হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৬

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৬

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৬
1.11K
0

১৫ পর্বের লিংক

পর্ব-১৬

আমি বলেছিলাম, ‘ও আচ্ছা। এজন্যই বুঝি বড় বড় লেখকদের উপন্যাস অবলম্বনে ধারাবাহিক নাটক বানাচ্ছে সবাই?’

খণ্ডত হাসান বলেছিল, ‘একজেক্টলি স্যার। আমরা ডিরেক্টর ছাগলরা ফুলের সাথে কীট হয়ে রাজমুকুটে যাই। আমাদের মুরোদ নাই। আমরা অন্যের মুরোদ নিয়ে উপরে উঠার ধান্ধা করছি। দোয়া করবেন স্যার।’

আমি বলেছিলাম, ‘অনেকের সম্পর্কে জানতে পারলাম। কিন্তু লেখক সম্পর্কে তো কিছুই বললে না?’

খণ্ডত হাসান বলেছিল, ‘লেখকরা সম্মানী লোক। তাদের সম্পর্কে কিছু বলা আমার সাজে না। তারপরও আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, লেখকরা আগেও জন্ডিসেভোগা ও ছ্যাবলা ছিল, এখনো আছে।’


তোমার কাছে বা অর্থমন্ত্রীর কাছে দুই টাকার মূল্য না থাকতে পারে কিন্তু আমার কাছে অনেক মূল্য।


খণ্ডত হাসানের কথা মনে পড়ায় বেশ মজা পেলাম। কিন্তু মজাটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কারণ আমি এখন পার্কের শান্ত শীতল পরিবেশে ঘুমঘুম ভাবের মধ্যে ভাসছি। ঘুম ছাড়া অন্য কোনো সুখ চিন্তায় সাঁতার কাটার অবসর নাই আমার। এখন ঘুমের অতল দেশে হারিয়ে যেতে চাই। আর নয় ব্যস্ত নগর সভ্যতার কোলাহল, আর নয় রিকশার টুংটাং, গাড়ির হর্ন, মানুষের কেরি-ক্যাচার। আহা ঘুম!…তুমি চলে এসো আমার চোখের গহ্বরে। কিন্তু না। ঈমানদার লোকের পেছনে যেমন শয়তান ঘুরঘুর করে তেমনি পার্কে বাদামঅলারা মানুষের আয়েস নষ্ট করার জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকে।

বাদামঅলা দেশি মোরগের মতো কঁকিয়ে ওঠল, ‘বাদাম আছে বাদাম!’

সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশার মতো ধেয়ে আসা চোখের ঘুম চলে গেল। আমার প্রিয় খাবারগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে বাদাম। দেখে লোভ হলো। তাই ছেলেটাকে হাত ইশারায় ডাকলাম। দুই টাকার বাদাম দিতে বললাম।

ছেলেটা বলল, ‘স্যরি ছার, পাঁচ টাকার নিচে সম্ভব না।’

শান্তভঙ্গিতে বললাম, ‘সম্ভব না হলে দিয়ো না। বিদায় হও।’

বাদামঅলা বলল, ‘পাঁচ টাকার নেন। এই বাজারে দুই টাকার কী মূল্য?’

আমি বললাম, ‘তোমার কাছে বা অর্থমন্ত্রীর কাছে দুই টাকার মূল্য না থাকতে পারে কিন্তু আমার কাছে অনেক মূল্য।’

বাদামঅলা বুঝল আমি লোকটা একটু অন্যরকম। তাই সে তার সিদ্ধান্ত বদলে বলল, ‘ঠিক আছে দুই টাকারই নেন।’

সে ছোট্ট ঠোঙায় বাদাম দিতে যাচ্ছিল। আমি তাকে ঠোঙায় না দিয়ে হাতে দিতে বললাম। আমার কথা শুনে যেন বাদামঅলার চোখ কপালে উঠে গেল। যদিও কিছু বলল না। পাঁচ কী ছয়টা বাদাম দিলো আমার হাতে। আমি আর কথা বাড়ালাম না। বাদামগুলো ভালো করে ভাজা হয়েছে। বেশ সুগন্ধি ও সুস্বাদু। লবণ দিয়ে খেতে খুব ভালো লাগল। বাদাম খাওয়া শেষ হতে না হতে শসাঅলা এসে হাঁক ছাড়ল : ‘অ্যাই শসা! আছে মোটা তাজা দেশি জাতের লম্বা শসা!’

