হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২০

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২০

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ২০
616
0

১৯ পর্বের লিংক

পর্ব- ২০

চা-বারে গিয়ে কিছুটা হলেও মাথার ঝট খুলল। বাসায় বসে শুধু একটা বিষয় নিয়ে ভাবছিলাম বলে জট কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছিল। কিন্তু চা-বারে হরেকরকম মানুষের ভাবভঙ্গির দিকে নজর দিতে হয়েছে। সে-কারণে মন একটি বিষয়ে কেন্দ্রীভূত ছিল না। যাই হোক, হালকা মাথা নিয়েই বাসায় ফিরলাম। ঘুমানোর আগ পর্যন্ত সবই স্বাভাবিক ছিল শুধু রাতের স্বপ্নটা ছাড়া। কী এক অদ্ভুত স্বপ্ন!—অনিতা আমাকে ভাত বেড়ে খাওয়াচ্ছে। কিন্তু বাস্তবের মতো স্বপ্নেও লোডশেডিং। অনিতার হাতে তালপাখা। তালপাখা দিয়ে গ্রামের বধূদের মতো আমাকে বাতাস করছে। কী ঠান্ডা বাতাস! আমি ইলিশ মাছের মাথা খাচ্ছি। বিদ্যুৎ না থাকলেও অনিতার তালপাখার কল্যাণে আরামের সাথে বেশ ধীর গতিতে ইলিশ মাছের মাথা চিবোচ্ছি।


অনিতা বলছে, ‘আমাদের বাবু মোটেও ঘ্যানরঘ্যানর-প্যানরপ্যানর করবে না।’


অনিতা বলছে, ‘আমাদের একটা বাবু থাকলে কী যে মজা হতো!’

আমি বলছি, ‘বাবু দিয়ে কী করবে?’

অনিতা বলছে, ‘বিয়ের পর মেয়েদের কোলজুড়ে ফুটফুটে একটা বাবু থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। কেন, তুমি চাও না?’

আমি বলছি, ‘না, বাবুটাবু আমার অপছন্দ। সব সময় ঘ্যানরঘ্যানর-প্যানরপ্যানর করে।’

অনিতা বলছে, ‘আমাদের বাবু মোটেও ঘ্যানরঘ্যানর-প্যানরপ্যানর করবে না।’

আমি বলছি, ‘কেন করবে না, তুমি কি তার মুখ সুপার গ্লু দিয়ে আটকে রাখবে?’

স্বপ্নের এই পর্যায়ে অনিতা আমার কথা শুনে ফিক করে হেসে ওঠে। আর তখনই তার তালপাখার খোঁচা লাগে আমার কপালে। আমি কিঞ্চিৎ ব্যথা পেয়ে উফ বলে উঠি।

সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্নও পালায়।

তখন সকাল হয়ে গেছে। আর ঘুমাতে পারলাম না। বেডরুম-লাগোয়া পুব বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। কয়েকটা পাখি কিচিরমিচির ডেকে সকালকে শুভোচ্ছা জানাচ্ছে। ব্যস্ত মানুষেরা রাস্তায় নেমে পড়েছে। দৃশ্যটা দেখে ভালো লাগল। ভাবলাম এক কাপ চা করে নিয়ে আসি। বারান্দা থেকে কিচেনের দিকে যাব, ঠিক তখন কলিংবেল বেজে উঠল। থমকে দাঁড়ালাম। সাত সকালে আবার কে এল? নিশ্চয়ই আসগর। আজ বেটাকে আচ্ছা মতো শাসাতে হবে। দ্রুততার সাথে দরজা খুলতে গেলাম। কিন্তু আজগর নয়—বিল্যাই মিঞা। তার কোলে কাঁথায় প্যাচানো একটি পোটলা। খুবই অগোছালো দেখাচ্ছে তাকে। হঠাৎ পোটলার ভেতর থেকে মানবশিশু নড়েচড়ে উঠল। আমার তালগোল পাকিয়ে গেল। কী বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘ছোরি ছার, আমি আপনাকে সালাম দিতে ভুলে গেলেও আমার পুত্র আপনাকে সালাম দিতে ভুল করে নি। দেখেন না কেমন নড়েচড়ে শব্দ করল। ছার, আপনি আমার পুত্রের সালাম গ্রহণ করেন।’

আমি বিড়বিড় করে সালামের উত্তর দিলাম।

বিলাই মিঞা বলল, ‘আমার খুব বিপদ ছার। না হলে এত সকালে আপনাকে ডিস্টার্ব করতে আসতাম না।’

আমি বললাম, ‘সেটা বুঝলাম কিন্তু তোমার কী বিপদ?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘ছার, ভিতরে এসে বলি?’

