হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২২

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২২

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২২
465
0

২১ পর্বের লিংক

পর্ব-২২

অনিতা সত্যি সিত্য আমার মাথায় বিলি কেটে দিতে লাগল।

যদিও আমি এটা চাচ্ছি না। যার সাথে কোনো সম্পর্ক নাই সে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে এটা হতে পারে না। কিন্তু অনিতা নাছোড় বান্দা। মনের কথাটা খোলাসা করে তার কাছে বলা যাচ্ছে না। তাই আমি সুবোধ বালকের মতো শুয়ে রইলাম। আরামে চোখের পাতা ভারি হয়ে এল। চেষ্টা করেও তাকিয়ে থাকতে পারলাম না।


আমার সঙ্গী নতুন সঙ্গী জুটিয়ে নিয়েছে।


ঘুমের জন্য প্রায়শ আমি উল্টো গুনি। ভেড়া গুনি। তারপরও ঘুম আসে না। অথচ আজ কত সহজে ঘুম আসছে! এই তো ক’দিন আগের ঘটনা। উল্টো গুনতে গুনতে অস্থির হয়ে শেষে কল্পনায় ভেড়া গুনেও ঘুমাতে পারি নি। আসলে ঘুম হলো আল্লাহর দানের জিনিস। কেউ লাখ টাকার বিছানায় শুয়েও ঘুমাতে পারে না আবার কেউ ফুটপাথে শুয়েই দিব্বি ঘুমায়।

মনে হচ্ছে আমি বেশ ফিলিংসের মধ্যে আছি। মেঘের মতো আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছি। একটা ফিলিংসের গান মনে এল: ফিলিংস করুম তালগাছের আগায়…(পরের লাইনগুলো মনে নাই।)

মেঘের মতো ভাসতে ভাসতে মনে মনে গাইলাম গানটি। আমি এখন মেঘ। ইচ্ছে মতো ভেসে বেড়াচ্ছি। যেখানে ইচ্ছে যেতে পারি। আমেরিকা সুইডেন সুইজারল্যান্ড পৃথিবীর যেকোনো দেশে। আমার কোনো পাসপোর্ট লাগবে না। আহা কী মজা!

ইচ্ছে হলো অনিতাকেও বলি, তুমিও মেঘ হও। আমরা একসাথে ভাসি। পরে মনে হলো, অনিতা হয়তো আমার প্রস্তাবে রাজি হবে না। তাই কথাটা তাকে বলাও হলো না। এইসব ভাবতে ভাবতে আধ-ঘুম আধ-জাগরণে মর্মান্তিক একটি স্বপ্ন দেখলাম:

মেঘ নয় আমি আসলে চড়ুই পাখি হয়ে গেছি। ফুড়ুত ফুড়ুত উড়ে যাচ্ছি এ ডাল থেকে ও ডালে। এ বাড়ির জানালা থেকে ও বাড়ির জানালায়। খুঁজে বেড়াচ্ছি আমার সঙ্গীকে। তিন দিন হলো আমার সঙ্গী আমাকে ছেড়ে গেছে। তাকে খুঁজতে খুঁজতে আমি যখন ক্লান্ত তখন একটা চড়ুই এসে আমার কানে কানে যা বলল তাতে আমার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার দশা হলো। খুব কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম।

আমার সঙ্গী নতুন সঙ্গী জুটিয়ে নিয়েছে। নতুন জীবন শুরু করেছে। আমি ধানমন্ডির এক বাসার সবুজ গ্রিলের শিকে বসে বৃষ্টিতে ভিজছি। মনে মনে বললাম, হে বৃষ্টি! আমার সকল বেদনা ধুয়ে-মুছে দাও। আর আমার জন্য দোয়া করো, আমিও যেন চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে নতুন সঙ্গী জুটিয়ে নিতে পারি। এমন সময় একটি পিচ্চি ছেলে এসে আমার লেজ ধরে টান দিলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে উড়ে গিয়ে নিজেকে রক্ষা করলাম। ইচ্ছে করেছিল বদের বদ পিচ্চিটাকে একটা ঠোকর বসিয়ে দেই।

যাই হোক, তারপর একটি জিকা গাছের ডালে বসে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলাম। আর তখনই অদ্ভুত একটি ঘটনা ঘটল। অপরিচিত একটি চড়ুই উড়ে এসে আমার পাশে বসল। আমার সঙ্গে খাতির জমাতে চাইল। আমি তাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখলাম। মনে হলো সে ক্ষুধার্ত।

আমার সান্নিধ্যে এসে চড়ুইটা বলল, ‘তুমি কি আমাকে সাহায্য করতে পারো?’