আমার ঘাড়ের কাছে এসে বলল, ‘দিবো নাকি ছার ফালি ফালি কাটা শসা? ঠান্ডা হবে পেট, ঠান্ডা হবে মন।’

আমি বললাম, ‘কবিতা বন্ধ কর। তোমার শসার দাম কত?’

শসাঅলা বলল, ‘বেশি না ছার, এক ব্যাগ মাত্র পাঁচ টাকা।’

আমি শসা বিক্রেতাদের টেকনিক জানি। একটি শসাকে পাতলা করে কেটে দুটি পলিথিনের কাগজে ভরে। ক্রেতারা মনে করে একটি ব্যাগে একটি শসাই আছে। ঘটনা আসলে তা নয়। শসা কাটায় ওদের কারিশমা আছে। এমনভাবে কাটে দেখে মনে হয় একটি ব্যাগে পুরো একটি শসাই দেওয়া আছে। ওরা ক্রেতাদের ঠকাতে ভালোই পটু।


ছার, আপনি কোন জগৎ থিকা আসছেন? চাঁদের দেশ থিকা নাকি পাতালপুর থিকা?


আমি বললাম, ‘তোমার শসা আমি খাব—যদি একটি সত্য কথা বলো।’

শসাঅলা আমার কথা পুরোপুরি বুঝতে না পেরে বলল, ‘শসা খাওয়ার সাথে সত্য কথা বলার সমন্ধ কী ছার?’

আমি বললাম, ‘সমন্ধ অবশ্যই আছে। তুমি বলো সত্য কথা বলবে কিনা?’

শসাঅলা বলল, ‘না বলার কী আছে ছার? একটা সত্য কথা বলতে বলেছেন, এইটা কি আর এমন কঠিন কাজ? বলেন, কী বলতে হবে?’

সত্য কথা বলার ব্যাপারে তার অতি আগ্রহী ভাবটা আমার কাছে সন্দেহজনক মনে হলো। তাই মূল প্রশ্নটি করার আগে একটি সম্পূরক প্রশ্ন করলাম : ‘তুমি কি নিয়মিত সত্য কথা বলো? মানে তোমার কি সত্য কথা বলার অভ্যাস আছে?’

শসাঅলা বলল, ‘ফিফটি ফিফটি ছার।’

আমি বললাম, ‘মানে?’

শসাঅলা বলল, ‘মানে হলো আমরা সুযোগ বুঝে সত্য বা মিথ্যা বলি। যাতে আমাদের লাভ হয়। সব সময় আমরা আমাদের লাভের দিকটা দেখি ছার।’

আমি বললাম, ‘ও আচ্ছা।’

শসাঅলা বড়ই জাঁদরেল। একে বেশি ঘাঁটানো ঠিক হবে না। মূল প্রশ্নটি করে ফেলাই ভালো। আমি বললাম, ‘তুমি যে-পানি দিয়ে শসা ধৌত কর, সেটা কোথাকার পানি?’

শসাঅলা এক গাল হেসে বলল, ‘ও এই কথা? লেকের পানি ছার।’

আমি বললাম, ‘সত্য কথা বলার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু লেকের পানি তো বিশুদ্ধ না।’

আমার কথা শুনে শুকনো মতো হাসল শসাঅলা। বলল, ‘ছার, আপনি কোন জগৎ থিকা আসছেন? চাঁদের দেশ থিকা নাকি পাতালপুর থিকা? এই দেশে যেখানে শুদ্ধ মানুষেরই অভাব সেখানে আপনি বিশুদ্ধ পানির কথা চিন্তা করেন কেমনে?’

