হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৭

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৭

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৭
441
0

১৬পর্বের লিংক

পর্ব-১৭

প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলাম। একটি সিনেমার কথা মনে পড়ল। ছবির নাম খুব সম্ভবত ‘দ্য বার্ড’। সেই ছবিতে পাখিরা এরকম মারমুখী ছিল। ঠুকরে ঠুকরে ভেঙে দিয়েছিল ঘর বাড়ি। কাকগুলোর মতিগতিও ভালো ঠেকছে না। যেকোনো ধরনের অপকর্ম করে ফেলতে পারে। ওদের দলের একটা কাককে মনে হলো দলনেতা। তার কথায় সবগুলো কাক পরিচালিত হচ্ছে। সে কা কা ডেকে উঠার সাথে সাথে অন্যরা হইহুল্লোড় করে ওঠল! আমি ভাষাবিদ না। তারপরও ওদের ভাষা বুঝতে পারছি। বিপদে পড়লে অনেক কিছুই বুঝতে হয়। জানতে হয়। মনে হলো ওদের দলনেতা বলছে, ‘দুনিয়ার যত কাক!’

বাকীরা বলছে, ‘এক হও। এক হও।

দলনেতা: ‘হাগু করো হাগু করো!

বাকীরা: ‘ঐ বেটার মাথায় হাগু করো!’


কাকের হাগুতে আমার পুরো দেহ আবৃত সুতরাং আমাকে চিনতে না পারাটাই স্বাভাবিক।


তারপর তারা আমাকে লক্ষ করে একের পর এক বিষ্ঠা-বৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগল। শুধু মাথা নয়, তাদের হাগুতে আমার পুরো শরীর ঢেকে গেল। আমি নাস্তানাবুদ হয়ে গেলাম। উপায়ান্ত না দেখে এক পর্যায়ে দৌড় দিলাম বাসার উদ্দেশ্যে। আজগর আমাকে চিনতে পারল না। বলল, ‘এই মিয়া দাঁড়ান। আপনার পরিচয় কী?’

আমি ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললাম, ‘পরিচয় পাবে। আগে সালাম দাও।’ সে ভড়কে গিয়ে তাজিমের সহিত সালাম দিলো।

যেহেতু কাকের হাগুতে আমার পুরো দেহ আবৃত সুতরাং আমাকে চিনতে না পারাটাই স্বাভাবিক। আজগরকে আমার কণ্ঠ চেনানোর চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু হাঁদারাম আজগর আমার কণ্ঠকে আইডেনটিফাই করতে ব্যর্থ হলো। অবশেষে একটি বুদ্ধি বের করলাম। তার দিকে তাকিয়ে হাসির অভিনয় করলাম। যাতে আমার দাঁত দেখে অন্তত চিনতে পারে। কিন্তু আজগর বুঝল উল্টো। বলল, ‘দাঁতে হাগু ভরে নাই। দাঁত অকে আছে।’

আমি বললাম, ‘আরে বেকুব আমি মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ। আমার হাসি দেখে চিনে নাও আমাকে।’—মনে মনে আজগরকে আরো একটা গালি দিলাম (সে গালিটা প্রিন্ট অনুপযোগী)।

আজগর সঙ্গে সঙ্গে আমাকে চিনতে পেরে লজ্জিত ভঙ্গিতে স্যালুট দিলো। বলল, ‘কোন পাখিতে আপনার এ অবস্থা করছে ছার?’

আজগরের ভাবখানা এমন, যেন নাম শোনামাত্র সে পাখিটাকে ধরে নিয়ে আসবে। পাখিটাকে বাধ্য করবে আমার কাছে মাফ চাইতে। কিন্তু আমি আজগরের অতি আগ্রহভাবটা গায়ে না মেখে বললাম, ‘পাতি কাক।’

ছোট্ট এই জবাবটি দিয়ে আমার ফ্ল্যাটে চলে গেলাম। মাথা ধুয়ে পরিষ্কার করলাম। পুরোপুরি ফ্রেশ হতে ২০ মিনিট সময় লেগে গেল। হঠাৎ কর্কশ কণ্ঠে কাকের কা কা শব্দ ভেসে এল। সচকিত হয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে যা দেখলাম, তাতে আমার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো।   

