হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৪

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৪

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৪
531
0

২৩ পর্বের লিংক

পর্ব-২৪

বিল্যাই মিঞা কেন ‘বিল্যাই মিঞা’ সেটা জানা হয়েছে। কিন্তু সে কেন ভালো মানুষ সেটা জানা হয় নি। ধানমন্ডি লেকের বেঞ্চিতে বসে এ কথাটিই ভাবছিলাম আর মনে হচ্ছিল, হয়তো এখনই তাকে দেখতে পাব। কিন্তু না, এল খাওজানি বরকত। বুঝলাম আমাকে দেখে সে খুব খুশি হয়েছে। তার ভাব খানা এমন যেন আমাকে পেয়ে আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেছে। কিন্তু আমি বুঝি এগুলো সবই কৃত্রিম। আমাকে খুশি করার বাহানামাত্র।

খাউজানি বরকত বলল, ‘ছার, আপনি অনেক দিন বাঁচবেন।’

আমি বললাম, ‘কেন?’

‘কারণ এতক্ষণ আপনার কথাই ভাবছিলাম। ভাবতে না ভাবতেই আপনার দেখা। দেখলেন না আপনাকে দেখে কেমনে দৌড়াইয়া আসলাম?’

‘হুম, দেখেছি। ২০০ মিটার দৌড় দিয়েছিলে। তা তোমার ব্যবসা কেমন চলছে?’

‘আর ব্যবসা! ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠার জো হইছে ছার।’

‘কেন? কী সমস্যা?’

‘কেন আবার, দ্যাশের হালহকিত জানেন না? দিনের পর দিন হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও, পিকেটিং…এই পরিস্থিতিতে ব্যবসা করা যায় বলেন?…’


টাকার কাছে পিস্তল-কামান-গোলাবারুদ-র‌্যাব-পুলিশ সব ফেউশা।


বুঝতে পারলাম সে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থতি নিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। কিন্তু আমি এ ব্যাপারে একেবারেই অনাগ্রহী। ফলে একে চাঞ্চ দেওয়া যাবে না। যেভাবেই হোক থামাতে হবে। কিন্তু কিভাবে? টাকা। টাকা যেমন কাঠের পুতুলকে কথা বলাতে পারে তেমনি জীবন্ত মানুষের মুখও বন্ধ করতে পারে। টাকার অনেক শক্তি। টাকার কাছে পিস্তল-কামান-গোলাবারুদ-র‌্যাব-পুলিশ সব ফেউশা।

দ্রুত তাকে ১০০ টাকা দিয়ে বললাম, ‘ভালো থেকো।’

খাওজানি বরকত টাকা পেয়ে খুব খুশি হলো এবং সঙ্গে সঙ্গে তার মুখও বন্ধ হলো। যদিও সে তার মুখ চুলকাতে থাকল। অর্থাৎ মুখ বন্ধ করায় তার অশ্বস্তি হচ্ছে, পেটের ভেতর থেকে কথারা মুখ পর্যন্ত চলে এসেছিল, মুখে আটকা পড়ার কারণে কথারা ছুটোছুটি করছে। তাই মুখের চামড়া চুলকাচ্ছে।

সে কিছু বলতে চায়। কিন্তু আমি তার কণ্ঠ রোধ করে দিয়েছি। কাজটা কি ঠিক হয়েছে? আমি কি তার বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছি?

এইসব ভেবে তাকে বললাম সুযোগ দিলাম, ‘বরকত!’

‘জি ছার।’

টকশোর বয়স্ক উপস্থাপকের মতো বললাম, ‘এক মিনিটের মধ্যে তুমি তোমার বক্তব্য শেষ করো। সময় খুব কম।’

খাউজানি বরকত খুশি হয়ে বলল, ‘আজকে আপনাকে স্মার্ট লাগতেছে!’

খাউজানি মূল প্রসঙ্গ রেখে অন্য কথা বলায় আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘মানে কী?’

‘এদিকে আজকে আবার উল্টাপাল্টা মাইয়াগো আনাগোনা বেশি কিনা! তাই বললাম আর কী!’

কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে গিয়ে হালাকা কাশির সাথে গলা খাঁকারি দিলাম, ‘ইয়ে মানে…উল্টাপাল্টা মাইয়া মানে কী?’

‘আরে বুঝলেন না ছার! ইশারা করলেই যারা চইলা আসে। বাসা পর্যন্ত সার্ভিস দেয়।’

আমি আরো জোরে গলা খাঁকারি দিলাম। যাতে সে এসব পচা কথা বন্ধ করে। প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বললাম, ‘যে হারে হরতাল হচ্ছে, কী আর বলব, খুব ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে দেশের। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। গার্মেন্টস সেক্টরে সব চেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। সহিংস হরতালে জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। মানুষ বিপাকে পড়ে যাচ্ছে…’

খাউজানি বরকত বলল, ‘ছার, আপনি সহজ-সরল জানতাম, কিন্তু এত যে লাজুক, তা জানতাম না।’

আমি বললাম, ‘না মানে…তোমার কি আরো কিছু টাকা লাগবে?’