আমি বললাম, ‘নিশ্চয়ই। কী সাহায্য করতে হবে বলো?’

সে বলল, ‘আমার সঙ্গীটি খুবই অসুস্থ। তুমি কি তার জন্য কিছু খাবার জোগাড় করে দিতে পারো?’

আমি হতাশ হয়ে বললাম, ‘এখন সম্ভব নয়। ব্যস্ত আছি।’

চড়ুইটা চলে গেল। আমি চুপচাপ বসে রইলাম।

একফোঁটা বৃষ্টি পড়ল ঠিক আমার চোখের পাতায়। আর তখনই ঘুম ভেঙে গেল। দেখি, অনিতা কাঁদছে। বুঝলাম বৃষ্টি নয়। অনিতার চোখের জল পড়েছে আমার চোখের পাতায়। আমি হতবিহ্বল হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

অনিতা বলল, ‘অমন করে তকিয়ে আছো কেন? তোমার জানতে ইচ্ছে হচ্ছে না, আমি কাঁদছি কেন?’

আমি বললাম, ‘ইচ্ছে হচ্ছে বলেই তো তাকিয়ে আছি।’

অনিতা বলল, ‘জানু! আমার কিছু হয় নি। এ কান্না সুখের কান্না। আজ আমি তোমাকে পাইলাম। আমার করে পাইলাম। আনন্দে তাই চোখে জল এসে পড়েছে!’


আমি বললাম, ‘জানু কথাটার মানে কী?’


আমি তো তার কাছে ধরা দেই নি। যা করছি, পুরোটাই অভিনয়। তাহলে সে আমাকে কিভাবে পাইল? নাহ! মেয়েটাকে যথেষ্ট বুদ্ধিমতী মনে করেছিলাম। এখন দেখছি সে একেবারেই বোকা। কাউকে না পেয়েও সে বলছে, পাইলাম। কারো মাথা টিপে দিলেই কি তাকে পাওয়া হলো? মনে মনে হাসলাম।

অনিতা বলল, ‘জানু, তোমার কেমন লাগছে?’

আমি বললাম, ‘ভালো।’ তার পর কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললাম, ‘আমি কি একটা কথা বলতে পারি?’

অনিতা বলল, ‘একটা কেন তুমি হাজারটা কথা বলতে পারো। আমি তোমার সব কথা মুগ্ধ হয়ে শুনব।’

আমি বললাম, ‘তুমি আমাকে জানু বলছ কেন?’

অনিতা অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি আমার জানু তাই জানু বলছি।’

আমি বললাম, ‘জানু কথাটার মানে কী?’

অনিতা বলল, ‘মানে হলো জান। জানকে আদর করে সবাই জানু বলে।’

আমি বললাম, ‘একজন মানুষ আর একজনের জান হয় কিভাবে? প্রত্যেকেরই তো নিজস্ব জান থাকে। তুমি সাইন্সের ছাত্রী অথচ অবৈজ্ঞানিক কথা বলছ কেন?’

অনিতা খিলখিল করে হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে বলল, ‘তুমি দেখছি কিছুই বোঝো না? আমার বুদ্ধু একটা! বুঝেছি, তোমাকে আমার বুঝিয়ে-পড়িয়ে নিতে হবে। আর কোনো কথা নয়। ঘুমিয়ে পড়ো। আমি আবার তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।’

আমি বললাম, ‘তুমি কতক্ষণ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে?’

অনিতা বলল, ‘মেয়েরা কোনোরকম ক্লান্তি ছাড়াই পতির মাথায় সারাজীবন হাত বুলিয়ে দিতে পারে।’

আমার চোখ আবার বুজে এল। তন্দ্রার মধ্যে শুনতে পেলাম বিড়ালের মিঞাউ ডাক। হয়তো রান্না ঘরে বিড়াল ঢুকেছে। একবার ভাবলাম উঠে গিয়ে বিড়াল তাড়িয়ে দিয়ে আসি। পরে মনে হলো, বিড়ালে খাওয়ার মতো কোনো কিছু নাই রান্না ঘরে। মিঞাউ মিঞাউ ডেকে এক সময় বিরক্ত হয়ে চলে যাবে।

কিন্তু এই বিড়ালের ডাককে কেন্দ্র করেই বিল্যাই মিঞার কথা মনে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তন্দ্রাভাবও কেটে গেল। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম অনিতার দিকে। অনিতা বিস্মিত হলো। আমি উঠে বসলাম।

অনিতা বলল, ‘উঠছ কেন? কী হলো হঠাৎ?’

