হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৩

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৩

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২৩
447
0

২২ পর্বের লিংক

পর্ব-২৩

খণ্ডত হাসান বলল, ‘হট নিউজ আছে স্যার! ভেরি সারপ্রাইজিং!’

আমি লেখার কাজে ব্যস্ত। ওর সঙ্গে বেশি কথা বলতে পারছি না। লিখতে লিখতেই বললাম, ‘বলে ফেলো।’

‘ডিরেক্টার শান্টু খানের ভিডিও ক্লিপ বের হয়েছে। চাইলে দেখতে পারেন। আমার ল্যাপটপে আছে।’

খণ্ডত হাসান জনৈক শান্টু খানের ভিডিও ক্লিপ দেখাল।

ভিডিও ক্লিপে যা দেখলাম তা কিভাবে যে বর্ণনা করব ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। পঞ্চাশোর্ধ ডিরেক্টর সাহেব তার হাঁটুর বয়সী এক সুন্দরী তরুণীর কামিজ উল্টে চা-কফি পান করার ভঙ্গিতে আস্তে আস্তে চুমুক দিচ্ছেন। কী জঘন্য ব্যাপার। ছি ছি! বেচারার বাসায় কি চা কফির আকাল পড়েছে?


শুধু ত্রিভুজ প্রেমের গল্প চায়। আরে বাবা যে লোকটা জীবনে প্রেমই করে নি সে কেমন করে প্রেমের গল্প লিখবে?


এক মুহূর্ত দেখেই আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম। আমার গা রি রি করে উঠল। ভেতরে ভেতরে ক্ষেপে গেলাম খণ্ডত হাসানের উপর। বেটার সাহস কত! আমাকে এইসব আজেবাজে জিনিস দেখাতে এসেছে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম এই ছোকড়া আজ থেকে আমার বাসায় নিষিদ্ধ। তাকে আর কোনো স্ক্রিপ্ট দেবো না। আজই আসগরকে বলে দেবো, সে যেন আমার ফ্ল্যাটে ঢুকতে না পারে।

খণ্ডত হাসান আমাকে এমন দুর্লভ জিনিস দেখানোর পর স্বভাবতই আশা করেছিল, আমি এ বিষয়ে কিছু বলব। আমাদের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা হবে। এই আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্কের বুনোট সুদৃঢ় হবে। সুদূর ভবিষ্যতে সে ফোনে অর্ডার দেওয়ামাত্রই আমি তার জন্য লেখা শুরু করে দেবো। কিন্তু না, আমার সাথে এরকম সমঝোতামূলক সম্পর্ক হওয়া এত সহজ নয়। সামান্য এই ভিডিও ক্লিপের মাধ্যমে তো নয়ই।

ফলে শিমুল তুলার মতো যে আলোচনা ফেটে পড়ার কথা, নিমেষে তা লজ্জাবতীর মতো ঝিমিয়ে পড়ল। খণ্ডত হাসান নাট্য নির্দেশক, স্বভাবতই চতুর ছেলে। আমি যে সাড়া দিতে চাইছি না সহজেই বুঝতে পারল।

ফলে দ্রুততার সাথে ল্যাপটপ গুটিয়ে নিতে নিতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মূল প্রসঙ্গে এল। মানে লেখার কত দূর!

এ বিষয়টা আমি সব সময় সিক্রেট রাখি। লেখা শুরু করেছি কিনা, কত দূর এগিয়েছে বা কবে শেষ হচ্ছে—এই তথ্যগুলো আমি কাউকে দিতে চাই না। এ ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই মনে হয়, আমার লেখার ওম নষ্ট হচ্ছে। এমনও হয়েছে, আমি লেখা শেষ করে প্রুফ দেখছি, পাবলিশার জানতে চাইছেন কবে পাঠাচ্ছি; তখন তাকে বলে দিয়েছি নেক্সট উইকে হয়তো শুরু করব। আমার পাবলিশাররা আমার সম্পর্কে জানে। তাই আমি যা বলি তারা তাই বিশ্বাস করে। কিন্তু এইসব নাট্য নির্দেশকদের নিয়ে পড়েছি মহাবিপদে। তারা আমাকে না চেনে, না বোঝে। শুধু ত্রিভুজ প্রেমের গল্প চায়। আরে বাবা যে লোকটা জীবনে প্রেমই করে নি সে কেমন করে প্রেমের গল্প লিখবে? তাও আবার ত্রিভুজ প্রেমের গল্প। আমি এদের হাত থেকে বাঁচতে চাই।

