হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৬

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৬

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৬
607
0

২৫ পর্বের লিংক

পর্ব-২৬

‘খুব অসুস্থ মানে? কী হয়েছে তার?’

‘মনে হয় বাঁচবে না! ব্লাড ক্যান্সার!’

‘বলো কী! বিল্যাই মিঞা মরে গেলে তার মাসুম বাচ্চাটার কী হবে?’

‘দেখো! এই জগৎ-সংসারের মালিক হলেন আল্লাতালা। তিনি সবার জন্য সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন। সুতরাং আমাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই।’

অনিতার কথাবার্তা শুনে আমার হালকা সন্দেহ হলো। সেকি এরই মধ্যে হজ-টজ করে এসেছে নাকি? স্পষ্ট মনে আছে, আগে সে কথায় কথায় এত আল্লার নাম নিত না! হঠাৎ কী কারণে দ্বীনের পথে গমন হলো! আমি গভীরভাবে ভাবতে লাগলাম।

‘কী ভাবছ?’ অনিতা জানতে চাইল।

আমি বললাম, ‘সত্যি করে বলো তো, তুমি হজে গিয়েছিলে নাকি?’

‘না তো।’

‘কিন্তু তোমার মধ্যে একটা চেঞ্জ লক্ষ করছি। মানুষ হজে গেলে এই ধরনের চেঞ্জ দেখা যায়।’

‘তুমি ঠিকই ধরেছ। কিন্তু আমার মধ্যে চেঞ্জ এসেছে অন্য কারণে!’

‘আমাকে বলা যায়, নাকি বলা যায় না?’

‘বলা যায়। কিন্তু শুনলে তোমার ভালো লাগবে না।’

‘তারপরও বলো! আমি শুনতে চাই।’


অনিতা কী বুঝল আল্লা-মালুম। আমার ঠোঁটে কিস করে বসল।


‘আসলে তুমি আমাকে ডিনাই করার পর থেকে আমি বদলে গেছি। একবার ভেবেছিলাম, সুইসাইড করব। কিন্তু সাহসে কুলাল না। শেষে ভাবলাম, বেঁচেই যখন থাকব, তাহলে আর আগের মতো কেন? তাই নিজেকে বদলে ফেললাম।’

কথাগুলো বলে অনিতা এমন করুণ চোখে আমার দিকে তাকাল, অন্য কেউ হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে বুকে জড়িয়ে নিত। কিন্তু আমার বেলায় তা হলো না। হলো না কারণ যা হওয়ার নয় তা হবে কেন? যাকে ভালোবাসি না, যাকে বিয়ে করব না তাকে অযথা বুকে জড়িয়ে নেওয়ার কী আছে? ফলে আমি চুপচাপ বসে রইলাম।

অনিতা আস্তে করে আমার হাতের উপর তার হাত রাখল। এবং হাতের উপর হাত রাখার ফলে আমার চোখে-মুখে কেমন ফিলিংস আসে সেটা দেখার চেষ্টা করল।

আমি যেহেতু বরাবরই কাঠখোট্টা সুতরাং আমার ফিলিংস বোঝা কারো পক্ষেই সম্ভব না। কিন্তু অনিতা কী বুঝল আল্লা-মালুম। আমার ঠোঁটে কিস করে বসল।

কিস-এর জবাবে কিস দিতে হয়—এটা পাগলের ভাই ছাগলেও জানে। কিন্তু আমি দিলাম না।

অনিতা ডাহুকের মতো চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কেমন?’

আমি বললাম, ‘কী কেমন?’

‘মানে কেমন লাগল?’