আমি চুপ হয়ে গেলাম। এর সাথে আর কথা বলা ঠিক হবে না। কথা বাড়ালে সে আমায় এক হাত নিয়ে ছাড়বে। এক ব্যাগ শসা কিনলাম বটে, খেলাম না। সে চলে যাওয়ামাত্র ফেলে দিলাম।

আমি খুব রেগে গেলাম। কিন্তু এই রাগীভাবটা দূর করা দরকার। কারণ এ ধরনের ভাবের কারণে মানুষকে অসুন্দর দেখা যায়। কী করা যায় ভাবতে লাগলাম। পুনরায় চোখের পাতায় ঘুমের আভাস টের পেলাম। খুশিতে ময়ূরের পাখনার মতো আমার মন নেচে ওঠল। আর কোনো রাগ রইল না।


আমার মাথায় মলত্যাগ করতে পেরে সে খুব আনন্দ পেয়েছে। লেখকের মাথা বলে কথা!


ঘুমের মধ্যে যে ঘটনাটা ঘটেছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ :

মাথার উপর কিছু একটা পড়ল। হাত ছুঁইয়ে নিশ্চিত হলাম, পাখির বিষ্ঠা। উপরের দিকে তাকিয়ে আরো নিশ্চিত হওয়া গেল জিনিসটা পাতি কাকের। কারণ মাথার উপর আম গাছের ডালে আনন্দিত একটি কাক কা কা করছিল। হয়তো আমার মাথায় মলত্যাগ করতে পেরে সে খুব আনন্দ পেয়েছে। লেখকের মাথা বলে কথা! আমি ক্ষিপ্ত হয়ে এমন কিছু খুঁজতে লাগলাম যা দিয়ে ওটাকে শায়েস্তা করা যায়। সঙ্গে সঙ্গে পেয়েও গেলাম। একটি ভাঙা ইটের টুকরা। মোক্ষম সময়ে মোক্ষম জিনিসটা পেয়ে যাওয়ায় বিধাতাকে ধন্যাবাদ দিলাম। হাতে তুলে নিলাম সেটি। ছোটবেলা থেকে আমার হাতের নিশানা ভালো। গুলতি দিয়ে জীবনে কত পাখি যে শিকার করেছি তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু আজকে খালি হাত। হোক। এই হাতই আমার গুলতি। কাকটিকে লক্ষ করে ইটের টুকরাটি ছুঁড়লাম। নিশানা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো না। লাগল বদমাশটার নরম বুকে। সঙ্গে সঙ্গে আমার সামনে লুটিয়ে পড়ল। আমি বীর দর্পে দেখতে লাগলাম বদটার তড়পানো। মনে মনে বললাম, তুই মানুষ চিনতে ভুল করেছিস রে কাউয়া।

তড়পাতে তড়পাতে মরে গেল কাকটি। যথাযথ প্রতিশোধ নিতে পেরে খুশি হলাম। মনে বিজয়ের আনন্দ অনুভব করলাম। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগল এটা ভেবে যে, আমার হাতের নিশানা আগের মতোই আছে। গুলতি হলে এখনো উড়ন্ত পাখিকে ভূপাতিত করতে পারব ইনশাআল্লাহ।

কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটনা অন্য দিকে মোড় নিল।

কাকের জ্ঞাতি-গোষ্ঠী-বন্ধ-বান্ধব-সাঙ্গপাঙ্গরা প্রতিশোধ নিতে উড়ে এল। দলে দলে। ঝাঁকে ঝাঁকে। আমার চক্ষু ছানাভরা। একি দেখছি! এতদিন নোয়াখালী এবং বরিশালের লোকেদের মধ্যে এমন জোট দেখেছি। কিন্তু এখন দেখছি কাকদের জোট আরো প্রবল। কাকেরা আমার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে একযোগে কর্কশ কণ্ঠে কা কা করে ওঠল। ভাষাবিদ হলে জানা যেতো কা কা করে ওরা আসলে কী বলছে। তবে ধারণা করা যায়, ওরা বিশ্রী ভাষায় গালাগালি করছে। আর চিল্লাপাল্লা করে বলছে, ‘তুই কত বড় মাস্তান হইছোস, আইজ তরে দেইখা লমু।’

১৭পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com
মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