আমি বললাম, ‘তুমি কি বিল্যাই মিঞাকে চেনো?’

‘বিল্যাই মিঞা!’ অনিতা বিস্মিত হয়ে বলল, ‘সে আবার কে?’

আমি তার কাছে বিল্যাই মিঞা সম্পর্কে সবিস্তারে বললাম। সব শুনে অনিতা বিল্যাই মিঞার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠল।

আমি বললাম, বিল্যাই মিঞার জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। বিশেষ করে তার ছেলেটির জন্য। ছেলেটি এখন কী অবস্থায় আছে কে জানে!

বিল্যাই মিঞার প্রতি অনিতার আগ্রহ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কারণ, তার মূল আগ্রহ আমি। তার কথা শুনে বুঝতে পারলাম, আজ সে একটা এসপার-ওসপার করতে এসেছে। রান্না করে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো এগুলো উপলক্ষ মাত্র। আসল ব্যাপার হলো সে আমাকে বিয়ে করতে চায়। তার বিবেচনায় আমাদের প্রেম পর্ব শেষ। স্বাভাবিক নিয়মে প্রেম পর্ব শেষে বিয়ে পর্ব। এখন বিয়ে করতে হবে। মেয়েটার কথা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার জো হলো। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।


যাকে ভালোবাসি না তাকে বিয়ে করার প্রশ্নও উঠে না।


অনিতা বলল, ‘আগামী পূর্ণিমায় শুভ কাজটা সেরে ফেলতে চাই।’

আমি নীরব।

সে বলল, ‘তোমার মত কী?’

আমি নীরব।

সে বলল, ‘তোমার এই নীরবতা কি সম্মতির লক্ষণ?’

আমি বললাম, ‘না।’

সে বলল, ‘না মানে?’

আমি বললাম, ‘না মানে আমি তোমাকে বিয়ে করছি না।’

এই কথা শুনে অনিতা রেগেমেগে আগুন হয়ে ওঠে পড়ল। আমি তাকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম যে, আমাদের মধ্যে কোনো রিলেশন হয় নি। সে যা ভাবছে তা একান্তই ছেলেমানুষী। সুতরাং এটা সম্ভব নয়। কিন্তু সে আমার কোনো কথা শুনল না। কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।

ঠিক এ সময়টাতে আমার দ্বিতীয় সত্তার উপস্থিতি টের পেলাম। তার সঙ্গে আমার বাকযুদ্ধ শুরু হলো।

দ্বিতীয় সত্তা: ‘কারো মনে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। তাকে তোমার ফেরানো উচিত।’

আমি: ‘আমি তাকে কষ্ট দেই নি। সে নিজে নিজে কষ্ট পেলে আমার কিছু করার নেই।’

দ্বিতীয় সত্তা: ‘সে তোমাকে গভীরভাবে ভালোবাসে। তোমাকে বিয়ে করতে চায়।’

আমি: ‘কিন্তু আমি তাকে ভালোবাসি না। যাকে ভালোবাসি না তাকে বিয়ে করার প্রশ্নও উঠে না।’

দ্বিতীয় সত্তা: ‘এজন্য তোমাকে পস্তাতে হবে।’

আমার উপর বিরক্ত হয়ে দ্বিতীয় সত্তা উধাও হয়ে গেল। আমি ভাবতে লাগলাম, অনিতাকে কি আমার ফেরানো উচিত? আমি কি তাকে এক বিন্দু হলেও ভালোবাসি?

না। তার প্রতি আমার কোনো টান নেই। তাকে আমি ভালোবাসি না। সুতরাং তাকে ফেরানোর কোনো প্রশ্নই উঠে না। বরং সে চলে যাওয়ায় আমি হালকাবোধ করছি এই ভেবে যে, সে আর আমাকে ফোন করবে না। আমার সাথে আর দেখা করবে না। এখন থেকে নিশ্চিন্তে নিজের কাজ করতে পারব। গুডবাই অনিতা।

২৩ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com