অনিতা পোলো খাচ্ছিল। সুতরাং কিস করার সময় আমার মুখের মধ্যে পলকা হাওয়ার মতো পোলোর ঘ্রাণ ঢুকে পড়েছিল। পোলোর ফ্লেবার আমার খারাপ লাগে না। একটা ফ্রেশনেস ফ্রেশনেস ব্যাপার কাজ করে মুখে। মাঝে মধ্যে আমি খাইও। কিন্তু তার মানে এই না যে, পোলোর ফ্লেবার মিশ্রিত কিস করলেই আমি আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে পড়ব। যদি তাই হতো তাহলে আমার এই বয়সেও অবিবাহিত থাকার কথা ছিল না। এতদিনে কয়েক বাচ্চার বাবা হয়ে যেতাম।

সুতরাং মধ্যপন্থা অবলম্বন করে বললাম, ‘চলে!’

আমার জবাব শুনে অনিতা কী বুঝল আল্লামালুম! তার চোখ-মুখ, শিরা-উপশিরা আনন্দে চিকচিক করতে লাগল। মনে হলো, সে পেয়ে গেছে—এতদিন ধরে যা সে চেয়ে আসছিল প্রাণপণে।

অনিতার বোকামি দেখে আমি মনে মনে কুটিকুটি হাসলাম! ইস, কী বোকা মেয়ে!

এসব কিছুর মধ্যে আমি বিল্যাই মিঞার সাথে দেখা করার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে পড়লাম। কিন্তু অনিতা বলল, যতই উদ্‌গ্রীব হই, মিনিমাম ২ ঘণ্টার আগে তার সাথে আমার দেখা হচ্ছে না। কারণ বিল্যাই মিঞা আছে তুরাগ নদীর পারে আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে আহসানিয়া মিশনের দূরত্ব কম হলেও চল্লিশ কিলোমিটার। কিন্তু দূরত্ব যাই হোক, জ্যামট্যাম পেরিয়ে ওখানে পৌঁছতে মিনিমাম দুই ঘণ্টা লাগবে।

‘ওখানে যাওয়ার আগে কিছু খেয়ে নাও!’ বলে অনিতা একটা পোলো বাড়িয়ে ধরল আমার দিকে।

আমি স্কুল গোয়িং বাচ্চাদের মতো না-বোধক মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘না থাক। লাগবে না।’

অনিতাও রাগী মিস্ট্রেসের মতো শাসনের সুরে বলল, ‘আরে নাও বলছি! এটা খেলে ভালো লাগবে!’ বলতে বলতে প্লাস্টিকের কভার খুলে পলোটা আমার মুখের সামনে ধরল। আমি বাধ্য ছেলের মতো হা করলাম। অনিতা আমার মুখের মধ্যে পোলোটি টুপ করে ছেড়ে দিলো। আমি মুখ বন্ধ করলাম। দুই ঠোঁট এমনভাবে সেঁটে দিলাম যাতে বাতাস বেরুবার মতো কোনো ফাঁক-ফোঁকর না থাকে।

অনিতা আমার সাথে ক্যান্সার হাসপাতালে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। না, ওকে নেওয়া যাবে না। ওর মতিগতি বিশেষ ভালো লাগছে না।

তাই বললাম, ‘তুমি গেলে ফজলুল হকের চিকিৎসা কে করবে?’

‘হু ইজ ফজলুল হক?’

‘বিল্যাই মিঞার ছেলে!’

‘ও তাই বলো! ডোন্ট ওরি। আমি সে ব্যবস্থা করে যাব।’

আর কথা বাড়ালাম না। কারণ অনিতা যদি বুঝে ফেলে আমি তাকে আমার সাথে নিতে চাচ্ছি না, তাহলে সে খুবই মন খারাপ করবে। এতে করে ফজলুল হকের সুচিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

‘আচ্ছা চলো!’ বলে অনিতার দিকে তাকিয়ে দেখি ওর চোখ দিয়ে বন্যার বেগে পানি বেরিয়ে আসছে। আমি ওর দিকে টিস্যু পেপার এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘কী হলো? তোমার চোখে পোকা-মাকড় ঢুকেছে নাকি?’