খাউজানি বরকত বলল, ‘দিলে মন্দ হয় না ছার।’

তাকে আরো ১০০ টাকা দিলাম।

খাউজানি বরকত বলল, ‘আপনি কি আজও বিল্যাই মিঞার সাথে দেখা করতে আসছেন?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’

খাউজানি বরকত বলল, ‘কিন্তু কয়েক দিন ধরে বিল্যাই মিঞাকে দেখা যাচ্ছে না।’

আমি বললাম, ‘তার সাথে দেখা হলে আমার কথা বলো।’

খাউজানি বরকত বলল, ‘ঠিক আছে বলব।’

তারপর আমিও চুপ খাউজানি বরকতও চুপ।

অনেক ক্ষণ পর আমি বললাম, ‘ভালো থেকো।’

মানে কথা শেষ। খাউজানি এখন চলে গেলেই ভালো। খাউজানি বরকত বুদ্ধিমান। সে আমার মনের কথা বুঝতে পারল। তাই সসম্মানে সালাম প্রদর্শন করে চলে গেল।

আমিও হাঁটা দিলাম। ভাবলাম, পুরো লেকে একটা চক্কর দেই।

চক্কর দিতে গিয়ে একে একে আমড়াঅলা, ব্যাটারি চাচা, পর্বত আলী, মালী, গার্ড সবার সাথে দেখা হলো। সবাইকে ১০০ করে টাকা দিলাম। তারা আমার অমায়িক ব্যবহারে খুশি হলো। তাদের সবার কাছেই বিল্যাই মিঞার কথা জানতে চাইলাম। কিন্তু কেউ তার খবর দিতে পারল না। খুব চিন্তা হলো তার জন্য।

সেদিনের পর থেকে বিল্যাই মিঞার কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম। লোকটা আমাকে যথেষ্ট যন্ত্রণা দিয়েছে। তার সম্পর্কে আর কিছু জানতে চাই না। সে যে নিজেকে ভালো মানুষ দাবি করছে, এটা নেহায়েত ছেলে মানুষী ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং এরকম তুচ্ছ ব্যাপারে মাথা খাটানোর কোনো মানে হয় না। তারচেয়ে বরং আমার অসমাপ্ত উপন্যাসটাতে হাত দেওয়া ভালো। বেশ ভালো একটা প্লট। বছর তিনেক আগে লেখা শুরু করেছিলাম। প্রায় পঁচাত্তর ভাগ লেখা কমপ্লিট। বাকি পঁচিশ ভাগ শেষ করার এখনই সুযোগ। আমি এখন ঝামেলামুক্ত। অনিতা, বিল্যাই মিঞা এবং ডিরেক্টরগণ এরা কেউ আর ডিস্টার্ব করবে না। আমি স্থিরভাবে, নিবিষ্ট মনে কাজ করতে পারব। এই ভেবে নিজেকে বেশ হালকাবোধ করতেই আসগরকে ডেকে পাঠালাম।


আল্লাহ আপনাকে ডাবল গুনা দিবে। দোজখের ডাবল-ড্যাকার বাসের ছাদ থিকা জ্বলন্ত আগুনে ফেলবে।


আসগর বাতাসের বেগে এসে হাজির হলো।

‘কেউ এলে বলে দেবে আমি নাই।’

আসগর জিহবায় কামড় কেটে বলল, ‘না’য়ুজুবিল্লাহ মিন জালেক! এইডা আপনি কী বললেন ছার!’

‘কেন, সমস্যা কী?’

আসগর বলল, ‘এমন কথা বলতে হয় না ছার। আল্লায় গুনা দেন।’

‘গুনা দিলে আমাকে দেবে—তোমার সমস্যা কী?’

আসগর বলল, ‘না ইয়ে মানে…এক মুসলিম যদি আরেক মুসলিমের সামনে গুনাহগার হয়, তাইলে পয়লা মুসলিমের উচিত তাকে গুনাগার হইতে না দেওয়া। অন্তত চেষ্টা করা।’

প্রচণ্ড রেগে গেলেও শান্ত কণ্ঠে বললাম, ‘তোমাকে যা বলতে বলেছি, তুমি তাই বলবে।’

আসগর বলল, ‘মিথ্যা বলা মহাপাপ। আপনি একজন জ্ঞানীগুণী মানুষ হয়ে আমাকে মিথ্যা বলতে বলছেন? আল্লাহ আপনাকে ডাবল গুনা দিবে। দোজখের ডাবল-ড্যাকার বাসের ছাদ থিকা জ্বলন্ত আগুনে ফেলবে।’

‘তুমি মহান। তোমার মতো মহান আসগর আলী যতদিন বেঁচে আছে, পৃথিবীতে ততদিন শান্তির পায়রা উড়ে বেড়াবে। মানবজাতি সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। তোমার জয় হোক। জয় আসগর আলী।’

আসগর আলীর মন খারাপ হলো। বলল, ‘ছার, কিছু মনে করবেন না। গুরু আমাকে এইগুলা শিখায়া দিছেন। না হলে আপনার কথা শুনতাম।’

‘তুমি এবার আসতে পারো।’

আসগর দরজা পর্যন্ত গিয়েও ফিরে এল। আমার দিকে ফ্যালফ্যালভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল।

‘আর কী?’

আসগর বলল, ‘ছার, আপনি যা বলতে বলছেন তাই বলব। মানে কেউ এলে বলে দিবো, আপনি নাই।’

‘কেন? সিদ্ধান্ত বদলালে কেন?’

আসগর বলল, ‘চিন্তা করে দেখলাম, গুরু আমার সামনে নাই। আমি কী বললাম আর না বললাম তিনি তা জানতে পারবেন না। তাই রাজি হলাম।’

‘তুমি এবার আসতে পারো।’

আসগর চলে গেল।

২৫ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com