হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৫

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৫

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৫
798
0

২৪ পর্বের লিংক

পর্ব-২৫

ভুলেই গেছিলাম বিল্যাই মিঞার কথা। ভুলে যাওয়াটা স্বাভাবিক। কেননা সে এমন আহামরি কেউ না যে তাকে মনে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত সে আমাকে বেশ মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ সে একদিন এসে হাজির। অনেক দিন পর তাকে দেখে বেশ অবাক হতে হলো। কারণ তার স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে সে অনেক দিনের রোগী। চেনাই যাচ্ছে না। তার গর্তে পড়া চোখে মুখে ফুটে উঠেছে অসহায়ত্ব। এ অবস্থায় তাকে দেখব ভাবি নি। খুব মায়া হলো তার জন্য।

বললাম, ‘কী ব্যাপার, তুমি কি অসুস্থ?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘জি ছার এক অর্থে অসুস্থ…’

‘মানে? এক অর্থে মানে কী?’

‘মানে ফজলুল হক ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি আছে। মনে হয় বাঁচবে না। আপনি যদি একবার গিয়ে আমার ছেলেটাকে দেখে দোয়া করে আসতেন ছার…’

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে যাব।’

বিল্যাই মিঞা উঠে পড়ল। আমি আর কোনো কথা বলার সুযোগ পেলাম না।


একজন চিরকুমারের জন্য বাবা হওয়ার প্রসঙ্গ মোটেও শোভন নয়।


সাদ্দাম বা ওবামা—এর কোনোটাই না। বিল্যাই মিঞা তার ছেলের নাম রেখেছে শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের নামে। চিন্তা করে দেখলাম, ব্যাপারটা একেবারে মন্দ না। একটি অখ্যাত ছেলের সাথে মিশে থাকবে খ্যাতিমান কোনো মানুষের নাম। ছেলেটি বড় হয়ে যখন জানবে তার নামের ইতিহাস, তখন তার মধ্যে এক ধরনের দায়বদ্ধতা কাজ করলেও করতে পারে। অন্তত বাবার চাওয়ার প্রতি শ্রদ্ধা তো থাকবেই।

তাই নবাগত সন্তানের নাম রাখার ক্ষেত্রে অবশ্যই সব মা-বাবাদের উচিত এই ব্যাপারটা মাথায় রাখা। এটা ঠিক যে, সুন্দর একটি নামের কারণে বদলে যেতে পারে কারো জীবন।

হঠাৎ বিল্যাই মিঞার ছেলেকে কেন্দ্র করে আমার মনে একটি প্রশ্ন উঁকি দিলো। আচ্ছা, আমি যদি বাবা হতাম, তাহলে আমার ছেলের কী নাম রাখতাম?

নাহ, চিন্তার নিয়ন্ত্রণ দরকার। হঠাৎ আমার ছেলের নামের প্রসঙ্গ আসছে কেন? একজন চিরকুমারের জন্য বাবা হওয়ার প্রসঙ্গ মোটেও শোভন নয়। তাই নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিলাম। চাইলে আপনারাও আমাকে ধিক্কার দিতে পারেন। আমি কিছু মনে করব না।

দম বন্ধ হয়ে আসা ঢাকা মেডিকেলের চাইল্ড ইউনিটে গিয়ে মনে হলো, শিশুরা নরকে আছে। এই অবস্থায় কাউকে খুঁজে বের করা জটিল কাজ। তার উপর আমি ওয়ার্ড বা বেড নাম্বার কিছুই জানি না। এসব না জেনে আসাটা মস্ত ভুল হয়েছে। কতক্ষণ যে খুঁজতে হবে আল্লাহ জানে।

যাই হোক, আমি দ্রুততার সাথে প্রত্যেকটা ওয়ার্ডের রোগীর দিকে তাকিয়ে বিল্যাই মিঞাকে খুঁজতে লাগলাম। প্রায় আধ ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর যা দেখলাম তা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি একেবারে হা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। অনিতা একটি বাচ্চাকে চিকিৎসা দিচ্ছে। ভাবলাম কেটে পড়ি কিন্তু ততক্ষণে আমি অনিতার চোখে পড়ে গেছি।

