হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২১

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২১

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২১
545
0

২০ পর্বের লিংক

পর্ব-২১

বাইরে তখন কড়া রোদ। বারান্দার গ্রিলে দুটি চড়ুই পাখির খুনসুটি দেখছি। গাছের পাতা নড়ার মতো বাতাসও নাই। তার উপর লোডশেডিং। শার্টের বোতাম খুলে বুকে ফুঁ দিতে গিয়ে লক্ষ করলাম, বেশ কয়েকটা পাকা লোম আমার বয়স জানান দিচ্ছে। কিন্তু বয়স নিয়ে আমি কোনোদিনও চিন্তিত ছিলাম না। তাই মনে কোনো চিন্তার দানা বাধতে পারল না।

আমার দৃষ্টি চড়ুই পাখির দিকে। ওদেরকে বেশ আনন্দিত মনে হলো। জানতে ইচ্ছে হলো, ওরা এত আনন্দিত কেন? কী কথা বলছে নিজেদের মধ্যে? পাখিবিদরা পাখির আচরণ দেখে ওদের ভাষা বলতে পারে। আমি তেমন কেউ নই। তবে চড়ুই দুটিকে দেখে আমার নিশ্চিত মনে হচ্ছে, ওরা একে অপরের প্রেমে পড়েছে। অচিরেই প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হবে। নিরালায় বসে তারা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছে। হয়তো আমার বাসার ঘুলঘুলিতেই সংসার পাতবে। সুখে শান্তিতে বসবাস করবে। এক সময় তাদের সংসারে আলো হয়ে আসবে দুটি বাচ্চা। তাদের প্রেম পূর্ণ হবে।

হঠাৎ একটি মারমুখী চড়ুই এসে তাদের পাশে বসল। বেসুরো গলায় কিচিরমিচির করতে লাগল। বিরক্ত হয়ে প্রেমিক-প্রেমিকাদ্বয় উড়ে গেল। মারমুখী চড়ুইটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছুক্ষণ ভ্যাড়ান্ডা ভাজল তারপর সেও চলে গেল। আমি স্টাডি রুমে বসে ওদেরকে দেখছি। আমার হাতে অনেক কাজ। কিন্তু কাজ করতে ভালো লাগছে না। খণ্ডত হাসান তাগাদা দিয়েছে তার স্ক্রিপ্ট শেষ করে দিতে। অগ্রিম সম্মানীও দিয়ে গেছে। তারপরও লেখা বেরুচ্ছে না।

বারান্দায় গিয়ে বসলাম। চড়ুই দু’টি আবার ফিলে এল। আমি দ্রুত রুমে চলে গেলাম। বিদ্যুৎ ফিরে এল। এসি ছেড়ে দিলাম। রুমে বসেই ওদেরকে দেখতে লাগলাম। আর তখনই বেজে উঠল আমার মোবাইল ফোন। অনিতা। সে খুব রাগ করল আমার সঙ্গে। আমি কেন তাকে ফোন দিই নি, তাকে আমার ফোন দেওয়া উচিত ছিল কিনা—এইসব অভিযোগ ঝাড়ল। কথা বাড়াতে ভালো লাগছিল না। তাই বলে দিলাম, এমনটি আর হবে না। এ কথা শুনে তার রাগের বরফ যেন গলে গেল। তারপর বলতে শুরু করল গতরাতে আমাকে নিয়ে তার স্বপ্ন কাহিনি।


রক্ত দেখে প্রচণ্ড চিৎকার করে উঠেছিল অনিতা।


আমরা নাকি হানিমুনে গিয়েছি। স্পট: সিঙ্গাপুর। সেখানে টানা সাত দিন আমরা থেকেছি। কিন্তু সপ্তম দিন একটা অ্যাকসিডেন্ট ঘটেছে। তারপর থেকে তার মন খারাপ। ভেবেছিল আমি তাকে ফোন করব। কিন্তু আমি ফোন করি নি। অবশেষে সে-ই ফোন করেছে। আমার খুব জানতে ইচ্ছে হলো, সিঙ্গাপুরের অ্যাকসিডেন্ট বৃত্তান্ত। কিন্তু এটা জানতে চাওয়া যাবে না। কারণ জানতে চাওয়া মানেই অনিতাকে লাই দেওয়া। সুতরাং নীরব থাকাই শ্রেয়। আমি যথারীতি নীরব রইলাম। কিন্তু অনিতা নীরব থাকার পাত্রী নয়। বলল, আমার বোকামির কারণেই নাকি অ্যাকসিডেন্ট ঘটেছিল। মনে মনে বললাম, ‘সেটা কিরকম?’ কিন্তু প্রকাশে বললাম, ‘ও আচ্ছা।’

