হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৫

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৫

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৫
424
0

১৪ পর্বের লিংক

পর্ব-১৫

মনটা খারাপ হয়ে গেল। প্রথমত বিল্যাই মিঞার বাকি দুটি গল্প শুনতে পারলাম না, দ্বিতীয়ত খাউজানি বরকতের কাছে বোকা হয়ে গেলাম। তাই এখানে থাকতে আর ভালো লাগছে না। বিল্যাই মিঞার নাম বৃত্তান্ত পাওয়া গেছে সেটাই যথেষ্ট। বাসায় গিয়ে ফ্রেশ একটা ঘুম দেওয়া যাবে।

ঠিক এমন সময় আমার সামনে উদয় হলো পর্বত আলী। মনে হলো সে এতক্ষণ আশেপাশেই কোথাও লুকিয়ে ছিল। খাউজানি বরকত চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুপ করে বেরিয়ে পড়ল।

পর্বত আলী একগাল হাসি হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু আমার কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে তার হাসি সেভেনটি ফাইভ পারসেন্ট বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। বাকি টোয়েন্টি ফাইভ পারসেন্ট তাকে গিলে খেতে হলো।


না ছার, রবীন্দ-নরজুল সঙ্গীতে আমাদের পোষায় না।


পর্বত আলী মোলায়েম কণ্ঠে বলল, ‘ছার কি চলে যাচ্ছেন?’

‘হুঁম।’

পর্বত আলী মিনমিন করে বলল, ‘যাবার বেলা—ইয়ে মানে…একটা কথা ছিল ছার।’

আমি চমকে উঠলাম। যাবার বেলা বলে পর্বত একটু পজ দিয়েছিল। আমার মনে পড়ে গেল, কাজী নজরুল ইসলামের একটি গান :

যাবার বেলা ফেলে যেয়ো একটি খোঁপার ফুল
আমার চোখে চেয়ে যেয়ো একটু চোখের ভুল॥

পর্বত আলী কি গানটি জানে? মনে হয় না। ওরা শোনে রক গান। ওদের জীবন রক দিয়ে মোড়ানো। যদি তাই হয়, তাহলে সে যাবার বেলার ইমোশন মেশানো কথা তৈরি করে কিভাবে? আমার মনে হলো ওকেও একটু টোকা দিয়ে দেখা দরকার।

আমি বললাম, ‘পর্বত আলী, তুমি কি নজরুল সঙ্গীত শোনো?’

পর্বত আলী বলল, ‘না ছার, রবীন্দ-নরজুল সঙ্গীতে আমাদের পোষায় না। আমাদের হলো কঠিন ছ্যাঁচা খাওয়া রিদয়। কলিজাকাটা বিচ্ছেদ গান শুনি। একটা শুনলেই বুঝতে পারবেন।’ সঙ্গে সঙ্গে গলা খাঁকারি দিয়ে গান শুরু করে দিলো :

তোমার প্রেমের আগুনেতে আমি হইলাম চিতা
আমার মালা যারে পরাও সে যে আমার মিতা॥

আমি ধমকের স্বরে বললাম, ‘তোমার গান বন্ধ করো।’

পর্বত আলী বলল, ‘কেন ছার, গান কি পছন্দ হয় নাই?’

আমি বললাম, ‘আমার অনুমতি ছাড়া তুমি গান শুরু করলে কেন?’

পর্বত আলী বলল, ‘ছোরি ছার। আমার ভুল হয়ে গেছে। আর কখনো আপনার অনুমতি ছাড়া গান করব না।’

পর্বত আলী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। আমি বললাম, ‘ঢঙ করবে না। সামনে থেকে সরে দাঁড়াও। আমি যাব।’

পর্বত আলী মাথা নিচু রেখেই বলল, ‘ছার, একটা কথা ছিল।’

আমি বললাম, ‘কী কথা?’

