হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৯

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৯

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৯
466
0

১৮ পর্বের লিংক

পর্ব-১৯

যা ভেবেছিলাম তাই। আমার বেড পরিপাটি করছে। আমি রুমে ঢুকতেই সে পেছন ফিরে তাকাল। আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নখরামীমূলক হাসি দিলো।  কী যেন বলতে চায় ও। আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

অনিতা বলল, ‘হট আর ইউ লুকিং?’

আমার হাত ধরে বসাল। নিজের বিছানা অথচ অপরিচিত লাগছে। পান নয় মরিচের গুড়ো নয়—সে কি ষোলকলার জাদুর শক্তিতে আমাকে কাবু করে ফেলছে? আমি কি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার বাধ্য টিনবয় হয়ে যাচ্ছি?

অনিতা বলল, ‘এই!’

আমি চিন্তার জগৎ থেকে ফিরে এলাম, ‘অ্যাঁ! কী?’

অনিতা বলল, ‘তুমি এত অগোছাল কেন?’


হাতটি টেনে নিয়ে তাতে আলতো করে চুম্বন করল।


লজ্জা পেলাম। চোরকে চোর বললে সে যেমন লজ্জা পায়। আমার চেহারায় হয়তো লজ্জা ফুটে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে অনিতা বলল, ‘ডোন্ট ওরি। এখন থেকে তোমার সব দায়িত্ব আমার। তোমাকে কিচ্ছুটি করতে হবে না। শুধু আমি যা বলব তাই শুনবে লক্ষ্মী ছেলেটির মতো।’

আমি ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

অনিতা বলল, ‘অমন করে কী দেখছ?’

আমি না বোধক মাথা দুলিয়ে বললাম, ‘না কিছু না।’

অনিতা বলল, ‘তুমি রেস্ট করো। আমি ঝুল পরিষ্কার করি।’

‘অ্যাই মেয়ে তুমি এসব করছ কেন?’ কথাটা মনে মনে বললাম। কিন্তু প্রকাশ্যে বলার সাহস পেলাম না। কিন্তু অনিতা ঠিকই আমার মনের কথাটি বুঝে ফেলল। বিল্যাই মিঞা একদিন বলেছিল মানুষের মনের ভাষা মুখে ফুটে ওঠে। খাঁটি কথা। আর সে কথার প্রমাণ পেলাম অনিতার কাছে।

অনিতা বলল, ‘ভাবছ আমি এসব করছি কেন—তাই তো? শোনো তাহলে বলি—কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি।’

অনিতার মুখে এমন কথা শুনে ’থ হয়ে তাকিয়ে রইলাম।’ অনিতা ঝুল পরিষ্কার করতে চলে গেল।

অতি অল্প সময়ের মধ্যে ফ্ল্যাটের চেহারা বদলে দিল অনিতা। তারপর সে যাবার বেলা যে কাজটি করল সেটি আরো বিস্ময়কর। আমার হাতটি টেনে নিয়ে তাতে আলতো করে চুম্বন করল। আমি ভয়ে শিউরে উঠলাম। মনে মনে বললাম এসব কী হচ্ছে? কিন্তু প্রকাশ্যে মৃদু হাসার চেষ্টা করলাম। আমার হাসির অর্থ হচ্ছে, ঠিক আছে, তবে চুম্বন একটার বেশি যেন না হয়!

অনিতা পাক্কা গৃহিণীর মতো বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়ে গেল। যেমন—রাত ১১টার মধ্যে ঘুমাতে হবে, সকাল ৭ টার মধ্যে উঠতে হবে, নাস্তা করার আগে চা খাওয়া যাবে না ইত্যাদি। আমি সুবোধ বালকের মতো তার কথা বাম কানে শুনলাম ডান কান দিয়ে বের করে দিলাম। অনিতা কিছুই টের পেলো না। সে খুশি মনে চলে গেল। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

অনিতা চলে যাওয়ার পর বিছানার গড়াগড়ি দিলাম। ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঘুম আসি আসি করেও এলো না।

হঠাৎ বালিশের পাশে রাখা একটি চিরকুট চোখে পড়ল। তাতে লেখা: ‘জানু! দিনে তিনটার বেশি সিগারেট খাবে না।’

সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ সিনেমার কথা মনে পড়ে গেল। অপুর নববধূ ঠিক এরকম একটি চিঠি লিখে রেখেছিল স্বামীর জন্য। সেই চিঠিতে অপুর একটার বেশি সিগারেট খাওয়ার পারমিশন ছিল না। সব মেয়েরাই দেখছি সিগারেটের ব্যাপারে কড়া। আমার জন্য অবশ্য তিনটে খাওয়ার পারমিশন আছে। তিনবেলা খাওয়ার পর তিনটে সিগারেট না হলেই নয়। অনিতা হয়তো এই ব্যাপারটা মাথায় রেখেই আমাকে নির্দেশনা দিয়েছে। ভালো।


অনিতার কথা মতো চলতে হবে আমাকে? অনিতা আমার কে?


আচ্ছা মেয়েটা কি ধূমপান করে? না করলে সিগারেটের উপর এরকম সম্মান দেখাল কেমন করে? একদিন অফার করে দেখা যেতে পারে। অফার করলেই বোঝা যাবে সিগারেট খায় কিনা। সিগারেটের কথা ভাবতে ভাবতে নেশা চেপে বসল। প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করার সময় মনে হলো, দিনে তিনটের বেশি সিগারেট খাওয়া যাবে না। তার মানে অনিতার কথা মতো চলতে হবে আমাকে? অনিতা আমার কে?

মহাঝামেলায় পড়ে গেলাম। ছোট্ট চিরকুটে অনিতার লেখা একটিমাত্র কথা আমাকে বেশ ঝামেলায় ফেলে দিলো। একবার মনে হলো আমি অবশ্যই সিগারেট খাব। আবার নিজেই নিজের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম, খাওয়া ঠিক হবে কি?  তারপর আমার ও আমার সত্ত্বার মধ্যে রীতিমতো বোঝাপড়া শুরু হয়ে গেল।

আমি: অনিতা আমার এমন কেউ নয় যে, তার কথা আমাকে শুনতে হবে।

সত্তা: মানলাম সে তোমার কেউ নয়। কিন্তু সে তো অন্যায় কিছু বলে নি। সুতরাং তার কথা শুনতে অসুবিধা কোথায়?

আমি: অসুবিধা আছে। কারণ সে গায়ে পড়ে আমাকে এসব বলছে।

সত্তা: তুমি যদি প্রেমে পড়াকে গায়ে পড়া বলো, তাহলে আর কী বলব?

আমি: তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ, অনিতা আমার প্রেমে পড়েছে?

সত্তা: সারারাত রামায়ণ পড়ে যদি জানতে চাও সীতা কার বাপ, তাহলে আমার অবাক হওয়া ছাড়া আর কোনো গতি থাকবে না। তোমার সঙ্গে আর কথা বলতে ভালো লাগছে না। বিদায়।

আমার সত্তা বিদায় নিলো। আমি আরো দ্বিধায় পড়ে গেলাম। মনে হলো মালিবাগের জ্যাম পড়ে গেছে আমার মাথায়। কিছুই ভাবতে পারছি না। এসব মুহূর্তে নাকি চা খেলে মাথা খোলো। গুড আইডিয়া। অনিতাকে নিয়ে আর চিন্তাা নয়। এবার এককাপ চা খাব। তবে বাসার চা নয়। ধানমণ্ডি ১৯ নম্বর-এর চা-বারের চা। ওখানকার তুলশি চা খুব ভালো। এক কাপ খেলে মন চনমন হয়ে ওঠে। যদিও ওখানে গেলে আমি সাধারণত গ্রিন টি খাই, কিন্তু আজ খাব তুলশি চা। শুনেছি মাথার জট খুলতে এ চা খুবই উপকারী।

দ্রুত রেডি হয়ে বের হলাম। নিচে আসগরের সাথে দেখা। আমাকে দেখে সে ভীষণ লজ্জা পেল। মনে হলো লজ্জার কারণে আমার দিকে তাকাতেই পারছে না। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। সঙ্গে সঙ্গে লজ্জাবতীর মতো অতি লজ্জায় তার মাথা নুয়ে পড়ল।

আমি বললাম, ‘কী ব্যাপার আসগর? কোনো সমস্যা?’