আমরা নাকি সিবিচে খুব আনন্দ করছিলাম। আমাদের আনন্দের সীমা ছিল না। বিশেষ করে আমার নাকি হিতাহিত জ্ঞান ছিল না। আমি এক পা, দুই পা করে কোমড় পানিতে নেমে গিয়েছিলাম। অনিতা বারবার নিষেধ করেছিল কিন্তু আমি তা কানেও নিচ্ছিলাম না। সাঁতরে সমুদ্রের গভীরের দিকে যাচ্ছিলাম। ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছিল আমার উপর। হঠাৎ ইয়া বড় একটি হাঙ্গর এসে আমার পায়ে কামড় বসিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে অনিতা ব্যাপারটা খেয়াল করে আমাকে টেনে ধরে রক্ষা করেছিল। ডাঙায় ওঠার পর তিরতির করে রক্ত পড়ছিল আমার পায়ের ক্ষত স্থান থেকে। রক্ত দেখে প্রচণ্ড চিৎকার করে উঠেছিল অনিতা। আর সেই চিৎকারেই তার ঘুম ভেঙে যায়।

আমি জানতে চাইলাম মাছটি আমার কোন পায়ে কামড় মেরেছিল?

অনিতা জানালো বাম পায়ে।

আমি বাম পায়ে আলতোভাবে হাত ছোঁয়ালাম, ‘কোনখানে?’

‘হাঁটুর নিচে।’

হাঁটুর নিচে হাত ছোঁয়ালাম। সব ঠিক আছে। কোনো ক্ষত নাই।

অনিতা জানাল সে আমার জন্য রান্না করেছে। দুপুরে তার সাথে খেতে হবে। কোনো অজুহাত দেখানো যাবে না। আমি উপায়ান্তহীন হয়ে পড়লাম। জানতে চাইলাম, কোথায় আমাদের দেখা হবে। অনিতা বলল ওর বাসায়। আরো জানাল ওর আম্মু নাকি আমাদের রিলেশন অ্যাকসেপ্ট করেছেন।

মনে মনে বললাম, যেমন মেয়ে তেমন মা। কিন্তু আমি ওদের বাসায় যেতে রাজি হলাম না। লজ্জাকে অজুহাত হিশেবে দাঁড় করালাম। তাতে কাজ হলো।

অনেকগুলো বাক্সভর্তি নানা পদের খাবার নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে এল অনিতা। বক্স খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল খাবারের সুগন্ধ। আমার ক্ষুুধার্ত পেট চিঁউমিঁউ করে উঠল। আমি একা মানুষ। ভালো মন্দ খাওয়ার সুযোগ হয় না। আজ মনে হচ্ছে পেট পুরে খেতে পারব।

কিন্তু খাওয়া শুরু করতে গিয়ে ঘটল আরেক বিপত্তি। অনিতা যত খাবার এনেছে সব নাকি আমাকেই সাবাড় করতে হবে। আমি বললাম, আমাকে গুলি করলেও এটা সম্ভব নয়।

অনিতা বলল, ‘আগে শুরু করো তারপরে দেখা যাবে।’ বলেই সে খাবারের প্লেটে হাত দিলো।

আমি বললাম, ‘আমার প্লেট কোথায়?’

