হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৪

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৪

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৪
433
0

১৩পর্বের লিংক

পর্ব-১৪

‘মা আমার কপালে কালো টিপ পরিয়ে উঠানে রেখে কাজে চলে গেছিল। এই সুযোগে চিলের রাডারে ধরা পড়ি আমি। আপনি জানেন কি-না জানি না, চিল পাখির কিন্তু রাডার থাকে। রাডারে তার শিকারের ছবি ফুটে ওঠে। তৎক্ষণাৎ সে ওড়াওড়ি থামিয়ে নিরিখ করা শুরু করে। চোখের পলকে মাটিতে নেমে আসে ছোঁ মেরে শিকার নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সে ব্যর্থ হয়। আমার পরম বন্ধু আমাদের বাড়ির পোষা বিল্যাই হারামজাদা চিলকে তাড়া করে। চিলের হাত থেকে বাঁচিয়ে বিল্যাই আমাকে কামড়ে ধরে নিয়ে যায় মায়ের কাছে। এই কারণে আমার নাম বিল্যাই মিঞা। ১ নং প্রশ্নর উত্তর দেওয়া হলো। বাকি রইল আরও দুটি প্রশ্ন। এখন চা পান বিরতি।’


‘ছার, আমি নিউজের হেডলাইন পাইছি। ডিটেল বলতে পারব না।’


চা পান বিরতির মধ্যেই হাঁপাতে হাঁপাতে এল খাউজানি বরকত। কী ব্যাপার? জানা গেল, বিল্যাই মিঞার স্ত্রী অসুস্থ। তাকে এখনই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

আমি বললাম, ‘কী হয়েছে বিল্যাই মিঞার স্ত্রীর?’

খাউজানি বরকত বলল, ‘ছার, আমি নিউজের হেডলাইন পাইছি। ডিটেল বলতে পারব না।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘ছার, কেস মনে হচ্ছে খারাপ। আমাকে এখনই যেতে হবে। বাকি গল্প দুটো পরে বলব।’

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, তুমি যাও।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ছার। আমার উয়াইফের জন্য দোয়া করবেন। মনে হয় সে বাঁচবে না।’

আমি বললাম, ‘মানে! কী বলছ এসব?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘জি ছার, ঘটনা সত্য। খাউজানি বরকতকে দৌড়ে আসতে দেখেই আমি সবটা বুঝতে পেরেছি। যাই হোক, আমি আপনার সাথে পরে দেখা করব।’

আমি পাঁচশত টাকা দিলাম বিল্যাই মিঞার হাতে। বিল্যাই মিঞা কাঁচুমাচু করতে লাগল।

আমি বললাম, ‘তুমি কাজ ফেলে আমাকে অনেকক্ষণ সময় দিয়েছ। ঘরে তোমার স্ত্রী অসুস্থ। এ-সময় তোমার টাকার প্রয়োজন। রেখে দাও, কাজে লাগবে।’

বিল্যাই মিঞা আমার দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকাল। বুঝলাম সে একজন দায়িত্ববান স্বামী। দায়িত্ববান বাবা। স্ত্রী এবং সন্তানের চিন্তায় তার চোখ ছলছল করছে। এই অনুভূতি বড় পবিত্র। আমি তাকে দ্রুত যেতে বললাম। সে চলে গেল।

আমার বাবাও ছিলেন দায়িত্ববান একজন মানুষ।। আমরা কখন কী খেলাম, কী পরলাম, কী করলাম—সব কিছু তিনি খেয়াল রাখতেন। বাবাকে কখনও কোনো ব্যাপারে বিরক্ত হতে দেখি নি। তিনি ছিলেন একজন উদার মনের মানুষ। ডাক বিভাগে চাকরি করতেন। প্রচণ্ড ভ্রমণ পিপাসু ছিলেন। শুক্রবারে পুরো পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। যদিও আমার বাইরে যেতে ভালো লাগত না। ছোটবেলা থেকেই আমি ছিলাম ঘরকুনো স্বভাবের। স্বভাবটা এখনো ধরে রেখেছি। বাবা ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই সবাইকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার প্ল্যান করতেন। বাবার প্ল্যানটার মর্মার্থ আমি বুঝতাম। আসলে তিনি আমাকে বদলাতে চাইতেন। যদিও তিনি তা পারেন নি।

বিল্যাই মিঞার জন্য আমার মায়া হলো। মনে মনে ভাবলাম, আমার কোনো সন্তান থাকলে আমিও হয়তো তার মতো দায়িত্ববান বাবা হতাম। দায়িত্ববান স্বামী হতাম। স্ত্রীর অসুস্থ হওয়ার খবর শুনে আমার চোখ বিল্যাই মিয়ার মতোই ছলছল করত। সত্যিই কি ছলছল করত? আমি ঠিক জানি না। কিছু কনফিউশন আছে আমার এসব ব্যাপারে।


আমি একজন নামকরা টেন্ডারবাজ হবো ছার। আমার টেন্ডার বাজনায় দেশ কাঁপবে।


বিল্যাই মিঞা চলে গেলেও খাউজানি বরকত রয়ে গেল। সে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে রইল। আমি তার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকার অর্থ বুঝতে পারলাম না। অর্থটা কি এই যে, তাকেও কিছু টাকা দিতে হবে?