সে মাথা নিচু রেখেই বলল, ‘আমার বাবা পর্বত থিকা পড়ে গিয়ে যেবার মারা গেল সেবারই আমার জন্ম। তাই আমার নাম পর্বত আলী।’

আমি তাকে রাগী কণ্ঠে বললাম, ‘তা তুমি পর্বত হও, পাহাড় হও তাতে আমার কী? এটা তো খুব সহজ ব্যাপার। তোমার বাবা নদীতে ডুবে মরলে তোমার নাম হতো নদের চাঁদ। তোমার বাবা সাপের কামড়ে মরলে তোমার হতো সরফরাজ। এ রকম আরও অনেক নামই হতে পারতো। যেমন : পাহাড় আলী, সাগর মোল্লা, আকাশ মিঞা ইত্যাদি।’

পর্বত বলল, ‘ছার, আমার গল্প বিল্যাই মিঞার গল্পের চেয়ে বেশি শ্রুতিমধুর। বলব ছার?’

‘না।’

বোঝা গেল পর্বত আলীর মতিগতি। সে একজন ঈর্ষাকাতর মানুষ। ভেতরে ভেতরে বিল্যাই মিঞার সাথে তার একটা প্রতিযোগিতা আছে। বিল্যাই মিঞা নিজের গল্প শুনিয়ে আমাকে খুশি করেছে। পর্বত আলীও আমাকে খুশি করতে চাচ্ছে। এটাই হলো মূল কথা।


সমস্যা মনে করলে সমস্যা। না মনে করলে ফেউশা।


আমি বললাম, ‘তোমার গল্প বেশি শ্রুতিমধুর হলেই যে আমি শুনব সেটা তোমাকে কে বলল?’

পর্বত আলী আবদারের সুরে বলল, ‘বিল্যাই মিঞার মিথ্যা গল্প শুনে তাকে পাঁচশ টাকা দিলেন আর আমার গল্প শুনবেনই না?’

আমি বললাম, ‘বিল্যাই মিঞার মিথ্যা গল্প মানে?’

পর্বত আলী বলল, ‘মিথ্যা গল্প না তো কী! মানুষকে কখনও চিলে নেয় নাকি? বিল্যাইতেই-বা মানবশিশুকে রক্ষা করল কিভাবে? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য গল্প?’

আমি বললাম, ‘ও এই কথা? তার মানে এতক্ষণ তুমি আড়ি পেতে আমার আর বিল্যাই মিঞার কথা শুনেছ?’

পর্বত আলী বলল, ‘না ছার। বিল্যাই মিঞার গল্প আমরা সবাই জানি।’

আমি বললাম, ‘তাহলে সমস্যা কোথায়?’

র্বত আলী বলল, ‘সমস্যা মনে করলে সমস্যা। না মনে করলে ফেউশা।’

আমি বুঝতে পারলাম পর্বত আলী একজন ঠোঁট কাটা টাইপের চাঁছাছোলা যুবক। এটাও মনে হলো যে, সে আমাকে এখন বলে বসতে পারে যেহেতু বিল্যাই মিঞাকে আমি পাঁচশত টাকা দিয়েছি, সুতরাং তাকেও দিতে হবে। না দিলে অসুবিধায় পড়তে হবে। এই চিন্তাটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি তাকেও টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। একশ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘টাকা পেয়েছ, এখন ভাগো।’

পর্বত বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ছার। কিন্তু আমার গল্প শুনবেন না?’

আমি বললাম, ‘আমি এক কথা দুইবার বলি না।’

পর্বতকে আর কোনো কথা বলার চাঞ্চ দিলাম না। সে চলে গেল।

আমি হাঁফ ছেড়ে যেন বাঁচলাম। ইচ্ছা হলো একটু পায়চারি করি। এখন আর কারো কথা ভাবতে ভালো লাগছে না। না বিল্যাই মিঞা, না পর্বত আলী, কেউ না। দশ মিনিট নিরিবিলি কোথাও বসে থাকব। এক কাপ চা খাব, সুযোগ পেলে একটা সিগারেটও খাব। তারপর বাসায় যাব। এটা হচ্ছে তাৎক্ষণিক মিনি পরিকল্পনা। জীবনে তাৎক্ষণিক পরিকল্পনার মূল্য আছে। যারা এই পরিকল্পনা করতে পারে এবং পরিকল্পনা মাফিক চলতে পারে তারা বুদ্ধিমান। আমার সমস্যা হচ্ছে, আমি কিঞ্চিৎ মন ভোলা টাইপের মানুষ। পরিকল্পনা করতে মনে থাকে না বলে নানান ঝামেলায় পড়ি। যাই হোক, মিনি পরিকল্পনা করতে পারায় আমি এখন পুরোপুরি তৃপ্ত ও ঝামেলা-মুক্ত।

