হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৩

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৩

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১৩
712
0

১২ পর্বের লিংক

পর্ব-১৩

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, তুমি তোমার খুশি মতো গল্প বলে যাও। মাঝে কোনো ব্রেক দিয়ো না কেমন?’

বিল্যাই মিঞা আবার তার গল্প শুরু করল।

‘আমার জন্মের বছর ফাল্গুন মাসেও হাড় কাঁপানো শীত ছিল। প্রায়ই আমার মা আমাকে উঠানের রোদে শুইয়ে রাখত। আমাদের বাড়িটা ছিল গাছগাছালিতে ভরা। বেলা ১১/১২টার আগে রোদ ঢুকতে পারত না। ঠিক ১২টার সময় মা আমাকে গোসল করাত। গোসলের পর আমাকে সাজাত। সাজাত মানে কপালে একটা কালো টিপ পরিয়ে দিত। কলা পাতায় সরিষার তেল মাখিয়ে কুপি বাতির শিসের উপর ধরলে যে কালি পড়ে সেই কালির টিপ। মজার বিষয় না ছার?’

‘হুঁম।’


মুরগিরা আমাকে চিনত। খালি উঠানে আমাকে শুয়ে থাকতে দেখে ওরা আশে-পাশে ঘরঘুর করত।


‘মা আমাকে সাজগোছ করিয়ে কাঁথা দিয়ে পেঁচিয়ে পুটলি বানাত। তারপর উঠানের রোদে শুইয়ে রেখে চলে যেত নিজের কাজে। তখনও আমার চোখ ফোটে নি। আমি আপন মনে নিজের সাথে খেলা করতাম।

আমি মাঝে মাঝে অবাক হই আমার মায়ের কথা ভেবে। চিন্তা করেন ছার, আমার মায়ের কত সাহস যে, একটা চোখ না ফোটা বাচ্চাকে উঠানে রেখে দিতে পারত। কত বড় গুর্দা থাকলে এমন কাজ করা যায় একবার ভেবে দেখেন! গুর্দা কি বোঝেন তো ছার?’

‘কী?’

‘বুঝলেন না? গুর্দা মানে কলিজা, বুকের পাটা, সাহস।’

‘তারপর?’

‘মুরগিরা আমাকে চিনত। খালি উঠানে আমাকে শুয়ে থাকতে দেখে ওরা আশে-পাশে ঘরঘুর করত কিন্তু কোনোদিন আমাকে ভুলেও ঠোক্কর দেয় নি। কুত্তারাও আমাকে চিনত। এমনকি কাঠবিড়ালী, পিঁপড়া, চেল্লা সবাই আমাকে চিনে তাজিম করত। কিন্তু আমাকে চিনত না কে জানেন?

এইখানে ‘কে’ বলটা খুব স্বাভাবিক কিন্তু আমি চুপ রইলাম।

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘আকাশের চিল।’

চিল শব্দটা শুনলেই জীবনানন্দ দাশের কথা মনে পড়ে আমার। এখনও তার ব্যতিক্রম হলো না। মনে মনে আওড়ালাম :

সোনালি-সোনালি চিল-শিশির শিকার করে নিয়ে গেছে তারে—
কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে!

এই কবিতাটা মনে হলেই আমি একটা ভাবের মধ্যে ডুবে যাই। নিজেকে মনে হয় আমিই কবিতাটা লিখেছি। কবিতাটার সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে চিলকে আমার ভালো লাগে। ভাবতে ভালো লাগে পাখিটা খুব ভালো। যদিও এ কথা জানা আছে যে, চিল খুব ভয়ঙ্কর পাখি। তাদের নিশানা বড়ই শক্তিশালী। একটা পাখির প্রতি বিল্যাই মিঞার অভিমান আঁচ করে কিছুটা অবাক হলাম।