একটু টোকা দিয়ে দেখলে কেমন হয়? টোকা দেওয়ার এই পরীক্ষাটা আমাকে শিখিয়েছে বন্ধুবর ড. আলবক্স মৃধা। বেশ ক’বছর আগে সে ভিক্ষুকদের নিয়ে একটা জরিপ চালিয়েছিল। সে তিনটে প্রশ্ন করত ভিক্ষুকদের। তারা ঝটপট উত্তর দিত। তারপর সে তার ফলাফল প্রকাশ করত। বন্ধুবর ড. আলবক্স মৃধার সূত্র মাথায় রেখে আমি খাউজানি বরকতকে ডাকলাম।

খাউজানি বরকত যেন সম্বিত ফিরে পেল। সপ্রতিভ হয়ে তাকাল আমার দিকে, ‘জি ছার?’

আমি বললাম, ‘তোমাকে আমি তিনটে প্রশ্ন করব। ঝটপট উত্তর দেবে।’

খাউজানি বরকত বলল, ‘ওকে ছার। আমি একজন মূর্খ মানুষ। দয়া করে কঠিন প্রশ্ন করবেন না।’

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। তবে তোমাকে সত্য কথা বলতে হবে। সত্য বই মিথ্যা বলা যাবে না।’

খাউজানি বরকত বলল, ‘ঠিক আছে ছার। আমি সত্য বই মিথ্যা বলব না।’

প্রথম প্রশ্ন : ‘একটি ফুলের নাম বলো?’

খাউজানি বরকত পানির মতো সোজা প্রশ্ন পেয়ে বাচ্চাদের মতো খুশিতে যেন নেচে ওঠল এবং বলল, ‘গেন্দাফুল।’

দ্বিতীয় প্রশ্ন : ‘ভবিষ্যতে তুমি কী হবে?’

খাউজানি বরকত বলল, ‘অনেক কিছু হবো ছার।’

আমি বললাম, ‘অনেক কিছু হবো বললে হবে না। যেকোনো একটি বলতে হবে।’

খাউজানি বরকত বলল, ‘আমি একজন নামকরা টেন্ডারবাজ হবো ছার। আমার টেন্ডার বাজনায় দেশ কাঁপবে।’

শেষ প্রশ্ন : ‘মনে করো—তোমার সামনে তিনটে জিনিস। একটি গেন্দাফুল। একটি ফাইনাল টেন্ডার ফর্ম এবং একটি একশত টাকার নোট। তুমি কোনটি নেবে?’

খাউজানি বরকত তৃতীয় প্রশ্নে বেশ ঝামেলায় পড়ে গেল। বুঝলাম তার মাথায় প্যাঁচ লেগে গেছে। তাকে নাকানি চুবানি খাইয়ে দিতে পেরে আমি মজা পেয়ে মনে মনে হাসতে লাগলাম।

অনেক চিন্তা-ভাবনা শেষে খাউজানি বরকত বলল, ‘পাঁচশ টাকার নোট নেবো ছার।’

আমি চমকে ওঠে বললাম, ‘আরে তুমি পাঁচশ টাকার নোট কোথায় পেলে? তোমার সামনে আছে একটি একশ টাকার নোট।’

খাউজানি বরকত লজ্জা পেল। আমি আমার পরীক্ষার ফলাফল পেয়ে গেলাম। অর্থাৎ খাউজানি বরকত দাঁড়িয়ে ছিল বিল্যাই মিঞার মতো পাঁচশত টাকা পাওয়ার প্রত্যাশায়। প্রুভড। ধন্যবাদ বন্ধু আলবক্স মৃধা।

খাউজানি বরকত হা হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমিও তাকে দেখতে লাগলাম। কয়েক মুহূর্ত পর পকেট থেকে একশ টাকা বের করে খাউজানি বরকতের হাতে দিয়ে বললাম, ‘আগামী ছয় মাস আমার সামনে আসবে না।’


খুব বুঝতে পারছি। হাসি কান্না রাগ এই তিনটা জিনিস অতি সহজেই বোঝা যায়।


খাউজানি বরকত আমাকে কদমবুছি করে খুশি মনে চলে গেল।

আমি অবাক হলাম। তাকে ডাকতে বাধ্য হলাম। সে ফিরে এল।

খাউজানি বরকত নরম কণ্ঠে বলল, ‘জি ছার বলেন।’

‘আমি যে তোমার সাথে রাগ করেছি তা কি তুমি বুঝতে পার নি?’

খাউজানি বরকত বলল, ‘কেন পারব না ছার। খুব বুঝতে পারছি। হাসি কান্না রাগ এই তিনটা জিনিস অতি সহজেই বোঝা যায়।’

আমি বললাম, ‘তাহলে তুমি খুশি হলে কেন?’

খাউজানি বরকত বলল, ‘সত্য গোপন করে বলব নাকি সত্যসহ বলব?’

আমি বললাম, ‘অবশ্যই সত্যসহ বলবে।’

খাউজানি বরকত বলল, ‘বেয়াদবি নিবেন না ছার। বোকা মানুষের পরিচয় পেলে আমার হাসি পায়। এটা আমার বহুদিনের অভ্যাস ছার।’

আমি বললাম, ‘মানে কী?’

খাউজানি বরকত বলল, ‘আবারও বেয়াদবি মাফ করবেন ছার। আপনি নিজের পকেটের টাকার বিনিময়ে মানুষ যাচাই-বাছাই করেন। আপনার চাইতে বোকা মানুষ এই দেশে আর কেউ আছে বলে মনে হয় না।’

খাউজানি বরকতের কথায় আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। নিজের সম্পর্কে প্রত্যেক মানুষের উচ্চ ধারণা থাকে। কিন্তু কেউ যখন তাকে নিয়ে মন্তব্য করে তখন সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার যে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে বোকামি রয়েছে। তাই বলে খাউজানি বরকতের মতো একজন মানুষ আমাকে বোকা হিশেবে ট্রিট করবে? এটা কি মেনে নেওয়া যায়?

১৫ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com