যে বেঞ্চিটাতে বসেছি সেটি বেশ নিরিবিলি জায়গায়। গাছের ডালে দু’একটি কাক ছাড়া আর কেউ নাই। অন্যান্য দিন কাকেরা অযথা কা কা করলেও আজ তারা বেশ শান্ত। তাই কোনো ডিস্টার্ব ফিল করছি না। বলা চলে, সুনসান নীরবতা। আয়েশ করে চা খেলাম। এই ফাঁকে আগামী রাতের কাজের পরিকল্পনাটাও চট করে সেরে ফেললাম। নিয়মিত লেখালেখির ভিড়ে আর একটি কাজ এসে জমেছে আমার টেবিলে। সেটি হলো টিভি নাটক। নির্দেশক খণ্ডত হাসান আমাকে যেভাবে ধরেছে, মনে হয় তার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। তাই নাটকের পরিকল্পনাটাও করে ফেললাম। তাকে একটা নাটক লিখে দিবো।


ডিরেক্টররাও নায়িকাদের ন্যাকামি দেখতে পছন্দ করেন।


বিশেষ কারণে খণ্ডত হাসানকে খুব ভালো লাগে। ছেলেটার কাছ থেকে আমি টিভি মিডিয়ার হাল-হকিকত জেনে মজা পাই। সে নায়িকাদের ন্যাকামির যেসব বর্ণনা দেয় তা এক কথায় অনবদ্য। নায়িকারা নাকি এম্নিতে অ্যাক্টিং না পারলেও ন্যাকামির অ্যাক্টিং খুব ভালো পারে। আর ডিরেক্টররাও নায়িকাদের ন্যাকামি দেখতে পছন্দ করেন। আমি একদিন ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘তুমি নিজে একজন ডিরেক্টর হয়ে নিজেদের বদনাম করছ কেন?

খণ্ডত হাসান বলেছিল, ‘স্যার, আপনার কাছে যেকোনো কথা বলা যায়। আপনি আমার কাছের মানুষ। আপনাকে বলি : নাটকের নামে টিভিতে এখন যা হচ্ছে তার সেভেনটি ফাইভ পারসেন্ট ন্যাকামি। বাকি টোয়েন্টি ফাইভ পারসেন্ট হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল সলিড।’

আমি জানতে চেয়েছিলাম, ‘আর্টিফিশিয়াল সলিড মানে? হোয়াট ডু ইউ মিন বাই আর্টিফিশিয়াল সলিড?’

আমার বোকামি দেখে খণ্ডত হাসান মজা পেয়ে বলেছিল, ‘বুঝলেন না! খুবই ইন্টারেস্টিং বিষয়। চ্যানেলের হেড অব প্রোগ্রামের মন মতো নাটক না হলে সে নাটক অন এয়ার হয় না। তাই আমরা ডিরেক্টর ছাগলরা হেড অব প্রোগ্রামের মন খুশি করার জন্য নাটক করি। এখানে তো আমাদের কোনো স্বকীয়তা নাই। তাই আমি এই বিষয়টার নাম দিয়েছি আর্টিফিশিয়ার সলিড।’

আমি বলেছিলাম, ‘তাহলে আমার কাছ থেকে যে নাটকটি নিচ্ছ সেটি অন এয়ার হবে কিভাবে?’

খণ্ডত হাসান বলেছিল, ‘এইখানে ছার, আর একটা কারিশমা আছে।’

আমি বলেছিলাম, ‘সেটি কেমন?’

খণ্ডত হাসান বলেছিল, ‘ছার, কেউ নামে কাটে কেউ ধারে কাটে। জানেন নিশ্চয়?’

আমি বলেছিলাম, ‘তা আমি কোন দলে?’

খণ্ডত হাসান বলেছিল, ‘আপনি উভয় দলেই আছেন। আপনার যেমন আছে নাম ডাক তেমন ধার। মানে যোগ্যতা। চ্যানেলের লোক আপনার নাম শুনলে নড়েচড়ে বসে। সত্যি কথা বলতে কী, কোনো রিস্ক নাই আপনাকে নিয়ে কাজ করতে।’

১৬ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com
মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