যাই হোক, লেখা শেষ হলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে—এই বলে খণ্ডত হাসানকে বিদায় করলাম। খণ্ডত হাসান চলে যাওয়ার পর ভিডিও ক্লিপের দৃশ্যটা চোখের সামনে পুনরায় ভেসে উঠল। আমার মধ্যে অস্থিরতা শুরু হলো। নিজের অফিস রুমের মধ্যে ডিরেক্টর ফস্টিনস্টি করছিল। তখন ধুরন্ধর কেউ একজন দরজার ফুটো দিয়ে তা ক্যামেরা বন্দি করেছে। তারপর ছেড়েছে ইন্টারনেটে। আর এসব হয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশের কল্যাণে! হায় ডিজিটাল!

লেখায় আর মন বসাতে পারলাম না। আমার এই একটা বদ-অভ্যাস। একবার কোনো কারণে মনঃসংযোগ নষ্ট হলে আর লিখতে পারি না। অথচ শুনেছি অনেক লেখক শত ঝড়-ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করেও লেখা চালিয়ে যেতে পারেন। তাদেরকে আমার মনে হয় গাধা। গাধার জীবন আমার ভালোলাগে না। আমি স্বাধীনচেতা মানুষ। আমার যখন ইচ্ছে হবে তখন কাজ করব। যখন ইচ্ছে হবে না, কাজ বন্ধ রাখব। ব্যস।


গুরুর কাছে রোগীর নাম ও বয়স বললেই সে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।


অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রিসিভ করলাম। ফোনদাতার নাম আদনান আমিন। তরুণ নাট্য ডিরেক্টর। তার ভালো একটি স্ক্রিপ্ট প্রয়োজন। খুব আশা নিয়ে আমাকে ফোন করেছে। কিন্তু আমি তাকে বলে দিলাম আগামী তিন বছর টিভি নাটকের স্ক্রিপ্ট লিখব না। আদনান যারপরনাই হতাশ হলো। আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পেলাম তাকে।

ইন্টারকমে আসগরকে ডেকে পাঠালাম। জানতে চাইলাম মানুষের মন ভালো করার কোনো পদ্ধতি তার জানা আছে কিনা। আমার কথা শুনে সে তাজ্জব হয়ে গেল। বোয়াল মাছের মতো হা করে তাকিয়ে রইল।

আমি বললাম, ‘তোমার হা করা মুখ বন্ধ করো। মাছি ঢুকবে।’

‘অ্যাঁ!’ সে যেন সম্বিত ফিরে পেল, ‘ইয়ে মানে ছার…কোনো সমস্যা?’

‘এত ঢং করার দরকার নাই। তোমার কাছে যা জানতে চেয়েছি তার উত্তর দাও। দয়া করে বেশি সময় নেবে না।’

আসগর জানাল, মন ভালো করার কোনো পদ্ধতি তার জানা নাই। তবে তার একজন গুরু আছে। গুরুর নাম ছাও মিয়া। মনোরোগের যাবতীয় চিকিৎসা সে করে থাকে। টোটকা চিকিৎসা। গুরুর কাছে রোগীর নাম ও বয়স বললেই সে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। আমি চাইলে সে তার গুরুর কাছ থেকে ওষুধ এনে দিতে পারবে। চিন্তা করে দেখলাম, ব্যাপারটা সময়সাপেক্ষ তাই আগ্রহ দেখালাম না।

কিন্তু আসগর মিয়া আমাকে পেয়ে বসল, ‘ছার, না করবেন না। আমি যাব আর আসব। গুরুর আস্তানা গাবতলী গরুর হাটের দক্ষিণ পাশে। তার কাছে আপনার খবর বলার সাথে সাথে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে।’