অনিতা বলল, ‘না, পোকা-মাকড় না!’

‘তার মানে তুমি কাঁদছ?’

‘হ্যাঁ কাঁদছি। কিন্তু এ কান্না সুখের কান্না। মনের মানুষকে মনের মতো করে পাওয়ার কান্না!’

মনে হলো, আমি বাংলা সিনেমার ডায়লগ শুনছি। বাংলাদেশের মেয়েদের এই এক সমস্যা। তারা নিমেষে আকাশ থেকে মাটিতে নামতে পারে। তাদের কাছে নারীত্বটাই যেন বড়ো। আর সবকিছু নস্যি।

যাই হোক আমরা দুজন বিল্যাই মিঞাকে দেখার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।

আমার গোপন বাসনা ছিল ড্রাইভারের পাশের সিটে বসার। সেই মোতাবেক গাড়ির দরজাও খুলেছিলাম। কিন্তু কিভাবে যেন অনিতা তা বুঝে ফেলল এবং আমাকে একরকম টান মেরে তার পাশে বসাল। আমি যতই চাইলাম রাস্তার পাশের সৌন্দর্য এবং অসৌন্দর্য দেখতে অনিতা ততই আমাকে বাধা দিলো। বাধা দিলো মানে সে তার সাথে গল্প করার জন্য অনুপ্রাণিত করল। যদিও তার সাথে গল্প করার মতো কোনো টপিক নাই। বরং সে ভটভট করে কথা বলতে লাগল। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও আমি তার বকবকানি শুনতে লাগলাম।

তার বকবকানির নমুনা নিম্নরূপ :

অনিতা : মনে হচ্ছে, আমি স্বর্গের রাস্তায় ছুটে চলেছি।

আমি : হুম!

অ : দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এভাবে চললেও ক্লান্ত হব না।

আ : হুম!

অ : দেখো—আকাশটা কত নীল।

আ : হুম!

অ : তোমার কি ঘুম পাচ্ছে? এত হুম হুম করছ কেন?

আ : উঁ? হ্যাঁ। একটু একটু!

অ : তা এই কথাটা আগে বলবে না? আগে বললে কি আমি এত বকবক করতাম? যাই হোক, তুমি আমার কাঁধে ঘুমাও! আমি তোমার মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছি।


লজ্জার চোটে তুমি তোমার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছ।


আ : না।

অ : না কেন?

আ : ড্রাইভার দেখে ফেলবে!

অ : তো কী হয়েছে? ড্রাইভারকে এত পাত্তা দিতে হবে কেন?

আ : তারপরও আমি পারব না।

অ : তাহলে আমার কোলে মাথা রাখো।

আ : ছি ছি তোমার দেখি একটুও লজ্জা নেই!

অ : আহা এখানে লজ্জার প্রসঙ্গ আসছে কেন?

আ : অবশ্যই আসবে। লজ্জা ছাড়া মানুষ নাই।

অ : তুমি আমাকে ধরো। তোমার লজ্জা কেটে যাবে।

আ : আমি আমার লজ্জার কথা বলছি না। তোমার লজ্জার কথা বলছি।

অ : আরে পাগল, জগতের কোনো মেয়ে কি তার বয়ফ্রেন্ডের সামনে লজ্জা পায়?

আ : কিন্তু আমি তোমার বয়ফ্রেন্ড না।

অ : বয়ফ্রেন্ড না তো কী?

আ : কিচ্ছু না।

অ : তুমি চুপ করো তো! লজ্জার চোটে তুমি তোমার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছ। আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ো।

আ : আরে নাহ! ড্রাইভার মাইন্ড করবে।

অ : কী মুশকিল!

আ : যদি শোয়াতেই চাও তাহলে গাড়ি ফাঁকা করো।

অ : গাড়ি ফাঁকা করব কিভাবে?

অা : ড্রাইভারকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দাও।

২৭ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com