতে পারি তাহলে কাটব। আর যদি না ফিরি তাহলে কাটা হবে না।’

‘এভাবে বলতে হয় না বিল্যাই মিঞা। তুমি অব্যশই আমাদের মাঝে ফিরবে।’

আমার মনে হলো বেহুদা প্যাচাল বেশি হচ্ছে। বিল্যাই মিঞা আমাদের হাত ধরেছে কী বলার জন্য সেটা বললে ভালো হয়। আমি বিল্যাই মিঞাকে বললাম, ‘বিল্যাই মিঞা, তুমি কি আর কিছু বলতে চাও?’

‘জি, ছার।’

‘বলো!’

‘আপনাদের দুইজনের কাছেই আমার অনুরোধ ফজলুল হকরে আপনারা দেখবেন। আমি বেঁচে থাকলে তাকে বাংলাদেশের পলেটিকসে ঢুকাতাম। তাকে দিয়ে এদেশের পলেটিকসের চোহারা পাল্টায়া দিতাম। কিন্তু আমি যদি আর না বাঁচি তাহলে আপনারা আমার এই স্বপ্নটা পুরণ করবেন—কথা দেন!’

‘ঠিকাছে। কথা দিলাম।’ আমার সাথে কোনোরকম আলাপ না করে হুট করে কথা দিয়ে ফেলল অনিতা।

‘ছার, ম্যাডামে কথা দিছে। আপনিও কথা দেন।’


হাসপাতালের লোকেরা বিল্যাই মিঞাকে শাদা কাপড়ে ঢেকে দিল।


মহামুশকিলে পড়ে গেলাম। এভাবে হুট করে কাউকে কথা দেওয়া যায়? নাকি দেওয়া উচিত? বিল্যাই মিঞা আমার কে? কেন আমি তার জন্য এত বড় সেক্রিফাইস করতে যাব?

আমি যখন এসব কথা ভাবছিলাম তখন অনিতা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কথা দিয়ে দাও! বাকিটা আমি দেখব।’

‘তুমি দেখবে মানে কী?’

‘মানে তোমাকে কিছু করতে হবে না। বিল্যাই মিঞার সব দায়-দায়িত্ব আমি নিব। তুমি শুধু উনাকে কথা দিয়ে দাও।’

মেয়েদের এরকম নিকনিকানি স্বভাব আমার খুবই অপছন্দ।

ভীষণ অবাক হলাম। এ মেয়ে কিভাবে ডাক্তারি পাশ করেছে! কিভাবেই-বা ডাক্তারি করছে। একে কে বোঝাবে, কাউকে কথা দেওয়ার মানে এই না যে, পকেট থেকে ২/৪টা টাকা বের করে দিয়ে দিলাম। বিশেষত বিল্যাই মিঞা একজন মৃত্যু পথযাত্রী। তাকে কোনো কথা দিলে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। সুতরাং এ ব্যাপারে খুব সাবধানতা দরকার।

বিল্যাই মিঞা আমার কথা শোনার জন্য স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার তাকানোর ভঙ্গিটা এমন যে, আমার কাছ থেকে হ্যাঁ বোধক কথাই শুনবে। ব্যতিক্রম কিছু হবে না।

এই প্রথম তার জন্য আমার মায়া হলো। আমি তার দিকে তাকালাম। কিছু বলতে হলো না। বিল্যাই মিঞা বুদ্ধিমান মানুষ। বুদ্ধিমান মানুষের জন্য ইশারাই কাফি। অর্থাৎ সে আমার মনের কথা পড়ে নিলো। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে মৃদু হাসির রেখা খেলে গেল। হালকা কেঁপে উঠল তার কালো ঠোঁটজোড়া। আর তখনই তার হাতটি টুপ করে খসে পড়ল আমাদের হাত থেকে!

হাসপাতালের লোকেরা বিল্যাই মিঞাকে শাদা কাপড়ে ঢেকে দিল।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com