আসগর মাথা তুলল। এবার আবিষ্কার করলাম, তার মুখে শুধু লজ্জা নয় কিঞ্চিৎ হাসির আভাও আছে। অর্থাৎ লজ্জা মিশ্রিত হাসি।

আমি ভাবতে লাগলাম, আসগর আমাকে দেখে এমন আচরণ করছে কেন?

আর তখনই আসগর বলল, ‘ছার, ম্যাডাম খুব ভালো। অমায়িক মানুষ।’

আমি ব্যাপারটা বুঝলাম। কিন্তু না বোঝার অভিনয় করে বললাম, ‘কোন ম্যাডামের কথা বলছ?’

আসগর বলল, ‘কেন ছার, ম্যাডাম—মানে আপনার ম্যাডাম।’ বলে সে গাল ভরে হাসি শুরু করল।

তার হাসি ভালো লাগল না। তাই মাঝ পথে হাসি থামানোর জন্য ধমকের স্বরে বললাম, ‘আমার কোনো ম্যাডাম নাই।’


তামাম মধ্যপ্রাচ্য ধ্বংস হইয়া যাইতেছে অথচ তা নিয়া তার কোনো মাথা ব্যথা নাই।


চা-বারে দু’জন আন্তর্জাতিক মানের রাজনীতি-বিশ্লেষকের কথোপকথন শুনে বেশ মজা পেলাম। শুধু আমি কেন, মজা সবারই পাওয়া দরকার। সুতরাং তাদের কথোপকথন নিম্নরূপ:

প্রথম বিশ্লেষক: (চায়ে চুমুক দিয়ে) এই দূর্মুল্যের বাজারে রিকশা-অলারা যে কেমনে বাঁচে। আল্লাহ-ই জানে।

দ্বিতীয় বিশ্লেষক: আরে হক ভাই, কী যে বলেন। অগো কথা আর কইয়েন না। শূন্য টাকার ভাড়া ত্রিশ টাকা কইরা লইছে। অসুবিধা কী? এই তো গত কাইলের কথাই ধরেন। হুড তুইলা বইয়া ঠ্যাং চুলকাইতেছে এক রিকশাঅলা। কইলাম, ৬ নম্বর  যাইবা? কয়, যামু। ভাড়া লাগব ৪০ টাকা। এখন আপনিই বলেন, এখান থিকা ৬ নম্বরের ভাড়া কত? বড়জোর ২০ টাকা। তাইলেই বুইঝা লন। অরা ভালো আছে না মন্দ আছে। আরে খারাপ আছি আমরা। আমাগো কারো ইনকামই বাড়ে নাই। ঠিক কিনা হাকিম ভাই?

প্রথম বিশ্লেষক: ঠিকই বলছেন। রিকশাঅলারা বহুত ত্যান্দ্রামি করে। যাই হোক, গুরুত্বপূর্ণ কথা শোনেন। গতকাল সেলুনে শেভ করাইতে গিয়া একটা কথা শুনলাম। ওবামা নাকি শীগ্রই বাংলাদেশ সফরে আসতেছে?

দ্বিতীয় বিশ্লেষক: আরে রাখেন ওবামা। তার দিন শেষ। ঐ বেটা লাদেনকে যে শাস্তি দিলো মনে পড়লে এখনো শরীর কাটা দিয়া ওঠে। তারপর দেখেন, তামাম মধ্যপ্রাচ্য ধ্বংস হইয়া যাইতেছে অথচ তা নিয়া তার কোনো মাথা ব্যথা নাই। উনারে যা মনে করছিলাম উনি আসলে তা না। মানুষ হিশেবে বেশি সুবিধার না।

প্রথম বিশ্লেষক: তাইলে কি আমি ভুল শুনলাম?

দ্বিতীয় বিশ্লেষক: আরে ভাই ওবামার ব্যাপারে কথা বলতে আমি আগ্রহী না। কথা যদি বলেন তো ক্লিনটনকে নিয়া বলতে পারেন। সে বাংলাদেশের পান্তাভাত চয়েস কইরা গ্যাছে। এটা আমাদের জন্য অহঙ্কারের ব্যাপার।

প্রথম বিশ্লেষক: তা ঠিক। যে পান্তা ভাত আমরা খাই না সেই জিনিস আম্রিকার প্রেসিডেন্ট খাইয়া গ্যাছে। একেই বলে, গরিবের বউ সকলের ভাবী!

২০ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com