আলমগীর সাহেব শাদা শার্ট, কালো প্যান্ট ও লাল টাই পরিহিত। তিনি সব সময় ফিটফাট থাকেন। শরীর চর্চা করেন। ফিগার মেইনটেন করেন। তিনি অফিস থেকে ফিরছিলেন। অথচ তাকে দেখে মোটেও তা বোঝার উপায় নেই। মনে হচ্ছে তিনি অফিসে যাচ্ছেন। খুবই ফ্রেশ দেখাচ্ছে তাকে। তিনি আমাদের বিল্ডিং-এর চারতলার বাসিন্দা। কাকেরা তো নির্বোধ প্রাণী। আমাকে ভেবে আলমগীর সাহেবকে ধরেছে। একযোগে সবাই তাকে লক্ষ করে হাগু করতে লাগল। আমি জিহ্বায় কামড় কেটে জানালার পর্দা নামিয়ে দিলাম। কিঞ্চিৎ ভয়ও পেলাম। মনে মনে বললাম, হে আল্লাহ আলমগীর সাহেবকে রক্ষা করুন। তিনি নির্দোষ। কিন্তু আমার এই প্রার্থনায় কোনো কাজ হলো না। তার শরীরে বৃষ্টিফোঁটার মতো মুহুর্মুহু হাগু পড়তে লাগল

কলিংবেল বেজে ওঠল। দরজা খুলব কী খুলব না ভাবতে লাগলাম। ভাবতে ভাবতে আরও একবার কলিংবেল বাজল। ভয়ে ভয়ে দরজা খুলতেই দেখতে পেলাম হাস্যরত আজগরকে। সে হাসি চেপে রাখতে পারছে না। দুঠোঁটের কর্নার দিয়ে যেন উপচে পড়ছে হাসির বাড়তি প্রস্রবণ ধারা। আমার দিকে সে এমনভাবে তাকাল, যেন সে আমার বাল্যকালের বন্ধু। হাসতে হাসতে বলল, ‘ছার, অল্পের লিগা আমি বাঁইচা গেছি।’

আমি কিছুই জানি না এমনভঙ্গি করে বললাম, ‘কেন, কী হয়েছে? তুমি মরতে গেছিলে কেন?’

আজগর বলল, ‘ছার, মরতে-টরতে যাই নি। ঘটনা অন্যরকম। পাতি কাকে কালা ছারের অবস্থা কাহিল করে দিছে। তার অবস্থা আপনার চাইতেও করুণ। আমি দৌড়ে ভাইগা বাঁচছি। আর একটু হলে আমাকেও হাগু করে কাহিল করে দিত।’ (বি. দ্র. আলমগীর সাহেব অতি কালো মানুষ। এ-কারণে ফ্ল্যাটের সবাই তাকে কালা সাহেব বলে।)


ইদানীং দেখা যায় টিনেজাররা একজন আর একজনকে জড়িয়ে না ধরে কথা বলতে পারে না।


আমি বললাম, ‘ও আচ্ছা। কিন্তু কালা সাহেব কী করেছিলেন, জানো তুমি?’

‘আপনি যা করেছিলেন কালা ছার নিশ্চয়ই তাই করেছিলেন।’ কথাটা বলেই সে ফিক করে হেসে ফেলল। ‘ছার, আপনি কী করেছিলেন?’

আমার বিরক্তি ধরে গেল। বললাম, ‘তুমি এখন যাও আজগর।’

‘কেমনে যাই ছার। আমার ভয় করছে। মনে হচ্ছে নিচে যাওয়া মাত্র কাকেরা আমার উপর হাগু করবে। আমি খুব বিপদে পড়ে যাব ছার।’

ঘটনা সত্য। মনে মনে বললাম কথাটা। কিন্তু প্রকাশ্যে বললাম, ‘তারপরও তুমি যাও। কর্তব্যে অবহেলা করা ঠিক নয়।’

‘ওকে ছার যাচ্ছি।’   

কিছুক্ষণ যেতে না যেতে আজগর মিয়া আবার ফিরে এল। এবার সে আরো বেশি আনন্দিত। হাসি ধরে রাখতে পারছে না। আমি কিঞ্চিৎ ধমকের স্বরে বললাম, ‘এই মিয়া! মাথা খারাপ হলো নাকি তোমার?’ আমার ধমকে কাজ হলো। কিন্তু হাসি থামিয়ে সে যা বলল তাতে আমারও হাসি পেল।

কালা সাহেব পাতি কাকের হাগুসমেত বাসায় গিয়ে কলিংবেল বাজিয়েছেন। তার মেয়ে লিপিকা দরজা খুলেই ভূত ভূত বলে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। তারপর এসেছে তার স্ত্রী, মানে আমাদের মরিয়ম ভাবী। ভাবীরও একই দশা। কালা সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন দরজার সামনে। চিন্তা করছেন কিভাবে বাসায় ঢুকবেন। পাশের ফ্ল্যাটের কলিংবেলে চাপ দিয়েছেন। দরজা খুলেছে বুয়া রহিমার মা। এক পলক দেখে মনে করেছে ভিক্ষুক। বলেছে, ‘মাফ হরেন!’