অনিতা বলল, ‘এটাই তোমার প্লেট। তুমি চুপ করে বসে থাকো। আমি তোমাকে খাইয়ে দিচ্ছি।’

‘অ্যাঁ!’ আমি রীতিমতো আঁৎকে উঠলাম।

অনিতা বলল, ‘তুমি অমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলে কেন? আমি কি তোমাকে খাইয়ে দিতে পারি না? শান্ত ছেলেটির মতো বসে থাকো।

একটুও নড়বে না।’

এ-সময় লেবু নিয়ে এল আসগর। অনিতা আসগরের হাত থেকে লেবু নিয়ে তাকে ধন্যবাদ দিলো। আসগর হয়তো এরই মধ্যে আমাকে খাইয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছে। তাই আশু ঘটনার কিয়দংশ দেখার জন্য গোল গোল চোখে তাকিয়ে রইল। আমি শান্তভাবে আসগরের দিকে তাকালাম। বললাম, ‘কিছু বলবে আসগর?’


‘দেখো, মেয়েদের অত খেতে হয় না। স্বামী খেলেই স্ত্রীর খাওয়া হয়ে যায়।’


আসগর আমতা আমতা করে বলল, ‘না ইয়ে মানে ছার! আর কিছু লাগবে কিনা…লাগলে বলেন, এনে দেই।’

আমি শান্ত কণ্ঠে বললাম, ‘কিছু লাগলে তোমাকে জানাব।’

আসগর তবুও দাঁড়িয়ে রইল। অনিতা লেবু চিপে রস বের করছে। একটু পরে আমাকে খাইয়ে দেবে। কিন্তু আসগর যাচ্ছে না। ও বেটার সামনে তো আমি ভাত মুখে দিতে পারব না। আসগর হলো বদের হাড্ডি। এমন দৃশ্য দেখতে পেলে আগামী তিন মাস সে আমাকে দেখে মিটিমিটি হাসবে। যা আমি সহ্য করতে পারব না।

ইচ্ছে হলো লেবু চিপার মতো করে আসগরকে চিপে দেই। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। তাই দ্রুত অ্যাক্টিং শুরু করলাম। আমার কাশি এল। বেদম কাশি। কাশতে কাশতে উঠে পড়লাম। তখনো আসগর দাঁড়িয়ে আছে। আমি আবার বললাম, ‘আর কিছু বলবে আসগর?’

আসগর বলল, ‘ছার, আপনার কাশি দেখে চিন্তায় পড়ে গেলাম। তাই দাঁড়িয়ে আছি।’

কত্তবড় সেয়ানা! আমার সামনে ডাক্তার বসা। সে চিন্তিত হচ্ছে না অথচ আসগরের দরদ উছলে পড়ছে।

মনে মনে বললাম, দাঁড়াও আমি তোমার শাস্তির ব্যবস্থা করছি!

অনিতাকে একটি প্রেসক্রিপশন লিখে দিতে বললাম। সঙ্গে সঙ্গে সে একটি কাশির ওষুধের নাম লিখে দিলো। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালের ভেষজ প্রোডাক্ট। অ্যাডোভাস। মসলার সুগন্ধে ভরা। খেতে বেশ সুস্বাদু। আসগরকে পাঠালাম সেটি আনার জন্য। বেচারা আর কোথায় যায়! যেমন কুকুর তেমন মুগুর।

বেশ যত্ন নিয়ে অনিতা আমাকে খাইয়ে দিলো। প্রথম দিকে অস্বস্তি লাগলেও পরে মানিয়ে নিলাম। খেয়ে আমার পেট ভরল।

আমি বললাম, ‘তুমি কী খাবে? সব তো আমিই খেলাম।’

অনিতা বলল, ‘দেখো, মেয়েদের অত খেতে হয় না। স্বামী খেলেই স্ত্রীর খাওয়া হয়ে যায়।’

শুনে আমি কিছুই বললাম না। অনেক দিন পর খাওয়ার পর বেশ আরাম লাগছে। এখন বিছানায় মাথা রাখলেই আমার ঘুম এসে যাবে। কিন্তু একথা ভুলেও অনিতাকে বলা যাবে না।

কিন্তু একটু পরে অনিতাই বলল কথাটা, ‘চলো, তুমি ঘুমোবে। দুপুরের খাবার পরে ঘুম উত্তম।’

আমি শুয়ে পড়লাম। অনিতা আমার সিথানের কাছে বসে রইল। বলল, ‘আমি তোমার মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছি। তুমি ঘুমোও।’

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com