এখন চুপ করে থাকাটা অভদ্র দেখায় তাই বললাম, ‘সবাই তোমাকে চিনল, কিন্তু চিল চিনল না কেন?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘সেটাই তো আমার জীবনের গল্প ছার। চিল যদি আমাকে চিনত তাহলে আমার নাম বিল্যাই মিঞা হতো না। অবশ্য না চেনাতে আমার উপকারই হয়েছে। আমি বিখ্যাত হয়েছি। আমাদের ইউনিয়ন পরিষদে আমার চাইতে বিখ্যাত আর কেউ নাই। এমনকি পাশের ইউনিয়নেও আমার পরিচিতি আছে। আমি চাইলে চেয়ারম্যান ইলেকশনে দাঁড়াতে পারি। নির্ঘাত পাশ করব। এটা বর্তমান চেয়ারম্যান সাহেব জানেন। তাই গ্রামে গেলে তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে এক্সট্রা খাতির করেন। মানে হলো আমাকে তোয়াজ করেন। যাতে আমি ইলেকশনে ফাইট না দেই। অথচ দেখেন ছার, আমি কোনোদিন কারো কাছে বলি নি যে, আমি চেয়ারম্যান ইলেকশনে দাঁড়াতে চাই। ওসব আমি চাই না। ভিলেজ পলেটিক্স খুব ড্যানজারাস জিনিস ছার।


আমি তাকে ডাক্তার বানাব। কানের ডাক্তার। সুতরাং গ্রামে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না।


শহরের মানুষ মনে করে গ্রামের মানুষ সহজ সরল। কিন্তু আমি এর বিরোধিতা করি। কারণ গ্রামের মানুষের মতো ত্যান্দর আর কেউ নাই। সহজ-সরল একটা ভাব ধরে থাকে। ঐগুলোকে আমার খালি থাবড়াতে ইচ্ছে করে। তাছাড়া আমার গ্রামে থাকার কোনো ইচ্ছা নাই। ওখানকার পরিবেশ আমার পছন্দ না। আমার উয়াইফ অবশ্য মাঝে মাঝে আমাকে চাপ দেয় গ্রামে যাওয়ার জন্য। আমি কিছু বলি না। কারণ আমি জানি, আমি যাব না। আর এখন তো আমার পুত্র হয়েছে। রাজধানী শহরে তার জন্ম। শহরেরই সে বড় হবে। আমি তাকে ডাক্তার বানাব। কানের ডাক্তার। সুতরাং গ্রামে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না।

আমার উয়াইফ কেন গ্রামে যেতে চায় জানেন ছার?’

আমি নিশ্চুপ।

বিল্যাই মিঞা বলতে থাকে, ‘থাক সেটা আপনার না জানলেও চলবে। এখন আমার একটাই চিন্তা। সেটা হলো আমার ছেলে। সে আমার ভবিষ্যৎ বংশধর। তার চিন্তা করাটাই আমার একমাত্র কাজ। তাই না ছার?’’

আমার বোধহয় আর মেকি ভদ্রতা দেখানো উচিত হচ্ছে না। কথাটা বিল্যাই মিঞাকে জানিয়ে দেওয়াই উচিত যে, আমি তার গল্পে আর মনোযোগ দিতে পারছি না। একটু আগেও মনে হয়েছিল, বিল্যাই মিঞা মূল পয়েন্টে চলে এসেছে। কিন্তু না। সে মুহূর্তের মধ্যে স্লিপ কেটে চলে গেছে তার ছেলের ভবিষ্যৎ জীবন ভাবনায়। এতে তো আমার কোনো উপকার হচ্ছে না। আমি তার কাছে এসেছি তার নাম বৃত্তান্ত জানতে। এটা না জানলে রাতে আমার ঘুম হবে না। আমি একজন সমস্যাবহুল মানুষ। যদি কখনও মনে করি কোনো একটা বিষয় আমার জানা দরকার, তো সেটা না জানা পর্যন্ত আমি যন্ত্রণার মধ্যে পড়ে যাই। রাতে ঘুম আসে না। কোনো চিন্তা করতে পারি না। লেখালেখি করতে পারি না। সে-কারণে এত সময় নষ্ট করে আমি বিল্যাই মিঞার দ্বারস্থ হয়েছি। কিন্তু সে যা শুরু করেছে, তা বিরক্তিলিপিতে প্রণিধানযোগ্য।

খুব সম্ভবত আমার মনের অবস্থা আঁচ করতে পেরে, বিল্যাই মিঞা আবার স্লিপ কাটল। আমাকে অবাক করে দিয়ে মূল পয়েন্টে ফিরে এল, ‘চিল খুব ভয়ঙ্কর পাখি। ওদের চোখের নিশানা খুব শক্তিশালী। যা ধরার জন্য নিরিখ করে তা ঠিকঠিক ধরে ফেলতে পারে। চিল ইঁদুর ধরে, সাপ ধরে, মাছ ধরে, মুরগীর বাচ্চা ধরে। কিন্তু মানুষের বাচ্চা ধরে কোনোদিন শুনেছেন ছার?’