বিল্যাই মিঞা ভেতরে এল। মূল ঘটনা না বলে জানতে চাইল আমার বাসায় দুধ আছে কিনা। পাউডার মিল্ক দিয়ে আমি চা খাই। জানালাম তাকে। বিল্যাই মিঞা বলল তাতেই চলবে।

তার ছেলেটি ক্ষুধার্ত। তাকে না খাওয়ালেই নয়। আমি দ্রুততার সাথে তার ছেলের দুধ খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলাম। সে তার ছেলেকে দুধ খাওয়ালো। তারপর আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন শুধু তার ছেলে নয়, সে নিজেও খেয়ে নিলো।

একটু পরেই তার দুচোখ ছলছল করে উঠল। বলল, ‘আমার এই দুর্ভাগা পুত্র আজ থেকে মা হারা হয়ে গেছে ছার।’

বিল্যাই মিঞার কথা শুনে আমি তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। আমি এতটাই হতবাক হয়ে গেলাম যে, কিছুই বলতে পারলাম না।

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘হায়াত-মৌত আল্লাহর হাতে। আল্লাহ যা করেন বান্দার ভালোর জন্যই করেন। এই কারণে আমি শান্ত আছি। আল্লাহর উপর মানবের নাফরমানি চলে না।’

বিল্যাই মিঞার শক্তি মত্তা দেখে আমি বিস্মিত হলাম।

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘ছার, কিছু বলছেন না যে? আমি আসার কারণে আপনি কি বিরক্ত হয়েছেন?’

আমি বললাম, ‘না। তোমার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে পড়েছি।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘ছার, আমার ছেলেটার দিকে তাকান। আপনার মন ভালো হয়ে যাবে।’

আমি বিল্যাই মিঞার ছেলের দিকে তাকালাম এবং সত্যি সত্যি আমার মন ভালো হয়ে গেল। বিল্যাই মিঞা বলল, মানব শিশুর মধ্যে এমন এক সৌন্দর্য থাকে যা দেখলে মানুষের মন ভালো হয়ে যায়।


যদি সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে তাহলে কে রক্ষা করবে বিল্যাই মিঞার ছেলেকে?


আমি তার ছেলেকে শুইয়ে দিতে বললাম। বিল্যাই মিঞা রাজি হলো না। বলল, ‘আমার পুত্রকে রেখে আসতে আজই আমি গ্রামে চলে যাচ্ছি। যদি সম্ভব হয়, আমাকে কিছু টাকা দেন।’

আমি বললাম, ‘কিন্তু তুমি তোমার পুত্রকে কার কাছে রেখে আসবে?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘কেউ না কেউ রাখবে। গ্রামের মানুষের যতই দোষ থাক, এখনো শহরের মানুষের চাইতে তাদের দয়া-মায়া বেশি।’

আমি তাকে পাঁচ হাজার টাকা দিলাম। কিন্তু সে এত টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানাল। বলল, শুধু গাড়ি ভাড়ার টাকা দিলেই হবে।’

আমি বললাম, ‘রাখো। কাজে লাগবে। এই টাকাটা আমি তোমার ছেলেকে গিফট দিলাম। তুমি তোমার কাজে খরচ করো না।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘আপনি সত্যিকারের ভালো মানুষ ছার। আপনার কথা আজীবন মনে রাখব।’

বিল্যাই মিঞা চলে যাওয়ার পর তার ছেলেটার রুগ্‌ণ ও পবিত্র মুখখানা আমার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠল। মনে হতে থাকল, বিল্যাই মিঞা তার ছেলের জন্য যে ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে—সেটা ঠিক হচ্ছে না। এতটুকু বাচ্চা, তার ওপর মা ছাড়া, কে তার লালন-পালন করবে? সে কি পারে না তার সন্তানটি নিজের কাছে রাখতে? মনে হতেই ইন্টারকমে ফোন দিলাম আসগরকে। যাতে সে বিল্যাই মিঞাকে আটকাতে পারে। কিন্তু ততক্ষণে বিল্যাই মিঞা চলে গিয়েছে।

আহা মানুষের জীবনে কত লাঞ্জনাই না থাকে! আমার মন খারাপ হয়ে গেল। ক’দিন আগে যে ছেলেটি ভূমিষ্ট হলো, আজ সে মাতৃহারা। এই ছেলেটি কার চোখে পৃথিবী দেখবে? কে তাকে মানুষ করবে? চিলের ছোবল থেকে একটি বিড়াল বিল্যাই মিঞাকে রক্ষা করেছিল। আবার যদি সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে তাহলে কে রক্ষা করবে বিল্যাই মিঞার ছেলেকে? এসব ভাবতে ভাবতে আমার বুকের কোণে চিনচিনে ব্যথা অনুভব করলাম। এই ব্যথার নাম বুঝি মায়া! হতে পারে। মনে মনে বিল্যাই মিঞার ছেলের জন্য প্রার্থনা করলাম। আল্লাহ যেন তাকে সহি-সালামতে রাখেন।

২১ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com