অনিতা আমাকে তার চেম্বারে নিয়ে গেল। কফি খেতে দিয়ে জানতে চাইল আমি কাকে দেখতে এসেছি। আমি বিল্যাই মিঞার ছেলের ব্যাপারে বললাম।

অনিতার সঙ্গে কথা বলে জানলাম, বিল্যাই মিঞার সাথে তার পরিচয় হয়েছে। কারণ সে বিল্যাই মিঞ্যার ছেলের চিকিৎসা দিচ্ছে। শুনে খুব ভালো লাগল। যাক, ফজলুল হক অন্তত ভালো চিকিৎসা পাবে।

অনিতা বলল, ‘তুমি কি জানো, বিল্যাই মিঞার লাভ ম্যারেজ ছিল?’

‘না।’


স্ত্রী মরে যাওয়ার পর সাতদিন বিল্যাই মিঞা পানি ছাড়া অন্য কিছু খায় নি?


হাসপাতালের চেম্বারে বসে বিল্যাই মিঞার লাভ ম্যারেজ প্রসঙ্গ টেনে আনায় আমি বিরক্ত হলাম। যদিও অনিতাকে তা বুঝতে দিলাম না। মনে মনে ভাবলাম, কখন কোথায় কী বলা দরকার এই মেয়েটা তা জানে না।

অনিতা বলল, ‘ইউ হ্যাভ টু নো। তোমার জানা উচিত। কারণ, বিল্যাই মিঞার কাহিনি জানলে তুমি বুঝতে পারবে স্যাকরিফাইস কাকে বলে। মনে কতটুকু গভীর প্রেম থাকলে কোনো মানুষ তার স্ত্রীর জন্য নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দিতে পারে—বিল্যাই মিঞা তার উদাহরণ।’

আমি বুঝতে পারলাম না অনিতা আসলে কী বলতে চাইছে। তাই তার দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম।

অনিতা বলতে লাগল, ‘বিল্যাই মিঞার সাথে আমার কথা হয়েছে। আমি জেনেছি, তার স্ত্রী মরে যাওয়ার পর এই পৃথিবী তার কাছে আর ভালো লাগছে না। এমনকি তার ছেলেটির প্রতিও তার কোনো মায়া হচ্ছে না। তার ছেলের দিকে তাকানো মাত্র স্ত্রীর কথা মনে পড়ছে। সে সহ্য করতে পারছে না।’

আমি এতক্ষণে বুঝলাম অনিতা আসলে কী বোঝাতে চাইছে। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার কিছু বলতে ইচ্ছা হলো না।

‘তুমি কি জানো স্ত্রী মরে যাওয়ার পর সাতদিন বিল্যাই মিঞা পানি ছাড়া অন্য কিছু খায় নি?’

আমার কাছে বিরক্তিকর লাগছিল। তাই বললাম, ‘এসব ব্যাপারে তোমার নজর দেওয়ার দরকার নাই। তোমার কাজ চিকিৎসা দেওয়া। বিল্যাই মিঞার ছেলেকে ভালোভাবে চিকিৎসা দাও। তাকে সারিয়ে তোল।’

আমার কথায় অনিতা নিরাশ হলো নাকি রাগান্বিত হলো বুঝতে পারলাম না।

সে শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘আল্লাহ চান তো বিল্যাই মিঞার ছেলে অতি শীঘ্র সুস্থ হয়ে উঠবে। কিন্তু বিল্যাই মিঞাকে নিয়ে কিছু বলতে পারছি না।’

কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল, ‘মানে! বিল্যাই মিঞার কী হয়েছে?’

‘বিল্যাই মিঞা খুব অসুস্থ।’

২৬ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com