অবশেষে তিনি আজগরের সহায়তায় নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকতে পেরেছেন। আজগরের কাছ থেকে কালা সাহেবের ঘটনা সবিস্তারে শুনে মজা নিচ্ছি ঠিক তখন কয়েকটি কাক আমার বারান্দার গ্রিলে এসে আছড়ে পড়ল। ভয় পেয়ে হাউমাউ করে উঠতেই আমার তন্দ্রাভাব কেটে গেল। আমি উঠে পড়লাম। শরীরে চিমটি কাটলাম। বুঝলাম ঘটনাটা ছিল নিছক স্বপ্ন। স্বপ্ন জগতে আমার উপর কাকেরা হাগু করলেও বাস্তবে আমি বহাল তবিয়তেই আছি। খোদাতালার অশেষ মেহেরবানি যে, ঘটনাটি বাস্তব নয়। ঘুম, স্বপ্ন ভালোই হয়েছে। এবার বাসায় যাওয়া যাক।

আজগরের চেয়ারে বসে আছে অনিতা। আজগর দাঁড়ানো। আমি ভেতরে ঢুকতেই আমাকে দেখিয়ে আজগর অনিতাকে কী যেন বলল। অনিতা চেয়ার থেকে উঠে আমার দিকে এগিয়ে এল। মিষ্টি করে হাসল। যেন তার সাথে আমার গভীর প্রেম। পারলে আমাকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে ট্যাকেল দিলাম।

ইদানীং দেখা যায় টিনেজাররা একজন আর একজনকে জড়িয়ে না ধরে কথা বলতে পারে না। অবশ্য অনিতাও এখনো টিন। বিজ্ঞানীদের মতে, ২৫ না পেরোনো পর্যন্ত ছেলেমেয়েরা পাকাপোক্তভাবে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। অর্থাৎ তখন পর্যন্ত তারা টিন। ইচ্ছে হলো অনিতাকে জিজ্ঞেস করি, তোমার বয়স কত? পরক্ষণে আবার মনে হলো, মেয়েদের বয়স জিজ্ঞেস করা ঠিক না।  


সে পূর্ণমাত্রায় লজ্জা পেয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, তাকে লজ্জার হাত থেকে উদ্ধার করা উচিত।


আমি কিছু বলার আগেই অনিতা বলল, ‘কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষণ?’ 

আমি বললাম, ‘জরুরি একটা কাজ ছিল।’

অনিতা বলল, ‘মোবাইল বন্ধ কেন?

আমি বললাম, ‘চার্জ শেষ।’

অনিতা বলল, ‘চার্জ দাও না কেন?’

আমি বললাম, ‘মনে থাকে না।’

আমরা কথা বলতে বলতে উপরে উঠে গেলাম। বুঝতে পারলাম প্রচণ্ড খুশি ভঙ্গিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে আজগর। হঠাৎ আমার মনে একটু দুষ্টুমি ভর করল। ফিরে তাকিয়ে আজগরকে লজ্জা দিতে ইচ্ছে হলো। যা ভাবনা তাই কাজ। আমি চতুরতার সাথে ফিরে তাকালাম।

হ্যাঁ, আজগর ঠিকই আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছিল। কিন্তু আমি তার দিকে তাকানো মাত্র সে চোখ নামিয়ে নিল। অর্থাৎ সে পূর্ণমাত্রায় লজ্জা পেয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, তাকে লজ্জার হাত থেকে উদ্ধার করা উচিত। মুহূর্তের মধ্যে মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। আজগরকে ডাকলাম।

আজগর আমার ডাকের অর্থ বুঝতে না পেরে কিঞ্চিৎ ভয় পেয়ে দ্রুততার সাথে সিঁড়ির কাছে চলে এল। পাঁচশ টাকার একটা নোট দিয়ে বললাম, ‘আমাদের জন্য কিছু নাস্তা নিয়ে এসো।’

আজগর মনে করেছিল আমি তাকে বকা দেওয়ার জন্য ডেকেছি কিন্তু সে যখন দেখল ঘটনা তার উল্টো তখন খুশিতে ডিগডিগে হয়ে বলল, ‘ওকে ছার। আমি এক্ষুণি যাচ্ছি।’

১৮পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com