অগত্যা তাকে সম্মতি দিলাম।  আসগরের কথা মতো একটি কাগজে আমার নাম ও বয়স লিখে দিলাম। সাথে কিছু টাকা। আসগর চলে গেল। ঘণ্টা খানেক পর গাবতলী গরুর হাট থেকে ফোন করে আসগর জানতে চাইল আমার মন ভালো হযেছে কিনা। আসগরের কথা বলার ধরন শুনে মনে হলো এতক্ষণে আমার মন ভালো হয়ে যাওয়ার কথা। তার প্রত্যাশাকে প্রশ্রয় দিলাম। বললাম, কিছুটা ভালো হয়েছে।

আসগর খুব খুশি হয়ে বলল, ‘ছার, আধা ঘণ্টার মধ্যে পুরোপুরি ভালো হয়ে যাবে। গুরু ছাও মিয়ার কারিশমা বলে কথা!’

আসগর ফিরে এল কাগজে মোড়ানো কালো রঙের একটি বড়ি নিয়ে। আবার বড়ি কেন? আসগর জানাল, সেটি খেলে আগামী তিন মাস আমার মন খারাপ তো হবেই না বরং প্রফুল্ল থাকবে। আমি আসগরকে বড়িটি রেখে যেতে বললাম।

আসগর চলে যাওয়ার পর কাগজে মোড়ানো বড়িটি খুললাম। জিনিসটা দেখতে ঠিক ছাগলের লাদির মতো। এ জিনিস খেলে আগামী তিন মাস আমার মন প্রফুল্ল থাকবে। বিস্ময়কর ব্যাপার-স্যাপার। জিনিসটা খেতে আমার মন বাধ সাধল। কেবলি মনে হতে লাগল, এটি তৈরি হয়েছে গাবতলী হাটের গোবর বা লাদি থেকে। খাওয়ামাত্র আমার বদহজম শুরু হবে। মহাখালির কলেরা হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। তাই গুরুর দেওয়া বড়িটা বিসমিল্লাহ বলে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিলাম।

তারপর থেকে আসগর ইন্টারকমে ঘণ্টায় ঘণ্টায় আমার মনের খবর নিতে লাগল। আমি তাকে যথারীতি জানিয়ে দিলাম, ‘মেরা দিল বহাৎ আচ্ছা হ্যে!’


কোনোদিনই টিভি নাটক লিখব না। এটা আমার প্রতিবাদ।


আসগর যারপর নাই খুশি হলো। সে তার সাহেবের মন ভালো করে দিয়েছে। এ যে অনেক বড় কৃতিত্ব। এখন সে ইচ্ছে করলেই ডিউটি ফাঁকি দিতে পারবে, তারপরও বকশিশ পাবে। আমি বকশিশ দিতে বাধ্য থাকব।

আমার মন সত্যি সত্যি ভালো হচ্ছিল। মন ভালো করার জন্য এটাও এক ভালো ওষুধ। আমার সাইকিয়াটিস্ট বন্ধু ড. কেরামত আলীর কাছ থেকে জেনেছি, প্রচণ্ড মন খারাপ থাকা সত্ত্বেও কোনো মানুষ যদি মনে করে তার মন ভালো হচ্ছে, তাহলে নাকি সত্যি সত্যি তার মন ভালো হয়ে যেতে পারে। মিরাক্যালি আমার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তেমন হচ্ছিল।

কিন্তু একটি ফোনকলের কারণে আবার মন খারাপ হয়ে গেল। কারণ ফোনটা ছিল টিভি মিডিয়ার জনৈক নাট্য নির্দেশকের। তারও প্রয়োজন স্ক্রিপ্ট। যথারীতি তাকেও বলে দিলাম, আগামী তিন বছর স্ক্রিপ্ট লিখব না।

একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম, টিভি নাটকের নির্দেশক ফোন করলেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আর এটার কারণ শান্টু খানের ভিডিও ক্লিপ। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, আর কোনোদিনই টিভি নাটক লিখব না। এটা আমার প্রতিবাদ। আপাতত নীরব প্রতিবাদ। প্রয়োজনে সবাইকে জানান দিয়ে প্রতিবাদ করব। যাগ্যে এ বিষয়টা নিয়ে লিখতে আর ভালো লাগছে না। মূল বিষয়ে যাওয়া দরকার।

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com