হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৮

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৮

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৮
555
0

১৭পর্বের লিংক

পর্ব-১৮

তড়িঘড়ি ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে এসে দেখি অনিতা নাই। ভয়ে গা কাটা দিয়ে ওঠল। মনে পড়ে গেল অনিতা সম্পর্কে আমার আগের ধারণা। সেদিনও আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। যদি সে আমাকে একটি পান খাইয়ে অথবা চোখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দিয়ে সবকিছু হরিলুট করে? আমি তো নিঃশেষ হয়ে যাব। তাহলে আমার কী করা উচিত? প্রোটেকশন। হ্যাঁ, প্রোটেকশন নিতে হবে। কোনো ভাবেই অনিতার প্ল্যান বাস্তবায়ন হতে দেওয়া যাবে না।

মুহূর্তের মধ্যে আমি একটি সমাধান বের করে ফেললাম। মানে কুইক সলিউশন। জীবনে কুইক সলিউশনের বড়ই দরকার। কুইক সলিউশনের উপর নির্ভর করে যুদ্ধে জয়-পরাজয়। যা-হোক আমার কুইক সিদ্ধান্তের কথা বলি।

পান বিষয়ে প্রতিরোধ।
অনিতা যতই চেষ্টা করুক পান আমি খাব না। সে আমাকে কোনোভাবেই পান খাওয়াতে পারবে না। সুতরাং আমি নিরাপদ।

মরিচের গুঁড়া বিষয়ে প্রতিরোধ।
ব্যাপারটা ভয়ঙ্কর। কথা বলার সময় সে যদি আমার চোখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দেয় তাহলে আমার কিছু করার থাকবে না। আমি ধরাশায়ী হয়ে যাব। তার মানে হচ্ছে পানের চেয়ে মরিচের গুঁড়া বেশি ভয়ঙ্কর!


অনিতাকে দেখতে দেখতে মনে হলো, আসলেই মেয়েরা খুব ন্যাকামি করতে পারে।


হঠাৎ কিচেন থেকে প্লেট-বাটির টুংটাং শব্দ ভেসে এল। ভীষণ চমকে ওঠলাম। কে হতে পারে আমার কিচেনে? অনিতা নাকি বিড়াল? যদি অনিতা হয় তাহলে সে কিচেনে কী করে? ওখানে গিয়ে আমার জন্য পান বানাচ্ছে কি? নাকি আমার ঘরের মরিচ দিয়ে আমাকে বধ করার ফন্দি করছে? প্রাণ কোম্পানির মরিচ আনা আছে। ব্র্যান্ড নিউ। এখনো প্যাকেট খোলা হয় নি। দোকানদার জানিয়েছে, এই মরিচে নাকি খুব ঝাল। অল্প পরিমাণেই কাজ হয়। ব্যাপারটা চিন্তা করে আমার মাথা চক্কর দেওয়ার দশা হলো। কিন্তু এখন মাথা চক্কর দিলে আরো বিপদে পড়তে হবে। সুতরাং মাথা চক্করের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। কষ্ট করে মাথা সামলালাম।

দ্রুত কিচেনে গেলাম। অনিতা এক মনে চা বানাচ্ছে। মানে? এর মানে কী? নিজেই নিজের কাছে বিস্ময় প্রকাশ করলাম। অনিতা কেন আমার বাসায় চা বানাবে? তার চা বানানোর ভঙ্গিটা এমন—যেন সে এ বাড়ির গৃহিণী। অনেক দিন যাবৎ আমার সাথে বসবাস করছে। অনিতাকে দেখতে দেখতে মনে হলো, আসলেই মেয়েরা খুব ন্যাকামি করতে পারে। অথচ সে হয়তো জানে না, ন্যাকামি আমি কতটা অপছন্দ করি।

আমার পায়ের শব্দে ব্যস্তভঙ্গিতে পেছন ফিরে তাকালো অনিতা। মৃদু হেসে কী যেন বোঝার চেষ্ট করল। আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে মনে বললাম, যতই তুমি চা বানাও, আমি ছুঁয়েও দেখব না। হয়তো তুমি চায়ের মধ্যে হাই পাওয়ারের ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছ। একবার মুখে দেওয়ার সাথে সাথে আমি লুটিয়ে পড়ব ঘুমের কোলে। আর অমনি তুমি আমাকে হরিলুট করে ভেগে যাবে। তা হবে না, আমি অতটা বোকা নই যতটা তুমি ভেবেছ!