আমি নড়েচড়ে বসলাম, ‘মানে! তোমাকে চিলে ধরেছিল নাকি?’

‘তাহলে আর কি বলছি ছার। মানবজাতির ইতিহাসে এইরকম ঘটনা দ্বিতীয়টি আছে কি-না আমি জানি না। আপনি জানলে বলতে পারেন।’

আমি বলে দিলাম, ‘না, জানি না।’

‘তাহলে আপনিই বলেন ছার আমি কেন বিখ্যাত হব না? আমার জন্ম যদি হতো আমরিকায় তাহলে হয়তো ওরা আমাকে সরকারি ভাতা দিত। আরো সম্মানজনক পেশা থাকত আমার। যদি জন্মাতাম সুইজারল্যান্ডে, আমার সুখের সীমা-পরিসীমা থাকত না। পাশের দেশ ভারতেও যদি জন্মাতাম, তাহলেও আমার এই দশা থাকত না। কিন্তু ভাগ্যদোষে বাংলাদেশে জন্ম আমার। কিছুই পেলাম না জীবনে। তারপরও আমি সন্তুষ্ট বেঁচে আছি বলে। আমার বেঁচে থাকার কথা ছিল না। চিল আমাকে ছিন্নভিন্ন করে খেয়ে ফেলত। আমার মা আমার হাড়গোড়ও খুঁজে পেত না। আমার না ফোটা চোখ খেয়ে ফেলত চিল। আমার হৃদয় টুকরো টুকরো করে খেয়ে ফেলত। আমি বাতাসে মিশে যেতাম। কেউ আমার জীবনকাহিনি শুনতে চাইত না। আপনার সাথে পরিচয় হতো না।’


আল্লার মেহেরবানিতে আমি জীবন পেলাম। ছার একমিনিট, আল্লার দরবারে মাগফেরাত করে নেই।


এই প্রথম লক্ষ করলাম বিল্যাই মিঞার চোখ ছলছল করছে। এক ফাঁকে সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে নিলো আমার মনের অবস্থা কী। ব্যাপার বুঝলাম। সে হয়তো চাচ্ছে, তার বেদনায় আমিও বেদনার্ত হই। আমার চোখেও অশ্রু ঝরুক।

বিল্যাই মিঞা আবার বলতে লাগল, ‘আমার সৌভাগ্য ছার। আমি বেঁচে গেলাম। আসলে বাঁচানোর মালিক আল্লতালা। আবার আল্লাই সৃষ্টি করেছেন ভয়ঙ্কর চিল পাখি। তিনি চিলকে শিকার করার ক্ষমতা দিয়েছেন। আবার শিকার থেকে বাঁচানোর ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। কিন্তু লাদেন বাঁচতে পারল না। আমরিকা তাকে সাগরে ফেলে দিলো। বড়ই দুর্ভাগ্য তার। একমাত্র আল্লার মেহেরবানিতে আমি জীবন পেলাম। ছার, এক মিনিট, আল্লার দরবারে মাগফেরাত করে নেই।’

সে দু’হাত তুলে আল্লার উদ্দেশ্যে বলতে লাগল, ‘হে পাক পরোয়ার দিগার, রহমানির রাহিম, তোমার রহমতে আমি বেঁচে আছি, চিলের হাত থেকে লাদেন বাঁচতে পারে নাই, আমি বাঁচিয়া গেছি, আমি তোমার নাদান বান্দা, আমারে তুমি সহিভাবে জীবন চালানোর তৌফিক দান কর—আমিন।’

সংক্ষিপ্ত মোনাজাত শেষ করে বলল, ‘আমি কিভাবে বেঁচে গেলাম জানতে চাইলেন না ছার?’

১৪ পর্বের লিংক

‘কিভাবে?’

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com