আচ্ছা আমি যা ভাবছি তার পুরোটা কি ঠিক? অথবা অর্ধেকটাই কি ঠিক? নাকি আমি অযথাই সন্দেহ করছি? ওর শান্ত-শিষ্ট চেহারার মধ্যে এই মুহূর্তে কোনো কূটচালের আভাস তো পাচ্ছি না। তাহলে এসব ভাবছি কেন? হঠাৎ আমি বদলে গেলাম। কেন বদলে গেলাম বুঝতে পারছি না। অনিতার বানানো চা খেতে ইচ্ছে হলো।

আবার একটা সমস্যা শুরু হলো মনে। ভাবলাম আমি কেন গ্রহণ করছি ওকে? একটা মেয়ে এসে আমার সাথে মিশবে আর আমি মেনে নিবো কেন? এর পরিণাম কী তা আমার ভাবা উচিত। যেখানে দুজনের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব সেখানে তো কোনো সম্পর্ক হতে পারে না।

অনিতা বলল, ‘তোমার চায়ে চিনি কম না বেশি?’

আমি বললাম, ‘না কম, না বেশি।’

অনিতা বলল, ‘স্ট্রেঞ্জ! —বলে আমার দিকে গভীরভাবে তাকাল।

আমি ওর এই গভীর দৃষ্টির কোনো মানে খুঁজে পেলাম না। শুধু বললাম, ‘স্ট্রেঞ্জ কেন?’

অনিতা বলল, ‘আমিও ঠিক তোমার মতো। সব কিছুতেই মিলে যাচ্ছে। খুব অবাক হচ্ছি।’

আমি বললাম, ‘মানে কী?’

অনিতা বলল, ‘আরে বাবা তুমি এত বোকা কেন? মানে হচ্ছে, তুমিও চিনি কম। আমিও চিনি কম।’

‘ন্যাকামো করার আর জায়গা পাচ্ছ না! ভাগো এখান থেকে। —কথাটা মনে মনে বললেও প্রকাশ্যে বললাম, ‘ও। তাই বুঝি!’

অনিতা বলল, ‘তাহলে আর বলছি কী!’


আমার কাছ থেকে কেউ হতাশ হয়েছে বুঝতে পারলে আমি তাকে ডেকে খুশি করি।


বুঝলাম আমার সাথে নিজেকে মেলানোর অপচেষ্টা করছে অনিতা। আমার হাসি পেল। মনে মনে বললাম, কোনো লাভ হবে না। আমি হাল ফ্যাশনের টিন বয় নই। আমাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো সহজ হবে না মেয়ে!

অনিতা বলল, ‘চিনি কম খাওয়াই ভালো। এখনো তোমার ফিগার পারফেক্ট আছে। শরীরে এখনো মেদ বাসা বাধতে পারে নি। এমনটাই আমার পছন্দ।’

ও মাই গড! ফিগার নিয়েও কথা বলছে! কে বলল আমার শরীরে মেদ বাসা বাধে নি? মেদ-ভূরি হয়তো হয় নি। কিন্তু একেবারে মেদহীন নই আমি। যাই হোক, আমি অবাক হলেও অনিতাকে বুঝতে দিলাম না। টুকটাক আরো দু’একটি কথা বলে চলে এলাম কিচেন থেকে। ভয়ে ভয়ে অনিতার বানানো চায়ে চুমুক দিলাম। প্রথম চুমুকে মুখে এক ফোঁটা পরিমাণ চা শুষে নিলাম। কিন্তু স্বাভাবিক চা খাওয়ার মতো ভাব করলাম। অনিতা আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

অনিতা বলল, ‘চা কেমন হয়েছে?’

আমি বললাম, ‘ভালো।’

অনিতা বলল, ‘শুধুই ভালো?’

‘মাত্র এক ফোঁটা চা মুখে দিয়েছি। এখনো তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া হয় নি। সে-কারণে কিছুই বলতে পারছি না।’ কথাটা মনে মনে আওড়ালাম। কিন্তু প্রকাশ্যে বললাম, ‘খুবই ভালো হয়েছে।’

এমন উত্তরই সে চাচ্ছিল। সে খুব খুশি হলো। খুশিতে চিকচিক করে উঠল তার দুই চোখ।

এক ফোঁটা চা খেয়ে বোঝা গেল চায়ে কোনো সমস্যা নাই। তাই দ্বিতীয়বার ভালোভাবে চায়ে চুমুক দিলাম। সত্যিই ভালো চা হয়েছে। আমি একটু খুঁতখুঁতে স্বভাবী মানুষ। সহজে কারো কিছু পছন্দ হয় না। অথচ অনিতার চা খেয়ে ভালো লেগে গেল। তাতে একটু অবাকই হলাম।

অনিতা বলল, ‘তুমি বসো, আমি ভেতর থেকে আসি।’

আমি বললাম, ‘ভেতরে মানে?’

অনিতা বলল, ‘এত মানে জানতে হবে না সাহেব। আমার অনেক কাজ আছে। বসো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসব।’

নখরামিমূলক হাসি হেসে চলে গেল অনিতা। আমি চায়ের কাপ ধরে ’থ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। কী হতে চলেছে আমার ফ্ল্যাটে? গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করতে লাগলাম।

আর তখনই কলিংবেল বেজে ওঠল। চমকে উঠে দ্রুত দরজা খুললাম। আসগর। নাস্তার প্যাকেট দিলো আমার হাতে। আজগরের মুখজুড়ে গিজগিজে আনন্দ। আমি ভাবগম্ভীরতার সাথে আজগরকে পরখ করার চেষ্টা করলাম। কাজ হলো তাতে। আজরের মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল। অপরাধবোধ ফুটে ওঠল। মনে মনে আমি খুশি হলাম। মানুষকে কত সহজেই না বদলে দেওয়া যায় বিশেষত সে যদি হয় অধীনস্ত কেউ!

দরজা বন্ধ করতে যাবো তখন আজগর বলল, ‘আর কিছু লাগবে নাকি ছার?’

আমি বললাম, ‘আর কিছু মানে?’

আসগর বলল, ‘না মানে বলছিলাম যে, যদি কিছু লাগে তো বলেন এনে দিচ্ছি। আমি নিচেই আছি।’

আমি কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘তুমি তো নিচেই থাকবে—নিচেই তো তোমার ডিউটি, নাকি?’

আসগর বলল, ‘না ইয়ে মানে ছার…’

আমার কথায় ভীষণরকম ধাক্কা খেলো আজগর। একটু খাতির জমাতে চেয়েছিল। কিন্তু জমল না। তাকে চলে যেতে হলো হতাশ মনে। আমার কাছ থেকে কেউ হতাশ হয়েছে বুঝতে পারলে আমি তাকে ডেকে খুশি করি। কিন্তু আজ সে ইচ্ছে হলো না। আসগরকে ডাকলাম না। মনে হলো সবদিন দুধভাত না খেয়ে দুয়েকদিন শাকভাত খেলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।


বেটার সাহস কত! ম্যাডাম এসেছে আমার বাসায় আর আনন্দে ভাসছে সে।


একটু পরে আবার এল আসগর।

বলল, ‘ছার, একটা কথা বলতে ভুলে গেছিলাম।’

আমি বললাম, ‘কী?’

আসগর বলল, ‘আমি আপনার অনুমতি ছাড়াই একটা আইসক্রিম খেয়েছি।’

আমি বললাম, ‘কত টাকার আইসক্রিম?’

আসগর বলল, ‘পয়ত্রিশ টাকা ছার।’

আমি বললাম, ‘এত টাকার আইসক্রিম খেলে কেন? কুলফি খেতে?’

আসগর বলল, ‘আজকের এই আনন্দের দিনে কুলফিতে মন ভরতো না ছার।’

আমি বললাম, ‘আজকের আনন্দের দিনে মানে? কিসের আনন্দ?’

আসগর বলল, ‘না ইয়ে মানে ছার…আজকে ম্যাডাম আসছেন তো, এইজন্যই আনন্দের দিন।’ কথাটা বলে  মাথা নিচু করে চলে যেতে লাগল। আমি রাগান্বিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বেটার সাহস কত! ম্যাডাম এসেছে আমার বাসায় আর আনন্দে ভাসছে সে। সময় মতো ভেগেছে। না হলে আমার থাপ্পড় থেকে আজ রেহাই পেতো না।

নাস্তা নিয়ে কিচেনে গেলাম। সেখানে অনিতা নেই। কিন্তু অনিতার উপস্থিতি লক্ষণীয়। মানে সে এরই মধ্যে আমার কিচেনের চেহারা পাল্টে দিয়েছে। একা মানুষ আমি। কোনো কিছুই গোছগাছ করা হয়ে উঠে না। অথচ অনিতা আমার কিচেনটাকে একেবারে ঝকঝকে তকতকে করে ফেলেছে। কিন্তু সে কোথায়?

১৯ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com